সংবাদ

ছোটগল্প

সম্পর্ক ও ক্ষুধা


শারদুল সজল
শারদুল সজল
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২০ এএম

সম্পর্ক ও ক্ষুধা
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন


কম্বলের ভেতর ঘেমে ভেজা মাটির মতো ত্যাকত্যাকা হয়ে গেছে সে। নিজের মাথায় নিজেই হাত দিয়ে দেখে, না, তেমন কমেনি। গেল চারদিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর, থেকে থেকে ভূ-কম্পনের মতো সারা শরীর কাঁপিয়ে তুলছে। ডান কাত ঘুরে শোয়ার চেষ্টা করে সে বুঝতে পারে— ভীষণ খিদে পেয়েছে তার। পাওয়ার কথাও, সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। লাইট জ্বালায় সে। ঘড়ির কাটা তখন রাত দুটো ছুঁই ছুঁই করছে। কিচেন রুমে গিয়ে দেখে ফোটানো পানি নেই। থাকার কথাও না। এ তিন চার দিন ধরে রান্নাবান্না কিছুই করতে পারেনি। ঘরে থাকা হরলিক্স, বিস্কুট খেয়েই আছে। বিস্কুটের বাক্স খুলে দেখে আর মাত্র দুটো বিস্কুট অবশিষ্ট আছে, তাও পোতানো। চার পাঁচটা গেছো পিঁঁপড়ে বিস্কুটের তলে-ওপরে আলেকজেন্ডারের ঘোড়ার মতো রেস করছে। কথায় আছে— ‘ক্ষুধা পেলে বাঘেও ঘাস খায়’। আর তার মনে হল— শুধু ঘাস কেন? ক্ষুধা যা পায় তাই খায়। হাতি ঘোড়া কুমিড় পর্যন্ত গিলে ফেলে। ক্ষুধার সামনে মাংস জাতীয় মানুষও নিরাপদ নয়। উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে বিমান বিধ্বস্ত সেই ভাইয়ের কথাই ভাবুন, যে তার মৃত বোনের মাংস খেয়ে বেঁচে ছিল। বেঁচে থাকাটাই ছিল তখন জরুরি। মৃত্যুকে মাথায় চেপে হরিণ বাফেলোকে নদী বা তৃণভূমিতে খাদ্যের সন্ধানে যেতে হয়, অনেকটা বাধ্য-বাধকতায়। 

এই যে বেঁচে থাকার লড়াই— তা নিরন্তর, চিরদিন। 

তাহলে মানুষ কার খাদ্য? অবশ্য মানুষও কারও না কারও খাদ্য, তবে আপতদৃষ্টিতে কোনো প্রাণি বা উদ্ভিদকুলের জন্যই শুধু নয়। জীবনাবস্থায় নতুন কোনো চিন্তা নয়তো অশেষ কষ্ট-যন্ত্রণার। 

থাক এসব কথা। 

সে পিপঁড়ে সরিয়ে বিস্কুট দুটো খেয়ে নেয়। জীবনে এরকম ভয়ানক ক্ষুধা আরও একবার লেগেছিল তার। ভীষণ ক্ষুধার মুহূর্তে পেটে একটু খাবার পড়লে, ক্ষুধা যেন আরো রাক্ষস হয়ে ওঠে। 

ওরও তাই মনে হলো। পানি আর বিস্কুট খাওয়ার পর কলকল করে ঘামতে থাকলো, মনে হলো এক গামলা ভাত খেলেই কেবল শান্তি মিলবে কিন্তু ভাত পাবে কোথায়?  কে দিবে ভাত? কেউ জানতেও চায়নি এ তিন-চার দিনের অসুস্থতায় সে কেমন আছে? কী করছে, ঠিকমত ওষুধপাতি খাচ্ছে কিনা? ইত্যাদি ইত্যাদি...

তাই নিজেই নিজেকে আদেশ করে, অনুরোধ করে— খাও... ঘুমাও... গোসল করো এই রকম আর কি! এবার নিজেই নিজেকে বললো, ঘুমাও— তোমার ঘুমানো দরকার!   

সে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলো।

কিন্তু ঘুম আসছে না, ঘুমানো অতো সহজ নয়। অতীত স্মৃতিগুলো সিডরের বেগে উতলা করে তুললো। সে ক্রমশই বাঁধভাঙা জলের ঘূর্ণিতে ডুবে যেতে থাকলো... এবং ভাবতে লাগলো— এই অন্ধ কুঠিরে সে যদি মরে পড়ে থাকে তবে কেউ জানবে না, কেউ নেই তার। হয়তো বাড়িওয়ালা একদিন পুলিশ ডেকে দরজা ভেঙে দেখবে— সে মরে পড়ে আছে। হয়তো তখন মোবাইল ডায়াল করবে কিন্তু কোন আত্মীয়-স্বজনকে পাওয়া যাবে না।  

তবে? নিজের কাছেই জানতে চায় সে! কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। নিঃসঙ্গ জীবনটাকে এতো কাছ থেকে দেখেছে, আত্মীয় স্বজন ভাই বোনের অর্থগত কোনো সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারেনি আজও...

২.

বেশ অবস্থাসম্পন্ন পরিবারেই জন্ম তার। ততদিনে একমাত্র বড় বোনের বিয়েও হয়ে গেছে। তার বছর দেড় পর বাবা মারা গেলেন। মারা যাওয়া বিষয়টা যে এতো ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক— তা সে বুঝতো না। বোঝার কথাও না, সে ছিল ছয় সাত বছরের দুরন্ত কিশোর, ছুটি গল্পের ফটিকের তাইরে নাইরের মতো। বড় ভাই (ছাত্র হিসেবে তুখোড়) আর বিধবা মা এই তাদের সংসার। পাশের গ্রামের কৃষকের ছেলে যদি বুয়েটে পড়তে পারে, তাহলে তার ভাইটি নয় কেন? এই ছিল তার বিধবা মায়ের নিস্পাপ চাওয়া। 

জমি বিক্রি করে তার বড় ভাইকে ঢাকায় পাঠানো হলো, ভালো কথা। কিন্তু ঢাকায় আসার পর নানা রকম আনন্দ ও রঙিন জগতের হিরো হবার নেশায় ভাইটির পড়ালেখার গনেশ উল্টে গেছে। মা বুঝতেও পারেনি। সে এমন পড়াশোনা করতো যে— বছরের দুটো ঈদেও বাড়ি আসতে পারতো না। মাসে মাসে চড়া সুদে কিম্বা ধার দেনা করে টাকা পাঠাতে হতো। 

৩.

এভাবে দশ এগারো বছর চলে গেলো। বড়ভাইটি ইঞ্জিনিয়ার কিম্বা রঙিন জগতের হিরো হতে পারেনি। তাতেও অসুবিধা ছিল না। শুধু আপত্তি উঠলো, এতো খোয়ানোর পরও মায়ের অভাব অনটন এতটুকুও বুঝতো না। নির্মমভাবে টাকা আদায় করে ছাড়তো, না হলে চলতো দেশ ছাড়ার হুমকি। আহা! এই ভয়ে মা কলিজা বিক্রির জন্যও প্রস্তুত থাকতেন। 

ছোট একটা ঘটনা বলি, ততদিনে মা’র সব গয়না বিক্রি হয়ে গেছে। কানে মাত্র দেড় আনার ছোট দুটি রিং— যা সে কিনে দিয়েছিল। মার স্বর্ণ বলতে তখন ঐটুকুই ছিল। তাও বিক্রি করে নিতে বড়ভাইটির বাঁধেনি। বাড়িতে সারাদিন পাওনাদার আসতো, চাচারা টাকা পায়, বোন টাকা পায়,  খালা-ফুফুরা টাকা পায়— কিন্তু কিছুই সে জানে না।  একসময় বাড়িতে কাজ করা লোকগুলোও টাকা পায়— তাও জানে না। দূরসর্ম্পকের এমন কোনো আত্মীয় নেই যে টাকা পায় না।

এদিকে মা’র শরীর ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল। জমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে থাকি আমি, এক এক করে । চাচা খালাদের পাশাপাশি বোনটিও জমিজমার সুযোগ নিল! ছোট চাচা জমির নায্য দাম দিল না, বরং রক্তের ঢল নামাবে বলে হুমকি দিয়ে কম দামে জমি নিয়ে নিল। তখন আমি ছোট, বোন যা দিয়েছিল তার ডাবল টাকা দাবি করলো। চিন্তায় চিন্তায় খুব অল্প দিনের মধ্যেই, যেন কেনো এক সকালে উঠে হঠাৎ দেখলাম মায়ের প্রায় সব চুল পেকে গেছে। ততদিনে মার ভেতরে মরন বাসা বেঁধে ফেলেছে, বুঝতে পারিনি । হঠাৎ হঠাৎ তার চোখ কুকার মতো লাল টকটক হয়ে যেতো, যেন এক্ষুনি চোখ ফেটে গলগল করে রক্ত ঝরবে। পাশের বাড়ি থেকে ডাক্তার চাচা (আর্মি থেকে রিটার্য়াড) এলেন, প্রেসার মেপে বললেন এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যাও। তখনও প্রেসার সর্ম্পকে আমার তেমন কোনো ধারণাই জন্মায়নি। ডাক্তার খুব শঙ্কিত হলেন— ২১০/১৪০!

এরপরও কয়েক যাত্রায় মা বেঁচে গেলেন। রাতে হঠাৎ হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যেত, দেখতাম— মা আমার পিঠে হাত দিয়ে বিড় বিড় করে কী যেন বলছেন। ঘুমো চোখেই জিজ্ঞেস করতাম— কী হইছে? তিনি ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকতেন আর বলতেন— তোকে খুব ঠকায় ফেলছি রে বাবা!

এই ঠকানো শব্দটায় আমি তখন মহাবিরক্ত। পরিচিত কেউ আমাকে দেখলেই শুরু করতো কত দিক দিয়ে ঠকেছি তার বিশদ ফিরিস্তি। কেন এতো বোকামি করছি, কেন আমার জমি বিক্রি করে ঋণ শোধাচ্ছি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যে বুঝতাম না তাও না, কিন্তু এ ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।  

৪.

আমি ততদিনে নতুন করে আবার কলেজে ভর্তি হয়েছি। থাকি জেলাসদরে, আকুরটাকুর পাড়া। মা প্রায় প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েন, হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে প্রায় ৬/৭ দিন থাকতে হয়। তার সেবাযত্ন ,কাপড় ধোয়া, মুখে তুলে খাওয়ানোর সবটাই আমি করি। বড়ভাইটি ঢাকা থেকে একবারও মাকে দেখতে আসে না। বোনটি একবার এসে দেখেই চলে যায়। ডাক্তার বললো, যেভাবে প্রেসার আপ-ডাউন করে, এভাবে একা রাখা ঠিক হবে না। 

আমি কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। কার কাছে মাকে রাখবো! আবার বাড়ি থেকেও কলেজে যাতায়াত সম্ভব না। তবে কি আবার পড়ালেখা ছেড়ে দেবো?  মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, যে করেই হোক মাকে আমার কাছেই রাখতে হবে।

কিন্তু টাকা! টাকা পাবো কোথায়? জমি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় উৎস নেই। কিন্তু মা নতুন করে আর কোনো জমি বিক্রি করতে রাজি নন। 

অথচ তখনও আমরা জানতাম না, ২/৩ বছর আগেই ভাই বিয়ে করেছে। মাকে পর্যন্ত জানায়নি।  

যা হোক, পরিচিত কামরুল ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে একটা সাবলেট বাসা এডভান্স করলাম। ট্রাক ভাড়া করে খাট, আলনা, হাঁড়িপাতিল, থালাবাসন, কাপড়চোপড় নিয়ে এলাম।

মাকে তখনও জানাইনি যে তাকে আর বাড়িতে যেতে দেয়া হবে না। তবে বাসাটা যে মা’র পছন্দ হয়নি তা আমি বুঝেছিলাম। এর চেয়ে সুন্দর বাসা ভাড়া করাও আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি তখন আদালত পাড়ার একটা কোচিংয়ে দুই শিফটে পড়াতে শুরু করলাম। আমার এত পরিশ্রম মা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। মাস ছয় পরেই মা বাড়ি যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি ভাবলেন, হয়তো তার জন্যই আমাকে এতো পরিশ্রম করতে হচ্ছে। শত চেষ্টা করেও তাকে আটকাতে পারলাম না। 

৫.

তার কিছুদিন পর মা ব্রেনস্টোক করলেন। প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল তারপর মগবাজার রাশমনি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হলো, পরেরদিন করানো হলো অপরেশন। কিন্তু হঠাৎ মার কিডনি দুটো অকেজো হয়ে পড়ল,  ল্যাবএইডের কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সামাদ একটা ইনজেকশন লিখলেন, এটাই নাকি তার শেষ চিকিৎসা! ছবিতে দেখা কাহিনির মতো সবকিছু ঘটছিল, রমজান মাস হওয়ায় রিক্সা গাড়ি বা দোকানপাট সবকিছুই মাঝরাতের আগে কমে যেতে শুরু করলো। রিক্সা পেলাম না, মগবাজার রাশমনি হাসপাতাল থেকে পিজির দিকে দৌড়াতে থাকি। ঢাকার শহর তখনো ভালো চিনি না, পিজির কাছে ছাড়া নাকি ঐ ইনজেকশন সচরাচর পাওয়া যায় না। হাসপাতাল থেকে বলে দেওয়া লোকেশন অনুযায়ী দৌড়াতে থাকি কিন্তু সব রাস্তায় আমার কাছে একরকম মনে হচ্ছে তারপরও দৌড়াচ্ছি... মেইন রাস্তা ধরেই দৌঁড়াচ্ছি কিন্তু কোথায় পিজি?  হোচঁট খেয়ে বুড়ো আঙুলে ব্যথা পেলাম, জুতাও ছিঁড়ে গেছে, জুতা ফেলেই দৌঁড়াতে থাকি... অনেক দূর আসার পর একটা রিক্সা পাই, তিনি বললেন আমি ভুল এসেছি— এটা নাকি পুরান ঢাকার দিকে যাচ্ছি! ঢাকার শহর বলতে তখনো এয়ারপোর্ট, কাকলি আর মিরপুর চৌদ্দ নম্বর ছাড়া আর কিছুই চিনি না। রিক্সাওয়ালা আমার বিপদ বুঝে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিজির দিকে নিয়ে চললেন। আমি বুঝতে পারলাম রিক্সাওয়ালার কথায় ঠিক, আমি একা একা পৌঁছাতে পারতাম না। ইনজেকশন নিয়ে আবার রিক্সায় চেপে বসি, রিক্সায় যাওয়ার সময়ই মাইকে বারবার শুনতে পেলাম সেহরির আর ১৫ মিনিট বাকি। যা হোক ইনজেকশন দেয়া হলো, ২৪ ঘণ্টা গেলো, ৪৮ ঘণ্টা গেলো, ৭২ ঘন্টা গেলো...

সেদিন ছিল শুক্রবার। ২১ রোযা, ২২ সেপ্টেম্বর। আনুমানিক রাত ১২ টার পর ডাক্তার হঠাৎ আমাকে ডাকলেন এবং তার পাশের চেয়ারে বসিয়ে পালস মাপলেন, আমার হাতটি তখনও তিনি মুঠিবদ্ধ করে ধরে আছেন, বললেন, শুন, তোমাকে শক্ত হতে হবে... তখনও কিছুই বুঝতে পারিনি আমি। 

তারপর তিনি বললেন— তোমার মা আর নেই। 

আমার মনে পড়ে, আমি শুধু তাকিয়ে ছিলাম... কিছুই বলিনি... দুঃখ হতাশা কান্না কিছুই পাইনি আমার বাইরে বের হয়ে ভাবলাম মাকে এই রাতেই আমি বাড়ি নিয়ে যাব, আমার ভাই তখন  ভেতরের সিড়ির পাশের কণারে চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছিল, আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি শত অবহেলা ও যন্ত্রণা পাওয়া আমার মায়ের লাশবাহী গাড়িতে আমার ভাই বোন চাচা খালা কাউকেই নেব না, নেইনি সেদিন তবে সমস্যা হলো হাসপাতালে বিল মিটাতে গিয়ে দেখি টাকা কম, এতো রাতে কাউকে জানাতেও পারতেছিলাম না, পরে আমার চাচাত বোন সেলিনা আপার কাছ থেকে টাকা ধার করে শোধ করি, তখন কফিন কেনার টাকা পযর্ন্ত অবশিষ্ট নেই , সিদ্ধান্ত নেই মার লাশ আমি সারারাস্তা বুকে জড়িয়ে নিয়ে যাব, এ্যাম্বুলেন্স ঠিক করা হলো, মাকে গাড়ির সিটে শুয়িয়ে দিয়ে মাথাটা আমার কোলে নিয়ে বসলাম, আমার ফর্সা সুন্দর শান্ত মায়ের মুখটা হলুদ হয়ে ঘুমিয়ে আছে, অপর পাশের  সিটে বসলেন এলাহি ভাই, বন্ধু সোহেল। এরপর উত্তরা থেকে ছোট্ট ভাগ্নি বৃষ্টি ও দিশাকে উঠিয়ে নিলাম, কারণ এই বৃষ্টি ছিল আমার মায়ের একমাত্র বন্ধু। 

এ্যাম্বুলেন্স হর্ন বাজাতে বাজাতে বাসাইলের দিকে চলতে শুরু করলো, এর মধ্যে কখন যেন মোবাইলও হারিয়ে ফেলেছি, এ্যাম্বুলেন্সের টাকার কথাও কাউকেই জানাতে পারিনি, তখন ছিল বর্ষা মাস, বাড়ি পর্যন্ত এ্যাম্বুলেন্স যাবে না... হঠাৎ শুনি আমাকে না পেয়ে সোহেলের নাম্বারে চাচাত বোন কানন আপা কল দিয়েছেন, তাকে বললাম টাকার কথা,  সে কাঁদতে কাঁদতে বললো টাকা নিয়ে তাদের রাখাল নয়াপাড়া ব্রিজের কাছে থাকবে। 

কিন্তু আশ্চর্য সেদিন আমি একফোঁটা কাঁদিনি। সত্যিই কাঁদিনি।    

তখন ভোর হয়ে গেছে। মাকে চাদরে ঢেকে থইথই জলের ওপর দিয়ে নৌকা করে বাড়ি পৌছালাম, পৌছালাম সেই বাড়িতে, যেখানে তার হাতেবোনা শত শত গাছ দাঁড়িয়ে আছে, শত শত মানুষ... চারপাশের অধিকাংশ মানুষই আমার মায়ের চেয়ে বয়সে বড়,  বৃদ্ধ, কী বয়সইবা হয়েছিল তার যে, এতো বড় পৃথিবীর অক্সিজেনে তার নিশ্বাস ফুরিয়ে গেলো... উত্তর নেই, উত্তর নেই।

ভাবছিলাম ভাইবোন, আপন চাচা খালাকে রেখেই মাকে দাফন করবো কিন্তু তা আর পেরে উঠিনি। সকাল ১০ টার দিকে ঢাকা থেকে তারা সবাই এলে দুপুর ৩টার দিকে মাকে দাফন করা হলো। এবং তার আধাঘণ্টা পরেই সবচেয়ে আশ্চর্যতম ঘটনা ঘটলো— মার হাতেবোনা প্রিয় আমগাছের তলে চাচিরা আমাকে নিয়ে বসে আছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন, এমন সময় আমার ছোট চাচা একখণ্ড কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললো,

“এই টাকাটা আমি তোর মা’র জন্য ধার করে এনে খরচ করেছি, একটু দ্রুত দিয়ে দিস’! 

(তখন তিনি উত্তরা থানার দারোগা) 

সম্ভবত আচ্ছা বলে আমি ৩৩,৭২৩ টাকার এই কাগজটা পকেটে রেখে দিই, ইসমাইল কাকার স্ত্রী তখন আমার পাশ থেকে রাগান্বিত হয়ে ওঠেন, “এই মুহূর্তে  তুমি এইগুলা কী বলছো সাইদ?” এই কথাটা আজও আমার কানে বাজে... 

৫.  

মাকে হারানোর পর, হোস্টলে ফিরে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। কিছুই খেতে পারতাম না, সারাদিন শুয়ে থাকি, জেগে থাকলে কাঁদি। শরীর দুর্বলতায় একেবারে শাদা হয়ে যাচ্ছিল বলে মেসমেটরা হাসপাতালে ভর্তি করাল এবং রক্তশূন্যতার কারণে ডাক্তার স্যালাইন করলেন। আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলাম। 

কয়েক দিন পরেই এলো ঈদ। বুয়া ১ সপ্তাহ আগেই ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেলো। মেসমেটরা এক দুইদিন আগে পরে যে যার মতো বাড়ি চলে গেলো। আমি মেসে একাই থেকে গেলাম কিন্তু সমস্যা হলো কুরবানির ঈদে হোটেলে যে ভাত পাওয়া যায় না তা জানতাম না। সকালের দিকে ঘুমিয়ে ভাবলাম, বিকালে ঘুম ভাঙলে রাতে হোটেলে গিয়ে খেয়ে নেব। কিন্তু দুপুরেই ঘুম ভেঙে গেলো। মসলাযুক্ত মাংসের সুস্বাদু ঘ্রাণ যেন গ্রিল গলে আমার রুমের ভেতর হু হু করে হামলে পড়ছে। চারদিকে বাংলা হিন্দি গানের আকাশ কাঁপানো মিউজিক। খিদেও লেগেছে ভীষণ। কিন্তু আলসামো লাগতেছিল, সাথে দ্বিধা ও পরিচিত মানুষদের সাথে দেখা হবার লজ্জা। কেউ যদি জানতে চাই কেন বাড়ি যাইনি? 

তখন কি উত্তর করবো আমি? মা মারা গেছেন অথবা বাড়িতে কেউ নেই!  না— না, মা মারা যাওয়া এই শব্দটা আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর একটা শব্দ, পারতপক্ষে এই কথাটি আমি মুখ ফুটে কাউকে জানাতে চাই না। 

রাত হলো। জেলাসদরের প্রতিটি স্ট্যান্ডে গেলাম, অলিগলি ঘুরলাম কোথাও ভাত নেই, হোটেলগুলো বন্ধ। এদিকে ক্সিাওয়ালার খিস্তিখেউর, ৫০ টাকার ভাড়া ৭০ টাকাও নিতে চাচ্ছে না। কথা একটাই— আজকে দিবেন না তো কবে দিবেন? এতো অসহায় লাগছিল যে— মুখ দিয়ে কথা পযর্ন্ত বের হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে নিরালার মোড়ের ফাস্টফুডের দোকানে ঢুকলাম , দেখলাম— আমার বয়সের ছেলে-মেয়েরা হৈ-চৈ করছে, পেপসি সেভেন-আপ কোকাকোলা খাচ্ছে। আমি চুপিচুপি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম বাগার্র হবে? 

আজকে? বিস্মিত স্বরে বললো দোকানওয়ালা 

পিজা জাতীয় কিছু? 

না, না 

আরও দু তিনটে দোকানে ঢুকলাম, একই অবস্থা! 

নেই, ভাত বার্গার পিজা পাউরুটি কিচ্ছু নেই। বনরুটি বা কেকের কারখানাও তিন দিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে সুতরাং ওগুলোও নেই। রিক্সায় উঠলে অজান্তে চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। নিমিষে ক্ষুধা যেন হারিয়ে গেছে। রিক্সা ততক্ষণে বাসার কাছে এসে পৌঁছাল। কে যেন একদিন বলেছিল— ‘পৃথিবীতে কারও কারও জন্মই হয় দুঃখ পাবার জন্য, এর থেকে কোনোভাবেই তার পরিত্রাণ ঘটে না’ নিজের কাছে সত্যিই মনে হলো আমি সেই ব্যক্তি। 

রাত যত বাড়তে থাকে ক্ষুধা যেন তত রাক্ষসের মতো খাবলে ধরতে শুরু করলো। কুমির যেন ঢুকে গেছে পেটে। তার দানব থাবা থেকে নিজেকে কোনোভাবেই কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না। কিন্তু এতো রাতে কী খাবো? পানি খেতে গেলে বমি আসে, কিচেন রুমে গিয়ে চালের ড্রাম খোলে দেখি— একটু চাল আছে। পানিতে ধুয়ে ঐ-টুকুই চিবুতে থাকি, সবজির ঝুড়িতে থাকা ৪/৫ টা শুকনো গাঁজর কচকচ করে নিমিষে সাবার করে ফেললাম... ক্ষুধা যে এতো নির্মম— এতো বড় রাক্ষস আমি ছাড়া তখন আর কে জানতো? 

সেদিনের সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পাখির ডাকে ধ্যান ভাঙে তার। দূর থেকে আযানের শব্দও ভেসে আসে। স্মৃতি আত্নঘাতির মতো ভেতরটা খুঁড়তে খুঁড়তে অতলে পৌছে গেছে, তার কূলকিনারা নেই। যেন চাঁদের পিরিচে চকচক করে সে জমতে থাকে, মিশে যায়, বাষ্পিভূত হয়, কিন্তু পরিত্রাণ হয় না। 

এতোকিছু মনে হবার পর আজ তার কান্না পেলো না। সে নিজেই নিজের বুক চাপড়িয়ে ছোট ছোট দুটো শাবাশ দিয়ে বললো— ‘বাঁচতে হবে’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সম্পর্ক ও ক্ষুধা

প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


কম্বলের ভেতর ঘেমে ভেজা মাটির মতো ত্যাকত্যাকা হয়ে গেছে সে। নিজের মাথায় নিজেই হাত দিয়ে দেখে, না, তেমন কমেনি। গেল চারদিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর, থেকে থেকে ভূ-কম্পনের মতো সারা শরীর কাঁপিয়ে তুলছে। ডান কাত ঘুরে শোয়ার চেষ্টা করে সে বুঝতে পারে— ভীষণ খিদে পেয়েছে তার। পাওয়ার কথাও, সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। লাইট জ্বালায় সে। ঘড়ির কাটা তখন রাত দুটো ছুঁই ছুঁই করছে। কিচেন রুমে গিয়ে দেখে ফোটানো পানি নেই। থাকার কথাও না। এ তিন চার দিন ধরে রান্নাবান্না কিছুই করতে পারেনি। ঘরে থাকা হরলিক্স, বিস্কুট খেয়েই আছে। বিস্কুটের বাক্স খুলে দেখে আর মাত্র দুটো বিস্কুট অবশিষ্ট আছে, তাও পোতানো। চার পাঁচটা গেছো পিঁঁপড়ে বিস্কুটের তলে-ওপরে আলেকজেন্ডারের ঘোড়ার মতো রেস করছে। কথায় আছে— ‘ক্ষুধা পেলে বাঘেও ঘাস খায়’। আর তার মনে হল— শুধু ঘাস কেন? ক্ষুধা যা পায় তাই খায়। হাতি ঘোড়া কুমিড় পর্যন্ত গিলে ফেলে। ক্ষুধার সামনে মাংস জাতীয় মানুষও নিরাপদ নয়। উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে বিমান বিধ্বস্ত সেই ভাইয়ের কথাই ভাবুন, যে তার মৃত বোনের মাংস খেয়ে বেঁচে ছিল। বেঁচে থাকাটাই ছিল তখন জরুরি। মৃত্যুকে মাথায় চেপে হরিণ বাফেলোকে নদী বা তৃণভূমিতে খাদ্যের সন্ধানে যেতে হয়, অনেকটা বাধ্য-বাধকতায়। 

এই যে বেঁচে থাকার লড়াই— তা নিরন্তর, চিরদিন। 

তাহলে মানুষ কার খাদ্য? অবশ্য মানুষও কারও না কারও খাদ্য, তবে আপতদৃষ্টিতে কোনো প্রাণি বা উদ্ভিদকুলের জন্যই শুধু নয়। জীবনাবস্থায় নতুন কোনো চিন্তা নয়তো অশেষ কষ্ট-যন্ত্রণার। 

থাক এসব কথা। 

সে পিপঁড়ে সরিয়ে বিস্কুট দুটো খেয়ে নেয়। জীবনে এরকম ভয়ানক ক্ষুধা আরও একবার লেগেছিল তার। ভীষণ ক্ষুধার মুহূর্তে পেটে একটু খাবার পড়লে, ক্ষুধা যেন আরো রাক্ষস হয়ে ওঠে। 

ওরও তাই মনে হলো। পানি আর বিস্কুট খাওয়ার পর কলকল করে ঘামতে থাকলো, মনে হলো এক গামলা ভাত খেলেই কেবল শান্তি মিলবে কিন্তু ভাত পাবে কোথায়?  কে দিবে ভাত? কেউ জানতেও চায়নি এ তিন-চার দিনের অসুস্থতায় সে কেমন আছে? কী করছে, ঠিকমত ওষুধপাতি খাচ্ছে কিনা? ইত্যাদি ইত্যাদি...

তাই নিজেই নিজেকে আদেশ করে, অনুরোধ করে— খাও... ঘুমাও... গোসল করো এই রকম আর কি! এবার নিজেই নিজেকে বললো, ঘুমাও— তোমার ঘুমানো দরকার!   

সে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলো।

কিন্তু ঘুম আসছে না, ঘুমানো অতো সহজ নয়। অতীত স্মৃতিগুলো সিডরের বেগে উতলা করে তুললো। সে ক্রমশই বাঁধভাঙা জলের ঘূর্ণিতে ডুবে যেতে থাকলো... এবং ভাবতে লাগলো— এই অন্ধ কুঠিরে সে যদি মরে পড়ে থাকে তবে কেউ জানবে না, কেউ নেই তার। হয়তো বাড়িওয়ালা একদিন পুলিশ ডেকে দরজা ভেঙে দেখবে— সে মরে পড়ে আছে। হয়তো তখন মোবাইল ডায়াল করবে কিন্তু কোন আত্মীয়-স্বজনকে পাওয়া যাবে না।  

তবে? নিজের কাছেই জানতে চায় সে! কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। নিঃসঙ্গ জীবনটাকে এতো কাছ থেকে দেখেছে, আত্মীয় স্বজন ভাই বোনের অর্থগত কোনো সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পারেনি আজও...

২.

বেশ অবস্থাসম্পন্ন পরিবারেই জন্ম তার। ততদিনে একমাত্র বড় বোনের বিয়েও হয়ে গেছে। তার বছর দেড় পর বাবা মারা গেলেন। মারা যাওয়া বিষয়টা যে এতো ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক— তা সে বুঝতো না। বোঝার কথাও না, সে ছিল ছয় সাত বছরের দুরন্ত কিশোর, ছুটি গল্পের ফটিকের তাইরে নাইরের মতো। বড় ভাই (ছাত্র হিসেবে তুখোড়) আর বিধবা মা এই তাদের সংসার। পাশের গ্রামের কৃষকের ছেলে যদি বুয়েটে পড়তে পারে, তাহলে তার ভাইটি নয় কেন? এই ছিল তার বিধবা মায়ের নিস্পাপ চাওয়া। 

জমি বিক্রি করে তার বড় ভাইকে ঢাকায় পাঠানো হলো, ভালো কথা। কিন্তু ঢাকায় আসার পর নানা রকম আনন্দ ও রঙিন জগতের হিরো হবার নেশায় ভাইটির পড়ালেখার গনেশ উল্টে গেছে। মা বুঝতেও পারেনি। সে এমন পড়াশোনা করতো যে— বছরের দুটো ঈদেও বাড়ি আসতে পারতো না। মাসে মাসে চড়া সুদে কিম্বা ধার দেনা করে টাকা পাঠাতে হতো। 

৩.

এভাবে দশ এগারো বছর চলে গেলো। বড়ভাইটি ইঞ্জিনিয়ার কিম্বা রঙিন জগতের হিরো হতে পারেনি। তাতেও অসুবিধা ছিল না। শুধু আপত্তি উঠলো, এতো খোয়ানোর পরও মায়ের অভাব অনটন এতটুকুও বুঝতো না। নির্মমভাবে টাকা আদায় করে ছাড়তো, না হলে চলতো দেশ ছাড়ার হুমকি। আহা! এই ভয়ে মা কলিজা বিক্রির জন্যও প্রস্তুত থাকতেন। 

ছোট একটা ঘটনা বলি, ততদিনে মা’র সব গয়না বিক্রি হয়ে গেছে। কানে মাত্র দেড় আনার ছোট দুটি রিং— যা সে কিনে দিয়েছিল। মার স্বর্ণ বলতে তখন ঐটুকুই ছিল। তাও বিক্রি করে নিতে বড়ভাইটির বাঁধেনি। বাড়িতে সারাদিন পাওনাদার আসতো, চাচারা টাকা পায়, বোন টাকা পায়,  খালা-ফুফুরা টাকা পায়— কিন্তু কিছুই সে জানে না।  একসময় বাড়িতে কাজ করা লোকগুলোও টাকা পায়— তাও জানে না। দূরসর্ম্পকের এমন কোনো আত্মীয় নেই যে টাকা পায় না।

এদিকে মা’র শরীর ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল। জমি বিক্রি করে ঋণ শোধ করতে থাকি আমি, এক এক করে । চাচা খালাদের পাশাপাশি বোনটিও জমিজমার সুযোগ নিল! ছোট চাচা জমির নায্য দাম দিল না, বরং রক্তের ঢল নামাবে বলে হুমকি দিয়ে কম দামে জমি নিয়ে নিল। তখন আমি ছোট, বোন যা দিয়েছিল তার ডাবল টাকা দাবি করলো। চিন্তায় চিন্তায় খুব অল্প দিনের মধ্যেই, যেন কেনো এক সকালে উঠে হঠাৎ দেখলাম মায়ের প্রায় সব চুল পেকে গেছে। ততদিনে মার ভেতরে মরন বাসা বেঁধে ফেলেছে, বুঝতে পারিনি । হঠাৎ হঠাৎ তার চোখ কুকার মতো লাল টকটক হয়ে যেতো, যেন এক্ষুনি চোখ ফেটে গলগল করে রক্ত ঝরবে। পাশের বাড়ি থেকে ডাক্তার চাচা (আর্মি থেকে রিটার্য়াড) এলেন, প্রেসার মেপে বললেন এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যাও। তখনও প্রেসার সর্ম্পকে আমার তেমন কোনো ধারণাই জন্মায়নি। ডাক্তার খুব শঙ্কিত হলেন— ২১০/১৪০!

এরপরও কয়েক যাত্রায় মা বেঁচে গেলেন। রাতে হঠাৎ হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যেত, দেখতাম— মা আমার পিঠে হাত দিয়ে বিড় বিড় করে কী যেন বলছেন। ঘুমো চোখেই জিজ্ঞেস করতাম— কী হইছে? তিনি ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকতেন আর বলতেন— তোকে খুব ঠকায় ফেলছি রে বাবা!

এই ঠকানো শব্দটায় আমি তখন মহাবিরক্ত। পরিচিত কেউ আমাকে দেখলেই শুরু করতো কত দিক দিয়ে ঠকেছি তার বিশদ ফিরিস্তি। কেন এতো বোকামি করছি, কেন আমার জমি বিক্রি করে ঋণ শোধাচ্ছি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যে বুঝতাম না তাও না, কিন্তু এ ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।  

৪.

আমি ততদিনে নতুন করে আবার কলেজে ভর্তি হয়েছি। থাকি জেলাসদরে, আকুরটাকুর পাড়া। মা প্রায় প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েন, হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে প্রায় ৬/৭ দিন থাকতে হয়। তার সেবাযত্ন ,কাপড় ধোয়া, মুখে তুলে খাওয়ানোর সবটাই আমি করি। বড়ভাইটি ঢাকা থেকে একবারও মাকে দেখতে আসে না। বোনটি একবার এসে দেখেই চলে যায়। ডাক্তার বললো, যেভাবে প্রেসার আপ-ডাউন করে, এভাবে একা রাখা ঠিক হবে না। 

আমি কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। কার কাছে মাকে রাখবো! আবার বাড়ি থেকেও কলেজে যাতায়াত সম্ভব না। তবে কি আবার পড়ালেখা ছেড়ে দেবো?  মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, যে করেই হোক মাকে আমার কাছেই রাখতে হবে।

কিন্তু টাকা! টাকা পাবো কোথায়? জমি বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় উৎস নেই। কিন্তু মা নতুন করে আর কোনো জমি বিক্রি করতে রাজি নন। 

অথচ তখনও আমরা জানতাম না, ২/৩ বছর আগেই ভাই বিয়ে করেছে। মাকে পর্যন্ত জানায়নি।  

যা হোক, পরিচিত কামরুল ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে একটা সাবলেট বাসা এডভান্স করলাম। ট্রাক ভাড়া করে খাট, আলনা, হাঁড়িপাতিল, থালাবাসন, কাপড়চোপড় নিয়ে এলাম।

মাকে তখনও জানাইনি যে তাকে আর বাড়িতে যেতে দেয়া হবে না। তবে বাসাটা যে মা’র পছন্দ হয়নি তা আমি বুঝেছিলাম। এর চেয়ে সুন্দর বাসা ভাড়া করাও আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি তখন আদালত পাড়ার একটা কোচিংয়ে দুই শিফটে পড়াতে শুরু করলাম। আমার এত পরিশ্রম মা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। মাস ছয় পরেই মা বাড়ি যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি ভাবলেন, হয়তো তার জন্যই আমাকে এতো পরিশ্রম করতে হচ্ছে। শত চেষ্টা করেও তাকে আটকাতে পারলাম না। 

৫.

তার কিছুদিন পর মা ব্রেনস্টোক করলেন। প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল তারপর মগবাজার রাশমনি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করানো হলো, পরেরদিন করানো হলো অপরেশন। কিন্তু হঠাৎ মার কিডনি দুটো অকেজো হয়ে পড়ল,  ল্যাবএইডের কিডনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সামাদ একটা ইনজেকশন লিখলেন, এটাই নাকি তার শেষ চিকিৎসা! ছবিতে দেখা কাহিনির মতো সবকিছু ঘটছিল, রমজান মাস হওয়ায় রিক্সা গাড়ি বা দোকানপাট সবকিছুই মাঝরাতের আগে কমে যেতে শুরু করলো। রিক্সা পেলাম না, মগবাজার রাশমনি হাসপাতাল থেকে পিজির দিকে দৌড়াতে থাকি। ঢাকার শহর তখনো ভালো চিনি না, পিজির কাছে ছাড়া নাকি ঐ ইনজেকশন সচরাচর পাওয়া যায় না। হাসপাতাল থেকে বলে দেওয়া লোকেশন অনুযায়ী দৌড়াতে থাকি কিন্তু সব রাস্তায় আমার কাছে একরকম মনে হচ্ছে তারপরও দৌড়াচ্ছি... মেইন রাস্তা ধরেই দৌঁড়াচ্ছি কিন্তু কোথায় পিজি?  হোচঁট খেয়ে বুড়ো আঙুলে ব্যথা পেলাম, জুতাও ছিঁড়ে গেছে, জুতা ফেলেই দৌঁড়াতে থাকি... অনেক দূর আসার পর একটা রিক্সা পাই, তিনি বললেন আমি ভুল এসেছি— এটা নাকি পুরান ঢাকার দিকে যাচ্ছি! ঢাকার শহর বলতে তখনো এয়ারপোর্ট, কাকলি আর মিরপুর চৌদ্দ নম্বর ছাড়া আর কিছুই চিনি না। রিক্সাওয়ালা আমার বিপদ বুঝে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিজির দিকে নিয়ে চললেন। আমি বুঝতে পারলাম রিক্সাওয়ালার কথায় ঠিক, আমি একা একা পৌঁছাতে পারতাম না। ইনজেকশন নিয়ে আবার রিক্সায় চেপে বসি, রিক্সায় যাওয়ার সময়ই মাইকে বারবার শুনতে পেলাম সেহরির আর ১৫ মিনিট বাকি। যা হোক ইনজেকশন দেয়া হলো, ২৪ ঘণ্টা গেলো, ৪৮ ঘণ্টা গেলো, ৭২ ঘন্টা গেলো...

সেদিন ছিল শুক্রবার। ২১ রোযা, ২২ সেপ্টেম্বর। আনুমানিক রাত ১২ টার পর ডাক্তার হঠাৎ আমাকে ডাকলেন এবং তার পাশের চেয়ারে বসিয়ে পালস মাপলেন, আমার হাতটি তখনও তিনি মুঠিবদ্ধ করে ধরে আছেন, বললেন, শুন, তোমাকে শক্ত হতে হবে... তখনও কিছুই বুঝতে পারিনি আমি। 

তারপর তিনি বললেন— তোমার মা আর নেই। 

আমার মনে পড়ে, আমি শুধু তাকিয়ে ছিলাম... কিছুই বলিনি... দুঃখ হতাশা কান্না কিছুই পাইনি আমার বাইরে বের হয়ে ভাবলাম মাকে এই রাতেই আমি বাড়ি নিয়ে যাব, আমার ভাই তখন  ভেতরের সিড়ির পাশের কণারে চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছিল, আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি শত অবহেলা ও যন্ত্রণা পাওয়া আমার মায়ের লাশবাহী গাড়িতে আমার ভাই বোন চাচা খালা কাউকেই নেব না, নেইনি সেদিন তবে সমস্যা হলো হাসপাতালে বিল মিটাতে গিয়ে দেখি টাকা কম, এতো রাতে কাউকে জানাতেও পারতেছিলাম না, পরে আমার চাচাত বোন সেলিনা আপার কাছ থেকে টাকা ধার করে শোধ করি, তখন কফিন কেনার টাকা পযর্ন্ত অবশিষ্ট নেই , সিদ্ধান্ত নেই মার লাশ আমি সারারাস্তা বুকে জড়িয়ে নিয়ে যাব, এ্যাম্বুলেন্স ঠিক করা হলো, মাকে গাড়ির সিটে শুয়িয়ে দিয়ে মাথাটা আমার কোলে নিয়ে বসলাম, আমার ফর্সা সুন্দর শান্ত মায়ের মুখটা হলুদ হয়ে ঘুমিয়ে আছে, অপর পাশের  সিটে বসলেন এলাহি ভাই, বন্ধু সোহেল। এরপর উত্তরা থেকে ছোট্ট ভাগ্নি বৃষ্টি ও দিশাকে উঠিয়ে নিলাম, কারণ এই বৃষ্টি ছিল আমার মায়ের একমাত্র বন্ধু। 

এ্যাম্বুলেন্স হর্ন বাজাতে বাজাতে বাসাইলের দিকে চলতে শুরু করলো, এর মধ্যে কখন যেন মোবাইলও হারিয়ে ফেলেছি, এ্যাম্বুলেন্সের টাকার কথাও কাউকেই জানাতে পারিনি, তখন ছিল বর্ষা মাস, বাড়ি পর্যন্ত এ্যাম্বুলেন্স যাবে না... হঠাৎ শুনি আমাকে না পেয়ে সোহেলের নাম্বারে চাচাত বোন কানন আপা কল দিয়েছেন, তাকে বললাম টাকার কথা,  সে কাঁদতে কাঁদতে বললো টাকা নিয়ে তাদের রাখাল নয়াপাড়া ব্রিজের কাছে থাকবে। 

কিন্তু আশ্চর্য সেদিন আমি একফোঁটা কাঁদিনি। সত্যিই কাঁদিনি।    

তখন ভোর হয়ে গেছে। মাকে চাদরে ঢেকে থইথই জলের ওপর দিয়ে নৌকা করে বাড়ি পৌছালাম, পৌছালাম সেই বাড়িতে, যেখানে তার হাতেবোনা শত শত গাছ দাঁড়িয়ে আছে, শত শত মানুষ... চারপাশের অধিকাংশ মানুষই আমার মায়ের চেয়ে বয়সে বড়,  বৃদ্ধ, কী বয়সইবা হয়েছিল তার যে, এতো বড় পৃথিবীর অক্সিজেনে তার নিশ্বাস ফুরিয়ে গেলো... উত্তর নেই, উত্তর নেই।

ভাবছিলাম ভাইবোন, আপন চাচা খালাকে রেখেই মাকে দাফন করবো কিন্তু তা আর পেরে উঠিনি। সকাল ১০ টার দিকে ঢাকা থেকে তারা সবাই এলে দুপুর ৩টার দিকে মাকে দাফন করা হলো। এবং তার আধাঘণ্টা পরেই সবচেয়ে আশ্চর্যতম ঘটনা ঘটলো— মার হাতেবোনা প্রিয় আমগাছের তলে চাচিরা আমাকে নিয়ে বসে আছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন, এমন সময় আমার ছোট চাচা একখণ্ড কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললো,

“এই টাকাটা আমি তোর মা’র জন্য ধার করে এনে খরচ করেছি, একটু দ্রুত দিয়ে দিস’! 

(তখন তিনি উত্তরা থানার দারোগা) 

সম্ভবত আচ্ছা বলে আমি ৩৩,৭২৩ টাকার এই কাগজটা পকেটে রেখে দিই, ইসমাইল কাকার স্ত্রী তখন আমার পাশ থেকে রাগান্বিত হয়ে ওঠেন, “এই মুহূর্তে  তুমি এইগুলা কী বলছো সাইদ?” এই কথাটা আজও আমার কানে বাজে... 

৫.  

মাকে হারানোর পর, হোস্টলে ফিরে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। কিছুই খেতে পারতাম না, সারাদিন শুয়ে থাকি, জেগে থাকলে কাঁদি। শরীর দুর্বলতায় একেবারে শাদা হয়ে যাচ্ছিল বলে মেসমেটরা হাসপাতালে ভর্তি করাল এবং রক্তশূন্যতার কারণে ডাক্তার স্যালাইন করলেন। আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলাম। 

কয়েক দিন পরেই এলো ঈদ। বুয়া ১ সপ্তাহ আগেই ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেলো। মেসমেটরা এক দুইদিন আগে পরে যে যার মতো বাড়ি চলে গেলো। আমি মেসে একাই থেকে গেলাম কিন্তু সমস্যা হলো কুরবানির ঈদে হোটেলে যে ভাত পাওয়া যায় না তা জানতাম না। সকালের দিকে ঘুমিয়ে ভাবলাম, বিকালে ঘুম ভাঙলে রাতে হোটেলে গিয়ে খেয়ে নেব। কিন্তু দুপুরেই ঘুম ভেঙে গেলো। মসলাযুক্ত মাংসের সুস্বাদু ঘ্রাণ যেন গ্রিল গলে আমার রুমের ভেতর হু হু করে হামলে পড়ছে। চারদিকে বাংলা হিন্দি গানের আকাশ কাঁপানো মিউজিক। খিদেও লেগেছে ভীষণ। কিন্তু আলসামো লাগতেছিল, সাথে দ্বিধা ও পরিচিত মানুষদের সাথে দেখা হবার লজ্জা। কেউ যদি জানতে চাই কেন বাড়ি যাইনি? 

তখন কি উত্তর করবো আমি? মা মারা গেছেন অথবা বাড়িতে কেউ নেই!  না— না, মা মারা যাওয়া এই শব্দটা আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর একটা শব্দ, পারতপক্ষে এই কথাটি আমি মুখ ফুটে কাউকে জানাতে চাই না। 

রাত হলো। জেলাসদরের প্রতিটি স্ট্যান্ডে গেলাম, অলিগলি ঘুরলাম কোথাও ভাত নেই, হোটেলগুলো বন্ধ। এদিকে ক্সিাওয়ালার খিস্তিখেউর, ৫০ টাকার ভাড়া ৭০ টাকাও নিতে চাচ্ছে না। কথা একটাই— আজকে দিবেন না তো কবে দিবেন? এতো অসহায় লাগছিল যে— মুখ দিয়ে কথা পযর্ন্ত বের হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে নিরালার মোড়ের ফাস্টফুডের দোকানে ঢুকলাম , দেখলাম— আমার বয়সের ছেলে-মেয়েরা হৈ-চৈ করছে, পেপসি সেভেন-আপ কোকাকোলা খাচ্ছে। আমি চুপিচুপি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম বাগার্র হবে? 

আজকে? বিস্মিত স্বরে বললো দোকানওয়ালা 

পিজা জাতীয় কিছু? 

না, না 

আরও দু তিনটে দোকানে ঢুকলাম, একই অবস্থা! 

নেই, ভাত বার্গার পিজা পাউরুটি কিচ্ছু নেই। বনরুটি বা কেকের কারখানাও তিন দিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে সুতরাং ওগুলোও নেই। রিক্সায় উঠলে অজান্তে চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। নিমিষে ক্ষুধা যেন হারিয়ে গেছে। রিক্সা ততক্ষণে বাসার কাছে এসে পৌঁছাল। কে যেন একদিন বলেছিল— ‘পৃথিবীতে কারও কারও জন্মই হয় দুঃখ পাবার জন্য, এর থেকে কোনোভাবেই তার পরিত্রাণ ঘটে না’ নিজের কাছে সত্যিই মনে হলো আমি সেই ব্যক্তি। 

রাত যত বাড়তে থাকে ক্ষুধা যেন তত রাক্ষসের মতো খাবলে ধরতে শুরু করলো। কুমির যেন ঢুকে গেছে পেটে। তার দানব থাবা থেকে নিজেকে কোনোভাবেই কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না। কিন্তু এতো রাতে কী খাবো? পানি খেতে গেলে বমি আসে, কিচেন রুমে গিয়ে চালের ড্রাম খোলে দেখি— একটু চাল আছে। পানিতে ধুয়ে ঐ-টুকুই চিবুতে থাকি, সবজির ঝুড়িতে থাকা ৪/৫ টা শুকনো গাঁজর কচকচ করে নিমিষে সাবার করে ফেললাম... ক্ষুধা যে এতো নির্মম— এতো বড় রাক্ষস আমি ছাড়া তখন আর কে জানতো? 

সেদিনের সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ পাখির ডাকে ধ্যান ভাঙে তার। দূর থেকে আযানের শব্দও ভেসে আসে। স্মৃতি আত্নঘাতির মতো ভেতরটা খুঁড়তে খুঁড়তে অতলে পৌছে গেছে, তার কূলকিনারা নেই। যেন চাঁদের পিরিচে চকচক করে সে জমতে থাকে, মিশে যায়, বাষ্পিভূত হয়, কিন্তু পরিত্রাণ হয় না। 

এতোকিছু মনে হবার পর আজ তার কান্না পেলো না। সে নিজেই নিজের বুক চাপড়িয়ে ছোট ছোট দুটো শাবাশ দিয়ে বললো— ‘বাঁচতে হবে’


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত