সংবাদ

রিহাভিলিটাশন আইনের সীমাবদ্ধতা


জোবায়দুর রশীদ
জোবায়দুর রশীদ
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১১:০৮ এএম

রিহাভিলিটাশন আইনের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য আজ আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জাতীয় দৈনিক সমূহে একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যার মূল বক্তব্য হলো— বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হলে একজন পেশাজীবীকে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে নির্ধারিত বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। এই স্বীকৃতি ছাড়া কেউ পেশাগতভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করলে আইন অনুযায়ী এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। 

জানামতে, বাংলাদেশে এই শর্ত পূরণকারী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে সরকারের ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। 

এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কি শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব?

পরিসংখ্যানগতভাবে বিষয়টি উদ্বেগজনক। যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের আইনগত সুযোগ খুব সীমিত সংখ্যক পেশাজীবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া; একজন পেশাজীবীর পক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে কার্যকর সেবা পৌঁছে দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। 

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য চাহিদা বিবেচনা করলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহুমাত্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মডেল নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্বের বহু দেশে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের পাশাপাশি কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ড্রামা থেরাপিস্ট, আর্ট থেরাপিস্ট, লাইসেন্সধারী কাউন্সেলর, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্র্যাকটিশনাররা নির্দিষ্ট যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের আওতায় কাজ করেন। 

বাংলাদেশেও প্রতিবছর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাইকোলজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে অসংখ্য শিক্ষার্থী বের হচ্ছেন। পাশাপাশি নাট্যকলা, এক্সপ্রেসিভ আর্টস, কাউন্সেলিং, ট্রমা কেয়ার এবং মনোসামাজিক সহায়তা বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও বহু বছর ধরে দুর্যোগ, শরণার্থী সহায়তা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, মাদক পুনর্বাসন এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রমে মনোসামাজিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। 

প্রশ্ন হলো— এই প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের স্থান কোথায়?

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য আজ আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেস এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ট্রমা— সব মিলিয়ে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। 

বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে পেশাজীবী মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের উদ্বেগ, যদি মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবা ও সাইকোথেরাপি কার্যক্রমের আইনগত পরিসর এমনভাবে নির্ধারিত হয় যে বাস্তবে কেবল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরাই এসব সেবা দিতে পারবেন, তাহলে দেশের বিদ্যমান মানবসম্পদের একটি বড় অংশ কার্যত সেবা প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। 

বাংলাদেশেও হয়তো এখন সময় এসেছে ‘একটি পেশা বনাম অন্য পেশা’ বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মশক্তি গঠনের কথা ভাবার। 

সরকার চাইলে বিভিন্ন স্তরের লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে পারে। যেমন— ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, এক্সপ্রেসিভ আর্টস থেরাপিস্ট, কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কার এবং সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট প্র্যাকটিশনারদের জন্য পৃথক নিবন্ধন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে সেবার মান নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দেশের বাস্তব চাহিদাও পূরণ হবে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করলেই দক্ষ পেশাজীবী তৈরি হয় না। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সুপারভিশন, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগগুলোতে আরও বেশি প্রায়োগিক ও ক্লিনিক্যাল উপাদান যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ৩-৬ মাস মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্সের মাধ্যমে প্রাথমিক মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানকারী কর্মী তৈরি করা যেতে পারে, যারা কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করবেন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের কাছে রেফার করবেন। 

এই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। পেশাজীবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে বসে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, গবেষণা প্রতিবেদন এবং নীতিপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে। 

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো একক পেশার এক্রছত্র ক্ষেত্র নয়; এটি জনগণের অধিকার। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—মান বজায় রেখে কীভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক এবং সহজলভ্য সেবা দেয়া যায়। 

১৮-১৯ কোটি মানুষের দেশে যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল অল্পসংখ্যক পেশাজীবীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি গভীর বৈষম্য তৈরি হবে। সেই বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন এবং দক্ষ মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। 

বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনই সময় এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলার, যেখানে মান, নিরাপত্তা এবং সেবার বিস্তার—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব পাবে। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি পেশাগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। 

[লেখক: প্রশিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, চট্টগ্রাম]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬


রিহাভিলিটাশন আইনের সীমাবদ্ধতা

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুন ২০২৬

featured Image

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জাতীয় দৈনিক সমূহে একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যার মূল বক্তব্য হলো— বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে হলে একজন পেশাজীবীকে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে নির্ধারিত বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। এই স্বীকৃতি ছাড়া কেউ পেশাগতভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করলে আইন অনুযায়ী এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। 

জানামতে, বাংলাদেশে এই শর্ত পূরণকারী ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে সরকারের ২০২১ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর সংখ্যাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম। 

এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কি শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব?

পরিসংখ্যানগতভাবে বিষয়টি উদ্বেগজনক। যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের আইনগত সুযোগ খুব সীমিত সংখ্যক পেশাজীবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া; একজন পেশাজীবীর পক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে কার্যকর সেবা পৌঁছে দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। 

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য চাহিদা বিবেচনা করলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহুমাত্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মডেল নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্বের বহু দেশে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের পাশাপাশি কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, ড্রামা থেরাপিস্ট, আর্ট থেরাপিস্ট, লাইসেন্সধারী কাউন্সেলর, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্র্যাকটিশনাররা নির্দিষ্ট যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনের আওতায় কাজ করেন। 

বাংলাদেশেও প্রতিবছর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাইকোলজি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে অসংখ্য শিক্ষার্থী বের হচ্ছেন। পাশাপাশি নাট্যকলা, এক্সপ্রেসিভ আর্টস, কাউন্সেলিং, ট্রমা কেয়ার এবং মনোসামাজিক সহায়তা বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও বহু বছর ধরে দুর্যোগ, শরণার্থী সহায়তা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, মাদক পুনর্বাসন এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রমে মনোসামাজিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। 

প্রশ্ন হলো— এই প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদের স্থান কোথায়?

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য আজ আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন। বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেস এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ট্রমা— সব মিলিয়ে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। 

বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে পেশাজীবী মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের উদ্বেগ, যদি মনোসামাজিক স্বাস্থ্যসেবা ও সাইকোথেরাপি কার্যক্রমের আইনগত পরিসর এমনভাবে নির্ধারিত হয় যে বাস্তবে কেবল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টরাই এসব সেবা দিতে পারবেন, তাহলে দেশের বিদ্যমান মানবসম্পদের একটি বড় অংশ কার্যত সেবা প্রদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। 

বাংলাদেশেও হয়তো এখন সময় এসেছে ‘একটি পেশা বনাম অন্য পেশা’ বিতর্কের বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মশক্তি গঠনের কথা ভাবার। 

সরকার চাইলে বিভিন্ন স্তরের লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে পারে। যেমন— ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, সাইকোথেরাপিস্ট, এক্সপ্রেসিভ আর্টস থেরাপিস্ট, কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ ওয়ার্কার এবং সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট প্র্যাকটিশনারদের জন্য পৃথক নিবন্ধন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একদিকে সেবার মান নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দেশের বাস্তব চাহিদাও পূরণ হবে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করলেই দক্ষ পেশাজীবী তৈরি হয় না। প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সুপারভিশন, ইন্টার্নশিপ, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগগুলোতে আরও বেশি প্রায়োগিক ও ক্লিনিক্যাল উপাদান যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি ৩-৬ মাস মেয়াদি সার্টিফিকেট কোর্সের মাধ্যমে প্রাথমিক মনোসামাজিক সহায়তা প্রদানকারী কর্মী তৈরি করা যেতে পারে, যারা কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করবেন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের কাছে রেফার করবেন। 

এই বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। পেশাজীবী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে বসে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক, গবেষণা প্রতিবেদন এবং নীতিপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা যেতে পারে। 

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো একক পেশার এক্রছত্র ক্ষেত্র নয়; এটি জনগণের অধিকার। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—মান বজায় রেখে কীভাবে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক এবং সহজলভ্য সেবা দেয়া যায়। 

১৮-১৯ কোটি মানুষের দেশে যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল অল্পসংখ্যক পেশাজীবীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেবার চাহিদা ও প্রাপ্যতার মধ্যে একটি গভীর বৈষম্য তৈরি হবে। সেই বৈষম্য দূর করতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন এবং দক্ষ মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার। 

বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাত আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনই সময় এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলার, যেখানে মান, নিরাপত্তা এবং সেবার বিস্তার—এই তিনটি বিষয় সমান গুরুত্ব পাবে। কারণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি পেশাগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। 

[লেখক: প্রশিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, চট্টগ্রাম]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত