সংবাদ

ছোটগল্প

চন্দ্রতারা


গোপাল দাশ
গোপাল দাশ
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ১২:৩২ এএম

চন্দ্রতারা

মাটির গন্ধটা আজ একটু ভিন্ন| শুকনো নয়, কাদামাটি মেশানো— যেমনটা দাদী বলতেন, “মৃতদেহের নিচে জমে থাকা জমিনের আলাদা ঘ্রাণ হয়|” দুলাল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, লোহার শানবাঁধানো কবরে সামনের কাদা হাতে ঘষছে, যেন কিছু শোধরানোর চেষ্টা করছে| কিন্তু দাদী তো আর ফিরে আসবে না| বাড়ি ফিরে ঘড়ির কাঁটা দুইটা পার করলেও দুলালের চোখে ঘুম নেই| শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মাথার ভেতরে যেন কারও কণ্ঠস্বর চলছিল| না, কণ্ঠস্বর না! ফিসফিস| আবার  ফিসফিস নয়, চাপা হাঁসফাঁস| তার মনে হচ্ছিল শব্দগুলো বাইরের না, ভেতরের মাথার গভীরে কেউ যেন কাঁচ ভেঙে হাঁটছে, কানের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে|

“ইন্দ্র জ্যোতি, ইন্দ্র জ্যোতি”

সকালটা স্বাভাবিক ছিল না| ঘরের বারান্দায় পাখির ডানার শব্দ ছিল, কিন্তু তাদের ডাক শুনতে পাচ্ছিল না দুলাল শুধু শব্দের ছায়া| যেমন স্বপ্নে মানুষ কারো মুখ দেখে, কিন্তু আওয়াজ শুনতে পায় না| সে তখন খাতার শেষ কিছু পাতা উল্টে দেখছিল যেগুলো জুড়ে ছিল ফাঁকা স্থান, বাদামি কালি, মাঝে মাঝে অদ্ভুত ছোট ছোট আঁকিবুঁকি কোনো শিকড়, কখনো সাপ, কখনো হাতের তালুর রেখার মতো ঘূর্ণি| তার চোখ আটকে গেল এক পাতায়| খাতার বাঁধনের ঠিক নিচের ভাঁজে হাত দিলে সে টের পেল কিছু যেন চাপা দেওয়া আছে|

চোখে লাগানো ধুলোর মতো পুরোনো এক প্যাঁচানো কাগজ সে ধীরে ধীরে টেনে বের করল| এটা ছিল একটি মানচিত্র| একদম হাতে আঁকা, জীর্ণ কাগজে| কালো কালি ঝাপসা হয়ে গেছে কিছু অংশে, কিন্তু কয়েকটি স্থান, রেখা, এবং একটি নাম একেবারে স্পষ্ট— 

“অমৃতডাঙ্গা”

একটা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত জায়গা মানচিত্রের এক কোনায়| তার নিচে লেখা:

“সেখানে ছিল তার দরজা,

এখন সেখানে তার শিকড়|”

দুলালের কপালের ঠিক মাঝখানে এক বিন্দু ঘাম জমে উঠল|

‘তার’ মানে কে?

চন্দ্রতারা?

না কি দাদী?

নাকি দুজনেই?

সে চোখ নামিয়ে খেয়াল করল, মানচিত্রের প্রান্তে আঁকা আছে একটা গোল কাঠামো নাগমুখ বিশিষ্ট মন্দিরের প্রতিরূপ| পাশে লেখা:

“নাগতলী”

আর নিচে রক্তমাখা অক্ষরে:

“যে রক্তে লেখা, তাকে খুঁজেই ফিরছে সে|”

দুলাল ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলে পড়ল| দেয়ালের ওপর তাকিয়ে ভাবল এই নাম তো সে আগে কখনো শোনেনি| কিন্তু শরীরের কোথাও যেন জায়গাটার ছায়া লেগে আছে, চিরকাল| হঠাৎ তার ফোন কাঁপতে শুরু করল টেবিলের কিনারে|

একবার, দুবার...

লাবণী|

তাকে এই অবস্থায় কিছু বলবে কি? এই খাতার কথা, এই মানচিত্র? দুলাল এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল| তারপর ফোনটা হাতে তুলে নিল| তবে সে জানে এই যাত্রা সে একা শুরু করলেও, একা শেষ হবে না|

“হ্যালো?”

লাবণীর গলা ফোনের ওপাশে ধোঁয়াটে লাগছিল| ঘুম ভেঙে উঠে কথা বলছে মনে হচ্ছিল, কিন্তু স্বরে ছিল এক ধরনের বিরক্তি, না বলা অভিযোগ| দুলাল চুপ করে রইল| কিছু বলল না|

“দুলাল, তুই ঠিক আছিস?”

লাবণী এবার একটু সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “গতকাল রাতে তুই হঠাৎ ডিসকানেক্ট করলি| কল ব্যাক করিসনি| আমিও বারবার ট্রাই করছিলাম|”

দুলাল ঠোঁট ভেজাতে চাইল, কিন্তু মুখ শুকনো| তার চোখ তখনও মানচিত্রের পাতায় আটকে|

“তুই কিছু লুকাচ্ছিস, তাই না?” লাবণী এবার আরেকটু নিচু গলায় বলল, “আমি ভালোভাবে চিনি তোর গলাটা| তোর কিছু একটা হয়েছে, আর সেটা কেমন অস্বাভাবিক|”

দুলাল তখনো চুপ| 

লাবণী এবার জোরালো গলায় বলল, “তুই মুখ ফুটে কিছু না বললে আমি আজই চলে আসছি তোর বাসায়| আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কিন্তু এই যে তুই কেমন কেমন করছিস মনে হচ্ছে কেউ তোর ভিতরে ঢুকে বসে আছে|”

এই শব্দটাই যেন দুলালের গা কেঁপে উঠল “ভিতরে ঢুকে বসে আছে|”

ঠিক তো, সে নিজেও তো অনুভব করছে, নিজের শরীর আর নিজের মতো লাগছে না| কখনও ঘাড়ের পেছনে ভার, কখনও কানের পাশে শীতল নিঃশ্বাস|

সে অবশেষে মুখ খুলল|

“আমি একটা জায়গায় যাচ্ছি|”

লাবণীর কণ্ঠ থেমে গেল|

“কোথায়?”

দুলাল বলল না সঙ্গে সঙ্গে| তারপর ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল,

“অমৃতডাঙ্গা|”

“এটা আবার কোথায়?”

“আমি ঠিক জানি না| খাতায় পাওয়া এক পুরনো মানচিত্রে জায়গাটা ছিল| দাদীর কিছু লেখা ছিল ওখানে| আমার কিছু বোঝার দরকার|”

লাবণী এবার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“তুই ওখানে একা যাচ্ছিস?”

দুলাল কিছু বলল না| লাবণী নিজেই উত্তর দিয়ে ফেলল,

“না| আমি যাচ্ছি তোর সঙ্গে|”

“লাবণী, এটা খেলার মতো কিছু না|”

“আমি খেলছি না| কিন্তু তুই যা খেলছিস, সেটা একা খেলে শেষ করা যায় না|”

একটা মুহূর্তে দুজনেই চুপ| তারপর দুলাল ধীরে বলল,

“আজ সন্ধ্যার ট্রেনে উঠব| রাত ১১টার লোকাল ধরে কার্পাসডাঙ্গার দিকে নামব| ওখান থেকে ভ্যানে যেতে হয়| দাদীর চিঠিতে ছিল, ‘রাতের শেষ প্রহরে পৌঁছো|’

লাবণী ফিসফিস করে বলল,

“শেষ প্রহর সব সময় কিছু খুলে দেয়, আর কিছু বন্ধ করে দেয়|”

দুলাল কেবল বলল,

“এই ট্রিপটা স্বাভাবিক হবে না|”

লাবণী একটু হাসল,

“তুই কবে স্বাভাবিক ছিলি দুলাল মাহমুদ?”

ফোন কেটে গেল| কিন্তু বাতাসে যেন থেকে গেল শব্দ দুটি

“তোর সঙ্গে”

“শেষ প্রহর”|

ট্রেন ছাড়ার দশ মিনিট আগে প্ল্যাটফর্মটা ছিল আশ্চর্যভাবে নির্জন| রাত এগারোটার শেষ ট্রেন, কম লোক, কম শব্দ| মেঘলা আকাশের নিচে স্টেশনটার আলোও কেমন ঝিমধরা, রঙ ফ্যাকাসে| দুলাল বসেছিল জানালার পাশে| ট্রেনের জানালার কাচ অল্প ময়লা, মাঝে মাঝে ঘষা দেওয়া দাগ, ধাতব ফ্রেমের নিচে কিছু নাম খোদাই করা “মিতু + জামাল” আর “জীবন মানে ছায়া”| সে মনোযোগ দিয়ে তাকাল সেখানেই|

লাবণী ঠিক তার পাশেই| গলায় হুডির ফিতা ঝুলে আছে, ফোনে কিছু একটা টাইপ করছে|

“তুই মানচিত্র এনেছিস?”

লাবণী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, চোখ না তুলেই|

দুলাল মাথা নাড়ল, ব্যাগে ইশারা করল|

“আছে|”

“তোর খাতাটা?”

দুলাল থামল| তার চোখে একটা গাঢ় ভাব|

“ওটা সঙ্গে রাখলে ঘুম আসে না|”

লাবণী হালকা চোরা হেসে বলল,

“তাহলে ঠিকই জায়গায় যাচ্ছিস|”

ট্রেন হুইসেল দিল| চাকা ঘুরতে শুরু করল| ধীরে ধীরে তারা শহরের আলো পেছনে ফেলতে লাগল| সামনে শুধু অন্ধকার, মাঝে মাঝে ইটভাটার লালচে আলো, মাঠের মাঝে ভেসে থাকা আলোর বিন্দু| দুলাল জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল| কিন্তু সে হঠাৎ চমকে উঠল, তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়ামূর্তি| নারী, মাথা নিচু, ঘোমটা টানা| ঘাড় বাঁকা, যেন একপাশে হেলানো| তার শরীরটা ঝুলে আছে যেন বাতাসে, নিচের অর্ধেকটা কুয়াশায় গলে যাচ্ছে| দুলাল নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিল| কিন্তু লাবণী তখনও ফোনে টাইপ করছে|

“এই দ্যাখ, আমার গুগল ম্যাপে অমৃতডাঙ্গা বলে কিছুই নেই খালি একটা ফাঁকা জায়গা|”

লাবণী ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল| দুলাল ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল| ছবির স্ক্রিনের দিকে নয় লাবণীর চোখের দিকে| আর হঠাৎই মনে হলো সে যেন আরেকটা জগতে বসে আছে| এই কামরায় নয়, এই ট্রেনেও নয়| সে আবার জানালার দিকে তাকাল| এইবার ছায়াটা নেই| কিন্তু কাচে জমে থাকা শিশিরবিন্দু দিয়ে আঁকা হয়ে গেছে কিছু একটা একটি চক্র, যার মাঝখানে চোখ|

একই চিহ্ন|

সেই পুরনো প্রতীক|

লাবণী তখন দুলালের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুই কেন ঘামছিস?”

দুলাল জানত না কী উত্তর দেবে| কারণ তার পেছনে বসে থাকা কিছু, হয়তো আরও কিছু, জানালার কাচে মাথা রেখে নিঃশ্বাস ফেলছে| আর সে জানে, এখন থেকে শুধু সে দেখবে না, তার ছায়ারাও দেখবে তাকে|

ট্রেন থেমেছিল মানিকহাটার এক ছোট্ট স্টেশনে, নামটা অদ্ভুতভাবে ঝাপসা, বোর্ডে রঙ উঠে গেছে|

ভোর সাড়ে চারটা| ঘন কুয়াশায় পুরো প্ল্যাটফর্মটা যেন হারিয়ে গিয়েছিল অন্য কোনো কাহিনির ভেতরে| দুলাল আর লাবণী একটা রিকশাভ্যানে উঠে পড়ল| ভ্যানচালক নাম বলতেই গা শিউরে উঠল|

“অমৃতডাঙ্গা? ওইদিকে তো কেউ যায় না ভাইজান| ঐ জায়গায় রাত কাটানো মানে বিপদ ডেকে আনার মতো|”

তার চোখ ছোট, মুখে কিছু জমে থাকা ভয়|

দুলাল কেবল বলল,

“আমার দাদির বাড়ি ছিল ওখানেই|”

চালক কিছু বলল না| শুধু মাথা নিচু করে বলল,

“দেখি পারি কি না| ওইদিক কুয়াশা খুব ঘন আজ|”

লাবণী ঠাণ্ডায় কাঁপছিল হালকা| তার হুডি টেনে মুখ ঢেকে রেখেছে, কেবল চোখ জোড়া বাইরে|

ঘণ্টাখানেক চলার পর, রাস্তা শেষ হয়ে গেল| কাঁচা মাটির পথ, দুই পাশে ধানক্ষেত, সবকিছুই কুয়াশায় ভেজা, নিঃশব্দ| সামনে অন্ধকারে উদ্ভাসিত হতে লাগল এক কাঠের ফ্রেম আর পাথরের গাঁথনি,

“নাগতলী”|

একটা বিশাল প্রবেশদ্বার পুরোনো, কালচে পাথরের ˆতরি, যার ওপরে খোদাই করা একটি মূর্তি| নারীমুখ, সাপের জিভ বের করা, চোখ দুটি ফাঁকা অন্তহীন ঘূর্ণি| দুপাশে দুটো পাথরের সাপ একটা মুখ খুলে, আরেকটা চোখ বন্ধ করে| আর ঠিক নিচে লেখা আছে লালচে হরফে

“তোমার রক্ত এখানে কাঁদে|”

দুলাল কিছু বলল না| তার গলার নিচের দাগটা একটু জ্বালাচ্ছিল, যেন গেটের কাছে এলেই জেগে ওঠে|

ভ্যানচালক পেছন ফিরে বলল,

“আমি আর সামনে যাব না ভাই| এখান থেইকা নিজের রাস্তা নিজেই বুঝে নেন|”

দুলাল মাথা নাড়ল| ভ্যানচালক চলে গেল| তারা দুজন পায়ে হেঁটে গেটের নিচ দিয়ে ঢুকল গ্রামে| ভেতরে প্রবেশ করতেই চারদিক নিস্তব্ধ| দুলাল তাকিয়ে রইল সামনের একটা বন্ধ মন্দিরের দিকে, যার ওপরে ভোরের রোদ পড়ছিল| পাথরের ওপরে লেখা ছিল:

“চন্দ্রতারার আশ্রয়|” 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬


চন্দ্রতারা

প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬

featured Image

মাটির গন্ধটা আজ একটু ভিন্ন| শুকনো নয়, কাদামাটি মেশানো— যেমনটা দাদী বলতেন, “মৃতদেহের নিচে জমে থাকা জমিনের আলাদা ঘ্রাণ হয়|” দুলাল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, লোহার শানবাঁধানো কবরে সামনের কাদা হাতে ঘষছে, যেন কিছু শোধরানোর চেষ্টা করছে| কিন্তু দাদী তো আর ফিরে আসবে না| বাড়ি ফিরে ঘড়ির কাঁটা দুইটা পার করলেও দুলালের চোখে ঘুম নেই| শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মাথার ভেতরে যেন কারও কণ্ঠস্বর চলছিল| না, কণ্ঠস্বর না! ফিসফিস| আবার  ফিসফিস নয়, চাপা হাঁসফাঁস| তার মনে হচ্ছিল শব্দগুলো বাইরের না, ভেতরের মাথার গভীরে কেউ যেন কাঁচ ভেঙে হাঁটছে, কানের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে|

“ইন্দ্র জ্যোতি, ইন্দ্র জ্যোতি”

সকালটা স্বাভাবিক ছিল না| ঘরের বারান্দায় পাখির ডানার শব্দ ছিল, কিন্তু তাদের ডাক শুনতে পাচ্ছিল না দুলাল শুধু শব্দের ছায়া| যেমন স্বপ্নে মানুষ কারো মুখ দেখে, কিন্তু আওয়াজ শুনতে পায় না| সে তখন খাতার শেষ কিছু পাতা উল্টে দেখছিল যেগুলো জুড়ে ছিল ফাঁকা স্থান, বাদামি কালি, মাঝে মাঝে অদ্ভুত ছোট ছোট আঁকিবুঁকি কোনো শিকড়, কখনো সাপ, কখনো হাতের তালুর রেখার মতো ঘূর্ণি| তার চোখ আটকে গেল এক পাতায়| খাতার বাঁধনের ঠিক নিচের ভাঁজে হাত দিলে সে টের পেল কিছু যেন চাপা দেওয়া আছে|

চোখে লাগানো ধুলোর মতো পুরোনো এক প্যাঁচানো কাগজ সে ধীরে ধীরে টেনে বের করল| এটা ছিল একটি মানচিত্র| একদম হাতে আঁকা, জীর্ণ কাগজে| কালো কালি ঝাপসা হয়ে গেছে কিছু অংশে, কিন্তু কয়েকটি স্থান, রেখা, এবং একটি নাম একেবারে স্পষ্ট— 

“অমৃতডাঙ্গা”

একটা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত জায়গা মানচিত্রের এক কোনায়| তার নিচে লেখা:

“সেখানে ছিল তার দরজা,

এখন সেখানে তার শিকড়|”

দুলালের কপালের ঠিক মাঝখানে এক বিন্দু ঘাম জমে উঠল|

‘তার’ মানে কে?

চন্দ্রতারা?

না কি দাদী?

নাকি দুজনেই?

সে চোখ নামিয়ে খেয়াল করল, মানচিত্রের প্রান্তে আঁকা আছে একটা গোল কাঠামো নাগমুখ বিশিষ্ট মন্দিরের প্রতিরূপ| পাশে লেখা:

“নাগতলী”

আর নিচে রক্তমাখা অক্ষরে:

“যে রক্তে লেখা, তাকে খুঁজেই ফিরছে সে|”

দুলাল ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলে পড়ল| দেয়ালের ওপর তাকিয়ে ভাবল এই নাম তো সে আগে কখনো শোনেনি| কিন্তু শরীরের কোথাও যেন জায়গাটার ছায়া লেগে আছে, চিরকাল| হঠাৎ তার ফোন কাঁপতে শুরু করল টেবিলের কিনারে|

একবার, দুবার...

লাবণী|

তাকে এই অবস্থায় কিছু বলবে কি? এই খাতার কথা, এই মানচিত্র? দুলাল এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল| তারপর ফোনটা হাতে তুলে নিল| তবে সে জানে এই যাত্রা সে একা শুরু করলেও, একা শেষ হবে না|

“হ্যালো?”

লাবণীর গলা ফোনের ওপাশে ধোঁয়াটে লাগছিল| ঘুম ভেঙে উঠে কথা বলছে মনে হচ্ছিল, কিন্তু স্বরে ছিল এক ধরনের বিরক্তি, না বলা অভিযোগ| দুলাল চুপ করে রইল| কিছু বলল না|

“দুলাল, তুই ঠিক আছিস?”

লাবণী এবার একটু সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “গতকাল রাতে তুই হঠাৎ ডিসকানেক্ট করলি| কল ব্যাক করিসনি| আমিও বারবার ট্রাই করছিলাম|”

দুলাল ঠোঁট ভেজাতে চাইল, কিন্তু মুখ শুকনো| তার চোখ তখনও মানচিত্রের পাতায় আটকে|

“তুই কিছু লুকাচ্ছিস, তাই না?” লাবণী এবার আরেকটু নিচু গলায় বলল, “আমি ভালোভাবে চিনি তোর গলাটা| তোর কিছু একটা হয়েছে, আর সেটা কেমন অস্বাভাবিক|”

দুলাল তখনো চুপ| 

লাবণী এবার জোরালো গলায় বলল, “তুই মুখ ফুটে কিছু না বললে আমি আজই চলে আসছি তোর বাসায়| আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কিন্তু এই যে তুই কেমন কেমন করছিস মনে হচ্ছে কেউ তোর ভিতরে ঢুকে বসে আছে|”

এই শব্দটাই যেন দুলালের গা কেঁপে উঠল “ভিতরে ঢুকে বসে আছে|”

ঠিক তো, সে নিজেও তো অনুভব করছে, নিজের শরীর আর নিজের মতো লাগছে না| কখনও ঘাড়ের পেছনে ভার, কখনও কানের পাশে শীতল নিঃশ্বাস|

সে অবশেষে মুখ খুলল|

“আমি একটা জায়গায় যাচ্ছি|”

লাবণীর কণ্ঠ থেমে গেল|

“কোথায়?”

দুলাল বলল না সঙ্গে সঙ্গে| তারপর ধীরে ধীরে উচ্চারণ করল,

“অমৃতডাঙ্গা|”

“এটা আবার কোথায়?”

“আমি ঠিক জানি না| খাতায় পাওয়া এক পুরনো মানচিত্রে জায়গাটা ছিল| দাদীর কিছু লেখা ছিল ওখানে| আমার কিছু বোঝার দরকার|”

লাবণী এবার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“তুই ওখানে একা যাচ্ছিস?”

দুলাল কিছু বলল না| লাবণী নিজেই উত্তর দিয়ে ফেলল,

“না| আমি যাচ্ছি তোর সঙ্গে|”

“লাবণী, এটা খেলার মতো কিছু না|”

“আমি খেলছি না| কিন্তু তুই যা খেলছিস, সেটা একা খেলে শেষ করা যায় না|”

একটা মুহূর্তে দুজনেই চুপ| তারপর দুলাল ধীরে বলল,

“আজ সন্ধ্যার ট্রেনে উঠব| রাত ১১টার লোকাল ধরে কার্পাসডাঙ্গার দিকে নামব| ওখান থেকে ভ্যানে যেতে হয়| দাদীর চিঠিতে ছিল, ‘রাতের শেষ প্রহরে পৌঁছো|’

লাবণী ফিসফিস করে বলল,

“শেষ প্রহর সব সময় কিছু খুলে দেয়, আর কিছু বন্ধ করে দেয়|”

দুলাল কেবল বলল,

“এই ট্রিপটা স্বাভাবিক হবে না|”

লাবণী একটু হাসল,

“তুই কবে স্বাভাবিক ছিলি দুলাল মাহমুদ?”

ফোন কেটে গেল| কিন্তু বাতাসে যেন থেকে গেল শব্দ দুটি

“তোর সঙ্গে”

“শেষ প্রহর”|

ট্রেন ছাড়ার দশ মিনিট আগে প্ল্যাটফর্মটা ছিল আশ্চর্যভাবে নির্জন| রাত এগারোটার শেষ ট্রেন, কম লোক, কম শব্দ| মেঘলা আকাশের নিচে স্টেশনটার আলোও কেমন ঝিমধরা, রঙ ফ্যাকাসে| দুলাল বসেছিল জানালার পাশে| ট্রেনের জানালার কাচ অল্প ময়লা, মাঝে মাঝে ঘষা দেওয়া দাগ, ধাতব ফ্রেমের নিচে কিছু নাম খোদাই করা “মিতু + জামাল” আর “জীবন মানে ছায়া”| সে মনোযোগ দিয়ে তাকাল সেখানেই|

লাবণী ঠিক তার পাশেই| গলায় হুডির ফিতা ঝুলে আছে, ফোনে কিছু একটা টাইপ করছে|

“তুই মানচিত্র এনেছিস?”

লাবণী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, চোখ না তুলেই|

দুলাল মাথা নাড়ল, ব্যাগে ইশারা করল|

“আছে|”

“তোর খাতাটা?”

দুলাল থামল| তার চোখে একটা গাঢ় ভাব|

“ওটা সঙ্গে রাখলে ঘুম আসে না|”

লাবণী হালকা চোরা হেসে বলল,

“তাহলে ঠিকই জায়গায় যাচ্ছিস|”

ট্রেন হুইসেল দিল| চাকা ঘুরতে শুরু করল| ধীরে ধীরে তারা শহরের আলো পেছনে ফেলতে লাগল| সামনে শুধু অন্ধকার, মাঝে মাঝে ইটভাটার লালচে আলো, মাঠের মাঝে ভেসে থাকা আলোর বিন্দু| দুলাল জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল| কিন্তু সে হঠাৎ চমকে উঠল, তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে এক ছায়ামূর্তি| নারী, মাথা নিচু, ঘোমটা টানা| ঘাড় বাঁকা, যেন একপাশে হেলানো| তার শরীরটা ঝুলে আছে যেন বাতাসে, নিচের অর্ধেকটা কুয়াশায় গলে যাচ্ছে| দুলাল নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিল| কিন্তু লাবণী তখনও ফোনে টাইপ করছে|

“এই দ্যাখ, আমার গুগল ম্যাপে অমৃতডাঙ্গা বলে কিছুই নেই খালি একটা ফাঁকা জায়গা|”

লাবণী ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল| দুলাল ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল| ছবির স্ক্রিনের দিকে নয় লাবণীর চোখের দিকে| আর হঠাৎই মনে হলো সে যেন আরেকটা জগতে বসে আছে| এই কামরায় নয়, এই ট্রেনেও নয়| সে আবার জানালার দিকে তাকাল| এইবার ছায়াটা নেই| কিন্তু কাচে জমে থাকা শিশিরবিন্দু দিয়ে আঁকা হয়ে গেছে কিছু একটা একটি চক্র, যার মাঝখানে চোখ|

একই চিহ্ন|

সেই পুরনো প্রতীক|

লাবণী তখন দুলালের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুই কেন ঘামছিস?”

দুলাল জানত না কী উত্তর দেবে| কারণ তার পেছনে বসে থাকা কিছু, হয়তো আরও কিছু, জানালার কাচে মাথা রেখে নিঃশ্বাস ফেলছে| আর সে জানে, এখন থেকে শুধু সে দেখবে না, তার ছায়ারাও দেখবে তাকে|

ট্রেন থেমেছিল মানিকহাটার এক ছোট্ট স্টেশনে, নামটা অদ্ভুতভাবে ঝাপসা, বোর্ডে রঙ উঠে গেছে|

ভোর সাড়ে চারটা| ঘন কুয়াশায় পুরো প্ল্যাটফর্মটা যেন হারিয়ে গিয়েছিল অন্য কোনো কাহিনির ভেতরে| দুলাল আর লাবণী একটা রিকশাভ্যানে উঠে পড়ল| ভ্যানচালক নাম বলতেই গা শিউরে উঠল|

“অমৃতডাঙ্গা? ওইদিকে তো কেউ যায় না ভাইজান| ঐ জায়গায় রাত কাটানো মানে বিপদ ডেকে আনার মতো|”

তার চোখ ছোট, মুখে কিছু জমে থাকা ভয়|

দুলাল কেবল বলল,

“আমার দাদির বাড়ি ছিল ওখানেই|”

চালক কিছু বলল না| শুধু মাথা নিচু করে বলল,

“দেখি পারি কি না| ওইদিক কুয়াশা খুব ঘন আজ|”

লাবণী ঠাণ্ডায় কাঁপছিল হালকা| তার হুডি টেনে মুখ ঢেকে রেখেছে, কেবল চোখ জোড়া বাইরে|

ঘণ্টাখানেক চলার পর, রাস্তা শেষ হয়ে গেল| কাঁচা মাটির পথ, দুই পাশে ধানক্ষেত, সবকিছুই কুয়াশায় ভেজা, নিঃশব্দ| সামনে অন্ধকারে উদ্ভাসিত হতে লাগল এক কাঠের ফ্রেম আর পাথরের গাঁথনি,

“নাগতলী”|

একটা বিশাল প্রবেশদ্বার পুরোনো, কালচে পাথরের ˆতরি, যার ওপরে খোদাই করা একটি মূর্তি| নারীমুখ, সাপের জিভ বের করা, চোখ দুটি ফাঁকা অন্তহীন ঘূর্ণি| দুপাশে দুটো পাথরের সাপ একটা মুখ খুলে, আরেকটা চোখ বন্ধ করে| আর ঠিক নিচে লেখা আছে লালচে হরফে

“তোমার রক্ত এখানে কাঁদে|”

দুলাল কিছু বলল না| তার গলার নিচের দাগটা একটু জ্বালাচ্ছিল, যেন গেটের কাছে এলেই জেগে ওঠে|

ভ্যানচালক পেছন ফিরে বলল,

“আমি আর সামনে যাব না ভাই| এখান থেইকা নিজের রাস্তা নিজেই বুঝে নেন|”

দুলাল মাথা নাড়ল| ভ্যানচালক চলে গেল| তারা দুজন পায়ে হেঁটে গেটের নিচ দিয়ে ঢুকল গ্রামে| ভেতরে প্রবেশ করতেই চারদিক নিস্তব্ধ| দুলাল তাকিয়ে রইল সামনের একটা বন্ধ মন্দিরের দিকে, যার ওপরে ভোরের রোদ পড়ছিল| পাথরের ওপরে লেখা ছিল:

“চন্দ্রতারার আশ্রয়|” 



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত