বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘদিনের সমঝোতা ও চুক্তিগুলো যখন নতুন করে পর্যালোচনার টেবিলে, তখনই ঢাকাকে পাল্টা কূটনৈতিক বার্তা দিল নয়াদিল্লি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পুনর্বিবেচনার ঘোষণা আসার পর ভারত স্পষ্ট করে জানিয়েছে–চুক্তিগুলোতে পরিবর্তন বা সংশোধনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে তারা। ফলে বিষয়টি এখন শুধু পুরনো চুক্তি পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে দুই দেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছিলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও এমওইউ পর্যালোচনা করছে সরকার এবং খুব শিগগিরই তার ফলাফল সামনে আসবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন চুক্তির শর্ত নিয়েও পর্যালোচনা চলছে বলে তিনি জানান। তার বক্তব্য ছিল–ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ঢাকা, কিন্তু জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এর পাঁচ দিনের মাথায়, ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে ভারত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখেছে, কিন্তু ঢাকার কাছ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ পায়নি। তার বক্তব্য–বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলে ভারত নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
এই অবস্থায় মূল প্রশ্ন উঠছে–১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা শেষ পর্যন্ত কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে? শুধু বন্দর ব্যবহার, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ বা অবকাঠামো সহযোগিতার শর্ত বদলাবে, নাকি এর প্রভাব পড়বে দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কেও? কারণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো নিরাপত্তা ও সীমান্ত সহযোগিতা। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে অতীতে যে নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল এবং বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটি ভবিষ্যতেও একইভাবে কার্যকর থাকবে কি না–এটি নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
আরও একটি বড় প্রশ্ন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের পরিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একইভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও সহযোগিতা কোন পর্যায়ে এগোয়, সেটিও আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে বন্দর, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত যোগাযোগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে ঢাকা যদি একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করে, তাহলে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সমীকরণের ওপর তার প্রভাব কী হবে–এটি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার বিষয়।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন–১৮ সেপ্টেম্বরের সরকারি ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সওয়াল প্রকাশ্যে চীন বা পাকিস্তান সম্পর্কে বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্ন করেননি। তাই চীন-পাকিস্তান সম্পর্ককে ভারতের আনুষ্ঠানিক শর্ত বা প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। বরং ১০১টি চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে কৌশলগত পর্যবেক্ষণ হিসেবে বিষয়গুলোকে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের অবস্থানও এই মুহূর্তে যথেষ্ট স্পষ্ট–ঢাকা বলছে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনার ঘোষণা এখনো কোনো চূড়ান্ত বাতিলের সিদ্ধান্ত নয়; কোন চুক্তি সংশোধন হবে, কোনটি বহাল থাকবে কিংবা কোনটির শর্ত পরিবর্তন হতে পারে–তা পর্যালোচনার ফল প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।
এর পাশাপাশি সামনে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা–১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি। ৩০ বছরের এই চুক্তির বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের বিদ্যমান যৌথ কাঠামো ও কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ ১০১টি চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও পানি ইস্যুতে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের পথ এখনো চালু রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে। ঢাকার কাছে প্রশ্ন শুধু কোন চুক্তি দেশের স্বার্থে, আর কোনটি নয়–তার পাশাপাশি ভবিষ্যতের আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর নয়াদিল্লির বার্তা বলছে, চুক্তির পরিবর্তন হলে ভারতও তার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানাবে। ফলে আগামী দিনে ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনার ফল শুধু কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পরবর্তী কূটনৈতিক কাঠামোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হয়ে উঠতে পারে।
/

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘদিনের সমঝোতা ও চুক্তিগুলো যখন নতুন করে পর্যালোচনার টেবিলে, তখনই ঢাকাকে পাল্টা কূটনৈতিক বার্তা দিল নয়াদিল্লি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পুনর্বিবেচনার ঘোষণা আসার পর ভারত স্পষ্ট করে জানিয়েছে–চুক্তিগুলোতে পরিবর্তন বা সংশোধনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে তারা। ফলে বিষয়টি এখন শুধু পুরনো চুক্তি পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে দুই দেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছিলেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও এমওইউ পর্যালোচনা করছে সরকার এবং খুব শিগগিরই তার ফলাফল সামনে আসবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন চুক্তির শর্ত নিয়েও পর্যালোচনা চলছে বলে তিনি জানান। তার বক্তব্য ছিল–ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ঢাকা, কিন্তু জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এর পাঁচ দিনের মাথায়, ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে ভারত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখেছে, কিন্তু ঢাকার কাছ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ পায়নি। তার বক্তব্য–বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলে ভারত নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
এই অবস্থায় মূল প্রশ্ন উঠছে–১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা শেষ পর্যন্ত কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে? শুধু বন্দর ব্যবহার, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ বা অবকাঠামো সহযোগিতার শর্ত বদলাবে, নাকি এর প্রভাব পড়বে দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কেও? কারণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো নিরাপত্তা ও সীমান্ত সহযোগিতা। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে অতীতে যে নিরাপত্তা উদ্বেগ ছিল এবং বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার যে কাঠামো তৈরি হয়েছে, সেটি ভবিষ্যতেও একইভাবে কার্যকর থাকবে কি না–এটি নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
আরও একটি বড় প্রশ্ন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের পরিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একইভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ও সহযোগিতা কোন পর্যায়ে এগোয়, সেটিও আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে বন্দর, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত যোগাযোগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে ঢাকা যদি একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করে, তাহলে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান সমীকরণের ওপর তার প্রভাব কী হবে–এটি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার বিষয়।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন–১৮ সেপ্টেম্বরের সরকারি ব্রিফিংয়ে রণধীর জয়সওয়াল প্রকাশ্যে চীন বা পাকিস্তান সম্পর্কে বাংলাদেশকে কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্ন করেননি। তাই চীন-পাকিস্তান সম্পর্ককে ভারতের আনুষ্ঠানিক শর্ত বা প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। বরং ১০১টি চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে কৌশলগত পর্যবেক্ষণ হিসেবে বিষয়গুলোকে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের অবস্থানও এই মুহূর্তে যথেষ্ট স্পষ্ট–ঢাকা বলছে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনার ঘোষণা এখনো কোনো চূড়ান্ত বাতিলের সিদ্ধান্ত নয়; কোন চুক্তি সংশোধন হবে, কোনটি বহাল থাকবে কিংবা কোনটির শর্ত পরিবর্তন হতে পারে–তা পর্যালোচনার ফল প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে।
এর পাশাপাশি সামনে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা–১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি। ৩০ বছরের এই চুক্তির বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের বিদ্যমান যৌথ কাঠামো ও কারিগরি পর্যায়ের বৈঠক অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ ১০১টি চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও পানি ইস্যুতে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের পথ এখনো চালু রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে। ঢাকার কাছে প্রশ্ন শুধু কোন চুক্তি দেশের স্বার্থে, আর কোনটি নয়–তার পাশাপাশি ভবিষ্যতের আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর নয়াদিল্লির বার্তা বলছে, চুক্তির পরিবর্তন হলে ভারতও তার জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া জানাবে। ফলে আগামী দিনে ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনার ফল শুধু কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের পরবর্তী কূটনৈতিক কাঠামোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হয়ে উঠতে পারে।
/

আপনার মতামত লিখুন