সংবাদ

ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি আবদুস সাদেকের প্রয়াণ


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি আবদুস সাদেকের প্রয়াণ

ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে বিদায় নিলেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অনন্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি খেলোয়াড় ও সফল সংগঠক আবদুস সাদেক। প্রায় দেড় বছর দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ শনিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ভক্ত-অনুরক্ত রেখে গেছেন।

মরহুমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ বাদ আসর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানী ওল্ড ডিওএইচএস মাঠে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হবে।

১৯৪৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত ক্রীড়া পরিবারে আবদুস সাদেকের জন্ম। তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ব্রিটিশ আমলের একজন খ্যাতনামা সাঁতারু ছিলেন। আবদুস সাদেকের ছোট ভাই হলেন দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, যিনি নিজেও একসময় হকির তারকা খেলোয়াড় ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তান যুবদলে দুই ভাই একসঙ্গে খেলেছেন। এছাড়া মরহুমের বড় ছেলে ইশতিয়াক সাদেক দেশের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও স্পোর্টস চ্যানেল ‘টি স্পোর্টস’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।

পাকিস্তান আমলের বৈরী পরিবেশেও নিজের মেধা ও ক্যারিশমা দিয়ে ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক দলে ডাক পেয়েছিলেন আবদুস সাদেক। তবে ইনজুরির কারণে সেবার খেলা হয়নি। অবিভক্ত পাকিস্তানের জাতীয় হকি দলের তারকা খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৬৯ সালে দেড় মাসের ইউরোপ ট্যুরে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডে মাঠ কাঁপিয়েছেন তিনি। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং দলের সেরা তারকা রশিদ জুনিয়রের কাছে তাঁর কদর ছিল আলাদা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। সেই আসরের ফাইনালে ছোট ভাই আহমেদ আকবর সোবহানের একমাত্র গোলেই কুমিল্লা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের যাত্রা শুরু হলে ক্লাব প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল দলের নেতৃত্বের গুরুভার তুলে দেন আবদুস সাদেকের কাঁধে। তিনি একাধারে আবাহনীর প্রথম ফুটবল ও হকি অধিনায়ক ছিলেন। হকি অধিনায়ক হিসেবে আবাহনীকে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন করে শেখ কামালের আস্থার প্রতিদান দেন তিনি।

ফুটবল ক্যারিয়ার শেষে ১৯৭৭ সালে আবাহনীর প্রশিক্ষকের (কোচ) দায়িত্ব নেন আবদুস সাদেক। তাঁর অধীনে সেবার লিগে কোনো ম্যাচ না হেরে, তিন ম্যাচ ড্র ও বাকি সব ম্যাচে দাপুটে জয় নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম দল হিসেবে ‘অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন’ হওয়ার বিরল রেকর্ড সৃষ্টি করে আবাহনী।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর চরম দুঃসময়ে যখন অনেকে ভয়ে ক্লাবে আসতেন না, তখন শেখ কামালের প্রিয় আবাহনীকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নেন আবদুস সাদেক। ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে সবাইকে একতাবদ্ধ করে আবাহনীকে মাঠে নামানোর সাহসিকতা দেখান তিনি। তাঁর এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবাহনী লিমিটেড তাঁকে ‘আজীবন সদস্য’ পদ প্রদান করে।

১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে বাংলাদেশ হকি দলের প্রথম আন্তর্জাতিক সফরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজে এবং ১৯৭৮ সালে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন আবদুস সাদেক।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর একক প্রচেষ্টায় এবং এশিয়ান হকি ফেডারেশনে তাঁর জাদুকরী বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরানের সমর্থনে ১৯৮৫ সালে জাপানকে টপকে ঢাকা এশিয়া কাপ হকি আয়োজনের মর্যাদা পায়। ২০১৭ সালে ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপ আয়োজন, হকিতে ফ্লাডলাইট, ইলেকট্রনিক স্কোর বোর্ডসহ আধুনিক প্রযুক্তি আনার পেছনেও ছিল তাঁর অগ্রণী ভূমিকা।

ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর এই অসামান্য ও অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে তাঁকে ‘জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। তাঁর প্রয়াণে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬


ক্রীড়াঙ্গনের কিংবদন্তি আবদুস সাদেকের প্রয়াণ

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬

featured Image

ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে বিদায় নিলেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অনন্য এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি খেলোয়াড় ও সফল সংগঠক আবদুস সাদেক। প্রায় দেড় বছর দুরারোগ্য ব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ শনিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও ভক্ত-অনুরক্ত রেখে গেছেন।

মরহুমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ বাদ আসর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানী ওল্ড ডিওএইচএস মাঠে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হবে।

১৯৪৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত ক্রীড়া পরিবারে আবদুস সাদেকের জন্ম। তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ব্রিটিশ আমলের একজন খ্যাতনামা সাঁতারু ছিলেন। আবদুস সাদেকের ছোট ভাই হলেন দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, যিনি নিজেও একসময় হকির তারকা খেলোয়াড় ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তান যুবদলে দুই ভাই একসঙ্গে খেলেছেন। এছাড়া মরহুমের বড় ছেলে ইশতিয়াক সাদেক দেশের ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও স্পোর্টস চ্যানেল ‘টি স্পোর্টস’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।

পাকিস্তান আমলের বৈরী পরিবেশেও নিজের মেধা ও ক্যারিশমা দিয়ে ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক দলে ডাক পেয়েছিলেন আবদুস সাদেক। তবে ইনজুরির কারণে সেবার খেলা হয়নি। অবিভক্ত পাকিস্তানের জাতীয় হকি দলের তারকা খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৬৯ সালে দেড় মাসের ইউরোপ ট্যুরে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডে মাঠ কাঁপিয়েছেন তিনি। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এবং দলের সেরা তারকা রশিদ জুনিয়রের কাছে তাঁর কদর ছিল আলাদা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। সেই আসরের ফাইনালে ছোট ভাই আহমেদ আকবর সোবহানের একমাত্র গোলেই কুমিল্লা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের যাত্রা শুরু হলে ক্লাব প্রতিষ্ঠাতা শেখ কামাল দলের নেতৃত্বের গুরুভার তুলে দেন আবদুস সাদেকের কাঁধে। তিনি একাধারে আবাহনীর প্রথম ফুটবল ও হকি অধিনায়ক ছিলেন। হকি অধিনায়ক হিসেবে আবাহনীকে হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন করে শেখ কামালের আস্থার প্রতিদান দেন তিনি।

ফুটবল ক্যারিয়ার শেষে ১৯৭৭ সালে আবাহনীর প্রশিক্ষকের (কোচ) দায়িত্ব নেন আবদুস সাদেক। তাঁর অধীনে সেবার লিগে কোনো ম্যাচ না হেরে, তিন ম্যাচ ড্র ও বাকি সব ম্যাচে দাপুটে জয় নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম দল হিসেবে ‘অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন’ হওয়ার বিরল রেকর্ড সৃষ্টি করে আবাহনী।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর চরম দুঃসময়ে যখন অনেকে ভয়ে ক্লাবে আসতেন না, তখন শেখ কামালের প্রিয় আবাহনীকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নেন আবদুস সাদেক। ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে সবাইকে একতাবদ্ধ করে আবাহনীকে মাঠে নামানোর সাহসিকতা দেখান তিনি। তাঁর এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবাহনী লিমিটেড তাঁকে ‘আজীবন সদস্য’ পদ প্রদান করে।

১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে বাংলাদেশ হকি দলের প্রথম আন্তর্জাতিক সফরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজে এবং ১৯৭৮ সালে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন আবদুস সাদেক।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর একক প্রচেষ্টায় এবং এশিয়ান হকি ফেডারেশনে তাঁর জাদুকরী বক্তব্যে মুগ্ধ হয়ে পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরানের সমর্থনে ১৯৮৫ সালে জাপানকে টপকে ঢাকা এশিয়া কাপ হকি আয়োজনের মর্যাদা পায়। ২০১৭ সালে ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপ আয়োজন, হকিতে ফ্লাডলাইট, ইলেকট্রনিক স্কোর বোর্ডসহ আধুনিক প্রযুক্তি আনার পেছনেও ছিল তাঁর অগ্রণী ভূমিকা।

ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর এই অসামান্য ও অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে তাঁকে ‘জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। তাঁর প্রয়াণে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।

 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত