পদ্মা সেতু চালুর পর বরিশাল অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে ওঠে একটি ইপিজেড স্থাপন। একই সঙ্গে ছয় লেন মহাসড়ক, ভোলা থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে লাহারহাট সেতু নির্মাণের দাবিও জোরালো হয়। ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পর শিল্পায়ন ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
বরিশালে ইপিজেড স্থাপনের দাবি নতুন নয়। ২০২২ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বরিশালে ইপিজেড নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সে সময় বরিশালের লাকুটিয়া ও তালতলী এলাকায় সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করে জমি উন্নয়ন ও ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি।
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হলো কৃষি, মৎস্য ও নদীনির্ভর অর্থনীতি। দেশের সর্বাধিক ইলিশ উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বরিশাল থেকে ইতোমধ্যে ইলিশ, আমড়া, পেয়ারাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া এ অঞ্চলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, পোশাকশিল্প ও কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত শিল্প অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সুবিধার অভাবে সেই সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরে অপূর্ণ রয়ে গেছে।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ওবায়দুল হক চান বলেন, “ইপিজেড হলে কর ও শুল্ক সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। বরিশাল থেকে ইলিশ, আমড়া ও পেয়ারা রপ্তানি করা হয়। এছাড়া এখানে বেশ কয়েকটি বড় শিল্পকারখানা রয়েছে, যেখানে কাঁচামাল আমদানি করা হয়।”তিনি বলেন, “ইপিজেড হলে আমদানি ও রপ্তানিতে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন। সরকারের এ উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।”
বরিশালের জেলা প্রশাসক খাযরুল আলম সুমন বলেন, “একটি ইপিজেড স্থাপনের প্রস্তাব আমরা লিখিতভাবে দিয়েছি। এটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় জনগণকে কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকা বা চট্টগ্রামে যেতে হবে না। নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় দারিদ্র্য কমবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।”
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী অবস্থান পণ্য পরিবহনে সহায়ক হবে। ইপিজেড তৈরির জন্য পর্যাপ্ত খাসজমি সরকারের রয়েছে।”
মিজানুর রহমান আরও বলেন, “সরকারের ইপিজেড স্থাপনের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এর সুফল নিশ্চিত করতে দ্রুত ছয় লেন মহাসড়ক নির্মাণ এবং ভোলার গ্যাস বরিশালে আনার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।”
তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে এনে ভিন্নমতও দিয়েছেন বরিশালের মানবিক চিকিৎসক ও বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, “মহাসড়ক উন্নয়ন ও ভোলার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ইপিজেড নির্মাণের সিদ্ধান্ত কাগজেই থেকে যেতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, পদ্মা সেতু চালুর ফলে বরিশালের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণ দক্ষিণাঞ্চলকে একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। একটি ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হলে কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার সুযোগও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
দীর্ঘদিন ধরে শিল্পবঞ্চিত বরিশাল অঞ্চলের মানুষের কাছে সরকারের এই ঘোষণা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। এখন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, অতীতের প্রতিশ্রুতির মতো এই উদ্যোগও যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে বরিশালে বহু প্রতীক্ষিত ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তব রূপ পাবে।

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
পদ্মা সেতু চালুর পর বরিশাল অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে ওঠে একটি ইপিজেড স্থাপন। একই সঙ্গে ছয় লেন মহাসড়ক, ভোলা থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এবং সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে লাহারহাট সেতু নির্মাণের দাবিও জোরালো হয়। ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পর শিল্পায়ন ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
বরিশালে ইপিজেড স্থাপনের দাবি নতুন নয়। ২০২২ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বরিশালে ইপিজেড নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সে সময় বরিশালের লাকুটিয়া ও তালতলী এলাকায় সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ করে জমি উন্নয়ন ও ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি।
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হলো কৃষি, মৎস্য ও নদীনির্ভর অর্থনীতি। দেশের সর্বাধিক ইলিশ উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বরিশাল থেকে ইতোমধ্যে ইলিশ, আমড়া, পেয়ারাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া এ অঞ্চলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, পোশাকশিল্প ও কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত শিল্প অবকাঠামো ও বিনিয়োগ সুবিধার অভাবে সেই সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরে অপূর্ণ রয়ে গেছে।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ওবায়দুল হক চান বলেন, “ইপিজেড হলে কর ও শুল্ক সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। বরিশাল থেকে ইলিশ, আমড়া ও পেয়ারা রপ্তানি করা হয়। এছাড়া এখানে বেশ কয়েকটি বড় শিল্পকারখানা রয়েছে, যেখানে কাঁচামাল আমদানি করা হয়।”তিনি বলেন, “ইপিজেড হলে আমদানি ও রপ্তানিতে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন। সরকারের এ উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।”
বরিশালের জেলা প্রশাসক খাযরুল আলম সুমন বলেন, “একটি ইপিজেড স্থাপনের প্রস্তাব আমরা লিখিতভাবে দিয়েছি। এটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় জনগণকে কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকা বা চট্টগ্রামে যেতে হবে না। নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় দারিদ্র্য কমবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।”
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী অবস্থান পণ্য পরিবহনে সহায়ক হবে। ইপিজেড তৈরির জন্য পর্যাপ্ত খাসজমি সরকারের রয়েছে।”
মিজানুর রহমান আরও বলেন, “সরকারের ইপিজেড স্থাপনের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এর সুফল নিশ্চিত করতে দ্রুত ছয় লেন মহাসড়ক নির্মাণ এবং ভোলার গ্যাস বরিশালে আনার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।”
তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে এনে ভিন্নমতও দিয়েছেন বরিশালের মানবিক চিকিৎসক ও বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, “মহাসড়ক উন্নয়ন ও ভোলার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ইপিজেড নির্মাণের সিদ্ধান্ত কাগজেই থেকে যেতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, পদ্মা সেতু চালুর ফলে বরিশালের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণ দক্ষিণাঞ্চলকে একটি সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। একটি ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হলে কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার সুযোগও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
দীর্ঘদিন ধরে শিল্পবঞ্চিত বরিশাল অঞ্চলের মানুষের কাছে সরকারের এই ঘোষণা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। এখন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, অতীতের প্রতিশ্রুতির মতো এই উদ্যোগও যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে বরিশালে বহু প্রতীক্ষিত ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তব রূপ পাবে।

আপনার মতামত লিখুন