সংবাদ

চার টাকার বিদ্যুৎ বিল এখন ১৩ টাকা


প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

চার টাকার বিদ্যুৎ বিল এখন ১৩ টাকা
মাছ বাঁচাতে অক্সিজেন দেওয়ার যন্ত্র (এয়ারেশন মেশিন)। ছবি : সংবাদ

জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড়ে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষির মানচিত্র বদলে গেছে। অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা আর মাটির লোনাভাবে ধান চাষ এখন প্রায় অসম্ভব। টিকে থাকার লড়াইয়ে কৃষকেরা বেছে নিয়েছেন সমন্বিত চাষ–একই জমিতে ধান, মাছ আর পাড়ের সবজি। কিন্তু কৃষকের এই অভিযোজন লড়াইয়ে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ বিল। মাছ বাঁচাতে অক্সিজেন দেওয়ার যন্ত্র (এয়ারেশন মেশিন) চালালেই কৃষি সেচের বদলে বিল আসছে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ হারে। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলার হাজারো চাষি।

জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে সাতক্ষীরায় সমন্বিত চাষের পরিধি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। কৃষি ও মৎস্য বিভাগও এটিকে জলবায়ু সহনশীল পদ্ধতি হিসেবে উৎসাহিত করছে। তবে মাঠপর্যায়ে বিদ্যুৎ নীতির মারপ্যাঁচে এই আশার আলো এখন ফিকে হতে বসেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ধান বা সবজি চাষের সেচে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৮০ পয়সা। কিন্তু মাছের জন্য এয়ারেশন মেশিন চালালেই সেটিকে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ হিসেবে গণ্য করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ফলে ইউনিটের দাম বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৩ টাকা ৪৯ পয়সা। সেই সঙ্গে কৃষিখাতের ২০ শতাংশ সরকারি ভর্তুকিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নিলেখালী গ্রামের কৃষক নারায়ণ সরকার আক্ষেপ করে বলেন, ‘ধান চাষে লাভ নেই বলে মাছ আর সবজি করছি। কিন্তু বিল আসছে যেন আমরা বড় কারখানা চালাচ্ছি। মাছ বাঁচাতে মেশিন তো চালাতেই হবে, কিন্তু এই বিল দিলে ঘরে খাওয়ার টাকা থাকবে না।’

একই গ্রামের বিভূতি সরকারের বিলের কপিতে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। জুন মাসে তার বিল ছিল ৬ হাজার ২৪০ টাকা। কিন্তু জুলাই মাসে সংযোগের ধরন বদলে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ করায় বিল দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬৮ টাকা। এক লাফে বিল বেড়েছে প্রায় চার গুণ। বিলের ভয়ে অনেক কৃষক রাতে মেশিন চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন, যা মাছের মড়কের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী একই মিটারে একাধিক উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার হলে সর্বোচ্চ হারের শ্রেণিটি কার্যকর হয়। সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মুহা. আজিজুর রহমান সরকার বলেন, ‘কোনো গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে আবেদন করতে পারেন, আমরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করব।’ 

তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন অন্য কথা। নাগরিক নেতা মাধব দত্ত বলেন, ‘উপকূলের কৃষকদের টিকে থাকার একমাত্র পথ এই সমন্বিত চাষ। এটাকে শিল্প হিসেবে ধরলে কৃষক ও কৃষি–উভয়ই ধ্বংস হয়ে যাবে।’ 

কৃষকদের দাবি, সমন্বিত চাষকে পূর্ণাঙ্গভাবে কৃষি সেচের আওতায় আনতে হবে এবং পূর্বের বকেয়া বা বাড়তি আদায় করা অর্থ সমন্বয় করতে হবে। অন্যথায় লোনা জলের এই জনপদে কৃষকের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬


চার টাকার বিদ্যুৎ বিল এখন ১৩ টাকা

প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

জলবায়ু পরিবর্তনের মরণকামড়ে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষির মানচিত্র বদলে গেছে। অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা আর মাটির লোনাভাবে ধান চাষ এখন প্রায় অসম্ভব। টিকে থাকার লড়াইয়ে কৃষকেরা বেছে নিয়েছেন সমন্বিত চাষ–একই জমিতে ধান, মাছ আর পাড়ের সবজি। কিন্তু কৃষকের এই অভিযোজন লড়াইয়ে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ বিল। মাছ বাঁচাতে অক্সিজেন দেওয়ার যন্ত্র (এয়ারেশন মেশিন) চালালেই কৃষি সেচের বদলে বিল আসছে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ হারে। এতে বিপাকে পড়েছেন জেলার হাজারো চাষি।

জেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে সাতক্ষীরায় সমন্বিত চাষের পরিধি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। কৃষি ও মৎস্য বিভাগও এটিকে জলবায়ু সহনশীল পদ্ধতি হিসেবে উৎসাহিত করছে। তবে মাঠপর্যায়ে বিদ্যুৎ নীতির মারপ্যাঁচে এই আশার আলো এখন ফিকে হতে বসেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, ধান বা সবজি চাষের সেচে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৮০ পয়সা। কিন্তু মাছের জন্য এয়ারেশন মেশিন চালালেই সেটিকে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ হিসেবে গণ্য করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ফলে ইউনিটের দাম বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৩ টাকা ৪৯ পয়সা। সেই সঙ্গে কৃষিখাতের ২০ শতাংশ সরকারি ভর্তুকিও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার নিলেখালী গ্রামের কৃষক নারায়ণ সরকার আক্ষেপ করে বলেন, ‘ধান চাষে লাভ নেই বলে মাছ আর সবজি করছি। কিন্তু বিল আসছে যেন আমরা বড় কারখানা চালাচ্ছি। মাছ বাঁচাতে মেশিন তো চালাতেই হবে, কিন্তু এই বিল দিলে ঘরে খাওয়ার টাকা থাকবে না।’

একই গ্রামের বিভূতি সরকারের বিলের কপিতে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। জুন মাসে তার বিল ছিল ৬ হাজার ২৪০ টাকা। কিন্তু জুলাই মাসে সংযোগের ধরন বদলে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ করায় বিল দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬৮ টাকা। এক লাফে বিল বেড়েছে প্রায় চার গুণ। বিলের ভয়ে অনেক কৃষক রাতে মেশিন চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন, যা মাছের মড়কের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী একই মিটারে একাধিক উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার হলে সর্বোচ্চ হারের শ্রেণিটি কার্যকর হয়। সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মুহা. আজিজুর রহমান সরকার বলেন, ‘কোনো গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে আবেদন করতে পারেন, আমরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করব।’ 

তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন অন্য কথা। নাগরিক নেতা মাধব দত্ত বলেন, ‘উপকূলের কৃষকদের টিকে থাকার একমাত্র পথ এই সমন্বিত চাষ। এটাকে শিল্প হিসেবে ধরলে কৃষক ও কৃষি–উভয়ই ধ্বংস হয়ে যাবে।’ 

কৃষকদের দাবি, সমন্বিত চাষকে পূর্ণাঙ্গভাবে কৃষি সেচের আওতায় আনতে হবে এবং পূর্বের বকেয়া বা বাড়তি আদায় করা অর্থ সমন্বয় করতে হবে। অন্যথায় লোনা জলের এই জনপদে কৃষকের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়বে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত