পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যকার এই জোট কি আসলেই নতুন কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে? ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এমন দেশগুলোকে একত্রিত করেছে যারা ভৌগোলিকভাবে ইরান ও ইসরায়েলের মাঝখানে অবস্থিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারবে?
শুক্রবার (৭ আগস্ট) একটি ঐতিহাসিক ঘোষণার মাধ্যমে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এটি গত বছর রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে হওয়া একই ধরনের একটি চুক্তিরই বর্ধিত রূপ। তবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই চুক্তিটি ইসরায়েল এবং ইরান–উভয় দেশ সম্পর্কে সতর্ক থাকা দেশগুলোর মধ্যে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক জোটের সূচনা করতে পারে। স্বাক্ষরকারী দেশগুলো আঞ্চলিক হুমকির মুখে শক্তি ও ঐক্যের বার্তা দিতে চাইলেও, এই চুক্তিটিকে সরাসরি কোনো ‘প্রতিরোধক’ হিসেবে অভিহিত করার ক্ষেত্রে তারা সাবধানতা অবলম্বন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিনটি দেশই আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের উত্তেজিত না করার বিষয়ে সতর্ক। তবে এই চুক্তির ফলে কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো তাকে রক্ষা করতে বাধ্য কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অ্যাডভাইজরি ফার্ম ‘কিলওয়েন গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আলজাজিরাকে বলেন, “আমরা এখনো মক্কা ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ পাঠ দেখিনি। আমরা ধারণা করছি এতে বলা হয়েছে–একজনের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে ‘বিবেচনা করা উচিত’। এখানে ‘উচিত’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মানে এই নয় যে তারা ‘অবশ্যই’ যুদ্ধে জড়াবে।”
হুমকিগুলো মোটেও সুদূরপরাহত নয়। পাকিস্তান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে লিপ্ত এবং ২০২৫ সালের মে মাসে আরেক পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারতের সঙ্গে কয়েকদিন ধরে গোলাবিনিময় করেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে ইরান ও তার মিত্রদের নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছে। আর তুরস্ক বছরের পর বছর ধরে দেশের ভেতরে ও বাইরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গেও তাদের উত্তেজনা বাড়ছে।
উলম্যানের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মক্কা চুক্তি কীভাবে এই তিন দেশকে একে অপরের সংঘাতে টেনে আনবে তা এখনো অনিশ্চিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যদি ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালায়, তবে কি তুরস্ক বা পাকিস্তান তাতে হস্তক্ষেপ করবে? সেটা দেখার বিষয়।”
পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং পরবর্তীতে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পর মধ্যপ্রাচ্য চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দশকের হুমকি-ধমকি শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এই বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় এবং পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলো এখন নতুন পথ খুঁজছে।
অনেক দেশই অতীত বিভেদ ভুলে পারস্পরিক হুমকির মুখে বাস্তবমুখী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তুরস্ক ও সৌদি আরব এর বড় উদাহরণ। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। কিন্তু ২০২২ সাল নাগাদ তারা সেই তিক্ততা কাটিয়ে ওঠে। রিয়াদ তখন পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর কৌশল নেয় এবং আঙ্কারা নজর দেয় তাদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার দিকে।
ইসরায়েল ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজ নিজ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, যা পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ককে কাছাকাছি আসতে বাধ্য করেছে বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা
মক্কা চুক্তির লক্ষ্য হলো তিন দেশের যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আলজাজিরা প্রতিনিধি ওসামাহ বিন জাভেদ যেমনটি উল্লেখ করেছেন, প্রতিটি দেশই এই জোটে ভিন্ন ভিন্ন শক্তি যোগ করছে। তিনি বলেন, “পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধাভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, গোলাবারুদ এবং পারমাণবিক অস্ত্র। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হিসেবে বিশ্বমানের ড্রোন প্রযুক্তি ও উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে পারদর্শী। আর সৌদি আরব এই সবকিছুর পেছনে আর্থিক শক্তির যোগান দিচ্ছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় নতুন সামরিক জোটের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। সৌদি আরব এবং তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার মনে করত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিকল্প খুঁজছে দেশগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার, যা অন্য মিত্রদের রক্ষা করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
উলম্যান বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে মিত্রদের নিজেদের সুরক্ষা নিজেদেরই করতে হবে। আমাদের মিত্ররা এখন বিকল্প খুঁজছে।”
ইসরায়েল ও ইরান উভয়েই আঞ্চলিক হুমকি হয়ে উঠলেও মক্কা চুক্তির দেশগুলো একে সরাসরি কারও বিরুদ্ধে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখাতে চায় না। তবে ওসামাহ বিন জাভেদ বলেন, “এই তিন দেশের জন্য ইসরায়েলই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি। এরপরই রয়েছে ইরান।”
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি উদীয়মান ‘সুন্নি অক্ষ’-এর বিপদের কথা বলতে শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তার এই বক্তব্যই মূলত সুন্নি প্রধান দেশগুলোকে এক হতে বাধ্য করতে পারে।
নতুন সদস্যের সম্ভাবনা?
মিশর, কাতার, সিরিয়া বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশগুলো এই জোটে যোগ দেবে কি না তা এখনো অস্পষ্ট। সুন্নি প্রধান দেশগুলোর বিভক্তির কারণেই তারা ইসরায়েল বা ইরানের বিপদ মোকাবিলা করতে পারছে না বলে মনে করা হয়। তবে অতীত বিভেদ ও ভিন্ন স্বার্থের কারণে এই জোটের বিস্তার সহজ নাও হতে পারে।
সিরিয়া এখন যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠনে ব্যস্ত। ইসরায়েলের সীমান্তে অবস্থিত দেশ হিসেবে তারা এমন কোনো জোটে জড়াতে চাইবে না যা ইসরায়েলকে ক্ষুব্ধ করতে পারে। মিশরও দেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগী। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই সৌদি বা তুরস্কের থেকে আলাদা, বিশেষ করে ইয়েমেন যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার (আব্রাহাম অ্যাকর্ডস) ইস্যুতে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের মিত্রতাগুলো প্রায়ই পরিবর্তিত হয়। এই জোটের আসল পরীক্ষা হবে সংকটের সময়ে। ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের ময়দানে নামতে প্রস্তুত, কিন্তু পাকিস্তান, সৌদি আরব বা তুরস্ক কি একে অপরের জন্য সেই ঝুঁকি নিতে পারবে? আজকের মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি তাদের হয়তো দ্রুতই সেই সিদ্ধান্তের মুখোমুখি করবে। আর তখনই বোঝা যাবে এই ‘তৃতীয় শক্তি’ বা আঞ্চলিক অক্ষটি আসলে কতটা শক্তিশালী।
সূত্র : আলজাজিরা

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যকার এই জোট কি আসলেই নতুন কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে? ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এমন দেশগুলোকে একত্রিত করেছে যারা ভৌগোলিকভাবে ইরান ও ইসরায়েলের মাঝখানে অবস্থিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারবে?
শুক্রবার (৭ আগস্ট) একটি ঐতিহাসিক ঘোষণার মাধ্যমে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এটি গত বছর রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে হওয়া একই ধরনের একটি চুক্তিরই বর্ধিত রূপ। তবে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিত এই চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই চুক্তিটি ইসরায়েল এবং ইরান–উভয় দেশ সম্পর্কে সতর্ক থাকা দেশগুলোর মধ্যে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক জোটের সূচনা করতে পারে। স্বাক্ষরকারী দেশগুলো আঞ্চলিক হুমকির মুখে শক্তি ও ঐক্যের বার্তা দিতে চাইলেও, এই চুক্তিটিকে সরাসরি কোনো ‘প্রতিরোধক’ হিসেবে অভিহিত করার ক্ষেত্রে তারা সাবধানতা অবলম্বন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই তিনটি দেশই আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের উত্তেজিত না করার বিষয়ে সতর্ক। তবে এই চুক্তির ফলে কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো তাকে রক্ষা করতে বাধ্য কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অ্যাডভাইজরি ফার্ম ‘কিলওয়েন গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আলজাজিরাকে বলেন, “আমরা এখনো মক্কা ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ পাঠ দেখিনি। আমরা ধারণা করছি এতে বলা হয়েছে–একজনের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে ‘বিবেচনা করা উচিত’। এখানে ‘উচিত’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মানে এই নয় যে তারা ‘অবশ্যই’ যুদ্ধে জড়াবে।”
হুমকিগুলো মোটেও সুদূরপরাহত নয়। পাকিস্তান চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে লিপ্ত এবং ২০২৫ সালের মে মাসে আরেক পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারতের সঙ্গে কয়েকদিন ধরে গোলাবিনিময় করেছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে ইরান ও তার মিত্রদের নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছে। আর তুরস্ক বছরের পর বছর ধরে দেশের ভেতরে ও বাইরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গেও তাদের উত্তেজনা বাড়ছে।
উলম্যানের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মক্কা চুক্তি কীভাবে এই তিন দেশকে একে অপরের সংঘাতে টেনে আনবে তা এখনো অনিশ্চিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যদি ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালায়, তবে কি তুরস্ক বা পাকিস্তান তাতে হস্তক্ষেপ করবে? সেটা দেখার বিষয়।”
পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং পরবর্তীতে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পর মধ্যপ্রাচ্য চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দশকের হুমকি-ধমকি শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এই বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় এবং পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলো এখন নতুন পথ খুঁজছে।
অনেক দেশই অতীত বিভেদ ভুলে পারস্পরিক হুমকির মুখে বাস্তবমুখী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তুরস্ক ও সৌদি আরব এর বড় উদাহরণ। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। কিন্তু ২০২২ সাল নাগাদ তারা সেই তিক্ততা কাটিয়ে ওঠে। রিয়াদ তখন পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর কৌশল নেয় এবং আঙ্কারা নজর দেয় তাদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার দিকে।
ইসরায়েল ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজ নিজ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, যা পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ককে কাছাকাছি আসতে বাধ্য করেছে বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা
মক্কা চুক্তির লক্ষ্য হলো তিন দেশের যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আলজাজিরা প্রতিনিধি ওসামাহ বিন জাভেদ যেমনটি উল্লেখ করেছেন, প্রতিটি দেশই এই জোটে ভিন্ন ভিন্ন শক্তি যোগ করছে। তিনি বলেন, “পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধাভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, গোলাবারুদ এবং পারমাণবিক অস্ত্র। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হিসেবে বিশ্বমানের ড্রোন প্রযুক্তি ও উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে পারদর্শী। আর সৌদি আরব এই সবকিছুর পেছনে আর্থিক শক্তির যোগান দিচ্ছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় নতুন সামরিক জোটের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। সৌদি আরব এবং তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার মনে করত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিকল্প খুঁজছে দেশগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার, যা অন্য মিত্রদের রক্ষা করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
উলম্যান বলেন, “ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে মিত্রদের নিজেদের সুরক্ষা নিজেদেরই করতে হবে। আমাদের মিত্ররা এখন বিকল্প খুঁজছে।”
ইসরায়েল ও ইরান উভয়েই আঞ্চলিক হুমকি হয়ে উঠলেও মক্কা চুক্তির দেশগুলো একে সরাসরি কারও বিরুদ্ধে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখাতে চায় না। তবে ওসামাহ বিন জাভেদ বলেন, “এই তিন দেশের জন্য ইসরায়েলই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি। এরপরই রয়েছে ইরান।”
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি উদীয়মান ‘সুন্নি অক্ষ’-এর বিপদের কথা বলতে শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তার এই বক্তব্যই মূলত সুন্নি প্রধান দেশগুলোকে এক হতে বাধ্য করতে পারে।
নতুন সদস্যের সম্ভাবনা?
মিশর, কাতার, সিরিয়া বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশগুলো এই জোটে যোগ দেবে কি না তা এখনো অস্পষ্ট। সুন্নি প্রধান দেশগুলোর বিভক্তির কারণেই তারা ইসরায়েল বা ইরানের বিপদ মোকাবিলা করতে পারছে না বলে মনে করা হয়। তবে অতীত বিভেদ ও ভিন্ন স্বার্থের কারণে এই জোটের বিস্তার সহজ নাও হতে পারে।
সিরিয়া এখন যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠনে ব্যস্ত। ইসরায়েলের সীমান্তে অবস্থিত দেশ হিসেবে তারা এমন কোনো জোটে জড়াতে চাইবে না যা ইসরায়েলকে ক্ষুব্ধ করতে পারে। মিশরও দেশের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগী। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই সৌদি বা তুরস্কের থেকে আলাদা, বিশেষ করে ইয়েমেন যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার (আব্রাহাম অ্যাকর্ডস) ইস্যুতে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের মিত্রতাগুলো প্রায়ই পরিবর্তিত হয়। এই জোটের আসল পরীক্ষা হবে সংকটের সময়ে। ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের ময়দানে নামতে প্রস্তুত, কিন্তু পাকিস্তান, সৌদি আরব বা তুরস্ক কি একে অপরের জন্য সেই ঝুঁকি নিতে পারবে? আজকের মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি তাদের হয়তো দ্রুতই সেই সিদ্ধান্তের মুখোমুখি করবে। আর তখনই বোঝা যাবে এই ‘তৃতীয় শক্তি’ বা আঞ্চলিক অক্ষটি আসলে কতটা শক্তিশালী।
সূত্র : আলজাজিরা

আপনার মতামত লিখুন