বর্ষা আর রবীন্দ্রনাথ–এই দুই নাম যেন একই অনুভূতির এপিঠ-ওপিঠ। মেঘলা আকাশ, ঝরঝর শ্রাবণ ধারা আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে লুকিয়ে থাকা চিরন্তন এক শূন্যতাকে সঙ্গী করে আজ ফিরে এসেছে ২২ শ্রাবণ। আশি বছর আগে, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই বর্ষাস্নাত দিনেই কলকাতার জোড়াসাঁকোর পৈতৃক বাসভবনে জীবনের পরপারে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের রবি–বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ তার ৮৫তম প্রয়াণ দিবস। মহাকালের আবর্তে ৮৫টি বছর পার হয়ে গেলেও বাঙালির হৃদয়ে তিনি এতটুকু পুরোনো হননি। জীবনের অনাবিল আনন্দ, গভীর বেদনা, বিরহ-মিলন কিংবা প্রার্থনা–মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিচ্ছবির প্রতিটি নিবিড় কোণে আজও তিনি একইভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ এমন এক অফুরন্ত ঝরনাধারা, যার অবগাহনে বাঙালি প্রতিদিন নতুন করে নিজের অস্তিত্ব ও বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয় খুঁজে পায়।
আট বছর বয়সে যে বালক কলম ধরেছিলেন, কালক্রমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক মহীরুহ। সাহিত্য ও শিল্পের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তার সফল পদচারণা ঘটেনি। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী ও চিত্রকলার সীমানা ছাড়িয়ে তার সৃষ্ট রবীন্দ্রসংগীত বাঙালি জীবনের আবহমান জীবনের সঙ্গী। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে তিনি এনে দিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতা।
শুধু লেখনীতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি কবিগুরু; জমিদারি তদারকির সুবাদে শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরের সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে গঠন করেছিলেন সমবায় ব্যাংক, চালু করেছিলেন কৃষিঋণ ব্যবস্থা এবং পল্লী পুনর্গঠনে গ্রহণ করেছিলেন বৈপ্লবিক উদ্যোগ। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বিশ্বভারতী’র মতো ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। অন্যায় ও ব্রিটিশ শাসকদের নির্মমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দ্বিধাহীনচিত্তে ত্যাগ করেছিলেন রাজকীয় ‘নাইটহুড’ খেতাব।
মৃত্যুকে রবীন্দ্রনাথ কখনোই জীবনের শেষ হিসেবে দেখেননি; তার দর্শন অনুযায়ী মৃত্যু হলো এক রূপান্তর, অনন্তর সাথে মহাজাগতিক মিলন। জোড়াসাঁকোর অভিজাত পরিবারে জন্ম নিলেও নিসর্গ আর সাধারণ মানুষের সাথে তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন নিজের আত্মাকে। আজ শুধু প্রথাগত স্মৃতি তর্পণের দিন নয়; বরং তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবতাবাদ ও কালজয়ী দর্শনকে নতুন করে বুকে ধারণ করার দিন।
বিশ্বকবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এবং ভারতের শান্তিনিকেতন ও জোড়াসাঁকোয় গ্রহণ করা হয়েছে নানা সংস্কৃতিবান্ধব কর্মসূচি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, ছায়ানট এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে প্রয়াণ স্মারক আলোচনা সভা, রবীন্দ্রসংগীত অনুষ্ঠান, আবৃত্তি ও নাটক। আজকের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ও জটিল পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি আমাদের জোগায় আত্মিক শান্তি ও পথচলার প্রজ্ঞা। শ্রাবণের এই সিক্ত প্রভাতে বিশ্বকবির চিরভাস্বর স্মৃতির প্রতি রইল অমলিন ও বিনম্র শ্রদ্ধা।
/

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
বর্ষা আর রবীন্দ্রনাথ–এই দুই নাম যেন একই অনুভূতির এপিঠ-ওপিঠ। মেঘলা আকাশ, ঝরঝর শ্রাবণ ধারা আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধে লুকিয়ে থাকা চিরন্তন এক শূন্যতাকে সঙ্গী করে আজ ফিরে এসেছে ২২ শ্রাবণ। আশি বছর আগে, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই বর্ষাস্নাত দিনেই কলকাতার জোড়াসাঁকোর পৈতৃক বাসভবনে জীবনের পরপারে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের রবি–বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ তার ৮৫তম প্রয়াণ দিবস। মহাকালের আবর্তে ৮৫টি বছর পার হয়ে গেলেও বাঙালির হৃদয়ে তিনি এতটুকু পুরোনো হননি। জীবনের অনাবিল আনন্দ, গভীর বেদনা, বিরহ-মিলন কিংবা প্রার্থনা–মানুষের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিচ্ছবির প্রতিটি নিবিড় কোণে আজও তিনি একইভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ এমন এক অফুরন্ত ঝরনাধারা, যার অবগাহনে বাঙালি প্রতিদিন নতুন করে নিজের অস্তিত্ব ও বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয় খুঁজে পায়।
আট বছর বয়সে যে বালক কলম ধরেছিলেন, কালক্রমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক মহীরুহ। সাহিত্য ও শিল্পের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তার সফল পদচারণা ঘটেনি। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী ও চিত্রকলার সীমানা ছাড়িয়ে তার সৃষ্ট রবীন্দ্রসংগীত বাঙালি জীবনের আবহমান জীবনের সঙ্গী। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে তিনি এনে দিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতা।
শুধু লেখনীতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি কবিগুরু; জমিদারি তদারকির সুবাদে শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরের সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে গঠন করেছিলেন সমবায় ব্যাংক, চালু করেছিলেন কৃষিঋণ ব্যবস্থা এবং পল্লী পুনর্গঠনে গ্রহণ করেছিলেন বৈপ্লবিক উদ্যোগ। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বিশ্বভারতী’র মতো ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। অন্যায় ও ব্রিটিশ শাসকদের নির্মমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দ্বিধাহীনচিত্তে ত্যাগ করেছিলেন রাজকীয় ‘নাইটহুড’ খেতাব।
মৃত্যুকে রবীন্দ্রনাথ কখনোই জীবনের শেষ হিসেবে দেখেননি; তার দর্শন অনুযায়ী মৃত্যু হলো এক রূপান্তর, অনন্তর সাথে মহাজাগতিক মিলন। জোড়াসাঁকোর অভিজাত পরিবারে জন্ম নিলেও নিসর্গ আর সাধারণ মানুষের সাথে তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন নিজের আত্মাকে। আজ শুধু প্রথাগত স্মৃতি তর্পণের দিন নয়; বরং তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবতাবাদ ও কালজয়ী দর্শনকে নতুন করে বুকে ধারণ করার দিন।
বিশ্বকবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এবং ভারতের শান্তিনিকেতন ও জোড়াসাঁকোয় গ্রহণ করা হয়েছে নানা সংস্কৃতিবান্ধব কর্মসূচি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, ছায়ানট এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে প্রয়াণ স্মারক আলোচনা সভা, রবীন্দ্রসংগীত অনুষ্ঠান, আবৃত্তি ও নাটক। আজকের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ও জটিল পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি আমাদের জোগায় আত্মিক শান্তি ও পথচলার প্রজ্ঞা। শ্রাবণের এই সিক্ত প্রভাতে বিশ্বকবির চিরভাস্বর স্মৃতির প্রতি রইল অমলিন ও বিনম্র শ্রদ্ধা।
/

আপনার মতামত লিখুন