সংবাদ

কেপ ভার্দের ডিফেন্স প্রাচীর ভেদ করতে পারল না স্পেন


ওয়াসিম খান রানা
ওয়াসিম খান রানা
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১২:১০ পিএম

কেপ ভার্দের ডিফেন্স প্রাচীর ভেদ করতে পারল না স্পেন
স্পেনকে রুখে দিল কেপ ভার্দে

প্রথমবার বিশ্বকাপের মাঠে এসে বুক পেতে দিয়ে কোটি হৃদয় জয় করল ‘ব্লু শার্কস’। ফুটবল মাঠে কখনো কখনো এমন কিছু ঘটে যা সংখ্যায় মাপা যায় না। পরিসংখ্যানে ধরা যায় না। সেটা অনুভব করতে হয়। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে সোমবার (১৫ জুন) রাতে ঠিক এমনই একটি অধ্যায় রচিত হলো বিশ্বকাপের ইতিহাসে।

ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে ০-০ গোলে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ইতিহাস গড়ল কেপ ভার্দে। লড়াই নয়, যেন বুক পেতে দিয়ে পুরো বিশ্বের মানুষের হৃদয় জয় করে নিল আটলান্টিক মহাসাগরের এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র।

কেপ ভার্দের কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো ম্যাচ শেষে বললেন, ‘এটা আমাদের দেশের জন্য সব কিছু।’ মাত্র পাঁচ লক্ষের বেশি মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্র স্পেনের তারকাখচিত দলকে থামিয়ে এমন একটি ফল করল যা গোটা ফুটবল দুনিয়ায় আলোচনার ঝড় তুলেছে।

বিশ্বকাপ দলের সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮-এ বাড়ানোর সমালোচনাকারীদের মুখে এই ম্যাচ যেন সজোরে চপেটাঘাত করল। কেপ ভার্দে এবার বিশ্বকাপে এসেছে আফ্রিকান পাওয়ারহাউস ক্যামেরুনকে ৪ পয়েন্টে পেছনে ফেলে কোয়ালিফাই করে। প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে পা দিয়েই দেশটি দেখিয়ে দিল, ছোট দেশ মানেই ছোট স্বপ্ন নয়।

স্পেনের ২৭টি শট, ৭টি অন টার্গেট কিন্তু একটিও ঠেকাতে পারল না অনমনীয় কেপ ভার্দের রক্ষণ প্রাচীর। স্পেনের বল দখল ছিল ৭৪ শতাংশ, তবু কেপ ভার্দে এই পুরো ম্যাচে মাত্র একটি ফাউল করল যা ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপ রেকর্ডে কোনো দলের দেওয়া সর্বনিম্ন ফাউল।

রেফারির বাঁশি বাজানোর সুযোগই দিল না তারা। সেটাই বলে দিচ্ছিল কী মনোভাব নিয়ে মাঠে নেমেছে কেপ ভার্দে।

স্পেনের সবচেয়ে কাছের সুযোগটি এল প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে, যখন ফেরান তোরেস বারে বল ঠেকালেন মাত্র ছয় গজ দূর থেকে। স্টেডিয়ামে দর্শকদের মুখ থেকে বের হলো হতাশার নিঃশ্বাস।

এই ম্যাচের মহানায়ক অবশ্যই কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনহা। ভোজিনহা বিশ্বকাপ অভিষেকে ক্লিন শিট রাখা সবচেয়ে বয়স্ক গোলকিপার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখালেন, ৪০ বছর বয়সে স্পেনের বিরুদ্ধে সাতটি সেভ করে।

ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ভোজিনহা সফাস্কোরে পেলেন ৯ দশমিক ৭ রেটিং। তার সাতটি সেভের মধ্যে ছয়টিই ছিল বক্সের ভেতর থেকে আসা শটের বিরুদ্ধে। স্পেন ৩৬টি ক্রস করলেও তিনি তিনটি হাই বল দখলে রাখলেন। পেদ্রি, মিকেল ওয়ারসাবাল আর ফেরান তোরেসের শট একে একে থামিয়ে দিলেন তিনি। তার সেভ করা শটগুলোর সম্মিলিত এক্সজি ছিল ১ দশমিক ৪৫ অর্থাৎ, তাঁকে ছাড়া স্পেন প্রায় নিশ্চিতভাবেই জিততে পারত।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে সবচেয়ে চমকপ্রদ সেভটি এল যখন তিনি আইমেরিক লাপোর্তের হেডার ডানদিকে ঝাঁপিয়ে আঙুলের ডগায় ঠেকিয়ে বাইরে পাঠালেন। স্টেডিয়াম তখন হাততালিতে ফেটে পড়েছিল। ভোজিনহা খেলেন পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেস-এ। কিন্তু সেদিন মনে হচ্ছিল তিনি যেন রিয়াল মাদ্রিদ বা এসি মিলানের গোলকিপার।

ভোজিনহার পাশে আরেকটি নাম উজ্জ্বল হয়ে উঠল এই ম্যাচে রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস। আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া পিকো লোপেস ৮৮ মিনিটে ওয়ারসাবালের নিশ্চিত গোল রুখে দিলেন অবিশ্বাস্য এক শেষ মুহূর্তের ব্লকে। দর্শকেরা আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে যেন বাধ্য হলেন।

শুধু রক্ষণই নয়, কেপ ভার্দে প্রায় জিতেই বসেছিল। শেষ দিকে এক কর্নারে একা পেয়ে দিনে বোর্হেস হেড করলেন, কিন্তু স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমোন তা থামিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে যেন থমকে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়াম।

স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বললেন, ‘আজকের ম্যাচে আমাদের জেতা উচিত ছিল। আমাদের প্রচুর সুযোগ ছিল, কিন্তু সতেজতা আর শেষ মুহূর্তের ধার ছিল না।’

৭১ মিনিটে বেঞ্চ থেকে মাঠে নামানো হলো লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো আর নিকো উইলিয়ামসকে, কিন্তু কেপ ভার্দের রক্ষণ প্রাচীর ভেদ করার ক্ষমতা তাদেরও হলো না।

কেপ ভার্দে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সপ্তম দল হিসেবে নিজেদের অভিষেক ম্যাচে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়ল। এই ফলাফল কেবল কেপ ভার্দের ইতিহাসের সেরা মুহূর্ত নয়, এটি সমগ্র বিশ্ব ফুটবলের জন্য একটি বার্তা- ফুটবল মাঠে হৃদয় থাকলে পরিসংখ্যান মানে না।

গ্রুপ এইচ-তে এখন স্পেন ও কেপ ভার্দে উভয়েরই ১ পয়েন্ট। পরের ম্যাচে কেপ ভার্দে মুখোমুখি হবে উরুগুয়ের, আর স্পেন খেলবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে।

আটলান্টার সেই সন্ধ্যায় জয়ী হয়নি কোনো দল। কিন্তু হৃদয় জয় করেছে কেপ ভার্দে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬


কেপ ভার্দের ডিফেন্স প্রাচীর ভেদ করতে পারল না স্পেন

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

প্রথমবার বিশ্বকাপের মাঠে এসে বুক পেতে দিয়ে কোটি হৃদয় জয় করল ‘ব্লু শার্কস’। ফুটবল মাঠে কখনো কখনো এমন কিছু ঘটে যা সংখ্যায় মাপা যায় না। পরিসংখ্যানে ধরা যায় না। সেটা অনুভব করতে হয়। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে সোমবার (১৫ জুন) রাতে ঠিক এমনই একটি অধ্যায় রচিত হলো বিশ্বকাপের ইতিহাসে।

ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে ০-০ গোলে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ইতিহাস গড়ল কেপ ভার্দে। লড়াই নয়, যেন বুক পেতে দিয়ে পুরো বিশ্বের মানুষের হৃদয় জয় করে নিল আটলান্টিক মহাসাগরের এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র।

কেপ ভার্দের কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো ম্যাচ শেষে বললেন, ‘এটা আমাদের দেশের জন্য সব কিছু।’ মাত্র পাঁচ লক্ষের বেশি মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্র স্পেনের তারকাখচিত দলকে থামিয়ে এমন একটি ফল করল যা গোটা ফুটবল দুনিয়ায় আলোচনার ঝড় তুলেছে।

বিশ্বকাপ দলের সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮-এ বাড়ানোর সমালোচনাকারীদের মুখে এই ম্যাচ যেন সজোরে চপেটাঘাত করল। কেপ ভার্দে এবার বিশ্বকাপে এসেছে আফ্রিকান পাওয়ারহাউস ক্যামেরুনকে ৪ পয়েন্টে পেছনে ফেলে কোয়ালিফাই করে। প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে পা দিয়েই দেশটি দেখিয়ে দিল, ছোট দেশ মানেই ছোট স্বপ্ন নয়।

স্পেনের ২৭টি শট, ৭টি অন টার্গেট কিন্তু একটিও ঠেকাতে পারল না অনমনীয় কেপ ভার্দের রক্ষণ প্রাচীর। স্পেনের বল দখল ছিল ৭৪ শতাংশ, তবু কেপ ভার্দে এই পুরো ম্যাচে মাত্র একটি ফাউল করল যা ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপ রেকর্ডে কোনো দলের দেওয়া সর্বনিম্ন ফাউল।

রেফারির বাঁশি বাজানোর সুযোগই দিল না তারা। সেটাই বলে দিচ্ছিল কী মনোভাব নিয়ে মাঠে নেমেছে কেপ ভার্দে।

স্পেনের সবচেয়ে কাছের সুযোগটি এল প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে, যখন ফেরান তোরেস বারে বল ঠেকালেন মাত্র ছয় গজ দূর থেকে। স্টেডিয়ামে দর্শকদের মুখ থেকে বের হলো হতাশার নিঃশ্বাস।

এই ম্যাচের মহানায়ক অবশ্যই কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনহা। ভোজিনহা বিশ্বকাপ অভিষেকে ক্লিন শিট রাখা সবচেয়ে বয়স্ক গোলকিপার হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখালেন, ৪০ বছর বয়সে স্পেনের বিরুদ্ধে সাতটি সেভ করে।

ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় ভোজিনহা সফাস্কোরে পেলেন ৯ দশমিক ৭ রেটিং। তার সাতটি সেভের মধ্যে ছয়টিই ছিল বক্সের ভেতর থেকে আসা শটের বিরুদ্ধে। স্পেন ৩৬টি ক্রস করলেও তিনি তিনটি হাই বল দখলে রাখলেন। পেদ্রি, মিকেল ওয়ারসাবাল আর ফেরান তোরেসের শট একে একে থামিয়ে দিলেন তিনি। তার সেভ করা শটগুলোর সম্মিলিত এক্সজি ছিল ১ দশমিক ৪৫ অর্থাৎ, তাঁকে ছাড়া স্পেন প্রায় নিশ্চিতভাবেই জিততে পারত।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে সবচেয়ে চমকপ্রদ সেভটি এল যখন তিনি আইমেরিক লাপোর্তের হেডার ডানদিকে ঝাঁপিয়ে আঙুলের ডগায় ঠেকিয়ে বাইরে পাঠালেন। স্টেডিয়াম তখন হাততালিতে ফেটে পড়েছিল। ভোজিনহা খেলেন পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেস-এ। কিন্তু সেদিন মনে হচ্ছিল তিনি যেন রিয়াল মাদ্রিদ বা এসি মিলানের গোলকিপার।

ভোজিনহার পাশে আরেকটি নাম উজ্জ্বল হয়ে উঠল এই ম্যাচে রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস। আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া পিকো লোপেস ৮৮ মিনিটে ওয়ারসাবালের নিশ্চিত গোল রুখে দিলেন অবিশ্বাস্য এক শেষ মুহূর্তের ব্লকে। দর্শকেরা আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে যেন বাধ্য হলেন।

শুধু রক্ষণই নয়, কেপ ভার্দে প্রায় জিতেই বসেছিল। শেষ দিকে এক কর্নারে একা পেয়ে দিনে বোর্হেস হেড করলেন, কিন্তু স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমোন তা থামিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে যেন থমকে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়াম।

স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বললেন, ‘আজকের ম্যাচে আমাদের জেতা উচিত ছিল। আমাদের প্রচুর সুযোগ ছিল, কিন্তু সতেজতা আর শেষ মুহূর্তের ধার ছিল না।’

৭১ মিনিটে বেঞ্চ থেকে মাঠে নামানো হলো লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো আর নিকো উইলিয়ামসকে, কিন্তু কেপ ভার্দের রক্ষণ প্রাচীর ভেদ করার ক্ষমতা তাদেরও হলো না।

কেপ ভার্দে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সপ্তম দল হিসেবে নিজেদের অভিষেক ম্যাচে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়ল। এই ফলাফল কেবল কেপ ভার্দের ইতিহাসের সেরা মুহূর্ত নয়, এটি সমগ্র বিশ্ব ফুটবলের জন্য একটি বার্তা- ফুটবল মাঠে হৃদয় থাকলে পরিসংখ্যান মানে না।

গ্রুপ এইচ-তে এখন স্পেন ও কেপ ভার্দে উভয়েরই ১ পয়েন্ট। পরের ম্যাচে কেপ ভার্দে মুখোমুখি হবে উরুগুয়ের, আর স্পেন খেলবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে।

আটলান্টার সেই সন্ধ্যায় জয়ী হয়নি কোনো দল। কিন্তু হৃদয় জয় করেছে কেপ ভার্দে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত