সংবাদ

সিন্ডিকেটের কবলে লাইটারেজ জাহাজ, পণ্য খালাসে নৈরাজ্য


মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০১ পিএম

সিন্ডিকেটের কবলে লাইটারেজ জাহাজ, পণ্য খালাসে নৈরাজ্য
চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটার জাহাজ সংকট চরমে, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনখাতে নৈরাজ্য

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সিন্ডিকেটের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। একটি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে আকারভেদে ৪ থেকে ৭টি লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র একটি। ফলে পণ্য খালাস ও পরিবহনে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। সিরিয়াল দেওয়ার জন্য সাধারণ জাহাজ মালিকদের জাহাজ দিনের পর দিন অলস ভাসলেও প্রভাবশালীদের জাহাজ সিরিয়ালবিহীনভাবে একের পর এক ট্রিপ দিয়ে পণ্য পরিবহন করছে। এতে লাইটারেজ জাহাজের স্বাভাবিক ব্যবসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি সাধারণ জাহাজ মালিকদের মধ্যে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে, স্বল্প ভাড়ায় সিরিয়ালবিহীন জাহাজ চলাচলের সুযোগে চড়া ভাড়ায় সিরিয়াল থেকে জাহাজ নেওয়া আমদানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ইচ্ছেমতো কম ভাড়ায় জাহাজ নেওয়ার সুযোগ থাকলে পণ্য পরিবহন ব্যয় সহনীয় হতো। এতে অসম প্রতিযোগিতা কমে যেত। সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ায় পুরো সেক্টরটিতে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। 

লাইটারেজ জাহাজ না যাওয়ায় মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করেননি আমদানিকারক। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষ মাদার ভ্যাসেলের স্থানীয় শিপিং এজেন্সিকে দশ লাখ টাকা জরিমানা করার ঘটনা পুরো সেক্টরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সবকিছু মিলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এবং দেশের ৩০টির বেশি গন্তব্যে কোটি কোটি টন পণ্য পরিবহনে পুরনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হওয়ায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

সূত্রমতে, বর্তমানে বন্দরের বহির্নোঙরে ৬৬টি মাদার ভেসেল রয়েছে। প্রতিটির জন্য ন্যূনতম পাঁচটি করে ধরলে প্রয়োজন ৩৩০টি লাইটার জাহাজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিন্ডিকেটের কারণে সিরিয়াল প্রথা না মেনে জাহাজ অন্য রুটে পরিচালনা এবং লাইটার জাহাজে দীর্ঘদিন পণ্য রেখে দেওয়াই সংকটের অন্যতম কারণ।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এভাবে সিরিয়াল প্রথা কিংবা সর্বনিম্ন রেট নির্ধারণ করে দেওয়ার সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ দর নির্ধারণ করে দেওয়া যায়। এর থেকে কমে যদি কেউ পণ্য পরিবহন করে পোষাতে পারে তাকে বাধা দেবেন কীভাবে? অথচ এই সেক্টরে তাই চলছে। এভাবে চলতে দেওয়া উচিত নয়। 

আমদানিকারক এবং সাধারণ জাহাজ মালিকেরা সেক্টরটিকে সিন্ডিকেট মুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে আমিরুল হক বলেন, এভাবে চলতে থাকলে দেশের আমদানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়বে।

সূত্র অনুযায়ী, দেশের আমদানি বাণিজ্যের ১০ কোটি টনের বেশি পণ্য প্রতি বছর বহির্নোঙর থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পরিবাহিত হয়। এই কার্যক্রমে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি লাইটারেজ জাহাজ নিয়োজিত রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা কয়লা, সিমেন্ট ক্লিংকার, গম, ডাল, সার, লবণ, পাথর, স্ল্যাগ, স্টিল, এইচআর কয়েল, সয়াবিন ভূষি, কোপ্রা, উড পাল্পসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বড় বড় মাদার ভ্যাসেল বহির্নোঙরে আসে। 

তবে ড্রাফটের কারণে এসব জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে না পারায় বহির্নোঙরে গ্র্যাব ও ক্রেনের মাধ্যমে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করা হয়। একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে একযোগে ৪ থেকে ৫টি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা থাকে। পরে এসব পণ্য কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের ৩০টির বেশি গন্তব্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এই কর্মযজ্ঞ এখন সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে বলে অভিযোগ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল বা বিডব্লিউটিসিসি সিরিয়াল প্রথা চালু করে। কিন্তু সিরিয়াল প্রথা নিয়ে জাহাজ মালিক এবং আমদানিকারকদের অনেক অভিযোগ। সিরিয়াল প্রথা না মেনে কয়েকশ লাইটারেজ জাহাজ পণ্য পরিবহন করছে। প্রভাবশালী নেতাদের জাহাজগুলো সিরিয়াল প্রথা না মেনে নিজেদের মতো করে একের পর এক ট্রিপ মারছে, পণ্য পরিবহন করছে। তাদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনা যাচ্ছে না। 

অপরদিকে যেসব আমদানিকারক সিরিয়ালবিহীন জাহাজ দিয়ে পণ্য পরিবহন করছেন তারা যে পণ্য টনপ্রতি ৪০০ টাকায় পরিবহন করছেন সিরিয়াল প্রথা অনুসরণ করা আমদানিকারকদের সেই পণ্য টনপ্রতি ৬০০ টাকার বেশি দিয়ে পরিবহন করতে হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ এবং বড় বড় আমদানিকারকেরা নিজেদের জাহাজ দিয়ে আরো কম খরচে পণ্য পরিবহন করছেন। এতে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত ছোট আমদানিকারকেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাজার থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা করছেন।

মোহাম্মদ আজাদ নামে একজন জাহাজ মালিক ও আমদানিকারক বলেন, ‘আমি ছোট আমদানিকারক। আমার নিজের একটি জাহাজ আছে। অথচ আমার জাহাজ দিয়ে আমার পণ্য পরিবহন করতে পারি না। সিরিয়াল প্রথা অনুসরণ করতে গিয়ে আমাকে চড়া ভাড়ায় অন্য মালিকের জাহাজ নিতে হয়। আমার জাহাজ সিরিয়ালের অপেক্ষায় অলস সাগরে ভাসে। ’

মোহাম্মদ আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমার পণ্য পরিবহনের জন্য আমি ট্রাক ভাড়া করব, যার থেকে কম পাব তার থেকে নেব। জাহাজের ক্ষেত্রেও তেমন হওয়া উচিত। আগে তো এমনই ছিল। এখন নেতারা সিন্ডিকেট করে নিজেদের জাহাজগুলো সিরিয়ালের বাইরে চালাচ্ছেন। অথচ আমাদের মতো সাধারণ মালিকদের জাহাজগুলোকে সিরিয়ালের নামে অলস বসিয়ে রাখছেন। মাসে গড়ে একটি ট্রিপ পায় না এমন শত শত জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজের নাবিকদের বেতনসহ আনুষাঙ্গিক খরচ যোগাতে মালিকেরা হিমশিম খাচ্ছেন।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে এই জাহাজ মালিক বলেন, ‘আইন হলে সবার জন্য হবে। একটি সিস্টেম হলে তা সবার জন্য হওয়া উচিত। এখন শিল্প গ্রুপ, বড় আমদানিকারক, জাহাজ মালিকদের নেতাদের কোনো সিস্টেম মানতে হবে না। সিস্টেম শুধু আমাদের মতো সাধারণ মালিকদের মানতে হবে। এটি আমাদেরকে বাজার ছাড়া করার ষড়যন্ত্র।’

তথ্যমতে, সিরিয়ালবিহীন জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়ায় বিডব্লিউটিসিসি প্রতিদিন বার্থিং মিটিংও করতে পারছে না। আমদানিকারকদের জাহাজ দিতে পারছে না। অসংখ্য জাহাজ সিরিয়ালের তোয়াক্কা না করে নিজেদের মতো করে পণ্য পরিবহন করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লাইটার জাহাজ মালিক বলেন, চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৮০০ লাইটার জাহাজ থাকলেও সিরিয়াল প্রথা কেউ মানতে চান না। সিরিয়াল মেনে চললে মাসে এক-দুইবার ভাড়া পাওয়া যায়, আর সিরিয়ালের বাইরে চললে চার-ছয়বার ভাড়া পাওয়া যায়। তার দাবি, বর্তমানে ৪ শতাধিক লাইটার জাহাজ ঢাকা, পায়রা ও তালতলী রুটে চলছে। এতে চট্টগ্রামে সংকট তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সময়মতো মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করতে না পারায় আমাদের একটি সদস্য প্রতিষ্ঠানকে দশ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। অথচ এশিয়া বাল্ক মেরিটাইম প্রাইভেট লিমিটেড নামের এই প্রতিষ্ঠানের সাথে ওই জাহাজের পণ্য খালাসের কোনো সম্পর্ক নেই। শিপিং এজেন্সির কাজ হলো বিদেশি মাদার ভ্যাসেলের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে জাহাজ এবং নাবিকদের দেখভাল করা। 

ওই নেতা আরও বলেন, ‘পণ্য খালাসের সাথে জড়িত আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং লাইটারেজ জাহাজ। তারা যদি শুল্ক কর পরিশোধ করে কাগজপত্র ঠিকভাবে উপস্থাপন এবং পণ্য খালাসের জন্য লাইটারেজ জাহাজ মাদার ভ্যাসেলের কাছ না পাঠায় তাহলে পণ্য খালাস হবে কীভাবে? পণ্য খালাস ব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে শিপিং এজেন্সির কোনো ভূমিকা নেই, অথচ বন্দর জরিমানা করল শিপিং এজেন্সিকে। এটা পরিশোধ করতে হবে বিদেশি মাদার ভ্যাসেলের মালিককে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তারা যদি আর চট্টগ্রাম বন্দরে ভাড়া নিয়ে আসতে না চায় বা বাড়তি চার্জ দাবি করে তার দায় কে নেবে?

বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহসভাপতি নবী আলম বলেন, ‘লাইটার জাহাজের সংকট নেই। সংকট রয়েছে সমন্বয়ের। অনেক অসাধু জাহাজ মালিক বেশি ভাড়া পাওয়ার আশায় সিরিয়াল প্রথা মানেন না। তারা অন্য রুটে জাহাজ পরিচালনা করতে মাস্টারকে বাধ্য করেন।

বাংলাদেশের লাইটার জাহাজ বা কার্গো ভেসেল মালিকদের নিবন্ধিত সংগঠন বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলম বলেন, সিরিয়াল নিয়ে একটু সমস্যা হতে পারে। এটা বড় কোনো বিষয় নয়। আমাদের সবার আগে মূল সমস্যাটা কোথায়, সেটা চিহ্নিত করতে হবে। শুধু লাইটার জাহাজকে জরিমানা করলে হবে না। 

খুরশিদ আলম আরও বলেন, ‘অনেক আমদানিকারক পণ্য যথাসময়ে খালাস করেন না। তারা লাইটার জাহাজে পণ্য রেখে দেন। এমনও দেখা গেছে, আমদানিকারক দুই মাসেও পণ্য খালাস করেনি। একটা লাইটার জাহাজ যদি দুই মাস ওই পণ্য নিয়ে বসে থাকে, তাহলে সংকট তো হবেই। সরকার, ডিজি শিপিংকে এই জায়গায় নজর দিতে হবে। নইলে এই সমস্যার সমাধান কখনোই হবে না।’

বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদ বলেন, চারশর বেশি লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়াল প্রথা না মেনে পণ্য পরিবহন করছে। আমরা নানাভাবে চেষ্টা করেও তাদের সিরিয়ালে আনতে পারছি না।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬


সিন্ডিকেটের কবলে লাইটারেজ জাহাজ, পণ্য খালাসে নৈরাজ্য

প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সিন্ডিকেটের কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। একটি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে আকারভেদে ৪ থেকে ৭টি লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে মিলছে মাত্র একটি। ফলে পণ্য খালাস ও পরিবহনে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। সিরিয়াল দেওয়ার জন্য সাধারণ জাহাজ মালিকদের জাহাজ দিনের পর দিন অলস ভাসলেও প্রভাবশালীদের জাহাজ সিরিয়ালবিহীনভাবে একের পর এক ট্রিপ দিয়ে পণ্য পরিবহন করছে। এতে লাইটারেজ জাহাজের স্বাভাবিক ব্যবসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি সাধারণ জাহাজ মালিকদের মধ্যে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে, স্বল্প ভাড়ায় সিরিয়ালবিহীন জাহাজ চলাচলের সুযোগে চড়া ভাড়ায় সিরিয়াল থেকে জাহাজ নেওয়া আমদানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ইচ্ছেমতো কম ভাড়ায় জাহাজ নেওয়ার সুযোগ থাকলে পণ্য পরিবহন ব্যয় সহনীয় হতো। এতে অসম প্রতিযোগিতা কমে যেত। সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ায় পুরো সেক্টরটিতে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। 

লাইটারেজ জাহাজ না যাওয়ায় মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করেননি আমদানিকারক। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষ মাদার ভ্যাসেলের স্থানীয় শিপিং এজেন্সিকে দশ লাখ টাকা জরিমানা করার ঘটনা পুরো সেক্টরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সবকিছু মিলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এবং দেশের ৩০টির বেশি গন্তব্যে কোটি কোটি টন পণ্য পরিবহনে পুরনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হওয়ায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

সূত্রমতে, বর্তমানে বন্দরের বহির্নোঙরে ৬৬টি মাদার ভেসেল রয়েছে। প্রতিটির জন্য ন্যূনতম পাঁচটি করে ধরলে প্রয়োজন ৩৩০টি লাইটার জাহাজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিন্ডিকেটের কারণে সিরিয়াল প্রথা না মেনে জাহাজ অন্য রুটে পরিচালনা এবং লাইটার জাহাজে দীর্ঘদিন পণ্য রেখে দেওয়াই সংকটের অন্যতম কারণ।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এভাবে সিরিয়াল প্রথা কিংবা সর্বনিম্ন রেট নির্ধারণ করে দেওয়ার সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ দর নির্ধারণ করে দেওয়া যায়। এর থেকে কমে যদি কেউ পণ্য পরিবহন করে পোষাতে পারে তাকে বাধা দেবেন কীভাবে? অথচ এই সেক্টরে তাই চলছে। এভাবে চলতে দেওয়া উচিত নয়। 

আমদানিকারক এবং সাধারণ জাহাজ মালিকেরা সেক্টরটিকে সিন্ডিকেট মুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে আমিরুল হক বলেন, এভাবে চলতে থাকলে দেশের আমদানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়বে।

সূত্র অনুযায়ী, দেশের আমদানি বাণিজ্যের ১০ কোটি টনের বেশি পণ্য প্রতি বছর বহির্নোঙর থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পরিবাহিত হয়। এই কার্যক্রমে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি লাইটারেজ জাহাজ নিয়োজিত রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা কয়লা, সিমেন্ট ক্লিংকার, গম, ডাল, সার, লবণ, পাথর, স্ল্যাগ, স্টিল, এইচআর কয়েল, সয়াবিন ভূষি, কোপ্রা, উড পাল্পসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বড় বড় মাদার ভ্যাসেল বহির্নোঙরে আসে। 

তবে ড্রাফটের কারণে এসব জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে না পারায় বহির্নোঙরে গ্র্যাব ও ক্রেনের মাধ্যমে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করা হয়। একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে একযোগে ৪ থেকে ৫টি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা থাকে। পরে এসব পণ্য কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের ৩০টির বেশি গন্তব্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এই কর্মযজ্ঞ এখন সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে বলে অভিযোগ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল বা বিডব্লিউটিসিসি সিরিয়াল প্রথা চালু করে। কিন্তু সিরিয়াল প্রথা নিয়ে জাহাজ মালিক এবং আমদানিকারকদের অনেক অভিযোগ। সিরিয়াল প্রথা না মেনে কয়েকশ লাইটারেজ জাহাজ পণ্য পরিবহন করছে। প্রভাবশালী নেতাদের জাহাজগুলো সিরিয়াল প্রথা না মেনে নিজেদের মতো করে একের পর এক ট্রিপ মারছে, পণ্য পরিবহন করছে। তাদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনা যাচ্ছে না। 

অপরদিকে যেসব আমদানিকারক সিরিয়ালবিহীন জাহাজ দিয়ে পণ্য পরিবহন করছেন তারা যে পণ্য টনপ্রতি ৪০০ টাকায় পরিবহন করছেন সিরিয়াল প্রথা অনুসরণ করা আমদানিকারকদের সেই পণ্য টনপ্রতি ৬০০ টাকার বেশি দিয়ে পরিবহন করতে হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ এবং বড় বড় আমদানিকারকেরা নিজেদের জাহাজ দিয়ে আরো কম খরচে পণ্য পরিবহন করছেন। এতে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত ছোট আমদানিকারকেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাজার থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা করছেন।

মোহাম্মদ আজাদ নামে একজন জাহাজ মালিক ও আমদানিকারক বলেন, ‘আমি ছোট আমদানিকারক। আমার নিজের একটি জাহাজ আছে। অথচ আমার জাহাজ দিয়ে আমার পণ্য পরিবহন করতে পারি না। সিরিয়াল প্রথা অনুসরণ করতে গিয়ে আমাকে চড়া ভাড়ায় অন্য মালিকের জাহাজ নিতে হয়। আমার জাহাজ সিরিয়ালের অপেক্ষায় অলস সাগরে ভাসে। ’

মোহাম্মদ আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতিতে আমার পণ্য পরিবহনের জন্য আমি ট্রাক ভাড়া করব, যার থেকে কম পাব তার থেকে নেব। জাহাজের ক্ষেত্রেও তেমন হওয়া উচিত। আগে তো এমনই ছিল। এখন নেতারা সিন্ডিকেট করে নিজেদের জাহাজগুলো সিরিয়ালের বাইরে চালাচ্ছেন। অথচ আমাদের মতো সাধারণ মালিকদের জাহাজগুলোকে সিরিয়ালের নামে অলস বসিয়ে রাখছেন। মাসে গড়ে একটি ট্রিপ পায় না এমন শত শত জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজের নাবিকদের বেতনসহ আনুষাঙ্গিক খরচ যোগাতে মালিকেরা হিমশিম খাচ্ছেন।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে এই জাহাজ মালিক বলেন, ‘আইন হলে সবার জন্য হবে। একটি সিস্টেম হলে তা সবার জন্য হওয়া উচিত। এখন শিল্প গ্রুপ, বড় আমদানিকারক, জাহাজ মালিকদের নেতাদের কোনো সিস্টেম মানতে হবে না। সিস্টেম শুধু আমাদের মতো সাধারণ মালিকদের মানতে হবে। এটি আমাদেরকে বাজার ছাড়া করার ষড়যন্ত্র।’

তথ্যমতে, সিরিয়ালবিহীন জাহাজ চলাচল বেড়ে যাওয়ায় বিডব্লিউটিসিসি প্রতিদিন বার্থিং মিটিংও করতে পারছে না। আমদানিকারকদের জাহাজ দিতে পারছে না। অসংখ্য জাহাজ সিরিয়ালের তোয়াক্কা না করে নিজেদের মতো করে পণ্য পরিবহন করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লাইটার জাহাজ মালিক বলেন, চট্টগ্রামে প্রায় ১ হাজার ৮০০ লাইটার জাহাজ থাকলেও সিরিয়াল প্রথা কেউ মানতে চান না। সিরিয়াল মেনে চললে মাসে এক-দুইবার ভাড়া পাওয়া যায়, আর সিরিয়ালের বাইরে চললে চার-ছয়বার ভাড়া পাওয়া যায়। তার দাবি, বর্তমানে ৪ শতাধিক লাইটার জাহাজ ঢাকা, পায়রা ও তালতলী রুটে চলছে। এতে চট্টগ্রামে সংকট তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সময়মতো মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করতে না পারায় আমাদের একটি সদস্য প্রতিষ্ঠানকে দশ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। অথচ এশিয়া বাল্ক মেরিটাইম প্রাইভেট লিমিটেড নামের এই প্রতিষ্ঠানের সাথে ওই জাহাজের পণ্য খালাসের কোনো সম্পর্ক নেই। শিপিং এজেন্সির কাজ হলো বিদেশি মাদার ভ্যাসেলের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে জাহাজ এবং নাবিকদের দেখভাল করা। 

ওই নেতা আরও বলেন, ‘পণ্য খালাসের সাথে জড়িত আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং লাইটারেজ জাহাজ। তারা যদি শুল্ক কর পরিশোধ করে কাগজপত্র ঠিকভাবে উপস্থাপন এবং পণ্য খালাসের জন্য লাইটারেজ জাহাজ মাদার ভ্যাসেলের কাছ না পাঠায় তাহলে পণ্য খালাস হবে কীভাবে? পণ্য খালাস ব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে শিপিং এজেন্সির কোনো ভূমিকা নেই, অথচ বন্দর জরিমানা করল শিপিং এজেন্সিকে। এটা পরিশোধ করতে হবে বিদেশি মাদার ভ্যাসেলের মালিককে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তারা যদি আর চট্টগ্রাম বন্দরে ভাড়া নিয়ে আসতে না চায় বা বাড়তি চার্জ দাবি করে তার দায় কে নেবে?

বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সিনিয়র সহসভাপতি নবী আলম বলেন, ‘লাইটার জাহাজের সংকট নেই। সংকট রয়েছে সমন্বয়ের। অনেক অসাধু জাহাজ মালিক বেশি ভাড়া পাওয়ার আশায় সিরিয়াল প্রথা মানেন না। তারা অন্য রুটে জাহাজ পরিচালনা করতে মাস্টারকে বাধ্য করেন।

বাংলাদেশের লাইটার জাহাজ বা কার্গো ভেসেল মালিকদের নিবন্ধিত সংগঠন বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভোয়া) সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ আলম বলেন, সিরিয়াল নিয়ে একটু সমস্যা হতে পারে। এটা বড় কোনো বিষয় নয়। আমাদের সবার আগে মূল সমস্যাটা কোথায়, সেটা চিহ্নিত করতে হবে। শুধু লাইটার জাহাজকে জরিমানা করলে হবে না। 

খুরশিদ আলম আরও বলেন, ‘অনেক আমদানিকারক পণ্য যথাসময়ে খালাস করেন না। তারা লাইটার জাহাজে পণ্য রেখে দেন। এমনও দেখা গেছে, আমদানিকারক দুই মাসেও পণ্য খালাস করেনি। একটা লাইটার জাহাজ যদি দুই মাস ওই পণ্য নিয়ে বসে থাকে, তাহলে সংকট তো হবেই। সরকার, ডিজি শিপিংকে এই জায়গায় নজর দিতে হবে। নইলে এই সমস্যার সমাধান কখনোই হবে না।’

বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদ বলেন, চারশর বেশি লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়াল প্রথা না মেনে পণ্য পরিবহন করছে। আমরা নানাভাবে চেষ্টা করেও তাদের সিরিয়ালে আনতে পারছি না।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত