সংবাদ

ছোটগল্প

একজন খুনির জবানবন্দী


সনোজ কুণ্ডু
সনোজ কুণ্ডু
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ এএম

একজন খুনির জবানবন্দী
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন


কুষ্টিয়া কারাগারের কয়েদীরা উল্লাসে মত্ত। শহরের কুখ্যাত ডাকাত সরদার বীরু আজ ভোরে কারাগারের ভেতর মারা গেছে। ঐ বদমাশটা কারাগারে বসেও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গেছে। বাইরে থাকা চ্যালাদের দিয়ে নিরীহ ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করত। তাকে বখরা না দিলে ক্ষোভে কয়েদীদের ওপর নির্যাতন চালাত। হাত-পা টেপাত। তিন দিন আগেও গলা খেঁকিয়ে বলেছে, কোনো খানকির পোলার সাধ্য নেই বীরুকে বেশিদিন জেলের মধ্যে আটকিয়ে রাখার।

অথচ আজকের এই দিনটা মারুফের জীবনে অশুভ দিন। বলা যায় সব হারানোর দিন। চার বছর আগে এই দিনেই তাকে মিথ্যে খুনের আসামী হয়ে কারাগারে আসতে হয়েছিল। জীবন থেকে হারিয়ে গেছে চারটি বসন্ত। বীরুর মৃত্যুতে আনন্দে কয়েদীরা আজ নাচ-গানের আসর বসিয়েছে। খাসির মাংসের বিরানির ব্যবস্থা হয়েছে। দু’চার বোতল বিলেতি মদ ছাড়া এখানকার অনুষ্ঠান জমে না। গাঁজাখোরদের অবশ্য মদে মন ভরে না। তাদেরটা ব্যবস্থা করা একেবারেই সহজ। তবে এসব নেশাগ্রস্ত জিনিস কীভাবে জেলখানার ভেতরে আসে তা নিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। তবে বিতর্ক না বাড়িয়ে বলা ভাল যে মদের বোতল কিংবা গাঁজার অদৃশ্য একজোড়া ডানা থাকে। উড়ে উড়ে এখানে আসে। 

মারুফ একটা জীর্ণ বালিশে মাথা রেখে কষ্টমাখা স্মৃতিগুলো মনে করে। সেই দীর্ঘশ্বাসের মুহূর্তে জেলখানার পুলিশ মারুফকে ডেকে নিয়ে আসে কারাগারের বিশ্রামাগারে। সেখানে একজন অচেনা লোক ধরে মারুফের অপেক্ষায় রয়েছে। লোকটি মধ্যবয়সী। মাঝারি গড়নের। মারুফের মুখোমুখি হতেই সে বেশ চনমনে হয়ে ওঠে। অনেক সমুদ্র পেরিয়ে লোকটি যেন সৈকতের সন্ধান খুঁজে পায়। মারুফ অচেনা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—

‘আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না তো!’

‘আমি জব্বার আলী। বলতে পার একজন খুনি। সেদিন জজ সাহেবকে আমিই খুন করেছি। এটাই সত্যি। ’

আকাশ জুড়ে যেন মেঘের সামিয়ানা টাঙানো। মাঝে মাঝে দিগন্ত কাঁপিয়ে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেছে আগেই। মোমবাতিটা দম ফুরাবার শেষ মুহূর্তে টিপ টিপ করে জ্বলছে। কুষ্টিয়া স্টেশন থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের হুইশেল। একজন খুনিকে দেখলে পরানের ভেতর যেমন ধপ করে ওঠার কথা, মারুফের বেলায় তার কিছুই হলো না। খুনের কথা স্বীকার করার পরও লোকটির চোখেমুখে রাজ্যের প্রশান্তি। তার কথাগুলো বারবার মারুফের হৃদয়ের ভেতর আন্দোলিত হতে থাকে। লোকটি যে খুনের বিষয়ে সত্যি বলছে তারই বা কী প্রমাণ আছে! নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে! মারুফ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে এক দৃষ্টিতে লোকটিকে দেখে। মনের ভেতর দ্বিধা-দ্বন্দ্বের প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। তবে সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় মারুফের উপলব্ধি হলো, লোকটি খুনি হয়েও এতটুকু অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছে না; বরং মারুফের জীবনটা নষ্ট হবার জন্য সে নিজেকে অপরাধী ভাবছে। চার বছর আগে জজ সাহেবের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি মারুফের চোখে ঝলমলিয়ে ওঠে।

তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। জজ সাহেব আদালত প্রাঙ্গণে ফুলের বাগানে পায়চারি করছেন। তার দেহরক্ষী কাছে ছিল না। কিছুটা দূরে কয়েকজন পুলিশ হাসি-তামাশায় মশগুল। সেই মুহূর্তে বিকট একটা চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসে। মারুফের চা খাওয়া তখনও শেষ হয়নি। উৎকীর্ণ হয়ে ঐ চিৎকারের উৎসস্থল অনুমান করার চেষ্টা করে। একপর্যায় দৌড়ে সে আদালতের গেটে ঢুকে পড়ে। ল্যাম্পপোস্টের নিচে জজ সাহেব মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। সমস্ত শরীর তার রক্তে ভেজা। মারুফ চিৎকার করে লোক জড়ো করার চেষ্টা করে। নিজেই জজ সাহেবের বুক থেকে রক্তমাখা ছুরিটা টেনে ওঠায়। কিছুক্ষণ নিস্পন্দের মতো দাঁড়িয়ে থেকে জজ সাহেবের প্রাণটা বেরিয়ে যেতে দেখে। ততক্ষণে পুলিশ ছুটে আসে। পাশের মহল্লার মানুষ জড়ো হয়। সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। পুলিশ মারুফকে খুনি সন্দেহে হাতে হ্যান্ডকাপ লাগায়। তখনও তার হাতের রক্তাক্ত ছুরি থেকে টপ টপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে। জামাটাও রক্তে জবুথবু। মারুফ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

রহিম ভাই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। মহল্লার মানুষের কাছে রহিম ভাই খুব পরিচিত। তার হাতে বানানো দুধ চা একবার যার ঠোঁট ছুঁয়েছে তাকে এই চায়ের কথা মনে রাখতে হবে। সে সবার সামনে পুলিশের উদ্দেশ্যে বলে,

‘একটু খাড়ান ভাই, আপনেরা কোনো ভুল করছেন না তো? এই ছেলেটি তো একটা নতুন ট্রলি আমার দোকানে রেখে চা খাচ্ছিল। হঠাৎ আমাদের কানে একটা চিৎকার ভেসে আসে। ছেলেটি দৌড়ে আদালতের ভেতর ঢুকে পড়ে।’ 

একজন বদমেজাজি পুলিশ রহিমের গলার গামছা ধরে হেঁচকা টান মেরে বলে,

‘ওরে চুদির ভাই, প্যাচ লাগাতি আইছো, খুনির হাতে এখনও ছুরিডা রইছে। চাইয়া দেখোন দি একবার।’

ওসির নির্দেশে রহিম ভাই ট্রলিটা নিয়ে আসে। মহল্লার মানুষ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের চোখের সামনেই যে রক্তাক্ত ছুরি হাতে খুনি দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে মোবাইলে ছবি ধারণ করতে ব্যস্ত। পুলিশের একজন এস.আই রুমাল দিয়ে মারুফের হাত থেকে ছুরিটা হাতে নেয়। আরও একটি পুলিশের গাড়ি আদালতের সামনে আসে। থানার ওসি মারুফকে প্রশ্নের বানে জর্জরিত করে। কথার ফাঁকে একজন কনস্টেবল পাখির চোখে ট্রলির মালপত্র ওলট পালট করতে থাকে। ট্রলিতে সব বিয়ের সরঞ্জাম। ব্যাকপার্ট চেইন খুলতেই রেরিয়ে আসে রক্তমাখা একটি বোরকা। সবার বিস্ফারিত চোখ আটকে যায় বোরকার দিকে। মারুফের চোখও ছানাবড়া। সে কিছুতেই ভেবে পায় না তার ট্রলিতে রক্তমাখা বোরকা এলো কী করে!

ওসি এবার বিক্ষিপ্ত স্বরে বলে—

‘স্ট্রেঞ্জ! বিয়ের আগেই খুন। নিশ্চয়ই বিয়ের সাথে খুনের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। ওকে নিয়ে চলো। যা বলার আদালতে গিয়ে বলবে।’

‘দেখুন স্যার, খুনের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। খোদা সাক্ষী। আমাকে আপনারা ছেড়ে দিন। কাল আমার বিয়ে। অসুস্থ মা আমার পথের দিকে তাকিয়ে আছেন।’ মারুফ কাতর কণ্ঠে কথাগুলো বলে।

‘এবার সত্যি কথাটা বলো জজ সাহেবকে খুন করার জন্য কত টাকা তুমি পেয়েছ?’ ওসি সাহেব বলেন।

‘খোদার কছম স্যার, আপনাদের ধারণা সব ভুল। খুনের সাথে আমি জড়িত নই। চায়ের কাপে চুমুক দেবার সময় চিৎকার শুনে আমি ছুটে আসি! এখন ভাবছি আমি ভুল করেছি! সব ক্ষেত্রে মানুষের বিপদে দাঁড়াতে নেই।’

‘শোন বাছাধন, তোমার খুনের পরিকল্পনাটা ভাল ছিল না। আসলে তুমি পেশাদার খুনি নও। ট্রলির ভেতর বোরকা রাখাটাও ছিল তোমার বড় ভুল।’

মারুফ এবার ওসি সাহেবের পায়ের উপর পড়ে—

‘খুনের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই স্যার। রহিম ভাই আমার বড় সাক্ষী।’

‘চুপ কর মাদারচোদ। যা বলার আদালতে বলবি।’ এস. আই ক্ষিপ্ত গলায় বলে। আরও একবার আকুতি করে মারুফ বলে—

‘ঠিক আছে স্যার, আপনাদের যখন আমাকেই খুনি বানাতে হবে, কী আর করার। তবে আমার মায়ের শেষ ইচ্ছেটা আমি পূরণ করতে চাই। অন্তত একটা দিন আমি আপনাদের কাছে ভিক্ষা চাইছি। কালকে আমার বিয়েটা হয়ে গেলে আমি নিজে থানায় এসে আত্মসমর্পণ করব। কথা দিলাম।’

‘এত কথা তো আমরা শুনব না। তুমি একজন খুনি এটাই তোমার পরিচয়। তোমার ফাঁসি হবে, নয়ত যাবজ্জীবন জেল। কিন্তু বিয়ে করে অন্য একটি মেয়ের জীবন ধ্বংস হতে আমরা দেব কেনো বলো?’ ওসি সাহেব কিছুটা ভারি গলায় বলেন।

রহিম ভাই ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে মারুফকে ছেড়ে দেবার অনুরোধ করে। একজন এস.আই বাজপাখির মতো ঠোঁট সরু করে বলে—

‘এই সালা, তুই খুনির পক্ষে সাফাই গেয়ে যাচ্ছি যে! তুই আবার খুনের সাথে জড়িত না তো!’

এবার মহল্লার মানুষ সম্মিলিত কণ্ঠে রহিম ভাইকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। তারা কৌশলে রহিমকে সাথে নিয়ে বাইরে চলে যায়।

মারুফ কান্না জড়িত গলায় কতভাবে পুলিশকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, সে খুনি নয়। কিন্তু মারুফের কোনো কথাই পুলিশ শুনল না। 

মারুফকে আদালতে তোলা হলো। আধাডজন পুলিশ যখন খুনের প্রত্যক্ষদর্শী তখন একজন রহিম ভাইয়ের বিচারপতির সামনে আহাজারি করা ছাড়া কিছুই করার থাকল না। অবশ্য রহিম ভাইয়ের যুক্তির কাছে থমকে যায় বিচারিক আদালত। বিচারকের কখনও কখনও নির্বাক কিংবা বাকরুদ্ধ হতে হয় যুক্তির কাছে। তথ্য-উপাত্তের কাছে। জজ আলতাফ লস্করকে খুন করার অপরাধে আদালত মারুফকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করে। অবশ্য কিছুদিনের ভেতর আসামী পক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করলে রায়টা ঘুরিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। 

মারুফের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ছেলের জীবনে এই নির্মম পরিণতি দেখে তার মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। দিনভর বগবগ করে বেড়ায়। পরিবারে মারুফই ছিল একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। আদালতে সাজা হবার পর সমাজসেবা অধিদপ্তরের চাকুরি থেকেও তাকে বরখাস্ত করা হয়। সেই থেকে কেটে গেছে চারটি বছর। নিয়তির কাছে পরাজিত হয়ে এভাবেই জেলের অন্ধকারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে মারুফ হোসেন। আজ এতদিন পর জব্বার আলীর কথা শুনে হৃদয়ে ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নের পাখিটা যেন নীলাকাশে ডানা ভাসাতে চাইছে।

‘আপনি কেনো জজ সাহেবকে খুন করলেন জানতে পারি কি?’ মারুফ জব্বার আলীকে প্রশ্ন করে।

‘প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার বাবা নিয়ামত আলী কুষ্টিয়া জুট মিলের শ্রমিক নেতা ছিলেন। একদিন সন্ধ্যারাতে মিলের মালিক খুন হয়। খুনের দায়টা চাপিয়ে দেয়া হয় বাবার ওপর। জজ আলতাফ লস্কর পাঁচ লক্ষ টাকা ঘুষ খেয়ে বাবাকে ফাঁসির আদেশ দেন। এই ষড়যন্ত্রমূলক রায়ের বিরুদ্ধে আমরাও আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু জেলের ভেতর হঠাৎ বাবার মৃত্যু হয়। বাবার এমন মৃত্যু আমি মেনে নিতে পারিনি। উন্মাদের মত জজ সাহেবকে সেদিন খুন করে লিবিয়া পালিয়ে যাই। পরিবারের সবাই জানে আমি বেঁচে নেই।’

মারুফ দ্বিধাজড়ানো গলায় বলে—

‘আপনার পরিবারকে সত্যিটা বলতে পারতেন!’

জব্বার আলী এবার চোখের জল ধরে রাখার চেষ্টা করেনি।

‘বাপরে আমি চাইনি আমার সন্তানেরা একজন খুনির সন্তান পরিচয়ে সমাজে বেড়ে উঠুক। আজ আমার বড় সন্তান মামুন পুলিশ অফিসার। দুটি মেয়ের বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে। তুমিই বলো বাবা, একটা খুনির ছেলেকে কে পুলিশের চাকুরি দিত। জেনে শুনে কারাই বা আমার খুনির মেয়েদের বিয়ে করতে আসত।’

মানুষটির প্রতি মারুফের দয়া হয়। চোখ মেলে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। লোকটি আবার বলতে শুরু করে—

‘আজ বলতে দ্বিধা নেই। শুধু আমার পরিবার নয়, বিদেশে গিয়ে তোমার বাবার বন্ধুর পরিচয়ে তোমার মাকেও টাকা পাঠাতাম। যে বিষয়টি তোমার কাছে গোপন রাখা হয়েছে। ঐ টাকাতে তোমার মায়ের চিকিৎসাসহ বোন রুনুর বিয়ে হয়েছে।’

একজন খুনি হয়েও জব্বার আলী যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে তা ইতিহাসে বিরল। জব্বার আলী তরতর করে শেষ কথাগুলো বলে চলে যায়—

‘তুমি ভেবে নিও, আজ থেকে তুমি মুক্ত। সব ব্যবস্থা আমার করা আছে। আমাকে এখনি থানায় যেতে হবে।’

জব্বার আলী সরাসরি থানায় যায়। জজসাহেবকে খুন করার পেছনে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। ওসি সাহেব জব্বার আলীকে নিজস্ব ক্ষমতায় গ্রেফতার করে। এজাহারের প্রেক্ষিতে নতুন করে এফ আই আর করা হয়। বিশেষ তদন্তপূর্বক সম্পূরক সার্জশিট দাখিল করে রায়কৃত মামলার নিষ্পত্তির নথি পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করে।

ধার্য তারিখে জব্বার আলীকে আদালতে তোলা হয়। জব্বার আলী শপথবাক্য পাঠ শেষে জজসাহেবকে নিজের হাতে খুন করার কথা স্বীকার করে জবানবন্দী দেয়। মারুফ এজলাশে দাঁড়িয়ে বিস্ময় চোখে জব্বার আলীকে দেখে। 

আদালত দীর্ঘ চার বছর মারুফকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে হাজতবাসের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। আদালত মারুফ হোসেনকে সম্মানের সাথে মুক্তি দেয়। চাকরিতে পুনর্বহাল করে যাবতীয় বকেয়া টাকা প্রদান করার নির্দেশ দেয়। তাছাড়া  ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আদালত দশ লক্ষ টাকা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। আদালত নিশ্চিত হয়ে যখন জব্বার আলীকে শাস্তি দিয়ে রায় ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তখনি মামলাটি আবার ভিন্নদিকে ধাবিত হয়।

থানার ওসি সাহেব বিচারকের অনুমতি নিয়ে এজলাশে উঠে দাঁড়ান। রহিম ভাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে আজ ভোর রাতেই মারা যায়। মৃত্যুর আগে সে ওসি সাহেবকে হাসপাতালে ডেকে জজসাহেব খুন হবার আরও চাঞ্চল্যকর সব গোপন তথ্য জানিয়ে যায়। ওসি সাহেব অত্যন্ত সুচতুরভাবে রহিম ভাইয়ের নিজ মুখে বলা জজসাহেবকে খুন করার জবানবন্দী মোবাইলে রেকর্ড করে রাখেন। যা এজলাশ কক্ষে সকলকে শোনানো হয়। 

‘শোনেন দারোগা সাহেব, যত খারাপ মানুষই হোক না কেনো মৃত্যুর আগে কেউ মিথ্যে বলতে চায় না। আমার মন বলছে, আমি আর বাঁচব না। সারাজীবন পাপ কাজ করেছি। মৃত্যুর আগে অন্তত একটা ভাল কাজ করে মরতে চাই। সেদিন জব্বার আলীর পরামর্শে দুই লক্ষ টাকার বিনিময়ে জজসাহেবকে খুনটা আমিই করেছিলাম। আমি একজন পেশাদার ভারাটে খুনি। চায়ের ব্যবসা ছিল আমার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার কৌশলমাত্র। আমার তিন পুরুষের শরীরে খুনির রক্ত প্রবাহিত। দুচারটে খুন না করে কেউ কবরে যায়নি। মন্ত্রীর ভাই লেবু মিয়াকেও আমি খুন করি। সবশেষে শহরের সিনিয়র সাংবাদিক মকবুলকেও খুন করতে বাধ্য হই। ঐ সালা আমার পিছে পই পই করে লেগেছিল। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিল। তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখাটা ভাল মনে করিনি।’

জব্বার আলীও নিরুপায় হয়ে জজসাহেব খুন হবার যাবতীয় ঘটনা স্বীকার করে। আদালত মৃত রহিম মিয়াকে ফাঁসির নির্দেশ দেয়। জব্বার আলীকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। মারুফ জব্বার আলীর দিকে এগিয়ে যায়। জব্বার আলী মারুফকে বুকে টেনে নিয়ে শব্দ করে কাঁদে। কিন্তু তার চোখ দিয়ে কোনো জল গড়িয়ে পড়ল না।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


একজন খুনির জবানবন্দী

প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image


কুষ্টিয়া কারাগারের কয়েদীরা উল্লাসে মত্ত। শহরের কুখ্যাত ডাকাত সরদার বীরু আজ ভোরে কারাগারের ভেতর মারা গেছে। ঐ বদমাশটা কারাগারে বসেও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গেছে। বাইরে থাকা চ্যালাদের দিয়ে নিরীহ ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করত। তাকে বখরা না দিলে ক্ষোভে কয়েদীদের ওপর নির্যাতন চালাত। হাত-পা টেপাত। তিন দিন আগেও গলা খেঁকিয়ে বলেছে, কোনো খানকির পোলার সাধ্য নেই বীরুকে বেশিদিন জেলের মধ্যে আটকিয়ে রাখার।

অথচ আজকের এই দিনটা মারুফের জীবনে অশুভ দিন। বলা যায় সব হারানোর দিন। চার বছর আগে এই দিনেই তাকে মিথ্যে খুনের আসামী হয়ে কারাগারে আসতে হয়েছিল। জীবন থেকে হারিয়ে গেছে চারটি বসন্ত। বীরুর মৃত্যুতে আনন্দে কয়েদীরা আজ নাচ-গানের আসর বসিয়েছে। খাসির মাংসের বিরানির ব্যবস্থা হয়েছে। দু’চার বোতল বিলেতি মদ ছাড়া এখানকার অনুষ্ঠান জমে না। গাঁজাখোরদের অবশ্য মদে মন ভরে না। তাদেরটা ব্যবস্থা করা একেবারেই সহজ। তবে এসব নেশাগ্রস্ত জিনিস কীভাবে জেলখানার ভেতরে আসে তা নিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। তবে বিতর্ক না বাড়িয়ে বলা ভাল যে মদের বোতল কিংবা গাঁজার অদৃশ্য একজোড়া ডানা থাকে। উড়ে উড়ে এখানে আসে। 

মারুফ একটা জীর্ণ বালিশে মাথা রেখে কষ্টমাখা স্মৃতিগুলো মনে করে। সেই দীর্ঘশ্বাসের মুহূর্তে জেলখানার পুলিশ মারুফকে ডেকে নিয়ে আসে কারাগারের বিশ্রামাগারে। সেখানে একজন অচেনা লোক ধরে মারুফের অপেক্ষায় রয়েছে। লোকটি মধ্যবয়সী। মাঝারি গড়নের। মারুফের মুখোমুখি হতেই সে বেশ চনমনে হয়ে ওঠে। অনেক সমুদ্র পেরিয়ে লোকটি যেন সৈকতের সন্ধান খুঁজে পায়। মারুফ অচেনা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—

‘আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না তো!’

‘আমি জব্বার আলী। বলতে পার একজন খুনি। সেদিন জজ সাহেবকে আমিই খুন করেছি। এটাই সত্যি। ’

আকাশ জুড়ে যেন মেঘের সামিয়ানা টাঙানো। মাঝে মাঝে দিগন্ত কাঁপিয়ে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেছে আগেই। মোমবাতিটা দম ফুরাবার শেষ মুহূর্তে টিপ টিপ করে জ্বলছে। কুষ্টিয়া স্টেশন থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের হুইশেল। একজন খুনিকে দেখলে পরানের ভেতর যেমন ধপ করে ওঠার কথা, মারুফের বেলায় তার কিছুই হলো না। খুনের কথা স্বীকার করার পরও লোকটির চোখেমুখে রাজ্যের প্রশান্তি। তার কথাগুলো বারবার মারুফের হৃদয়ের ভেতর আন্দোলিত হতে থাকে। লোকটি যে খুনের বিষয়ে সত্যি বলছে তারই বা কী প্রমাণ আছে! নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে! মারুফ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে এক দৃষ্টিতে লোকটিকে দেখে। মনের ভেতর দ্বিধা-দ্বন্দ্বের প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। তবে সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় মারুফের উপলব্ধি হলো, লোকটি খুনি হয়েও এতটুকু অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছে না; বরং মারুফের জীবনটা নষ্ট হবার জন্য সে নিজেকে অপরাধী ভাবছে। চার বছর আগে জজ সাহেবের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি মারুফের চোখে ঝলমলিয়ে ওঠে।

তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। জজ সাহেব আদালত প্রাঙ্গণে ফুলের বাগানে পায়চারি করছেন। তার দেহরক্ষী কাছে ছিল না। কিছুটা দূরে কয়েকজন পুলিশ হাসি-তামাশায় মশগুল। সেই মুহূর্তে বিকট একটা চিৎকারের আওয়াজ ভেসে আসে। মারুফের চা খাওয়া তখনও শেষ হয়নি। উৎকীর্ণ হয়ে ঐ চিৎকারের উৎসস্থল অনুমান করার চেষ্টা করে। একপর্যায় দৌড়ে সে আদালতের গেটে ঢুকে পড়ে। ল্যাম্পপোস্টের নিচে জজ সাহেব মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। সমস্ত শরীর তার রক্তে ভেজা। মারুফ চিৎকার করে লোক জড়ো করার চেষ্টা করে। নিজেই জজ সাহেবের বুক থেকে রক্তমাখা ছুরিটা টেনে ওঠায়। কিছুক্ষণ নিস্পন্দের মতো দাঁড়িয়ে থেকে জজ সাহেবের প্রাণটা বেরিয়ে যেতে দেখে। ততক্ষণে পুলিশ ছুটে আসে। পাশের মহল্লার মানুষ জড়ো হয়। সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। পুলিশ মারুফকে খুনি সন্দেহে হাতে হ্যান্ডকাপ লাগায়। তখনও তার হাতের রক্তাক্ত ছুরি থেকে টপ টপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে। জামাটাও রক্তে জবুথবু। মারুফ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

রহিম ভাই ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। মহল্লার মানুষের কাছে রহিম ভাই খুব পরিচিত। তার হাতে বানানো দুধ চা একবার যার ঠোঁট ছুঁয়েছে তাকে এই চায়ের কথা মনে রাখতে হবে। সে সবার সামনে পুলিশের উদ্দেশ্যে বলে,

‘একটু খাড়ান ভাই, আপনেরা কোনো ভুল করছেন না তো? এই ছেলেটি তো একটা নতুন ট্রলি আমার দোকানে রেখে চা খাচ্ছিল। হঠাৎ আমাদের কানে একটা চিৎকার ভেসে আসে। ছেলেটি দৌড়ে আদালতের ভেতর ঢুকে পড়ে।’ 

একজন বদমেজাজি পুলিশ রহিমের গলার গামছা ধরে হেঁচকা টান মেরে বলে,

‘ওরে চুদির ভাই, প্যাচ লাগাতি আইছো, খুনির হাতে এখনও ছুরিডা রইছে। চাইয়া দেখোন দি একবার।’

ওসির নির্দেশে রহিম ভাই ট্রলিটা নিয়ে আসে। মহল্লার মানুষ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের চোখের সামনেই যে রক্তাক্ত ছুরি হাতে খুনি দাঁড়িয়ে আছে। অনেকে মোবাইলে ছবি ধারণ করতে ব্যস্ত। পুলিশের একজন এস.আই রুমাল দিয়ে মারুফের হাত থেকে ছুরিটা হাতে নেয়। আরও একটি পুলিশের গাড়ি আদালতের সামনে আসে। থানার ওসি মারুফকে প্রশ্নের বানে জর্জরিত করে। কথার ফাঁকে একজন কনস্টেবল পাখির চোখে ট্রলির মালপত্র ওলট পালট করতে থাকে। ট্রলিতে সব বিয়ের সরঞ্জাম। ব্যাকপার্ট চেইন খুলতেই রেরিয়ে আসে রক্তমাখা একটি বোরকা। সবার বিস্ফারিত চোখ আটকে যায় বোরকার দিকে। মারুফের চোখও ছানাবড়া। সে কিছুতেই ভেবে পায় না তার ট্রলিতে রক্তমাখা বোরকা এলো কী করে!

ওসি এবার বিক্ষিপ্ত স্বরে বলে—

‘স্ট্রেঞ্জ! বিয়ের আগেই খুন। নিশ্চয়ই বিয়ের সাথে খুনের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। ওকে নিয়ে চলো। যা বলার আদালতে গিয়ে বলবে।’

‘দেখুন স্যার, খুনের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। খোদা সাক্ষী। আমাকে আপনারা ছেড়ে দিন। কাল আমার বিয়ে। অসুস্থ মা আমার পথের দিকে তাকিয়ে আছেন।’ মারুফ কাতর কণ্ঠে কথাগুলো বলে।

‘এবার সত্যি কথাটা বলো জজ সাহেবকে খুন করার জন্য কত টাকা তুমি পেয়েছ?’ ওসি সাহেব বলেন।

‘খোদার কছম স্যার, আপনাদের ধারণা সব ভুল। খুনের সাথে আমি জড়িত নই। চায়ের কাপে চুমুক দেবার সময় চিৎকার শুনে আমি ছুটে আসি! এখন ভাবছি আমি ভুল করেছি! সব ক্ষেত্রে মানুষের বিপদে দাঁড়াতে নেই।’

‘শোন বাছাধন, তোমার খুনের পরিকল্পনাটা ভাল ছিল না। আসলে তুমি পেশাদার খুনি নও। ট্রলির ভেতর বোরকা রাখাটাও ছিল তোমার বড় ভুল।’

মারুফ এবার ওসি সাহেবের পায়ের উপর পড়ে—

‘খুনের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই স্যার। রহিম ভাই আমার বড় সাক্ষী।’

‘চুপ কর মাদারচোদ। যা বলার আদালতে বলবি।’ এস. আই ক্ষিপ্ত গলায় বলে। আরও একবার আকুতি করে মারুফ বলে—

‘ঠিক আছে স্যার, আপনাদের যখন আমাকেই খুনি বানাতে হবে, কী আর করার। তবে আমার মায়ের শেষ ইচ্ছেটা আমি পূরণ করতে চাই। অন্তত একটা দিন আমি আপনাদের কাছে ভিক্ষা চাইছি। কালকে আমার বিয়েটা হয়ে গেলে আমি নিজে থানায় এসে আত্মসমর্পণ করব। কথা দিলাম।’

‘এত কথা তো আমরা শুনব না। তুমি একজন খুনি এটাই তোমার পরিচয়। তোমার ফাঁসি হবে, নয়ত যাবজ্জীবন জেল। কিন্তু বিয়ে করে অন্য একটি মেয়ের জীবন ধ্বংস হতে আমরা দেব কেনো বলো?’ ওসি সাহেব কিছুটা ভারি গলায় বলেন।

রহিম ভাই ওসি সাহেবের দিকে তাকিয়ে মারুফকে ছেড়ে দেবার অনুরোধ করে। একজন এস.আই বাজপাখির মতো ঠোঁট সরু করে বলে—

‘এই সালা, তুই খুনির পক্ষে সাফাই গেয়ে যাচ্ছি যে! তুই আবার খুনের সাথে জড়িত না তো!’

এবার মহল্লার মানুষ সম্মিলিত কণ্ঠে রহিম ভাইকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। তারা কৌশলে রহিমকে সাথে নিয়ে বাইরে চলে যায়।

মারুফ কান্না জড়িত গলায় কতভাবে পুলিশকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, সে খুনি নয়। কিন্তু মারুফের কোনো কথাই পুলিশ শুনল না। 

মারুফকে আদালতে তোলা হলো। আধাডজন পুলিশ যখন খুনের প্রত্যক্ষদর্শী তখন একজন রহিম ভাইয়ের বিচারপতির সামনে আহাজারি করা ছাড়া কিছুই করার থাকল না। অবশ্য রহিম ভাইয়ের যুক্তির কাছে থমকে যায় বিচারিক আদালত। বিচারকের কখনও কখনও নির্বাক কিংবা বাকরুদ্ধ হতে হয় যুক্তির কাছে। তথ্য-উপাত্তের কাছে। জজ আলতাফ লস্করকে খুন করার অপরাধে আদালত মারুফকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করে। অবশ্য কিছুদিনের ভেতর আসামী পক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করলে রায়টা ঘুরিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। 

মারুফের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ছেলের জীবনে এই নির্মম পরিণতি দেখে তার মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। দিনভর বগবগ করে বেড়ায়। পরিবারে মারুফই ছিল একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি। আদালতে সাজা হবার পর সমাজসেবা অধিদপ্তরের চাকুরি থেকেও তাকে বরখাস্ত করা হয়। সেই থেকে কেটে গেছে চারটি বছর। নিয়তির কাছে পরাজিত হয়ে এভাবেই জেলের অন্ধকারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে মারুফ হোসেন। আজ এতদিন পর জব্বার আলীর কথা শুনে হৃদয়ে ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নের পাখিটা যেন নীলাকাশে ডানা ভাসাতে চাইছে।

‘আপনি কেনো জজ সাহেবকে খুন করলেন জানতে পারি কি?’ মারুফ জব্বার আলীকে প্রশ্ন করে।

‘প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার বাবা নিয়ামত আলী কুষ্টিয়া জুট মিলের শ্রমিক নেতা ছিলেন। একদিন সন্ধ্যারাতে মিলের মালিক খুন হয়। খুনের দায়টা চাপিয়ে দেয়া হয় বাবার ওপর। জজ আলতাফ লস্কর পাঁচ লক্ষ টাকা ঘুষ খেয়ে বাবাকে ফাঁসির আদেশ দেন। এই ষড়যন্ত্রমূলক রায়ের বিরুদ্ধে আমরাও আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু জেলের ভেতর হঠাৎ বাবার মৃত্যু হয়। বাবার এমন মৃত্যু আমি মেনে নিতে পারিনি। উন্মাদের মত জজ সাহেবকে সেদিন খুন করে লিবিয়া পালিয়ে যাই। পরিবারের সবাই জানে আমি বেঁচে নেই।’

মারুফ দ্বিধাজড়ানো গলায় বলে—

‘আপনার পরিবারকে সত্যিটা বলতে পারতেন!’

জব্বার আলী এবার চোখের জল ধরে রাখার চেষ্টা করেনি।

‘বাপরে আমি চাইনি আমার সন্তানেরা একজন খুনির সন্তান পরিচয়ে সমাজে বেড়ে উঠুক। আজ আমার বড় সন্তান মামুন পুলিশ অফিসার। দুটি মেয়ের বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে। তুমিই বলো বাবা, একটা খুনির ছেলেকে কে পুলিশের চাকুরি দিত। জেনে শুনে কারাই বা আমার খুনির মেয়েদের বিয়ে করতে আসত।’

মানুষটির প্রতি মারুফের দয়া হয়। চোখ মেলে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। লোকটি আবার বলতে শুরু করে—

‘আজ বলতে দ্বিধা নেই। শুধু আমার পরিবার নয়, বিদেশে গিয়ে তোমার বাবার বন্ধুর পরিচয়ে তোমার মাকেও টাকা পাঠাতাম। যে বিষয়টি তোমার কাছে গোপন রাখা হয়েছে। ঐ টাকাতে তোমার মায়ের চিকিৎসাসহ বোন রুনুর বিয়ে হয়েছে।’

একজন খুনি হয়েও জব্বার আলী যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে তা ইতিহাসে বিরল। জব্বার আলী তরতর করে শেষ কথাগুলো বলে চলে যায়—

‘তুমি ভেবে নিও, আজ থেকে তুমি মুক্ত। সব ব্যবস্থা আমার করা আছে। আমাকে এখনি থানায় যেতে হবে।’

জব্বার আলী সরাসরি থানায় যায়। জজসাহেবকে খুন করার পেছনে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। ওসি সাহেব জব্বার আলীকে নিজস্ব ক্ষমতায় গ্রেফতার করে। এজাহারের প্রেক্ষিতে নতুন করে এফ আই আর করা হয়। বিশেষ তদন্তপূর্বক সম্পূরক সার্জশিট দাখিল করে রায়কৃত মামলার নিষ্পত্তির নথি পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করে।

ধার্য তারিখে জব্বার আলীকে আদালতে তোলা হয়। জব্বার আলী শপথবাক্য পাঠ শেষে জজসাহেবকে নিজের হাতে খুন করার কথা স্বীকার করে জবানবন্দী দেয়। মারুফ এজলাশে দাঁড়িয়ে বিস্ময় চোখে জব্বার আলীকে দেখে। 

আদালত দীর্ঘ চার বছর মারুফকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে হাজতবাসের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। আদালত মারুফ হোসেনকে সম্মানের সাথে মুক্তি দেয়। চাকরিতে পুনর্বহাল করে যাবতীয় বকেয়া টাকা প্রদান করার নির্দেশ দেয়। তাছাড়া  ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আদালত দশ লক্ষ টাকা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। আদালত নিশ্চিত হয়ে যখন জব্বার আলীকে শাস্তি দিয়ে রায় ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তখনি মামলাটি আবার ভিন্নদিকে ধাবিত হয়।

থানার ওসি সাহেব বিচারকের অনুমতি নিয়ে এজলাশে উঠে দাঁড়ান। রহিম ভাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে আজ ভোর রাতেই মারা যায়। মৃত্যুর আগে সে ওসি সাহেবকে হাসপাতালে ডেকে জজসাহেব খুন হবার আরও চাঞ্চল্যকর সব গোপন তথ্য জানিয়ে যায়। ওসি সাহেব অত্যন্ত সুচতুরভাবে রহিম ভাইয়ের নিজ মুখে বলা জজসাহেবকে খুন করার জবানবন্দী মোবাইলে রেকর্ড করে রাখেন। যা এজলাশ কক্ষে সকলকে শোনানো হয়। 

‘শোনেন দারোগা সাহেব, যত খারাপ মানুষই হোক না কেনো মৃত্যুর আগে কেউ মিথ্যে বলতে চায় না। আমার মন বলছে, আমি আর বাঁচব না। সারাজীবন পাপ কাজ করেছি। মৃত্যুর আগে অন্তত একটা ভাল কাজ করে মরতে চাই। সেদিন জব্বার আলীর পরামর্শে দুই লক্ষ টাকার বিনিময়ে জজসাহেবকে খুনটা আমিই করেছিলাম। আমি একজন পেশাদার ভারাটে খুনি। চায়ের ব্যবসা ছিল আমার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার কৌশলমাত্র। আমার তিন পুরুষের শরীরে খুনির রক্ত প্রবাহিত। দুচারটে খুন না করে কেউ কবরে যায়নি। মন্ত্রীর ভাই লেবু মিয়াকেও আমি খুন করি। সবশেষে শহরের সিনিয়র সাংবাদিক মকবুলকেও খুন করতে বাধ্য হই। ঐ সালা আমার পিছে পই পই করে লেগেছিল। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিল। তাই তাকে বাঁচিয়ে রাখাটা ভাল মনে করিনি।’

জব্বার আলীও নিরুপায় হয়ে জজসাহেব খুন হবার যাবতীয় ঘটনা স্বীকার করে। আদালত মৃত রহিম মিয়াকে ফাঁসির নির্দেশ দেয়। জব্বার আলীকেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। মারুফ জব্বার আলীর দিকে এগিয়ে যায়। জব্বার আলী মারুফকে বুকে টেনে নিয়ে শব্দ করে কাঁদে। কিন্তু তার চোখ দিয়ে কোনো জল গড়িয়ে পড়ল না।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত