আর্থার কোয়েসলার (Arthur Koestler) নামটি আমি প্রথম শুনে ১৯৮১/৮২ সালে, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি, অধ্যাপক অসীম কুমার দাসের মুখে| আমরা তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্সের ছাত্র| অসীম মাঝে মাঝে কোয়েসলারের অমামুলি প্রতিভা ও পাণ্ডিত্যের প্রসঙ্গ তুলতেন| আমাদেও অন্তরঙ্গ বন্ধুবৃত্তে অসীমই প্রথম কোয়েসলারের লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত হন| কেবল তা-ই নয় বোর্হেস, নিকোস কাজানজাকিস, মার্কেস প্রমুখের লেখাও তিনি আমাদের মধ্যে সবার আগে পড়েছেন| সাধ্যানুযায়ী সেসব নিয়ে মন্তব্যও করেছেন|
কোয়েসলার নামটি শোনার পনের/ষোলো বছর পর আমি তার লেখা পড়ি ১৯৯৭/৯৮ সাল নাগাদ| স্বভাবতই আমাকে আকর্ষণ করেছিল লেখকের অসামান্য উপন্যাস এবং সম্ভবত সর্বাধিক বিখ্যাত গ্রন্থ Darkness at Noon(১৯৪০)| আর্থার কোয়েসলার আদৌ জনপ্রিয় লেখক ছিলেন না, কেননা গভীর বিষয় নিয়ে তিনি লিখতেন, ততোধিক গভীর জীবনসন্ধিৎসার সঙ্গে| তার আত্মজীবনী Arrow in the Blue (১৯৫২) আমি পাঠ করেছি| এ গ্রন্থে অনেক উচিত কথা তিনি বলেছেন, মন খারাপ করে দেয়ার মতো অসখ্য প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন| কৌতুক বা শ্লেষের কিছুটা আশ্রয়ও নিয়েছেন| এ বইয়ে কম-বেশি বিনোদী উপকরণ লক্ষ করা যায়, যদিও শেষ পর্যন্ত একে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা লেখক করেননি| তা সত্ত্বেও Darkness at Noon-এর পর এটাই এখন পর্যন্ত তার দ্বিতীয় সর্বাধিক বিক্রিত গ্রন্থ|
আর্থার কোয়েসলার একই সঙ্গে জসৎবিখ্যাত ও কুখ্যাত| অভূতপূর্ব মণীষা ও প্রতিভার ধারক এ লেখক উদ&বায়ী মেজাজের অধিকারী ছিলেন| তার আচার-ব্যবহারও নির্ভরযোগ্য ছিল না| তিনি ঠিক ইউরোপীয় ধাঁচের ভদ্রলোক নন, বরং eccentric শব্দটি তার বেলায় সুপ্রযোজ্য বলে মনে হয়| কোয়েসলারের জন্মভূমি হাঙ্গেরি| ১৯০৫ সালে বুদাপেস্টে তার জন্ম| ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র ছিলেন ভিয়েনায়| উত্তরকালে সাংবাদিকের পেশা বেছে নেন| প্যারিস, বার্লিন প্রভৃতি স্থানে সাংবাদিকতা করেছেন| আর্থারের বাবা-মা ইহুদি| মার্কসবাদের প্রভাব কোয়েসলারকে অল্প বয়সেই নাস্তিক ও বিপ্লবী করে তুলেছিল| ১৯৩০ সালে তিনি জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন| ইতোমধ্যে পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচে যায়| আর্থার এরপর ১৯৩৬ সাল নাগাদ স্পেনে যান এবং গৃহযুদ্ধের ওপর রিপোর্ট লিখতে থাকেন| এক পর্যায়ে ফ্রাঙ্কোর সৈনিকরা তাকে যেহেতু কমিউনিস্ট ছিলেন, প্রথমে মালাগায় পরে সেভিলে বন্দি করে রাখে| তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল| মৃত্যুচিন্তায় বিভোর ছ’মাস জেলে কাটানোর পর ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপে কারাগার থেকে ছাড়া পান| গ্রেট ব্রিটেন ওই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো না যদি-না ডরোতি অ্যাশার (লেখকের স্ত্রী, বিয়ে ১৯৩৫) স্বামীর মুক্তির জন্য যথেষ্ট চেষ্টা-তদ্বির করতেন|
বিংশ শতাব্দীর কঠিন লেখকদের একজন আর্থার কোয়েসলার| যাদের কাছে তিনি পাঠকনন্দিত তারা সকলেই অগ্রসর পাঠক বা ভাবুক পাঠক| কেননা তাঁর বেশিরভাগ রচনার উপজীব্য দর্শন, বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব| মনস্তাত্ত্বিক লেখক হিসেবে তিনি মানুষের সেই সমস্ত কার্যকলাপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন— যা যুক্তিনির্ভর নয়| মজার বিষয়, মানুষের যেসব আচরণ ও কাজ যুক্তি মানে না, সেগুলোকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তার ¯^ভাবনির্ণীত যুক্তি সাহায্যেই| পাণ্ডিত্য আছে কিন্তু মূলত সৃজনশীল এমন পাঠকের কাছে আর্থার কোয়েসলার প্রিয় লেখক নন| আমলকি বেশিরভাগ মানুষের প্রিয় ফল নয়| তবে খাদ্যগুণঋদ্ধ এ ফলটির স্বাদ বহু মানুষই নিয়েছেন, অন্তত এক/দু’বার| লেখককুলের ভেতর কোয়েসলার হচ্ছেন আমলকি| তার The Sleepwalkers (১৯৫৯), The Act of Cretion (১৯৬৪) প্রভৃতি বই পড়তে শুরু করেছিলাম| কোয়েসলার বিশারদগণ বলেন, এগুলো মৌলিক ও অর্থবহ| কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এসব গ্রন্থে আশ্রিত তাত্ত্বিক কচকচানি মাঝারি মানের, পাঠকদের হজম করা অসম্ভব| তাছাড়া অর্থনীতিক গুণার মিরড্যাল (Gunnar Myrdal) সাহেব Asian Drama : An Inquiry into the poverty of Nations (১৯৬৮) গ্রন্থে যে রকম আকর্ষণী ভাষায় অর্থনীতির চোরা গলিঘুঁজি ও তাদের ব্যাখ্যা অনেকখানি বোধ্য করে তুলতে পেরেছেন, কোয়েসলার সাহেব তার বিজ্ঞানের ও দর্শনের বইগুলোতে তা করতে পারেননি|
The Gladiators (উপন্যাস, ১৯৩৯), Darkness at Noon এবং আত্মজীবনী Arrow in the Blue — সাকল্যে এ তিনটি গ্রন্থ আমি পড়ে উঠতে পেরেছি| অল্প বয়স থেকেই ‘কঠিন’কে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটা মানসতা আমার মধ্যে কাজ করে| সেই মানসতাই আমাকে যেমন জয়েসের ‘ইউলিসিস’, টমাস মানের ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেনন’ প্রভৃতি পড়তে প্রণোদিত করেছে, তেমনি তা আমাকে সাহস জুগিয়েছে হেনরি জেমস, বোর্হেস, কোয়েসলার প্রমুখের কঠিন মধুর রচনার দিকে এগোতে| এসব মহান লেখকের কাউকেই পুরোপুরি বুঝতে পারিনি আমি— বিশেষভাবে কোয়েসলার সাহেবকে| তবে রচনাবস্তুও যতখানি ভেতরে ঢুকতে পারলে একজন লেখককের জাত চেনা যায় ততখানি ভেতরে বোধ হয় যেতে পেরেছি| সত্যিকার ভালো কিছু লিখতে পারা যেমন সাধনাসাপেক্ষ তেমনি এদের উচ্চমার্গীয় লেখা পড়াও একটা সাধনার বিষয়|
কোয়েসলার বিজ্ঞান-দর্শনভিত্তিক লেখক হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত| কিন্তু সৃষ্টিশীল বা সাধারণভাবে অনুসন্ধিৎসু পাঠকসমাজে তিনি বেশি সংবর্ধিত হয়েছেন Darkness at Noon-এর লেখক হিসেবে অর্থাৎ ঔপন্যাসিক হিসেবে| অল্প ক’টি উপন্যাসের জনক তিনি| কেতাবি জ্ঞান নয়, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই তার প্রতিটি গল্পের প্রধান উৎস| আর্থারের উপন্যাসগুলো প্রধানত রাজনীতিকে উপজীব্য করেছে| রাজনীতিকে শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু করা সহজ নয়| দস্তয়েভস্কি, জাঁ পল সার্ত্র, আলবেয়র কামু, জর্জ অরঅয়েল, চিনুয়া আচিবে, মার্কেজ প্রমুখ বিদেশি লেখকদের মতো রবীন্দ্রনাথ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ি, সমরেশ বসু, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান, ইলিয়াস, শহীদুল জহির প্রমুখ সেই চেষ্টা করেছেন; কমবেশি সাফল্যও পেয়েছেন| কিন্তু আমার ধারণা এরা কেউই Darkness at Noon-এর মতো অতখানি গভীরে প্রবেশ করতে পারেননি| রাজনীতির অন্ধকার ও অনাচারকে আলোয় নিয়ে আসার জন্য যতখানি নির্মোহ ও ব্যাখ্যাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় কোয়েসলার এখানে রেখেছেন তা অত্যন্ত বিরল ঘটনা| এ উপন্যাসে আমরা কী দেখতে পাই? দেখি, বলশেভিক নেতা রুবাশভ বৈপ্লবিক উদ্দেশ্য হাসিলের গরজে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব মায়া-মমতা, ন্যায়-অন্যায়বোধসহ বহু কিছু বিসর্জন দিয়েছে| তার সেই কঠোর আদর্শনিষ্ঠা বিপ্লবোত্তর সময়ে তাকে সাফল্যের স্বাদ দেয়নি|
বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটেছে আদর্শহীন রাষ্ট্রতন্ত্রে| তার বলি হয়েছেন রুবাশভের মতো উদ্দেশ্যনিষ্ঠ বিপ্লবীরা; যারা ছিলেন একই সঙ্গে অকুতোভয় ও মননশীল| ভাগ্যের কী পরিহাস দেখুন! সেই রুবাশভ দেশদ্রোহের মিথ্যা অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলেন| মৃত্যুর আগে জেলখানায় রুবাশভের আত্মবিশ্লেষণ এবং বিপ্লবী যুক্তি অনুসরণ করে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে সত্য বলে ধরে নিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানে সম্মত হওয়ার ভেতর দিয়ে তার টানাপড়েনছিন্ন বিপ্লবী মনের অতলে আলো ফেলেছেন লেখক| এখানে শুধু অপরাধ ও শাস্তির ধারণা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ববহ ইতিহাস-দর্শন এবং বিপ্লববাদের তাত্ত্বিক পুনর্বিচারের প্রসঙ্গটিও এসে যায়| উপন্যাস The Gladiators (১৯৩৯) শেষ বিচারে এক পরাজয়ের গল্প| এ গ্রন্থে বিদ্রোহের নায়ক স্পার্টকাস শেষ পর্যন্ত হেরে যায়| কেন সে পর্যুদস্তু হয়? কোয়েসলার যুক্তিসহ দেখিয়েছেন, স্পার্টকাস উদ্দেশ্য সাধনের গরজে নির্মম হতে পারেনি| আর সেটাই তার পরাজয়ের প্রধান কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে|
আর্থার কোয়েসলার মনগড়া গল্পের কারিগর নন| উপন্যাস বা নন-ফিকশন সর্বত্রই তিনি জীবনের অভিজ্ঞতাকে স্থান দিয়েছেন সব কিছুর ওপর| তার Spanish Testament গ্রন্থের পেছনে আছে ফ্যাসিস্ট ও কমিউনিস্ট উভয় পক্ষেরই অবিবেকী কাজকর্ম— যা লেখক প্রত্যক্ষ করেছেন স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ে| এমন নয় যে, তার মনে হয়েছিল তিনি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি আর যুক্ত থাকবেন না এবং সে জন্যই কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন| বরং এখানে যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা হচ্ছে অবিশ্বাস ও ঘৃণা| প্রথম পর্যায়ের বলশেভিকদের ধরপাকড়, খুনখারাপি এবং কুখ্যাত ‘মস্কো ট্রায়াল’ নিশ্চিতভাবেই কোয়েসলারের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল| ওই পথেই তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন রাজনীতির প্রতি| জার্মানির কাছে ফরাসি সরকার আত্মসমর্পণ করলে কোয়েসলারের জীবনে দুর্ভাগ্য নেমে আসে| জার্মান সৈনিকরা প্যারিসে অবস্থানরত এ লেখককে আটক করে রাখে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে| কোয়েসলার Scum of the Earth (১৯৪১) নামে চালচিত্র ধরনের যে গ্রন্থটি লিখেছেন তা পুরোপুরি ওই অভিজ্ঞতাজাত|
ইউরোপের অনেক বুদ্ধিজীবী লেখকের মতো আর্থার কোয়েসলারও সযত্নে ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন| তার প্রথম দিকের বইগুলো জার্মান বা ফরাসি ভাষায় রচিত| ইংল্যান্ডে আশ্রিত হওয়ার পর তিনি কেবল ইংরেজিতেই লিখেছেন| আঁদ্রে মালরো, বার্ট্রান্ড রাসেল, রবসন, আঁরি বারবুসসহ অনেক বিশিষ্ট শিল্প-সাহিত্যিকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছিলেন কোয়েসলার| তার নারীসঙ্গের ও নারীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি সুবিদিত| অনেক নারীকেই তিনি সম্ভোগ করে নির্মমভাবে ত্যাগ করেছেন| দ্বিতীয় স্ত্রী যামেইনের সঙ্গে বিচ্ছেদের প্রধান কারণ কোয়েসলারের অমার্জিত ব্যবহার| একাধিক বন্ধুপত্নী তার ব্যক্তিত্বের প্রবল আকর্ষণে ঘরছাড়া হয়েছেন| এদের ভেতর বার্ট্রান্ড রাসেলের স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া স্পেন্সও আছেন| বলা হয়, রাসেলের সঙ্গে তার বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য প্রধানত কোয়েসলারই দায়ী| Arrow in the Blue গ্রন্থে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কটু অভিজ্ঞতা বয়ানের পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনও দারুণভাবে তুলে এনেছেন লেখক| নারীসঙ্গ, বন্ধুত্ব, প্রেম, বিবাহ, বিচ্ছেদ প্রভৃতি বিষয়ে কোয়েসলার এখানে খোলামেলাভাবে অনেক কথা বলেছেন, কোনো বাঙালি লেখকের পক্ষে যা করা চিল অসম্ভব|
মৃত্যুর আগে এ লেখক পারকিনসন&স রোগে আক্রান্ত হন| পরে তার রক্তে লিউকিমিয়া ধরা পড়ে| কোয়েসলার ও তার তৃতীয় স্ত্রী (বাইশ বছরের ছোট) সিন্থিয়া জেফ্রিস সে সময় Exit নামের এক প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন| ওই প্রতিষ্ঠানের সদস্যগণ বিশ্বাস করতেন, জীবন যদি দুরারোগ্য ব্যাধি কিংবা অনতিক্রম্য শূন্যতাবোধ দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে স্বেচ্ছামৃত্যু কর্তব্য| অতএব এ দম্পতি তাদের লন্ডনস্থ ফ্ল্যাটে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেন| দিনটি ছিল ১৯৮৩ সালের ১ মার্চ| ওই কাজে তাদেরকে সহায়তা দিয়েছিল অ্যালকোহল ও উচ্চ মাত্রার ঘুমের ওষুধ| কোয়েসলার তার প্রায় সমস্ত টাকা-পয়সা দুস্থ সাহিত্যিক ও কারাবন্দিদের সাহায্য করার জন্য দান করে গেছেন| এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছেন পাঁচ লক্ষ পাউন্ড|
যদিও নাস্তিক ছিলেন, মৃত্যুর পর মানুষের কী হয় সে বিষয়ে কোয়েসলারের ছিল গভীর কৌতূহল| তাছাড়া ইন্দ্রিয়াতীত মানসপ্রক্রিয়া, মনের যুক্তিহীন কার্যকলাপ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসু ছিলেন আমৃত্যু| মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন, কারাবন্দিদের প্রতি গভীর সহানুভূতি, জ্ঞান ও সৃজনক্রিয়ার উৎস সংশ্লিষ্ট অনলস অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতি কোয়েসলারকে উঁচু দরের বুদ্ধিজীবীর আসনে বসিয়েছে| ইউরোপজুড়ে প্রথম শ্রেণির ইন্টেলেকচুয়াল অনেকেই ছিলেন এবং আছেন| কিন্তু ব্যক্তিত্বের চৌ¤^ক ক্ষমতা, জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, বহুমুখী কৌতূহল ও অফুরন্ত প্রাণ-প্রাচুর্য তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে| এক ব্যক্তির মধ্যে এত গুণের (এবং দোষেরও) সমাবেশ বিরল ঘটনা| আমার মনে হয়েছে আর্থার কোয়েসলারের সবচেয়ে বড় কাজ বিপ্লবচেষ্টার কেন্দ্রে উদ্দেশ্য ও উপায়ের মধ্যকার দূরতিক্রম্য অসংগতি উদ্ঘান করা| শক্তিমান শিল্পীর মুন্সিআনায় তিনি তা সম্পন্ন করতে পেরেছেন| আর এ ক্ষেত্রে যে ধরনের অন্তর্দৃষ্টি তিনি কাজে লাগিয়েছেন এক কথায় তা অতুল|

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
আর্থার কোয়েসলার (Arthur Koestler) নামটি আমি প্রথম শুনে ১৯৮১/৮২ সালে, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি, অধ্যাপক অসীম কুমার দাসের মুখে| আমরা তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্সের ছাত্র| অসীম মাঝে মাঝে কোয়েসলারের অমামুলি প্রতিভা ও পাণ্ডিত্যের প্রসঙ্গ তুলতেন| আমাদেও অন্তরঙ্গ বন্ধুবৃত্তে অসীমই প্রথম কোয়েসলারের লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত হন| কেবল তা-ই নয় বোর্হেস, নিকোস কাজানজাকিস, মার্কেস প্রমুখের লেখাও তিনি আমাদের মধ্যে সবার আগে পড়েছেন| সাধ্যানুযায়ী সেসব নিয়ে মন্তব্যও করেছেন|
কোয়েসলার নামটি শোনার পনের/ষোলো বছর পর আমি তার লেখা পড়ি ১৯৯৭/৯৮ সাল নাগাদ| স্বভাবতই আমাকে আকর্ষণ করেছিল লেখকের অসামান্য উপন্যাস এবং সম্ভবত সর্বাধিক বিখ্যাত গ্রন্থ Darkness at Noon(১৯৪০)| আর্থার কোয়েসলার আদৌ জনপ্রিয় লেখক ছিলেন না, কেননা গভীর বিষয় নিয়ে তিনি লিখতেন, ততোধিক গভীর জীবনসন্ধিৎসার সঙ্গে| তার আত্মজীবনী Arrow in the Blue (১৯৫২) আমি পাঠ করেছি| এ গ্রন্থে অনেক উচিত কথা তিনি বলেছেন, মন খারাপ করে দেয়ার মতো অসখ্য প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন| কৌতুক বা শ্লেষের কিছুটা আশ্রয়ও নিয়েছেন| এ বইয়ে কম-বেশি বিনোদী উপকরণ লক্ষ করা যায়, যদিও শেষ পর্যন্ত একে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা লেখক করেননি| তা সত্ত্বেও Darkness at Noon-এর পর এটাই এখন পর্যন্ত তার দ্বিতীয় সর্বাধিক বিক্রিত গ্রন্থ|
আর্থার কোয়েসলার একই সঙ্গে জসৎবিখ্যাত ও কুখ্যাত| অভূতপূর্ব মণীষা ও প্রতিভার ধারক এ লেখক উদ&বায়ী মেজাজের অধিকারী ছিলেন| তার আচার-ব্যবহারও নির্ভরযোগ্য ছিল না| তিনি ঠিক ইউরোপীয় ধাঁচের ভদ্রলোক নন, বরং eccentric শব্দটি তার বেলায় সুপ্রযোজ্য বলে মনে হয়| কোয়েসলারের জন্মভূমি হাঙ্গেরি| ১৯০৫ সালে বুদাপেস্টে তার জন্ম| ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র ছিলেন ভিয়েনায়| উত্তরকালে সাংবাদিকের পেশা বেছে নেন| প্যারিস, বার্লিন প্রভৃতি স্থানে সাংবাদিকতা করেছেন| আর্থারের বাবা-মা ইহুদি| মার্কসবাদের প্রভাব কোয়েসলারকে অল্প বয়সেই নাস্তিক ও বিপ্লবী করে তুলেছিল| ১৯৩০ সালে তিনি জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন| ইতোমধ্যে পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচে যায়| আর্থার এরপর ১৯৩৬ সাল নাগাদ স্পেনে যান এবং গৃহযুদ্ধের ওপর রিপোর্ট লিখতে থাকেন| এক পর্যায়ে ফ্রাঙ্কোর সৈনিকরা তাকে যেহেতু কমিউনিস্ট ছিলেন, প্রথমে মালাগায় পরে সেভিলে বন্দি করে রাখে| তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল| মৃত্যুচিন্তায় বিভোর ছ’মাস জেলে কাটানোর পর ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপে কারাগার থেকে ছাড়া পান| গ্রেট ব্রিটেন ওই ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো না যদি-না ডরোতি অ্যাশার (লেখকের স্ত্রী, বিয়ে ১৯৩৫) স্বামীর মুক্তির জন্য যথেষ্ট চেষ্টা-তদ্বির করতেন|
বিংশ শতাব্দীর কঠিন লেখকদের একজন আর্থার কোয়েসলার| যাদের কাছে তিনি পাঠকনন্দিত তারা সকলেই অগ্রসর পাঠক বা ভাবুক পাঠক| কেননা তাঁর বেশিরভাগ রচনার উপজীব্য দর্শন, বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব| মনস্তাত্ত্বিক লেখক হিসেবে তিনি মানুষের সেই সমস্ত কার্যকলাপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন— যা যুক্তিনির্ভর নয়| মজার বিষয়, মানুষের যেসব আচরণ ও কাজ যুক্তি মানে না, সেগুলোকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তার ¯^ভাবনির্ণীত যুক্তি সাহায্যেই| পাণ্ডিত্য আছে কিন্তু মূলত সৃজনশীল এমন পাঠকের কাছে আর্থার কোয়েসলার প্রিয় লেখক নন| আমলকি বেশিরভাগ মানুষের প্রিয় ফল নয়| তবে খাদ্যগুণঋদ্ধ এ ফলটির স্বাদ বহু মানুষই নিয়েছেন, অন্তত এক/দু’বার| লেখককুলের ভেতর কোয়েসলার হচ্ছেন আমলকি| তার The Sleepwalkers (১৯৫৯), The Act of Cretion (১৯৬৪) প্রভৃতি বই পড়তে শুরু করেছিলাম| কোয়েসলার বিশারদগণ বলেন, এগুলো মৌলিক ও অর্থবহ| কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এসব গ্রন্থে আশ্রিত তাত্ত্বিক কচকচানি মাঝারি মানের, পাঠকদের হজম করা অসম্ভব| তাছাড়া অর্থনীতিক গুণার মিরড্যাল (Gunnar Myrdal) সাহেব Asian Drama : An Inquiry into the poverty of Nations (১৯৬৮) গ্রন্থে যে রকম আকর্ষণী ভাষায় অর্থনীতির চোরা গলিঘুঁজি ও তাদের ব্যাখ্যা অনেকখানি বোধ্য করে তুলতে পেরেছেন, কোয়েসলার সাহেব তার বিজ্ঞানের ও দর্শনের বইগুলোতে তা করতে পারেননি|
The Gladiators (উপন্যাস, ১৯৩৯), Darkness at Noon এবং আত্মজীবনী Arrow in the Blue — সাকল্যে এ তিনটি গ্রন্থ আমি পড়ে উঠতে পেরেছি| অল্প বয়স থেকেই ‘কঠিন’কে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটা মানসতা আমার মধ্যে কাজ করে| সেই মানসতাই আমাকে যেমন জয়েসের ‘ইউলিসিস’, টমাস মানের ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেনন’ প্রভৃতি পড়তে প্রণোদিত করেছে, তেমনি তা আমাকে সাহস জুগিয়েছে হেনরি জেমস, বোর্হেস, কোয়েসলার প্রমুখের কঠিন মধুর রচনার দিকে এগোতে| এসব মহান লেখকের কাউকেই পুরোপুরি বুঝতে পারিনি আমি— বিশেষভাবে কোয়েসলার সাহেবকে| তবে রচনাবস্তুও যতখানি ভেতরে ঢুকতে পারলে একজন লেখককের জাত চেনা যায় ততখানি ভেতরে বোধ হয় যেতে পেরেছি| সত্যিকার ভালো কিছু লিখতে পারা যেমন সাধনাসাপেক্ষ তেমনি এদের উচ্চমার্গীয় লেখা পড়াও একটা সাধনার বিষয়|
কোয়েসলার বিজ্ঞান-দর্শনভিত্তিক লেখক হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত| কিন্তু সৃষ্টিশীল বা সাধারণভাবে অনুসন্ধিৎসু পাঠকসমাজে তিনি বেশি সংবর্ধিত হয়েছেন Darkness at Noon-এর লেখক হিসেবে অর্থাৎ ঔপন্যাসিক হিসেবে| অল্প ক’টি উপন্যাসের জনক তিনি| কেতাবি জ্ঞান নয়, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই তার প্রতিটি গল্পের প্রধান উৎস| আর্থারের উপন্যাসগুলো প্রধানত রাজনীতিকে উপজীব্য করেছে| রাজনীতিকে শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু করা সহজ নয়| দস্তয়েভস্কি, জাঁ পল সার্ত্র, আলবেয়র কামু, জর্জ অরঅয়েল, চিনুয়া আচিবে, মার্কেজ প্রমুখ বিদেশি লেখকদের মতো রবীন্দ্রনাথ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ি, সমরেশ বসু, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান, ইলিয়াস, শহীদুল জহির প্রমুখ সেই চেষ্টা করেছেন; কমবেশি সাফল্যও পেয়েছেন| কিন্তু আমার ধারণা এরা কেউই Darkness at Noon-এর মতো অতখানি গভীরে প্রবেশ করতে পারেননি| রাজনীতির অন্ধকার ও অনাচারকে আলোয় নিয়ে আসার জন্য যতখানি নির্মোহ ও ব্যাখ্যাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় কোয়েসলার এখানে রেখেছেন তা অত্যন্ত বিরল ঘটনা| এ উপন্যাসে আমরা কী দেখতে পাই? দেখি, বলশেভিক নেতা রুবাশভ বৈপ্লবিক উদ্দেশ্য হাসিলের গরজে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব মায়া-মমতা, ন্যায়-অন্যায়বোধসহ বহু কিছু বিসর্জন দিয়েছে| তার সেই কঠোর আদর্শনিষ্ঠা বিপ্লবোত্তর সময়ে তাকে সাফল্যের স্বাদ দেয়নি|
বিপ্লবের সমাপ্তি ঘটেছে আদর্শহীন রাষ্ট্রতন্ত্রে| তার বলি হয়েছেন রুবাশভের মতো উদ্দেশ্যনিষ্ঠ বিপ্লবীরা; যারা ছিলেন একই সঙ্গে অকুতোভয় ও মননশীল| ভাগ্যের কী পরিহাস দেখুন! সেই রুবাশভ দেশদ্রোহের মিথ্যা অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলেন| মৃত্যুর আগে জেলখানায় রুবাশভের আত্মবিশ্লেষণ এবং বিপ্লবী যুক্তি অনুসরণ করে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে সত্য বলে ধরে নিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানে সম্মত হওয়ার ভেতর দিয়ে তার টানাপড়েনছিন্ন বিপ্লবী মনের অতলে আলো ফেলেছেন লেখক| এখানে শুধু অপরাধ ও শাস্তির ধারণা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ববহ ইতিহাস-দর্শন এবং বিপ্লববাদের তাত্ত্বিক পুনর্বিচারের প্রসঙ্গটিও এসে যায়| উপন্যাস The Gladiators (১৯৩৯) শেষ বিচারে এক পরাজয়ের গল্প| এ গ্রন্থে বিদ্রোহের নায়ক স্পার্টকাস শেষ পর্যন্ত হেরে যায়| কেন সে পর্যুদস্তু হয়? কোয়েসলার যুক্তিসহ দেখিয়েছেন, স্পার্টকাস উদ্দেশ্য সাধনের গরজে নির্মম হতে পারেনি| আর সেটাই তার পরাজয়ের প্রধান কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে|
আর্থার কোয়েসলার মনগড়া গল্পের কারিগর নন| উপন্যাস বা নন-ফিকশন সর্বত্রই তিনি জীবনের অভিজ্ঞতাকে স্থান দিয়েছেন সব কিছুর ওপর| তার Spanish Testament গ্রন্থের পেছনে আছে ফ্যাসিস্ট ও কমিউনিস্ট উভয় পক্ষেরই অবিবেকী কাজকর্ম— যা লেখক প্রত্যক্ষ করেছেন স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ে| এমন নয় যে, তার মনে হয়েছিল তিনি রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি আর যুক্ত থাকবেন না এবং সে জন্যই কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন| বরং এখানে যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা হচ্ছে অবিশ্বাস ও ঘৃণা| প্রথম পর্যায়ের বলশেভিকদের ধরপাকড়, খুনখারাপি এবং কুখ্যাত ‘মস্কো ট্রায়াল’ নিশ্চিতভাবেই কোয়েসলারের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল| ওই পথেই তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন রাজনীতির প্রতি| জার্মানির কাছে ফরাসি সরকার আত্মসমর্পণ করলে কোয়েসলারের জীবনে দুর্ভাগ্য নেমে আসে| জার্মান সৈনিকরা প্যারিসে অবস্থানরত এ লেখককে আটক করে রাখে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে| কোয়েসলার Scum of the Earth (১৯৪১) নামে চালচিত্র ধরনের যে গ্রন্থটি লিখেছেন তা পুরোপুরি ওই অভিজ্ঞতাজাত|
ইউরোপের অনেক বুদ্ধিজীবী লেখকের মতো আর্থার কোয়েসলারও সযত্নে ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন| তার প্রথম দিকের বইগুলো জার্মান বা ফরাসি ভাষায় রচিত| ইংল্যান্ডে আশ্রিত হওয়ার পর তিনি কেবল ইংরেজিতেই লিখেছেন| আঁদ্রে মালরো, বার্ট্রান্ড রাসেল, রবসন, আঁরি বারবুসসহ অনেক বিশিষ্ট শিল্প-সাহিত্যিকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছিলেন কোয়েসলার| তার নারীসঙ্গের ও নারীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি সুবিদিত| অনেক নারীকেই তিনি সম্ভোগ করে নির্মমভাবে ত্যাগ করেছেন| দ্বিতীয় স্ত্রী যামেইনের সঙ্গে বিচ্ছেদের প্রধান কারণ কোয়েসলারের অমার্জিত ব্যবহার| একাধিক বন্ধুপত্নী তার ব্যক্তিত্বের প্রবল আকর্ষণে ঘরছাড়া হয়েছেন| এদের ভেতর বার্ট্রান্ড রাসেলের স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া স্পেন্সও আছেন| বলা হয়, রাসেলের সঙ্গে তার বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য প্রধানত কোয়েসলারই দায়ী| Arrow in the Blue গ্রন্থে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কটু অভিজ্ঞতা বয়ানের পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনও দারুণভাবে তুলে এনেছেন লেখক| নারীসঙ্গ, বন্ধুত্ব, প্রেম, বিবাহ, বিচ্ছেদ প্রভৃতি বিষয়ে কোয়েসলার এখানে খোলামেলাভাবে অনেক কথা বলেছেন, কোনো বাঙালি লেখকের পক্ষে যা করা চিল অসম্ভব|
মৃত্যুর আগে এ লেখক পারকিনসন&স রোগে আক্রান্ত হন| পরে তার রক্তে লিউকিমিয়া ধরা পড়ে| কোয়েসলার ও তার তৃতীয় স্ত্রী (বাইশ বছরের ছোট) সিন্থিয়া জেফ্রিস সে সময় Exit নামের এক প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন| ওই প্রতিষ্ঠানের সদস্যগণ বিশ্বাস করতেন, জীবন যদি দুরারোগ্য ব্যাধি কিংবা অনতিক্রম্য শূন্যতাবোধ দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে স্বেচ্ছামৃত্যু কর্তব্য| অতএব এ দম্পতি তাদের লন্ডনস্থ ফ্ল্যাটে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেন| দিনটি ছিল ১৯৮৩ সালের ১ মার্চ| ওই কাজে তাদেরকে সহায়তা দিয়েছিল অ্যালকোহল ও উচ্চ মাত্রার ঘুমের ওষুধ| কোয়েসলার তার প্রায় সমস্ত টাকা-পয়সা দুস্থ সাহিত্যিক ও কারাবন্দিদের সাহায্য করার জন্য দান করে গেছেন| এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছেন পাঁচ লক্ষ পাউন্ড|
যদিও নাস্তিক ছিলেন, মৃত্যুর পর মানুষের কী হয় সে বিষয়ে কোয়েসলারের ছিল গভীর কৌতূহল| তাছাড়া ইন্দ্রিয়াতীত মানসপ্রক্রিয়া, মনের যুক্তিহীন কার্যকলাপ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসু ছিলেন আমৃত্যু| মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন, কারাবন্দিদের প্রতি গভীর সহানুভূতি, জ্ঞান ও সৃজনক্রিয়ার উৎস সংশ্লিষ্ট অনলস অনুসন্ধিৎসা প্রভৃতি কোয়েসলারকে উঁচু দরের বুদ্ধিজীবীর আসনে বসিয়েছে| ইউরোপজুড়ে প্রথম শ্রেণির ইন্টেলেকচুয়াল অনেকেই ছিলেন এবং আছেন| কিন্তু ব্যক্তিত্বের চৌ¤^ক ক্ষমতা, জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, বহুমুখী কৌতূহল ও অফুরন্ত প্রাণ-প্রাচুর্য তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে| এক ব্যক্তির মধ্যে এত গুণের (এবং দোষেরও) সমাবেশ বিরল ঘটনা| আমার মনে হয়েছে আর্থার কোয়েসলারের সবচেয়ে বড় কাজ বিপ্লবচেষ্টার কেন্দ্রে উদ্দেশ্য ও উপায়ের মধ্যকার দূরতিক্রম্য অসংগতি উদ্ঘান করা| শক্তিমান শিল্পীর মুন্সিআনায় তিনি তা সম্পন্ন করতে পেরেছেন| আর এ ক্ষেত্রে যে ধরনের অন্তর্দৃষ্টি তিনি কাজে লাগিয়েছেন এক কথায় তা অতুল|

আপনার মতামত লিখুন