বাংলা কবিতার ষাটের দশকের এক ভিন্ন প্রান্ত থেকে যে দুএকজন কবিকে আমরা শনাক্ত করে থাকি, কবি রবিউল হুসাইন তাঁদের অন্যতম। আমৃত্যু এই কবির নিরীক্ষা ও নতুনত্বের অন্বেষায় আমরা বিশ্বাসী থেকেছি— যা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত ও আত্মবিশ্বাসী করেছে। তাঁর স্থাপত্য জ্ঞানকে দেশপ্রেমের সাক্ষর হিসেবে ব্যবহার করেছেন অসংখ্য ভাস্কর্য নির্মাণের কাজে— যা আমাদের দেশের প্রতি গভীর মমত্ব ও ভালবাসা তৈরি করে। চিত্র সমালোচনাকে নিয়ে গেছে নন্দনের চূড়ায়।
যারা মানুষ দেখলেই তার ভিতরে গিয়ে বসে; অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করে মানুষটির ভেতরটা কেমন, কতটা দগ্ধ, কতটা ক্ষতবিক্ষত কিংবা কতটাইবা আনন্দে ভরপুর, তেমন মানুষদের একজন কবি-স্থপতি রবিউল হুসাইন। যিনি বলতেন, “হাজার বছর কালের বিচারে কিছুই না/দূরের ঠিকানা চিরকালই অজানা।” কবি রবিউল হুসাইন এখন সেই অজানায়।
রবিউল হুসাইন সব সময় মানুষকে বুঝতে চেষ্টা করতেন; মানুষের ভেতর থেকে সহজ কম্যুনিকেশনের ভাষাটা খুঁজে নিতেন। যে কারণে তাঁর কথায় মানুষ মুগ্ধ হতো, যে কথাটি শুনলে মানুষ খুশি হয়, আনন্দিত হয়, এমন ভাষাটা রবিউল হুসাইন সহজে শনাক্ত করতে পারতেন। এই ভাষা দিয়ে তিনি মানুষের ভেতরে প্রবেশ করতেন, তারপর তার পরম সুহৃদ হয়ে উঠতেন। যার ভেতরে প্রগাঢ় বিষাদের ছায়া তিনি দেখতে পেতেন এবং যার ভেতরে এমন কিছু থাকত না, রবিউল হুসাইন এই উভয়ের জন্য হাস্যরসাত্মক একটি বাণী উচ্চারণ করতেন। এবং এই কথাটির গভীরতা কেবল প্রাজ্ঞ মানুষেরা বুঝতে পারতেন। সবাই হাসতে হাসতে কথাটি গ্রহণ করতেন এবং ভাবতে ভাবতে কথার মর্মার্থ খুঁজতেন। এদিক থেকে রবিউল হুসাইন একটা প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে এই সোসাইটিকে শাসন করতে চেয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর যে বিচরণভূমি, সেই কবিতা-শিল্প-সংস্কৃতির ভুবনে যে একদল মানুষ আছে, যারা হাসতে জানে না; কিংবা কথা বলতে জানে না; এবং এই অজানা নীরবতার ভেতর দিয়ে শিল্পের জগতের মোড়ল সাজতে চায়, রবিউল হুসাইন সেই মোড়লীপনার মুখোশ খুলে দিতেন প্রথমত তাঁর রসাত্মক কথাবার্তা দিয়ে; দ্বিতীয়ত তাঁর রচনার তীক্ষ্ণতা দিয়ে।
তাঁর রচনা দিয়ে তিনি মানুষের কাছে যেতে পারতেন। দূরকে নিকট করতে পারতেন। ভারাক্রান্ত মুখকে আনন্দিত করতে পারতেন। এ সংক্রান্তে তিনি প্রেমের অবিচার দিয়ে ভালবাসার পরাজয়কে সামনে নিয়ে আসেন। তিনি কখনো চান না প্রেমের অবিচারে ভালবাসা পরাজিত হোক: “দূরের মধ্যে এক অতি নিকট থাকে / দুঃখের মধ্যেও সুখ এক দৈবদুর্বিপাকে / আকাশটি ভাসে বৃষ্টি বৈশাখে / দুঃখগুলো স্থির দাঁড়িয়ে তবু সবিনয়ে / কারো কোনো কষ্ট নেই এই বিষণ্ন হৃদয়ে / সুখ ছিল সুখ আছে দুঃখকে ঘিরে / সূর্য যদি দুঃখ হয় সুখের চারিধারে / চাঁদ তখন তাকে ঘিরে অহর্নিশি ঘোরে” (ভালোবাসা হেরে যায় প্রেমের অবিচারে, নির্বাচিত কবিতা)।
কবি রবিউল হুসাইন দূরকে কাছে এবং দুঃখকে আনন্দে রূপ দিতে চেয়েছেন। সর্বসাম্প্রতিক কাব্যভাষা, চিন্তাতত্ত্ব ও সময়ের নিঃসঙ্গতাকে কবির নিয়তি ধরে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলাকেই সাম্প্রতিক প্রবণতা মনে করেন।
এখনও বাকি বিষণ্ন হওয়ার পালা
নিঃসঙ্গ সময় তো কবির জন্মকাল
দুঃখ কষ্টের হাত ধরেই তো তার পথচলা
নিজের সঙ্গে নিজে নিজে গোপনে একা একা
কথা বলা এটাই উত্তর-আধুনিকতা
এটাই উত্তর-ঔপনিবেশিকতা
এসবের ভেতরেই জাগে মাটি মা মমতা
(হাজারটি পাথার খণ্ড, নির্বাচিত কবিতা)
রবিউল হুসাইনের আদর্শিক জীবন অনেকটা গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি অহিংস ও ভালবাসায় বিশ্বাসী। কলুষমুক্ত, ক্ষতদাগমুক্ত একটি নির্মল পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন তিনি। তিনি আমগ্ন কাটাকুটি যেমন খেলেছেন তেমনি স্বপ্নের সাহসী মানুষের মতো বিষুবরেখায় হেঁটেছেন। অন্ধকারের গভীরে কী আছে, কিংবা কী থাকে— কবিতা ও স্থাপত্য শিল্পে সেসব খুঁজতে খুঁজতে কাটিয়েছেন একটি জীবন। নীল নীল অপমান তাঁকে গ্রাস করেছে, তাঁকে লিখতে হয়েছে অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ। স্থিরবিন্দুর মোহন সংকটকালে তিনি বিচলিত হননি। মানুষকে ভালোবাসতে ভোলেননি। তাঁকে জাগিয়ে রেখেছে ভেতরের শক্তি, সরলিপনা।
রবিউল হুসাইন ছিলেন সহজ নিভৃত প্রাণ নিরীক্ষাধর্মী কবি-স্থপতি। তাঁর কবিতার নিরীক্ষা প্রবণতা শেষদিন পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়। এমনকি স্থপত্যেও। তিনি ভাষাকে ইচ্ছেমতো অলংকরণ পরাতে পারেন অনায়াসে। ভাষা যেন তাঁর অনুগত সহযোগী। তাকে যেভাবে বলবেন, সেভাবেই সে তার কবিতায় উঠে আসবে।
ব্যক্তিগত জীবনে রবিউল হুসাইনের সঙ্গে জানাশোনা প্রায় দুই দশকের। তাঁকে শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত একই রকম দেখেছি। ষাটের দশকের সাহিত্য আন্দোলনের একজন অগ্রণী কবি তিনি। তবে লক্ষ্যযোগ্য যে, সে সময়ের কবিজীবনের বোহেমিয়ানপনা তাঁকে স্পর্শ করেনি। কিন্তু তিনি বরাবরই ছিলেন কবিতার বোহেমিয়ান।
রবিউল হুসাইন অঢেল লেখেননি। তবে তাঁকেও এক ধরনের সব্যসাচী বলতে কোনো দ্বিধা নেই। তিনি কবিতা নিয়েই মেতে থাকেননি। লিখেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস। তার বিশেষ স্বীকৃতি রয়েছে একজন বিশিষ্ট চিত্রসমালোচক হিসেবে। একজন বিশিষ্ট স্থপতি হিসেবে তিনি দেশ বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছেন। তাঁর তৈরি করা উল্লেখযোগ্য নকশার মধ্যে আছে— বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ফটক, ভাসানী হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল প্রভৃতি।
স্থাপত্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যাপারটি খুব গভীরভাবে রেখাপাত করে। আন্দোলন সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের যুদ্ধে বরাবর রবিউল হুসাইনকে পাশে পাওয়া যেত।
সাহিত্য সম্পাদনা করতে গিয়ে আমার বিভিন্ন লেখক সম্পর্কে একপ্রকারের ধারণা তৈরি হয়ে যায়। আমার প্রায় দুই দশকের বাণিজ্যিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদনার অভিজ্ঞতা থেকে বলি যে, রবিউল হুসাইন ছিলেন দৈনিক সংবাদ ও আমার নির্ভরযোগ্য ভরসার জায়গা। কোনো একটি বিষয়ে ঠেকে গেলে, কোনো বিশিষ্ট সাহিত্যব্যক্তিত্বের ওপর কোনো লেখার দরকার হলে বা কোনো বিশেষ বিষয়ের ওপর লেখার প্রয়োজন হলে আমি অনিবার্য আশ্রয়স্থল হিসেবে রবিউল হুসাইনের কাছে গিয়েছি এবং তাঁর একটা সমাধান পেয়েছি। তিনি সব্যসাচীর মতো দুই হাতে যে কোনো বিষয়ই লিখতে পারতেন, যদিও তাঁর রচনার পরিমাণ সেই তুলনায় যথেষ্ট নয়।
রবিউল হুসাইন ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও গভীরপ্রাণ মানুষ। তিনি সহজে রেগে যেতেন না। কারো কানকথায় বিশ্বাস রাখতেন না। তিনি সারাজীবন অল্প কিছু নির্বাচিত মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। মগ্ন থেকেছেন সর্বদা শিল্পে। এদিক থেকে তিনি ছিলেন একজন বিশ্ব নাগরিক।
রবিউল হুসাইন ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার রতিডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক কুষ্টিয়া জেলায় সম্পন্ন করে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
স্থপতি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এরপর। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নিয়মিত লেখালেখিও করতেন। কর্মজীবনে তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্যসহ শিশু-কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
রবিউল হুসাইনের কবিতা, উপন্যাস, শিশুতোষ ও প্রবন্ধ সম্পর্কিত ২৫টির বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো: কী আছে এই অন্ধকারের গভীরে, আরও ঊনত্রিশটি চাঁদ, স্থিরবিন্দুর মোহন সংকট, কর্পূরের ডানাঅলা পাখি, আমগ্ন কাটাকুটি খেলা, বিষুবরেখা, দুর্দান্ত, অমনিবাস, কবিতাপুঞ্জ, স্বপ্নের সাহসী মানুষেরা, যে নদী রাত্রির, এইসব নীল অপমান, অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ, দুরন্ত কিশোর, বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি, নির্বাচিত কবিতা, গল্পগাথা, ছড়িয়ে দিলাম ছড়াগুলি।
বিচিত্রপ্রাণ এই মানুষটির প্রয়াণের এত বছর পরও আমরা তাঁকে যে কোনো প্রয়োজনে স্মরণ করি। তার রচনার কাছে ফিরে যাই। তাঁর সাহসের কাছে ফিরে আসি এবং প্রতিনিয়ত তাঁর কবিতার মতো নিজেকে নবায়ন করে নিতে থাকি।
***

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলা কবিতার ষাটের দশকের এক ভিন্ন প্রান্ত থেকে যে দুএকজন কবিকে আমরা শনাক্ত করে থাকি, কবি রবিউল হুসাইন তাঁদের অন্যতম। আমৃত্যু এই কবির নিরীক্ষা ও নতুনত্বের অন্বেষায় আমরা বিশ্বাসী থেকেছি— যা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত ও আত্মবিশ্বাসী করেছে। তাঁর স্থাপত্য জ্ঞানকে দেশপ্রেমের সাক্ষর হিসেবে ব্যবহার করেছেন অসংখ্য ভাস্কর্য নির্মাণের কাজে— যা আমাদের দেশের প্রতি গভীর মমত্ব ও ভালবাসা তৈরি করে। চিত্র সমালোচনাকে নিয়ে গেছে নন্দনের চূড়ায়।
যারা মানুষ দেখলেই তার ভিতরে গিয়ে বসে; অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করে মানুষটির ভেতরটা কেমন, কতটা দগ্ধ, কতটা ক্ষতবিক্ষত কিংবা কতটাইবা আনন্দে ভরপুর, তেমন মানুষদের একজন কবি-স্থপতি রবিউল হুসাইন। যিনি বলতেন, “হাজার বছর কালের বিচারে কিছুই না/দূরের ঠিকানা চিরকালই অজানা।” কবি রবিউল হুসাইন এখন সেই অজানায়।
রবিউল হুসাইন সব সময় মানুষকে বুঝতে চেষ্টা করতেন; মানুষের ভেতর থেকে সহজ কম্যুনিকেশনের ভাষাটা খুঁজে নিতেন। যে কারণে তাঁর কথায় মানুষ মুগ্ধ হতো, যে কথাটি শুনলে মানুষ খুশি হয়, আনন্দিত হয়, এমন ভাষাটা রবিউল হুসাইন সহজে শনাক্ত করতে পারতেন। এই ভাষা দিয়ে তিনি মানুষের ভেতরে প্রবেশ করতেন, তারপর তার পরম সুহৃদ হয়ে উঠতেন। যার ভেতরে প্রগাঢ় বিষাদের ছায়া তিনি দেখতে পেতেন এবং যার ভেতরে এমন কিছু থাকত না, রবিউল হুসাইন এই উভয়ের জন্য হাস্যরসাত্মক একটি বাণী উচ্চারণ করতেন। এবং এই কথাটির গভীরতা কেবল প্রাজ্ঞ মানুষেরা বুঝতে পারতেন। সবাই হাসতে হাসতে কথাটি গ্রহণ করতেন এবং ভাবতে ভাবতে কথার মর্মার্থ খুঁজতেন। এদিক থেকে রবিউল হুসাইন একটা প্রতিবাদের ভাষা দিয়ে এই সোসাইটিকে শাসন করতে চেয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর যে বিচরণভূমি, সেই কবিতা-শিল্প-সংস্কৃতির ভুবনে যে একদল মানুষ আছে, যারা হাসতে জানে না; কিংবা কথা বলতে জানে না; এবং এই অজানা নীরবতার ভেতর দিয়ে শিল্পের জগতের মোড়ল সাজতে চায়, রবিউল হুসাইন সেই মোড়লীপনার মুখোশ খুলে দিতেন প্রথমত তাঁর রসাত্মক কথাবার্তা দিয়ে; দ্বিতীয়ত তাঁর রচনার তীক্ষ্ণতা দিয়ে।
তাঁর রচনা দিয়ে তিনি মানুষের কাছে যেতে পারতেন। দূরকে নিকট করতে পারতেন। ভারাক্রান্ত মুখকে আনন্দিত করতে পারতেন। এ সংক্রান্তে তিনি প্রেমের অবিচার দিয়ে ভালবাসার পরাজয়কে সামনে নিয়ে আসেন। তিনি কখনো চান না প্রেমের অবিচারে ভালবাসা পরাজিত হোক: “দূরের মধ্যে এক অতি নিকট থাকে / দুঃখের মধ্যেও সুখ এক দৈবদুর্বিপাকে / আকাশটি ভাসে বৃষ্টি বৈশাখে / দুঃখগুলো স্থির দাঁড়িয়ে তবু সবিনয়ে / কারো কোনো কষ্ট নেই এই বিষণ্ন হৃদয়ে / সুখ ছিল সুখ আছে দুঃখকে ঘিরে / সূর্য যদি দুঃখ হয় সুখের চারিধারে / চাঁদ তখন তাকে ঘিরে অহর্নিশি ঘোরে” (ভালোবাসা হেরে যায় প্রেমের অবিচারে, নির্বাচিত কবিতা)।
কবি রবিউল হুসাইন দূরকে কাছে এবং দুঃখকে আনন্দে রূপ দিতে চেয়েছেন। সর্বসাম্প্রতিক কাব্যভাষা, চিন্তাতত্ত্ব ও সময়ের নিঃসঙ্গতাকে কবির নিয়তি ধরে নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলাকেই সাম্প্রতিক প্রবণতা মনে করেন।
এখনও বাকি বিষণ্ন হওয়ার পালা
নিঃসঙ্গ সময় তো কবির জন্মকাল
দুঃখ কষ্টের হাত ধরেই তো তার পথচলা
নিজের সঙ্গে নিজে নিজে গোপনে একা একা
কথা বলা এটাই উত্তর-আধুনিকতা
এটাই উত্তর-ঔপনিবেশিকতা
এসবের ভেতরেই জাগে মাটি মা মমতা
(হাজারটি পাথার খণ্ড, নির্বাচিত কবিতা)
রবিউল হুসাইনের আদর্শিক জীবন অনেকটা গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি অহিংস ও ভালবাসায় বিশ্বাসী। কলুষমুক্ত, ক্ষতদাগমুক্ত একটি নির্মল পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন তিনি। তিনি আমগ্ন কাটাকুটি যেমন খেলেছেন তেমনি স্বপ্নের সাহসী মানুষের মতো বিষুবরেখায় হেঁটেছেন। অন্ধকারের গভীরে কী আছে, কিংবা কী থাকে— কবিতা ও স্থাপত্য শিল্পে সেসব খুঁজতে খুঁজতে কাটিয়েছেন একটি জীবন। নীল নীল অপমান তাঁকে গ্রাস করেছে, তাঁকে লিখতে হয়েছে অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ। স্থিরবিন্দুর মোহন সংকটকালে তিনি বিচলিত হননি। মানুষকে ভালোবাসতে ভোলেননি। তাঁকে জাগিয়ে রেখেছে ভেতরের শক্তি, সরলিপনা।
রবিউল হুসাইন ছিলেন সহজ নিভৃত প্রাণ নিরীক্ষাধর্মী কবি-স্থপতি। তাঁর কবিতার নিরীক্ষা প্রবণতা শেষদিন পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়। এমনকি স্থপত্যেও। তিনি ভাষাকে ইচ্ছেমতো অলংকরণ পরাতে পারেন অনায়াসে। ভাষা যেন তাঁর অনুগত সহযোগী। তাকে যেভাবে বলবেন, সেভাবেই সে তার কবিতায় উঠে আসবে।
ব্যক্তিগত জীবনে রবিউল হুসাইনের সঙ্গে জানাশোনা প্রায় দুই দশকের। তাঁকে শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত একই রকম দেখেছি। ষাটের দশকের সাহিত্য আন্দোলনের একজন অগ্রণী কবি তিনি। তবে লক্ষ্যযোগ্য যে, সে সময়ের কবিজীবনের বোহেমিয়ানপনা তাঁকে স্পর্শ করেনি। কিন্তু তিনি বরাবরই ছিলেন কবিতার বোহেমিয়ান।
রবিউল হুসাইন অঢেল লেখেননি। তবে তাঁকেও এক ধরনের সব্যসাচী বলতে কোনো দ্বিধা নেই। তিনি কবিতা নিয়েই মেতে থাকেননি। লিখেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস। তার বিশেষ স্বীকৃতি রয়েছে একজন বিশিষ্ট চিত্রসমালোচক হিসেবে। একজন বিশিষ্ট স্থপতি হিসেবে তিনি দেশ বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছেন। তাঁর তৈরি করা উল্লেখযোগ্য নকশার মধ্যে আছে— বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ফটক, ভাসানী হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল প্রভৃতি।
স্থাপত্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যাপারটি খুব গভীরভাবে রেখাপাত করে। আন্দোলন সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের যুদ্ধে বরাবর রবিউল হুসাইনকে পাশে পাওয়া যেত।
সাহিত্য সম্পাদনা করতে গিয়ে আমার বিভিন্ন লেখক সম্পর্কে একপ্রকারের ধারণা তৈরি হয়ে যায়। আমার প্রায় দুই দশকের বাণিজ্যিক পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদনার অভিজ্ঞতা থেকে বলি যে, রবিউল হুসাইন ছিলেন দৈনিক সংবাদ ও আমার নির্ভরযোগ্য ভরসার জায়গা। কোনো একটি বিষয়ে ঠেকে গেলে, কোনো বিশিষ্ট সাহিত্যব্যক্তিত্বের ওপর কোনো লেখার দরকার হলে বা কোনো বিশেষ বিষয়ের ওপর লেখার প্রয়োজন হলে আমি অনিবার্য আশ্রয়স্থল হিসেবে রবিউল হুসাইনের কাছে গিয়েছি এবং তাঁর একটা সমাধান পেয়েছি। তিনি সব্যসাচীর মতো দুই হাতে যে কোনো বিষয়ই লিখতে পারতেন, যদিও তাঁর রচনার পরিমাণ সেই তুলনায় যথেষ্ট নয়।
রবিউল হুসাইন ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও গভীরপ্রাণ মানুষ। তিনি সহজে রেগে যেতেন না। কারো কানকথায় বিশ্বাস রাখতেন না। তিনি সারাজীবন অল্প কিছু নির্বাচিত মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। মগ্ন থেকেছেন সর্বদা শিল্পে। এদিক থেকে তিনি ছিলেন একজন বিশ্ব নাগরিক।
রবিউল হুসাইন ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার রতিডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক কুষ্টিয়া জেলায় সম্পন্ন করে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
স্থপতি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এরপর। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নিয়মিত লেখালেখিও করতেন। কর্মজীবনে তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্যসহ শিশু-কিশোর সংগঠন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
রবিউল হুসাইনের কবিতা, উপন্যাস, শিশুতোষ ও প্রবন্ধ সম্পর্কিত ২৫টির বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো: কী আছে এই অন্ধকারের গভীরে, আরও ঊনত্রিশটি চাঁদ, স্থিরবিন্দুর মোহন সংকট, কর্পূরের ডানাঅলা পাখি, আমগ্ন কাটাকুটি খেলা, বিষুবরেখা, দুর্দান্ত, অমনিবাস, কবিতাপুঞ্জ, স্বপ্নের সাহসী মানুষেরা, যে নদী রাত্রির, এইসব নীল অপমান, অপ্রয়োজনীয় প্রবন্ধ, দুরন্ত কিশোর, বাংলাদেশের স্থাপত্য সংস্কৃতি, নির্বাচিত কবিতা, গল্পগাথা, ছড়িয়ে দিলাম ছড়াগুলি।
বিচিত্রপ্রাণ এই মানুষটির প্রয়াণের এত বছর পরও আমরা তাঁকে যে কোনো প্রয়োজনে স্মরণ করি। তার রচনার কাছে ফিরে যাই। তাঁর সাহসের কাছে ফিরে আসি এবং প্রতিনিয়ত তাঁর কবিতার মতো নিজেকে নবায়ন করে নিতে থাকি।
***

আপনার মতামত লিখুন