সংবাদ

নতুন নয়, পুরোনো প্রকল্প বাস্তবায়নেই জোর


আবুল কালাম আজাদ
আবুল কালাম আজাদ
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম

নতুন নয়, পুরোনো প্রকল্প বাস্তবায়নেই জোর
প্রতীকী ছবি।

সরকার নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার চেয়ে চলমান প্রকল্প শেষ করতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বিগত সরকারের পতনের পরে উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা আসে। অর্ন্তবর্তী সরকারও তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কাজে হাত দেয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষিতে সরকার ধীরে চলো নীতিতে এগুচ্ছে।

এছাড়া বিগত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকার উন্নয়নের নামে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছিলো সেগুলো খতিয়ে দেখবে সরকার। এসব প্রেক্ষিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত পাঁচ দশকে সর্বনিম্ন। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আইএমইডি‘র তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে। তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত এডিপির ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা। আইএমইডি‘র তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই বাস্তবায়ন হার অন্তত পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ উন্নয়ন বাজেটে অর্থ থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি সংবাদকে বলেন, ওই অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কমে যাওয়া ও বাস্তবায়নের গতি ধীর হওয়ার বিষয়টি সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে দেখা প্রয়োজন। 

তার ভাষায়, অর্থবছরটিতে শাসনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সময় দায়িত্বে ছিল। সরকার পরিবর্তনের সময়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম, নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠন, দায়িত্ব বণ্টন এবং সরকারের কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগে।

ড. মুজেরি আরও বলেন, অর্থবছরটি দেশীয় ও বৈশ্বিক-উভয় ক্ষেত্রেই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। সরকারি ব্যয় যত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারও তত দ্রুত হবে। সামনে সরকারের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ফিরিয়ে আনা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অবকাঠামোর উদাহরণ রয়েছে, যেখানে প্রকল্পের দৃশ্যমান একটি অংশ তৈরি হলেও সেটিকে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় অন্য অংশ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।

হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে কাটা গঙ্গা নদীর ওপর ৮৩ মিটার সেতু নির্মাণের প্রকল্পটি তার একটি উদাহরণ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এই প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা। কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের জুলাইয়ে। প্রাথমিকভাবে ২০২৫ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে সময় বাড়ানো হলেও ২০২৬ সালের মার্চে বর্ধিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। ফলে যে উদ্দেশ্যে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল-দুই এলাকার যোগাযোগ সহজ করা-তা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

রাজবাড়ীর পাংশায় গড়াই নদীর ওপর ৬৫০ মিটার সেতুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা দেখা গেছে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক সময়সীমা ছিল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু পাঁচ বছর পরও কাজ শেষ হয়নি। স্প্যান বসানো এবং সংযোগ সড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় কাজের গতি কমেছে। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৬৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

কুষ্টিয়ার কুমার নদীর ওপর ৮১ মিটার সেতুটিও প্রায় পাঁচ বছর ধরে অসম্পূর্ণ ছিল। ২০২০ সালের নভেম্বরে ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২২ সালের মার্চে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফা সময় বাড়ানোর পরও কাজ শেষ হয়নি। এতে স্থানীয় কৃষক ও পরিবহন ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, একটি অবকাঠামোকে আলাদা করে দেখলে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য বোঝা যায় না। সেতু নির্মাণ শেষ হলেও যদি সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, ড্রেনেজ বা অন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকে, তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও কাঙ্ক্ষিত জনসেবা নিশ্চিত করা যায় না।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট-চাক্তাই সড়ক ও বাঁধ প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে তিন বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়ক ও বাঁধ নির্মাণের প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালেও এর কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ চারবার বাড়ানো হয়েছে।

জমি অধিগ্রহণ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন বাস্তবায়ন জটিলতায় প্রকল্পটি বারবার পিছিয়েছে। অথচ প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল শুধু একটি সড়ক নির্মাণ নয়। বিকল্প চার লেনের সড়ক তৈরি, যানজট কমানো এবং জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় বাঁধ নির্মাণও এর লক্ষ্য ছিল। দীর্ঘ বিলম্বের কারণে যে সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর একটি অংশ থেকে গেছে। অর্থাৎ প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

এখানেই উন্নয়ন ব্যয়ের প্রকৃত মূল্যায়নের প্রশ্নটি সামনে আসে। কোনো প্রকল্পে ৭০ বা ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে-এটি একা সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং জনগণের জন্য প্রকল্পটি ৭০ বা ৮০ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য হয়েছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প বিলম্বের জন্য প্রায়ই ঠিকাদারকে দায়ী করা হয়। ধীরগতির কাজ, নিম্নমানের নির্মাণ কিংবা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ-এসব সমস্যা অবশ্যই আছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার শুরু হয় প্রকল্প অনুমোদনের আগেই।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় বাজেট শৃঙ্খলার ঘাটতি, দীর্ঘ বাস্তবায়ন বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোতে গড়ে ন্যূনতম প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রায় তিন বছরের বিলম্ব দেখা যায়। প্রকল্প গ্রহণের আগে পর্যাপ্ত সম্ভাব্যতা যাচাই, সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ ও অংশীজনের পরামর্শের ঘাটতির কথাও সেখানে বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘প্রকল্প প্রস্তুতি’। জমি অধিগ্রহণের বিষয় নিষ্পত্তি হয়নি, পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি, নকশা চূড়ান্ত নয় কিংবা ইউটিলিটি স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেই-এমন অবস্থায় প্রকল্প অনুমোদন করা হলে মাঠপর্যায়ে কাজ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন নিয়েও ক্রয় প্রক্রিয়ার বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দুর্বল সমন্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি প্রকল্পের সময়সীমা একবার বাড়লে শুধু ক্যালেন্ডার বদলায় না, বদলে যায় প্রকল্পের আর্থিক হিসাবও। নির্মাণসামগ্রীর দাম, শ্রমের মজুরি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং প্রশাসনিক ব্যয় বাড়তে থাকে। ফলে নির্ধারিত সময়ে তুলনামূলক কম খরচে শেষ করার কথা ছিল যে প্রকল্প, কয়েক বছর পর সেটিই অনেক বেশি ব্যয়ে শেষ করতে হয়।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সরকারি টাস্কফোর্স-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে আটটি বড় প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলন ও পরবর্তী ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধানের বিষয়টি উঠে আসে। পদ্মা সেতু ও রেল সেতু সংযোগ, যমুনা রেল সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রোরেল-৬, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ এবং বিআরটি-৩—এই আট প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় মোট ৬৮ শতাংশ বা ৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাই, দুর্নীতি ও বিলম্বকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সংশোধিত এডিপিতে ১ হাজার ৪০০টির বেশি প্রকল্প ছিল। সংস্থাটি এটিকে বাজেট শৃঙ্খলার ঘাটতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখিয়েছে এবং অনেক অদক্ষ ও টেকসই নয় এমন প্রকল্প থাকার কথাও উল্লেখ করেছে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রকল্প পরিচালনা করতে গিয়ে প্রশাসনিক সক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ে। কোনো প্রকল্পেই তখন পর্যাপ্ত নজরদারি থাকে না। বরাদ্দ পাওয়া গেলেও কাজের গতি কম থাকে। বছরের শেষে বরাদ্দ ব্যয় করতে না পারায় বাস্তবায়ন হার কমে যায়। পরের বছর একই প্রকল্প আবার এডিপিতে ফিরে আসে। এভাবেই বছরের পর বছর টেনে নেওয়া প্রকল্পের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশের সামনে এখন উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানোর চেয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের মান বাড়ানো দিকে গুরুত্ব দিবে সরকার। একটি সেতু উদ্বোধন হলো-এটিই সাফল্যের শেষ কথা নয়। সেতুটির দুই পাশে সংযোগ সড়ক আছে কি না, মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারছে কি না, কৃষকের পরিবহন ব্যয় কমেছে কি না, ব্যবসার সময় ও খরচ কমেছে কি না-এসবই প্রকৃত সাফল্যের সূচক।

একইভাবে কোনো সড়কের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও শেষ ১০ শতাংশের কারণে যদি যান চলাচল শুরু করা না যায়, তাহলে সেটি কার্যকর অবকাঠামো হয়ে ওঠে না। একটি হাসপাতাল ভবন নির্মাণ শেষ হলেও যদি জনবল, যন্ত্রপাতি কিংবা বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ না থাকে, তাহলে সেই ভবন মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কতটা অবদান রাখছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাই এখন একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার-‘কত প্রকল্প নেওয়া হলো’ সেখান থেকে ‘কত প্রকল্প কার্যকরভাবে শেষ হলো’। নতুন প্রকল্প প্রয়োজন হবে, কিন্তু তার আগে দেখতে হবে পুরোনোগুলো কেন আটকে আছে। যে প্রকল্প মানুষের হাতে সুফল পৌঁছায় না, সেটি কাগজে যত বড়ই হোক, উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ প্রতীক নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই, যখন বরাদ্দকৃত অর্থ দৃশ্যমান অবকাঠামোতে রূপ নেয়, সেই অবকাঠামো মানুষের কাজে লাগে এবং তার সুফল অর্থনীতিতে পরিমাপযোগ্য হয়ে ওঠে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬


নতুন নয়, পুরোনো প্রকল্প বাস্তবায়নেই জোর

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সরকার নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার চেয়ে চলমান প্রকল্প শেষ করতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বিগত সরকারের পতনের পরে উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা আসে। অর্ন্তবর্তী সরকারও তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কাজে হাত দেয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষিতে সরকার ধীরে চলো নীতিতে এগুচ্ছে।

এছাড়া বিগত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ সরকার উন্নয়নের নামে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছিলো সেগুলো খতিয়ে দেখবে সরকার। এসব প্রেক্ষিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার গত পাঁচ দশকে সর্বনিম্ন। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

আইএমইডি‘র তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশে। তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত এডিপির ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা। আইএমইডি‘র তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই বাস্তবায়ন হার অন্তত পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ উন্নয়ন বাজেটে অর্থ থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি সংবাদকে বলেন, ওই অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কমে যাওয়া ও বাস্তবায়নের গতি ধীর হওয়ার বিষয়টি সামগ্রিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে দেখা প্রয়োজন। 

তার ভাষায়, অর্থবছরটিতে শাসনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু সময় দায়িত্বে ছিল। সরকার পরিবর্তনের সময়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম, নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠন, দায়িত্ব বণ্টন এবং সরকারের কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগে।

ড. মুজেরি আরও বলেন, অর্থবছরটি দেশীয় ও বৈশ্বিক-উভয় ক্ষেত্রেই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। সরকারি ব্যয় যত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারও তত দ্রুত হবে। সামনে সরকারের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ফিরিয়ে আনা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অবকাঠামোর উদাহরণ রয়েছে, যেখানে প্রকল্পের দৃশ্যমান একটি অংশ তৈরি হলেও সেটিকে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় অন্য অংশ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।

হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে কাটা গঙ্গা নদীর ওপর ৮৩ মিটার সেতু নির্মাণের প্রকল্পটি তার একটি উদাহরণ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এই প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা। কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের জুলাইয়ে। প্রাথমিকভাবে ২০২৫ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে সময় বাড়ানো হলেও ২০২৬ সালের মার্চে বর্ধিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। ফলে যে উদ্দেশ্যে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল-দুই এলাকার যোগাযোগ সহজ করা-তা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

রাজবাড়ীর পাংশায় গড়াই নদীর ওপর ৬৫০ মিটার সেতুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতা দেখা গেছে। ২০২০ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক সময়সীমা ছিল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু পাঁচ বছর পরও কাজ শেষ হয়নি। স্প্যান বসানো এবং সংযোগ সড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় কাজের গতি কমেছে। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৬৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

কুষ্টিয়ার কুমার নদীর ওপর ৮১ মিটার সেতুটিও প্রায় পাঁচ বছর ধরে অসম্পূর্ণ ছিল। ২০২০ সালের নভেম্বরে ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২২ সালের মার্চে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফা সময় বাড়ানোর পরও কাজ শেষ হয়নি। এতে স্থানীয় কৃষক ও পরিবহন ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, একটি অবকাঠামোকে আলাদা করে দেখলে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য বোঝা যায় না। সেতু নির্মাণ শেষ হলেও যদি সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, ড্রেনেজ বা অন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকে, তাহলে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও কাঙ্ক্ষিত জনসেবা নিশ্চিত করা যায় না।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট-চাক্তাই সড়ক ও বাঁধ প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে তিন বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়ক ও বাঁধ নির্মাণের প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালেও এর কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ চারবার বাড়ানো হয়েছে।

জমি অধিগ্রহণ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন বাস্তবায়ন জটিলতায় প্রকল্পটি বারবার পিছিয়েছে। অথচ প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল শুধু একটি সড়ক নির্মাণ নয়। বিকল্প চার লেনের সড়ক তৈরি, যানজট কমানো এবং জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় বাঁধ নির্মাণও এর লক্ষ্য ছিল। দীর্ঘ বিলম্বের কারণে যে সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর একটি অংশ থেকে গেছে। অর্থাৎ প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

এখানেই উন্নয়ন ব্যয়ের প্রকৃত মূল্যায়নের প্রশ্নটি সামনে আসে। কোনো প্রকল্পে ৭০ বা ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে-এটি একা সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং জনগণের জন্য প্রকল্পটি ৭০ বা ৮০ শতাংশ ব্যবহারযোগ্য হয়েছে কি না, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প বিলম্বের জন্য প্রায়ই ঠিকাদারকে দায়ী করা হয়। ধীরগতির কাজ, নিম্নমানের নির্মাণ কিংবা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ-এসব সমস্যা অবশ্যই আছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার শুরু হয় প্রকল্প অনুমোদনের আগেই।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বাংলাদেশের সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় বাজেট শৃঙ্খলার ঘাটতি, দীর্ঘ বাস্তবায়ন বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধিকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, সরকারি বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোতে গড়ে ন্যূনতম প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রায় তিন বছরের বিলম্ব দেখা যায়। প্রকল্প গ্রহণের আগে পর্যাপ্ত সম্ভাব্যতা যাচাই, সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ ও অংশীজনের পরামর্শের ঘাটতির কথাও সেখানে বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘প্রকল্প প্রস্তুতি’। জমি অধিগ্রহণের বিষয় নিষ্পত্তি হয়নি, পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি, নকশা চূড়ান্ত নয় কিংবা ইউটিলিটি স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেই-এমন অবস্থায় প্রকল্প অনুমোদন করা হলে মাঠপর্যায়ে কাজ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন নিয়েও ক্রয় প্রক্রিয়ার বিলম্ব, জমি অধিগ্রহণ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দুর্বল সমন্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একটি প্রকল্পের সময়সীমা একবার বাড়লে শুধু ক্যালেন্ডার বদলায় না, বদলে যায় প্রকল্পের আর্থিক হিসাবও। নির্মাণসামগ্রীর দাম, শ্রমের মজুরি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং প্রশাসনিক ব্যয় বাড়তে থাকে। ফলে নির্ধারিত সময়ে তুলনামূলক কম খরচে শেষ করার কথা ছিল যে প্রকল্প, কয়েক বছর পর সেটিই অনেক বেশি ব্যয়ে শেষ করতে হয়।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সরকারি টাস্কফোর্স-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে আটটি বড় প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলন ও পরবর্তী ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধানের বিষয়টি উঠে আসে। পদ্মা সেতু ও রেল সেতু সংযোগ, যমুনা রেল সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল, মেট্রোরেল-৬, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ এবং বিআরটি-৩—এই আট প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় মোট ৬৮ শতাংশ বা ৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাই, দুর্নীতি ও বিলম্বকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সংশোধিত এডিপিতে ১ হাজার ৪০০টির বেশি প্রকল্প ছিল। সংস্থাটি এটিকে বাজেট শৃঙ্খলার ঘাটতির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখিয়েছে এবং অনেক অদক্ষ ও টেকসই নয় এমন প্রকল্প থাকার কথাও উল্লেখ করেছে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রকল্প পরিচালনা করতে গিয়ে প্রশাসনিক সক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ে। কোনো প্রকল্পেই তখন পর্যাপ্ত নজরদারি থাকে না। বরাদ্দ পাওয়া গেলেও কাজের গতি কম থাকে। বছরের শেষে বরাদ্দ ব্যয় করতে না পারায় বাস্তবায়ন হার কমে যায়। পরের বছর একই প্রকল্প আবার এডিপিতে ফিরে আসে। এভাবেই বছরের পর বছর টেনে নেওয়া প্রকল্পের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশের সামনে এখন উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ানোর চেয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের মান বাড়ানো দিকে গুরুত্ব দিবে সরকার। একটি সেতু উদ্বোধন হলো-এটিই সাফল্যের শেষ কথা নয়। সেতুটির দুই পাশে সংযোগ সড়ক আছে কি না, মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারছে কি না, কৃষকের পরিবহন ব্যয় কমেছে কি না, ব্যবসার সময় ও খরচ কমেছে কি না-এসবই প্রকৃত সাফল্যের সূচক।

একইভাবে কোনো সড়কের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও শেষ ১০ শতাংশের কারণে যদি যান চলাচল শুরু করা না যায়, তাহলে সেটি কার্যকর অবকাঠামো হয়ে ওঠে না। একটি হাসপাতাল ভবন নির্মাণ শেষ হলেও যদি জনবল, যন্ত্রপাতি কিংবা বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ না থাকে, তাহলে সেই ভবন মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কতটা অবদান রাখছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাই এখন একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার-‘কত প্রকল্প নেওয়া হলো’ সেখান থেকে ‘কত প্রকল্প কার্যকরভাবে শেষ হলো’। নতুন প্রকল্প প্রয়োজন হবে, কিন্তু তার আগে দেখতে হবে পুরোনোগুলো কেন আটকে আছে। যে প্রকল্প মানুষের হাতে সুফল পৌঁছায় না, সেটি কাগজে যত বড়ই হোক, উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ প্রতীক নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই, যখন বরাদ্দকৃত অর্থ দৃশ্যমান অবকাঠামোতে রূপ নেয়, সেই অবকাঠামো মানুষের কাজে লাগে এবং তার সুফল অর্থনীতিতে পরিমাপযোগ্য হয়ে ওঠে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত