সংবাদ

হিমালয়ে বৃষ্টি ছাড়াই ভয়ংকর ঢল, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৪ পিএম

হিমালয়ে বৃষ্টি ছাড়াই ভয়ংকর ঢল, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা
ছবি: সংগৃহীত

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কয়েক মিনিটের মধ্যে পাহাড়ি নদী পরিণত হলো কাদা, পাথর, বরফ ও পানির উন্মত্ত স্রোতে। প্রথমে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও নতুন বিশ্লেষণে সামনে আসছে হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ার তথ্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন ঘটনা আগে থেকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।

নেপালের রসুয়া জেলার মানুষ বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বরং আবহাওয়া ছিল তুলনামূলক শান্ত। কিন্তু হঠাৎ পাহাড়ের দিক থেকে নেমে এল এমন এক স্রোত, যার মধ্যে শুধু পানি ছিল না- ছিল কাদা, পাথর, বরফ ও পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেল সড়ক, সেতু, যানবাহন, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে; সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন।

এটি সাধারণ পাহাড়ি বন্যা ছিল না। বরং বিজ্ঞানীদের ভাষায়, বরফ-পাথরের ধস, নদী আটকে যাওয়া এবং সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় তৈরি হওয়া এক ভয়ংকর ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা।

ভূমিকম্প, নাকি ভূমিধস: ঘটনার পর প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।

কিন্তু পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা-ইউএসজিএস-তথ্য বিশ্লেষণ করে অবস্থান বদলায়। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে সিসমিক সংকেতকে প্রথমে ভূমিকম্প মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে ভূমিধসের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়া ও বরফ-পাথরের ধসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ভাসিয়ে নিয়ে গেল সবকিছু

অর্থাৎ আপাতত চিত্রটি অনেকটা এমন- প্রথমত, হিমবাহের অংশ ভাঙল।  তারপর বরফ ও পাথর নিচে পড়ল। নদীর প্রবাহ আটকে গেল। এরপর পানি জমল। তারপর প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেল। গোটা প্রক্রিয়া শেষে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নিচে নেমে এল।

আইসিএমওডি-এর প্রাথমিক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, একটি পাথর ও বরফ ধস লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়ে এই বিপর্যয় ঘটিয়ে থাকতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত ভয়ংকর হলো কেন?

বাংলাদেশে বন্যা বলতে আমরা সাধারণত পানি বাড়তে থাকা বুঝি। নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়ে, মানুষ সময় পায় ঘর ছাড়ার, গবাদিপশু সরানোর কিংবা উঁচু জায়গায় যাওয়ার। তবে হিমালয়ের পাহাড়ি ঢল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

পাহাড়ের ঢাল খাড়া। ফলে ওপরের বিপুল পানি দ্রুত নিচের দিকে ছুটে আসে। তার সঙ্গে যদি মিশে যায় পাহাড়ের পাথর, বালি, মাটি ও বরফ, তখন সেটি আর সাধারণ পানির স্রোত থাকে না। হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঘন ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ- পানি ও ধ্বংসাবশেষের এমন এক প্রবাহ, যার আঘাত অনেকটা তরল কংক্রিটের মতো।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফ এ কারণেই বলেছেন, এমন স্রোত সামনে থেকে দেখা গেলে দৌড়ে পালানো বা গাড়িতে করে সরে যাওয়ার সুযোগও খুব কম। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত উঁচু জায়গায় উঠে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর আত্মরক্ষার উপায়।

বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও গবেষক তানভীর হোসেনও তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে বরফ, পাথর, পানি ও মহাকর্ষের সম্মিলিত শক্তির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার ব্যাখ্যায়, নদীর ওপর অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়ে সেটি ভেঙে গেলে আটকে থাকা পানি একই সঙ্গে নিচে নেমে এসে ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক স্রোত তৈরি করতে পারে।

বরফ, পানি আর শিলাপাথরের প্রবাহ

বৃষ্টি ছিল না, তাহলে এত পানি কোথা থেকে?এই প্রশ্নটিই বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। ঘটনার আগে রসুয়া এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। নেপালের জল ও আবহাওয়া কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, মঙ্গলবার ও বুধবার সেখানে বড় ধরনের বৃষ্টি হয়নি। 

সাধারণ বন্যার ক্ষেত্রে বৃষ্টি না থাকা অস্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনা যদি সত্যিই হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়া ও নদী সাময়িকভাবে আটকে যাওয়ার ফল হয়, তাহলে বৃষ্টির প্রয়োজন ছিল না। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি মূলত একটি পাহাড়ি ভূ-প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যার সঙ্গে আকস্মিক পানির প্রবাহ যুক্ত হয়েছে।

তানভীর হোসেনের ভাষায়, পাহাড়ের ওপর সামান্য সময়ের জন্য নদী আটকে গেলেও সেই প্রাকৃতিক বাঁধ মানুষের তৈরি বাঁধের মতো স্থিতিশীল নয়। পানি জমতে জমতে একসময় বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে নিচের জনপদে পৌঁছে যেতে পারে বিপুল জলরাশি।

তবে বিপদ এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় ঢলের ভয় রয়েছে প্রবলভাবেই।  আইসিএমওডি সতর্ক করেছে, উজানের কোথাও নদীর প্রবাহ এখনো আটকে থাকলে আবারও বড় ঢল নামতে পারে। সংস্থাটি বলছে, রসুয়া থেকে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় প্রবল পানি, পলি ও বড় বড় পাথর নেমে এসেছে। ফলে নিচের দিকের এলাকাগুলোতেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

পাহাড়ি নদীর আরেকটি সমস্যা হলো- উজানে কী ঘটছে, তা নিচের জনপদের মানুষ সব সময় জানতে পারেন না। নদীর পানি হঠাৎ বাড়তে শুরু করার অর্থ অনেক সময় হলো, বিপদ ইতিমধ্যে অনেকটা এগিয়ে এসেছে। 

মূলত, এই দুর্যোগ প্রচলিত বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থার জন্যও বড় পরীক্ষা। প্রশ্ন আবারও, হিমালয়ের বরফ কি তবে অস্থির হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নের উত্তরেই ঘটনাটি একটি বড় বৈশ্বিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এখানে ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উষ্ণতা বৃদ্ধি।

হিমবাহ সরে যাচ্ছে, বরফ পাতলা হচ্ছে, উচ্চ পর্বতাঞ্চলের জমাট মাটি ও বরফের স্থিতিশীলতাও বদলাচ্ছে। নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে। ফলে ‘হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা’ বা জিএলওএফ-এর ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে সতর্ক করছেন। তবে একটি সতর্কতা জরুরি-এই নির্দিষ্ট দুর্যোগকে এখনই সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।

এ জন্য প্রয়োজন ‘কারণ নির্ণয় ও উৎস অনুসন্ধানমূলক গবেষণা’—অর্থাৎ বর্তমান উষ্ণ পৃথিবীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব জলবায়ুর তুলনায় কতটা বেড়েছে, তা বিশ্লেষণ করা। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। উষ্ণতা হিমবাহ ও উচ্চ পর্বতের বরফের স্থিতিশীলতা বদলে দিচ্ছে- এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

গত বছরও একই অঞ্চল সতর্ক করেছিল এমন ভয়াবহতার। তবে সেই বিপর্যয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এটি সম্পূর্ণ অচেনা কোনো ঝুঁকি নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একই ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। তখন তিব্বতের একটি ‘হিমবাহের ওপর সৃষ্ট হ্রদ’ বা হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদের পানি বেরিয়ে গিয়ে নেপালে ভয়াবহ ঢল তৈরি করেছিল। সেই ঘটনায় নেপাল-চীন সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতুও ভেসে যায়।

বৃষ্টি ছাড়াই ঢল

অর্থাৎ একই ভূপ্রকৃতি, একই নদী ব্যবস্থা এবং কাছাকাছি এলাকায় পরপর এমন বিপর্যয়- হিমালয়ের পরিবর্তিত ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার যথেষ্ট কারণ তৈরি করছে। এর সঙ্গে অবশ্যই মনে রাখতেই হচ্ছে, পাহাড়ের বিপদ শুধু পাহাড়ে থাকছে না। তানভীর হোসেনের বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই।

হিমালয়ের ওপর একটি বরফ-পাথরের ধস কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীতে বিপুল শক্তি যোগ করতে পারে। তারপর সেই স্রোত পাহাড় থেকে সমতলের দিকে ছুটে যায়। ফলে পাহাড়ের ওপরের ঘটনা কয়েক দশক বা কয়েক শ কিলোমিটার দূরের জনপদের জন্যও বিপদ হয়ে উঠতে পারে।

নেপালের এবারের বিপর্যয় তাই শুধু একটি ভয়াবহ বন্যার খবর নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা- পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগের ধরন বদলাচ্ছে। আর অনেক ক্ষেত্রে বিপদ আসার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আকাশে বৃষ্টি বা নদীতে অস্বাভাবিকতার কোনো দৃশ্যমান সংকেত নাও থাকতে পারে।

একটি পাহাড় ভাঙল। নদী কয়েক মিনিটের জন্য আটকাল। তারপর সেই বাঁধ ভেঙে গেল। আর সেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই- পানি আর পানি থাকল না; হয়ে উঠল বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের এক উন্মত্ত দেয়াল।

হিমালয়ের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন শুধু, আরেকটি ঢল আসবে কি না। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন- উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবীতে এমন আকস্মিক বিপর্যয়কে আগে থেকে শনাক্ত করার মতো সতর্কতা ব্যবস্থা কি আমরা তৈরি করতে পারব?


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬


হিমালয়ে বৃষ্টি ছাড়াই ভয়ংকর ঢল, কী বলছেন বিজ্ঞানীরা

প্রকাশের তারিখ : ২৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে কয়েক মিনিটের মধ্যে পাহাড়ি নদী পরিণত হলো কাদা, পাথর, বরফ ও পানির উন্মত্ত স্রোতে। প্রথমে ভূমিকম্পের কথা বলা হলেও নতুন বিশ্লেষণে সামনে আসছে হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ার তথ্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন ঘটনা আগে থেকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন।

নেপালের রসুয়া জেলার মানুষ বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে বৃষ্টির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বরং আবহাওয়া ছিল তুলনামূলক শান্ত। কিন্তু হঠাৎ পাহাড়ের দিক থেকে নেমে এল এমন এক স্রোত, যার মধ্যে শুধু পানি ছিল না- ছিল কাদা, পাথর, বরফ ও পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ। মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেল সড়ক, সেতু, যানবাহন, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের এই আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে; সর্বশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন।

এটি সাধারণ পাহাড়ি বন্যা ছিল না। বরং বিজ্ঞানীদের ভাষায়, বরফ-পাথরের ধস, নদী আটকে যাওয়া এবং সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় তৈরি হওয়া এক ভয়ংকর ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যা।

ভূমিকম্প, নাকি ভূমিধস: ঘটনার পর প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন।

কিন্তু পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা-ইউএসজিএস-তথ্য বিশ্লেষণ করে অবস্থান বদলায়। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে সিসমিক সংকেতকে প্রথমে ভূমিকম্প মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে ভূমিধসের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়া ও বরফ-পাথরের ধসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ভাসিয়ে নিয়ে গেল সবকিছু

অর্থাৎ আপাতত চিত্রটি অনেকটা এমন- প্রথমত, হিমবাহের অংশ ভাঙল।  তারপর বরফ ও পাথর নিচে পড়ল। নদীর প্রবাহ আটকে গেল। এরপর পানি জমল। তারপর প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেল। গোটা প্রক্রিয়া শেষে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নিচে নেমে এল।

আইসিএমওডি-এর প্রাথমিক মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, একটি পাথর ও বরফ ধস লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়ে এই বিপর্যয় ঘটিয়ে থাকতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত ভয়ংকর হলো কেন?

বাংলাদেশে বন্যা বলতে আমরা সাধারণত পানি বাড়তে থাকা বুঝি। নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়ে, মানুষ সময় পায় ঘর ছাড়ার, গবাদিপশু সরানোর কিংবা উঁচু জায়গায় যাওয়ার। তবে হিমালয়ের পাহাড়ি ঢল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

পাহাড়ের ঢাল খাড়া। ফলে ওপরের বিপুল পানি দ্রুত নিচের দিকে ছুটে আসে। তার সঙ্গে যদি মিশে যায় পাহাড়ের পাথর, বালি, মাটি ও বরফ, তখন সেটি আর সাধারণ পানির স্রোত থাকে না। হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঘন ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ- পানি ও ধ্বংসাবশেষের এমন এক প্রবাহ, যার আঘাত অনেকটা তরল কংক্রিটের মতো।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফ এ কারণেই বলেছেন, এমন স্রোত সামনে থেকে দেখা গেলে দৌড়ে পালানো বা গাড়িতে করে সরে যাওয়ার সুযোগও খুব কম। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত উঁচু জায়গায় উঠে যাওয়াই সবচেয়ে কার্যকর আত্মরক্ষার উপায়।

বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও গবেষক তানভীর হোসেনও তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে বরফ, পাথর, পানি ও মহাকর্ষের সম্মিলিত শক্তির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার ব্যাখ্যায়, নদীর ওপর অস্থায়ী প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়ে সেটি ভেঙে গেলে আটকে থাকা পানি একই সঙ্গে নিচে নেমে এসে ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক স্রোত তৈরি করতে পারে।

বরফ, পানি আর শিলাপাথরের প্রবাহ

বৃষ্টি ছিল না, তাহলে এত পানি কোথা থেকে?এই প্রশ্নটিই বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। ঘটনার আগে রসুয়া এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। নেপালের জল ও আবহাওয়া কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, মঙ্গলবার ও বুধবার সেখানে বড় ধরনের বৃষ্টি হয়নি। 

সাধারণ বন্যার ক্ষেত্রে বৃষ্টি না থাকা অস্বাভাবিক। কিন্তু এই ঘটনা যদি সত্যিই হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়া ও নদী সাময়িকভাবে আটকে যাওয়ার ফল হয়, তাহলে বৃষ্টির প্রয়োজন ছিল না। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি মূলত একটি পাহাড়ি ভূ-প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যার সঙ্গে আকস্মিক পানির প্রবাহ যুক্ত হয়েছে।

তানভীর হোসেনের ভাষায়, পাহাড়ের ওপর সামান্য সময়ের জন্য নদী আটকে গেলেও সেই প্রাকৃতিক বাঁধ মানুষের তৈরি বাঁধের মতো স্থিতিশীল নয়। পানি জমতে জমতে একসময় বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে নিচের জনপদে পৌঁছে যেতে পারে বিপুল জলরাশি।

তবে বিপদ এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় ঢলের ভয় রয়েছে প্রবলভাবেই।  আইসিএমওডি সতর্ক করেছে, উজানের কোথাও নদীর প্রবাহ এখনো আটকে থাকলে আবারও বড় ঢল নামতে পারে। সংস্থাটি বলছে, রসুয়া থেকে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় প্রবল পানি, পলি ও বড় বড় পাথর নেমে এসেছে। ফলে নিচের দিকের এলাকাগুলোতেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

পাহাড়ি নদীর আরেকটি সমস্যা হলো- উজানে কী ঘটছে, তা নিচের জনপদের মানুষ সব সময় জানতে পারেন না। নদীর পানি হঠাৎ বাড়তে শুরু করার অর্থ অনেক সময় হলো, বিপদ ইতিমধ্যে অনেকটা এগিয়ে এসেছে। 

মূলত, এই দুর্যোগ প্রচলিত বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থার জন্যও বড় পরীক্ষা। প্রশ্ন আবারও, হিমালয়ের বরফ কি তবে অস্থির হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নের উত্তরেই ঘটনাটি একটি বড় বৈশ্বিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। হিমালয় পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল। ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এখানে ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উষ্ণতা বৃদ্ধি।

হিমবাহ সরে যাচ্ছে, বরফ পাতলা হচ্ছে, উচ্চ পর্বতাঞ্চলের জমাট মাটি ও বরফের স্থিতিশীলতাও বদলাচ্ছে। নতুন নতুন হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে। ফলে ‘হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা’ বা জিএলওএফ-এর ঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে সতর্ক করছেন। তবে একটি সতর্কতা জরুরি-এই নির্দিষ্ট দুর্যোগকে এখনই সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।

এ জন্য প্রয়োজন ‘কারণ নির্ণয় ও উৎস অনুসন্ধানমূলক গবেষণা’—অর্থাৎ বর্তমান উষ্ণ পৃথিবীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব জলবায়ুর তুলনায় কতটা বেড়েছে, তা বিশ্লেষণ করা। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। উষ্ণতা হিমবাহ ও উচ্চ পর্বতের বরফের স্থিতিশীলতা বদলে দিচ্ছে- এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

গত বছরও একই অঞ্চল সতর্ক করেছিল এমন ভয়াবহতার। তবে সেই বিপর্যয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- এটি সম্পূর্ণ অচেনা কোনো ঝুঁকি নয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একই ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। তখন তিব্বতের একটি ‘হিমবাহের ওপর সৃষ্ট হ্রদ’ বা হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদের পানি বেরিয়ে গিয়ে নেপালে ভয়াবহ ঢল তৈরি করেছিল। সেই ঘটনায় নেপাল-চীন সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতুও ভেসে যায়।

বৃষ্টি ছাড়াই ঢল

অর্থাৎ একই ভূপ্রকৃতি, একই নদী ব্যবস্থা এবং কাছাকাছি এলাকায় পরপর এমন বিপর্যয়- হিমালয়ের পরিবর্তিত ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার যথেষ্ট কারণ তৈরি করছে। এর সঙ্গে অবশ্যই মনে রাখতেই হচ্ছে, পাহাড়ের বিপদ শুধু পাহাড়ে থাকছে না। তানভীর হোসেনের বিশ্লেষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই।

হিমালয়ের ওপর একটি বরফ-পাথরের ধস কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীতে বিপুল শক্তি যোগ করতে পারে। তারপর সেই স্রোত পাহাড় থেকে সমতলের দিকে ছুটে যায়। ফলে পাহাড়ের ওপরের ঘটনা কয়েক দশক বা কয়েক শ কিলোমিটার দূরের জনপদের জন্যও বিপদ হয়ে উঠতে পারে।

নেপালের এবারের বিপর্যয় তাই শুধু একটি ভয়াবহ বন্যার খবর নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা- পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগের ধরন বদলাচ্ছে। আর অনেক ক্ষেত্রে বিপদ আসার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আকাশে বৃষ্টি বা নদীতে অস্বাভাবিকতার কোনো দৃশ্যমান সংকেত নাও থাকতে পারে।

একটি পাহাড় ভাঙল। নদী কয়েক মিনিটের জন্য আটকাল। তারপর সেই বাঁধ ভেঙে গেল। আর সেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই- পানি আর পানি থাকল না; হয়ে উঠল বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের এক উন্মত্ত দেয়াল।

হিমালয়ের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন শুধু, আরেকটি ঢল আসবে কি না। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন- উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবীতে এমন আকস্মিক বিপর্যয়কে আগে থেকে শনাক্ত করার মতো সতর্কতা ব্যবস্থা কি আমরা তৈরি করতে পারব?



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত