২০০১ সালের ১৬ জুন। বিকেলের আলো সবে ম্লান হতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে চলছিল দলীয় সভা। নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে রাজনৈতিক আলোচনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই নেমে আসে ভয়াবহ এক বিভীষিকা।
হঠাৎ একের পর এক বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া, আতঙ্ক আর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী। কয়েক মিনিটের সেই তাণ্ডবে প্রাণ হারান অন্তত ২০ জন। আহত হন তৎকালীন সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক মানুষ।
ঘটনার এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি বহুল আলোচিত সেই বোমা হামলা মামলার বিচার। দীর্ঘ তদন্ত, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, রাজনৈতিক পালাবদল এবং বিচারিক জটিলতায় এখনও ঝুলে আছে মামলাটি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন রায় ঘোষণা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) একেএম ওমর ফারুক নয়ন জানান, সম্পূরক অভিযোগপত্রের পূর্ণাঙ্গ মূল কপি আদালতে দাখিল না করায় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছে। পুনরায় তার সাক্ষ্য গ্রহণের পর মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগোবে।
বোমা হামলার পর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। মামলায় বিএনপির ২৭ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার এবং মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত হাশেম শকু।
তবে ২০০৩ সালে তদন্ত শেষে পুলিশ জানায়, এজাহারে নাম থাকা কেউই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি।
এরপর হামলায় নিহত চা-দোকানি হালিমা বেগমের ছেলে আবুল কালাম বাদী হয়ে একটি পাল্টা মামলা করেন। সেই মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান, তার ভাই নাসিম ওসমান ও সেলিম ওসমানসহ ৫৮ জনকে আসামি করা হয়। পরে উচ্চ আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আদালতের নির্দেশে মামলাটির পুনঃতদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চার বছর তদন্ত শেষে ২০১৩ সালে দুটি মামলায় মোট ৯৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয় এবং ৩১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, জঙ্গি নেতা ওবায়দুল্লাহ রহমান, তার ভাই আনিসুল মোরসালিন, মুহিবুল মুত্তাকিন, শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল এবং বিএনপি নেতা শওকত হাশেম শকু।
মামলার অন্যতম সাক্ষী এবং হামলায় আহত তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ২০২০ সালে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে অভিযোগপত্র নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। আদালতে তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে এমন অনেকের নাম রয়েছে যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, আবার প্রকৃত অপরাধীদের নাম বাদ পড়েছে। পরে সাংবাদিকদের কাছেও একই ধরনের বক্তব্য দেন তিনি। এমনকি তিনি প্রকাশ্যে বলেন, তৈমুর আলম খন্দকার ও শওকত হাশেম শকুর সম্পৃক্ততা নিয়েও তার সন্দেহ রয়েছে। এই বক্তব্য মামলাটিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে।
সেদিনের হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা সাইদুল হাসান বাপ্পী, তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস আকতার হোসেন, সংগীতশিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু ও নজরুল ইসলাম বাচ্চু, আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, এবিএম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, চা-দোকানি হালিমা বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, রাজিয়া বেগম, আব্দুস সাত্তার, এনায়েতউল্লাহ স্বপন ও স্বপন রায়সহ ২০ জন।
আহতদের মধ্যে ছিলেন শামীম ওসমান, আওয়ামী লীগ নেতা চন্দন শীল এবং যুবলীগ কর্মী রতন দাস। গুরুতর আহত হয়ে চন্দন শীল ও রতন দাস স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের হওয়া দুটি মামলায় এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তার পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের পর মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে নতুন করে রায়ের দিন নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে।
এদিকে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে চলে যান। মামলার সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারের কয়েকজন সদস্যও এখন প্রকাশ্যে নেই।
অন্যদিকে, এই মামলার অন্যতম সাক্ষী শামীম ওসমান বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সশস্ত্র হামলার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার নামও আলোচনায় রয়েছে।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
২০০১ সালের ১৬ জুন। বিকেলের আলো সবে ম্লান হতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে চলছিল দলীয় সভা। নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে রাজনৈতিক আলোচনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই নেমে আসে ভয়াবহ এক বিভীষিকা।
হঠাৎ একের পর এক বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া, আতঙ্ক আর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী। কয়েক মিনিটের সেই তাণ্ডবে প্রাণ হারান অন্তত ২০ জন। আহত হন তৎকালীন সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানসহ অর্ধশতাধিক মানুষ।
ঘটনার এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি বহুল আলোচিত সেই বোমা হামলা মামলার বিচার। দীর্ঘ তদন্ত, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, রাজনৈতিক পালাবদল এবং বিচারিক জটিলতায় এখনও ঝুলে আছে মামলাটি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন রায় ঘোষণা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) একেএম ওমর ফারুক নয়ন জানান, সম্পূরক অভিযোগপত্রের পূর্ণাঙ্গ মূল কপি আদালতে দাখিল না করায় তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছে। পুনরায় তার সাক্ষ্য গ্রহণের পর মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এগোবে।
বোমা হামলার পর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। মামলায় বিএনপির ২৭ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার এবং মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত হাশেম শকু।
তবে ২০০৩ সালে তদন্ত শেষে পুলিশ জানায়, এজাহারে নাম থাকা কেউই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল বিএনপি।
এরপর হামলায় নিহত চা-দোকানি হালিমা বেগমের ছেলে আবুল কালাম বাদী হয়ে একটি পাল্টা মামলা করেন। সেই মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান, তার ভাই নাসিম ওসমান ও সেলিম ওসমানসহ ৫৮ জনকে আসামি করা হয়। পরে উচ্চ আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আদালতের নির্দেশে মামলাটির পুনঃতদন্ত শুরু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চার বছর তদন্ত শেষে ২০১৩ সালে দুটি মামলায় মোট ৯৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয় এবং ৩১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুল হান্নান, জঙ্গি নেতা ওবায়দুল্লাহ রহমান, তার ভাই আনিসুল মোরসালিন, মুহিবুল মুত্তাকিন, শাহাদাত উল্লাহ জুয়েল এবং বিএনপি নেতা শওকত হাশেম শকু।
মামলার অন্যতম সাক্ষী এবং হামলায় আহত তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ২০২০ সালে আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে অভিযোগপত্র নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। আদালতে তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে এমন অনেকের নাম রয়েছে যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন, আবার প্রকৃত অপরাধীদের নাম বাদ পড়েছে। পরে সাংবাদিকদের কাছেও একই ধরনের বক্তব্য দেন তিনি। এমনকি তিনি প্রকাশ্যে বলেন, তৈমুর আলম খন্দকার ও শওকত হাশেম শকুর সম্পৃক্ততা নিয়েও তার সন্দেহ রয়েছে। এই বক্তব্য মামলাটিকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে।
সেদিনের হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা সাইদুল হাসান বাপ্পী, তোলারাম কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস আকতার হোসেন, সংগীতশিল্পী মোশাররফ হোসেন মশু ও নজরুল ইসলাম বাচ্চু, আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন ভাসানী, এবিএম নজরুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাইদুর রহমান সবুজ, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পলি বেগম, কবি শওকত হোসেন মোক্তার, চা-দোকানি হালিমা বেগম, যুবলীগ কর্মী নিধু রাম বিশ্বাস, রাজিয়া বেগম, আব্দুস সাত্তার, এনায়েতউল্লাহ স্বপন ও স্বপন রায়সহ ২০ জন।
আহতদের মধ্যে ছিলেন শামীম ওসমান, আওয়ামী লীগ নেতা চন্দন শীল এবং যুবলীগ কর্মী রতন দাস। গুরুতর আহত হয়ে চন্দন শীল ও রতন দাস স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের হওয়া দুটি মামলায় এখন পর্যন্ত ৩৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তার পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণের পর মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করে নতুন করে রায়ের দিন নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে।
এদিকে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে চলে যান। মামলার সাক্ষী ও ভুক্তভোগী পরিবারের কয়েকজন সদস্যও এখন প্রকাশ্যে নেই।
অন্যদিকে, এই মামলার অন্যতম সাক্ষী শামীম ওসমান বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সশস্ত্র হামলার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার নামও আলোচনায় রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন