মঈনউদ্দিন মুনশীর ১৬টি নতুন কবিতা
অনিষ্ট
আগুন দৌড়াতে লাগলো
আতঙ্কগ্রস্তভাবে
এর ভস্ম থেকে।
রক্তিম আভার মধ্যে এর
প্রতিবিম্ব
চলচ্চিত্রের ঘূর্ণমাণ ছায়ার মতো পালিয়ে গেলো
মানুষের মাংস এবং রক্ত
থেকে।
আঘাতের চোখে ক্ষত চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হলো
বহু বছর পর।
রক্ত-বর্ণের ক্ষণিক চমক
ক্ষয়ে যায় নিষ্ঠুরভাবে!
কিন্তু ঐ প্রক্রিয়ার
কোনো অবকাশ নেই
থেমে যাবার,
যেন রেলগাড়ি টেনে নিয়ে
যাচ্ছে
এর ভগ্নাবশেষ !
সাজ
প্রস্তর,
মনুষ্য-দিন শেষে
তাতেই পরিণত ।
স্মৃতি,
স্মৃতি থেকে
স্মৃতিতে বিস্তৃত।
অশ্ব,
ভুলে যায় গাড়ির ওজন যখন
বন্ধন মুক্ত।
পান্থশালা
এক দ্রাক্ষালতা ঘিরে
রেখেছে বেষ্টনী
শান্ত- গভীর আগ্রহে,
যেন সমগ্র জলপ্রপাত !
আমার ত্বক অবসন্ন,
সংগ্রাম করে,
পূর্ব প্রত্যাশায়
দেখো, আমি কীভাবে বিষয়
পরিবর্তন করি
নিজেকে না বদলে,
আমি বলতে চাই–
যা বাহ্যত কিছুই না–
কিন্তু এটাই পদ্ধতি
কোনো বড় পরিবর্তন আনার
জন্য।
আমার মন একটা ভঙ্গির
মতো
যেন বৃক্ষের বিন্যাস–
ঘন, বিক্ষিপ্ত,
মোচাকৃতি,
একদিকে হেলানো, ঝালর–
আমার আগের প্রজার মনের
মতো !
চিত্রলিপি
নির্দেশ, ভাবাবেগ, ইন্দ্রিয় সব বাকশক্তিহীন।
অজ্ঞাত আনন্দ, শক্তি, এবং ধ্যান প্রসারিত করে আকাশ।
অনুভূতি কাছে টানে হৃদয় এবং অরণ্যের ভাষাকে,
তবুও মন রয়ে যায় নির্বাক।
দর্শন এক ভবিষ্যৎ শিশুকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়!
তৃতীয় বিশ্ব
ওরা তোমাকে বলে নতুন পৃথিবী, কিন্তু আমি চোখ বন্ধ করে দেখি,
শীতল একটা মেঘ ইতিহাস আবৃত করে রেখেছে।
দুঃখ প্রাচীন শব্দ।
এখন বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হয় প্রতিটি শব্দের ওপর,
প্রতিটি পঙ্ক্তির ওপর, যা লিখছি।
এই নীল দিনগুলো এবং এই শিশুকালের সূর্য হচ্ছে বৃষ্টি,
আত্মা ভিজিয়ে করেছে স্বতন্ত্র।
সমুদ্র ব্যথার আবাসস্থল ।
আমি শুনতে পাই বিজয়ের ঢাক, যা নিশ্চুপ করে দেয় নির্বাসিতদের রাত।
আমি শুনতে পাই ভেসে যাচ্ছে মেঘ, সমুদ্রের স্রোত, তরুণদের পদশব্দ
ভেজা জেটির ওপর।
এটাই ভবিষ্যৎ: ভেবে দেখ কীভাবে সৈন্যরা সামনে এগোয়,
কীভাবে বন্দুকের গুলি ধ্বংস করে চুম্বন এবং মেঘ,
ধূসর ধর্মের বেদীতে নিরীহদের রক্ত,
উষ্ণ লাল রক্ত, যেটা একসময় ছিল ভালবাসা এবং স্ফুলিঙ্গ।
এসব বললে কিছু এসে যায় না, আমার স্বর না সম্পৃক্ত শিশুদের
গানের সাথে, না কোন সুখী দেশের নতুন প্রভাতে।
এটাই ভবিষ্যৎ: এক বৃষ্টি ভেজা অপরাহ্ণ সমুদ্রে সমর্পিত,
এক ছায়া মানুষ এবং সংগীতে সন্নিহিত,
এক মায়ের মুখ নীরস ভূখণ্ডের নিচে সমাবৃত।
শেষ দলিল
আমি এড়াতে পারি না আমার
ব্যথিত করোটি
অথবা যে গোলাপ ফুটে
উঠছে আমার ভিতরে !
আমি গণনা করবো সপ্তাহ,
মাস,
আমার চুলের মধ্যে এক
একটা চিহ্নিত দিনকে প্রসারিত করে।
জমাট হিমতন্তু আমার
মগজের ভিতরে,
বিভক্ত ভূমি সবলে আমার
পা উঁচু করে রাখে।
পৃথিবী আমাকে যা জানতে
বলে
আমি সেই দিকে এগুচ্ছি।
আমি এক দেবদূত বন্দুকের
গুলির ভিতর আটকে আছি।
আমি এক বহির্গমন ক্ষত
দেবদূতের ভিতর আটকে আছি।
আমি কি কাকতাড়ুয়া
মূর্তি- দাঁড়ের মতো মানবচিহ্নের শেষে ।
আমি সহিষ্ণু বৃক্ষ রোপণ
করবো আমার প্রার্থনার মধ্যে
যে পর্যন্ত না বিশ্ব
ব্রহ্মাণ্ড অদৃশ্য হয়ে যায়,
রঙিন সামুদ্রিক মাছকে
ঢেউ দিয়ে দুলিয়ে নিয়ে যায় আগ্নেয়গিরির দিকে।
কি শক্তি বন্দুকের নল
থেকে গুলি ছুঁড়ে দেয়?
এর উৎপত্তি উৎস কি পানি...
ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে
ক্ষয়িষ্ণু চুনাপাথরের গুহায়,
অথবা এটা কি এক
দেবদূতের অবসন্ন শ্বাস যখন সে পালিয়ে যায়।
আমি এই সব প্রশ্নের
উত্তর দিতে পারবো না,
কিন্তু আমার মুখোশ বেড়ে
লম্বা হচ্ছে প্রতি বছর!
বিশ্বাস
একবার আমার কোমল সুর,
স্পন্দন, তন্দ্রায়
গিয়েছিলো ঈশ্বরের ভাগ্য
বিতরণসভায়।
বৃষ্টি
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পুরনো গান
তীক্ষ্ণধার, অনুরঞ্জক,
পৃথিবীর প্রাণ।
বিস্তীর্ণ পতিত ভূমি প্রদীপ– ডানার নিচে
মেঘদল কখনও যায়নি ছেড়ে
তার শান্তহ্রদয় চিরতরে।
আমি জানতাম, আলো আরও
হবে উজ্জ্বল
আমার বন্ধ চোখে,
আমি জানতাম, প্রশান্ত
মহাসাগর শেখাবে আমায়
কীভাবে হতে হয় শান্ত
অগ্নিশিখার মুখে।
এখন আমি পদ্মরাগমণির
শেষে,
বিন্দু বিন্দু হারিয়ে
ফেলছি আরেকটা সূর্যোদয়
তোমার হাতের উষ্ণতার
মধ্যে।
ঘরের ঋষি
১
আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,
পুনর্জীবিত করবে এক
বাঁকা নদীতে।
পাহাড়ের ঋষিরা গত
হয়েছে,
এটা একটা নতুন দেশ।
নারীরা মরুভূমি ভাঁজ
করে কম্বল বানিয়েছে।
আড়াআড়ি সেলাই আকারে
উড়ন্ত পাখিদের ঝাঁক মহার্ঘ।
শূন্য– সংযোজনের সিদ্ধপুরুষ মহার্ঘ।
গুল্ম ও সাদা পদক্ষেপ
মহার্ঘ।
সীমান্ত ও এর ৭টি নাম,
আশু প্রত্যাবর্তন; কলের
পানি এবং পুণ্য নামে শুরু।
২
আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,
তাঁর হাতের উল্টো পিঠে
চুমু দিতে।
আমি বৃষ্টির কাছে
প্রার্থনা করি
সব উন্মুক্ত করতে এবং
ভূপৃষ্ঠের নাম করন করতে।
আমার প্রিয় আশ্রয় হচ্ছে
আমার মা।
হৃদয় শব্দ চাপা দেয়
বাগ্মীর মতো।
এখানে কোন বাগান
নেই, শুধু ভিন্ন সময়।
গাছের পাতাগুলো খোলা
হাতের মতো
সময়োচিত সমর্থনের জন্য
প্রস্তুত।
৩
আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,
কালো পাখিদের সাথে উড়ে
যেতে।
ভূমধ্যসাগর এক বলিষ্ঠ
উচ্চারণ।
নীলনদ এক বলিষ্ঠ
উচ্চারণ।
আমার পিতা এক বলিষ্ঠ
উচ্চারণ,
তাঁর শ্যামল দেশ এক গীতিনাট্য।
প্রতিকৃতি
কোনো বড় যজ্ঞ কি
আমাদেরকে পর্বতে উন্নীত করেছে
উপত্যকা তদারক করতে !
দেখতে আগের প্রয়াস,
কে জানতো যে তাঁরা এই
পথে হাঁটবে
ঊষা এবং গোধূলির
মাঝখানে অর্ধ জাগ্রত?
একটা বক্র চোখ এবং
চিত্তের যৌনতা চোখের পাতাকে নাচায়।
মস্তিষ্ক বিরতি নেয়
আরোহণ অথবা সমর্পণের প্রান্তে।
এক নিদ্রালু হাত
অঙ্গুলি নির্দেশ করে বৃষকাষ্ঠের পানে,
এবং আরেক হাত মেপে দেখে
একটা লাঠি অথবা খাঁজ-কাটা শিলার গুরুত্ব ।
মাটিতে আকাশে
১
চোখ বন্ধ করলে দেখি একটা বিন্দু,
সেটা হয়ে ওঠে একটা আলোর চিহ্ন ,
তারপর বড় হতে হতে হয়ে ওঠে একটা মানুষের আকৃতি,
যা ক্রমে দূরে চলে যায়, যেতে যেতে হয়ে ওঠে আলোর চিহ্ন,
আবার একটা বিন্দু।
২
উৎসবের রুটির মত তোমার কথাগুলো
আমার মুখে বিগলিত হয়ে যায়,
কখনও বিলুপ্ত হয় না।
৩ কোনো আকাশের নিচে, কিছু এসে যায় না–
গেয়ে যাও তোমার গান শেস অবধি।
৪
অস্থি, যা আমার শ্বাস রোধ করে;
তা শুধু লবণ নয়, শুধু চিনি নয়, ফুটন্ত পানি ও–
একটা কেটলিতে, যার কোনো ঢাকনা নেই।
৫
জিজ্ঞাসা করো না কতগুলো বাড়ি নির্মিত হয়েছে,
জিজ্ঞাসা করো কত মানুষ সেখানে থেকেছে।
৬
যে অগ্নিশিখা উন্মুক্ত হয় এক প্রকাণ্ড বৃক্ষের মত,
নিঃশেষ করে ফেলে একের পর এক
তাদের হারানো এবং প্রাপ্ত প্রাণিসমূহ।
৭
সে, তাঁর গানের শুরু নেই, শেষও নেই।
সে, তাঁর স্বর বিলীন হয়ে গেছে নক্ষত্র ও চাঁদে–
সে কোথায়? সে কোথায়?
৮
স্বপ্ন দুই আকারের হয়ঃ লম্বা-লম্বি এবং সমান্তরাল।
আমাকে বলো তোমার স্বপ্নের আকার কি,
আমি বলে দেবো তুমি কোথা থেকে এসেছো।
৯
আগুন এবং আলো দুটোই যন্ত্রণাদায়ক।
আমরা ঘুমুতে যাই যখন পৃথিবীর অর্ধেক জেগে থাকে।
রাত এবং দিন ভরে থাকে স্বপ্ন।
১০
তোমার দৃষ্টি
আমার অভ্যন্তরে ভেদ করে যায় বিদ্যুৎ-এর মতো।
১১
যে প্রজাপতি উড়ে গেলো এক মুহূর্ত আগে মৃতের ওপর দিয়ে,
সেটা ছিল এক আত্মা যে গৃহ খুঁজে ফিরছে।
১২
আমাদের একত্র-সময় এক সময় পরিণত হয়েছে,
তারপর ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে তুষারের মতো ।
১৩ ক্যামেরায় কি ধরা যায়–
পাখির চোখে যে ভয়?
তার চোখে ডিম ভেঙে যাওয়ার যে আতংক?
১৪
পাখির কাছে বাতাস মহার্ঘ।
বাতাসে বিস্তৃত সমগ্র পৃথিবী।
মেঘদল ঘন হয়, আবার বিচ্ছিন্ন হয়।
গাছের পাতা ইঙ্গিত করে একে অপরকে।
পাখির জন্য সবকিছুই ঝুলে থাকে বাতাসে।
১৫
আমার কাগজের নৌকো যেটা নদীতে পড়ে গিয়েছিলো
সব কিছু পিছনে ফেলে, তাতে একটা বার্তা ছিলঃ
সে একদিন ফিরে আসতে পারে, যদিও দেরীতে–
সব সত্যিই দেরীতে আসে।
১৬
শুকনো পাতারা
ঐ খানে
আমাদের প্রথম একান্ত কামনা।
১৭
সূর্য প্রকাশ করে নৌকোর গোপন গহ্বর,
মাছের ডানার উজ্জ্বলতা,
যে পর্যন্ত তা জীবিত ।
১৮
দিন এবং রাত্রি
যেভাবে ভাগ করে আমাদের পদচারণা,
একইভাবে ভাগ করে পৃথিবীকে সমান অংশে।
বিজয়ের পদাবলি
বিজয় মানে মেঘ সরিয়ে হঠাৎ নীল শরত আকাশ
বিজয় মানে চির দুঃখিনীর কান্না-ভেজা মুখের হাসি
বিজয় মানে শুকনো মাঠে ভোরের ঊষায় ফুলের সুবাস
বিজয় মানে হতাশ পিতার স্বপ্ন পূরণ মোমের বাঁশি
বিজয় মানে আপন করে প্রিয় একটা নিজের দেশ
বিজয় মানে যখন তখন কথার মালায় মায়ের ভাষা
বিজয় মানে হারানো প্রিয় পাখিদের ঘরে ফিরে আসা
বিজয় মানে সহদরের জন্য উতলা দীর্ঘ প্রতীক্ষার
শেষ
বিজয় মানে বন্দী জীবন দিনের শেষে রক্তিম
গোধূলি
বিজয় মানে উত্তাল ঝড়ের পরে শান্ত বাউল নদী
বিজয় মানে আমাদের ভূগোলে জেগে ওঠা নতুন সৈকত
বিজয় মানে সবার সাথে বন্ধু হবার দীপ্ত শপথ
বিজয় মানে অর্ধ-শতাব্দী পেরিয়ে নতুন চোখে ফিরে তাকানো
বিজয় মানে বিজয়ের ব্যবচ্ছেদ, অন্তঃপুরে দেখো আছে কি লাবণ্য
প্রত্যয়
শহিদ মিনারের রাস্তা ধরে যখন হেঁটে যাই,
বাতাসের হাত ধরি, যাতে ধুলো না ওড়ে।
মিনার থেকে জীবনের আলো উঠছে, দ্যাখো আকাশ কি যে মধুর, তার আস্বাদ মনে লাগছে!
শহিদদের ফুটো হৃদয় বড় একাকী মনে হলো।
একটু পরে রাস্তার বাতিগুলো জীবন্ত হবে, টেলিভিশনে
আলোকিত হয়ে উঠবে নীল। চলে যেওনা যেন, যে পর্যন্ত আকাশ রয়েছে
সোনালি!
এই মই ধর যাতে আমি বেয়ে ওপরে উঠতে পারি এবং সবচেয়ে উঁচু ধাপ থেকে আলোর কণাগুলো হাতে নিয়ে মিনারের চারদিকে
মালার মতো পরাতে পারি।
দ্যাখো, এক একাকী
নক্ষত্র প্রেমে ও নিঃসঙ্গতায়; একাকী আমার দেশঃ রক্তিম, উষ্ণ ও
উজ্জ্বল।
সূর্যকন্যা
(পূর্ণ গ্রহণের সময়)
ঈশ্বর সূর্যকন্যাকে ধরে আছে তাঁর গোড়ালিতে
তাঁকে ঝুলিয়ে রেখেছে মেঘে
সে মৃগ শিশুর মতো
তাঁর মুঠোয় মোচড়ানো
টান করে বাঁধা, পেঁচানো ঘন গাছের সাথে।
সূর্যকন্যা আমার কাছে এসেছে অরণ্য থেকে।
যখন সে পড়ে যাচ্ছিলো তাঁকে ধরেছিলাম
দেবদারুর সারির ভিতর থেকে
বিষণ্ণ জ্বরাক্রান্ত করতলে।
গোধূলি স্থিরীকৃত, যেন কুয়াশা আমাদের গোড়ালির চারপাশে
ঈশ্বর ছুঁড়ে দিলে আমি তাঁকে ধরলাম
একটা দরজা খুলে গেলো অরন্যের ছাদে
সে সহজেই এটা একপাশে ঠেলে দিলো
তাঁর সুডোল বাহু এবং পিঙ্গল কুঞ্চিত কুন্তল
এখনও মেঘে ভেজা
দরজা তরঙ্গায়িত, যেন বাতাসে দুলছে একটা তামাটে তেরপল,
সে ঘোরাফেরা করলো সেখানে এক মুহূর্ত
যখন তাঁর ডানা দুর্বল হয়ে পড়ে গেলো
আমি প্রিয় সম্বোধনে তাঁকে ধরলাম
আমরা দাঁড়িয়ে এখন
অন্ধকার ঢেকে আছে আমাদের চিবুক অবধি
তাঁকে কাঁধে বসিয়ে
আমি জলের মধ্যে হাঁটছি অরণ্য রাত্রির ভিতরে
নক্ষত্র আলোয় দৃষ্টি রেখে ।
ঐক্যের জয়
নির্ভীক হৃদয়গুলো হাতে
হাত রেখে যুক্ত
প্রতিটি কণ্ঠস্বর
এক বৃহৎ সমস্বরে সিক্ত
শৌর্য প্রবাহিত যেন
প্রসারিত নদী
একত্রে আমরা স্থির
পাশাপাশি ।
আমাদের শক্তি এক প্রবল
প্রতাপী
অধীনতা জানে না
অনুরণিত হয় রণভূমি
ব্যাপি
ঐক্যের
স্ফুলিঙ্গে উজ্জ্বল অগ্নিশিখা।
বিজয় প্রস্ফুটিত হয়
চারিদিকে
যখন আমরা অংশভাগী হই
জন্মভুমির নামে।
প্রিয়
আমি ভূমি বা বৃক্ষ নই, তুমিও নও সমুদ্র কিমবা স্বর্গীয় পাত্র,
বরং আমরা ক্ষুদ্র প্রাণি, যা সব সময়ই ছিলাম।
ভূমি এবং সমুদ্র একে অপরকে জানে
যখন থেকে তাদের সাক্ষাৎ।
আমরা যেমন জানি একে অপরকে,
বিভিন্ন সময়ে তার কিছুটা দেখাই,
কিছুটা ইন্দ্রিয়জনিত,
কিছুটা সংবেদন।
জীবন চর্চার অভ্যাস না করে
সাড়ম্বরে দেখানোকে আমরা সম্পর্ক ভাবি,
আমরা তা বলারও চেষ্টা করি বিভিন্ন সময়ে,
একটা অনুভূতি কাজ করে।
দুটি প্রাণর এক সাথে থাকার অলংকারিক নাম কি দাম্পত্য ?
আমরা কিছু নিত্য অভ্যাস ভাগ করে নিই,
তুমি আর আমি,
কিছু পারস্পরিক ভঙ্গিমার অনুক্রম !
এভাবেই আমি হয়ে উঠি এক বৃক্ষ,
আর তুমি এক স্বর্গীয় পাত্র !
সত্যালাপ
উৎসব উল্লাস দেখলে আমার ভ্রম হয়
এটা বিজয় না শৃঙ্খল?
স্বাধীনতার স্লোগান শুনলে আমার ভ্রম হয়
এটা ভোরের ঊষা না উত্তাল ঝড়?
বৈসাদৃশ্য নিপাত স্লোগান শুনলে আমার ভ্রম হয়
এটা সত্যি না প্রবঞ্চনা?
বাংলাদেশে স্বপ্নের বিদ্রোহ!
এর বিনাশ নেই,
জনমে মৃত্যুতে–
দেশ যতদিন থাকবে ততদিন।
ভুল সময়, তবু আছি
এই সব বিভেদ, প্রতারণা,
মার খাওয়া মানুষ,
হীন-স্বার্থ শাসকের স্বাভাবিক কথা–
তবু, আছে বাংলার পলিমাটি,
নিসর্গের স্বপ্নময় আলপনা, ভেজা ঘাসের ধ্রুপদী ঘ্রাণ–
তাই, কবিতার পাণ্ডুলিপি।
** মঈনউদ্দিন মুনশী গত শতকের সত্তরের দশকের স্বতন্ত্র ধারার বিশিষ্ট কবি। প্রচারবিমুখ ও অন্তর্মুখি স্বভাবের এই মেধাবী কবি পেশায় একজন চিকিৎসক। তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঈনউদ্দিন মুনশীর ১৬টি নতুন কবিতা
অনিষ্ট
আগুন দৌড়াতে লাগলো
আতঙ্কগ্রস্তভাবে
এর ভস্ম থেকে।
রক্তিম আভার মধ্যে এর
প্রতিবিম্ব
চলচ্চিত্রের ঘূর্ণমাণ ছায়ার মতো পালিয়ে গেলো
মানুষের মাংস এবং রক্ত
থেকে।
আঘাতের চোখে ক্ষত চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হলো
বহু বছর পর।
রক্ত-বর্ণের ক্ষণিক চমক
ক্ষয়ে যায় নিষ্ঠুরভাবে!
কিন্তু ঐ প্রক্রিয়ার
কোনো অবকাশ নেই
থেমে যাবার,
যেন রেলগাড়ি টেনে নিয়ে
যাচ্ছে
এর ভগ্নাবশেষ !
সাজ
প্রস্তর,
মনুষ্য-দিন শেষে
তাতেই পরিণত ।
স্মৃতি,
স্মৃতি থেকে
স্মৃতিতে বিস্তৃত।
অশ্ব,
ভুলে যায় গাড়ির ওজন যখন
বন্ধন মুক্ত।
পান্থশালা
এক দ্রাক্ষালতা ঘিরে
রেখেছে বেষ্টনী
শান্ত- গভীর আগ্রহে,
যেন সমগ্র জলপ্রপাত !
আমার ত্বক অবসন্ন,
সংগ্রাম করে,
পূর্ব প্রত্যাশায়
দেখো, আমি কীভাবে বিষয়
পরিবর্তন করি
নিজেকে না বদলে,
আমি বলতে চাই–
যা বাহ্যত কিছুই না–
কিন্তু এটাই পদ্ধতি
কোনো বড় পরিবর্তন আনার
জন্য।
আমার মন একটা ভঙ্গির
মতো
যেন বৃক্ষের বিন্যাস–
ঘন, বিক্ষিপ্ত,
মোচাকৃতি,
একদিকে হেলানো, ঝালর–
আমার আগের প্রজার মনের
মতো !
চিত্রলিপি
নির্দেশ, ভাবাবেগ, ইন্দ্রিয় সব বাকশক্তিহীন।
অজ্ঞাত আনন্দ, শক্তি, এবং ধ্যান প্রসারিত করে আকাশ।
অনুভূতি কাছে টানে হৃদয় এবং অরণ্যের ভাষাকে,
তবুও মন রয়ে যায় নির্বাক।
দর্শন এক ভবিষ্যৎ শিশুকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়!
তৃতীয় বিশ্ব
ওরা তোমাকে বলে নতুন পৃথিবী, কিন্তু আমি চোখ বন্ধ করে দেখি,
শীতল একটা মেঘ ইতিহাস আবৃত করে রেখেছে।
দুঃখ প্রাচীন শব্দ।
এখন বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হয় প্রতিটি শব্দের ওপর,
প্রতিটি পঙ্ক্তির ওপর, যা লিখছি।
এই নীল দিনগুলো এবং এই শিশুকালের সূর্য হচ্ছে বৃষ্টি,
আত্মা ভিজিয়ে করেছে স্বতন্ত্র।
সমুদ্র ব্যথার আবাসস্থল ।
আমি শুনতে পাই বিজয়ের ঢাক, যা নিশ্চুপ করে দেয় নির্বাসিতদের রাত।
আমি শুনতে পাই ভেসে যাচ্ছে মেঘ, সমুদ্রের স্রোত, তরুণদের পদশব্দ
ভেজা জেটির ওপর।
এটাই ভবিষ্যৎ: ভেবে দেখ কীভাবে সৈন্যরা সামনে এগোয়,
কীভাবে বন্দুকের গুলি ধ্বংস করে চুম্বন এবং মেঘ,
ধূসর ধর্মের বেদীতে নিরীহদের রক্ত,
উষ্ণ লাল রক্ত, যেটা একসময় ছিল ভালবাসা এবং স্ফুলিঙ্গ।
এসব বললে কিছু এসে যায় না, আমার স্বর না সম্পৃক্ত শিশুদের
গানের সাথে, না কোন সুখী দেশের নতুন প্রভাতে।
এটাই ভবিষ্যৎ: এক বৃষ্টি ভেজা অপরাহ্ণ সমুদ্রে সমর্পিত,
এক ছায়া মানুষ এবং সংগীতে সন্নিহিত,
এক মায়ের মুখ নীরস ভূখণ্ডের নিচে সমাবৃত।
শেষ দলিল
আমি এড়াতে পারি না আমার
ব্যথিত করোটি
অথবা যে গোলাপ ফুটে
উঠছে আমার ভিতরে !
আমি গণনা করবো সপ্তাহ,
মাস,
আমার চুলের মধ্যে এক
একটা চিহ্নিত দিনকে প্রসারিত করে।
জমাট হিমতন্তু আমার
মগজের ভিতরে,
বিভক্ত ভূমি সবলে আমার
পা উঁচু করে রাখে।
পৃথিবী আমাকে যা জানতে
বলে
আমি সেই দিকে এগুচ্ছি।
আমি এক দেবদূত বন্দুকের
গুলির ভিতর আটকে আছি।
আমি এক বহির্গমন ক্ষত
দেবদূতের ভিতর আটকে আছি।
আমি কি কাকতাড়ুয়া
মূর্তি- দাঁড়ের মতো মানবচিহ্নের শেষে ।
আমি সহিষ্ণু বৃক্ষ রোপণ
করবো আমার প্রার্থনার মধ্যে
যে পর্যন্ত না বিশ্ব
ব্রহ্মাণ্ড অদৃশ্য হয়ে যায়,
রঙিন সামুদ্রিক মাছকে
ঢেউ দিয়ে দুলিয়ে নিয়ে যায় আগ্নেয়গিরির দিকে।
কি শক্তি বন্দুকের নল
থেকে গুলি ছুঁড়ে দেয়?
এর উৎপত্তি উৎস কি পানি...
ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে
ক্ষয়িষ্ণু চুনাপাথরের গুহায়,
অথবা এটা কি এক
দেবদূতের অবসন্ন শ্বাস যখন সে পালিয়ে যায়।
আমি এই সব প্রশ্নের
উত্তর দিতে পারবো না,
কিন্তু আমার মুখোশ বেড়ে
লম্বা হচ্ছে প্রতি বছর!
বিশ্বাস
একবার আমার কোমল সুর,
স্পন্দন, তন্দ্রায়
গিয়েছিলো ঈশ্বরের ভাগ্য
বিতরণসভায়।
বৃষ্টি
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পুরনো গান
তীক্ষ্ণধার, অনুরঞ্জক,
পৃথিবীর প্রাণ।
বিস্তীর্ণ পতিত ভূমি প্রদীপ– ডানার নিচে
মেঘদল কখনও যায়নি ছেড়ে
তার শান্তহ্রদয় চিরতরে।
আমি জানতাম, আলো আরও
হবে উজ্জ্বল
আমার বন্ধ চোখে,
আমি জানতাম, প্রশান্ত
মহাসাগর শেখাবে আমায়
কীভাবে হতে হয় শান্ত
অগ্নিশিখার মুখে।
এখন আমি পদ্মরাগমণির
শেষে,
বিন্দু বিন্দু হারিয়ে
ফেলছি আরেকটা সূর্যোদয়
তোমার হাতের উষ্ণতার
মধ্যে।
ঘরের ঋষি
১
আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,
পুনর্জীবিত করবে এক
বাঁকা নদীতে।
পাহাড়ের ঋষিরা গত
হয়েছে,
এটা একটা নতুন দেশ।
নারীরা মরুভূমি ভাঁজ
করে কম্বল বানিয়েছে।
আড়াআড়ি সেলাই আকারে
উড়ন্ত পাখিদের ঝাঁক মহার্ঘ।
শূন্য– সংযোজনের সিদ্ধপুরুষ মহার্ঘ।
গুল্ম ও সাদা পদক্ষেপ
মহার্ঘ।
সীমান্ত ও এর ৭টি নাম,
আশু প্রত্যাবর্তন; কলের
পানি এবং পুণ্য নামে শুরু।
২
আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,
তাঁর হাতের উল্টো পিঠে
চুমু দিতে।
আমি বৃষ্টির কাছে
প্রার্থনা করি
সব উন্মুক্ত করতে এবং
ভূপৃষ্ঠের নাম করন করতে।
আমার প্রিয় আশ্রয় হচ্ছে
আমার মা।
হৃদয় শব্দ চাপা দেয়
বাগ্মীর মতো।
এখানে কোন বাগান
নেই, শুধু ভিন্ন সময়।
গাছের পাতাগুলো খোলা
হাতের মতো
সময়োচিত সমর্থনের জন্য
প্রস্তুত।
৩
আমি সেই অলৌকিক চাই যা আমাকে অসাধারণ বানাবে,
কালো পাখিদের সাথে উড়ে
যেতে।
ভূমধ্যসাগর এক বলিষ্ঠ
উচ্চারণ।
নীলনদ এক বলিষ্ঠ
উচ্চারণ।
আমার পিতা এক বলিষ্ঠ
উচ্চারণ,
তাঁর শ্যামল দেশ এক গীতিনাট্য।
প্রতিকৃতি
কোনো বড় যজ্ঞ কি
আমাদেরকে পর্বতে উন্নীত করেছে
উপত্যকা তদারক করতে !
দেখতে আগের প্রয়াস,
কে জানতো যে তাঁরা এই
পথে হাঁটবে
ঊষা এবং গোধূলির
মাঝখানে অর্ধ জাগ্রত?
একটা বক্র চোখ এবং
চিত্তের যৌনতা চোখের পাতাকে নাচায়।
মস্তিষ্ক বিরতি নেয়
আরোহণ অথবা সমর্পণের প্রান্তে।
এক নিদ্রালু হাত
অঙ্গুলি নির্দেশ করে বৃষকাষ্ঠের পানে,
এবং আরেক হাত মেপে দেখে
একটা লাঠি অথবা খাঁজ-কাটা শিলার গুরুত্ব ।
মাটিতে আকাশে
১
চোখ বন্ধ করলে দেখি একটা বিন্দু,
সেটা হয়ে ওঠে একটা আলোর চিহ্ন ,
তারপর বড় হতে হতে হয়ে ওঠে একটা মানুষের আকৃতি,
যা ক্রমে দূরে চলে যায়, যেতে যেতে হয়ে ওঠে আলোর চিহ্ন,
আবার একটা বিন্দু।
২
উৎসবের রুটির মত তোমার কথাগুলো
আমার মুখে বিগলিত হয়ে যায়,
কখনও বিলুপ্ত হয় না।
৩ কোনো আকাশের নিচে, কিছু এসে যায় না–
গেয়ে যাও তোমার গান শেস অবধি।
৪
অস্থি, যা আমার শ্বাস রোধ করে;
তা শুধু লবণ নয়, শুধু চিনি নয়, ফুটন্ত পানি ও–
একটা কেটলিতে, যার কোনো ঢাকনা নেই।
৫
জিজ্ঞাসা করো না কতগুলো বাড়ি নির্মিত হয়েছে,
জিজ্ঞাসা করো কত মানুষ সেখানে থেকেছে।
৬
যে অগ্নিশিখা উন্মুক্ত হয় এক প্রকাণ্ড বৃক্ষের মত,
নিঃশেষ করে ফেলে একের পর এক
তাদের হারানো এবং প্রাপ্ত প্রাণিসমূহ।
৭
সে, তাঁর গানের শুরু নেই, শেষও নেই।
সে, তাঁর স্বর বিলীন হয়ে গেছে নক্ষত্র ও চাঁদে–
সে কোথায়? সে কোথায়?
৮
স্বপ্ন দুই আকারের হয়ঃ লম্বা-লম্বি এবং সমান্তরাল।
আমাকে বলো তোমার স্বপ্নের আকার কি,
আমি বলে দেবো তুমি কোথা থেকে এসেছো।
৯
আগুন এবং আলো দুটোই যন্ত্রণাদায়ক।
আমরা ঘুমুতে যাই যখন পৃথিবীর অর্ধেক জেগে থাকে।
রাত এবং দিন ভরে থাকে স্বপ্ন।
১০
তোমার দৃষ্টি
আমার অভ্যন্তরে ভেদ করে যায় বিদ্যুৎ-এর মতো।
১১
যে প্রজাপতি উড়ে গেলো এক মুহূর্ত আগে মৃতের ওপর দিয়ে,
সেটা ছিল এক আত্মা যে গৃহ খুঁজে ফিরছে।
১২
আমাদের একত্র-সময় এক সময় পরিণত হয়েছে,
তারপর ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে তুষারের মতো ।
১৩ ক্যামেরায় কি ধরা যায়–
পাখির চোখে যে ভয়?
তার চোখে ডিম ভেঙে যাওয়ার যে আতংক?
১৪
পাখির কাছে বাতাস মহার্ঘ।
বাতাসে বিস্তৃত সমগ্র পৃথিবী।
মেঘদল ঘন হয়, আবার বিচ্ছিন্ন হয়।
গাছের পাতা ইঙ্গিত করে একে অপরকে।
পাখির জন্য সবকিছুই ঝুলে থাকে বাতাসে।
১৫
আমার কাগজের নৌকো যেটা নদীতে পড়ে গিয়েছিলো
সব কিছু পিছনে ফেলে, তাতে একটা বার্তা ছিলঃ
সে একদিন ফিরে আসতে পারে, যদিও দেরীতে–
সব সত্যিই দেরীতে আসে।
১৬
শুকনো পাতারা
ঐ খানে
আমাদের প্রথম একান্ত কামনা।
১৭
সূর্য প্রকাশ করে নৌকোর গোপন গহ্বর,
মাছের ডানার উজ্জ্বলতা,
যে পর্যন্ত তা জীবিত ।
১৮
দিন এবং রাত্রি
যেভাবে ভাগ করে আমাদের পদচারণা,
একইভাবে ভাগ করে পৃথিবীকে সমান অংশে।
বিজয়ের পদাবলি
বিজয় মানে মেঘ সরিয়ে হঠাৎ নীল শরত আকাশ
বিজয় মানে চির দুঃখিনীর কান্না-ভেজা মুখের হাসি
বিজয় মানে শুকনো মাঠে ভোরের ঊষায় ফুলের সুবাস
বিজয় মানে হতাশ পিতার স্বপ্ন পূরণ মোমের বাঁশি
বিজয় মানে আপন করে প্রিয় একটা নিজের দেশ
বিজয় মানে যখন তখন কথার মালায় মায়ের ভাষা
বিজয় মানে হারানো প্রিয় পাখিদের ঘরে ফিরে আসা
বিজয় মানে সহদরের জন্য উতলা দীর্ঘ প্রতীক্ষার
শেষ
বিজয় মানে বন্দী জীবন দিনের শেষে রক্তিম
গোধূলি
বিজয় মানে উত্তাল ঝড়ের পরে শান্ত বাউল নদী
বিজয় মানে আমাদের ভূগোলে জেগে ওঠা নতুন সৈকত
বিজয় মানে সবার সাথে বন্ধু হবার দীপ্ত শপথ
বিজয় মানে অর্ধ-শতাব্দী পেরিয়ে নতুন চোখে ফিরে তাকানো
বিজয় মানে বিজয়ের ব্যবচ্ছেদ, অন্তঃপুরে দেখো আছে কি লাবণ্য
প্রত্যয়
শহিদ মিনারের রাস্তা ধরে যখন হেঁটে যাই,
বাতাসের হাত ধরি, যাতে ধুলো না ওড়ে।
মিনার থেকে জীবনের আলো উঠছে, দ্যাখো আকাশ কি যে মধুর, তার আস্বাদ মনে লাগছে!
শহিদদের ফুটো হৃদয় বড় একাকী মনে হলো।
একটু পরে রাস্তার বাতিগুলো জীবন্ত হবে, টেলিভিশনে
আলোকিত হয়ে উঠবে নীল। চলে যেওনা যেন, যে পর্যন্ত আকাশ রয়েছে
সোনালি!
এই মই ধর যাতে আমি বেয়ে ওপরে উঠতে পারি এবং সবচেয়ে উঁচু ধাপ থেকে আলোর কণাগুলো হাতে নিয়ে মিনারের চারদিকে
মালার মতো পরাতে পারি।
দ্যাখো, এক একাকী
নক্ষত্র প্রেমে ও নিঃসঙ্গতায়; একাকী আমার দেশঃ রক্তিম, উষ্ণ ও
উজ্জ্বল।
সূর্যকন্যা
(পূর্ণ গ্রহণের সময়)
ঈশ্বর সূর্যকন্যাকে ধরে আছে তাঁর গোড়ালিতে
তাঁকে ঝুলিয়ে রেখেছে মেঘে
সে মৃগ শিশুর মতো
তাঁর মুঠোয় মোচড়ানো
টান করে বাঁধা, পেঁচানো ঘন গাছের সাথে।
সূর্যকন্যা আমার কাছে এসেছে অরণ্য থেকে।
যখন সে পড়ে যাচ্ছিলো তাঁকে ধরেছিলাম
দেবদারুর সারির ভিতর থেকে
বিষণ্ণ জ্বরাক্রান্ত করতলে।
গোধূলি স্থিরীকৃত, যেন কুয়াশা আমাদের গোড়ালির চারপাশে
ঈশ্বর ছুঁড়ে দিলে আমি তাঁকে ধরলাম
একটা দরজা খুলে গেলো অরন্যের ছাদে
সে সহজেই এটা একপাশে ঠেলে দিলো
তাঁর সুডোল বাহু এবং পিঙ্গল কুঞ্চিত কুন্তল
এখনও মেঘে ভেজা
দরজা তরঙ্গায়িত, যেন বাতাসে দুলছে একটা তামাটে তেরপল,
সে ঘোরাফেরা করলো সেখানে এক মুহূর্ত
যখন তাঁর ডানা দুর্বল হয়ে পড়ে গেলো
আমি প্রিয় সম্বোধনে তাঁকে ধরলাম
আমরা দাঁড়িয়ে এখন
অন্ধকার ঢেকে আছে আমাদের চিবুক অবধি
তাঁকে কাঁধে বসিয়ে
আমি জলের মধ্যে হাঁটছি অরণ্য রাত্রির ভিতরে
নক্ষত্র আলোয় দৃষ্টি রেখে ।
ঐক্যের জয়
নির্ভীক হৃদয়গুলো হাতে
হাত রেখে যুক্ত
প্রতিটি কণ্ঠস্বর
এক বৃহৎ সমস্বরে সিক্ত
শৌর্য প্রবাহিত যেন
প্রসারিত নদী
একত্রে আমরা স্থির
পাশাপাশি ।
আমাদের শক্তি এক প্রবল
প্রতাপী
অধীনতা জানে না
অনুরণিত হয় রণভূমি
ব্যাপি
ঐক্যের
স্ফুলিঙ্গে উজ্জ্বল অগ্নিশিখা।
বিজয় প্রস্ফুটিত হয়
চারিদিকে
যখন আমরা অংশভাগী হই
জন্মভুমির নামে।
প্রিয়
আমি ভূমি বা বৃক্ষ নই, তুমিও নও সমুদ্র কিমবা স্বর্গীয় পাত্র,
বরং আমরা ক্ষুদ্র প্রাণি, যা সব সময়ই ছিলাম।
ভূমি এবং সমুদ্র একে অপরকে জানে
যখন থেকে তাদের সাক্ষাৎ।
আমরা যেমন জানি একে অপরকে,
বিভিন্ন সময়ে তার কিছুটা দেখাই,
কিছুটা ইন্দ্রিয়জনিত,
কিছুটা সংবেদন।
জীবন চর্চার অভ্যাস না করে
সাড়ম্বরে দেখানোকে আমরা সম্পর্ক ভাবি,
আমরা তা বলারও চেষ্টা করি বিভিন্ন সময়ে,
একটা অনুভূতি কাজ করে।
দুটি প্রাণর এক সাথে থাকার অলংকারিক নাম কি দাম্পত্য ?
আমরা কিছু নিত্য অভ্যাস ভাগ করে নিই,
তুমি আর আমি,
কিছু পারস্পরিক ভঙ্গিমার অনুক্রম !
এভাবেই আমি হয়ে উঠি এক বৃক্ষ,
আর তুমি এক স্বর্গীয় পাত্র !
সত্যালাপ
উৎসব উল্লাস দেখলে আমার ভ্রম হয়
এটা বিজয় না শৃঙ্খল?
স্বাধীনতার স্লোগান শুনলে আমার ভ্রম হয়
এটা ভোরের ঊষা না উত্তাল ঝড়?
বৈসাদৃশ্য নিপাত স্লোগান শুনলে আমার ভ্রম হয়
এটা সত্যি না প্রবঞ্চনা?
বাংলাদেশে স্বপ্নের বিদ্রোহ!
এর বিনাশ নেই,
জনমে মৃত্যুতে–
দেশ যতদিন থাকবে ততদিন।
ভুল সময়, তবু আছি
এই সব বিভেদ, প্রতারণা,
মার খাওয়া মানুষ,
হীন-স্বার্থ শাসকের স্বাভাবিক কথা–
তবু, আছে বাংলার পলিমাটি,
নিসর্গের স্বপ্নময় আলপনা, ভেজা ঘাসের ধ্রুপদী ঘ্রাণ–
তাই, কবিতার পাণ্ডুলিপি।
** মঈনউদ্দিন মুনশী গত শতকের সত্তরের দশকের স্বতন্ত্র ধারার বিশিষ্ট কবি। প্রচারবিমুখ ও অন্তর্মুখি স্বভাবের এই মেধাবী কবি পেশায় একজন চিকিৎসক। তাঁর কবিতা বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

আপনার মতামত লিখুন