ভঙ্গুর সার্বিক অর্থনীতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের সংকটের সময় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেছে সরকার। এই বাজেটে মেগা প্রকল্পের চাকচিক্য পরিহার করে সাধারণ মানুষের স্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মাধ্যমে ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর চ্যালেঞ্জিং রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’ দর্শনে সাজানো এই মহাপরিকল্পনা দেখতে জনমুখী ও কল্যাণমুখী হলেও এর বাস্তবায়নের পথ খুব সহজ নয়। রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, পাহাড়সম খেলাপি ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদের বোঝা মাথায় নিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় এই বাজেট ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। এবারের বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাজেটের মূল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শন হলো ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ বা গোষ্ঠী পুরো অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত এবং লুটপাট চালাত। সেই ধারা ভেঙে সাধারণ সব মানুষের জন্য জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন এবং ন্যায্য সুযোগের অর্থনীতি গড়ে তোলাই সরকারের উদ্দেশ্য। সরকার বড় বড় জাঁকজমকপূর্ণ মেগা-প্রকল্পের মোহে না পড়ে মানুষের মৌলিক অধিকার, দৈনন্দিন স্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি গুণগত সংস্কারের দিকে নজর দিয়েছে।’
বাজেটে ১০টি অগ্রাধিকার উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এই পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সাথে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও অর্জন করবে। সেই লক্ষ্যের আলোকে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এ জন্য সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছে।’
অগ্রাধিকারগুলোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সবার জন্য উন্নয়ন, সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজিকৃত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ, প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
এই অগ্রাধিকারগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে তা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতির বড় অংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মেটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে নেওয়া হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই ঋণ ব্যাংক খাতের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, ‘চলতি বছর ব্যাংক খাত থেকে সরকার বেশি ঋণ নেওয়ার কারণে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। আগামী বছরও এখান থেকে ঋণ নিলে একই সংকট দেখা দিবে।’ এতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে যাবে বলে মনে করে তারা।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা করেছে সেটাতে থামতে পারবে না, আরও বেশি ঋণ ব্যাংক খাত থেকে নিবে। সেহেতু বলা যায়, সরকারের এই ঋণের কারণে ব্যাংক খাত চাপে পড়বে। কারণ, ব্যক্তি খাতে ঋণ এখন ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকার যত বেশি ঋণ ব্যাংক থেকে নিবে তত বেশি ব্যক্তি খাত চাপে পড়বে। এটা অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। আবার বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ আসারও ইতিবাচক লক্ষণ নেই।’
বাজেটে ব্যয়ের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব হলো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ৩ লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি এবং পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বাজেটে ক্রমান্বয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ (সংশোধিত) ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয় চলতি অর্থবছরের ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাজেট বক্তব্যে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সায় দিয়ে নবম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবত একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সহায়তার জন্য নতুন বেতন কাঠামো তথা নবম জাতীয় পে স্কেল আগামী ১ জুলাই (২০২৬) হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।’
অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর এটি নিশ্চিত যে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী মাস থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে। তাহলে এই খাতে ব্যয় বাড়বে। আর সেই বাড়তি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আহরণ করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাত ও তৃণমূলের মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা মোট বরাদ্দের ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা যা মোট বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। সামাজিক খাতের এই বর্ধিত ও সর্বোচ্চ ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিফলন বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব আছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এমনিতেই দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও প্রশাসনিক নানা জটিল সংকটে জর্জরিত। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দুর্বলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে সনাতনী কর আদায় পদ্ধতি, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির অভাব, ব্যাপক কর ফাঁকি এবং করদাতার সীমিত সংখ্যা। এমন একটি সংস্কারমুখী ও ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে এনবিআরের ওপর ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে আরও ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য হবে এক অগ্নিপরীক্ষা।
মূলধারা ছাড়াও বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি চাঙ্গা করা হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং ব্লু ইকোনোমির মত খাতগুলোকে আমরা জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চাই।’
বিনিয়োগ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এবং বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ও বাস্তবায়নে আমরা নীতিগতভাবে প্রধান বিবেচনায় রাখছি, ভ্যালু ফর মানি অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট অর্থাৎ জনগণের সম্পদ যেসকল প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার কার্যকর অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি অর্থাৎ সরকারের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা এবং পরিবেশগত বিবেচনা অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি।’
একইভাবে করের আওতা সম্প্রসারণের জন্য এবারের বাজেটে খুচরা ব্যবসায়ীদের এই প্রথম করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে দেশের লাখ লাখ খুচরা ব্যবসায়ীর ওপর করের বোঝা চাপতে পারে। পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজেট প্রস্তাবে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপে কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য করের হার বৃদ্ধি নয়; বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ। এই উদ্দেশ্যে কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। করভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহে দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব করছি। সংগৃহীত এই অগ্রিম করের পরিমাণ হবে অতি নগণ্য, প্রতি ১ হাজার টাকায় মাত্র ২ টাকা।
এবারের বাজেটের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হলো, যেকোনো ব্যক্তি ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দেখাতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেমন, শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব নেওয়ার সময় এই টিআইএন সনদ দেখাতে হবে না। আবার নো ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট যেমন, ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব, সরকারি ভাতা সুবিধা নেওয়ার জন্য যত হিসাবসহ পেনশনভোগীদের হিসাবের ক্ষেত্রে টিআইএন দেখানোয় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দেশে ১৭ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাব আছে। নতুন করে যারা হিসাব খুলবেন তাদের ওপর টিআইএন খোলার খড়গ নামতে পারে। মূলত করের জাল বাড়ানোর জন্য এই উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এতে প্রান্তিক পযায়ের নাগরিকদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই বাজেট বাস্তবায়নে সরকার চ্যালেঞ্জে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরতা এবং বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা ভবিষ্যতে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বাজেটের মূল সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানবিক অর্থনীতি গড়ার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে, সেজন্য বিভিন্ন বরাদ্দ উল্লেখ আছে। যুব সমাজ, পিছিয়ে পড়া মানুষ, এদের কথাও একই সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সরকার অর্থনৈতিক নীতি কাঠামোকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে আর্থিক কাঠামো সেটা অত্যন্ত দুর্বল। আর্থিক কাঠামো যেটা করা হয়েছে তার ভেতরে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক বিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা দেশে এখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সক্ষমতা নিয়ে এই বিশাল বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে। তাই শুধু বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, এগুলো কতখানি এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটাই এখন মূল বিষয়।’

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
ভঙ্গুর সার্বিক অর্থনীতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের সংকটের সময় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেছে সরকার। এই বাজেটে মেগা প্রকল্পের চাকচিক্য পরিহার করে সাধারণ মানুষের স্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মাধ্যমে ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর চ্যালেঞ্জিং রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ’ দর্শনে সাজানো এই মহাপরিকল্পনা দেখতে জনমুখী ও কল্যাণমুখী হলেও এর বাস্তবায়নের পথ খুব সহজ নয়। রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, পাহাড়সম খেলাপি ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদের বোঝা মাথায় নিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরের তুলনায় এই বাজেট ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। এবারের বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাজেটের মূল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শন হলো ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ বা গোষ্ঠী পুরো অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত এবং লুটপাট চালাত। সেই ধারা ভেঙে সাধারণ সব মানুষের জন্য জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন এবং ন্যায্য সুযোগের অর্থনীতি গড়ে তোলাই সরকারের উদ্দেশ্য। সরকার বড় বড় জাঁকজমকপূর্ণ মেগা-প্রকল্পের মোহে না পড়ে মানুষের মৌলিক অধিকার, দৈনন্দিন স্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি গুণগত সংস্কারের দিকে নজর দিয়েছে।’
বাজেটে ১০টি অগ্রাধিকার উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, এই পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একই সাথে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও অর্জন করবে। সেই লক্ষ্যের আলোকে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এ জন্য সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছে।’
অগ্রাধিকারগুলোর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সবার জন্য উন্নয়ন, সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ-নির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজিকৃত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ, প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।
এই অগ্রাধিকারগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনাও উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে তা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতির বড় অংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মেটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে নেওয়া হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে যা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আগামী অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই ঋণ ব্যাংক খাতের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, ‘চলতি বছর ব্যাংক খাত থেকে সরকার বেশি ঋণ নেওয়ার কারণে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। আগামী বছরও এখান থেকে ঋণ নিলে একই সংকট দেখা দিবে।’ এতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমে যাবে বলে মনে করে তারা।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদকে বলেন, ‘সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা করেছে সেটাতে থামতে পারবে না, আরও বেশি ঋণ ব্যাংক খাত থেকে নিবে। সেহেতু বলা যায়, সরকারের এই ঋণের কারণে ব্যাংক খাত চাপে পড়বে। কারণ, ব্যক্তি খাতে ঋণ এখন ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকার যত বেশি ঋণ ব্যাংক থেকে নিবে তত বেশি ব্যক্তি খাত চাপে পড়বে। এটা অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। আবার বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ আসারও ইতিবাচক লক্ষণ নেই।’
বাজেটে ব্যয়ের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব হলো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ৩ লাখ কোটি টাকাসহ মোট উন্নয়ন ব্যয় ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি এবং পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে।
বাজেটে ক্রমান্বয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সে লক্ষ্যে মোট উন্নয়ন ব্যয় চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ (সংশোধিত) ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশে উন্নীত করার এবং পরিচালন ব্যয় চলতি অর্থবছরের ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাজেট বক্তব্যে সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সায় দিয়ে নবম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবত একই বেতন কাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সহায়তার জন্য নতুন বেতন কাঠামো তথা নবম জাতীয় পে স্কেল আগামী ১ জুলাই (২০২৬) হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।’
অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর এটি নিশ্চিত যে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী মাস থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে। তাহলে এই খাতে ব্যয় বাড়বে। আর সেই বাড়তি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আহরণ করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাত ও তৃণমূলের মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে মোট ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা মোট বরাদ্দের ২৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ভৌত অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা যা মোট বরাদ্দের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। সামাজিক খাতের এই বর্ধিত ও সর্বোচ্চ ব্যয় প্রস্তাব সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিফলন বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব আছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এমনিতেই দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও প্রশাসনিক নানা জটিল সংকটে জর্জরিত। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দুর্বলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে সনাতনী কর আদায় পদ্ধতি, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির অভাব, ব্যাপক কর ফাঁকি এবং করদাতার সীমিত সংখ্যা। এমন একটি সংস্কারমুখী ও ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে এনবিআরের ওপর ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে আরও ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য হবে এক অগ্নিপরীক্ষা।
মূলধারা ছাড়াও বিচ্ছিন্ন অর্থনীতি চাঙ্গা করা হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ক্রীড়া অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি এবং ব্লু ইকোনোমির মত খাতগুলোকে আমরা জাতীয় অর্থনীতির একেবারে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চাই।’
বিনিয়োগ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এবং বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণে ও বাস্তবায়নে আমরা নীতিগতভাবে প্রধান বিবেচনায় রাখছি, ভ্যালু ফর মানি অর্থাৎ সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট অর্থাৎ জনগণের সম্পদ যেসকল প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার কার্যকর অর্থনৈতিক সুফল মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি অর্থাৎ সরকারের বিনিয়োগের সুনির্দিষ্টভাবে কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা এবং পরিবেশগত বিবেচনা অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ সুরক্ষার দিকে সজাগ দৃষ্টি।’
একইভাবে করের আওতা সম্প্রসারণের জন্য এবারের বাজেটে খুচরা ব্যবসায়ীদের এই প্রথম করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে দেশের লাখ লাখ খুচরা ব্যবসায়ীর ওপর করের বোঝা চাপতে পারে। পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা।
বাজেট প্রস্তাবে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপে কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য করের হার বৃদ্ধি নয়; বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ। এই উদ্দেশ্যে কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। করভিত্তি সম্প্রসারণের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহে দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর সংগ্রহের প্রস্তাব করছি। সংগৃহীত এই অগ্রিম করের পরিমাণ হবে অতি নগণ্য, প্রতি ১ হাজার টাকায় মাত্র ২ টাকা।
এবারের বাজেটের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হলো, যেকোনো ব্যক্তি ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দেখাতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেমন, শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব নেওয়ার সময় এই টিআইএন সনদ দেখাতে হবে না। আবার নো ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট যেমন, ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব, সরকারি ভাতা সুবিধা নেওয়ার জন্য যত হিসাবসহ পেনশনভোগীদের হিসাবের ক্ষেত্রে টিআইএন দেখানোয় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দেশে ১৭ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাব আছে। নতুন করে যারা হিসাব খুলবেন তাদের ওপর টিআইএন খোলার খড়গ নামতে পারে। মূলত করের জাল বাড়ানোর জন্য এই উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এতে প্রান্তিক পযায়ের নাগরিকদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই বাজেট বাস্তবায়নে সরকার চ্যালেঞ্জে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরতা এবং বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা ভবিষ্যতে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বাজেটের মূল সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানবিক অর্থনীতি গড়ার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে, সেজন্য বিভিন্ন বরাদ্দ উল্লেখ আছে। যুব সমাজ, পিছিয়ে পড়া মানুষ, এদের কথাও একই সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সরকার অর্থনৈতিক নীতি কাঠামোকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে আর্থিক কাঠামো সেটা অত্যন্ত দুর্বল। আর্থিক কাঠামো যেটা করা হয়েছে তার ভেতরে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক বিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা দেশে এখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা আমাদের দেশে এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সক্ষমতা নিয়ে এই বিশাল বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে। তাই শুধু বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, এগুলো কতখানি এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটাই এখন মূল বিষয়।’

আপনার মতামত লিখুন