সংবাদ

সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা


বাবুল রবিদাস
বাবুল রবিদাস
প্রকাশ: ২ জুলাই ২০২৬, ১২:১১ পিএম

সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা

সততা মানুষের চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়; পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থারও ভিত্তি। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ ও স্বচ্ছ আচরণ— এসবের সমন্বয়েই সততার প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সততার চর্চা করে, তারা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে; আর যেখানে সততার ঘাটতি দেখা দেয়, সেখানে ধীরে ধীরে আস্থা, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। 

কাথায় আছে, সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। এই কথার তাৎপর্য কেবল নৈতিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; ব্যক্তি ও সমাজজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও এর সত্যতা প্রমাণ করে। অসততা হয়তো সাময়িক সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। 

সন্ত গুরু রবিদাস তার বাণীতে বাহ্যিক ধর্মীয় আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো— কপালে তিলক, হাতে জপমালা বা বিশেষ পোশাক ধারণ করলেই কেউ সত্যিকার অর্থে ধার্মিক বা সৎ হয়ে ওঠেন না। প্রকৃত সাধুতা মানুষের চরিত্র, আচরণ ও মানবিকতায় প্রকাশ পায়। একই শিক্ষা আমরা সন্ত কবীর দাসসহ বহু সাধক ও মনীষীর বাণীতেও দেখতে পাই। তাদের মূল আহ্বান ছিল— মানুষ যেন ভণ্ডামি নয়, সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথ অনুসরণ করে। 

বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সময়ে সময়েই ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কেবল তার ঐতিহ্য বা পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক মানদণ্ডের ওপর। যেখানে দানের অর্থ, জনসম্পদ বা মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। 

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজন দায়িত্বশীল মানুষের অপরাধ বা অনিয়মের দায় পুরো ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ করা ন্যায়সংগত নয়। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিচার্য। আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে প্রত্যেক অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষী প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষের সম্মানও অক্ষত্নু রাখতে হবে। 

সততার অভাব কেবল আর্থিক দুর্নীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। মিথ্যা, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার— এসবও অসততারই বিভিন্ন রূপ। ব্যক্তি যখন নিজের স্বার্থকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তখন সমাজে অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। 

সন্ত কবীর দাস বলেছেন—  ‘রাম নামকে লুট হে তো লুট, / অন্ত কাল মে পস্তায়েগা, যব প্রাণ যায়েগা ছুট। ’

এই বাণীর মূল শিক্ষা হলো, ধর্ম বা নৈতিকতার নামে প্রতারণা করে সাময়িক লাভবান হওয়া সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি অনুশোচনা ছাড়া আর কিছু নয়। সত্য ও সততার বিকল্প নেই। 

আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতই হোক, নৈতিকতার ভিত্তি দুর্বল হলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটি দেশের অগ্রগতি নির্ভর করে শুধু সম্পদের ওপর নয়; বরং নাগরিকের সততা, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং আইনের সুশাসনের ওপরও। তাই পরিবারে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা সময়ের দাবি। 

সততা এমন একটি মূল্যবোধ, যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা দেশের সম্পদ নয়; এটি মানবজাতির সার্বজনীন নৈতিক আদর্শ। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—  সবার কল্যাণের জন্যই সততার চর্চা অপরিহার্য। বাহ্যিক পরিচয় নয়, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার চরিত্র, কর্ম ও নৈতিকতার মাধ্যমে। এ কারণেই যুগে যুগে জ্ঞানীজন এক বাক্যে বলেছেন—  সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। 

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬


সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুলাই ২০২৬

featured Image

সততা মানুষের চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। এটি শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়; পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থারও ভিত্তি। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ ও স্বচ্ছ আচরণ— এসবের সমন্বয়েই সততার প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সততার চর্চা করে, তারা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে; আর যেখানে সততার ঘাটতি দেখা দেয়, সেখানে ধীরে ধীরে আস্থা, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। 

কাথায় আছে, সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। এই কথার তাৎপর্য কেবল নৈতিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; ব্যক্তি ও সমাজজীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও এর সত্যতা প্রমাণ করে। অসততা হয়তো সাময়িক সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। 

সন্ত গুরু রবিদাস তার বাণীতে বাহ্যিক ধর্মীয় আড়ম্বরের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো— কপালে তিলক, হাতে জপমালা বা বিশেষ পোশাক ধারণ করলেই কেউ সত্যিকার অর্থে ধার্মিক বা সৎ হয়ে ওঠেন না। প্রকৃত সাধুতা মানুষের চরিত্র, আচরণ ও মানবিকতায় প্রকাশ পায়। একই শিক্ষা আমরা সন্ত কবীর দাসসহ বহু সাধক ও মনীষীর বাণীতেও দেখতে পাই। তাদের মূল আহ্বান ছিল— মানুষ যেন ভণ্ডামি নয়, সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথ অনুসরণ করে। 

বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সময়ে সময়েই ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কোনো প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কেবল তার ঐতিহ্য বা পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিক মানদণ্ডের ওপর। যেখানে দানের অর্থ, জনসম্পদ বা মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। 

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজন দায়িত্বশীল মানুষের অপরাধ বা অনিয়মের দায় পুরো ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা প্রতিষ্ঠানের ওপর আরোপ করা ন্যায়সংগত নয়। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিচার্য। আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে প্রত্যেক অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষী প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষের সম্মানও অক্ষত্নু রাখতে হবে। 

সততার অভাব কেবল আর্থিক দুর্নীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। মিথ্যা, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার— এসবও অসততারই বিভিন্ন রূপ। ব্যক্তি যখন নিজের স্বার্থকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তখন সমাজে অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। 

সন্ত কবীর দাস বলেছেন—  ‘রাম নামকে লুট হে তো লুট, / অন্ত কাল মে পস্তায়েগা, যব প্রাণ যায়েগা ছুট। ’

এই বাণীর মূল শিক্ষা হলো, ধর্ম বা নৈতিকতার নামে প্রতারণা করে সাময়িক লাভবান হওয়া সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত তার পরিণতি অনুশোচনা ছাড়া আর কিছু নয়। সত্য ও সততার বিকল্প নেই। 

আজকের বিশ্বে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতই হোক, নৈতিকতার ভিত্তি দুর্বল হলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটি দেশের অগ্রগতি নির্ভর করে শুধু সম্পদের ওপর নয়; বরং নাগরিকের সততা, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং আইনের সুশাসনের ওপরও। তাই পরিবারে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা সময়ের দাবি। 

সততা এমন একটি মূল্যবোধ, যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, জাতি বা দেশের সম্পদ নয়; এটি মানবজাতির সার্বজনীন নৈতিক আদর্শ। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—  সবার কল্যাণের জন্যই সততার চর্চা অপরিহার্য। বাহ্যিক পরিচয় নয়, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার চরিত্র, কর্ম ও নৈতিকতার মাধ্যমে। এ কারণেই যুগে যুগে জ্ঞানীজন এক বাক্যে বলেছেন—  সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। 

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত