কেতকী কুশারী ডাইসনকে প্রথম পড়ার সময় তাঁর নামের চেয়েও বেশি টেনেছিল তাঁর জীবন ও লেখার অবস্থান। বাংলা সাহিত্যের একজন লেখক, অথচ তাঁর বসবাস ইংল্যান্ডে; চারপাশে অক্সফোর্ডের জীবন, ব্রিটিশ সমাজ আর অভিবাসী মানুষের সংসার। সেই দূরের জীবন তিনি বাংলায় লিখছেন এমন স্বাভাবিকভাবে, যেন বাংলা তাঁর সঙ্গে কলকাতা থেকে বিমানে চড়ে ইংল্যান্ডে চলে গেছে। পরে তাঁর রবীন্দ্রচর্চা, অনুবাদ, কবিতা, প্রবন্ধ পড়ে বুঝেছি, কেতকীর কাছে মাতৃভাষা জন্মস্থানে ফেলে আসা কোনো স্মৃতিচিহ্ন ছিল না। বাংলা ছিল তাঁর প্রতিদিনের বসবাসের জায়গা। ইংরেজিও তাঁর নিজের। দুই ভাষার মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো একটিকে বেছে নেননি; দীর্ঘ সাহিত্যজীবন ধরে দুই দিকেই যাতায়াত করেছেন।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডে ৮৬ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসানের সংবাদ আমাদের সামনে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনের এক বিস্তৃত পরিসর খুলে দেয়। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গবেষণা ও অনুবাদে ছড়িয়ে থাকা তাঁর কাজকে নতুন করে পাঠ করার উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। ৩১ আগস্ট হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি ঘটে। তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে আবার সামনে এসেছে এমন এক সাহিত্যিক জীবন, যেখানে বাংলা কবিতা থেকে অক্সফোর্ডের গবেষণা, রবীন্দ্রনাথ থেকে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, বুদ্ধদেব বসু থেকে অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতা, অভিবাসী বাঙালির ঘরসংসার থেকে নারীর আত্মপরিচয় সবই একই লেখকের কর্মপরিসরে জায়গা পেয়েছে।
দুই ভাষার মধ্যে একটি জীবন: কেতকীর সাহিত্যিক পরিচয় ধরতে গেলে প্রথমেই তাঁর দ্বিভাষিক সত্তার কাছে যেতে হয়। বাংলা ও ইংরেজিতে মৌলিক কবিতা লিখেছেন তিনি। গবেষণা করেছেন ইংরেজিতে, প্রবন্ধ লিখেছেন দুই ভাষায়, অনুবাদ করেছেন বাংলা থেকে ইংরেজিতে, ইংরেজি থেকে বাংলায়। কথাসাহিত্য ও নাটকের জন্য প্রধানত বাংলাকেই বেছে নিয়েছেন। নিজের লেখক পরিচয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেতকী বলেছিলেন, তাঁর কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য বিচিত্র সাহিত্যরূপে বিচরণ, দ্বিসাংস্কৃতিক জীবন এবং দ্বিভাষিকতা। তিনি নিজেকে বাংলা ডায়াস্পোরার লেখক হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের পূর্ণ ছবি পেতে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, গবেষণা, অনুবাদ সব কিছুকে একসঙ্গে পড়তে হবে। ইংল্যান্ডে তাঁর কথাসাহিত্যের ঘটনাস্থল তৈরি হলেও সেই জীবনকে দেখার চোখটি বাংলা সমাজ ও সংস্কৃতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তৈরি।
এই অবস্থান তাঁর সাহিত্যকে বিশেষ এক চরিত্র দিয়েছে। অভিবাসনের পর অনেক লেখকের মাতৃভাষার সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ ধীরে ধীরে কমে আসে। কেতকীর ক্ষেত্রে ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা। ষাটের দশক থেকেই তিনি কলকাতার সাহিত্যপত্রে নিয়মিত লিখেছেন। ১৯৬১ সাল থেকে ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সেখানে বিদেশি বই নিয়ে তাঁর নিজস্ব পর্যালোচনা বিভাগও ছিল। ১৯৫৮-৫৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সম্পাদনার কাজ শুরু করেছিলেন। ইংল্যান্ডে স্থায়ী জীবনের মধ্যেও কলকাতার সাময়িকপত্র, ছোটকাগজ ও সাহিত্যিক মহলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দীর্ঘকাল সচল ছিল। তাই তাঁর প্রবাস কোনো বিচ্ছেদরেখা হয়ে ওঠেনি। দূরত্ব তাঁর লেখায় নতুন এক দৃষ্টিকোণ তৈরি করেছে। কাছে থেকে যা অনেক সময় চোখে পড়ে না, দূরত্বে তার রেখাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কেতকী কুশারীর জন্ম ১৯৪০ সালের ২৬ জুন। তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে কলকাতার উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন, পরে উচ্চশিক্ষার পথ তাঁকে নিয়ে যায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৪ সালে রবার্ট ডাইসনকে বিয়ের পর ইংল্যান্ডেই তাঁর দীর্ঘ বসবাস শুরু। অক্সফোর্ডে তাঁর পিএইচডির বিষয় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে ১৭৬৫ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ নারী-পুরুষের জার্নাল ও স্মৃতিকথা। বিষয়টির দিকে তাকালে কেতকীর পরবর্তী সাহিত্যিক আগ্রহের একটি রেখা ধরা যায়। তিনি বৃহৎ রাজনৈতিক ঘটনাকে শুধু তারিখ ও প্রশাসনিক দলিলের ভেতর দিয়ে পড়েননি। ব্যক্তিগত জার্নাল, স্মৃতি, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিমানুষের চোখে অপর সমাজকে দেখার ধরন তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। এই প্রবণতা পরে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে তাঁর কাজে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি, সম্পর্ক, স্মৃতি, সংস্কৃতির পারস্পরিক যোগাযোগ তাঁর গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’: প্রবাসের ঘরের ভেতর: কেতকীর কথাসাহিত্যের প্রসঙ্গ উঠলেই ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’র কথা আসে। ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৮১-৮২ সালে ধারাবাহিক প্রকাশের পর ১৯৮৩ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটির গুরুত্ব শুধু বিদেশে বসবাসরত বাঙালির জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে বলে নয়। কেতকী প্রবাসকে পর্যটকের চোখে দেখেননি। বিদেশ তাঁর কাছে বিমানবন্দর, বরফ, পরিচ্ছন্ন রাস্তা আর বিস্ময়ের দৃশ্য নয়। সেখানে রান্নাঘর আছে, বিবাহ আছে, যৌনতা আছে, দাম্পত্যের ক্লান্তি আছে, সন্তান আছে, চাকরি আছে, একাকিত্ব আছে, সাংস্কৃতিক অস্বস্তি আছে। এই ঘরোয়া পরিসর বাংলা কথাসাহিত্যে প্রবাসের একটি নতুন মানচিত্র তৈরি করেছিল। অভিবাসী মানুষ একই সঙ্গে একাধিক সামাজিক সময়ের মধ্যে বাস করেন। ঘরের ভেতর কলকাতা, ঢাকা, সিলেট, পারিবারিক স্মৃতি; ঘরের বাইরে ব্রিটিশ কর্মক্ষেত্র, প্রতিবেশী, বিদ্যালয়, সামাজিক আচার। সন্তান আর মা-বাবার সাংস্কৃতিক সময়ও এক থাকে না। ফলে পরিচয় স্থির কোনো বস্তু হয়ে থাকতে পারে না।
কেতকীর সাহিত্য এই চলমান নির্মাণের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী। তাঁর একটি প্রবন্ধ গ্রন্থের নামই ‘চলন্ত নির্মাণ’। নামটির মধ্যে তাঁর চিন্তার একটি সূত্র পাওয়া যায়: মানুষ নিজেকে ক্রমাগত তৈরি করে।
নারী, অভিবাসন এবং নিজের কণ্ঠ: কেতকীর লেখায় নারী কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার দূরবর্তী চরিত্র নন। সংসার, মাতৃত্ব, পেশা, যৌনতা, শিক্ষা, সৃজনশীল কাজ, সামাজিক প্রত্যাশা, প্রতিষ্ঠানগত বৈষম্য সব মিলিয়ে নারীর জীবন তাঁর লেখায় বহুস্তরীয়। নিজের স্মৃতিচারণেও তিনি ব্রিটিশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন নারী, একজন দক্ষিণ এশীয়, একজন দ্বিভাষিক লেখক হিসেবে নানা অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। অক্সফোর্ডের সেন্ট হিল্ডাস কলেজে পোস্ট ডক্টরাল সুযোগের ক্ষেত্রে যে বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, বহু বছর পরে সেটিও অকপটে লিখেছেন। একই স্মৃতিচারণে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলা ভাষায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অনেক সময় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। এই অভিজ্ঞতা তাঁর দ্বিভাষিকতার রাজনৈতিক দিকটি বুঝতেও সাহায্য করে। ইংরেজিতে লিখলে আন্তর্জাতিক পাঠকের সামনে যাওয়ার সুযোগ বাড়ে, বাংলা লিখলে সেই পথ অনেক সংকীর্ণ। অথচ কেতকী বাংলা ছাড়েননি।
২০১৬ সালে কলকাতা লিটারারি মিটে তিনি আঞ্চলিক ভাষার ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ইংরেজির আন্তর্জাতিক ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন, একই সঙ্গে মাতৃভাষার গভীর দক্ষতার প্রয়োজনও বারবার বলেছেন। তাঁর নিজের জীবন ছিল সেই কথার বাস্তব অনুশীলন।
রবীন্দ্রনাথ, ওকাম্পো এবং এক অসমাপ্ত কথোপকথন: কেতকীর সাহিত্য জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আর্জেন্টাইন লেখক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা। ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ গ্রন্থে গবেষণা, অনুবাদ ও সৃজনশীল গদ্যকে তিনি পাশাপাশি এনেছিলেন। ১৯৮৬ সালে বইটির জন্য তিনি প্রফুল্লকুমার সরকার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার পান। পরে ইংরেজিতে ‘ইন ইয়োর ব্লসমিং ফ্লাওয়ার গার্ডেন’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ-ওকাম্পো সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গবেষণা আরও বিস্তৃত আকার পায়।
এখানে কেতকীর কাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। গবেষণা আর সাহিত্যকে তিনি কঠোর দেয়াল তুলে আলাদা রাখতে চাননি। আর্কাইভ তাঁর কাছে মৃত কাগজের স্তূপ ছিল না। চিঠির মধ্যে তিনি মানুষ খুঁজেছেন, অনুবাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব মেপেছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে দুই ভিন্ন সমাজের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত পড়েছেন।
ওকাম্পোকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি স্প্যানিশও শিখেছিলেন। একটি সাহিত্যিক সম্পর্ক বুঝতে আরেকটি ভাষার কাছে যাওয়া তাঁর কাছে অতিরিক্ত পরিশ্রম ছিল না; কাজটির স্বাভাবিক অংশ ছিল। এই জায়গায় তাঁর গবেষকসত্তা আজও বিশেষ মনোযোগের যোগ্য। আমরা প্রায়ই রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বিদেশি ব্যক্তিদের পড়ি। কেতকী ওকাম্পোকে শুধু রবীন্দ্রনাথের জীবনের পার্শ্বচরিত্র করে রাখেননি। ওকাম্পোর নিজস্ব জীবন, মনন, সাহিত্যিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে পড়েছেন। ফলে সম্পর্কটি একমুখী থাকে না। শান্তিনিকেতন থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত দুটি স্বাধীন মানুষের কথোপকথন হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রচর্চায় কেতকীর আরেকটি ব্যতিক্রমী কাজ ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’। সুশোভন অধিকারী, এড্রিয়ান হিল ও রবার্ট ডাইসনের সহযোগিতায় রবীন্দ্রনাথের রঙ দেখার বিশেষ শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য এবং তাঁর সাহিত্য ও চিত্রকলায় রঙের ব্যবহারের সম্পর্ক নিয়ে কাজটি তৈরি হয়। গ্রন্থটি ১৯৯৭ সালে আনন্দ পুরস্কার পায়। সাহিত্য গবেষণায় এমন কাজ সহজে দেখা যায় না। এখানে সাহিত্য, চিত্রকলা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং দৃষ্টিবিজ্ঞানের তথ্য পাশাপাশি এসেছে। রবীন্দ্রনাথকে কেবল সাহিত্য বিভাগের সম্পত্তি হিসেবে না দেখে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে এক টেবিলে বসিয়েছিলেন গবেষকেরা। রবার্ট ডাইসনের প্রসঙ্গও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র রবার্ট কেতকীর সৃজনশীল ও গবেষণামূলক জীবনের বহু কাজে যুক্ত ছিলেন। দাম্পত্য এখানে শুধু ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে থাকেনি, বৌদ্ধিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব: উত্তরাধিকার এবং স্বাধীনতা: নিজের কবিজীবনে রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবের কথা কেতকী একাধিকবার বলেছেন। শিশুকালেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাঠজগতে প্রবেশ করেন। পরে বুদ্ধদেব বসুও তাঁর কবিতাবোধে গভীর প্রভাব ফেলেন। তবে প্রভাব গ্রহণ মানে অনুকরণ নয়। কেতকীর জীবন পরিস্থিতি তাঁকে এমন সব অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা তাঁর পূর্বসূরিদের জগতে একইভাবে উপস্থিত ছিল না। অভিবাসী নারী, দ্বিভাষিক লেখক, আন্তঃসাংস্কৃতিক দাম্পত্য, ইংল্যান্ডে বসে বাংলায় সাহিত্যচর্চা, মাতৃভাষা থেকে শারীরিক দূরত্ব, সন্তানদের নতুন সামাজিক পরিবেশ— এসব তাঁর কবিতায় স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার তৈরি করেছে।
বাংলায় তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার বইয়ের মধ্যে ‘বল্কল’, ‘সবীজ পৃথিবী’, ‘জলের করিডোর ধরে’, ‘কথা বলতে দাও’, ‘জাদুকর প্রেম, জাদুকর মৃত্যু’, ‘দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে’ রয়েছে। ইংরেজিতে স্যাপউড, ‘হাইবিসকাস ইন দ্য নর্থ’, ‘স্পেসেস আই ইনহ্যাবিট’, ‘মেমোরিজ অব আর্জেন্টিনা অ্যান্ড আদার পোয়েমস’, ‘ইন দ্যাট সেন্স ইউ টাচ্ড ইট’ তাঁর কবিতার বিস্তার বোঝায়। ‘স্পেসেস আই ইনহ্যাবিট’ নামটিই যেন তাঁর কবিজীবনের একটি চাবি। তিনি একটি মাত্র জায়গায় বাস করেননি। তাঁর বসবাস ছিল বহু পরিসরে, বহু স্মৃতিতে, দুই ভাষায়।
অনুবাদ: দুই তীরের মধ্যে যাতায়াত: কেতকীর অনুবাদক পরিচয়কে তাঁর মৌলিক সাহিত্যকর্ম থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম। অনুবাদ তাঁর কাছে ছিল লেখক জীবনেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। তাঁর অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত কবিতা ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ‘আই ওউন্ট লেট ইউ গো’ নামে। ১৯৯১ সালে ব্লাডঅ্যাক্স বুকস থেকে প্রকাশিত বইটি পোয়েট্রি বুক সোসাইটির ‘রেকমেন্ডেড ট্রান্সলেশন’ হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর অনুবাদে বুদ্ধদেব বসুর নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি সংকলন। অনুবাদের এই যাত্রা শুধু বাংলা থেকে ইংরেজিতে সীমিত ছিল না; অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতাও তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন।
অনুবাদ নিয়ে তাঁর চিন্তার একটি বিশেষ দিক ছিল সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি। অন্য সংস্কৃতির লেখা বুঝতে পাঠককে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। ভূমিকা, টীকা, শব্দার্থ তাঁর কাছে অনুবাদের বাইরের বোঝা ছিল না। একটি কবিতা অন্য ভাষায় পৌঁছালে তার সঙ্গে যতটা সম্ভব সাংস্কৃতিক স্মৃতিও পৌঁছাক, তিনি তা চাইতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের দ্রুত অনুবাদের সময়ে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। শুধু শব্দের বদল ঘটালেই এক ভাষার সাহিত্য আরেক ভাষায় পৌঁছে যায় না। একটি শব্দের সঙ্গে খাদ্য, ঋতু, পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্মীয় অভ্যাস, সামাজিক শ্রেণি, লোকস্মৃতি জড়িয়ে থাকতে পারে। অনুবাদককে তাই শব্দের পেছনের জীবনও চিনতে হয়। কেতকী সেই শ্রম করতেন
বহুভাষিকতার পক্ষে এক জীবন: কেতকীর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে মনোযোগ টানে। ২০১৬ সালের কলকাতা লিটারারি মিটে তিনি বলেছিলেন, যত ভাষা জানা যায়, সাহিত্যিক ‘খেলা’ তত জমে। তাঁর জীবনে কথাটি নিছক বাগ্চাতুর্য ছিল না। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি সংস্কৃতের প্রতি আগ্রহ ছিল, জার্মান ও স্প্যানিশের কাছেও গেছেন প্রয়োজনমতো। বর্তমান পৃথিবীতে ইংরেজির বিপুল ক্ষমতার মধ্যে কেতকীর সাহিত্যজীবন অন্য একটি পথের কথা সামনে আনে। আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য ইংরেজি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার বিনিময়ে বাংলাকে ছেড়ে দেননি।
এক ভাষায় সাফল্য অর্জনের জন্য আরেক ভাষাকে বিসর্জন দেওয়ার সমীকরণ তিনি মানেননি। তাঁর সাহিত্য তাই বাংলাদেশের পাঠকের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে। তাঁর নিজের পরিচয় বয়ানে তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মূল ধারার পাঠকের পাশাপাশি বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বাংলাভাষী প্রবাসী সমাজেও তাঁর পাঠক রয়েছে। বাংলা ভাষার সাহিত্য যে রাষ্ট্রসীমার মধ্যে আটকে নেই, তাঁর জীবন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কলকাতায় জন্ম নেওয়া একজন লেখক অক্সফোর্ডে বসে বাংলায় উপন্যাস লিখছেন; ঢাকা ও কলকাতায় তাঁর পাঠক পড়ছেন; আর্জেন্টিনায় গিয়ে ওকাম্পোর সূত্র অনুসন্ধান করছেন; রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজিতে নিয়ে যাচ্ছেন; বুদ্ধদেব বসুর ইংরেজি অনুবাদ পরে ফিনিশ ভাষায় নতুন যাত্রা শুরু করছে। একটি লেখা কত দূর যেতে পারে, কেতকীর কর্মজীবনে তার চমৎকার সব নজির ছড়িয়ে আছে।
তাঁর কাজের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক সাহিত্যরূপের সীমানা নিয়ে স্বাধীনতা। ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ গবেষণা ও উপন্যাসের উপাদান পাশাপাশি চলে। তাঁর নিজের ভাষায়, সৃজনশীল লেখা ও গবেষণার মাঝের বাধা ভাঙা ছিল তাঁর দীর্ঘমেয়াদি সাহিত্যিক লক্ষ্য। এখানেই কেতকীকে কেবল ‘প্রবাসী লেখক’ পরিচয়ে আটকে রাখা কঠিন। তিনি সাহিত্যরূপ নিয়েও পরীক্ষা করেছেন। কবিতা তাঁকে যা করতে দিয়েছে, গবেষণা অন্য কাজ দিয়েছে। উপন্যাসে তিনি যে সামাজিক বিস্তার পেয়েছেন, প্রবন্ধে পেয়েছেন সরাসরি চিন্তার জায়গা। নাটকে মানুষকে কণ্ঠ দিয়েছেন। অনুবাদে নিজের কণ্ঠ কিছুটা সরিয়ে রেখে অন্য কবির জন্য জায়গা তৈরি করেছেন। একজন লেখকের ভেতরে এতগুলো কাজ পরস্পরের সঙ্গে কথোপকথনে ছিল।
কেতকী কুশারী ডাইসন ১৯৮৬ ও ১৯৯৭ সালে দুবার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ভুবনমোহিনী দাসী পদক দেয়। ২০০৯ সালে বাংলা সাহিত্যে ‘বেস্ট বেঙ্গলি অব দ্য ইয়ার’ সম্মান, ২০১৬ সালে বুদ্ধদেব বসু স্মারক পুরস্কার, ২০২৩ সালে বিদ্যাসাগর দীনময়ী পুরস্কার ও ভাষানগর আজীবন সম্মান পেয়েছেন। পুরস্কারের তালিকা একজন লেখকের কাজের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির গভীরতা ও ব্যাপ্তি পুরোপুরি ধরতে পারে না। কেতকীর বড় অর্জন সম্ভবত অন্য জায়গায়। তিনি নিজের জীবন দিয়ে একটি সাহিত্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন: মানুষ একই সঙ্গে একাধিক সংস্কৃতির ভেতরে বাস করেও নিজের মাতৃভাষায় গভীরভাবে সক্রিয় থাকতে পারে। ইংরেজিতে আন্তর্জাতিক গবেষণা করতে পারে, বাংলায় কবিতা লিখতে পারে, রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে পারে, অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতাকে বাংলায় অনুবাদ করতে পারে, আর্জেন্টিনার একজন লেখকের কাছে পৌঁছতে স্প্যানিশ শিখতে পারে। এমন জীবনকে ‘দেশে’ আর ‘বিদেশে’ এই দুই ঘরে ভাগ করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত একজন কবি: কেতকীর বিপুল গবেষণা, প্রবন্ধ, অনুবাদ ও কথাসাহিত্যের পাশে তাঁর কবিসত্তাকে আলাদা করে মনে রাখা দরকার। কারণ এত কাজের মধ্যেও তিনি নিজেকে কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। ব্রিটেনের ‘পোয়েট্রি রিভিউ’, ‘ওয়াসাফিরি’, ‘মডার্ন পোয়েট্রি ইন ট্রান্সলেশন’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর ইংরেজি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। কলকাতা ও ভারতের নানা সাময়িকপত্রে বাংলা কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশ চলেছে সমান্তরালে। কবি কেতকীর কাছে পৃথিবী সম্ভবত একটিমাত্র কেন্দ্র থেকে দেখা যেত না। একটি গাছ ইংল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থেকেও বাংলার কোনো গাছের স্মৃতি বহন করতে পারে। উত্তর দেশের হিবিস্কাস অন্য আলো পায়। জল করিডোর হয়ে দুই দূরবর্তী জীবনের মাঝখানে চলাচলের পথ খুলে দেয়। শিকড় মাটির নিচে থাকে, আবার মানুষের শিকড় স্মৃতি, শব্দ, উচ্চারণ, খাদ্য, প্রেম, সন্তান, বইয়ের পাতার মধ্যেও ছড়িয়ে যায়।
তাই তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কাছে-দূরের কক্ষপথে’ ‘ভাবনার ভাস্কর্য, ‘শিকড় বাকড়’ নামও কৌতূহল জাগায়। শিকড় এক জায়গায় স্থির, বাকড় ছড়িয়ে পড়ে নানা দিকে। কেতকীর জীবনও যেন তেমন। ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনযাত্রা থেমে গেছে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তাসূত্র সহজে শেষ হওয়ার নয়। বাংলা সাহিত্য এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানুষের সাহিত্য। ঢাকা, কলকাতা, আগরতলা, লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি একই ভাষার পাঠকের আলাদা আবাস। আগামী দিনের বাংলা সাহিত্য আরও বেশি বহুকেন্দ্রিক হবে। সেই সাহিত্যকে বুঝতে কেতকীর কাছে ফিরে যেতে হবে। ফিরতে হবে ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’র অভিবাসী সংসারে। ফিরতে হবে রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর চিঠির কাছে, ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর আন্তঃবিষয়ক অনুসন্ধানে, তাঁর অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর কাছে।
তাঁর বাংলা ও ইংরেজি কবিতা পাশাপাশি পড়লে বোঝা যায়, একই মানুষ দুই ভাষায় নিজের অন্তর্জগৎকে কীভাবে ভিন্ন ছন্দ ও স্বরে প্রকাশ করেছেন। কেতকী একবার নিজের লেখক পরিচয় বোঝাতে গিয়ে ‘বহু কাজের’ দিকে তাকাতে বলেছিলেন। কথাটি তাঁর মৃত্যুর পরে আরও অর্থপূর্ণ শোনায়। তাঁকে শুধু রবীন্দ্র-গবেষক বললে কবি হারিয়ে যান, কবি বললে ঔপন্যাসিক আড়ালে পড়েন। প্রবাসী লেখক বললে তাঁর ইংরেজি সাহিত্যকর্ম ছোট হয়ে যায়, অনুবাদক বললে গবেষণার বিস্তার ধরা পড়ে না। তাঁকে পড়তে হয় সবগুলো পরিচয় পাশাপাশি রেখে। সেখানেই কেতকী কুশারী ডাইসনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাহিত্যিক পরিচয়: তিনি দুই ভাষার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন না, দুই ভাষাতেই ঘর বানিয়েছিলেন। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাতায়াত করেছেন সারাজীবন। সঙ্গে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে, বুদ্ধদেব বসুকে, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে, অভিবাসী নারীকে, সংসারের নিভৃত কথাকে, গবেষণাগারের তথ্যকে, নিজের স্মৃতিকে। এখন মানুষটি নেই। রয়ে গেছে সেই দুই ঘর। আর তাদের মাঝখানের দীর্ঘ করিডোর ধরে পাঠকের যাতায়াত চলবে।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কেতকী কুশারী ডাইসনকে প্রথম পড়ার সময় তাঁর নামের চেয়েও বেশি টেনেছিল তাঁর জীবন ও লেখার অবস্থান। বাংলা সাহিত্যের একজন লেখক, অথচ তাঁর বসবাস ইংল্যান্ডে; চারপাশে অক্সফোর্ডের জীবন, ব্রিটিশ সমাজ আর অভিবাসী মানুষের সংসার। সেই দূরের জীবন তিনি বাংলায় লিখছেন এমন স্বাভাবিকভাবে, যেন বাংলা তাঁর সঙ্গে কলকাতা থেকে বিমানে চড়ে ইংল্যান্ডে চলে গেছে। পরে তাঁর রবীন্দ্রচর্চা, অনুবাদ, কবিতা, প্রবন্ধ পড়ে বুঝেছি, কেতকীর কাছে মাতৃভাষা জন্মস্থানে ফেলে আসা কোনো স্মৃতিচিহ্ন ছিল না। বাংলা ছিল তাঁর প্রতিদিনের বসবাসের জায়গা। ইংরেজিও তাঁর নিজের। দুই ভাষার মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি কোনো একটিকে বেছে নেননি; দীর্ঘ সাহিত্যজীবন ধরে দুই দিকেই যাতায়াত করেছেন।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডে ৮৬ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসানের সংবাদ আমাদের সামনে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনের এক বিস্তৃত পরিসর খুলে দেয়। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গবেষণা ও অনুবাদে ছড়িয়ে থাকা তাঁর কাজকে নতুন করে পাঠ করার উপলক্ষ তৈরি হয়েছে। ৩১ আগস্ট হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি ঘটে। তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে আবার সামনে এসেছে এমন এক সাহিত্যিক জীবন, যেখানে বাংলা কবিতা থেকে অক্সফোর্ডের গবেষণা, রবীন্দ্রনাথ থেকে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, বুদ্ধদেব বসু থেকে অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতা, অভিবাসী বাঙালির ঘরসংসার থেকে নারীর আত্মপরিচয় সবই একই লেখকের কর্মপরিসরে জায়গা পেয়েছে।
দুই ভাষার মধ্যে একটি জীবন: কেতকীর সাহিত্যিক পরিচয় ধরতে গেলে প্রথমেই তাঁর দ্বিভাষিক সত্তার কাছে যেতে হয়। বাংলা ও ইংরেজিতে মৌলিক কবিতা লিখেছেন তিনি। গবেষণা করেছেন ইংরেজিতে, প্রবন্ধ লিখেছেন দুই ভাষায়, অনুবাদ করেছেন বাংলা থেকে ইংরেজিতে, ইংরেজি থেকে বাংলায়। কথাসাহিত্য ও নাটকের জন্য প্রধানত বাংলাকেই বেছে নিয়েছেন। নিজের লেখক পরিচয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেতকী বলেছিলেন, তাঁর কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য বিচিত্র সাহিত্যরূপে বিচরণ, দ্বিসাংস্কৃতিক জীবন এবং দ্বিভাষিকতা। তিনি নিজেকে বাংলা ডায়াস্পোরার লেখক হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের পূর্ণ ছবি পেতে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, গবেষণা, অনুবাদ সব কিছুকে একসঙ্গে পড়তে হবে। ইংল্যান্ডে তাঁর কথাসাহিত্যের ঘটনাস্থল তৈরি হলেও সেই জীবনকে দেখার চোখটি বাংলা সমাজ ও সংস্কৃতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তৈরি।
এই অবস্থান তাঁর সাহিত্যকে বিশেষ এক চরিত্র দিয়েছে। অভিবাসনের পর অনেক লেখকের মাতৃভাষার সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ ধীরে ধীরে কমে আসে। কেতকীর ক্ষেত্রে ঘটেছে ভিন্ন ঘটনা। ষাটের দশক থেকেই তিনি কলকাতার সাহিত্যপত্রে নিয়মিত লিখেছেন। ১৯৬১ সাল থেকে ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সেখানে বিদেশি বই নিয়ে তাঁর নিজস্ব পর্যালোচনা বিভাগও ছিল। ১৯৫৮-৫৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সম্পাদনার কাজ শুরু করেছিলেন। ইংল্যান্ডে স্থায়ী জীবনের মধ্যেও কলকাতার সাময়িকপত্র, ছোটকাগজ ও সাহিত্যিক মহলের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দীর্ঘকাল সচল ছিল। তাই তাঁর প্রবাস কোনো বিচ্ছেদরেখা হয়ে ওঠেনি। দূরত্ব তাঁর লেখায় নতুন এক দৃষ্টিকোণ তৈরি করেছে। কাছে থেকে যা অনেক সময় চোখে পড়ে না, দূরত্বে তার রেখাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কেতকী কুশারীর জন্ম ১৯৪০ সালের ২৬ জুন। তাঁর শিক্ষাজীবনের সঙ্গে কলকাতার উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েছেন, পরে উচ্চশিক্ষার পথ তাঁকে নিয়ে যায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৪ সালে রবার্ট ডাইসনকে বিয়ের পর ইংল্যান্ডেই তাঁর দীর্ঘ বসবাস শুরু। অক্সফোর্ডে তাঁর পিএইচডির বিষয় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে ১৭৬৫ থেকে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ নারী-পুরুষের জার্নাল ও স্মৃতিকথা। বিষয়টির দিকে তাকালে কেতকীর পরবর্তী সাহিত্যিক আগ্রহের একটি রেখা ধরা যায়। তিনি বৃহৎ রাজনৈতিক ঘটনাকে শুধু তারিখ ও প্রশাসনিক দলিলের ভেতর দিয়ে পড়েননি। ব্যক্তিগত জার্নাল, স্মৃতি, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিমানুষের চোখে অপর সমাজকে দেখার ধরন তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। এই প্রবণতা পরে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে তাঁর কাজে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ব্যক্তিগত চিঠি, সম্পর্ক, স্মৃতি, সংস্কৃতির পারস্পরিক যোগাযোগ তাঁর গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে।
‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’: প্রবাসের ঘরের ভেতর: কেতকীর কথাসাহিত্যের প্রসঙ্গ উঠলেই ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’র কথা আসে। ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৮১-৮২ সালে ধারাবাহিক প্রকাশের পর ১৯৮৩ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটির গুরুত্ব শুধু বিদেশে বসবাসরত বাঙালির জীবন নিয়ে লেখা হয়েছে বলে নয়। কেতকী প্রবাসকে পর্যটকের চোখে দেখেননি। বিদেশ তাঁর কাছে বিমানবন্দর, বরফ, পরিচ্ছন্ন রাস্তা আর বিস্ময়ের দৃশ্য নয়। সেখানে রান্নাঘর আছে, বিবাহ আছে, যৌনতা আছে, দাম্পত্যের ক্লান্তি আছে, সন্তান আছে, চাকরি আছে, একাকিত্ব আছে, সাংস্কৃতিক অস্বস্তি আছে। এই ঘরোয়া পরিসর বাংলা কথাসাহিত্যে প্রবাসের একটি নতুন মানচিত্র তৈরি করেছিল। অভিবাসী মানুষ একই সঙ্গে একাধিক সামাজিক সময়ের মধ্যে বাস করেন। ঘরের ভেতর কলকাতা, ঢাকা, সিলেট, পারিবারিক স্মৃতি; ঘরের বাইরে ব্রিটিশ কর্মক্ষেত্র, প্রতিবেশী, বিদ্যালয়, সামাজিক আচার। সন্তান আর মা-বাবার সাংস্কৃতিক সময়ও এক থাকে না। ফলে পরিচয় স্থির কোনো বস্তু হয়ে থাকতে পারে না।
কেতকীর সাহিত্য এই চলমান নির্মাণের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী। তাঁর একটি প্রবন্ধ গ্রন্থের নামই ‘চলন্ত নির্মাণ’। নামটির মধ্যে তাঁর চিন্তার একটি সূত্র পাওয়া যায়: মানুষ নিজেকে ক্রমাগত তৈরি করে।
নারী, অভিবাসন এবং নিজের কণ্ঠ: কেতকীর লেখায় নারী কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার দূরবর্তী চরিত্র নন। সংসার, মাতৃত্ব, পেশা, যৌনতা, শিক্ষা, সৃজনশীল কাজ, সামাজিক প্রত্যাশা, প্রতিষ্ঠানগত বৈষম্য সব মিলিয়ে নারীর জীবন তাঁর লেখায় বহুস্তরীয়। নিজের স্মৃতিচারণেও তিনি ব্রিটিশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন নারী, একজন দক্ষিণ এশীয়, একজন দ্বিভাষিক লেখক হিসেবে নানা অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। অক্সফোর্ডের সেন্ট হিল্ডাস কলেজে পোস্ট ডক্টরাল সুযোগের ক্ষেত্রে যে বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, বহু বছর পরে সেটিও অকপটে লিখেছেন। একই স্মৃতিচারণে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলা ভাষায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অনেক সময় প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। এই অভিজ্ঞতা তাঁর দ্বিভাষিকতার রাজনৈতিক দিকটি বুঝতেও সাহায্য করে। ইংরেজিতে লিখলে আন্তর্জাতিক পাঠকের সামনে যাওয়ার সুযোগ বাড়ে, বাংলা লিখলে সেই পথ অনেক সংকীর্ণ। অথচ কেতকী বাংলা ছাড়েননি।
২০১৬ সালে কলকাতা লিটারারি মিটে তিনি আঞ্চলিক ভাষার ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ইংরেজির আন্তর্জাতিক ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন, একই সঙ্গে মাতৃভাষার গভীর দক্ষতার প্রয়োজনও বারবার বলেছেন। তাঁর নিজের জীবন ছিল সেই কথার বাস্তব অনুশীলন।
রবীন্দ্রনাথ, ওকাম্পো এবং এক অসমাপ্ত কথোপকথন: কেতকীর সাহিত্য জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আর্জেন্টাইন লেখক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা। ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ গ্রন্থে গবেষণা, অনুবাদ ও সৃজনশীল গদ্যকে তিনি পাশাপাশি এনেছিলেন। ১৯৮৬ সালে বইটির জন্য তিনি প্রফুল্লকুমার সরকার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার পান। পরে ইংরেজিতে ‘ইন ইয়োর ব্লসমিং ফ্লাওয়ার গার্ডেন’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ-ওকাম্পো সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গবেষণা আরও বিস্তৃত আকার পায়।
এখানে কেতকীর কাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। গবেষণা আর সাহিত্যকে তিনি কঠোর দেয়াল তুলে আলাদা রাখতে চাননি। আর্কাইভ তাঁর কাছে মৃত কাগজের স্তূপ ছিল না। চিঠির মধ্যে তিনি মানুষ খুঁজেছেন, অনুবাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক দূরত্ব মেপেছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে দুই ভিন্ন সমাজের মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত পড়েছেন।
ওকাম্পোকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি স্প্যানিশও শিখেছিলেন। একটি সাহিত্যিক সম্পর্ক বুঝতে আরেকটি ভাষার কাছে যাওয়া তাঁর কাছে অতিরিক্ত পরিশ্রম ছিল না; কাজটির স্বাভাবিক অংশ ছিল। এই জায়গায় তাঁর গবেষকসত্তা আজও বিশেষ মনোযোগের যোগ্য। আমরা প্রায়ই রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে বিদেশি ব্যক্তিদের পড়ি। কেতকী ওকাম্পোকে শুধু রবীন্দ্রনাথের জীবনের পার্শ্বচরিত্র করে রাখেননি। ওকাম্পোর নিজস্ব জীবন, মনন, সাহিত্যিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে পড়েছেন। ফলে সম্পর্কটি একমুখী থাকে না। শান্তিনিকেতন থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত দুটি স্বাধীন মানুষের কথোপকথন হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রচর্চায় কেতকীর আরেকটি ব্যতিক্রমী কাজ ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’। সুশোভন অধিকারী, এড্রিয়ান হিল ও রবার্ট ডাইসনের সহযোগিতায় রবীন্দ্রনাথের রঙ দেখার বিশেষ শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য এবং তাঁর সাহিত্য ও চিত্রকলায় রঙের ব্যবহারের সম্পর্ক নিয়ে কাজটি তৈরি হয়। গ্রন্থটি ১৯৯৭ সালে আনন্দ পুরস্কার পায়। সাহিত্য গবেষণায় এমন কাজ সহজে দেখা যায় না। এখানে সাহিত্য, চিত্রকলা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং দৃষ্টিবিজ্ঞানের তথ্য পাশাপাশি এসেছে। রবীন্দ্রনাথকে কেবল সাহিত্য বিভাগের সম্পত্তি হিসেবে না দেখে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে এক টেবিলে বসিয়েছিলেন গবেষকেরা। রবার্ট ডাইসনের প্রসঙ্গও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র রবার্ট কেতকীর সৃজনশীল ও গবেষণামূলক জীবনের বহু কাজে যুক্ত ছিলেন। দাম্পত্য এখানে শুধু ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে থাকেনি, বৌদ্ধিক সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব: উত্তরাধিকার এবং স্বাধীনতা: নিজের কবিজীবনে রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবের কথা কেতকী একাধিকবার বলেছেন। শিশুকালেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাঠজগতে প্রবেশ করেন। পরে বুদ্ধদেব বসুও তাঁর কবিতাবোধে গভীর প্রভাব ফেলেন। তবে প্রভাব গ্রহণ মানে অনুকরণ নয়। কেতকীর জীবন পরিস্থিতি তাঁকে এমন সব অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা তাঁর পূর্বসূরিদের জগতে একইভাবে উপস্থিত ছিল না। অভিবাসী নারী, দ্বিভাষিক লেখক, আন্তঃসাংস্কৃতিক দাম্পত্য, ইংল্যান্ডে বসে বাংলায় সাহিত্যচর্চা, মাতৃভাষা থেকে শারীরিক দূরত্ব, সন্তানদের নতুন সামাজিক পরিবেশ— এসব তাঁর কবিতায় স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার তৈরি করেছে।
বাংলায় তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার বইয়ের মধ্যে ‘বল্কল’, ‘সবীজ পৃথিবী’, ‘জলের করিডোর ধরে’, ‘কথা বলতে দাও’, ‘জাদুকর প্রেম, জাদুকর মৃত্যু’, ‘দোলনচাঁপায় ফুল ফুটেছে’ রয়েছে। ইংরেজিতে স্যাপউড, ‘হাইবিসকাস ইন দ্য নর্থ’, ‘স্পেসেস আই ইনহ্যাবিট’, ‘মেমোরিজ অব আর্জেন্টিনা অ্যান্ড আদার পোয়েমস’, ‘ইন দ্যাট সেন্স ইউ টাচ্ড ইট’ তাঁর কবিতার বিস্তার বোঝায়। ‘স্পেসেস আই ইনহ্যাবিট’ নামটিই যেন তাঁর কবিজীবনের একটি চাবি। তিনি একটি মাত্র জায়গায় বাস করেননি। তাঁর বসবাস ছিল বহু পরিসরে, বহু স্মৃতিতে, দুই ভাষায়।
অনুবাদ: দুই তীরের মধ্যে যাতায়াত: কেতকীর অনুবাদক পরিচয়কে তাঁর মৌলিক সাহিত্যকর্ম থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কম। অনুবাদ তাঁর কাছে ছিল লেখক জীবনেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। তাঁর অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত কবিতা ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ‘আই ওউন্ট লেট ইউ গো’ নামে। ১৯৯১ সালে ব্লাডঅ্যাক্স বুকস থেকে প্রকাশিত বইটি পোয়েট্রি বুক সোসাইটির ‘রেকমেন্ডেড ট্রান্সলেশন’ হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর অনুবাদে বুদ্ধদেব বসুর নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি সংকলন। অনুবাদের এই যাত্রা শুধু বাংলা থেকে ইংরেজিতে সীমিত ছিল না; অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতাও তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন।
অনুবাদ নিয়ে তাঁর চিন্তার একটি বিশেষ দিক ছিল সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি। অন্য সংস্কৃতির লেখা বুঝতে পাঠককে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। ভূমিকা, টীকা, শব্দার্থ তাঁর কাছে অনুবাদের বাইরের বোঝা ছিল না। একটি কবিতা অন্য ভাষায় পৌঁছালে তার সঙ্গে যতটা সম্ভব সাংস্কৃতিক স্মৃতিও পৌঁছাক, তিনি তা চাইতেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের দ্রুত অনুবাদের সময়ে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। শুধু শব্দের বদল ঘটালেই এক ভাষার সাহিত্য আরেক ভাষায় পৌঁছে যায় না। একটি শব্দের সঙ্গে খাদ্য, ঋতু, পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্মীয় অভ্যাস, সামাজিক শ্রেণি, লোকস্মৃতি জড়িয়ে থাকতে পারে। অনুবাদককে তাই শব্দের পেছনের জীবনও চিনতে হয়। কেতকী সেই শ্রম করতেন
বহুভাষিকতার পক্ষে এক জীবন: কেতকীর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে মনোযোগ টানে। ২০১৬ সালের কলকাতা লিটারারি মিটে তিনি বলেছিলেন, যত ভাষা জানা যায়, সাহিত্যিক ‘খেলা’ তত জমে। তাঁর জীবনে কথাটি নিছক বাগ্চাতুর্য ছিল না। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি সংস্কৃতের প্রতি আগ্রহ ছিল, জার্মান ও স্প্যানিশের কাছেও গেছেন প্রয়োজনমতো। বর্তমান পৃথিবীতে ইংরেজির বিপুল ক্ষমতার মধ্যে কেতকীর সাহিত্যজীবন অন্য একটি পথের কথা সামনে আনে। আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য ইংরেজি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার বিনিময়ে বাংলাকে ছেড়ে দেননি।
এক ভাষায় সাফল্য অর্জনের জন্য আরেক ভাষাকে বিসর্জন দেওয়ার সমীকরণ তিনি মানেননি। তাঁর সাহিত্য তাই বাংলাদেশের পাঠকের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছে। তাঁর নিজের পরিচয় বয়ানে তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মূল ধারার পাঠকের পাশাপাশি বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বাংলাভাষী প্রবাসী সমাজেও তাঁর পাঠক রয়েছে। বাংলা ভাষার সাহিত্য যে রাষ্ট্রসীমার মধ্যে আটকে নেই, তাঁর জীবন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কলকাতায় জন্ম নেওয়া একজন লেখক অক্সফোর্ডে বসে বাংলায় উপন্যাস লিখছেন; ঢাকা ও কলকাতায় তাঁর পাঠক পড়ছেন; আর্জেন্টিনায় গিয়ে ওকাম্পোর সূত্র অনুসন্ধান করছেন; রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজিতে নিয়ে যাচ্ছেন; বুদ্ধদেব বসুর ইংরেজি অনুবাদ পরে ফিনিশ ভাষায় নতুন যাত্রা শুরু করছে। একটি লেখা কত দূর যেতে পারে, কেতকীর কর্মজীবনে তার চমৎকার সব নজির ছড়িয়ে আছে।
তাঁর কাজের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক সাহিত্যরূপের সীমানা নিয়ে স্বাধীনতা। ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’ গবেষণা ও উপন্যাসের উপাদান পাশাপাশি চলে। তাঁর নিজের ভাষায়, সৃজনশীল লেখা ও গবেষণার মাঝের বাধা ভাঙা ছিল তাঁর দীর্ঘমেয়াদি সাহিত্যিক লক্ষ্য। এখানেই কেতকীকে কেবল ‘প্রবাসী লেখক’ পরিচয়ে আটকে রাখা কঠিন। তিনি সাহিত্যরূপ নিয়েও পরীক্ষা করেছেন। কবিতা তাঁকে যা করতে দিয়েছে, গবেষণা অন্য কাজ দিয়েছে। উপন্যাসে তিনি যে সামাজিক বিস্তার পেয়েছেন, প্রবন্ধে পেয়েছেন সরাসরি চিন্তার জায়গা। নাটকে মানুষকে কণ্ঠ দিয়েছেন। অনুবাদে নিজের কণ্ঠ কিছুটা সরিয়ে রেখে অন্য কবির জন্য জায়গা তৈরি করেছেন। একজন লেখকের ভেতরে এতগুলো কাজ পরস্পরের সঙ্গে কথোপকথনে ছিল।
কেতকী কুশারী ডাইসন ১৯৮৬ ও ১৯৯৭ সালে দুবার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ভুবনমোহিনী দাসী পদক দেয়। ২০০৯ সালে বাংলা সাহিত্যে ‘বেস্ট বেঙ্গলি অব দ্য ইয়ার’ সম্মান, ২০১৬ সালে বুদ্ধদেব বসু স্মারক পুরস্কার, ২০২৩ সালে বিদ্যাসাগর দীনময়ী পুরস্কার ও ভাষানগর আজীবন সম্মান পেয়েছেন। পুরস্কারের তালিকা একজন লেখকের কাজের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির গভীরতা ও ব্যাপ্তি পুরোপুরি ধরতে পারে না। কেতকীর বড় অর্জন সম্ভবত অন্য জায়গায়। তিনি নিজের জীবন দিয়ে একটি সাহিত্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন: মানুষ একই সঙ্গে একাধিক সংস্কৃতির ভেতরে বাস করেও নিজের মাতৃভাষায় গভীরভাবে সক্রিয় থাকতে পারে। ইংরেজিতে আন্তর্জাতিক গবেষণা করতে পারে, বাংলায় কবিতা লিখতে পারে, রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে পারে, অ্যাংলো-স্যাক্সন কবিতাকে বাংলায় অনুবাদ করতে পারে, আর্জেন্টিনার একজন লেখকের কাছে পৌঁছতে স্প্যানিশ শিখতে পারে। এমন জীবনকে ‘দেশে’ আর ‘বিদেশে’ এই দুই ঘরে ভাগ করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত একজন কবি: কেতকীর বিপুল গবেষণা, প্রবন্ধ, অনুবাদ ও কথাসাহিত্যের পাশে তাঁর কবিসত্তাকে আলাদা করে মনে রাখা দরকার। কারণ এত কাজের মধ্যেও তিনি নিজেকে কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই কবিতা লিখেছেন দীর্ঘ সময় ধরে। ব্রিটেনের ‘পোয়েট্রি রিভিউ’, ‘ওয়াসাফিরি’, ‘মডার্ন পোয়েট্রি ইন ট্রান্সলেশন’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর ইংরেজি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। কলকাতা ও ভারতের নানা সাময়িকপত্রে বাংলা কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশ চলেছে সমান্তরালে। কবি কেতকীর কাছে পৃথিবী সম্ভবত একটিমাত্র কেন্দ্র থেকে দেখা যেত না। একটি গাছ ইংল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থেকেও বাংলার কোনো গাছের স্মৃতি বহন করতে পারে। উত্তর দেশের হিবিস্কাস অন্য আলো পায়। জল করিডোর হয়ে দুই দূরবর্তী জীবনের মাঝখানে চলাচলের পথ খুলে দেয়। শিকড় মাটির নিচে থাকে, আবার মানুষের শিকড় স্মৃতি, শব্দ, উচ্চারণ, খাদ্য, প্রেম, সন্তান, বইয়ের পাতার মধ্যেও ছড়িয়ে যায়।
তাই তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কাছে-দূরের কক্ষপথে’ ‘ভাবনার ভাস্কর্য, ‘শিকড় বাকড়’ নামও কৌতূহল জাগায়। শিকড় এক জায়গায় স্থির, বাকড় ছড়িয়ে পড়ে নানা দিকে। কেতকীর জীবনও যেন তেমন। ১১ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবনযাত্রা থেমে গেছে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তাসূত্র সহজে শেষ হওয়ার নয়। বাংলা সাহিত্য এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানুষের সাহিত্য। ঢাকা, কলকাতা, আগরতলা, লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি একই ভাষার পাঠকের আলাদা আবাস। আগামী দিনের বাংলা সাহিত্য আরও বেশি বহুকেন্দ্রিক হবে। সেই সাহিত্যকে বুঝতে কেতকীর কাছে ফিরে যেতে হবে। ফিরতে হবে ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’র অভিবাসী সংসারে। ফিরতে হবে রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর চিঠির কাছে, ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর আন্তঃবিষয়ক অনুসন্ধানে, তাঁর অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর কাছে।
তাঁর বাংলা ও ইংরেজি কবিতা পাশাপাশি পড়লে বোঝা যায়, একই মানুষ দুই ভাষায় নিজের অন্তর্জগৎকে কীভাবে ভিন্ন ছন্দ ও স্বরে প্রকাশ করেছেন। কেতকী একবার নিজের লেখক পরিচয় বোঝাতে গিয়ে ‘বহু কাজের’ দিকে তাকাতে বলেছিলেন। কথাটি তাঁর মৃত্যুর পরে আরও অর্থপূর্ণ শোনায়। তাঁকে শুধু রবীন্দ্র-গবেষক বললে কবি হারিয়ে যান, কবি বললে ঔপন্যাসিক আড়ালে পড়েন। প্রবাসী লেখক বললে তাঁর ইংরেজি সাহিত্যকর্ম ছোট হয়ে যায়, অনুবাদক বললে গবেষণার বিস্তার ধরা পড়ে না। তাঁকে পড়তে হয় সবগুলো পরিচয় পাশাপাশি রেখে। সেখানেই কেতকী কুশারী ডাইসনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সাহিত্যিক পরিচয়: তিনি দুই ভাষার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন না, দুই ভাষাতেই ঘর বানিয়েছিলেন। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাতায়াত করেছেন সারাজীবন। সঙ্গে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে, বুদ্ধদেব বসুকে, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে, অভিবাসী নারীকে, সংসারের নিভৃত কথাকে, গবেষণাগারের তথ্যকে, নিজের স্মৃতিকে। এখন মানুষটি নেই। রয়ে গেছে সেই দুই ঘর। আর তাদের মাঝখানের দীর্ঘ করিডোর ধরে পাঠকের যাতায়াত চলবে।

আপনার মতামত লিখুন