কবিতাগুচ্ছ
নাসির আহমেদ
সময়-অসময়
দুপুর কি রাত সর্বদা শুনি ভৈরবী রাগে ঝরছে বিষাদ
বাতাসে বাতাসে। নক্ষত্রের পুড়ে যাওয়া ছাই
স্নায়ুকোষে নীল সুরমার রং! ঋতুভেদহীন সব ঋতু আজ
প্রবল হিমের আর কুয়াশার!
একাত্তরের রূঢ়বাস্তব
আজ চেতনায় ছায়াবাস্তব।
শহীদের স্মৃতিস্তম্ভে যে ফুল,
সে ফুল পুড়ছে
জালিম আগুন!
ষড়ঋতু নেই, বসন্ত নেই!
সব মুছে গেছে দীর্ঘশ্বাসে!
বস্তু হারায় নির্বস্তুর শূন্যতা হয়ে!
তুমিই স্থবির শুধু
আলো হাঁটে, নদী হাঁটে, হেঁটে যায় রাজকীয়
গ্রীবাটি দুলিয়ে রাজহাঁস!
আলোকের দিকে দ্রুত অন্ধকারও হেঁটে যায়
হেঁটে যায় কুয়াশায় ভেজা স্নিগ্ধ গুচ্ছগুচ্ছ ঘাস!
তুমিই স্থবির শুধু দাঁড়িয়ে রয়েছো সমকাল
হায় স্বপ্ন! হাঁটতে পারো না তুমি এমনই কপাল!
মরীচিকা
কোনো কোনো নির্ঘুম রাত
মরীচিকাময় রোদে হুহুবেগে ছুটে চলা
জলের প্রপাত!
তৃষ্ণা এসে বসে আছে পাশে বহুক্ষণ
জল নেই, বৃষ্টি নেই! আহা মরীচিকা মন
অকাল মরণ!
প্রতীক্ষা
কার প্রতীক্ষায় তুমি বসে আছো রাত!
ভোর?
সে তো কুয়াশায় ঢাকা গভীর রাত্রির চোখে
সূর্য নয়, মায়াবিনী আলোকের ঘোর!
হঠাৎ হাওয়ায়
নাড়িয়ে গেল হঠাৎ হাওয়া ঝোপের আড়াল বন।
এই দৃশ্যে চমকে উঠি! পড়লো মনে হারিয়ে গেছো
সেই যে কবে মনের হাওয়ায় নাড়িয়ে দিয়ে মন।
মন পুড়েছে, বন পুড়েছে হঠাৎ দাবানল
সেই কবেকার স্মৃতির চোখে অশ্রু টলমল!
বিপরীত প্রকৃতি
পুরুষ প্রকৃতি তুমি, আমি নারী প্রকৃতি স্বরূপা;
উপেক্ষায় মুছে গেছে আমার সোনালি রং
যেন আমি পথে পড়ে থাকা সস্তা রূপা!
অচল মুদ্রার ঠিক প্রতিমাই আমি
অথচ আমার নাকি তুমি অন্তর্যামী!
হাজিরার খাতা
আতাউর রহমান মিলাদ
ভিড়ের মাঝে একা হয়ে যাই
কাছের মানুষগুলোও অচেনা হয়ে যায়
কাকে, কখন যে দেখেছি কোথায়,
বা আদৌ দেখিনি
কেন যে আজ মনে পড়ে না
হাজিরার খাতায় কাটা যায় নামের তালিকা!
বন্ধনের শেকড় ছেঁড়া স্মৃতির ভূগোল
বুঝতে পারিনি কুশলচক্রে—
বাইরের আলো জ্বলে উঠলেই
প্রকট হয়ে ওঠে ভেতরের অন্ধকার...
কফির ধোঁয়ায় মিশে যায় এক চিলতে রোদ
সংশয় গচ্ছিত রেখে হাত পাতি
বেয়াড়া হাওয়ায়
সেও উড়িয়ে নিয়ে যায় রহস্যে ধুলোয়...
শরতের মতো একা
দুলাল সরকার
তুমি কি শরতের মত একা— নীল ডগা
কচুরিপানার চাক দলছুট কারে যেন
খুঁজে খুঁজে জলাশয়ে চড়ে— মেঘ সরে যেতে
যে রকম অলকায় তুমি একা? বিরহ বোঝো না;
সময়ের যাঁতাকলে রাখাল বাতাস
তোমাকে একাকী পেয়ে ঠোঁটে বসে
পান কর শরতের নীল— আর তুমি
দূরত্ব সৃষ্টি কর পথের গ্রীবায় এক মহাকাল
নীলকণ্ঠ দিগন্ত অবধি অপরিসর
মনের অজ্ঞাতে হোক তব অজ্ঞাতবাস।
দেয়ালগুলো সাদা
আলী সিদ্দিকী
দেয়ালগুলো সব সাদা
বিমূঢ় ক্যানভাস
লৌকিক মুখের আদলে
চাপা দেয়া লাভা স্রোত
সময়গুলো থেমে আছে
রঙহীন পলেস্তারা
জন্মহীন মৃত্যুহীন প্রহর
বিঁধে আছে এক ভগ্নাংশ
প্রশ্নাতীত ছিন্ন কুসম এক
থেতলানো ঘাসফুল
ধুসর প্রচ্ছায়া নৃত্যপাগল
মহাকাল হাসে বিষ হাসি
দেয়ালগুলো দায়িত্বশীল
যথাযথ শোকগাথা
তোমার কথারা হয়ে উঠেছে
নৈঃশব্দ্যের অনন্য স্মরণিকা
যাপনের শতমুখো লতাগুল্ম
শোকার্ত গোলাপদল
অসমাপ্ত সুরের রেণু হয়েছো
দেয়াল জুড়ে সাদা অন্ধকার।
প্রজ্ঞা
তৃণা চক্রবর্তী
শরীর সব জানত
অথচ তুমি শুধু মাথা খাটিয়ে গেছ অনর্থক
গোয়েন্দার মতো ভেবেছ নিজেকে
আর সমস্ত রহস্য থেকে গিয়েছে অজানা
শরীর সব জানে
কোনটা ঠিক, কোনটা সেভাবে ঠিক নয়
কোথায় অস্থিরতা, কোথায়বা স্থির হয়ে আছে শান্তি
কোথায় বিপদ, কোথায় বন্ধু
কোন দরজা বন্ধ, কোথায় খোলা আকাশ
শরীর সব জানত
আর তুমি মস্তিস্ক দিয়ে ভেবেছ সবকিছু
সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছ ঠাণ্ডা মাথায়
বুঝতে পারনি এই মাথার ভিতরে কত ফাঁদ
কত জটিল আবর্ত, কত চোরাগলি
তোমাকে বিভ্রান্ত করে দিতে পারে সারা জীবনের মতো
এক ভুল সিদ্ধান্তের পিছনে আর এক ভুল সিদ্ধান্ত এসে জুড়ে যেতে যেতে
একটা লম্বা ঘোরানো সিঁড়ি হয়ে যায় শেষে
আসলে শরীর এক প্রাচীন প্রজ্ঞা
সে সব কিছু বোঝে
আলোকিত প্রত্যুষের খোঁজে
মোঃ ইখতিয়ার উদ্দীন
শূন্যতায় ঢেকে আছে চারিদিক
তুমুল কোলাহল আর অজস্র জনারণ্যে
মানবের মানবিকতা বিবর্জিত সমাজে।
রাতের নিস্তব্ধতায় কোন
জোনাকির আলো নেই,
নেই রুপোলি চাঁদের মোহনীয় মায়া।
শুধুই আঁধারের কালো ছায়া।
কোন এক আলোকবর্তিকার মোহে
নিশাচর আমি জেগে থাকি
আলোকিত প্রতুষ্যের খোঁজে।
আমার পৃথিবী
পুলিন রায়
বৃক্ষচোখে চোখ রাখি
সবুজ ধার করে মাখি অঞ্জন
সকালের মায়াবী রোদে
ঘূর্ণন শুরু হলে বদলে যায়
আমার পৃথিবী
ফেলে যাওয়া দিন আর ফিরে না
গন্তব্য ভুলে গেলে
উতলা হয় ফেরারি মন
ঘুমঘোরে নয়--
অহল্যা সময় জানে
বেভুল পথের আসল মাজেজা...
আমার পৃথিবীর আঁকাবাকা কক্ষপথ
চিনি তো কেবল আমিই।
ছুতো
মাতিন মোসাব্বির
ওরা ভুলে যায়—
ওরা ভুলে যেতে পারে!
ওরা ব্যস্ততার ছুতোয় ভুলে যায়।
ওরা অভিযোগের পাশায় অভিযুক্ত করে চলে যায়।
ওরা পারে নতুন মুখে হাসতে,
ওরা পারে পুরনো ক্ষত ঢাকতে,
ওরা পারে সব মনে রেখে, না-থাকার ভান করতে!
আমি ভুলতে জানি না, তাই জেগে থাকি;
বুকের ভেতর পুষে রাখি ছাইচাপা আগুন
রাত গড়ালেই লিখি কষ্টের বুনন—
ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কবিতাগুচ্ছ
নাসির আহমেদ
সময়-অসময়
দুপুর কি রাত সর্বদা শুনি ভৈরবী রাগে ঝরছে বিষাদ
বাতাসে বাতাসে। নক্ষত্রের পুড়ে যাওয়া ছাই
স্নায়ুকোষে নীল সুরমার রং! ঋতুভেদহীন সব ঋতু আজ
প্রবল হিমের আর কুয়াশার!
একাত্তরের রূঢ়বাস্তব
আজ চেতনায় ছায়াবাস্তব।
শহীদের স্মৃতিস্তম্ভে যে ফুল,
সে ফুল পুড়ছে
জালিম আগুন!
ষড়ঋতু নেই, বসন্ত নেই!
সব মুছে গেছে দীর্ঘশ্বাসে!
বস্তু হারায় নির্বস্তুর শূন্যতা হয়ে!
তুমিই স্থবির শুধু
আলো হাঁটে, নদী হাঁটে, হেঁটে যায় রাজকীয়
গ্রীবাটি দুলিয়ে রাজহাঁস!
আলোকের দিকে দ্রুত অন্ধকারও হেঁটে যায়
হেঁটে যায় কুয়াশায় ভেজা স্নিগ্ধ গুচ্ছগুচ্ছ ঘাস!
তুমিই স্থবির শুধু দাঁড়িয়ে রয়েছো সমকাল
হায় স্বপ্ন! হাঁটতে পারো না তুমি এমনই কপাল!
মরীচিকা
কোনো কোনো নির্ঘুম রাত
মরীচিকাময় রোদে হুহুবেগে ছুটে চলা
জলের প্রপাত!
তৃষ্ণা এসে বসে আছে পাশে বহুক্ষণ
জল নেই, বৃষ্টি নেই! আহা মরীচিকা মন
অকাল মরণ!
প্রতীক্ষা
কার প্রতীক্ষায় তুমি বসে আছো রাত!
ভোর?
সে তো কুয়াশায় ঢাকা গভীর রাত্রির চোখে
সূর্য নয়, মায়াবিনী আলোকের ঘোর!
হঠাৎ হাওয়ায়
নাড়িয়ে গেল হঠাৎ হাওয়া ঝোপের আড়াল বন।
এই দৃশ্যে চমকে উঠি! পড়লো মনে হারিয়ে গেছো
সেই যে কবে মনের হাওয়ায় নাড়িয়ে দিয়ে মন।
মন পুড়েছে, বন পুড়েছে হঠাৎ দাবানল
সেই কবেকার স্মৃতির চোখে অশ্রু টলমল!
বিপরীত প্রকৃতি
পুরুষ প্রকৃতি তুমি, আমি নারী প্রকৃতি স্বরূপা;
উপেক্ষায় মুছে গেছে আমার সোনালি রং
যেন আমি পথে পড়ে থাকা সস্তা রূপা!
অচল মুদ্রার ঠিক প্রতিমাই আমি
অথচ আমার নাকি তুমি অন্তর্যামী!
হাজিরার খাতা
আতাউর রহমান মিলাদ
ভিড়ের মাঝে একা হয়ে যাই
কাছের মানুষগুলোও অচেনা হয়ে যায়
কাকে, কখন যে দেখেছি কোথায়,
বা আদৌ দেখিনি
কেন যে আজ মনে পড়ে না
হাজিরার খাতায় কাটা যায় নামের তালিকা!
বন্ধনের শেকড় ছেঁড়া স্মৃতির ভূগোল
বুঝতে পারিনি কুশলচক্রে—
বাইরের আলো জ্বলে উঠলেই
প্রকট হয়ে ওঠে ভেতরের অন্ধকার...
কফির ধোঁয়ায় মিশে যায় এক চিলতে রোদ
সংশয় গচ্ছিত রেখে হাত পাতি
বেয়াড়া হাওয়ায়
সেও উড়িয়ে নিয়ে যায় রহস্যে ধুলোয়...
শরতের মতো একা
দুলাল সরকার
তুমি কি শরতের মত একা— নীল ডগা
কচুরিপানার চাক দলছুট কারে যেন
খুঁজে খুঁজে জলাশয়ে চড়ে— মেঘ সরে যেতে
যে রকম অলকায় তুমি একা? বিরহ বোঝো না;
সময়ের যাঁতাকলে রাখাল বাতাস
তোমাকে একাকী পেয়ে ঠোঁটে বসে
পান কর শরতের নীল— আর তুমি
দূরত্ব সৃষ্টি কর পথের গ্রীবায় এক মহাকাল
নীলকণ্ঠ দিগন্ত অবধি অপরিসর
মনের অজ্ঞাতে হোক তব অজ্ঞাতবাস।
দেয়ালগুলো সাদা
আলী সিদ্দিকী
দেয়ালগুলো সব সাদা
বিমূঢ় ক্যানভাস
লৌকিক মুখের আদলে
চাপা দেয়া লাভা স্রোত
সময়গুলো থেমে আছে
রঙহীন পলেস্তারা
জন্মহীন মৃত্যুহীন প্রহর
বিঁধে আছে এক ভগ্নাংশ
প্রশ্নাতীত ছিন্ন কুসম এক
থেতলানো ঘাসফুল
ধুসর প্রচ্ছায়া নৃত্যপাগল
মহাকাল হাসে বিষ হাসি
দেয়ালগুলো দায়িত্বশীল
যথাযথ শোকগাথা
তোমার কথারা হয়ে উঠেছে
নৈঃশব্দ্যের অনন্য স্মরণিকা
যাপনের শতমুখো লতাগুল্ম
শোকার্ত গোলাপদল
অসমাপ্ত সুরের রেণু হয়েছো
দেয়াল জুড়ে সাদা অন্ধকার।
প্রজ্ঞা
তৃণা চক্রবর্তী
শরীর সব জানত
অথচ তুমি শুধু মাথা খাটিয়ে গেছ অনর্থক
গোয়েন্দার মতো ভেবেছ নিজেকে
আর সমস্ত রহস্য থেকে গিয়েছে অজানা
শরীর সব জানে
কোনটা ঠিক, কোনটা সেভাবে ঠিক নয়
কোথায় অস্থিরতা, কোথায়বা স্থির হয়ে আছে শান্তি
কোথায় বিপদ, কোথায় বন্ধু
কোন দরজা বন্ধ, কোথায় খোলা আকাশ
শরীর সব জানত
আর তুমি মস্তিস্ক দিয়ে ভেবেছ সবকিছু
সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছ ঠাণ্ডা মাথায়
বুঝতে পারনি এই মাথার ভিতরে কত ফাঁদ
কত জটিল আবর্ত, কত চোরাগলি
তোমাকে বিভ্রান্ত করে দিতে পারে সারা জীবনের মতো
এক ভুল সিদ্ধান্তের পিছনে আর এক ভুল সিদ্ধান্ত এসে জুড়ে যেতে যেতে
একটা লম্বা ঘোরানো সিঁড়ি হয়ে যায় শেষে
আসলে শরীর এক প্রাচীন প্রজ্ঞা
সে সব কিছু বোঝে
আলোকিত প্রত্যুষের খোঁজে
মোঃ ইখতিয়ার উদ্দীন
শূন্যতায় ঢেকে আছে চারিদিক
তুমুল কোলাহল আর অজস্র জনারণ্যে
মানবের মানবিকতা বিবর্জিত সমাজে।
রাতের নিস্তব্ধতায় কোন
জোনাকির আলো নেই,
নেই রুপোলি চাঁদের মোহনীয় মায়া।
শুধুই আঁধারের কালো ছায়া।
কোন এক আলোকবর্তিকার মোহে
নিশাচর আমি জেগে থাকি
আলোকিত প্রতুষ্যের খোঁজে।
আমার পৃথিবী
পুলিন রায়
বৃক্ষচোখে চোখ রাখি
সবুজ ধার করে মাখি অঞ্জন
সকালের মায়াবী রোদে
ঘূর্ণন শুরু হলে বদলে যায়
আমার পৃথিবী
ফেলে যাওয়া দিন আর ফিরে না
গন্তব্য ভুলে গেলে
উতলা হয় ফেরারি মন
ঘুমঘোরে নয়--
অহল্যা সময় জানে
বেভুল পথের আসল মাজেজা...
আমার পৃথিবীর আঁকাবাকা কক্ষপথ
চিনি তো কেবল আমিই।
ছুতো
মাতিন মোসাব্বির
ওরা ভুলে যায়—
ওরা ভুলে যেতে পারে!
ওরা ব্যস্ততার ছুতোয় ভুলে যায়।
ওরা অভিযোগের পাশায় অভিযুক্ত করে চলে যায়।
ওরা পারে নতুন মুখে হাসতে,
ওরা পারে পুরনো ক্ষত ঢাকতে,
ওরা পারে সব মনে রেখে, না-থাকার ভান করতে!
আমি ভুলতে জানি না, তাই জেগে থাকি;
বুকের ভেতর পুষে রাখি ছাইচাপা আগুন
রাত গড়ালেই লিখি কষ্টের বুনন—
ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে।

আপনার মতামত লিখুন