(পূর্ব প্রকাশের পর)
চার.
আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার একেবারে শুরুতে একটা বাড়ির পর মনসুর পাগলাদের বাড়ি| মনসুর পাগলার বাড়ির পর দক্ষিণ পাড়াটা একটা বড় পুকুর ও অনেকগুলো ইশা নিয়ে আরও দক্ষিণে এগিয়ে গেছে| দক্ষিণ পাড়ার একেবারে শেষে বুইদ্দার বিল| অবশ্য এই বুইদ্দার বিলটা শুধু দক্ষিণ পাড়ার শেষেই নয়, পুব পাড়া, পশ্চিম পাড়া, এমনকি উত্তর পাড়ার একাংশকে ঘিরে রেখেছে| শুধুমাত্র একটা খাল দিয়ে প্রত্যেকটা পাড়া ভাগ করা হয়েছে| খালটার নাম বুইদ্দার খাল| বুইদ্দার বিলের নামেই বুইদ্দার খালটা| সেই বুইদ্দার খাল মনসুর পাগলাদের বাড়ির পুব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বলে উত্তরের জোয়ারের জল তাদের বাড়িটাকেও স্পর্শ করেছে|
মনসুর পাগলা সেই বুইদ্দার খাল ধরে বেয়ে নৌকাটা এনে তাদের বাড়ির গোপাট ঘেঁষা আমগাছটার তলে আসতেই তার চাচাত বোন মমিনা দৌড়ে এল| এসেই কোনোকিছু জিজ্ঞেস না করেই সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল|
মনসুর পাগলা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কানতাছস ক্যান?’
মমিনা কান্না ধরে রেখেই বলল, ‘ভাবী মইরা গেছে| ভাবীর লাশ...!’
মনসুর পাগলা বলল, ‘হ, তোর ভাবীর লাশ| তয় কী হইছে|’
‘ভাবী আমার সখির লাহান আছিল| কত সুখদুঃখের কথা কইছি!’
‘আজাইরা কথা কইস না| কবে আছিল? চাপা পিটাইতাছস ক্যান? সবসময় দেখতাম কাইজা লাইগা থাকতি| অখন যা| আমাগো ঘর থাইকা একটা চাটাই বাইর কইরা লইয়া আয়| উডানে শোয়ামু|’
মমিনা কান্না থামিয়ে চেহারা খানিকটা ভোঁতা করে ফেলল| একবার মাথা নেড়ে কী ভেবে ধীর পায়ে গোপাট থেকে আবার মনসুর পাগলার ঘরের দিকে হাঁটা ধরল|
মনসুর পাগলা মমিনার গমন পথের দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবার সেতারা বেগমের লাশটা দেখল| এক মুহূর্ত সময় নিয়ে লাশটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে ভাবল, সেতারার লাশটা কোড়ের পাড়ে একলা নৌকায় তুললেও এখন সে কি সেটা বহন করে একা উঠোনে নিয়ে যেতে পারবে? ভাবতে ভাবতেই সে দেখল, তার মা কমলা খাতুন উঠোন ছেড়ে গোপাটে নেমে আসছে|
মনসুর পাগলা গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মা, তুমি এখানে আইতাছ ক্যান?’
কমলা খাতুন কোনো জবাব দিলা না| গোপাটে নেমে এল| নৌকায় সেতারার লাশটার দিকে তাকাল|
মনসুর পাগলা রাগ দেখিয়ে বলল, ‘তোমার গামলা মুখটা দেখবার ইচ্ছা করে না, মা| তুমি আমার সামনের থাইকা যাও|’
কমলা খাতুন এবারও চুপ|
মনসুর পাগলা রাগে ঘড়ঘড় করতে করতে নৌকা থেকে লাফ দিয়ে জলে নামল| জলের ধারে ঝুলে থাকা একটি আমগাছে নৌকা বেঁধে সেতারা বেগমের লাশটা এক টানে পাঁজাকোলে তুলে নিল| শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে পাড়ে উঠে সে গোপাট ধরে উঠোনের দিকে হাঁটা ধরল| সেতারার লাশ জলে ডুবে ফুলে উঠলেও আদতে সে ছোটখাটো নাদুসনুদুস ধরনের মহিলা| সেতারা বেগমের যখন বেঁচেছিল, মনসুর পাগলার যখন মন ভালো থাকত, তখন কতবার সে তাকে পাঁজাকোলে করে হাওয়ায় ভাসিয়েছে!
মনসুর পাগলা উঠোনে উঠতেই দেখল, মমিনা এরই মধ্যে ঘর থেকে একটা হোগলার চাটাই এনে ঘরের দাওয়ার কাছে উঠোনে বিছিয়ে দিয়েছে|
মনসুর পাগলা সেতারা বেগমের লাশটা চাটাইর ওপর উত্তর-দক্ষিণ করে শুইয়ে দিল| কয়েকবার হাঁপর-ছাড়া শ্বাস ফেলে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল| ঘরে ঢুকেই সে ঝাঁপের ওপর থেকে সেতারা বেগমেরই একটা পুরোনো শাড়ি টেনে নিল| নিজের পরনের ভেজা লুঙ্গি ও গায়ের ভেজা পাঞ্জাবিটা পরিবর্তন করবে কি না ভাবল| কিন্তু পরক্ষণ কী ভেবে সেতারা বেগমের পুরোনো শাড়িটা নিয়েই ঘর থেকে বের হলো|
কমলা খাতুন এবার গোপাট থেকে উঠে এসে উঠোনের একপাশে দাঁড়াল| সে নির্বাক দৃষ্টিতে সেতারা বেগমের লাশটার দিকে তাকিয়ে রইল| ততক্ষণে উঠোনের একপাশে বেশি কিছু উৎসুক মানুষ জমেছে| এদের মধ্যে পাড়ার বউ-ঝিয়ারিরাই বেশি| আর আছে কিছু ন্যাংটা ছেলেমেয়ে| ব্যাটাছেলে তেমন না এলেও পাশের বাড়ির একজন মুরুব্বি মনসুর পাগলার ছোটচাচা কেরামত আলী এসেছে|
মনসুর পাগলা ঘর থেকে আনা সেই পুরোনো শাড়িটা দিয়ে সেতারা বেগমের লাশটা পুরোপুরি ঢেকে দিল|
কেরামত আলী কয়েক পা এগিয়ে এসে বলল, ‘মনসুর, উত্তর পাড়ায় যা|’
মনসুর পাগলা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘উত্তর পাড়ায় ক্যান, কাকা?’
‘ওমা, উত্তর পাড়ার মসজিদের রহমান হুজুররে আনতে হইব না? লাশরে গোছল করাইব কেডা?’
‘হ হ, কাকা| রহমান হুজুররে তো আনতে হইবই| তয় অখন আনতে হইব?
‘হ, অখনই| লাশের গন্ধ ছুইটা গেছে, টের পাইতাছস না?’
মনসুর পাগলা এতক্ষণ গন্ধ না পেলেও এখন কেরামত আলীর কথা শুনে লাশের গন্ধ টের পেল| সে একটু ব্যস্ত গলায় বলল, ‘হ হ, পাইতাছি| নাকে গন্ধ লাগতাছে|’
কেরামত আলী বলল, ‘তাইলে যা| তাড়াতাড়ি কর|’
মনসুর পাগলা বলল, ‘কিন্তুক, আমার যে আগে ভুঁইয়া বাড়িত যাইতে হইব?’
‘ভুঁইয়া বাড়িত ক্যান, আনিস ভুঁইয়ার কাছে?’
‘হ, কাকা|’
‘তার ওইখানে পরে গেলেও তো হইব| আগে রহমান হুজুরের কাছে তোর যাওন দরকার|’
‘কাকা, আমি আনিসরে বাদে কিছুই করবার পারি না, হেইডা তো জানো?’
কেরামত আলী বিরক্তিতে মুখ বাঁকা করে বলল, ‘হেইডা আমি না হুদাই, গেরামের সব্বাই জানে|’
মনসুর পাগলা বলল, ‘হ হ, জানি| আমি আগে আনিসগো বাড়িত যাই|’
কেরামত আলী আর কিছু বলল না|
মনসুর পাগলা সেতারার লাশটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে উঠোন থেকে গোপাটে নেমে এল| আমগাছে বাঁধা রশিটা ছেড়ে নৌকায় উঠতে উঠতে সে দূর থেকে আরও একবার সেতারা বেগমের লাশটা দেখল|
গ্রামের আর কারও কথা মানুক আর না-মানুক, মনসুর পাগলা সত্যি সত্যি আনিস ভুঁইয়ার কথা খুব মানে| ওদিকে আনিস তাকে কেমন সবকিছু থেকে আগলে রাখে| একটা অদৃশ্য বন্ধন যেন তাদের মধ্যে| সেই ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা| একই সঙ্গে মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া...|
মনসুর পাগলার অবশ্য পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর লেখাপড়া আর এগিয়ে নিতে পারেনি, মাথায় ছিট ধরা পড়ে| মাথায় ছিট ধরার পর প্রথম প্রথম সে গম্ভীর হয়ে ঘরের দাওয়ায় বসে থাকত| চোখ বড় করে সবার দিকে তাকাত| বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাগলামিটা আরও বেশি করে বাড়তে শুরু করে| হঠাৎ হঠাৎ মস্তানের মাজারে গিয়ে পড়ে থাকে| তার আরেকটা বাজে অভ্যাস দেখা দেয়, রাস্তাঘাটে কোনো মেয়েছেলে দেখলেই সে তাদের সামনে লাফিয়ে পড়ত| শাড়ির আঁচল ধরে টান দিত| তাই অল্প বয়সেই তাকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হয়| জুলেখা তার প্রথম স্ত্রী ছিল| বিয়ের পর পাগলামি কিছুটা কমে এলেও গোঁয়ার্তুমি বেড়ে যায়| জুলেখা মারা যাওয়ার পর সেতারা বেগম ঘরে এলে গোঁয়ার্তুমির পাশাপাশি মস্তানের মাজারে গিয়ে তার পড়ে থাকা আরও বেড়ে যায়|
আনিস অবশ্য মীরবহরি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর অনুতপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করে দেবিদ্বার সুজাত আলী কলেজ থেকে আই.এ. ও বি.এ. পাস করে| ঢাকায় গিয়ে এম.এ. টাও পড়ত| বছর সাতেক আগে হঠাৎ তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়া মারা গেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা’র জন্য গ্রামে থেকে যায়| এখন সে অনুতপুর হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে সেখানে নবম ও দশম শ্রেণিতে বাংলা পড়ায়|
আনিস ও মনসুর পাগলার অদ্ভুত নির্ভরতা নিয়ে মানুষ যেমনটাই বলুক, তাদের চেহারার মিল নিয়ে গ্রামে সবচেয়ে বেশি কানাঘুষাটা হয়| গ্রামের অনেকেই বলে, মনসুর পাগলা নাকি সুন্দর কাজীরই ছেলে| তাদের এমনটা বলার পেছনে কারণও ছিল| মনসুর পাগলার বাবা আছমত আলী ব্যাপারির ছিল মীরবহরি বাজারে চালের আড়ত| তার চালের আড়তটা ছিল নামমাত্র| সে মূলত আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি, ছল্লাকান্দিসহ এ এলাকার অনেকগুলো গ্রাম থেকে ধান কিনে চাল করে রামচন্দ্রপুর বাজার, কোম্পানীগঞ্জ বাজার, হোমনা, গৌরীপুর বাজার, দাউদকান্দি, এমনকি নারায়ণগঞ্জে পাইকারি দামে চাল বিক্রি করত| সে এ কাজটা করত বর্ষার মওসুমে যখন ওসব বাজারগুলোতে চালের আকাল পড়ত| তার একটা বেশ বড় নৌকা ছিল| দেখতে বজরার মতো, তবে আকারে আরও বড় ছিল| সেই নৌকাটা মীরবহরি বাজারের কাছে ঘাটে বাঁধা থাকত| অবশ্য তার বাড়িতে আসা-যাওয়ার জন্য আরেকটা ছোট্ট লোহা কাঠের নৌকা ছিল, যেটা মনসুর পাগলা এখনও যত্নআত্তি করে বর্ষার মওসুমে চালায়|
আসমত আলী ব্যাপারি বর্ষার মওসুমে আরও দুইজন মাঝি সহ যখন চাল বোঝাই বড় নৌকাটা নিয়ে বের হতো, তখন দুই-তিন সপ্তাহ, মাঝেমধ্যে একমাস-দেড়মাস বাড়ি ফিরতে পারত না| তখন সুন্দর ভুঁইয়া কমলা খাতুনের খোঁজখবর নিত, সময়-অসময় বাজারসদাই করে দিত| মীরবহরি বাজারে আসমত আলী ব্যাপারির চালের আড়তের তিনটা দোকান পরেই সুন্দর ভুঁইয়ার ছিল সার-কীটনাশকের দোকান| দু’জনের সম্পর্কটা ছিল পান ভাগ করে খাওয়া দোস্তের মতো|
মনসুর পাগলা ও আনিস যেন সেই সম্পর্কেরই ধারাবাহিকতা বহন করছে|
পাঁচ.
আনিস অনুতপুর হাইস্কুলে যোগদানের পর স্কুলের পাশে হেডমাস্টারের বাড়িতে একটা ঘর ভাড়া করে থাকলেও বাড়িতে সে প্রায় প্রতি সপ্তাহে আসে| এখনও বিয়ে করেনি| আত্মীয়¯^জন বেশ চাপ দিচ্ছে বিয়ে করার জন্য| অন্তত মা’র কথা চিন্তা করে যেন বিয়ে করে| কিন্তু কবিতা লেখা তার ধ্যান| এর বাইরে অন্য কিছু নিয়ে সে ভাবতে চায় না| শরীরের চাহিদা যেখানেই মিটুক, মনের চাহিদা যে তার কবিতার শরীরে!
তিনদিন ধরে আনিস বাড়িতে| শুক্রবার ও শনিবার স্কুল ছুটির দিনে সে এমনিতেই বাড়িতে চলে আসে| এবার সে স্কুল থেকে এক সপ্তাহের বাড়তি ছুটি নিয়ে এসেছে| তার মা রাহেলা খানমের শরীর দিনদিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে| ছোটবয়স থেকেই সে দেখে আসছে, তার মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারে না| প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলেও কারো না কারো সাহায্য নিতে হয়| গত চার বছর ধরে বলা যায় পুরোপুরি বিছানাবন্দি| তাকে সর্বক্ষণ দেখাশোনার জন্য একজন কাজের মহিলা রাখা হয়েছে| বাড়িতে একজন বছর বাঁধা কামলা আছে| সে জমিজমা দেখার পাশাপাশি রাহেলা খানমকে দেখাশোনা করে|
আনিস বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিল, মা’কে সে একজন বড় ডাক্তার দেখাবে| যেভাবে তার মা’র শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্টটা বেড়ে গেছে, কোনদিন না বড় কোনো অঘটন ঘটে যায়! ঢাকা নিয়ে যাওয়ার কথাও সে ভেবেছিল| কিন্তু পরে সে সেই চিন্তা বাদ দেয়| আপাতত সে মা’কে কুমিল্লা নিয়ে যাবে| এজন্য আগামীকাল মা’কে নিয়ে সে নৌকায় করে উপজেলার ¯^াস্থ্য কমপ্লেক্সে যাবে| ডা. জাহিদ আলমের ডাক্তারখানা ও চে¤^ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছেই|
আনিস আগে থেকেই ফোনে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে রেখেছে| ডা. জাহিদ আলমের কাছে থেকে কাগজপত্রগুলো নিয়ে সে উপজেলা কমপ্লেক্সের পাশ থেকে অ্যাম্বুলেন্সটা নিবে| কুমিল্লার বড় ডাক্তারের সঙ্গে ডা. জাহিদই কথা বলে রেখেছেন|
আজ আনিসের অবশ্য কিছু করার নেই| ঘরে তার মা এখন ঘুমোচ্ছে| কাজের মহিলা সাবেরা রান্নাঘরে কিছু একটা রান্না করছে| বছর বাঁধা কামলা বশির মীরবহরি বাজার থেকে এসে পুকুরের উত্তর পাড়ে গরুর জন্য জলঘাস কাটতে গেছে| আনিস এলে মনসুর পাগলা সাধারণত এ সময় বাড়িতে এসে বসে থাকে| নতুন কোনো কবিতা লিখলে বলে, ‘আনিস, পড়ো দেখি, তোমার নতুন কবিতাডা কী লিখছ?’
আনিস জিজ্ঞেস করে, ‘মনসুর, তুই কবিতার কী বুঝিস?’
মনসুর পাগলা চোখ বড় বড় করে বলে, ‘কী কও, আনিস| কেলাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ছি| আমাগো মীরবহরি প্রাইমারি স্কুলে কত কবিতা পড়ছি! কেলাসে কিন্তু আমি তোমার চাইতে ভালা ছাত্র আছিলাম|’
আনিস হেসে জিজ্ঞেস করে, ‘তাইলে তুই লেখাপড়া ছাড়লি কেন?’
মনসুর পাগলা মন খারাপ করে বলে, ‘মাথাডা খারাপ হইয়া গেছিল যে, হের লাইগা| তুমি তো হেইডা জানোই|’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ|’
গতকাল দুপুরের পর আনিস মনসুর পাগলার সঙ্গে নৌকায় করে সেতারা বেগমের লাশ খুঁজতে বের হয়েছিল| মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটগাছের তলা থেকে সেই ছল্লাকান্দি পর্যন্ত খুঁজেছে| তার চোখ জলের ওপর থৈথৈ ভাসছিল| দিঘল দৃষ্টি, বুকের চাপা কষ্ট ও শরীরের অদৃশ্য ক্ষরণ| সেতারা বেগমের পুরোনো কষ্ট ও শরীরের পুরোনো স্পর্শ যে তাকে ভাবিত করে!
গোমতীর দিঘল জলে সন্ধ্যা পেরিয়ে খানিকটা রাত হয়ে আসা অব্দি ওরা লাশ খুঁজেছিল| সন্ধ্যার পর আকাশে একটা চাঁদ উঠেছিল অদ্ভুত ভরাট শরীর নিয়ে| নদীতে ভরাট জল থাকলেও স্রোতের টান আগের দিনের মতো ছিল না| চাঁদের আলো নদীর জলে বিছিয়ে পড়েছিল রমণীর অজস্র রুপোর গহনা বিছিয়ে| জীবিত সেতারা বেগমের মুখটাই যে আনিসের চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল তখন বারবার| সেই ভরাট মুখ| ভরাট চোখ| ভরাট বুকের বান| নাকের নিচের নথটা ছিল রুপোর| একদিন হাত ও গলা ভরতি রুপোর গহনা পরে সেতারা তার কাছে এসে বলেছিল, ‘আমারে কেমন লাগতাছে, কন দেহি?’
আনিস বলেছিল, ‘একদম রুপার পরি গো!’
সেতারা বেগমের সে কী হাসি, হিহি, হিহি, হিহি...!
লাশ খুঁজে না পেয়ে রাতে ফিরেই আনিস কবিতার খাতা নিয়ে বসে| প্রথমে ভেবেছিল একটি প্রেম ও দীর্ঘশ্বাসের কবিতা লিখবে| কিন্তু লিখতে লিখতে সে টের পায়, সেতারাকে নিয়ে তার মনের ভেতর একটার পর একটা কবিতা উতালপাতাল করছে| কলম আর থামছে| একে একে লিখে ফেলে ছয়টি কবিতা| এই সিরিজ কবিতার নাম দেয়— ‘গোমতীকন্যা|’
সকালে উঠে আনিস কবিতাগুলো নিয়ে ঘষামাজা করতে বসে| ঠিক তখনই তার মনে হয়, সেতারাকে নিয়ে লেখা এই ছয়টা কবিতাই শেষ নয়| তাকে আরও কিছু কবিতা লিখতে হবে| সেই সিরিজ কবিতা সে কোনো সাহিত্য পত্রিকার অনলাইন পোর্টালে পাঠাবে| গ্রামীণ প্রেক্ষাপট ও মিথলজির সমন্বয়ে লেখা তার কবিতাগুলো ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্যের পাতার সম্পাদকদের বেশ প্রিয়| লিটল ম্যাগাজিনগুলোতেও সে সমান তালে লিখে যাচ্ছে|
আনিস কবিতা লিখে বলেই স্কুলে বাংলা পড়ায়| এজন্য অনুতপুর স্কুলের শিক্ষক-ছাত্র সবাই তাকে বেশ সম্মান করে| মা অসুস্থ বলেই সে এখন গ্রামে পড়ে আছে| ভবিষ্যতে তার অন্য পরিকল্পনা আছে| তার তো সয়সম্পত্তি কম নেই| বাড়ির পুবের বুইদ্দার বিলের বিস্তৃত বিঘার পর বিঘা জমি তার| পৈতৃকসূত্রে পাওয়া| তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার একটাই নেশা ছিল, প্রতিবছর একটা করে জমি কেনা| আশেপাশের গৃহস্থের জমি, এমনকি ভূঁইয়াদের কারো কারো ঘরের জমিও সে কিনেছে|
আনিস সেখান থেকে কিছু জমি বিক্রি করে ঢাকা শহরে ছোট আকারের একটি ফ্ল্যাট কিনবে| তারপর সে কোথাও কোনো একটা পত্রিকায় চাকরি নিবে| পত্রিকায় চাকরি ও লেখালেখি নিয়ে সে জীবনটা কাটিয়ে দিবে| অবশ্য তার পত্রিকার চাকরি না নিলেও হবে| তার কবিতা লেখার সঙ্গে যদি পত্রিকার চাকরিটা সাংঘর্ষিক হয় সে পত্রিকার চাকরি থেকে বিরত থাকবে| জমিগুলো বর্গায় দিলেও ঢাকা শহরে তার চলার মতো টাকা হয়ে যাবে|
আনিসের এরই মধ্যে দুটো কবিতার বই বের হয়েছে| গ্রামে থাকে বলে খুব একটা নাড়া না পড়লেও কবিতার বই দুটো কবিতা-বোদ্ধাদের কাছে বেশ সমাদৃত হয়েছে| বেশ কয়েকটা ˆদনিকে আলোচনা এসেছে| ঢাকার এক বিখ্যাত কবি তার প্রথম কবিতার বইটি নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধও লিখেছেন|
আনিস এখন ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজের সাত ন¤^র কবিতাটি লিখছে| সাত ন¤^র কবিতায় সে মৃত সেতারা বেগমের সঙ্গে জীবিত সেতারার অদ্ভুত এক সমীকরণ খুঁজে পেয়েছে| সে কবিতাটিতে একধরনের আধ্যাত্মিকতাও টেনে আনার চেষ্টা করছে| ব্যক্তির ভেতরে দেহের ঊর্ধ্বে মনের সত্তা, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য ও ঈশ্বরের সঙ্গে দেহ-মনের সংযোগ| বন্ধনের ভেতর অমোঘ মুক্তি ও সৃষ্টির সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার অনুরাগ তো আছেই| কিন্তু এতসব আয়োজনেও সেই সকাল থেকে সে কবিতাটি টেনে নিতে পারছ না| তার কলম বারবার থেমে যাচ্ছে| দেহের ভেতর বাহ্যিক টানে চোখ চলে যাচ্ছে অতলান্তের দিকে|
আনিস বসে আছে তাদের দিঘল বারান্দার পুবপাশে, দক্ষিণ দিকে মুখ করে| তাদের বাড়ির বসতঘরটা ইট-সিমেন্টের দেয়াল ও টিনের চাল দিয়ে করা| জানালার গ্রিলে সুন্দর কারুকাজ| সুন্দর ভুঁইয়া সেই কোম্পানীগঞ্জ থেকে থাই-অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে প্রতিটি জানালার গ্রিল বানিয়ে এনেছিল| পুরো বারান্দায়ও সে থাই-অ্যালুমিনিয়াম গ্রিল লাগাত| কিন্তু এর আগেই সে হঠাৎ করে ওপারে পাড়ি জমায়|
আনিসের অবশ্য খোলা বারান্দাটাই পছন্দ| গ্রিল দেওয়া হলে বরং বারান্দাটা বদ্ধ হয়ে যেত| দিঘল বারান্দাটা দক্ষিণদিকে মুখ করা, বারান্দার সামান্য দূরে সারি করা বেশ বড় বড় কয়েকটি আমগাছ| সেই আমগাছগুলো বারান্দা ও বাড়ির সামনে সবসময় ছায়া করে রাখে| বাড়ির সীমানার পর সরু গোপাট| তারপর আমগাছ আর হিজল গাছের ফাঁক গলা দক্ষিণে বুইদ্দার খাল ও বিস্তীর্ণ বুইদ্দার বিলের জলাভূমি| উত্তরের জোয়ারের জল নামলে তিন-চার মাস কোমর বা গলা অব্দি ভরাট জলে বুইদ্দার বিল দিগন্ত হারিয়ে ফেলে| তখন বুইদ্দার বিল, লোঙ্গার চর ও গোমতী নদী সীমানা হারিয়ে একাকার হয়ে যায়| আঁধারিয়া, মীরবহরি ও মোল্লাকান্দিসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম, এমনকি প্রতিটি গ্রামের একেকটা পাড়া তখন আলাদা আলাদা দ্বীপের মতো ভাসে|
একটা চেয়ারে বসে অন্য আরেকটা চেয়ারে পা-দুটো তুলে একটা বাঁধাই খাতায় আনিস কবিতা লিখছে| তার একটা ভালো অভ্যাস, কবিতা লিখতে গিয়ে খুব একটা কাটাছেঁড়া করে না| খানিকটা ভেবে সে প্রতিটি লাইন লেখে| এ কাজটা সে করে আঁধারিয়া গ্রামে এলে| প্রতিটি কবিতা আগে খাতায় লিখে পরে অনুতপুর গিয়ে ল্যাপটপে টাইপ করে পত্রিকা অফিসে পাঠায়| আঁধারিয়া গ্রামে সে যে তার কবিতা ল্যাপটপে টাইপ করে না, তা নয়| কিন্তু প্রধান সমস্যা হয়, এখানে একদিন বিদ্যুৎ এলে এরপর দুইদিন আর কোনো খবর থাকে না| মোবাইল নেটওয়ার্কও তেমন ভালো নয়, যেমনটা ভালো অনুতপুর হাইস্কুলের আশেপাশে| অনুতপুরে নিজস্ব মোবাইল টাওয়ার আছে|
আনিস ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজের সাত নম্বর কবিতাটি নিয়ে তেমন এগোতে না পারলেও সে একটা অনন্য-মুগ্ধতার ভেতর ঢুকে গিয়েছিল| লাশের ওপর আলোর নৃত্য| আলোর নৃত্য ঠিক আছে, কিন্তু লাশটা নেই| চারিদিকে অমোঘ আকর্ষণে ক্ষয়ে পড়া অশরীরী আত্মা| দেহের ভেতর টেনে নেওয়া টান|
আনিস সেই টানে কেন জানি কবিতাটির আধাআধি এসে আটকে গেল| সেই আটকে যাওয়ার ভেতর সে কী একটা চাপা কষ্টে নিজের ভেতর নিজে ক্ষয়ে গেল| তার দৃষ্টি উত্থিত হলো ফারাক ব্যবধানে, দক্ষিণের দিঘল বিস্তৃত জলে| ঠিক তখনই সে দেখল, জলের দিকে ঝুঁকে থাকা একটা আমগাছের তলে একটা নৌকা ভিড়ছে| নৌকায় মনসুর পাগলা|
মনসুর পাগলাকে দেখে আনিস মনে মনে খানিকটা বিরক্ত হলো| কিন্তু পরক্ষণ কী ভেবে তার দৃষ্টিটা প্রসন্ন হয়ে উঠল| ‘লাশ’ সিরিজের সাত নম্বর কবিতাটি নিয়ে যে জটলার সৃষ্টি হয়েছে সেটার সমাধান সে এখন করতে পারবে না| কোনো কোনো কবিতার জটলা সে এক-দুই মাসেও সমাধান করতে পারে না|
মনসুর পাগলা নৌকা থেকে নেমে ঝুঁকে একটা আমগাছের গোড়ায় রশিটা বেঁধে আনিসের দিকে এগোতে এগোতে বলল, ‘আনিস, আমার বউরে পাইছি|’
আনিস ঘণ্টা দুয়েক আগেই তাদের বছর-বাঁধা কামলা বশিরের কাছে এ খবরটা পেয়েছে| কিন্তু সে কবিতা লেখায় মগ্ন ছিল বলে নিজ থেকে কোড়ের পাড় দেখতে যায়নি| সে এটাও ভেবেছিল, সেতারা বেগমের লাশ পাওয়ার পর মনসুর পাগলা নিশ্চয়ই তার কাছে আসবে|
আনিস মনসুর পাগলার কথায় কবিতার খাতা থেকে চোখ তুলে বলল, ‘আমি শুনেছি| তোর অপেক্ষায় ছিলাম| লাশটা এখন কোথায়?’
মনসুর পাগলা বলল, ‘বাড়িত আনছি|’
‘কখন আনছিস?’
‘ওই তো, বেশিক্ষণ হয় নাই|’
‘ও, আচ্ছা| দাফন-কাফনের ব্যবস্থা কী করেছিস?
‘কিছুই করি নাই| এর লাইগাই তো তোমার কাছে আইছি|’
‘আমি গিয়া কী করব?’
‘আরে ধুর, তোমার কিছুই করতে হইব না| আমার লগে থাকলেই হইব| তুমি লগে থাকলে আমার সাহস হয়|’
‘তোর এমনিতেই অনেক সাহস|’
‘হেইডা জানি না| অখন চলো তো| বাড়িত উঠানে বউরে একলা রাইখা আইছি|’
আনিস হাসতে গিয়ে হাসল না| সে বলল, ‘লাশ তো লাশই| একলা রাখলে কী হবে? ভয় তো জীবিত মানুষের| মৃত মানুষের না|’
মনসুর পাগলা বলল, ‘আনিস, আমি অত বুঝি না| আমার বউ একলা আছে| তুমি অখনই আমার লগে চলো|’
আনিস কবিতার খাতাটা বন্ধ করতে করতে বলল, ‘ঠিক আছে, আমাকে এক মিনিট সময় দে| আমি পরনের জামাটা পাল্টে আসি|’
মনসুর পাগলা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা|’ ক্রমশ...
***

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
চার.
আঁধারিয়া গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার একেবারে শুরুতে একটা বাড়ির পর মনসুর পাগলাদের বাড়ি| মনসুর পাগলার বাড়ির পর দক্ষিণ পাড়াটা একটা বড় পুকুর ও অনেকগুলো ইশা নিয়ে আরও দক্ষিণে এগিয়ে গেছে| দক্ষিণ পাড়ার একেবারে শেষে বুইদ্দার বিল| অবশ্য এই বুইদ্দার বিলটা শুধু দক্ষিণ পাড়ার শেষেই নয়, পুব পাড়া, পশ্চিম পাড়া, এমনকি উত্তর পাড়ার একাংশকে ঘিরে রেখেছে| শুধুমাত্র একটা খাল দিয়ে প্রত্যেকটা পাড়া ভাগ করা হয়েছে| খালটার নাম বুইদ্দার খাল| বুইদ্দার বিলের নামেই বুইদ্দার খালটা| সেই বুইদ্দার খাল মনসুর পাগলাদের বাড়ির পুব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বলে উত্তরের জোয়ারের জল তাদের বাড়িটাকেও স্পর্শ করেছে|
মনসুর পাগলা সেই বুইদ্দার খাল ধরে বেয়ে নৌকাটা এনে তাদের বাড়ির গোপাট ঘেঁষা আমগাছটার তলে আসতেই তার চাচাত বোন মমিনা দৌড়ে এল| এসেই কোনোকিছু জিজ্ঞেস না করেই সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল|
মনসুর পাগলা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কানতাছস ক্যান?’
মমিনা কান্না ধরে রেখেই বলল, ‘ভাবী মইরা গেছে| ভাবীর লাশ...!’
মনসুর পাগলা বলল, ‘হ, তোর ভাবীর লাশ| তয় কী হইছে|’
‘ভাবী আমার সখির লাহান আছিল| কত সুখদুঃখের কথা কইছি!’
‘আজাইরা কথা কইস না| কবে আছিল? চাপা পিটাইতাছস ক্যান? সবসময় দেখতাম কাইজা লাইগা থাকতি| অখন যা| আমাগো ঘর থাইকা একটা চাটাই বাইর কইরা লইয়া আয়| উডানে শোয়ামু|’
মমিনা কান্না থামিয়ে চেহারা খানিকটা ভোঁতা করে ফেলল| একবার মাথা নেড়ে কী ভেবে ধীর পায়ে গোপাট থেকে আবার মনসুর পাগলার ঘরের দিকে হাঁটা ধরল|
মনসুর পাগলা মমিনার গমন পথের দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবার সেতারা বেগমের লাশটা দেখল| এক মুহূর্ত সময় নিয়ে লাশটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে ভাবল, সেতারার লাশটা কোড়ের পাড়ে একলা নৌকায় তুললেও এখন সে কি সেটা বহন করে একা উঠোনে নিয়ে যেতে পারবে? ভাবতে ভাবতেই সে দেখল, তার মা কমলা খাতুন উঠোন ছেড়ে গোপাটে নেমে আসছে|
মনসুর পাগলা গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মা, তুমি এখানে আইতাছ ক্যান?’
কমলা খাতুন কোনো জবাব দিলা না| গোপাটে নেমে এল| নৌকায় সেতারার লাশটার দিকে তাকাল|
মনসুর পাগলা রাগ দেখিয়ে বলল, ‘তোমার গামলা মুখটা দেখবার ইচ্ছা করে না, মা| তুমি আমার সামনের থাইকা যাও|’
কমলা খাতুন এবারও চুপ|
মনসুর পাগলা রাগে ঘড়ঘড় করতে করতে নৌকা থেকে লাফ দিয়ে জলে নামল| জলের ধারে ঝুলে থাকা একটি আমগাছে নৌকা বেঁধে সেতারা বেগমের লাশটা এক টানে পাঁজাকোলে তুলে নিল| শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে পাড়ে উঠে সে গোপাট ধরে উঠোনের দিকে হাঁটা ধরল| সেতারার লাশ জলে ডুবে ফুলে উঠলেও আদতে সে ছোটখাটো নাদুসনুদুস ধরনের মহিলা| সেতারা বেগমের যখন বেঁচেছিল, মনসুর পাগলার যখন মন ভালো থাকত, তখন কতবার সে তাকে পাঁজাকোলে করে হাওয়ায় ভাসিয়েছে!
মনসুর পাগলা উঠোনে উঠতেই দেখল, মমিনা এরই মধ্যে ঘর থেকে একটা হোগলার চাটাই এনে ঘরের দাওয়ার কাছে উঠোনে বিছিয়ে দিয়েছে|
মনসুর পাগলা সেতারা বেগমের লাশটা চাটাইর ওপর উত্তর-দক্ষিণ করে শুইয়ে দিল| কয়েকবার হাঁপর-ছাড়া শ্বাস ফেলে ধীর পায়ে ঘরে ঢুকল| ঘরে ঢুকেই সে ঝাঁপের ওপর থেকে সেতারা বেগমেরই একটা পুরোনো শাড়ি টেনে নিল| নিজের পরনের ভেজা লুঙ্গি ও গায়ের ভেজা পাঞ্জাবিটা পরিবর্তন করবে কি না ভাবল| কিন্তু পরক্ষণ কী ভেবে সেতারা বেগমের পুরোনো শাড়িটা নিয়েই ঘর থেকে বের হলো|
কমলা খাতুন এবার গোপাট থেকে উঠে এসে উঠোনের একপাশে দাঁড়াল| সে নির্বাক দৃষ্টিতে সেতারা বেগমের লাশটার দিকে তাকিয়ে রইল| ততক্ষণে উঠোনের একপাশে বেশি কিছু উৎসুক মানুষ জমেছে| এদের মধ্যে পাড়ার বউ-ঝিয়ারিরাই বেশি| আর আছে কিছু ন্যাংটা ছেলেমেয়ে| ব্যাটাছেলে তেমন না এলেও পাশের বাড়ির একজন মুরুব্বি মনসুর পাগলার ছোটচাচা কেরামত আলী এসেছে|
মনসুর পাগলা ঘর থেকে আনা সেই পুরোনো শাড়িটা দিয়ে সেতারা বেগমের লাশটা পুরোপুরি ঢেকে দিল|
কেরামত আলী কয়েক পা এগিয়ে এসে বলল, ‘মনসুর, উত্তর পাড়ায় যা|’
মনসুর পাগলা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘উত্তর পাড়ায় ক্যান, কাকা?’
‘ওমা, উত্তর পাড়ার মসজিদের রহমান হুজুররে আনতে হইব না? লাশরে গোছল করাইব কেডা?’
‘হ হ, কাকা| রহমান হুজুররে তো আনতে হইবই| তয় অখন আনতে হইব?
‘হ, অখনই| লাশের গন্ধ ছুইটা গেছে, টের পাইতাছস না?’
মনসুর পাগলা এতক্ষণ গন্ধ না পেলেও এখন কেরামত আলীর কথা শুনে লাশের গন্ধ টের পেল| সে একটু ব্যস্ত গলায় বলল, ‘হ হ, পাইতাছি| নাকে গন্ধ লাগতাছে|’
কেরামত আলী বলল, ‘তাইলে যা| তাড়াতাড়ি কর|’
মনসুর পাগলা বলল, ‘কিন্তুক, আমার যে আগে ভুঁইয়া বাড়িত যাইতে হইব?’
‘ভুঁইয়া বাড়িত ক্যান, আনিস ভুঁইয়ার কাছে?’
‘হ, কাকা|’
‘তার ওইখানে পরে গেলেও তো হইব| আগে রহমান হুজুরের কাছে তোর যাওন দরকার|’
‘কাকা, আমি আনিসরে বাদে কিছুই করবার পারি না, হেইডা তো জানো?’
কেরামত আলী বিরক্তিতে মুখ বাঁকা করে বলল, ‘হেইডা আমি না হুদাই, গেরামের সব্বাই জানে|’
মনসুর পাগলা বলল, ‘হ হ, জানি| আমি আগে আনিসগো বাড়িত যাই|’
কেরামত আলী আর কিছু বলল না|
মনসুর পাগলা সেতারার লাশটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে উঠোন থেকে গোপাটে নেমে এল| আমগাছে বাঁধা রশিটা ছেড়ে নৌকায় উঠতে উঠতে সে দূর থেকে আরও একবার সেতারা বেগমের লাশটা দেখল|
গ্রামের আর কারও কথা মানুক আর না-মানুক, মনসুর পাগলা সত্যি সত্যি আনিস ভুঁইয়ার কথা খুব মানে| ওদিকে আনিস তাকে কেমন সবকিছু থেকে আগলে রাখে| একটা অদৃশ্য বন্ধন যেন তাদের মধ্যে| সেই ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা| একই সঙ্গে মীরবহরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া...|
মনসুর পাগলার অবশ্য পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর লেখাপড়া আর এগিয়ে নিতে পারেনি, মাথায় ছিট ধরা পড়ে| মাথায় ছিট ধরার পর প্রথম প্রথম সে গম্ভীর হয়ে ঘরের দাওয়ায় বসে থাকত| চোখ বড় করে সবার দিকে তাকাত| বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাগলামিটা আরও বেশি করে বাড়তে শুরু করে| হঠাৎ হঠাৎ মস্তানের মাজারে গিয়ে পড়ে থাকে| তার আরেকটা বাজে অভ্যাস দেখা দেয়, রাস্তাঘাটে কোনো মেয়েছেলে দেখলেই সে তাদের সামনে লাফিয়ে পড়ত| শাড়ির আঁচল ধরে টান দিত| তাই অল্প বয়সেই তাকে বিয়ে করিয়ে দেওয়া হয়| জুলেখা তার প্রথম স্ত্রী ছিল| বিয়ের পর পাগলামি কিছুটা কমে এলেও গোঁয়ার্তুমি বেড়ে যায়| জুলেখা মারা যাওয়ার পর সেতারা বেগম ঘরে এলে গোঁয়ার্তুমির পাশাপাশি মস্তানের মাজারে গিয়ে তার পড়ে থাকা আরও বেড়ে যায়|
আনিস অবশ্য মীরবহরি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর অনুতপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করে দেবিদ্বার সুজাত আলী কলেজ থেকে আই.এ. ও বি.এ. পাস করে| ঢাকায় গিয়ে এম.এ. টাও পড়ত| বছর সাতেক আগে হঠাৎ তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়া মারা গেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা’র জন্য গ্রামে থেকে যায়| এখন সে অনুতপুর হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে সেখানে নবম ও দশম শ্রেণিতে বাংলা পড়ায়|
আনিস ও মনসুর পাগলার অদ্ভুত নির্ভরতা নিয়ে মানুষ যেমনটাই বলুক, তাদের চেহারার মিল নিয়ে গ্রামে সবচেয়ে বেশি কানাঘুষাটা হয়| গ্রামের অনেকেই বলে, মনসুর পাগলা নাকি সুন্দর কাজীরই ছেলে| তাদের এমনটা বলার পেছনে কারণও ছিল| মনসুর পাগলার বাবা আছমত আলী ব্যাপারির ছিল মীরবহরি বাজারে চালের আড়ত| তার চালের আড়তটা ছিল নামমাত্র| সে মূলত আঁধারিয়া, মোল্লাকান্দি, মীরবহরি, ছল্লাকান্দিসহ এ এলাকার অনেকগুলো গ্রাম থেকে ধান কিনে চাল করে রামচন্দ্রপুর বাজার, কোম্পানীগঞ্জ বাজার, হোমনা, গৌরীপুর বাজার, দাউদকান্দি, এমনকি নারায়ণগঞ্জে পাইকারি দামে চাল বিক্রি করত| সে এ কাজটা করত বর্ষার মওসুমে যখন ওসব বাজারগুলোতে চালের আকাল পড়ত| তার একটা বেশ বড় নৌকা ছিল| দেখতে বজরার মতো, তবে আকারে আরও বড় ছিল| সেই নৌকাটা মীরবহরি বাজারের কাছে ঘাটে বাঁধা থাকত| অবশ্য তার বাড়িতে আসা-যাওয়ার জন্য আরেকটা ছোট্ট লোহা কাঠের নৌকা ছিল, যেটা মনসুর পাগলা এখনও যত্নআত্তি করে বর্ষার মওসুমে চালায়|
আসমত আলী ব্যাপারি বর্ষার মওসুমে আরও দুইজন মাঝি সহ যখন চাল বোঝাই বড় নৌকাটা নিয়ে বের হতো, তখন দুই-তিন সপ্তাহ, মাঝেমধ্যে একমাস-দেড়মাস বাড়ি ফিরতে পারত না| তখন সুন্দর ভুঁইয়া কমলা খাতুনের খোঁজখবর নিত, সময়-অসময় বাজারসদাই করে দিত| মীরবহরি বাজারে আসমত আলী ব্যাপারির চালের আড়তের তিনটা দোকান পরেই সুন্দর ভুঁইয়ার ছিল সার-কীটনাশকের দোকান| দু’জনের সম্পর্কটা ছিল পান ভাগ করে খাওয়া দোস্তের মতো|
মনসুর পাগলা ও আনিস যেন সেই সম্পর্কেরই ধারাবাহিকতা বহন করছে|
পাঁচ.
আনিস অনুতপুর হাইস্কুলে যোগদানের পর স্কুলের পাশে হেডমাস্টারের বাড়িতে একটা ঘর ভাড়া করে থাকলেও বাড়িতে সে প্রায় প্রতি সপ্তাহে আসে| এখনও বিয়ে করেনি| আত্মীয়¯^জন বেশ চাপ দিচ্ছে বিয়ে করার জন্য| অন্তত মা’র কথা চিন্তা করে যেন বিয়ে করে| কিন্তু কবিতা লেখা তার ধ্যান| এর বাইরে অন্য কিছু নিয়ে সে ভাবতে চায় না| শরীরের চাহিদা যেখানেই মিটুক, মনের চাহিদা যে তার কবিতার শরীরে!
তিনদিন ধরে আনিস বাড়িতে| শুক্রবার ও শনিবার স্কুল ছুটির দিনে সে এমনিতেই বাড়িতে চলে আসে| এবার সে স্কুল থেকে এক সপ্তাহের বাড়তি ছুটি নিয়ে এসেছে| তার মা রাহেলা খানমের শরীর দিনদিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে| ছোটবয়স থেকেই সে দেখে আসছে, তার মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারে না| প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলেও কারো না কারো সাহায্য নিতে হয়| গত চার বছর ধরে বলা যায় পুরোপুরি বিছানাবন্দি| তাকে সর্বক্ষণ দেখাশোনার জন্য একজন কাজের মহিলা রাখা হয়েছে| বাড়িতে একজন বছর বাঁধা কামলা আছে| সে জমিজমা দেখার পাশাপাশি রাহেলা খানমকে দেখাশোনা করে|
আনিস বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিল, মা’কে সে একজন বড় ডাক্তার দেখাবে| যেভাবে তার মা’র শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্টটা বেড়ে গেছে, কোনদিন না বড় কোনো অঘটন ঘটে যায়! ঢাকা নিয়ে যাওয়ার কথাও সে ভেবেছিল| কিন্তু পরে সে সেই চিন্তা বাদ দেয়| আপাতত সে মা’কে কুমিল্লা নিয়ে যাবে| এজন্য আগামীকাল মা’কে নিয়ে সে নৌকায় করে উপজেলার ¯^াস্থ্য কমপ্লেক্সে যাবে| ডা. জাহিদ আলমের ডাক্তারখানা ও চে¤^ার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছেই|
আনিস আগে থেকেই ফোনে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে রেখেছে| ডা. জাহিদ আলমের কাছে থেকে কাগজপত্রগুলো নিয়ে সে উপজেলা কমপ্লেক্সের পাশ থেকে অ্যাম্বুলেন্সটা নিবে| কুমিল্লার বড় ডাক্তারের সঙ্গে ডা. জাহিদই কথা বলে রেখেছেন|
আজ আনিসের অবশ্য কিছু করার নেই| ঘরে তার মা এখন ঘুমোচ্ছে| কাজের মহিলা সাবেরা রান্নাঘরে কিছু একটা রান্না করছে| বছর বাঁধা কামলা বশির মীরবহরি বাজার থেকে এসে পুকুরের উত্তর পাড়ে গরুর জন্য জলঘাস কাটতে গেছে| আনিস এলে মনসুর পাগলা সাধারণত এ সময় বাড়িতে এসে বসে থাকে| নতুন কোনো কবিতা লিখলে বলে, ‘আনিস, পড়ো দেখি, তোমার নতুন কবিতাডা কী লিখছ?’
আনিস জিজ্ঞেস করে, ‘মনসুর, তুই কবিতার কী বুঝিস?’
মনসুর পাগলা চোখ বড় বড় করে বলে, ‘কী কও, আনিস| কেলাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ছি| আমাগো মীরবহরি প্রাইমারি স্কুলে কত কবিতা পড়ছি! কেলাসে কিন্তু আমি তোমার চাইতে ভালা ছাত্র আছিলাম|’
আনিস হেসে জিজ্ঞেস করে, ‘তাইলে তুই লেখাপড়া ছাড়লি কেন?’
মনসুর পাগলা মন খারাপ করে বলে, ‘মাথাডা খারাপ হইয়া গেছিল যে, হের লাইগা| তুমি তো হেইডা জানোই|’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ|’
গতকাল দুপুরের পর আনিস মনসুর পাগলার সঙ্গে নৌকায় করে সেতারা বেগমের লাশ খুঁজতে বের হয়েছিল| মোল্লাকান্দির পুনোয়ারার বটগাছের তলা থেকে সেই ছল্লাকান্দি পর্যন্ত খুঁজেছে| তার চোখ জলের ওপর থৈথৈ ভাসছিল| দিঘল দৃষ্টি, বুকের চাপা কষ্ট ও শরীরের অদৃশ্য ক্ষরণ| সেতারা বেগমের পুরোনো কষ্ট ও শরীরের পুরোনো স্পর্শ যে তাকে ভাবিত করে!
গোমতীর দিঘল জলে সন্ধ্যা পেরিয়ে খানিকটা রাত হয়ে আসা অব্দি ওরা লাশ খুঁজেছিল| সন্ধ্যার পর আকাশে একটা চাঁদ উঠেছিল অদ্ভুত ভরাট শরীর নিয়ে| নদীতে ভরাট জল থাকলেও স্রোতের টান আগের দিনের মতো ছিল না| চাঁদের আলো নদীর জলে বিছিয়ে পড়েছিল রমণীর অজস্র রুপোর গহনা বিছিয়ে| জীবিত সেতারা বেগমের মুখটাই যে আনিসের চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল তখন বারবার| সেই ভরাট মুখ| ভরাট চোখ| ভরাট বুকের বান| নাকের নিচের নথটা ছিল রুপোর| একদিন হাত ও গলা ভরতি রুপোর গহনা পরে সেতারা তার কাছে এসে বলেছিল, ‘আমারে কেমন লাগতাছে, কন দেহি?’
আনিস বলেছিল, ‘একদম রুপার পরি গো!’
সেতারা বেগমের সে কী হাসি, হিহি, হিহি, হিহি...!
লাশ খুঁজে না পেয়ে রাতে ফিরেই আনিস কবিতার খাতা নিয়ে বসে| প্রথমে ভেবেছিল একটি প্রেম ও দীর্ঘশ্বাসের কবিতা লিখবে| কিন্তু লিখতে লিখতে সে টের পায়, সেতারাকে নিয়ে তার মনের ভেতর একটার পর একটা কবিতা উতালপাতাল করছে| কলম আর থামছে| একে একে লিখে ফেলে ছয়টি কবিতা| এই সিরিজ কবিতার নাম দেয়— ‘গোমতীকন্যা|’
সকালে উঠে আনিস কবিতাগুলো নিয়ে ঘষামাজা করতে বসে| ঠিক তখনই তার মনে হয়, সেতারাকে নিয়ে লেখা এই ছয়টা কবিতাই শেষ নয়| তাকে আরও কিছু কবিতা লিখতে হবে| সেই সিরিজ কবিতা সে কোনো সাহিত্য পত্রিকার অনলাইন পোর্টালে পাঠাবে| গ্রামীণ প্রেক্ষাপট ও মিথলজির সমন্বয়ে লেখা তার কবিতাগুলো ঢাকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্যের পাতার সম্পাদকদের বেশ প্রিয়| লিটল ম্যাগাজিনগুলোতেও সে সমান তালে লিখে যাচ্ছে|
আনিস কবিতা লিখে বলেই স্কুলে বাংলা পড়ায়| এজন্য অনুতপুর স্কুলের শিক্ষক-ছাত্র সবাই তাকে বেশ সম্মান করে| মা অসুস্থ বলেই সে এখন গ্রামে পড়ে আছে| ভবিষ্যতে তার অন্য পরিকল্পনা আছে| তার তো সয়সম্পত্তি কম নেই| বাড়ির পুবের বুইদ্দার বিলের বিস্তৃত বিঘার পর বিঘা জমি তার| পৈতৃকসূত্রে পাওয়া| তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার একটাই নেশা ছিল, প্রতিবছর একটা করে জমি কেনা| আশেপাশের গৃহস্থের জমি, এমনকি ভূঁইয়াদের কারো কারো ঘরের জমিও সে কিনেছে|
আনিস সেখান থেকে কিছু জমি বিক্রি করে ঢাকা শহরে ছোট আকারের একটি ফ্ল্যাট কিনবে| তারপর সে কোথাও কোনো একটা পত্রিকায় চাকরি নিবে| পত্রিকায় চাকরি ও লেখালেখি নিয়ে সে জীবনটা কাটিয়ে দিবে| অবশ্য তার পত্রিকার চাকরি না নিলেও হবে| তার কবিতা লেখার সঙ্গে যদি পত্রিকার চাকরিটা সাংঘর্ষিক হয় সে পত্রিকার চাকরি থেকে বিরত থাকবে| জমিগুলো বর্গায় দিলেও ঢাকা শহরে তার চলার মতো টাকা হয়ে যাবে|
আনিসের এরই মধ্যে দুটো কবিতার বই বের হয়েছে| গ্রামে থাকে বলে খুব একটা নাড়া না পড়লেও কবিতার বই দুটো কবিতা-বোদ্ধাদের কাছে বেশ সমাদৃত হয়েছে| বেশ কয়েকটা ˆদনিকে আলোচনা এসেছে| ঢাকার এক বিখ্যাত কবি তার প্রথম কবিতার বইটি নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধও লিখেছেন|
আনিস এখন ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজের সাত ন¤^র কবিতাটি লিখছে| সাত ন¤^র কবিতায় সে মৃত সেতারা বেগমের সঙ্গে জীবিত সেতারার অদ্ভুত এক সমীকরণ খুঁজে পেয়েছে| সে কবিতাটিতে একধরনের আধ্যাত্মিকতাও টেনে আনার চেষ্টা করছে| ব্যক্তির ভেতরে দেহের ঊর্ধ্বে মনের সত্তা, প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য ও ঈশ্বরের সঙ্গে দেহ-মনের সংযোগ| বন্ধনের ভেতর অমোঘ মুক্তি ও সৃষ্টির সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার অনুরাগ তো আছেই| কিন্তু এতসব আয়োজনেও সেই সকাল থেকে সে কবিতাটি টেনে নিতে পারছ না| তার কলম বারবার থেমে যাচ্ছে| দেহের ভেতর বাহ্যিক টানে চোখ চলে যাচ্ছে অতলান্তের দিকে|
আনিস বসে আছে তাদের দিঘল বারান্দার পুবপাশে, দক্ষিণ দিকে মুখ করে| তাদের বাড়ির বসতঘরটা ইট-সিমেন্টের দেয়াল ও টিনের চাল দিয়ে করা| জানালার গ্রিলে সুন্দর কারুকাজ| সুন্দর ভুঁইয়া সেই কোম্পানীগঞ্জ থেকে থাই-অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে প্রতিটি জানালার গ্রিল বানিয়ে এনেছিল| পুরো বারান্দায়ও সে থাই-অ্যালুমিনিয়াম গ্রিল লাগাত| কিন্তু এর আগেই সে হঠাৎ করে ওপারে পাড়ি জমায়|
আনিসের অবশ্য খোলা বারান্দাটাই পছন্দ| গ্রিল দেওয়া হলে বরং বারান্দাটা বদ্ধ হয়ে যেত| দিঘল বারান্দাটা দক্ষিণদিকে মুখ করা, বারান্দার সামান্য দূরে সারি করা বেশ বড় বড় কয়েকটি আমগাছ| সেই আমগাছগুলো বারান্দা ও বাড়ির সামনে সবসময় ছায়া করে রাখে| বাড়ির সীমানার পর সরু গোপাট| তারপর আমগাছ আর হিজল গাছের ফাঁক গলা দক্ষিণে বুইদ্দার খাল ও বিস্তীর্ণ বুইদ্দার বিলের জলাভূমি| উত্তরের জোয়ারের জল নামলে তিন-চার মাস কোমর বা গলা অব্দি ভরাট জলে বুইদ্দার বিল দিগন্ত হারিয়ে ফেলে| তখন বুইদ্দার বিল, লোঙ্গার চর ও গোমতী নদী সীমানা হারিয়ে একাকার হয়ে যায়| আঁধারিয়া, মীরবহরি ও মোল্লাকান্দিসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম, এমনকি প্রতিটি গ্রামের একেকটা পাড়া তখন আলাদা আলাদা দ্বীপের মতো ভাসে|
একটা চেয়ারে বসে অন্য আরেকটা চেয়ারে পা-দুটো তুলে একটা বাঁধাই খাতায় আনিস কবিতা লিখছে| তার একটা ভালো অভ্যাস, কবিতা লিখতে গিয়ে খুব একটা কাটাছেঁড়া করে না| খানিকটা ভেবে সে প্রতিটি লাইন লেখে| এ কাজটা সে করে আঁধারিয়া গ্রামে এলে| প্রতিটি কবিতা আগে খাতায় লিখে পরে অনুতপুর গিয়ে ল্যাপটপে টাইপ করে পত্রিকা অফিসে পাঠায়| আঁধারিয়া গ্রামে সে যে তার কবিতা ল্যাপটপে টাইপ করে না, তা নয়| কিন্তু প্রধান সমস্যা হয়, এখানে একদিন বিদ্যুৎ এলে এরপর দুইদিন আর কোনো খবর থাকে না| মোবাইল নেটওয়ার্কও তেমন ভালো নয়, যেমনটা ভালো অনুতপুর হাইস্কুলের আশেপাশে| অনুতপুরে নিজস্ব মোবাইল টাওয়ার আছে|
আনিস ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজের সাত নম্বর কবিতাটি নিয়ে তেমন এগোতে না পারলেও সে একটা অনন্য-মুগ্ধতার ভেতর ঢুকে গিয়েছিল| লাশের ওপর আলোর নৃত্য| আলোর নৃত্য ঠিক আছে, কিন্তু লাশটা নেই| চারিদিকে অমোঘ আকর্ষণে ক্ষয়ে পড়া অশরীরী আত্মা| দেহের ভেতর টেনে নেওয়া টান|
আনিস সেই টানে কেন জানি কবিতাটির আধাআধি এসে আটকে গেল| সেই আটকে যাওয়ার ভেতর সে কী একটা চাপা কষ্টে নিজের ভেতর নিজে ক্ষয়ে গেল| তার দৃষ্টি উত্থিত হলো ফারাক ব্যবধানে, দক্ষিণের দিঘল বিস্তৃত জলে| ঠিক তখনই সে দেখল, জলের দিকে ঝুঁকে থাকা একটা আমগাছের তলে একটা নৌকা ভিড়ছে| নৌকায় মনসুর পাগলা|
মনসুর পাগলাকে দেখে আনিস মনে মনে খানিকটা বিরক্ত হলো| কিন্তু পরক্ষণ কী ভেবে তার দৃষ্টিটা প্রসন্ন হয়ে উঠল| ‘লাশ’ সিরিজের সাত নম্বর কবিতাটি নিয়ে যে জটলার সৃষ্টি হয়েছে সেটার সমাধান সে এখন করতে পারবে না| কোনো কোনো কবিতার জটলা সে এক-দুই মাসেও সমাধান করতে পারে না|
মনসুর পাগলা নৌকা থেকে নেমে ঝুঁকে একটা আমগাছের গোড়ায় রশিটা বেঁধে আনিসের দিকে এগোতে এগোতে বলল, ‘আনিস, আমার বউরে পাইছি|’
আনিস ঘণ্টা দুয়েক আগেই তাদের বছর-বাঁধা কামলা বশিরের কাছে এ খবরটা পেয়েছে| কিন্তু সে কবিতা লেখায় মগ্ন ছিল বলে নিজ থেকে কোড়ের পাড় দেখতে যায়নি| সে এটাও ভেবেছিল, সেতারা বেগমের লাশ পাওয়ার পর মনসুর পাগলা নিশ্চয়ই তার কাছে আসবে|
আনিস মনসুর পাগলার কথায় কবিতার খাতা থেকে চোখ তুলে বলল, ‘আমি শুনেছি| তোর অপেক্ষায় ছিলাম| লাশটা এখন কোথায়?’
মনসুর পাগলা বলল, ‘বাড়িত আনছি|’
‘কখন আনছিস?’
‘ওই তো, বেশিক্ষণ হয় নাই|’
‘ও, আচ্ছা| দাফন-কাফনের ব্যবস্থা কী করেছিস?
‘কিছুই করি নাই| এর লাইগাই তো তোমার কাছে আইছি|’
‘আমি গিয়া কী করব?’
‘আরে ধুর, তোমার কিছুই করতে হইব না| আমার লগে থাকলেই হইব| তুমি লগে থাকলে আমার সাহস হয়|’
‘তোর এমনিতেই অনেক সাহস|’
‘হেইডা জানি না| অখন চলো তো| বাড়িত উঠানে বউরে একলা রাইখা আইছি|’
আনিস হাসতে গিয়ে হাসল না| সে বলল, ‘লাশ তো লাশই| একলা রাখলে কী হবে? ভয় তো জীবিত মানুষের| মৃত মানুষের না|’
মনসুর পাগলা বলল, ‘আনিস, আমি অত বুঝি না| আমার বউ একলা আছে| তুমি অখনই আমার লগে চলো|’
আনিস কবিতার খাতাটা বন্ধ করতে করতে বলল, ‘ঠিক আছে, আমাকে এক মিনিট সময় দে| আমি পরনের জামাটা পাল্টে আসি|’
মনসুর পাগলা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, ‘আইচ্ছা|’ ক্রমশ...
***

আপনার মতামত লিখুন