অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে পাড়ি দিয়েছিলেন প্রবাসে। রাশিয়ায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজের কথা বলে যোগ দিতে হয় যুদ্ধে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলার শিকার হয়ে কোমরের নিচ থেকে শক্তি হারান রাজন। চারদিন চার কিলোমিটার পথ বুক দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে রাশিয়ার এক চিকিৎসকের সহায়তায় দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন।
রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধে অংশ নিয়ে ড্রোন হামলায় আহত হয়ে সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গয়েশপুর গ্রামে ফিরে আসা রাজন হোসেন (২২) এভাবেই বলছিলেন তার প্রতারিত হওয়ার গল্প।
দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত এখন রাজনের পরিবার। রাজন গয়েশপুর গ্রামের আব্দুল কাদের কালুর ছেলে। তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের ৭ মে বাংলাদেশ থেকে মস্কো বিমানবন্দরে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ৩০ বাংলাদেশিকে বাসে করে মস্কো থেকে ওয়ারেনবার্গ নিয়ে যায়। সেখানে হোটেলে ৩/৪ দিন রাখে আমাদের।
রাজন বলেন, ‘ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ডের কথা বলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এরপর কাজের কথা বলে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে। সেখানে আমাদের একদিন রাখে। আমরা বুঝতে পেরে সেখানে আমরা যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানাই।’
সেই মুহূর্তের কথা উল্লেখ করে রাজন বলেন, ‘ঈগর ও জুলিয়া নামে রাশিয়ার কোম্পানির দুইজনকে আমরা ৩০ জন পা জড়িয়ে ধরি। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে একটা বাংকারে রাখে। এরপর সেখানে ১ ঘণ্টা রাখার পর আমাদের ভাগ করে ফেলে। ’
রাজন সেখানে ৬ জনের একটি গ্রুপে ছিলেন। পরে তাদের রাশিয়া সেনাবাহিনীর পোশাক, অস্ত্রসহ যুদ্ধের সবকিছু দেওয়া হয়। ২১ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়। সেই যুদ্ধের ময়দানের পরিস্থিতি তুলে ধরে রাজন জানান, প্রথম দিনেই ১৭ জন বাংলাদেশি ড্রোন হামলায় মারা যায়। ওইদিনই একটি ড্রোন তার কোমর বরাবর আঘাত করলে তিনি মাঠিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর কোমরের নিচ থেকে আর শক্তি পাচ্ছিলেন না। উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ছিল না।
রাজন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘চারদিন চার কিলোমিটার পথ বুকে ভর দিয়ে অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে যাই। এর মধ্যে দুইজন রাশিয়ার সেনার কাছে পানি চাইলেও তারা দেয়নি। বরং ফিরে আসায় ক্যাম্পের কমান্ডার মারধর করেছে। উপরে ড্রোন, নিচে মাইন আর সামনে ইউক্রেনের সেনা। কি যে ভয়াবহ অবস্থা বলে বোঝানো যাবে না।
রাজন বলেন, ‘সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা একদমই ভালো ছিল না। এরপর রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ দিন একজন ডাক্তার তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যায়। এরপর ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে পরিবার থেকে ৬২ হাজার রুবল পাঠানোর পর টিকিট কেটে ইথুপিয়া এয়ারলাইন্সে বাংলাদেশে আসেন।
রাজন বলেন, ‘বাংলাদেশের জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সি আমাদের রাশিয়ার পুরো টেকনোলজির কাছে পাঠায়।
রাজনের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, ‘ধারদেনা করে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম একতারপুর গ্রামের লেন্টু হোসেনের কাছে। ৩ বছর ঘুরিয়ে গত মে মাসে শ্রমিকের কাজের কথা বলে আমার ছেলেকে প্রতারণা করে রাশিয়ায় যুদ্ধে পাঠায়। আমার ছেলে যুদ্ধে আঘাত পেয়ে দেশে ফিরেছে। ছেলেকে চিকিৎসা করাবো সেই অর্থ এখন আমার কাছে নেই। আমার ছেলের সঙ্গে যারা এমন কাজ করেছে তাদের শাস্তি চাই।’
রাজনের পরিবার
রাজনের মা মাহফুজ বেগম বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারের অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বিদেশে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই সুস্থ ছেলে এখন হাঁটতে পারে না। পরের কাছে সাহায্য চেয়ে এখন দিন চলছে। কীভাবে সংসার চালাবো সেই দুশ্চিন্তায় আছি।’কলেজ শিক্ষক মুসা করিম বলেন, ‘ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন আব্দুল কাদের। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে পরিবারটি। খুবই অসহায় হয়ে পড়েছে। এসব দালালদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’
দালাল আবু তাহের লেন্টু বলেন, ‘আমার ভাগ্নে সোহেলের মাধ্যমে রাজনকে পাঠানো হয়েছিল। তিনি কোনো প্রতারণা করা হয়নি। রাজনকে সরকারিভাবে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে যেন কেউ এমন প্রতারণার শিকার না হয় সে ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এছাড়া রাশিয়া থেকে ফিরে আসা রাজনের পাশে উপজেলা প্রশাসন থাকবে বলেও জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ আগস্ট ২০২৬
অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে পাড়ি দিয়েছিলেন প্রবাসে। রাশিয়ায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজের কথা বলে যোগ দিতে হয় যুদ্ধে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলার শিকার হয়ে কোমরের নিচ থেকে শক্তি হারান রাজন। চারদিন চার কিলোমিটার পথ বুক দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের হাসপাতালে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে রাশিয়ার এক চিকিৎসকের সহায়তায় দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন।
রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধে অংশ নিয়ে ড্রোন হামলায় আহত হয়ে সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গয়েশপুর গ্রামে ফিরে আসা রাজন হোসেন (২২) এভাবেই বলছিলেন তার প্রতারিত হওয়ার গল্প।
দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত এখন রাজনের পরিবার। রাজন গয়েশপুর গ্রামের আব্দুল কাদের কালুর ছেলে। তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের ৭ মে বাংলাদেশ থেকে মস্কো বিমানবন্দরে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ৩০ বাংলাদেশিকে বাসে করে মস্কো থেকে ওয়ারেনবার্গ নিয়ে যায়। সেখানে হোটেলে ৩/৪ দিন রাখে আমাদের।
রাজন বলেন, ‘ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ডের কথা বলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। এরপর কাজের কথা বলে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে। সেখানে আমাদের একদিন রাখে। আমরা বুঝতে পেরে সেখানে আমরা যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানাই।’
সেই মুহূর্তের কথা উল্লেখ করে রাজন বলেন, ‘ঈগর ও জুলিয়া নামে রাশিয়ার কোম্পানির দুইজনকে আমরা ৩০ জন পা জড়িয়ে ধরি। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে একটা বাংকারে রাখে। এরপর সেখানে ১ ঘণ্টা রাখার পর আমাদের ভাগ করে ফেলে। ’
রাজন সেখানে ৬ জনের একটি গ্রুপে ছিলেন। পরে তাদের রাশিয়া সেনাবাহিনীর পোশাক, অস্ত্রসহ যুদ্ধের সবকিছু দেওয়া হয়। ২১ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর ফ্রন্ট লাইনে যুদ্ধ করতে পাঠানো হয়। সেই যুদ্ধের ময়দানের পরিস্থিতি তুলে ধরে রাজন জানান, প্রথম দিনেই ১৭ জন বাংলাদেশি ড্রোন হামলায় মারা যায়। ওইদিনই একটি ড্রোন তার কোমর বরাবর আঘাত করলে তিনি মাঠিতে লুটিয়ে পড়েন। এরপর কোমরের নিচ থেকে আর শক্তি পাচ্ছিলেন না। উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ছিল না।
রাজন ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘চারদিন চার কিলোমিটার পথ বুকে ভর দিয়ে অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে যাই। এর মধ্যে দুইজন রাশিয়ার সেনার কাছে পানি চাইলেও তারা দেয়নি। বরং ফিরে আসায় ক্যাম্পের কমান্ডার মারধর করেছে। উপরে ড্রোন, নিচে মাইন আর সামনে ইউক্রেনের সেনা। কি যে ভয়াবহ অবস্থা বলে বোঝানো যাবে না।
রাজন বলেন, ‘সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা একদমই ভালো ছিল না। এরপর রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ দিন একজন ডাক্তার তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যায়। এরপর ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে পরিবার থেকে ৬২ হাজার রুবল পাঠানোর পর টিকিট কেটে ইথুপিয়া এয়ারলাইন্সে বাংলাদেশে আসেন।
রাজন বলেন, ‘বাংলাদেশের জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সি আমাদের রাশিয়ার পুরো টেকনোলজির কাছে পাঠায়।
রাজনের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, ‘ধারদেনা করে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম একতারপুর গ্রামের লেন্টু হোসেনের কাছে। ৩ বছর ঘুরিয়ে গত মে মাসে শ্রমিকের কাজের কথা বলে আমার ছেলেকে প্রতারণা করে রাশিয়ায় যুদ্ধে পাঠায়। আমার ছেলে যুদ্ধে আঘাত পেয়ে দেশে ফিরেছে। ছেলেকে চিকিৎসা করাবো সেই অর্থ এখন আমার কাছে নেই। আমার ছেলের সঙ্গে যারা এমন কাজ করেছে তাদের শাস্তি চাই।’
রাজনের পরিবার
রাজনের মা মাহফুজ বেগম বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারের অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বিদেশে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সেই সুস্থ ছেলে এখন হাঁটতে পারে না। পরের কাছে সাহায্য চেয়ে এখন দিন চলছে। কীভাবে সংসার চালাবো সেই দুশ্চিন্তায় আছি।’কলেজ শিক্ষক মুসা করিম বলেন, ‘ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন আব্দুল কাদের। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে পরিবারটি। খুবই অসহায় হয়ে পড়েছে। এসব দালালদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’
দালাল আবু তাহের লেন্টু বলেন, ‘আমার ভাগ্নে সোহেলের মাধ্যমে রাজনকে পাঠানো হয়েছিল। তিনি কোনো প্রতারণা করা হয়নি। রাজনকে সরকারিভাবে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে যেন কেউ এমন প্রতারণার শিকার না হয় সে ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এছাড়া রাশিয়া থেকে ফিরে আসা রাজনের পাশে উপজেলা প্রশাসন থাকবে বলেও জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন