(পূর্ব প্রকাশের পর)
নয়
বিকেলের আলোটা আস্তে আস্তে মিইয়ে আসছে| সন্ধ্যা হতে এখনও খানিকটা বাকি| গোধূলির রঙিন আভা শ্রাবণের ছেঁড়া মেঘের সঙ্গে মিলে কেমন ঢেউয়ের নৃত্য করছে| পশ্চিম আকাশের পুরোটাতেই এখন রঙের ভাঁজ| বুইদ্দার বিলের স্থির জলের ওপর সেই আভার একটা হাল্কা প্রলেপ পড়েছে| আনিস এ মুহূর্তে মুগ্ধ হয়ে বিলের জলে আবীর আভার প্রলেপ দেখছি| যদিও তার মনটা বেশ বিক্ষিপ্ত|
আনিস বাড়ি ফিরেছে বেশ কতক্ষণ আগেই| সে আবদেল আলীর বাড়ি থেকে সরাসরি বাড়ি চলে এসেছে| তাদের বছরবাঁধা কামলা বশির নৌকা নিয়ে গিয়েছিল তাকে আনতে| আবদেল আলীর বৃদ্ধ বউ সফুরা বিবির কটাক্ষমূলক কথাগুলো সহ্য করতে না পেরে সে বশিরকে ফোন দিয়েছিল তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে| বশিরের একটা বোতামটেপা মোবাইল আছে| মা’র খবরাখবর নেওয়ার জন্য আনিসই তাকে কিনে দিয়েছে| সে মনসুর পাগলাকেও একটা বোতামটেপা মোবাইল কিনে দিয়েছিল| কিন্তু মনসুর পাগলা সেটা হারিয়ে ফেলেছে|
আনিস বাড়ি ফিরে তাদের দিঘল বারান্দাটায় একটা চেয়ার টেনে বসে বেশ কিছুক্ষণ চুপ হয়ে বসেছিল| তারপর সে কবিতার খাতাটা এনে ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজের সাত নম্বর কবিতাটা নিয়ে আবার বসে| সে একটা জিনিস সবসময় দেখেছে, তার যখন কোনো কারণে মন খারাপ থাকে তখন খাতা-কলম নিয়ে বসলে তার তরতর করে কবিতার পঙক্তি বের হয়| কলম যেন তখন আর থামতে চায় না|
আনিসের এই বিকেলেও তাই হয়েছে| সে কবিতার খাতাটা নিয়ে বসে ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজের সাত নম্বর কবিতাটির বাকি পঙক্তিগুলো টেনে লিখে ফেলেছে| আট নম্বর কবিতাও লিখতে শুরু করেছিল| এরই মধ্যে তার দৃষ্টি পড়ে পশ্চিমের আকাশে| বারান্দায় বসে পশ্চিমের আকাশটা পুরোপুরি দেখা যায় না বলে তখনই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে আসে| উঠোন পেরিয়ে দক্ষিণের গোপাটে নেমে আকাশটা দেখতে শুরু করে| তাদের বাড়ির দক্ষিণের গোপাটটা বেশ সরু| উঠোন থেকে গাছের মোটা মোটা শেকড় বেয়ে খানিকটা নেমে গেছে| গোপাটে দুটো গরু পাশাপাশি হাঁটতে পারে না| গোপাটের পর বিলের ধার ঘেঁষে সারি করা আমগাছ আর হিজল গাছ| একটা আমগাছের নিচে তাদের নৌকাটা বাঁধা|
আনিস আকাশ আর বিলের জলে আবীরের আভা দেখতে দেখতে কী ভেবে গোপাট ছেড়ে নৌকায় উঠে এল| নৌকাটা কেঁপে উঠল জলের কাঁপুনিতে| তার মোটেও পরিকল্পনা ছিল না, এ মুহূর্তে বাড়ি থেকে বের হওয়ার| এমনিতেই তার মনটা খুব বিক্ষিপ্ত| একদিকে মন ও মননের দোলচালে সে দ্বিধায় পড়ে আছে| মানুষের তির্যক দৃষ্টি তো আছেই| অন্যদিকে সেতারা বেগমের লাশ ও মনসুর পাগলাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা তার মনে বারবার হানা দিচ্ছে| মনসুর পাগলার পুলিশ থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য তার দিকে কী করুণ দৃষ্টিতেই না তাকিয়েছিল! সেতারা বেগমের গোমতীর বানে ডোবার কষ্টটা তো গত দু’দিন ধরেই সে বয়ে বেড়াচ্ছে| ছফুরা বিবির কটুকথাগুলোও তার কানে বাজছে বেশ|
আনিস আমগাছের গোড়া থেকে রশিটা ছাড়িয়ে নৌকার গলুতে বসে ˆবঠা ধরল| তাদের নৌকাটা কেড়াই নৌকা| অত বড় নয়, আবার কোসা নৌকার মতো এত ছোটও নয়| ছইয়ের নিচে আরাম করে শোয়া যায়| প্রতি শুক্রবারে স্কুলের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বশির যখন তাকে অনুতপুর থেকে আনতে যায়, তখন সে ছইয়ের নিচে হাতপা মেলে শোয়ে জলের দুলুনি অনুভব করে| গোমতীর ঢেউয়ের তালে তালে মৃদু দুলুনি, আহা! বর্ষার মওসুমে গোমতী নদীর ভরাটবানের অনুভূতিটা অন্যরকম ভয়ের| দুলুনিতে গায়ের লোম যেন খাঁড়া হয়ে যায়|
এখন অবশ্য বশিরকে আনিসের ডাকতে ইচ্ছে হলো না| সে বেশিদূর যাবেও না| এই তো কিছুক্ষণ বিলের জলে নৌকা বেয়ে পশ্চিম আকাশের গোধূলিটা আরও স্পষ্ট করে দেখবে| তারপর সন্ধ্যার অনুভূতিটা নিবে| বিলের ধানক্ষেতের ভেতর থেকে ব্যাঙের ডাক— ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, কটর কট| কোথাও বিলের জলে মাছের লেজ ঝাপটানো শব্দ— ছলাৎ ছলাৎ, ছলাৎ ছলাৎ| ধানক্ষেতে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ— সড়সড়, সড়সড়| এছাড়া সন্ধ্যা ও রাতের একধরনের শব্দ আছে| সেই শব্দ যতটুকু না শোনা যায়, এর চেয়ে বেশি অনুভব করা যায়|
আনিস নৌকা বাইতে বাইতে বুইদ্দার বিলের দক্ষিণে খানিকটা ভেতরে চলে এল| তার দু’পাশে জলের ওপর মাথা উঁচু করা ধানগাছের ডগা| ধানগাছের ডগাগুলো এমনভাবে গায়ে গা লেগে দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন কোনো যুবতীর কিঞ্চিৎ কালি রং ধারণ করা সবুজ চুল| গোধূলির আভায় যুবতী সেই চুল বিছিয়ে দিয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত সিঁথি কেটে| গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে গেছে সেই সিঁথিকাটা পথ| নৌকা চলে অহরহ|
আনিস আরও দক্ষিণে যেতেই দেখল, ধানক্ষেতের ভেতর এলোমেলো আরও চারটা নৌকা| এই নৌকাগুলো গৃহস্থের ছোট্ট ডিঙি নৌকা| ওরা এসেছে ধানী জমির ফাঁকে ফাঁকে টানা জাল পাততে| সন্ধ্যার এ সময় জাল পেতে ওরা ভোর-সকালে টেনে তোলে| বর্ষার মওসুমে গৃহস্থের খেতে-খামারে কাজ থাকে না| ওদের অনেকে বুইদ্দার বিলের ˆথথৈ জলে মাছ ধরে খোরাক জোগায়|
ধানী জমির ফাঁকে টানা জাল পাততে আসা একজন গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেডা, আনিস ভাই নাকি?’
আনিস দেখল, দক্ষিণ পাড়ার জয়নাল| বলল, ‘হ্যাঁ|’
‘এই সইন্ধ্যাবেলা কই যান?’
‘কোথাও না|’
‘কোথাও না, অথচ নাও লইয়া বাইর হইছেন?’
‘এমনিই| নৌকা বাইতে ইচ্ছে হলো তাই বের হয়েছি|’
জয়নাল বলল, ‘ও, আইচ্ছা| আপনে কবি মানুষ, কত ইচ্ছা হইবো|’ বলেই সে একটু থেমে কিছু একটা ভাবল| তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘আনিস ভাই, মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ খুঁইজা পাওয়া গেছে, হেইডা জানেন তো?’
আনিস বলল, ‘হ্যাঁ, জানি|’
জয়নাল আবার জিজ্ঞেস করল, ‘মনসুর পাগলারে নাকি পুলিশে ধইরা লইয়া গেছে?’
আনিস একটু চুপ হয়ে গিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ|’
‘ক্যান ধইরা লইয়া গেছে?’
‘জানি না|’
‘ওমা, কী কন? আপনের দোস্তরে ধইরা লইয়া গেছে, অথচ আপনে জানেন না? আমি তো শুনছি হেয় তার বউরে নাকি গাঙে চুবাইয়া মারছে?’
আনিস মনে মনে বেশ বিরক্তিবোধ করল| সে আবার বলল, ‘জানি না|’ —বলেই সে জোরে নৌকা বাইতে শুরু করল| জয়নাল পেছন থেকে একটু জোর গলায় কিছু একটা বলল| কিন্তু সে শোনার চেষ্টা করল না| সে নৌকাটা টেনে বুইদ্দার বিলের আরো দক্ষিণে চলে এল|
বিলের এপাশটায় আরও ঘন ধানী জমি| এপাশটায় গৃহস্থের কোনো নৌকা নেই| যদিও সিঁথিকাটা নৌকা চলার পথটা চলে গেছে দূরে আরও দক্ষিণে রায়তলা গ্রাম অব্দি| পুবে কদমতলি গ্রাম| পশ্চিমে মীরবহরি| গোমতী নদীটা মোল্লাকান্দি পেরিয়ে বেঁকে মীরবহরি গ্রামে ঢুকেছে| মীরবহরি গ্রামের পরই অনুতপুর গ্রাম|
এদিকের সবগুলো গ্রামের মধ্যে অনুতপুর গ্রামটা বেশ সমৃদ্ধ| অনুতপুর গ্রামের পশ্চিমদিক দিয়ে একটা উঁচু মেঠোপথ চলে গেছে পাকা সড়কের দিকে| পথটা পুরোনো| এখন যদিও নতুন রাস্তার কাজ চলছে| মোল্লাকান্দি অব্দি রাস্তাটা এগিয়ে এসেছে| কিন্তু অনুতপুর গ্রামটা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই বেশ উন্নত ছিল| অনুতপুর গ্রামে একটা উচ্চবিদ্যালয়, একটা পোস্ট অফিস, একটা ব্যাংক ও একটা এনজিও অফিস আছে| একসময় জমিদার রাধারমণ দত্তের কাচারি ছিল সেখানে| সেই ব্রিটিশ আমলে জমিদার রাধারমণ দত্ত তাঁর বাবার নামে সেখানে সেই উচ্চবিদ্যালয়টা প্রতিষ্ঠা করেন| শ্রী কৃষ্ণচরণ দত্ত বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়| আনিস সেই স্কুলে নিজে লেখাপড়া করেছে| এখন সেখানে সে শিক্ষক|
সেতারা বেগমের বাপের বাড়িও সেই অনুতপুর গ্রামের পুবপাড়ায়| শ্রী কৃষ্ণচরণ দত্ত উচ্চবিদ্যালয় থেকে খুব বেশি দূরে নয়| গ্রামের ভেতর দিয়ে একটা সরু পথ, একটা বড় পুকুর ও কয়েকটা বাড়ি পেরোলেই সেতারা বেগমের বাপের বাড়ি| আনিস বেশ কয়েকবার সেই বাড়িতে গিয়েছে| মনসুর পাগলার সঙ্গে সেতারা বেগমের বিয়েটাও দিয়েছে নিজে ঘটকালি করে|
আনিস নিজে ঘটকালি করে বিয়ে দিয়েছে বলেই হয়তো সেতারা বেগমের মাঝেমধ্যে তার ওপর ক্ষোভটা একটু বেশি ঝাড়ত| অধিকারবোধটা খাটাত বেশি| দু’বার তো মনসুর পাগলার পাগলামি সহ্য করতে না পেরে সে বাপের বাড়ি চলে যায়| সংসার করবে না এমন কথাও তোলে| পরে মনসুর পাগলার হয়ে আনিস তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়ে আসে| সেসব কথা অবশ্য সেতারা বেগম ও মনসুর পাগলার বিয়ের প্রথমদিককার|
সেতারা বেগমের যে বিষয়টা আনিসকে এ মুহূর্তে ক্ষুধিত করছে সেটা হলো, ওরা দু’জন একসঙ্গে বেশ কয়েকবার এক নৌকায় আঁধারিয়া থেকে অনুতপুর, অনুতপুর থেকে আঁধারিয়া গ্রামে আসাযাওয়া করেছে| একবার তো তাদের নৌকায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়| সে রাতটা ছিল জ্যোৎস্নার রাত| আকাশে ছিল একাদশী চাঁদ| গোমতী নদীর বুকে রুপোলি জ্যোৎস্নার আলো সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছিল| নৌকায় তাদের দু’জন বাদে বশির ছিল| তারপরও আনিস আবেগে সেতারা বেগমের হাতটা ধরে বলেছিল, ‘তুমি মনে রেখো, আমি তোমাকে এক কোটি জ্যোৎস্না দিয়ে কিনে নিলাম...!’
সেতারা বেগম ফিসফিস করে বলেছিল, ‘আমি আপনাগো কবিদের মতো ওইসব কথা বুঝি না| আমি হেই কথা বুঝি, আমি ব্যাপারি বাড়িত পইড়া আছি শুধু আপনের লাইগাই| নইলে...|’
‘নইলে কী?’
‘নইলে আপনের পাগলা দোস্তরে ছাইড়া বাপের বাড়িত কবেই চইলা যাইতাম...!’
আনিস জানে, সেতারা বেগমের এসব কথাবার্তাই একসময় অন্য এক বিপন্ন অনুভূতিতে বাঁক নেয়|
আনিস নৌকা চালিয়ে আরও দক্ষিণে গিয়ে থামল| এদিকে বিলে গোধূলির রং একেবারে মিইয়ে গিয়ে পুরোপুরি সন্ধ্যা নেমেছে| ধোঁয়া ওঠা সন্ধ্যা| দূরে পাড়ার বাড়িগুলো থেকে কুপির মিটমিট আলো আসছে| আজও গ্রামে বিদ্যুৎ নেই| আজকাল গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে|
আনিস সেতারা বেগমকে নিয়ে ভাবতে বসল| সেতারা বেগমের সেটা কি সত্যি বিপন্ন অনুভূতির বাঁক ছিল? হয়তো| হয়তো এজন্য যে, কবিতাকে ছাপিয়ে আজ পর্যন্ত কারও মন তাকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি| শরীর পেরেছে| সেতারা বেগম সেই ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম| সে তার মনকে অবশ্যই খানিকটা প্রলুব্ধ করতে পেরেছিল|
আনিসের মনে পড়ল, আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে সেতার বেগমকে সে প্রথম অন্যভাবে আবিষ্কার করে| সেটা এমনই এক বর্ষার মওসুম ছিল| সে কোথাও থেকে নৌকায় করে বাড়ি ফিরছিল| নিজেই নৌকাটা বাইছিল| বুইদ্দার খাল ধরে মনসুর পাগলার বাড়ির পাশ দিয়ে যেতেই সে দেখে, সেতারা বেগম বুইদ্দার খাল থেকে গোছল সেরে সবে আমগাছের তলায় গোপাটে উঠে দাঁড়িয়েছে| তখনও ভেজা শাড়িটা বদলায়নি| ব্লাউজবিহীন ভেজা শাড়িটা ল্যাপ্টে আছে শরীরে, উরুর সন্ধিস্থলে ও উঁচু বুকে| সেতারা বেগমের নাদুসনুদুস শরীরে বুকদুটো ছিল বেশ ভরাট| শ্যামলা চেহারায় চোখ দুটো ছিল মায়ায় ভরা| হাসত জোয়ারের জলের মতো খলবল করে|
আনিসের দৃষ্টি থেমে যায়| নৌকাটা থেমে যায় সঙ্গে সঙ্গে|
আনিসকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সেতারা বেগম প্রথমে বেশ লজ্জা পেয়ে যায়| কিন্তু নিজেকে সে গাছের আড়াল করে না| পরক্ষণ লজ্জা কাটিয়ে খলবল হেসে বলে, ‘এমুন কইরা তাকায়েন না| পাপ হইব যে আপনের|’
আনিস নিজে লজ্জা পেয়ে যায়| তাড়াতাড়ি যে ˆবঠা বাইতে শুরু করে|
সেতারা বেগম বলে ওঠে, ‘বুঝছি| ব্যাটা মাইনসের এমুন লাজ থাকলে হয়?’
আনিস সেতারা বেগমের কথাটা শুনেও না শোনার ভান করে সেখান থেকে নৌকাটা বেয়ে চলে যায়| একবার ফিরেও তাকায় না| কিন্তু বাড়ি ফিরে সে সেই দৃশ্যটা মন থেকে দূর করতে পারে না| মনকে ছাপিয়ে শরীরের চাহিদা বড্ড কঠিনভাবে ধরা দেয়| সে সন্ধ্যার পর কোনো কারণ ছাড়াই মনসুর পাগলাকে খুঁজতে তার বাড়িতে যায়|
কমলা খাতুন তখন ঘরের পিছদোরে কিছু একটা করছিল| সেতারা বেগম ঘরের সম্মুখ দুয়ারের সামনে দাওয়ায় বসে কাঁকুইতে চুল টানছিল| ঘরের ভেতর থেকে কুপির আলোয় তার ছায়াটা পড়ছিল দিঘল হয়ে|
আনিসকে দেখেই সেতারা বেগম বলে ওঠে, ‘ও, আপনে? আমি জানতাম আপনে আইবেন|’
সেতারা বেগমের এ কথা আনিসের গলা শুকিয়ে যায়| তারপরও সে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কেমনে জানতে?’
সেতারা বেগম একটা জটিল হাসি দিয়ে বলে, ‘ব্যাটা মানুষের চোখ দেখলেই আমরা মাইয়ারা বুঝি| দুপুর বেলা পালাইছিলেন ক্যান?’
আনিস খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলে, ‘আমি পালাইলাম কই?’
‘ওমা, কী কন| পালান নাই?’
‘না, পালাই নাই|’
‘আইচ্ছা, পালান নাই ভালা কথা| অখন আইছেন ক্যান?
‘মনসুর পাগলাকে খুঁজতে|’
‘আপনে ভালা কইরাই জানেন, হেয় অখন পুনোয়ারার বটতলায় মস্তানের দরগায়| গত দুইদিন ধইরা বাড়িতে আসে না|’
আনিস চোখ নামিয়ে বলে, ‘ও!’
সেতারা বেগম হেসে ওঠে, হিহি হিহি|
পিছদোর থাইকা কমলা খাতুন জিজ্ঞেস করে, ‘কেডা আইছে?’
সেতারা বেগম শঙ্কিত দৃষ্টি মেলে হাসি থামিয়ে বলে, ‘আনিস ভাই আইছে| আপনের পোলার খোঁজ নিতে|
কমলা খাতুন কিছু বলে না| পিছদোরে চুপ হয়ে যায়|
আনিস বলে, ‘আমি আসি|’
সেতারা বেগম বলে, ‘আইলেন তো সবে| অখনই চইলা যাইবেন? আরে কিছু কইবেন না?’- বলেই মুখ টিপে হাসে|
আনিস কিছু না বলেই সেখান থেকে চলে যায়|
সেদিন সন্ধ্যায় আনিস কিছু না বলে চলে গেলেও এর কয়েক দিন পর আরেক সন্ধ্যায় মনসুর পাগলার বাড়ির গোপাট লাগা উঁচু খড়ের মাড়ায় সে সেতারা বেগমকে নিজের শরীরের ভেতর আবিষ্কার করে| সেদিনও মনসুর পাগলা দরগায় গিয়ে পড়েছিল| তারপর কত রাত সে খাল পেরিয়ে সে সেতারা বেগমের কাছে যায়| সেতারা বেগমও বুইদ্দার খাল সাঁতরে ভেজা কাপড়ে তার লেখার ঘরে চলে এসেছে অনেকবার| মনসুর পাগলার দরগায় পড়ে থাকার আদতটা কোনোদিনও যায়নি| বৃদ্ধ শাশুড়ি সন্ধ্যার পরই ঝাঁপের ওপাশে পিছদোরে চাটাই বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে| একা ঘরে সেতারা বেগম কী করবে? শরীরের জ্বালা যে বড় জ্বালা...! ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
নয়
বিকেলের আলোটা আস্তে আস্তে মিইয়ে আসছে| সন্ধ্যা হতে এখনও খানিকটা বাকি| গোধূলির রঙিন আভা শ্রাবণের ছেঁড়া মেঘের সঙ্গে মিলে কেমন ঢেউয়ের নৃত্য করছে| পশ্চিম আকাশের পুরোটাতেই এখন রঙের ভাঁজ| বুইদ্দার বিলের স্থির জলের ওপর সেই আভার একটা হাল্কা প্রলেপ পড়েছে| আনিস এ মুহূর্তে মুগ্ধ হয়ে বিলের জলে আবীর আভার প্রলেপ দেখছি| যদিও তার মনটা বেশ বিক্ষিপ্ত|
আনিস বাড়ি ফিরেছে বেশ কতক্ষণ আগেই| সে আবদেল আলীর বাড়ি থেকে সরাসরি বাড়ি চলে এসেছে| তাদের বছরবাঁধা কামলা বশির নৌকা নিয়ে গিয়েছিল তাকে আনতে| আবদেল আলীর বৃদ্ধ বউ সফুরা বিবির কটাক্ষমূলক কথাগুলো সহ্য করতে না পেরে সে বশিরকে ফোন দিয়েছিল তাকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে| বশিরের একটা বোতামটেপা মোবাইল আছে| মা’র খবরাখবর নেওয়ার জন্য আনিসই তাকে কিনে দিয়েছে| সে মনসুর পাগলাকেও একটা বোতামটেপা মোবাইল কিনে দিয়েছিল| কিন্তু মনসুর পাগলা সেটা হারিয়ে ফেলেছে|
আনিস বাড়ি ফিরে তাদের দিঘল বারান্দাটায় একটা চেয়ার টেনে বসে বেশ কিছুক্ষণ চুপ হয়ে বসেছিল| তারপর সে কবিতার খাতাটা এনে ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজের সাত নম্বর কবিতাটা নিয়ে আবার বসে| সে একটা জিনিস সবসময় দেখেছে, তার যখন কোনো কারণে মন খারাপ থাকে তখন খাতা-কলম নিয়ে বসলে তার তরতর করে কবিতার পঙক্তি বের হয়| কলম যেন তখন আর থামতে চায় না|
আনিসের এই বিকেলেও তাই হয়েছে| সে কবিতার খাতাটা নিয়ে বসে ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজের সাত নম্বর কবিতাটির বাকি পঙক্তিগুলো টেনে লিখে ফেলেছে| আট নম্বর কবিতাও লিখতে শুরু করেছিল| এরই মধ্যে তার দৃষ্টি পড়ে পশ্চিমের আকাশে| বারান্দায় বসে পশ্চিমের আকাশটা পুরোপুরি দেখা যায় না বলে তখনই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে আসে| উঠোন পেরিয়ে দক্ষিণের গোপাটে নেমে আকাশটা দেখতে শুরু করে| তাদের বাড়ির দক্ষিণের গোপাটটা বেশ সরু| উঠোন থেকে গাছের মোটা মোটা শেকড় বেয়ে খানিকটা নেমে গেছে| গোপাটে দুটো গরু পাশাপাশি হাঁটতে পারে না| গোপাটের পর বিলের ধার ঘেঁষে সারি করা আমগাছ আর হিজল গাছ| একটা আমগাছের নিচে তাদের নৌকাটা বাঁধা|
আনিস আকাশ আর বিলের জলে আবীরের আভা দেখতে দেখতে কী ভেবে গোপাট ছেড়ে নৌকায় উঠে এল| নৌকাটা কেঁপে উঠল জলের কাঁপুনিতে| তার মোটেও পরিকল্পনা ছিল না, এ মুহূর্তে বাড়ি থেকে বের হওয়ার| এমনিতেই তার মনটা খুব বিক্ষিপ্ত| একদিকে মন ও মননের দোলচালে সে দ্বিধায় পড়ে আছে| মানুষের তির্যক দৃষ্টি তো আছেই| অন্যদিকে সেতারা বেগমের লাশ ও মনসুর পাগলাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা তার মনে বারবার হানা দিচ্ছে| মনসুর পাগলার পুলিশ থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য তার দিকে কী করুণ দৃষ্টিতেই না তাকিয়েছিল! সেতারা বেগমের গোমতীর বানে ডোবার কষ্টটা তো গত দু’দিন ধরেই সে বয়ে বেড়াচ্ছে| ছফুরা বিবির কটুকথাগুলোও তার কানে বাজছে বেশ|
আনিস আমগাছের গোড়া থেকে রশিটা ছাড়িয়ে নৌকার গলুতে বসে ˆবঠা ধরল| তাদের নৌকাটা কেড়াই নৌকা| অত বড় নয়, আবার কোসা নৌকার মতো এত ছোটও নয়| ছইয়ের নিচে আরাম করে শোয়া যায়| প্রতি শুক্রবারে স্কুলের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বশির যখন তাকে অনুতপুর থেকে আনতে যায়, তখন সে ছইয়ের নিচে হাতপা মেলে শোয়ে জলের দুলুনি অনুভব করে| গোমতীর ঢেউয়ের তালে তালে মৃদু দুলুনি, আহা! বর্ষার মওসুমে গোমতী নদীর ভরাটবানের অনুভূতিটা অন্যরকম ভয়ের| দুলুনিতে গায়ের লোম যেন খাঁড়া হয়ে যায়|
এখন অবশ্য বশিরকে আনিসের ডাকতে ইচ্ছে হলো না| সে বেশিদূর যাবেও না| এই তো কিছুক্ষণ বিলের জলে নৌকা বেয়ে পশ্চিম আকাশের গোধূলিটা আরও স্পষ্ট করে দেখবে| তারপর সন্ধ্যার অনুভূতিটা নিবে| বিলের ধানক্ষেতের ভেতর থেকে ব্যাঙের ডাক— ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, কটর কট| কোথাও বিলের জলে মাছের লেজ ঝাপটানো শব্দ— ছলাৎ ছলাৎ, ছলাৎ ছলাৎ| ধানক্ষেতে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দ— সড়সড়, সড়সড়| এছাড়া সন্ধ্যা ও রাতের একধরনের শব্দ আছে| সেই শব্দ যতটুকু না শোনা যায়, এর চেয়ে বেশি অনুভব করা যায়|
আনিস নৌকা বাইতে বাইতে বুইদ্দার বিলের দক্ষিণে খানিকটা ভেতরে চলে এল| তার দু’পাশে জলের ওপর মাথা উঁচু করা ধানগাছের ডগা| ধানগাছের ডগাগুলো এমনভাবে গায়ে গা লেগে দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে যেন কোনো যুবতীর কিঞ্চিৎ কালি রং ধারণ করা সবুজ চুল| গোধূলির আভায় যুবতী সেই চুল বিছিয়ে দিয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত সিঁথি কেটে| গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে গেছে সেই সিঁথিকাটা পথ| নৌকা চলে অহরহ|
আনিস আরও দক্ষিণে যেতেই দেখল, ধানক্ষেতের ভেতর এলোমেলো আরও চারটা নৌকা| এই নৌকাগুলো গৃহস্থের ছোট্ট ডিঙি নৌকা| ওরা এসেছে ধানী জমির ফাঁকে ফাঁকে টানা জাল পাততে| সন্ধ্যার এ সময় জাল পেতে ওরা ভোর-সকালে টেনে তোলে| বর্ষার মওসুমে গৃহস্থের খেতে-খামারে কাজ থাকে না| ওদের অনেকে বুইদ্দার বিলের ˆথথৈ জলে মাছ ধরে খোরাক জোগায়|
ধানী জমির ফাঁকে টানা জাল পাততে আসা একজন গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেডা, আনিস ভাই নাকি?’
আনিস দেখল, দক্ষিণ পাড়ার জয়নাল| বলল, ‘হ্যাঁ|’
‘এই সইন্ধ্যাবেলা কই যান?’
‘কোথাও না|’
‘কোথাও না, অথচ নাও লইয়া বাইর হইছেন?’
‘এমনিই| নৌকা বাইতে ইচ্ছে হলো তাই বের হয়েছি|’
জয়নাল বলল, ‘ও, আইচ্ছা| আপনে কবি মানুষ, কত ইচ্ছা হইবো|’ বলেই সে একটু থেমে কিছু একটা ভাবল| তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘আনিস ভাই, মনসুর পাগলার বউয়ের লাশ খুঁইজা পাওয়া গেছে, হেইডা জানেন তো?’
আনিস বলল, ‘হ্যাঁ, জানি|’
জয়নাল আবার জিজ্ঞেস করল, ‘মনসুর পাগলারে নাকি পুলিশে ধইরা লইয়া গেছে?’
আনিস একটু চুপ হয়ে গিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ|’
‘ক্যান ধইরা লইয়া গেছে?’
‘জানি না|’
‘ওমা, কী কন? আপনের দোস্তরে ধইরা লইয়া গেছে, অথচ আপনে জানেন না? আমি তো শুনছি হেয় তার বউরে নাকি গাঙে চুবাইয়া মারছে?’
আনিস মনে মনে বেশ বিরক্তিবোধ করল| সে আবার বলল, ‘জানি না|’ —বলেই সে জোরে নৌকা বাইতে শুরু করল| জয়নাল পেছন থেকে একটু জোর গলায় কিছু একটা বলল| কিন্তু সে শোনার চেষ্টা করল না| সে নৌকাটা টেনে বুইদ্দার বিলের আরো দক্ষিণে চলে এল|
বিলের এপাশটায় আরও ঘন ধানী জমি| এপাশটায় গৃহস্থের কোনো নৌকা নেই| যদিও সিঁথিকাটা নৌকা চলার পথটা চলে গেছে দূরে আরও দক্ষিণে রায়তলা গ্রাম অব্দি| পুবে কদমতলি গ্রাম| পশ্চিমে মীরবহরি| গোমতী নদীটা মোল্লাকান্দি পেরিয়ে বেঁকে মীরবহরি গ্রামে ঢুকেছে| মীরবহরি গ্রামের পরই অনুতপুর গ্রাম|
এদিকের সবগুলো গ্রামের মধ্যে অনুতপুর গ্রামটা বেশ সমৃদ্ধ| অনুতপুর গ্রামের পশ্চিমদিক দিয়ে একটা উঁচু মেঠোপথ চলে গেছে পাকা সড়কের দিকে| পথটা পুরোনো| এখন যদিও নতুন রাস্তার কাজ চলছে| মোল্লাকান্দি অব্দি রাস্তাটা এগিয়ে এসেছে| কিন্তু অনুতপুর গ্রামটা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই বেশ উন্নত ছিল| অনুতপুর গ্রামে একটা উচ্চবিদ্যালয়, একটা পোস্ট অফিস, একটা ব্যাংক ও একটা এনজিও অফিস আছে| একসময় জমিদার রাধারমণ দত্তের কাচারি ছিল সেখানে| সেই ব্রিটিশ আমলে জমিদার রাধারমণ দত্ত তাঁর বাবার নামে সেখানে সেই উচ্চবিদ্যালয়টা প্রতিষ্ঠা করেন| শ্রী কৃষ্ণচরণ দত্ত বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়| আনিস সেই স্কুলে নিজে লেখাপড়া করেছে| এখন সেখানে সে শিক্ষক|
সেতারা বেগমের বাপের বাড়িও সেই অনুতপুর গ্রামের পুবপাড়ায়| শ্রী কৃষ্ণচরণ দত্ত উচ্চবিদ্যালয় থেকে খুব বেশি দূরে নয়| গ্রামের ভেতর দিয়ে একটা সরু পথ, একটা বড় পুকুর ও কয়েকটা বাড়ি পেরোলেই সেতারা বেগমের বাপের বাড়ি| আনিস বেশ কয়েকবার সেই বাড়িতে গিয়েছে| মনসুর পাগলার সঙ্গে সেতারা বেগমের বিয়েটাও দিয়েছে নিজে ঘটকালি করে|
আনিস নিজে ঘটকালি করে বিয়ে দিয়েছে বলেই হয়তো সেতারা বেগমের মাঝেমধ্যে তার ওপর ক্ষোভটা একটু বেশি ঝাড়ত| অধিকারবোধটা খাটাত বেশি| দু’বার তো মনসুর পাগলার পাগলামি সহ্য করতে না পেরে সে বাপের বাড়ি চলে যায়| সংসার করবে না এমন কথাও তোলে| পরে মনসুর পাগলার হয়ে আনিস তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়ে আসে| সেসব কথা অবশ্য সেতারা বেগম ও মনসুর পাগলার বিয়ের প্রথমদিককার|
সেতারা বেগমের যে বিষয়টা আনিসকে এ মুহূর্তে ক্ষুধিত করছে সেটা হলো, ওরা দু’জন একসঙ্গে বেশ কয়েকবার এক নৌকায় আঁধারিয়া থেকে অনুতপুর, অনুতপুর থেকে আঁধারিয়া গ্রামে আসাযাওয়া করেছে| একবার তো তাদের নৌকায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়| সে রাতটা ছিল জ্যোৎস্নার রাত| আকাশে ছিল একাদশী চাঁদ| গোমতী নদীর বুকে রুপোলি জ্যোৎস্নার আলো সাদা চাদর বিছিয়ে দিয়েছিল| নৌকায় তাদের দু’জন বাদে বশির ছিল| তারপরও আনিস আবেগে সেতারা বেগমের হাতটা ধরে বলেছিল, ‘তুমি মনে রেখো, আমি তোমাকে এক কোটি জ্যোৎস্না দিয়ে কিনে নিলাম...!’
সেতারা বেগম ফিসফিস করে বলেছিল, ‘আমি আপনাগো কবিদের মতো ওইসব কথা বুঝি না| আমি হেই কথা বুঝি, আমি ব্যাপারি বাড়িত পইড়া আছি শুধু আপনের লাইগাই| নইলে...|’
‘নইলে কী?’
‘নইলে আপনের পাগলা দোস্তরে ছাইড়া বাপের বাড়িত কবেই চইলা যাইতাম...!’
আনিস জানে, সেতারা বেগমের এসব কথাবার্তাই একসময় অন্য এক বিপন্ন অনুভূতিতে বাঁক নেয়|
আনিস নৌকা চালিয়ে আরও দক্ষিণে গিয়ে থামল| এদিকে বিলে গোধূলির রং একেবারে মিইয়ে গিয়ে পুরোপুরি সন্ধ্যা নেমেছে| ধোঁয়া ওঠা সন্ধ্যা| দূরে পাড়ার বাড়িগুলো থেকে কুপির মিটমিট আলো আসছে| আজও গ্রামে বিদ্যুৎ নেই| আজকাল গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে|
আনিস সেতারা বেগমকে নিয়ে ভাবতে বসল| সেতারা বেগমের সেটা কি সত্যি বিপন্ন অনুভূতির বাঁক ছিল? হয়তো| হয়তো এজন্য যে, কবিতাকে ছাপিয়ে আজ পর্যন্ত কারও মন তাকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি| শরীর পেরেছে| সেতারা বেগম সেই ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম| সে তার মনকে অবশ্যই খানিকটা প্রলুব্ধ করতে পেরেছিল|
আনিসের মনে পড়ল, আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে সেতার বেগমকে সে প্রথম অন্যভাবে আবিষ্কার করে| সেটা এমনই এক বর্ষার মওসুম ছিল| সে কোথাও থেকে নৌকায় করে বাড়ি ফিরছিল| নিজেই নৌকাটা বাইছিল| বুইদ্দার খাল ধরে মনসুর পাগলার বাড়ির পাশ দিয়ে যেতেই সে দেখে, সেতারা বেগম বুইদ্দার খাল থেকে গোছল সেরে সবে আমগাছের তলায় গোপাটে উঠে দাঁড়িয়েছে| তখনও ভেজা শাড়িটা বদলায়নি| ব্লাউজবিহীন ভেজা শাড়িটা ল্যাপ্টে আছে শরীরে, উরুর সন্ধিস্থলে ও উঁচু বুকে| সেতারা বেগমের নাদুসনুদুস শরীরে বুকদুটো ছিল বেশ ভরাট| শ্যামলা চেহারায় চোখ দুটো ছিল মায়ায় ভরা| হাসত জোয়ারের জলের মতো খলবল করে|
আনিসের দৃষ্টি থেমে যায়| নৌকাটা থেমে যায় সঙ্গে সঙ্গে|
আনিসকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সেতারা বেগম প্রথমে বেশ লজ্জা পেয়ে যায়| কিন্তু নিজেকে সে গাছের আড়াল করে না| পরক্ষণ লজ্জা কাটিয়ে খলবল হেসে বলে, ‘এমুন কইরা তাকায়েন না| পাপ হইব যে আপনের|’
আনিস নিজে লজ্জা পেয়ে যায়| তাড়াতাড়ি যে ˆবঠা বাইতে শুরু করে|
সেতারা বেগম বলে ওঠে, ‘বুঝছি| ব্যাটা মাইনসের এমুন লাজ থাকলে হয়?’
আনিস সেতারা বেগমের কথাটা শুনেও না শোনার ভান করে সেখান থেকে নৌকাটা বেয়ে চলে যায়| একবার ফিরেও তাকায় না| কিন্তু বাড়ি ফিরে সে সেই দৃশ্যটা মন থেকে দূর করতে পারে না| মনকে ছাপিয়ে শরীরের চাহিদা বড্ড কঠিনভাবে ধরা দেয়| সে সন্ধ্যার পর কোনো কারণ ছাড়াই মনসুর পাগলাকে খুঁজতে তার বাড়িতে যায়|
কমলা খাতুন তখন ঘরের পিছদোরে কিছু একটা করছিল| সেতারা বেগম ঘরের সম্মুখ দুয়ারের সামনে দাওয়ায় বসে কাঁকুইতে চুল টানছিল| ঘরের ভেতর থেকে কুপির আলোয় তার ছায়াটা পড়ছিল দিঘল হয়ে|
আনিসকে দেখেই সেতারা বেগম বলে ওঠে, ‘ও, আপনে? আমি জানতাম আপনে আইবেন|’
সেতারা বেগমের এ কথা আনিসের গলা শুকিয়ে যায়| তারপরও সে জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কেমনে জানতে?’
সেতারা বেগম একটা জটিল হাসি দিয়ে বলে, ‘ব্যাটা মানুষের চোখ দেখলেই আমরা মাইয়ারা বুঝি| দুপুর বেলা পালাইছিলেন ক্যান?’
আনিস খানিকটা লজ্জা পেয়ে বলে, ‘আমি পালাইলাম কই?’
‘ওমা, কী কন| পালান নাই?’
‘না, পালাই নাই|’
‘আইচ্ছা, পালান নাই ভালা কথা| অখন আইছেন ক্যান?
‘মনসুর পাগলাকে খুঁজতে|’
‘আপনে ভালা কইরাই জানেন, হেয় অখন পুনোয়ারার বটতলায় মস্তানের দরগায়| গত দুইদিন ধইরা বাড়িতে আসে না|’
আনিস চোখ নামিয়ে বলে, ‘ও!’
সেতারা বেগম হেসে ওঠে, হিহি হিহি|
পিছদোর থাইকা কমলা খাতুন জিজ্ঞেস করে, ‘কেডা আইছে?’
সেতারা বেগম শঙ্কিত দৃষ্টি মেলে হাসি থামিয়ে বলে, ‘আনিস ভাই আইছে| আপনের পোলার খোঁজ নিতে|
কমলা খাতুন কিছু বলে না| পিছদোরে চুপ হয়ে যায়|
আনিস বলে, ‘আমি আসি|’
সেতারা বেগম বলে, ‘আইলেন তো সবে| অখনই চইলা যাইবেন? আরে কিছু কইবেন না?’- বলেই মুখ টিপে হাসে|
আনিস কিছু না বলেই সেখান থেকে চলে যায়|
সেদিন সন্ধ্যায় আনিস কিছু না বলে চলে গেলেও এর কয়েক দিন পর আরেক সন্ধ্যায় মনসুর পাগলার বাড়ির গোপাট লাগা উঁচু খড়ের মাড়ায় সে সেতারা বেগমকে নিজের শরীরের ভেতর আবিষ্কার করে| সেদিনও মনসুর পাগলা দরগায় গিয়ে পড়েছিল| তারপর কত রাত সে খাল পেরিয়ে সে সেতারা বেগমের কাছে যায়| সেতারা বেগমও বুইদ্দার খাল সাঁতরে ভেজা কাপড়ে তার লেখার ঘরে চলে এসেছে অনেকবার| মনসুর পাগলার দরগায় পড়ে থাকার আদতটা কোনোদিনও যায়নি| বৃদ্ধ শাশুড়ি সন্ধ্যার পরই ঝাঁপের ওপাশে পিছদোরে চাটাই বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে| একা ঘরে সেতারা বেগম কী করবে? শরীরের জ্বালা যে বড় জ্বালা...! ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন