মাটির গন্ধটা আজ একটু ভিন্ন| শুকনো নয়, কাদামাটি মেশানো— যেমনটা দাদী বলতেন, “মৃতদেহের নিচে জমে থাকা জমিনের আলাদা ঘ্রাণ হয়|” দুলাল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, লোহার শানবাঁধানো কবরে সামনের কাদা হাতে ঘষছে, যেন কিছু শোধরানোর চেষ্টা করছে| কিন্তু দাদী তো আর ফিরে আসবে না| বাড়ি ফিরে ঘড়ির কাঁটা দুইটা পার করলেও দুলালের চোখে ঘুম নেই| শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মাথার ভেতরে যেন কারও কণ্ঠস্বর চলছিল| না, কণ্ঠস্বর না! ফিসফিস| আবার ফিসফিস নয়, চাপা হাঁসফাঁস| তার মনে হচ্ছিল শব্দগুলো বাইরের না, ভেতরের মাথার গভীরে কেউ যেন কাঁচ ভেঙে হাঁটছে, কানের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে|
“ইন্দ্র জ্যোতি, ইন্দ্র জ্যোতি”
সকালটা স্বাভাবিক ছিল না| ঘরের বারান্দায় পাখির ডানার শব্দ ছিল, কিন্তু তাদের ডাক শুনতে পাচ্ছিল না দুলাল শুধু শব্দের ছায়া| যেমন স্বপ্নে মানুষ কারো মুখ দেখে, কিন্তু আওয়াজ শুনতে পায় না| সে তখন খাতার শেষ কিছু পাতা উল্টে দেখছিল যেগুলো জুড়ে ছিল ফাঁকা স্থান, বাদামি কালি, মাঝে মাঝে অদ্ভুত ছোট ছোট আঁকিবুঁকি কোনো শিকড়, কখনো সাপ, কখনো হাতের তালুর রেখার মতো ঘূর্ণি| তার চোখ আটকে গেল এক পাতায়| খাতার বাঁধনের ঠিক নিচের ভাঁজে হাত দিলে সে টের পেল কিছু যেন চাপা দেওয়া আছে|
চোখে লাগানো ধুলোর মতো পুরোনো এক প্যাঁচানো কাগজ সে ধীরে ধীরে টেনে বের করল| এটা ছিল একটি মানচিত্র| একদম হাতে আঁকা, জীর্ণ কাগজে| কালো কালি ঝাপসা হয়ে গেছে কিছু অংশে, কিন্তু কয়েকটি স্থান, রেখা, এবং একটি নাম একেবারে স্পষ্ট—
“অমৃতডাঙ্গা”
একটা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত জায়গা মানচিত্রের এক কোনায়| তার নিচে লেখা:
“সেখানে ছিল তার দরজা,
এখন সেখানে তার শিকড়|”
দুলালের কপালের ঠিক মাঝখানে এক বিন্দু ঘাম জমে উঠল|
‘তার’ মানে কে?
চন্দ্রতারা?
না কি দাদী?
নাকি দুজনেই?
সে চোখ নামিয়ে খেয়াল করল, মানচিত্রের প্রান্তে আঁকা আছে একটা গোল কাঠামো নাগমুখ বিশিষ্ট মন্দিরের প্রতিরূপ| পাশে লেখা:
“নাগতলী”
আর নিচে রক্তমাখা অক্ষরে:
“যে রক্তে লেখা, তাকে খুঁজেই ফিরছে সে|”
দুলাল ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলে পড়ল| দেয়ালের ওপর তাকিয়ে ভাবল এই নাম তো সে আগে কখনো শোনেনি| কিন্তু শরীরের কোথাও যেন জায়গাটার ছায়া লেগে আছে, চিরকাল| হঠাৎ তার ফোন কাঁপতে শুরু করল টেবিলের কিনারে|
একবার, দুবার...
লাবণী|
তাকে এই অবস্থায় কিছু বলবে কি? এই খাতার কথা, এই মানচিত্র? দুলাল এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল| তারপর ফোনটা হাতে তুলে নিল| তবে সে জানে এই যাত্রা সে একা শুরু করলেও, একা শেষ হবে না|
“হ্যালো?”
লাবণীর গলা ফোনের ওপাশে ধোঁয়াটে লাগছিল| ঘুম ভেঙে উঠে কথা বলছে মনে হচ্ছিল, কিন্তু স্বরে ছিল এক ধরনের বিরক্তি, না বলা অভিযোগ| দুলাল চুপ করে রইল| কিছু বলল না|
“দুলাল, তুই ঠিক আছিস?”
লাবণী এবার একটু সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “গতকাল রাতে তুই হঠাৎ ডিসকানেক্ট করলি| কল ব্যাক করিসনি| আমিও বারবার ট্রাই করছিলাম|”
দুলাল ঠোঁট ভেজাতে চাইল, কিন্তু মুখ শুকনো| তার চোখ তখনও মানচিত্রের পাতায় আটকে|
“তুই কিছু লুকাচ্ছিস, তাই না?” লাবণী এবার আরেকটু নিচু গলায় বলল, “আমি ভালোভাবে চিনি তোর গলাটা| তোর কিছু একটা হয়েছে, আর সেটা কেমন অস্বাভাবিক|”
দুলাল তখনো চুপ|
লাবণী এবার জোরালো গলায় বলল, “তুই মুখ ফুটে কিছু না বললে আমি আজই চলে আসছি তোর বাসায়| আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কিন্তু এই যে তুই কেমন কেমন করছিস মনে হচ্ছে কেউ তোর ভিতরে ঢুকে বসে আছে|”
এই শব্দটাই যেন দুলালের গা কেঁপে উঠল “ভিতরে ঢুকে বসে আছে|”
ঠিক তো, সে নিজেও তো অনুভব করছে, নিজের শরীর আর নিজের মতো লাগছে না| কখনও ঘাড়ের পেছনে ভার, কখনও কানের পাশে শীতল নিঃশ্বাস|
সে অবশেষে মুখ খুলল|
“আমি একটা জায়গায় যাচ্ছি|”
লাবণীর কণ্ঠ থেমে গেল|
“কোথায়?”
দুলাল বলল না সঙ্গে সঙ্গে| তারপর ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল,
“অমৃতডাঙ্গা|”
“এটা আবার কোথায়?”
“আমি ঠিক জানি না| খাতায় পাওয়া এক পুরনো মানচিত্রে জায়গাটা ছিল| দাদীর কিছু লেখা ছিল ওখানে| আমার কিছু বোঝার দরকার|”
লাবণী এবার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“তুই ওখানে একা যাচ্ছিস?”
দুলাল কিছু বলল না| লাবণী নিজেই উত্তর দিয়ে ফেলল,
“না| আমি যাচ্ছি তোর সঙ্গে|”
“লাবণী, এটা খেলার মতো কিছু না|”
“আমি খেলছি না| কিন্তু তুই যা খেলছিস, সেটা একা খেলে শেষ করা যায় না|”
একটা মুহূর্তে দুজনেই চুপ| তারপর দুলাল ধীরে বলল,
“আজ সন্ধ্যার ট্রেনে উঠব| রাত ১১টার লোকাল ধরে কার্পাসডাঙ্গার দিকে নামব| ওখান থেকে ভ্যানে যেতে হয়| দাদীর চিঠিতে ছিল, ‘রাতের শেষ প্রহরে পৌঁছো|’
লাবণী ফিসফিস করে বলল,
“শেষ প্রহর সব সময় কিছু খুলে দেয়, আর কিছু বন্ধ করে দেয়|”
দুলাল কেবল বলল,
“এই ট্রিপটা স্বাভাবিক হবে না|”
লাবণী একটু হাসল,
“তুই কবে স্বাভাবিক ছিলি দুলাল মাহমুদ?”
ফোন কেটে গেল| কিন্তু বাতাসে যেন থেকে গেল শব্দ দুটি
“তোর সঙ্গে”
“শেষ প্রহর”|
ট্রেন ছাড়ার দশ মিনিট আগে প্ল্যাটফর্মটা ছিল আশ্চর্যভাবে নির্জন| রাত এগারোটার শেষ ট্রেন, কম লোক, কম শব্দ| মেঘলা আকাশের নিচে স্টেশনটার আলোও কেমন ঝিমধরা, রঙ ফ্যাকাসে| দুলাল বসেছিল জানালার পাশে| ট্রেনের জানালার কাচ অল্প ময়লা, মাঝে মাঝে ঘষা দেওয়া দাগ, ধাতব ফ্রেমের নিচে কিছু নাম খোদাই করা “মিতু + জামাল” আর “জীবন মানে ছায়া”| সে মনোযোগ দিয়ে তাকাল সেখানেই|
লাবণী ঠিক তার পাশেই| গলায় হুডির ফিতা ঝুলে আছে, ফোনে কিছু একটা টাইপ করছে|
“তুই মানচিত্র এনেছিস?”
লাবণী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, চোখ না তুলেই|
দুলাল মাথা নাড়ল, ব্যাগে ইশারা করল|
“আছে|”
“তোর খাতাটা?”
দুলাল থামল| তার চোখে একটা গাঢ় ভাব|
“ওটা সঙ্গে রাখলে ঘুম আসে না|”
লাবণী হালকা চোরা হেসে বলল,
“তাহলে ঠিকই জায়গায় যাচ্ছিস|”
ট্রেন হুইসেল দিল| চাকা ঘুরতে শুরু করল| ধীরে ধীরে তারা শহরের আলো পেছনে ফেলতে লাগল| সামনে শুধু অন্ধকার, মাঝে মাঝে ইটভাটার লালচে আলো, মাঠের মাঝে ভেসে থাকা আলোর বিন্দু| দুলাল জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল| কিন্তু সে হঠাৎ চমকে উঠল, তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়ামূর্তি| নারী, মাথা নিচু, ঘোমটা টানা| ঘাড় বাঁকা, যেন একপাশে হেলানো| তার শরীরটা ঝুলে আছে যেন বাতাসে, নিচের অর্ধেকটা কুয়াশায় গলে যাচ্ছে| দুলাল নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিল| কিন্তু লাবণী তখনও ফোনে টাইপ করছে|
“এই দ্যাখ, আমার গুগল ম্যাপে অমৃতডাঙ্গা বলে কিছুই নেই খালি একটা ফাঁকা জায়গা|”
লাবণী ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল| দুলাল ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল| ছবির স্ক্রিনের দিকে নয় লাবণীর চোখের দিকে| আর হঠাৎই মনে হলো সে যেন আরেকটা জগতে বসে আছে| এই কামরায় নয়, এই ট্রেনেও নয়| সে আবার জানালার দিকে তাকাল| এইবার ছায়াটা নেই| কিন্তু কাচে জমে থাকা শিশিরবিন্দু দিয়ে আঁকা হয়ে গেছে কিছু একটা একটি চক্র, যার মাঝখানে চোখ|
একই চিহ্ন|
সেই পুরনো প্রতীক|
লাবণী তখন দুলালের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই কেন ঘামছিস?”
দুলাল জানত না কী উত্তর দেবে| কারণ তার পেছনে বসে থাকা কিছু, হয়তো আরও কিছু, জানালার কাচে মাথা রেখে নিঃশ্বাস ফেলছে| আর সে জানে, এখন থেকে শুধু সে দেখবে না, তার ছায়ারাও দেখবে তাকে|
ট্রেন থেমেছিল মানিকহাটার এক ছোট্ট স্টেশনে, নামটা অদ্ভুতভাবে ঝাপসা, বোর্ডে রঙ উঠে গেছে|
ভোর সাড়ে চারটা| ঘন কুয়াশায় পুরো প্ল্যাটফর্মটা যেন হারিয়ে গিয়েছিল অন্য কোনো কাহিনির ভেতরে| দুলাল আর লাবণী একটা রিকশাভ্যানে উঠে পড়ল| ভ্যানচালক নাম বলতেই গা শিউরে উঠল|
“অমৃতডাঙ্গা? ওইদিকে তো কেউ যায় না ভাইজান| ঐ জায়গায় রাত কাটানো মানে বিপদ ডেকে আনার মতো|”
তার চোখ ছোট, মুখে কিছু জমে থাকা ভয়|
দুলাল কেবল বলল,
“আমার দাদির বাড়ি ছিল ওখানেই|”
চালক কিছু বলল না| শুধু মাথা নিচু করে বলল,
“দেখি পারি কি না| ওইদিক কুয়াশা খুব ঘন আজ|”
লাবণী ঠাণ্ডায় কাঁপছিল হালকা| তার হুডি টেনে মুখ ঢেকে রেখেছে, কেবল চোখ জোড়া বাইরে|
ঘণ্টাখানেক চলার পর, রাস্তা শেষ হয়ে গেল| কাঁচা মাটির পথ, দুই পাশে ধানক্ষেত, সবকিছুই কুয়াশায় ভেজা, নিঃশব্দ| সামনে অন্ধকারে উদ্ভাসিত হতে লাগল এক কাঠের ফ্রেম আর পাথরের গাঁথনি,
“নাগতলী”|
একটা বিশাল প্রবেশদ্বার পুরোনো, কালচে পাথরের ˆতরি, যার ওপরে খোদাই করা একটি মূর্তি| নারীমুখ, সাপের জিভ বের করা, চোখ দুটি ফাঁকা অন্তহীন ঘূর্ণি| দুপাশে দুটো পাথরের সাপ একটা মুখ খুলে, আরেকটা চোখ বন্ধ করে| আর ঠিক নিচে লেখা আছে লালচে হরফে
“তোমার রক্ত এখানে কাঁদে|”
দুলাল কিছু বলল না| তার গলার নিচের দাগটা একটু জ্বালাচ্ছিল, যেন গেটের কাছে এলেই জেগে ওঠে|
ভ্যানচালক পেছন ফিরে বলল,
“আমি আর সামনে যাব না ভাই| এখান থেইকা নিজের রাস্তা নিজেই বুঝে নেন|”
দুলাল মাথা নাড়ল| ভ্যানচালক চলে গেল| তারা দুজন পায়ে হেঁটে গেটের নিচ দিয়ে ঢুকল গ্রামে| ভেতরে প্রবেশ করতেই চারদিক নিস্তব্ধ| দুলাল তাকিয়ে রইল সামনের একটা বন্ধ মন্দিরের দিকে, যার ওপরে ভোরের রোদ পড়ছিল| পাথরের ওপরে লেখা ছিল:
“চন্দ্রতারার আশ্রয়|”

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
মাটির গন্ধটা আজ একটু ভিন্ন| শুকনো নয়, কাদামাটি মেশানো— যেমনটা দাদী বলতেন, “মৃতদেহের নিচে জমে থাকা জমিনের আলাদা ঘ্রাণ হয়|” দুলাল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, লোহার শানবাঁধানো কবরে সামনের কাদা হাতে ঘষছে, যেন কিছু শোধরানোর চেষ্টা করছে| কিন্তু দাদী তো আর ফিরে আসবে না| বাড়ি ফিরে ঘড়ির কাঁটা দুইটা পার করলেও দুলালের চোখে ঘুম নেই| শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মাথার ভেতরে যেন কারও কণ্ঠস্বর চলছিল| না, কণ্ঠস্বর না! ফিসফিস| আবার ফিসফিস নয়, চাপা হাঁসফাঁস| তার মনে হচ্ছিল শব্দগুলো বাইরের না, ভেতরের মাথার গভীরে কেউ যেন কাঁচ ভেঙে হাঁটছে, কানের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে|
“ইন্দ্র জ্যোতি, ইন্দ্র জ্যোতি”
সকালটা স্বাভাবিক ছিল না| ঘরের বারান্দায় পাখির ডানার শব্দ ছিল, কিন্তু তাদের ডাক শুনতে পাচ্ছিল না দুলাল শুধু শব্দের ছায়া| যেমন স্বপ্নে মানুষ কারো মুখ দেখে, কিন্তু আওয়াজ শুনতে পায় না| সে তখন খাতার শেষ কিছু পাতা উল্টে দেখছিল যেগুলো জুড়ে ছিল ফাঁকা স্থান, বাদামি কালি, মাঝে মাঝে অদ্ভুত ছোট ছোট আঁকিবুঁকি কোনো শিকড়, কখনো সাপ, কখনো হাতের তালুর রেখার মতো ঘূর্ণি| তার চোখ আটকে গেল এক পাতায়| খাতার বাঁধনের ঠিক নিচের ভাঁজে হাত দিলে সে টের পেল কিছু যেন চাপা দেওয়া আছে|
চোখে লাগানো ধুলোর মতো পুরোনো এক প্যাঁচানো কাগজ সে ধীরে ধীরে টেনে বের করল| এটা ছিল একটি মানচিত্র| একদম হাতে আঁকা, জীর্ণ কাগজে| কালো কালি ঝাপসা হয়ে গেছে কিছু অংশে, কিন্তু কয়েকটি স্থান, রেখা, এবং একটি নাম একেবারে স্পষ্ট—
“অমৃতডাঙ্গা”
একটা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত জায়গা মানচিত্রের এক কোনায়| তার নিচে লেখা:
“সেখানে ছিল তার দরজা,
এখন সেখানে তার শিকড়|”
দুলালের কপালের ঠিক মাঝখানে এক বিন্দু ঘাম জমে উঠল|
‘তার’ মানে কে?
চন্দ্রতারা?
না কি দাদী?
নাকি দুজনেই?
সে চোখ নামিয়ে খেয়াল করল, মানচিত্রের প্রান্তে আঁকা আছে একটা গোল কাঠামো নাগমুখ বিশিষ্ট মন্দিরের প্রতিরূপ| পাশে লেখা:
“নাগতলী”
আর নিচে রক্তমাখা অক্ষরে:
“যে রক্তে লেখা, তাকে খুঁজেই ফিরছে সে|”
দুলাল ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলে পড়ল| দেয়ালের ওপর তাকিয়ে ভাবল এই নাম তো সে আগে কখনো শোনেনি| কিন্তু শরীরের কোথাও যেন জায়গাটার ছায়া লেগে আছে, চিরকাল| হঠাৎ তার ফোন কাঁপতে শুরু করল টেবিলের কিনারে|
একবার, দুবার...
লাবণী|
তাকে এই অবস্থায় কিছু বলবে কি? এই খাতার কথা, এই মানচিত্র? দুলাল এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল| তারপর ফোনটা হাতে তুলে নিল| তবে সে জানে এই যাত্রা সে একা শুরু করলেও, একা শেষ হবে না|
“হ্যালো?”
লাবণীর গলা ফোনের ওপাশে ধোঁয়াটে লাগছিল| ঘুম ভেঙে উঠে কথা বলছে মনে হচ্ছিল, কিন্তু স্বরে ছিল এক ধরনের বিরক্তি, না বলা অভিযোগ| দুলাল চুপ করে রইল| কিছু বলল না|
“দুলাল, তুই ঠিক আছিস?”
লাবণী এবার একটু সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “গতকাল রাতে তুই হঠাৎ ডিসকানেক্ট করলি| কল ব্যাক করিসনি| আমিও বারবার ট্রাই করছিলাম|”
দুলাল ঠোঁট ভেজাতে চাইল, কিন্তু মুখ শুকনো| তার চোখ তখনও মানচিত্রের পাতায় আটকে|
“তুই কিছু লুকাচ্ছিস, তাই না?” লাবণী এবার আরেকটু নিচু গলায় বলল, “আমি ভালোভাবে চিনি তোর গলাটা| তোর কিছু একটা হয়েছে, আর সেটা কেমন অস্বাভাবিক|”
দুলাল তখনো চুপ|
লাবণী এবার জোরালো গলায় বলল, “তুই মুখ ফুটে কিছু না বললে আমি আজই চলে আসছি তোর বাসায়| আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কিন্তু এই যে তুই কেমন কেমন করছিস মনে হচ্ছে কেউ তোর ভিতরে ঢুকে বসে আছে|”
এই শব্দটাই যেন দুলালের গা কেঁপে উঠল “ভিতরে ঢুকে বসে আছে|”
ঠিক তো, সে নিজেও তো অনুভব করছে, নিজের শরীর আর নিজের মতো লাগছে না| কখনও ঘাড়ের পেছনে ভার, কখনও কানের পাশে শীতল নিঃশ্বাস|
সে অবশেষে মুখ খুলল|
“আমি একটা জায়গায় যাচ্ছি|”
লাবণীর কণ্ঠ থেমে গেল|
“কোথায়?”
দুলাল বলল না সঙ্গে সঙ্গে| তারপর ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল,
“অমৃতডাঙ্গা|”
“এটা আবার কোথায়?”
“আমি ঠিক জানি না| খাতায় পাওয়া এক পুরনো মানচিত্রে জায়গাটা ছিল| দাদীর কিছু লেখা ছিল ওখানে| আমার কিছু বোঝার দরকার|”
লাবণী এবার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“তুই ওখানে একা যাচ্ছিস?”
দুলাল কিছু বলল না| লাবণী নিজেই উত্তর দিয়ে ফেলল,
“না| আমি যাচ্ছি তোর সঙ্গে|”
“লাবণী, এটা খেলার মতো কিছু না|”
“আমি খেলছি না| কিন্তু তুই যা খেলছিস, সেটা একা খেলে শেষ করা যায় না|”
একটা মুহূর্তে দুজনেই চুপ| তারপর দুলাল ধীরে বলল,
“আজ সন্ধ্যার ট্রেনে উঠব| রাত ১১টার লোকাল ধরে কার্পাসডাঙ্গার দিকে নামব| ওখান থেকে ভ্যানে যেতে হয়| দাদীর চিঠিতে ছিল, ‘রাতের শেষ প্রহরে পৌঁছো|’
লাবণী ফিসফিস করে বলল,
“শেষ প্রহর সব সময় কিছু খুলে দেয়, আর কিছু বন্ধ করে দেয়|”
দুলাল কেবল বলল,
“এই ট্রিপটা স্বাভাবিক হবে না|”
লাবণী একটু হাসল,
“তুই কবে স্বাভাবিক ছিলি দুলাল মাহমুদ?”
ফোন কেটে গেল| কিন্তু বাতাসে যেন থেকে গেল শব্দ দুটি
“তোর সঙ্গে”
“শেষ প্রহর”|
ট্রেন ছাড়ার দশ মিনিট আগে প্ল্যাটফর্মটা ছিল আশ্চর্যভাবে নির্জন| রাত এগারোটার শেষ ট্রেন, কম লোক, কম শব্দ| মেঘলা আকাশের নিচে স্টেশনটার আলোও কেমন ঝিমধরা, রঙ ফ্যাকাসে| দুলাল বসেছিল জানালার পাশে| ট্রেনের জানালার কাচ অল্প ময়লা, মাঝে মাঝে ঘষা দেওয়া দাগ, ধাতব ফ্রেমের নিচে কিছু নাম খোদাই করা “মিতু + জামাল” আর “জীবন মানে ছায়া”| সে মনোযোগ দিয়ে তাকাল সেখানেই|
লাবণী ঠিক তার পাশেই| গলায় হুডির ফিতা ঝুলে আছে, ফোনে কিছু একটা টাইপ করছে|
“তুই মানচিত্র এনেছিস?”
লাবণী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, চোখ না তুলেই|
দুলাল মাথা নাড়ল, ব্যাগে ইশারা করল|
“আছে|”
“তোর খাতাটা?”
দুলাল থামল| তার চোখে একটা গাঢ় ভাব|
“ওটা সঙ্গে রাখলে ঘুম আসে না|”
লাবণী হালকা চোরা হেসে বলল,
“তাহলে ঠিকই জায়গায় যাচ্ছিস|”
ট্রেন হুইসেল দিল| চাকা ঘুরতে শুরু করল| ধীরে ধীরে তারা শহরের আলো পেছনে ফেলতে লাগল| সামনে শুধু অন্ধকার, মাঝে মাঝে ইটভাটার লালচে আলো, মাঠের মাঝে ভেসে থাকা আলোর বিন্দু| দুলাল জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল| কিন্তু সে হঠাৎ চমকে উঠল, তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়ামূর্তি| নারী, মাথা নিচু, ঘোমটা টানা| ঘাড় বাঁকা, যেন একপাশে হেলানো| তার শরীরটা ঝুলে আছে যেন বাতাসে, নিচের অর্ধেকটা কুয়াশায় গলে যাচ্ছে| দুলাল নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিল| কিন্তু লাবণী তখনও ফোনে টাইপ করছে|
“এই দ্যাখ, আমার গুগল ম্যাপে অমৃতডাঙ্গা বলে কিছুই নেই খালি একটা ফাঁকা জায়গা|”
লাবণী ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল| দুলাল ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল| ছবির স্ক্রিনের দিকে নয় লাবণীর চোখের দিকে| আর হঠাৎই মনে হলো সে যেন আরেকটা জগতে বসে আছে| এই কামরায় নয়, এই ট্রেনেও নয়| সে আবার জানালার দিকে তাকাল| এইবার ছায়াটা নেই| কিন্তু কাচে জমে থাকা শিশিরবিন্দু দিয়ে আঁকা হয়ে গেছে কিছু একটা একটি চক্র, যার মাঝখানে চোখ|
একই চিহ্ন|
সেই পুরনো প্রতীক|
লাবণী তখন দুলালের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই কেন ঘামছিস?”
দুলাল জানত না কী উত্তর দেবে| কারণ তার পেছনে বসে থাকা কিছু, হয়তো আরও কিছু, জানালার কাচে মাথা রেখে নিঃশ্বাস ফেলছে| আর সে জানে, এখন থেকে শুধু সে দেখবে না, তার ছায়ারাও দেখবে তাকে|
ট্রেন থেমেছিল মানিকহাটার এক ছোট্ট স্টেশনে, নামটা অদ্ভুতভাবে ঝাপসা, বোর্ডে রঙ উঠে গেছে|
ভোর সাড়ে চারটা| ঘন কুয়াশায় পুরো প্ল্যাটফর্মটা যেন হারিয়ে গিয়েছিল অন্য কোনো কাহিনির ভেতরে| দুলাল আর লাবণী একটা রিকশাভ্যানে উঠে পড়ল| ভ্যানচালক নাম বলতেই গা শিউরে উঠল|
“অমৃতডাঙ্গা? ওইদিকে তো কেউ যায় না ভাইজান| ঐ জায়গায় রাত কাটানো মানে বিপদ ডেকে আনার মতো|”
তার চোখ ছোট, মুখে কিছু জমে থাকা ভয়|
দুলাল কেবল বলল,
“আমার দাদির বাড়ি ছিল ওখানেই|”
চালক কিছু বলল না| শুধু মাথা নিচু করে বলল,
“দেখি পারি কি না| ওইদিক কুয়াশা খুব ঘন আজ|”
লাবণী ঠাণ্ডায় কাঁপছিল হালকা| তার হুডি টেনে মুখ ঢেকে রেখেছে, কেবল চোখ জোড়া বাইরে|
ঘণ্টাখানেক চলার পর, রাস্তা শেষ হয়ে গেল| কাঁচা মাটির পথ, দুই পাশে ধানক্ষেত, সবকিছুই কুয়াশায় ভেজা, নিঃশব্দ| সামনে অন্ধকারে উদ্ভাসিত হতে লাগল এক কাঠের ফ্রেম আর পাথরের গাঁথনি,
“নাগতলী”|
একটা বিশাল প্রবেশদ্বার পুরোনো, কালচে পাথরের ˆতরি, যার ওপরে খোদাই করা একটি মূর্তি| নারীমুখ, সাপের জিভ বের করা, চোখ দুটি ফাঁকা অন্তহীন ঘূর্ণি| দুপাশে দুটো পাথরের সাপ একটা মুখ খুলে, আরেকটা চোখ বন্ধ করে| আর ঠিক নিচে লেখা আছে লালচে হরফে
“তোমার রক্ত এখানে কাঁদে|”
দুলাল কিছু বলল না| তার গলার নিচের দাগটা একটু জ্বালাচ্ছিল, যেন গেটের কাছে এলেই জেগে ওঠে|
ভ্যানচালক পেছন ফিরে বলল,
“আমি আর সামনে যাব না ভাই| এখান থেইকা নিজের রাস্তা নিজেই বুঝে নেন|”
দুলাল মাথা নাড়ল| ভ্যানচালক চলে গেল| তারা দুজন পায়ে হেঁটে গেটের নিচ দিয়ে ঢুকল গ্রামে| ভেতরে প্রবেশ করতেই চারদিক নিস্তব্ধ| দুলাল তাকিয়ে রইল সামনের একটা বন্ধ মন্দিরের দিকে, যার ওপরে ভোরের রোদ পড়ছিল| পাথরের ওপরে লেখা ছিল:
“চন্দ্রতারার আশ্রয়|”

আপনার মতামত লিখুন