সংবাদ

সাহিত্য

মাসুদ খান-এর ১০টি নতুন কবিতা

মাসুদ খান-এর ১০টি নতুন কবিতা মধুফাঁদ ভ্রমরকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে নির্ঘাৎ ফাঁসিয়ে দেবে মধুফাঁদেতবে নিজে প্রচারিত হবে যেন নিষ্পালক, নিষ্পক্ষ, নির্দল।এই এক অভিনব মধুফাঁদ, যাকে বলে, মধুফাঁদ দুই দশমিক শূন্য, যার আসঞ্জনে, ব্যামোহে, আটকে পড়ামাত্র শিকার চূড়ান্তভাবে হয়ে পড়ে বিমর্ষ ও হীনম্মন্য। তুমি তো নিমিত্ত মাত্র, নিজধর্মে বশীভূত। এ জগতে, জানো তো, দংশনই ধর্ম, হিংসাই সর্বসার। তোমার এ উদ্যত ছোবলভঙ্গি তাই যথারীতি সুন্দর ও স্বাভাবিক লাগে। দ্রব্যে দ্রব্যে এত আঠা, এত আসঞ্জন বিষয়ে বিষয়ে এত বিষ, এত মোহঘোরসবকিছু মায়াত্মক, নেশা-নেশা, মনোহর!   ত্রাণ তোমাদের গ্রহে ফিরোজা আকাশআমাদেরটায় হালকা-হালকা নীল আমাদের গ্রহ দুর্যোগে ভরাতোমাদের গ্রহে সবকিছু সাবলীল। তোমাদের গ্রহে তুমুল বর্ষা অথচ এখানে জীবনবিনাশী খরা।আমাদের গ্রহে সবই চৌচিরতোমাদের গ্রহ সুফলা, স্বয়ম্ভরা। তোমাদের গ্রহে বৃষ্টি বাজত বহু নূপুরের একটানা নিক্বণে। আমাদের গ্রহে মেঘেরা জমত তোমাদের সেই বৃষ্টির স্পন্দনে। স্পন্দনগুলি এই বছরেওপাঠিয়ে দিয়ো তো আমাদের নীল গ্রহে।এই গ্রহ বাঁচে তোমাদের ওই দয়ামায়াময় গ্রহেরই অনুগ্রহে। আবার জাগুক দাদুর-দাদুরি--মকমকি আর অবিরাম জলকেলি।ঝাঁক ঝাঁক কই বিল থেকে উঠে আসুক পেরিয়ে ধানখেত বেলাবেলি। ইলশেগুঁড়ির সঙ্গে আবার ঝরুক প্রচুর প্রিয় ইলিশের পোনাজীব জড় সব উদবাহু হয়ে গাইতে থাকুক বৃষ্টির বন্দনা।  উৎসর্গিতা  ওগো রূপনিধি,আজও জানি না যে কোন বংশে তুমি হয়েছিলে লীলায়িতা, কবে, কতকাল আগে! আর এখনই-বা কোন বংশে দিচ্ছ ছড়িয়ে তোমার প্রফুল্ল পল্লব, ওহে অভিনব!   আজ ভাবি-- সহোদরা না হয়ে কেন যে হয়েছিলে ভিনগ্রহী, ভিন্নভাষী, অন্যা, অন্যোদরা! তবে কি আমারই ভাষ্যান্তররূপে, আমারই নিষ্ক্রয় হয়ে তুমি উৎসর্গিতা হয়ে আছো ঝলমলে ছায়াপথে? এই যে ধারণাতীত মহাকাশ ও কারণাতীত মহাকাল, এসবেরই কোনো এক অস্থির স্থানাঙ্কে?   রূপ ও স্বরূপ হাজার তারার ভিড়ে তোমায় দেখব এক ঝলক  দেখতে তোমার রূপ ও স্বরূপ তাকাই নিষ্পলক। এমন করেই তাকিয়ে আছি বহু জন্ম ধ’রে কৌতূহলে কুম্ভ থেকে প্রাণ ছলকে পড়ে।    যুগে যুগে পালক খসে শ্যাওলা জমে চোখেহড়কে পড়ি চোখ-ধাঁধানো রূপজ্যোৎস্নালোকে। জং ধরে যায় চঞ্চু ডানায়ঘটে পদস্খলন এমনি করেই দিনে দিনে আমার অধঃপতন। ক্ষুৎপিপাসায় অনঙ্গ-প্রায়যায় শুকিয়ে মনচেয়ে থাকাই চাতক পাখির জীবন, উজ্জীবন।   তবু আমার নেই অনুযোগ শত প্রবঞ্চনায় তাকিয়ে থাকাই ধর্ম আমার নীরব উপাসনা।     মহীরুহ ভয়ংকর যুদ্ধ। সমগ্র এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে সবাই--যত ভূচর খেচর জলচর, ভূতপ্রেত, জিন ও ইনসান,এমনকী কীট-কীটাণু, পোকা-পতঙ্গ, অণুজীব-জীবাণুরাও। পালিয়েছে ঘরবাড়ি, আসবাব, যন্ত্র, যানবাহন ও কতশত দ্রব্যসামগ্রী। পালিয়েছে দিঘি ও নদীর পানি, জলযানসহ।একেবারে ধূলি ও ধোঁয়া হয়ে পালিয়ে গেছে জড় ও অজড় বহুকিছু।  দীর্ঘ যুদ্ধের এক পর্যায়ে, কী এক ভৌতিক কারণে যুদ্ধ ফেলে পালিয়েছে সব যোদ্ধা, দু-পক্ষেরই।  পালায়নি কেবল বৃক্ষেরা। ঝাঁঝরা দেহে দাঁড়িয়ে আছে ভাবলেশহীন রণাঙ্গন জুড়ে এখানে ওখানেনির্বাক, অটল মহীরুহ।     জীবন এই যে জীবন, এ তো আর কিছু নয়--যেন এক আমরণ অনশনপর্ব চলা-কালে লুকিয়ে অশন-গ্রহণের মতো কোনো আয়োজিত ফাঁকি। আটকে-পড়া শিশুহাতিটিকে উদ্ধারের সকরুণ আবেদন নিয়ে ছুটে আসে নিরুপায় মা-হাতি, দয়ামায়াহীন মানুষের কাছে। উড়ালবিমুখ ছোট্ট রোড-রানার পাখির কাছে অবলীলায় হেরে যায় কখনো কখনো কোনো চৌকস চিতাবাঘ।    সহসাই নানারূপ সামাজিক ভূকম্প, সুনামি, অস্থিরতা, দলে দলে গৃহত্যাগ... ওগুলিও আর কিছু নয়--এক অবদমিত ইতিহাসের আচমকা খোঁয়ারি-বমন।দীর্ঘ অবদমনের শেষে দুর্লভ লাভার উদ্গিরণ, আরো পরে হিমবাহ, হিমানিপ্রপাত... তবে পোশাক যে শুধু রোদ শীত ধূলি কাদা নিবারণ করে তা-ই নয়,নিবারণ করে আমাদের লালিত লজ্জাও।   বিশ্ব-বন্দোবস্ত  তারা ভাবে বিবাদী ভাষায়, বিসংবাদী স্বরেতবে কথা বলে সমবাদী মিত্রাক্ষরে।  ক্ষণে ক্ষণে কামোদয় হয় মনে-- স্বভাবসূত্রেই তারা তো কামতাত্ত্বিক  অবদমনের শেষে কামার্ত আবার, শুধু হাবভাবে নিষ্কাম, সাত্ত্বিক। শ্মশানশিল্পীর নিরাবেগ চিতা-সাজানোর কারুকাজ, পরপরই দাহকৃত্য...দাহশেষে সেই ছাই, সে-ভস্মবিভূতি গায়ে মেখে মশানের ব্যোমভোলা নৃত্য।  যে খড়ম-পায়ে পার হয় তারা নদনদী, যোজক-প্রণালি, যত সাগর-মহাসাগরসে-খড়ম গনগনে, খরতীক্ষ্ণ তারকাঁটা-মারা, তেজস্কর। ঝলমলে সাজে সেজে আসে তারা বারবার, রঙিলা সওদাগর।       দুর্ঘটনা সেই কবে এক দৈত্যাকার গ্রহ ছুটে এসে পৃথিবীকে সাড়ে তেইশ ডিগ্রি ত্যাড়া করে দিয়েছিল বলেই তো আজ এই গ্রহটিতে এত-এত প্রাণ, এত আকর্ষণ, সুর,সৌরভ, বাৎসল্য, প্রেম, নিষ্ঠুরতা, দগদগে বিদ্বেষ, হিংসা ও রিরংসা-রসে সব একাকার...  দস্তখত মন্ত্রপাঠকালে মান্ত্রিকেরও দেহে জাগে সাময়িক তান্ত্রিকতা। প্রথমে পঞ্চ ম-কার, পরে তীব্র তন্নিষ্ঠ সাধনা। অতঃপর মাঝে-মাঝে উপবাস। সবশেষে অশেষ আমিষ ছেড়ে হবিষ্যের দিকে অভিযাত্রা--ক্রমশ গার্হস্থ্য থেকে বৈরাগ্য ও ধু-ধু বানপ্রস্থ... প্রত্যেকেই রেখে যায় জগতে, কোনো-না-কোনোভাবে,নিজস্ব একক জৈবস্বাক্ষরশোভিত একপৃষ্ঠার একটি অলংকৃত দরখাস্ত।   হেত্বাভাস কোনটি যে সত্য আর কোনটি যে মিথ্যা!সবই দেখি একাকার উন্মাদ অস্থির প্রহেলিকা।  একটানা এই বিভ্রমের যুগে পরিত্রাণহীন সত্য-মিথ্যার জগতে, এই সঘন সংশয়ে,কোথায়-বা পাওয়া যাবে এত-এত কর্তুকাম ফ্যাক্ট চেকার! আরকেন-বা দরিদ্র দেশে এতটা প্রবল হয় একইসঙ্গে বৈষয়িক আর আধ্যাত্মিক, ধর্ম ও অধর্মবাদী অধৈর্য চাহিদা! **কবি পরিচিতিমাসুদ খানের জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী। বসবাস কানাডার টরন্টোতে। শিক্ষকতা করেন টরন্টোর সেন্টেনিয়াল কলেজে।     প্রকাশিত গ্রন্থ:পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩, পুনঃপ্রকাশ ২০১৯)-- কবিতা।  নদীকূলে করি বাস (২০০১)-- কবিতা। সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬)-- কবিতা। আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১)-- কবিতা। এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪)-- কবিতা।  দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫)--গদ্য-আলেখ্য। প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (২০১৬)-- উপন্যাস। প্রসন্ন দ্বীপদেশ (২০১৮)-- কবিতা। গদ্যগুচ্ছ (২০১৮)-- প্রবন্ধ-নিবন্ধ। শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১৮)।  পাখপাখালির গান পাগলাঝোরার তান (২০১৯)-- ছড়াকবিতা। ঊর্মিকুমার ঘাটে (২০২০)-- কবিতা। দুঃস্বপ্নের মধ্যপর্ব (২০২২)-- কবিতা। কবিতাসংগ্রহ (২০২৫)।  বিছুটিপাতার অটোগ্রাফ (২০২৬)-– কবিতা।        পুরস্কার/সম্মাননা:বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার, ১৯৯৪। জীবনানন্দ সাহিত্য পুরস্কার, ২০১৬। বাংলা একাডেমি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পুরস্কার, ২০১৭। প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার ১৪২৪, ২০১৯। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা), ২০২৪।    

মাসুদ খান-এর ১০টি নতুন কবিতা