বিস্তীর্ণ জলরাশি। সামনে শুধুই অন্ধকার আর অজানা। পেছনে ফেলে আসা দেশ, বাড়ি, মা-বাবা। আর ফিরে পাওয়া যাবে না। ভূমধ্যসাগরের বুকে টানা ছয় দিন ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হলো মাসুমকে। তার মতো আরও ১৭ জন বাংলাদেশির সমাধি হলো সমুদ্রের অতল গর্ভে।
একটি ভালো জীবনের আশায়, সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্নে সব শেষ সম্বল বিক্রি করে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউরোপের পথে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেন না গন্তব্যে। পাচারকারীদের প্রতারণার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের ঠিকানা হলো অজানা সমুদ্র।
আর্থিক সংকটে জর্জরিত মাসুমের পরিবার। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। পাড়ার পরিচিতজন মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামের মাধ্যমে পাচারচক্রের সংস্পর্শে আসেন মাসুম। চক্রের সদস্যরা গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারের কাছে দাবি করে ১৩ লাখ টাকা।
বাবা বলেছিলেন, "টাকা কোথায় পাব?" মাসুম বলেছিল, "বাবা, একবার সুযোগ দাও। আমি ফিরে এসে সব ঘুচিয়ে দেব।"
পরিবারের সব জমি-জমা, গয়না- সব বিক্রি করে টাকা জোগাড় করা হয়। মাসুমের বাবা জানান, "আমাদের শেষ সম্বলটা বিক্রি করে ওকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। ও বলেছিল, ফিরে এসে আমাদের ভালো রাখবে।"
চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিমানযোগে মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয়। গ্রিস পৌঁছানোর পর বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেয়। বিশ্বাস আর আশায় মাসুম রাজি হয়।
ঢাকায় ১৭ দিন থাকার পর মাসুমসহ আরও কয়েকজনকে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর মাসুম পরিবারকে ফোন করে চক্রের সদস্যের কাছে আরও টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেন। বাবা তখনও ভেবেছিলেন, সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে এসব টাকা দেওয়া লাগবে। জানুয়ারিতে ব্যাংক হিসাবে ৪ লাখ টাকা জমা দেন তিনি। আরও ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন মিকাইল ইসলামের কাছে। কিন্তু মাসুমকে আর গ্রিসে পৌঁছাতে হয়নি।
২০২৬ সালের ২১ মার্চ। লিবিয়া থেকে মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে ছেড়ে যায় একটি নৌযান। তাদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি।
প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে ফেলে তারা। খাবারের নামে কিছু নেই, পানির বিন্দুও মিলছে না। বাড়ছে রোদের তাপ, কমছে শক্তি। একের পর এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই- শুধু মৃত্যুর ছায়া আরো কাছে আসছে।
উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী জানান, "আমাদের বাঁচাতে কেউ এগিয়ে এলো না। আমরা চিৎকার করেছিলাম, কিন্তু ওপারে কেউ ছিল না।"
ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর চরম ক্লান্তিতে কয়েকজন প্রাণ হারান। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝসমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। মাসুমও সেই নিহতদের একজন।
খবর পৌঁছায় গ্রামে। মাসুমের মা জানেন না, কীভাবে এত টাকা দিয়ে সন্তানকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না যে এই টাকাগুলো কোনোদিন ফিরে আসবে না, শুধু সন্তানের খবর আসবে- মৃত।
মাসুমের বাবা বলেন, "ওকে ফিরে পাব না জেনেও আমি দালালের কাছে টাকা দিয়েছিলাম। আর টাকা ফেরত চাইতেও পারি না, কারণ টাকার সঙ্গে ওর জীবন চলে গেছে।"
আত্মীয়স্বজন, গ্রামের মানুষ, সবাই এক হয়ে জড়ো হয়- শোকের ছায়ায়। কান্নায় ভেসে যায় গোটা গ্রাম।
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে (৫২) গ্রেপ্তার করেছে সিআইডির টিএইচবি ইউনিট। গত ১৫ জুন সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
মিকাইল ইসলাম সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে। পেশায় মাঝারি চাষি ও স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি এবং তার সহযোগীরা নিরীহ মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ পাঠানোর নামে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে মানবপাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। এই পাচার চক্রটি বৈধ অভিবাসনের বদলে অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাঠাত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের।
সিআইডি জনসাধারণকে বিদেশযাত্রায় শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে। মানবপাচার, জাল ভিসা বা অভিবাসী চোরাচালান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে সিআইডিকে জানানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মাসুমের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে সমুদ্রের গভীরে। তার মতো আরও ১৭ জন বাংলাদেশির স্বপ্ন চিরতরে হারিয়ে গেছে। তাদের পরিবারের শোক কখনো মেটানো সম্ভব নয়, কিন্তু তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে এ ধরনের আর কোনো প্রাণহানি যেন না ঘটে- সেটাই প্রত্যাশা সবার।
পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনা এবং এই অবৈধ মানবপাচার বন্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
বিস্তীর্ণ জলরাশি। সামনে শুধুই অন্ধকার আর অজানা। পেছনে ফেলে আসা দেশ, বাড়ি, মা-বাবা। আর ফিরে পাওয়া যাবে না। ভূমধ্যসাগরের বুকে টানা ছয় দিন ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হলো মাসুমকে। তার মতো আরও ১৭ জন বাংলাদেশির সমাধি হলো সমুদ্রের অতল গর্ভে।
একটি ভালো জীবনের আশায়, সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্নে সব শেষ সম্বল বিক্রি করে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইউরোপের পথে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেন না গন্তব্যে। পাচারকারীদের প্রতারণার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের ঠিকানা হলো অজানা সমুদ্র।
আর্থিক সংকটে জর্জরিত মাসুমের পরিবার। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে গ্রিসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। পাড়ার পরিচিতজন মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামের মাধ্যমে পাচারচক্রের সংস্পর্শে আসেন মাসুম। চক্রের সদস্যরা গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারের কাছে দাবি করে ১৩ লাখ টাকা।
বাবা বলেছিলেন, "টাকা কোথায় পাব?" মাসুম বলেছিল, "বাবা, একবার সুযোগ দাও। আমি ফিরে এসে সব ঘুচিয়ে দেব।"
পরিবারের সব জমি-জমা, গয়না- সব বিক্রি করে টাকা জোগাড় করা হয়। মাসুমের বাবা জানান, "আমাদের শেষ সম্বলটা বিক্রি করে ওকে বিদেশ পাঠিয়েছিলাম। ও বলেছিল, ফিরে এসে আমাদের ভালো রাখবে।"
চক্রের সদস্যরা প্রথমে বিমানযোগে মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয়। গ্রিস পৌঁছানোর পর বাকি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেয়। বিশ্বাস আর আশায় মাসুম রাজি হয়।
ঢাকায় ১৭ দিন থাকার পর মাসুমসহ আরও কয়েকজনকে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর মাসুম পরিবারকে ফোন করে চক্রের সদস্যের কাছে আরও টাকা পাঠানোর নির্দেশ দেন। বাবা তখনও ভেবেছিলেন, সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করতে এসব টাকা দেওয়া লাগবে। জানুয়ারিতে ব্যাংক হিসাবে ৪ লাখ টাকা জমা দেন তিনি। আরও ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন মিকাইল ইসলামের কাছে। কিন্তু মাসুমকে আর গ্রিসে পৌঁছাতে হয়নি।
২০২৬ সালের ২১ মার্চ। লিবিয়া থেকে মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে ছেড়ে যায় একটি নৌযান। তাদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি।
প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে ফেলে তারা। খাবারের নামে কিছু নেই, পানির বিন্দুও মিলছে না। বাড়ছে রোদের তাপ, কমছে শক্তি। একের পর এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই- শুধু মৃত্যুর ছায়া আরো কাছে আসছে।
উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী জানান, "আমাদের বাঁচাতে কেউ এগিয়ে এলো না। আমরা চিৎকার করেছিলাম, কিন্তু ওপারে কেউ ছিল না।"
ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর চরম ক্লান্তিতে কয়েকজন প্রাণ হারান। পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদেহগুলো মাঝসমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। মাসুমও সেই নিহতদের একজন।
খবর পৌঁছায় গ্রামে। মাসুমের মা জানেন না, কীভাবে এত টাকা দিয়ে সন্তানকে বিদেশ পাঠিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না যে এই টাকাগুলো কোনোদিন ফিরে আসবে না, শুধু সন্তানের খবর আসবে- মৃত।
মাসুমের বাবা বলেন, "ওকে ফিরে পাব না জেনেও আমি দালালের কাছে টাকা দিয়েছিলাম। আর টাকা ফেরত চাইতেও পারি না, কারণ টাকার সঙ্গে ওর জীবন চলে গেছে।"
আত্মীয়স্বজন, গ্রামের মানুষ, সবাই এক হয়ে জড়ো হয়- শোকের ছায়ায়। কান্নায় ভেসে যায় গোটা গ্রাম।
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় মানব পাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে (৫২) গ্রেপ্তার করেছে সিআইডির টিএইচবি ইউনিট। গত ১৫ জুন সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
মিকাইল ইসলাম সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে। পেশায় মাঝারি চাষি ও স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি এবং তার সহযোগীরা নিরীহ মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশ পাঠানোর নামে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে মানবপাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। এই পাচার চক্রটি বৈধ অভিবাসনের বদলে অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাঠাত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের।
সিআইডি জনসাধারণকে বিদেশযাত্রায় শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে। মানবপাচার, জাল ভিসা বা অভিবাসী চোরাচালান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে সিআইডিকে জানানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
মাসুমের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে সমুদ্রের গভীরে। তার মতো আরও ১৭ জন বাংলাদেশির স্বপ্ন চিরতরে হারিয়ে গেছে। তাদের পরিবারের শোক কখনো মেটানো সম্ভব নয়, কিন্তু তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে এ ধরনের আর কোনো প্রাণহানি যেন না ঘটে- সেটাই প্রত্যাশা সবার।
পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনা এবং এই অবৈধ মানবপাচার বন্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন