সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ১৪

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৬ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চার.

মনসুর পাগলা বসে আছে বসতঘর ও পাকঘরের কাছাকাছি উঠোনের দক্ষিণে একচিলতে রোদের ভেতর। রোদ থেকে সে যে খুব একটা ওম পাচ্ছে, তা নয়। তারপরও সে গায়ে চাদর পেঁচিয়ে জবুথবু হয়ে একটা পিড়ির ওপর বসে আছে। রোদের খানিকটা দূরের ছায়ার একটা স্পষ্ট দাগ। বসতঘর ও পাকঘরের মাঝখানে যে বেশ বড় ও পুরোনো কাঁচামিঠা আমগাছটা আছে, সেটারই ছায়া। সূর্যটা পুবের আকাশ বেয়ে যত উপরে উঠছে, আমগাছটার ছায়া তার পায়ের দিকে ততই এগোচ্ছে। ছায়ার ভেতর একটা মুরগি পাঁচটা ছা-সহ হাঁটছে। একটা কাক ডাকছে পাকঘরের চাল থেকে। একটা ঘুঘু ডাকছে কোনো একটা গাছ থেকে- ক্রু-কু-কুউ-কু, ক্রু-কু-কুউ-কু।

মনসুর পাগলা ঘুঘুটাকে দেখার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই সে আরেকটা পাখির ডাক শুনল— টুক-অ-রুক, টুক-অ-রুক, টুক টুক টুক। সেকরা পাখি। কাঠ ঠুকরায়। সে পাখিটাকে চিনে। আনিসের সঙ্গে থেকে থেকে সে অনেক পাখিই চিনেছে। আনিস অবশ্য এই পাখিটাকে ডাকে ‘বসন্তবৌরি’ বলে।

মনসুর পাগলা ভাবল, এখন ফাল্গুন মাস নয়, সেকরা পাখি ডাকছে কেন? তার আনিসের কথা মনে পড়ল। সে আশা করেছিল আনিস অন্তত জেলখানার গেটে তাকে আনতে যাবে। তার জন্য সে উকিল ঠিক করেছে। উকিলের পেছনে বেশ টাকাপয়সা খরচ করেছে। কিন্তু গতকাল সে গেট থেকে বের হয়ে দেখে, গেটের কাছে আনিস থাক দূরের কথা পরিচিত কেউ নেই। হাত একেবারে খালি দেখে এডভোকেট আতিকুল হক কী ভেবে তাকে পাঁচশো টাকার একটি নোট ধরিয়ে দেন।

মনসুর পাগলার জামিন মঞ্জুরের রায় এসেছিল পরশুদিন। পরশুদিনই এডভোকেট আতিকুল হক বন্ড দাখিল করেন। গতকাল সকালে রিলিজ অর্ডার নিয়ে কারাকর্তৃপক্ষের কাছে যান। কারাকর্তৃপক্ষ দুপুরের মধ্যে কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেয়। প্রায় দুই বছর সাত মাস পর সে মুক্তি পায়।

কুমিল্লা থেকে বাড়ি ফিরতে তার বেশিক্ষণ লাগার কথা নয়। মনসুর পাগলা সন্ধ্যার মধ্যেই বাড়ি ফিরতে পারত। কিন্তু সে জেলগেট থেকে সরাসরি শাসনগাছা নূরজাহান রেস্তোরাঁয় যায়। সেখানে আয়াস করে পেটভরে মুরগির গোস্ত ও মুগডাল দিয়ে ভাত খেয়ে ফুটপাত ধরে অনেকক্ষণ ঘোরে। তারপর ফুটপাত থেকেই থেকে দেড়শো টাকা দিয়ে একটা শার্ট ও দেড়শো টাকা দিয়ে একটা প্যান্ট কিনে। পুরোনো কাপড়গুলো ফেলে সেই প্যান্ট-শার্ট পরে বাবু সেজে সে বিকেল পড়ে যাওয়ার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনসুর পাগলার অনেক রাত হয়ে যায়। তার এই বেশি রাত করে বাড়ি ফেরার অবশ্য আরেকটা কারণ ছিল। সে উপজেলা নৌকাঘাট থেকে গোমতী নদী ধরে বাড়ি ফেরার কোনো নৌকা পাচ্ছিল না। যদিও সুদিন মাস। তারপরও সচরাচর ঘাটে বেশ নৌকা থাকে। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখে, ঘাটে নৌকা একদম কমে গেছে। যে দুই-চারটা নৌকা দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো মালবাহী নৌকা। পরে সে ঘাটের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, তাদের গ্রামের দিকে হাঁটার নতুন পথ হয়েছে বলে গোমতীতে নৌকার বাহন কমে গেছে। মানুষ হেঁটেই গ্রামে চলে যায়।

মনসুর পাগলা পরে হেঁটেই গ্রামে আসে। নতুন আইল ধরে আসতে গিয়ে রাতের আঁধারে গ্রামগুলোকে সে চিনতে পারে না। আঁধারিয়া গ্রামকে তো একদম না। সারাজীবন সুদিন বা বর্ষার মওসুমে গোমতী নদী ধরে নৌকায় করে উত্তর দিক দিয়ে গ্রামে ঢুকতে হয়েছে। কিন্তু গতরাতে সে এসেছে গ্রামের দক্ষিণ দিক দিয়ে। মাত্র দুই বছর সাত মাসে সে গ্রামে এত পরিবর্তন দেখছে!

আঁধারিয়াতে তখন মাঝরাত না হলেও কেমন একটা নিস্তব্ধতা নেমেছিল পুরো গ্রামে। গতরাতেও গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। রাতটা ছিল অমাবস্যার। ভুঁইয়াবাড়ির কোনো কোনো ঘর থেকে জানালা গলে হারিকেনের আলো বাইরে এসে পড়ছিল। মনসুর পাগলা নতুন রাস্তা থেকে শুধুমাত্র আনিসদের ভুঁইয়াবাড়ি ঠাহর করে বুইদ্দার বিলে নেমে এসে তারপর নিজেদের বাড়িটা চিনে নেয়।

বাড়িতে এসে উঠোনের মাঝখানে মনসুর পাগলা বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারাগারে থেকে সে এটুকু অনুভব করেছে, বুঝ হওয়ার পর থেকে সে সত্যি তার মার সঙ্গে সবসময় খারাপ ব্যবহার করে এসেছে। সে তার মাকে একদম সহ্য করতে পারত না। কয়েকবার গায়েও হাত তুলেছে। সে কেন তার মাকে সহ্য করতে পারত না, এর পেছনে হয়তো বেশ কিছু কারণ আছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ তার বাবার মৃত্যুটা। কিন্তু এই দীর্ঘ দুই বছর সাত মাস কারাগারে সে তার মাকে না দেখে, নিঃসঙ্গ কুঠুুরিতে দিনের পর দিন কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, কোনোদিন জেল থেকে বের হলে সে আর মা’র সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না। অযথা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে না। গায়ে হাত তোলা তো আর কোনোকালেই না। তারপরও উঠোনে দাঁড়িয়ে সে তার মাকে ডাকতে পারে না। দরজায় করাঘাত করে।

আনিসের প্রতিও মনসুর পাগলার অভিমান আছে। সে কতবার তার কথা এডভোকেট আতিকুল হক চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করেছে! সে একবারই তাকে জেলে দেখতে এসেছিল। মাত্র কিছুক্ষণের জন্য। তাদের মধ্যে সেদিন কোনো কথাই হয়নি। তারপর আনিস আর কোনোদিন জেলে দেখা করতে আসেনি।

মনসুর পাগলা ভাবল, জেলের কত কথা তার ভেতর জমা আছে! আনিসকে না বলা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। সেই ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। এ জীবনে তার যত কথা, তা তো শুধু আনিসের সঙ্গেই হয়েছে। আনিসও কখনও তাকে দূরের মানুষ ভাবেনি, সবসময় আপনজনের মতো আগলে রেখেছে।

মনসুর পাগলা সিদ্ধান্ত নিল, রোদ একটু তেতে উঠলেই সে আনিসদের বাড়িতে যাবে। এমনিই বাড়িটা একটু ঘুরে আসবে। সে জানে, আনিস স্কুলের চাকরি ছেড়ে ঢাকা চলে গেছে। পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে চাকরি নিয়েছে। ঢাকায় গিয়ে সে এখন বড় বড় কবিতা লেখে...।

কাঁচামিঠা আমগাছটির ছায়া এরই মধ্যে বাড়তে বাড়তে মনসুর পাগলার পায়ের কাছে চলে এসেছে। কাকের ডাকটা নেই। এমনকি ঘুঘুর ডাকটাও না। সেকরা পাখির ডাকটাও থেমে গেছে। দক্ষিণ পাড়ার কারও বাড়ি থেকে একটা গরুর ডাক আসছে— হাম্বা-অ-অ। উঠোনের অন্যপাশ থেকে মুরগিটার ডাক— কিক কিক, কিক কিক। মা-মুরগিটার সঙ্গে ছাগুলো সমস্বরে সাড়া দিচ্ছে— কিচ কিচ, কিচ কিচ। তার মা কমলা খাতুন তখনই পিছদোর ধরে বের হয়ে এলো। মা’র হাতে একটা টুকরি। টুকরিতে মুড়ি।

টুকরিতে মুড়ি দেখে মনসুর পাগলা প্রসন্ন হয়ে মা’র দিকে তাকাল। কিন্তু কমলা খাতুন ছেলের দিকে ঠিক প্রসন্ন হয়ে তাকাতে পারল না। তার মধ্যে ছেলেকে নিয়ে বেশ দ্বিধা। গতকাল রাতেই ছেলের নরম ব্যবহার ও আন্তরিক মা ডাক শুনে সে দ্বিধায় পড়ে আছে। ছেলেকে তো সে এভাবে কখনও দেখেনি। ছেলের অত্যাচার, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও নির্যাতন দেখতে দেখতে এতগুলো বছর পার করেছে। তার একদিনেই সেই দ্বিধা কীভাবে কাটবে? তাই সে কাঠদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল।

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘মা, তোমার মুড়ি কই, তুমি খাইবা না?’

কমলা খাতুন আগের মতোই কাঠদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কোনো জবাব দিতে পারল না।

মনসুর পাগলা কমলা খাতুনকে আবার কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে ঠিক তখনই দেখল মমিনা পিছদোরের সরুপথটা ধরে তাদের ইশায় ঢুকছে।

মমিনা খানিকটা দূর থেকেই মনসুর পাগলাকে দেখে উচ্ছ্বসিত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আরে, ভাইজান যে! তুমি ছাড়া পাইছ কখন? আমি দূর থাইকা পুরুষ মানুষের গলা শুনতেছিলাম। ভাবতেছিলাম, কেডা আইছে অইখানে। তাই দেখবার আইলাম।’

মনসুর পাগলা একটু হেসে সায় দিয়ে বলল, ‘আমি কাইল দুপুরবেলায় ছাড়া পাইছি।’

‘তয় কাইলকা বাড়িত আসো নাই ক্যান?’

‘কাইলকাই তো আইছি।’

‘কাইলকা সইন্ধ্যাবেলা পর্যন্ত তো তোমাগো ঘরে আছিলাম। বড়চাচির কাছ থাইকা তো শুনি নাই?’

‘তোরা কি কোনো খোঁজখবর রাখছস যে আমার খবর পাইবি?

‘তা অবশ্যি ঠিক কইছো। আমি বেডিমানুষ কি কুমিল্লা যাইতে পারি?

মনসুর পাগলা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, ‘হেইডা ঠিক, তুই ক্যামনে কুমিল্লা যাইবি? তয় আমার কাইল বাড়িত আইতে আইতে অনেক রাইত হইয়া গেছিল।’

মমিনা বলল, ‘ও, হেইডা কও। আসলে তুমি বাড়িত নাই, এতদিন বাড়িডা কেমুন খাইলা খাইলা লাগতেছিল।’

মনসুর পাগলা হেসে বলল, ‘তুই হাছা কইতাছস?’

মমিনাও হেসে বলল, ‘আমি মিছা কমু ক্যান?

‘কইতেও তো পারস। তুই তো সারাজীবনই আমার লগে মিছা কথা কইয়া আইছস।’

‘মোটেও না, ভাইজান। তুমি জেলে বইসা মনে হয় রসিকতা শিক্ষা আইছো।

মনসুর পাগলা প্রথমে হাসল। তারপর একটা ভারি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘হইতেও পারে।’

কমলা খাতুন এতক্ষণ পর কথা বলল। তবে ছেলের সঙ্গে নয়, মমিনার সঙ্গে। সে মমিনাকে বলল, ‘মমিনা, তুই বস। আমি তোর লাইগা মুড়ি লইয়া আইতাছি।’

মনসুর পাগলা মোলায়েম গলায় বলল, ‘মা, তোমার লাইগাও মুড়ি আইন্ন।’

কমলা খাতুন মুড়ির জন্য বসতঘরের দিকে যেতে গিয়ে একটু থামল। এবার খানিকটা দ্বিধা কাটিয়ে ছেলের দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু বেশিক্ষণ সে তাকিয়ে থাকতে পারল না। পাছে আবার তার মনের ভেতর দ্বিধা চলে আসে, তাই সে তাড়াতাড়ি বসতঘরের ভেতর ঢুকে গেল।

মমিনা পাকঘর থেকে আরেকটা পিড়ি এনে মনসুর পাগলার কাছাকাছি রোদে বসল।

মনসুর পাগলা এবার প্রশস্ত দৃষ্টিতে মমিনাকে দেখল। মমিনা বরাবরই ফরসা ও সুন্দরী। কিন্তু সে জেলে যাওয়ার আগে যে শুকনা-চিকনা মমিনাকে দেখে গেছে, এখন সেই মমিনা আর নেই। শরীরে খানিকটা ভারিক্কি ভাব। চেহারা আরও গোলগাল হয়েছে। এতে তাকে আরও অনেক সুন্দর লাগছে।

মমিনা নিজ থেকেই বলল, ‘ভাইজান, আমার একটা বিশ্বাস আছিল, তোমারে বেশিদিন জেলে আটকাইয়া রাখবার পারবে না। তুমি তো কোনো অন্যায় করো নাই। সেতারা ভাবী তো গোমতী গাঙে ডুইবা মরছে। এতে তোমার দোষটা কী আছিল?’

মনসুর পাগলা সায় দিয়ে বলল, ‘আমারও তো হেই কথা। আমার বউ তো গাঙে ডুইবা মরছে। পুলিশ হুদাহুদাই আমারে ধইরা লইয়া গেছে। তারপরও দেখ, আমারে আড়াই বছরের ওপরে জেলে আটকাইয়া রাখছে।’

মমিনা অসন্তোষের গলায় বলল, ‘পুলিশের কাম না? আর আমাগো ছালেক মেম্বর কামডা খুব খারাপ করছিল। হের লাইগাই আপনের এই ভোগান্তি হইছে।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘তুই দেখিস, আমি ছালেক মেম্বররে দেইখা ছাড়মু।’

মমিনা মাথা নেড়ে বলল, ‘না ভাইজান, তুমি আর ঝামেলায় জড়ায়ো না। এমনেই একটা ঝামেলা থাইকা ছাড়া পাইয়া আইছ।’

মনসুর পাগলা সায় দিয়ে বলল, ‘তুই অবশ্যই ঠিক কইছস, মমিনা। একদম ঠিক কইছস।’ ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

দ্বিতীয় পর্ব: মমিনার জীবন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চার.

মনসুর পাগলা বসে আছে বসতঘর ও পাকঘরের কাছাকাছি উঠোনের দক্ষিণে একচিলতে রোদের ভেতর। রোদ থেকে সে যে খুব একটা ওম পাচ্ছে, তা নয়। তারপরও সে গায়ে চাদর পেঁচিয়ে জবুথবু হয়ে একটা পিড়ির ওপর বসে আছে। রোদের খানিকটা দূরের ছায়ার একটা স্পষ্ট দাগ। বসতঘর ও পাকঘরের মাঝখানে যে বেশ বড় ও পুরোনো কাঁচামিঠা আমগাছটা আছে, সেটারই ছায়া। সূর্যটা পুবের আকাশ বেয়ে যত উপরে উঠছে, আমগাছটার ছায়া তার পায়ের দিকে ততই এগোচ্ছে। ছায়ার ভেতর একটা মুরগি পাঁচটা ছা-সহ হাঁটছে। একটা কাক ডাকছে পাকঘরের চাল থেকে। একটা ঘুঘু ডাকছে কোনো একটা গাছ থেকে- ক্রু-কু-কুউ-কু, ক্রু-কু-কুউ-কু।

মনসুর পাগলা ঘুঘুটাকে দেখার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই সে আরেকটা পাখির ডাক শুনল— টুক-অ-রুক, টুক-অ-রুক, টুক টুক টুক। সেকরা পাখি। কাঠ ঠুকরায়। সে পাখিটাকে চিনে। আনিসের সঙ্গে থেকে থেকে সে অনেক পাখিই চিনেছে। আনিস অবশ্য এই পাখিটাকে ডাকে ‘বসন্তবৌরি’ বলে।

মনসুর পাগলা ভাবল, এখন ফাল্গুন মাস নয়, সেকরা পাখি ডাকছে কেন? তার আনিসের কথা মনে পড়ল। সে আশা করেছিল আনিস অন্তত জেলখানার গেটে তাকে আনতে যাবে। তার জন্য সে উকিল ঠিক করেছে। উকিলের পেছনে বেশ টাকাপয়সা খরচ করেছে। কিন্তু গতকাল সে গেট থেকে বের হয়ে দেখে, গেটের কাছে আনিস থাক দূরের কথা পরিচিত কেউ নেই। হাত একেবারে খালি দেখে এডভোকেট আতিকুল হক কী ভেবে তাকে পাঁচশো টাকার একটি নোট ধরিয়ে দেন।

মনসুর পাগলার জামিন মঞ্জুরের রায় এসেছিল পরশুদিন। পরশুদিনই এডভোকেট আতিকুল হক বন্ড দাখিল করেন। গতকাল সকালে রিলিজ অর্ডার নিয়ে কারাকর্তৃপক্ষের কাছে যান। কারাকর্তৃপক্ষ দুপুরের মধ্যে কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেয়। প্রায় দুই বছর সাত মাস পর সে মুক্তি পায়।

কুমিল্লা থেকে বাড়ি ফিরতে তার বেশিক্ষণ লাগার কথা নয়। মনসুর পাগলা সন্ধ্যার মধ্যেই বাড়ি ফিরতে পারত। কিন্তু সে জেলগেট থেকে সরাসরি শাসনগাছা নূরজাহান রেস্তোরাঁয় যায়। সেখানে আয়াস করে পেটভরে মুরগির গোস্ত ও মুগডাল দিয়ে ভাত খেয়ে ফুটপাত ধরে অনেকক্ষণ ঘোরে। তারপর ফুটপাত থেকেই থেকে দেড়শো টাকা দিয়ে একটা শার্ট ও দেড়শো টাকা দিয়ে একটা প্যান্ট কিনে। পুরোনো কাপড়গুলো ফেলে সেই প্যান্ট-শার্ট পরে বাবু সেজে সে বিকেল পড়ে যাওয়ার পর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনসুর পাগলার অনেক রাত হয়ে যায়। তার এই বেশি রাত করে বাড়ি ফেরার অবশ্য আরেকটা কারণ ছিল। সে উপজেলা নৌকাঘাট থেকে গোমতী নদী ধরে বাড়ি ফেরার কোনো নৌকা পাচ্ছিল না। যদিও সুদিন মাস। তারপরও সচরাচর ঘাটে বেশ নৌকা থাকে। কিন্তু সে অবাক হয়ে দেখে, ঘাটে নৌকা একদম কমে গেছে। যে দুই-চারটা নৌকা দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো মালবাহী নৌকা। পরে সে ঘাটের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, তাদের গ্রামের দিকে হাঁটার নতুন পথ হয়েছে বলে গোমতীতে নৌকার বাহন কমে গেছে। মানুষ হেঁটেই গ্রামে চলে যায়।

মনসুর পাগলা পরে হেঁটেই গ্রামে আসে। নতুন আইল ধরে আসতে গিয়ে রাতের আঁধারে গ্রামগুলোকে সে চিনতে পারে না। আঁধারিয়া গ্রামকে তো একদম না। সারাজীবন সুদিন বা বর্ষার মওসুমে গোমতী নদী ধরে নৌকায় করে উত্তর দিক দিয়ে গ্রামে ঢুকতে হয়েছে। কিন্তু গতরাতে সে এসেছে গ্রামের দক্ষিণ দিক দিয়ে। মাত্র দুই বছর সাত মাসে সে গ্রামে এত পরিবর্তন দেখছে!

আঁধারিয়াতে তখন মাঝরাত না হলেও কেমন একটা নিস্তব্ধতা নেমেছিল পুরো গ্রামে। গতরাতেও গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। রাতটা ছিল অমাবস্যার। ভুঁইয়াবাড়ির কোনো কোনো ঘর থেকে জানালা গলে হারিকেনের আলো বাইরে এসে পড়ছিল। মনসুর পাগলা নতুন রাস্তা থেকে শুধুমাত্র আনিসদের ভুঁইয়াবাড়ি ঠাহর করে বুইদ্দার বিলে নেমে এসে তারপর নিজেদের বাড়িটা চিনে নেয়।

বাড়িতে এসে উঠোনের মাঝখানে মনসুর পাগলা বেশ কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারাগারে থেকে সে এটুকু অনুভব করেছে, বুঝ হওয়ার পর থেকে সে সত্যি তার মার সঙ্গে সবসময় খারাপ ব্যবহার করে এসেছে। সে তার মাকে একদম সহ্য করতে পারত না। কয়েকবার গায়েও হাত তুলেছে। সে কেন তার মাকে সহ্য করতে পারত না, এর পেছনে হয়তো বেশ কিছু কারণ আছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ তার বাবার মৃত্যুটা। কিন্তু এই দীর্ঘ দুই বছর সাত মাস কারাগারে সে তার মাকে না দেখে, নিঃসঙ্গ কুঠুুরিতে দিনের পর দিন কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, কোনোদিন জেল থেকে বের হলে সে আর মা’র সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না। অযথা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে না। গায়ে হাত তোলা তো আর কোনোকালেই না। তারপরও উঠোনে দাঁড়িয়ে সে তার মাকে ডাকতে পারে না। দরজায় করাঘাত করে।

আনিসের প্রতিও মনসুর পাগলার অভিমান আছে। সে কতবার তার কথা এডভোকেট আতিকুল হক চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করেছে! সে একবারই তাকে জেলে দেখতে এসেছিল। মাত্র কিছুক্ষণের জন্য। তাদের মধ্যে সেদিন কোনো কথাই হয়নি। তারপর আনিস আর কোনোদিন জেলে দেখা করতে আসেনি।

মনসুর পাগলা ভাবল, জেলের কত কথা তার ভেতর জমা আছে! আনিসকে না বলা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। সেই ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। এ জীবনে তার যত কথা, তা তো শুধু আনিসের সঙ্গেই হয়েছে। আনিসও কখনও তাকে দূরের মানুষ ভাবেনি, সবসময় আপনজনের মতো আগলে রেখেছে।

মনসুর পাগলা সিদ্ধান্ত নিল, রোদ একটু তেতে উঠলেই সে আনিসদের বাড়িতে যাবে। এমনিই বাড়িটা একটু ঘুরে আসবে। সে জানে, আনিস স্কুলের চাকরি ছেড়ে ঢাকা চলে গেছে। পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে চাকরি নিয়েছে। ঢাকায় গিয়ে সে এখন বড় বড় কবিতা লেখে...।

কাঁচামিঠা আমগাছটির ছায়া এরই মধ্যে বাড়তে বাড়তে মনসুর পাগলার পায়ের কাছে চলে এসেছে। কাকের ডাকটা নেই। এমনকি ঘুঘুর ডাকটাও না। সেকরা পাখির ডাকটাও থেমে গেছে। দক্ষিণ পাড়ার কারও বাড়ি থেকে একটা গরুর ডাক আসছে— হাম্বা-অ-অ। উঠোনের অন্যপাশ থেকে মুরগিটার ডাক— কিক কিক, কিক কিক। মা-মুরগিটার সঙ্গে ছাগুলো সমস্বরে সাড়া দিচ্ছে— কিচ কিচ, কিচ কিচ। তার মা কমলা খাতুন তখনই পিছদোর ধরে বের হয়ে এলো। মা’র হাতে একটা টুকরি। টুকরিতে মুড়ি।

টুকরিতে মুড়ি দেখে মনসুর পাগলা প্রসন্ন হয়ে মা’র দিকে তাকাল। কিন্তু কমলা খাতুন ছেলের দিকে ঠিক প্রসন্ন হয়ে তাকাতে পারল না। তার মধ্যে ছেলেকে নিয়ে বেশ দ্বিধা। গতকাল রাতেই ছেলের নরম ব্যবহার ও আন্তরিক মা ডাক শুনে সে দ্বিধায় পড়ে আছে। ছেলেকে তো সে এভাবে কখনও দেখেনি। ছেলের অত্যাচার, অবহেলা, তাচ্ছিল্য ও নির্যাতন দেখতে দেখতে এতগুলো বছর পার করেছে। তার একদিনেই সেই দ্বিধা কীভাবে কাটবে? তাই সে কাঠদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইল।

মনসুর পাগলা জিজ্ঞেস করল, ‘মা, তোমার মুড়ি কই, তুমি খাইবা না?’

কমলা খাতুন আগের মতোই কাঠদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কোনো জবাব দিতে পারল না।

মনসুর পাগলা কমলা খাতুনকে আবার কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে ঠিক তখনই দেখল মমিনা পিছদোরের সরুপথটা ধরে তাদের ইশায় ঢুকছে।

মমিনা খানিকটা দূর থেকেই মনসুর পাগলাকে দেখে উচ্ছ্বসিত গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আরে, ভাইজান যে! তুমি ছাড়া পাইছ কখন? আমি দূর থাইকা পুরুষ মানুষের গলা শুনতেছিলাম। ভাবতেছিলাম, কেডা আইছে অইখানে। তাই দেখবার আইলাম।’

মনসুর পাগলা একটু হেসে সায় দিয়ে বলল, ‘আমি কাইল দুপুরবেলায় ছাড়া পাইছি।’

‘তয় কাইলকা বাড়িত আসো নাই ক্যান?’

‘কাইলকাই তো আইছি।’

‘কাইলকা সইন্ধ্যাবেলা পর্যন্ত তো তোমাগো ঘরে আছিলাম। বড়চাচির কাছ থাইকা তো শুনি নাই?’

‘তোরা কি কোনো খোঁজখবর রাখছস যে আমার খবর পাইবি?

‘তা অবশ্যি ঠিক কইছো। আমি বেডিমানুষ কি কুমিল্লা যাইতে পারি?

মনসুর পাগলা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিয়ে বলল, ‘হেইডা ঠিক, তুই ক্যামনে কুমিল্লা যাইবি? তয় আমার কাইল বাড়িত আইতে আইতে অনেক রাইত হইয়া গেছিল।’

মমিনা বলল, ‘ও, হেইডা কও। আসলে তুমি বাড়িত নাই, এতদিন বাড়িডা কেমুন খাইলা খাইলা লাগতেছিল।’

মনসুর পাগলা হেসে বলল, ‘তুই হাছা কইতাছস?’

মমিনাও হেসে বলল, ‘আমি মিছা কমু ক্যান?

‘কইতেও তো পারস। তুই তো সারাজীবনই আমার লগে মিছা কথা কইয়া আইছস।’

‘মোটেও না, ভাইজান। তুমি জেলে বইসা মনে হয় রসিকতা শিক্ষা আইছো।

মনসুর পাগলা প্রথমে হাসল। তারপর একটা ভারি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘হইতেও পারে।’

কমলা খাতুন এতক্ষণ পর কথা বলল। তবে ছেলের সঙ্গে নয়, মমিনার সঙ্গে। সে মমিনাকে বলল, ‘মমিনা, তুই বস। আমি তোর লাইগা মুড়ি লইয়া আইতাছি।’

মনসুর পাগলা মোলায়েম গলায় বলল, ‘মা, তোমার লাইগাও মুড়ি আইন্ন।’

কমলা খাতুন মুড়ির জন্য বসতঘরের দিকে যেতে গিয়ে একটু থামল। এবার খানিকটা দ্বিধা কাটিয়ে ছেলের দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু বেশিক্ষণ সে তাকিয়ে থাকতে পারল না। পাছে আবার তার মনের ভেতর দ্বিধা চলে আসে, তাই সে তাড়াতাড়ি বসতঘরের ভেতর ঢুকে গেল।

মমিনা পাকঘর থেকে আরেকটা পিড়ি এনে মনসুর পাগলার কাছাকাছি রোদে বসল।

মনসুর পাগলা এবার প্রশস্ত দৃষ্টিতে মমিনাকে দেখল। মমিনা বরাবরই ফরসা ও সুন্দরী। কিন্তু সে জেলে যাওয়ার আগে যে শুকনা-চিকনা মমিনাকে দেখে গেছে, এখন সেই মমিনা আর নেই। শরীরে খানিকটা ভারিক্কি ভাব। চেহারা আরও গোলগাল হয়েছে। এতে তাকে আরও অনেক সুন্দর লাগছে।

মমিনা নিজ থেকেই বলল, ‘ভাইজান, আমার একটা বিশ্বাস আছিল, তোমারে বেশিদিন জেলে আটকাইয়া রাখবার পারবে না। তুমি তো কোনো অন্যায় করো নাই। সেতারা ভাবী তো গোমতী গাঙে ডুইবা মরছে। এতে তোমার দোষটা কী আছিল?’

মনসুর পাগলা সায় দিয়ে বলল, ‘আমারও তো হেই কথা। আমার বউ তো গাঙে ডুইবা মরছে। পুলিশ হুদাহুদাই আমারে ধইরা লইয়া গেছে। তারপরও দেখ, আমারে আড়াই বছরের ওপরে জেলে আটকাইয়া রাখছে।’

মমিনা অসন্তোষের গলায় বলল, ‘পুলিশের কাম না? আর আমাগো ছালেক মেম্বর কামডা খুব খারাপ করছিল। হের লাইগাই আপনের এই ভোগান্তি হইছে।’

মনসুর পাগলা বলল, ‘তুই দেখিস, আমি ছালেক মেম্বররে দেইখা ছাড়মু।’

মমিনা মাথা নেড়ে বলল, ‘না ভাইজান, তুমি আর ঝামেলায় জড়ায়ো না। এমনেই একটা ঝামেলা থাইকা ছাড়া পাইয়া আইছ।’

মনসুর পাগলা সায় দিয়ে বলল, ‘তুই অবশ্যই ঠিক কইছস, মমিনা। একদম ঠিক কইছস।’ ক্রমশ...


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত