সহিংস পরিস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, আতঙ্ক ও আসন্ন সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে প্রাত্যহিক জীবনে ঘুমাতে না পারা, খাওয়া-দাওয়ার প্রতি অনীহা এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাভাবিক সামঞ্জস্য বজায় রাখতে না পারার মতো বহুমাত্রিক জটিলতা দেখা দিয়েছে।
ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের ডিসঅর্ডার তথা মানসিক জটিলতা। মানুষ হয়ে পড়ছেন ‘ট্রমাটাইজড’। এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে দেখা দিতে পারে ‘ডিপ্রেশন’ ও ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’-এর মতো মানসিক সমস্যা।
মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মতে, বর্তমানে চলমান অশান্তি ও উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যে যে মনোদৈহিক ও মনোসামাজিক বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা তাদের শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। এর ফলে বিনষ্ট হচ্ছে তাদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতা।
সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ততা। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে মানুষ যখন স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে পারেন না, তখন তাদের সৃজনশীলতাও ব্যাহত হয়। এতে দৈনন্দিন কাজকর্মে আচরণগত বিক্ষিপ্ততা ও অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
এমন অবস্থায় অপরিচিত মুহূর্তগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তথা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছেন। তারা এমন সব আচরণ করছেন, যা সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য সামাজিকতা এবং মানবিকতার পরিপন্থী। অতিউৎসাহী হয়ে মানুষ নেতিবাচক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। অংশগ্রহণ করছেন অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডে। ভেঙে পড়ছে সামাজিক স্থিতিশীলতা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এসব আচরণ মনোবৈকল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মানুষ অসামাজিক কাজ করছেন। এতে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্য। সহনশীলতা হারিয়ে অনেকে হয়ে পড়ছেন অসহিষ্ণু। করে ফেলছেন অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক কাজ। বিরুদ্ধ মতের রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী, কার্যালয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কর্মী ও থানায়ও হামলার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিতিশীল পারিপার্শ্বিকতা, যা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এটি একটি ভঙ্গুর সমাজকাঠামো গড়ে তুলছে। যে সমাজকাঠামো আমাদের কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাশিত নয়। আনুপূর্বিক এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে আমাদের সমাজবাস্তবতা আরও অশান্ত পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে, যা ভয়ঙ্কর পরিণতির জন্ম দিতে পারে।
তবে ইতিবাচক আত্ম-উপলব্ধির কারণে অনেকে লুটপাটের মাধ্যমে নেয়া বস্তুগত সম্পদ ইতোমধ্যে ফেরত দিচ্ছেন। এই ইতিবাচক উপলব্ধিকে উপজীব্য করে জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নেতিবাচক ও ইতিবাচক পরিস্থিতিকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিকীকরণের ধারায় প্রবাহিত করতে অনতিবিলম্বে মনোবৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক মনোস্বাস্থ্যসেবা চালু করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে জন্ম নেয়া নেতিবাচক মনস্তত্ত্বকে ইতিবাচকভাবে রূপান্তর করতে পারেন এবং মনোবৈকল্য থেকে বেরিয়ে এসে ইতিবাচক ও মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হতে পারেন।
পর্যায়ক্রমিক এই মনোদৈহিক ও মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক সেবা একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সমাজকাঠামো গড়ে তুলতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে একটি মানবিক সমাজ। আর মানুষ হয়ে উঠতে পারেন প্রশান্ত মন ও মননের মানবিক মানুষ।
এই মানবিক মানুষের মননশীল ও ইতিবাচক আচরণ নিশ্চিত করতে পারে একটি সহনশীল ও সম্প্রীতিপূর্ণ সামাজিক অবকাঠামো। এর জন্য প্রয়োজন মনোবৈজ্ঞানিক মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা কাঠামো। আর তা তখনই সম্ভব হবে, যখন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রকে সহজলভ্য ও প্রশস্ত করা হবে, যাতে মানুষ বাধাহীনভাবে আচরণবিজ্ঞানের এই সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে তাই নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত বিবেচনার জন্য দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে একটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ কর্মসূচি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে নিম্নোক্ত কর্মপ্রস্তাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে।
উল্লিখিত কর্মপ্রস্তাবনা গ্রহণ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা একটি প্রশান্ত ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব- মনোবিজ্ঞানী জ্যাকব লেভি মোরেনো যাকে ‘থেরাপিউটিক সোসাইটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
জাতীয়ভাবে ঔষধবিহীন তথা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডভিত্তিক মনোচিকিৎসা পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘জাতীয় মনোবৈজ্ঞানিক সেবা পরিকাঠামো ও অবকাঠামো’ গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ অত্যাবশ্যক।
কেননা প্রচলিত সাইকোথেরাপির পাশাপাশি ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ অনুশীলনের মাধ্যমে স্বল্প সময় ও আর্থিক বিনিয়োগে অধিক মানুষের জন্য মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ একটি দলীয় মনোস্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক মানুষের মানসিক সুস্থতা ও ইতিবাচক অভিব্যক্তি বিকাশে কাজ করা যায়।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জনসংখ্যার জনমিতি ও বয়সভিত্তিক বৈচিত্র্য এবং নিম্ন আয়ের মানুষের পরিসংখ্যান বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’কে চলমান স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা একটি যৌক্তিক ও কার্যকর কর্মপ্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা ‘কিশোর গ্যাং’-এর সদস্যদের তালিকাভুক্ত করে সংশোধনাগারের কাঠামোয় এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপিভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে তাদের একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক মনোবৃত্তিসম্পন্ন জনসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সহিংসতায় দেখা গেছে, ‘কিশোর গ্যাং’ হিসেবে পরিচিত এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ব্যাপক হারে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল এবং এখনও আছে। সুবিধাবাদীরা তাদের ব্যবহার করছে নিজস্ব চাহিদা পূরণের নেতিবাচক অভিপ্রায়ে।
অনুরূপভাবে, মনোবৈকল্যে ভুগছেন এমন নাগরিকদের চিহ্নিত করে তাদের অংশগ্রহণে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ সেশন আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ইতিবাচক মনস্তত্ত্বসম্পন্ন দক্ষ ও কর্মক্ষম জনসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
এই জনসম্পদকে আমরা গঠনমূলক কাজে এবং দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারি। তারা তাদের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবেন। এটি ভঙ্গুর সমাজকাঠামো পুনর্গঠনে জনহিতকর ভূমিকা রাখবে।
কারণ ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ অভিব্যক্তিমূলক একটি মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন ও ইতিবাচক মনোভাব গঠনের প্রক্রিয়া। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণশৈলী। এই শৈলী মানুষের অভিব্যক্তিকে তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক খাতে প্রবাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক তথা দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের কাছে বিনীত অনুরোধ— দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রস্তাবিত কর্মকৌশল ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ প্রদানের জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক সেবা প্রদানের জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চলমান সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি একটি গঠনমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত হয়।
[লেখক: সাধারণ সম্পাদক, মেন্টাল হেলথ অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েশন]

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬
সহিংস পরিস্থিতির কারণে মানুষের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, আতঙ্ক ও আসন্ন সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে প্রাত্যহিক জীবনে ঘুমাতে না পারা, খাওয়া-দাওয়ার প্রতি অনীহা এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাভাবিক সামঞ্জস্য বজায় রাখতে না পারার মতো বহুমাত্রিক জটিলতা দেখা দিয়েছে।
ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের ডিসঅর্ডার তথা মানসিক জটিলতা। মানুষ হয়ে পড়ছেন ‘ট্রমাটাইজড’। এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে দেখা দিতে পারে ‘ডিপ্রেশন’ ও ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’-এর মতো মানসিক সমস্যা।
মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মতে, বর্তমানে চলমান অশান্তি ও উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যে যে মনোদৈহিক ও মনোসামাজিক বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা তাদের শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। এর ফলে বিনষ্ট হচ্ছে তাদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতা।
সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ততা। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে মানুষ যখন স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে পারেন না, তখন তাদের সৃজনশীলতাও ব্যাহত হয়। এতে দৈনন্দিন কাজকর্মে আচরণগত বিক্ষিপ্ততা ও অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে।
এমন অবস্থায় অপরিচিত মুহূর্তগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তথা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছেন। তারা এমন সব আচরণ করছেন, যা সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য সামাজিকতা এবং মানবিকতার পরিপন্থী। অতিউৎসাহী হয়ে মানুষ নেতিবাচক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন। অংশগ্রহণ করছেন অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ডে। ভেঙে পড়ছে সামাজিক স্থিতিশীলতা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এসব আচরণ মনোবৈকল্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মানুষ অসামাজিক কাজ করছেন। এতে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্প্রীতি ও ঐক্য। সহনশীলতা হারিয়ে অনেকে হয়ে পড়ছেন অসহিষ্ণু। করে ফেলছেন অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক কাজ। বিরুদ্ধ মতের রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী, কার্যালয়, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কর্মী ও থানায়ও হামলার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিতিশীল পারিপার্শ্বিকতা, যা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এটি একটি ভঙ্গুর সমাজকাঠামো গড়ে তুলছে। যে সমাজকাঠামো আমাদের কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাশিত নয়। আনুপূর্বিক এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে আমাদের সমাজবাস্তবতা আরও অশান্ত পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাবে, যা ভয়ঙ্কর পরিণতির জন্ম দিতে পারে।
তবে ইতিবাচক আত্ম-উপলব্ধির কারণে অনেকে লুটপাটের মাধ্যমে নেয়া বস্তুগত সম্পদ ইতোমধ্যে ফেরত দিচ্ছেন। এই ইতিবাচক উপলব্ধিকে উপজীব্য করে জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নেতিবাচক ও ইতিবাচক পরিস্থিতিকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিকীকরণের ধারায় প্রবাহিত করতে অনতিবিলম্বে মনোবৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত। লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক মনোস্বাস্থ্যসেবা চালু করা প্রয়োজন, যাতে মানুষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে জন্ম নেয়া নেতিবাচক মনস্তত্ত্বকে ইতিবাচকভাবে রূপান্তর করতে পারেন এবং মনোবৈকল্য থেকে বেরিয়ে এসে ইতিবাচক ও মানবিক আচরণে অভ্যস্ত হতে পারেন।
পর্যায়ক্রমিক এই মনোদৈহিক ও মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক সেবা একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির সমাজকাঠামো গড়ে তুলতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে একটি মানবিক সমাজ। আর মানুষ হয়ে উঠতে পারেন প্রশান্ত মন ও মননের মানবিক মানুষ।
এই মানবিক মানুষের মননশীল ও ইতিবাচক আচরণ নিশ্চিত করতে পারে একটি সহনশীল ও সম্প্রীতিপূর্ণ সামাজিক অবকাঠামো। এর জন্য প্রয়োজন মনোবৈজ্ঞানিক মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা কাঠামো। আর তা তখনই সম্ভব হবে, যখন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রকে সহজলভ্য ও প্রশস্ত করা হবে, যাতে মানুষ বাধাহীনভাবে আচরণবিজ্ঞানের এই সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
সামগ্রিক অবস্থা ও প্রয়োজনীয়তার নিরিখে তাই নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত বিবেচনার জন্য দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশে একটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ কর্মসূচি গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে নিম্নোক্ত কর্মপ্রস্তাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে।
উল্লিখিত কর্মপ্রস্তাবনা গ্রহণ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আমরা একটি প্রশান্ত ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে পারব- মনোবিজ্ঞানী জ্যাকব লেভি মোরেনো যাকে ‘থেরাপিউটিক সোসাইটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
জাতীয়ভাবে ঔষধবিহীন তথা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডভিত্তিক মনোচিকিৎসা পদ্ধতিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি ‘জাতীয় মনোবৈজ্ঞানিক সেবা পরিকাঠামো ও অবকাঠামো’ গড়ে তুলতে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ অত্যাবশ্যক।
কেননা প্রচলিত সাইকোথেরাপির পাশাপাশি ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ অনুশীলনের মাধ্যমে স্বল্প সময় ও আর্থিক বিনিয়োগে অধিক মানুষের জন্য মনোসামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ একটি দলীয় মনোস্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক মানুষের মানসিক সুস্থতা ও ইতিবাচক অভিব্যক্তি বিকাশে কাজ করা যায়।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জনসংখ্যার জনমিতি ও বয়সভিত্তিক বৈচিত্র্য এবং নিম্ন আয়ের মানুষের পরিসংখ্যান বিবেচনায় দ্রুততম সময়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’কে চলমান স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা একটি যৌক্তিক ও কার্যকর কর্মপ্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা ‘কিশোর গ্যাং’-এর সদস্যদের তালিকাভুক্ত করে সংশোধনাগারের কাঠামোয় এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপিভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে তাদের একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক মনোবৃত্তিসম্পন্ন জনসম্পদে পরিণত করা সম্ভব হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সহিংসতায় দেখা গেছে, ‘কিশোর গ্যাং’ হিসেবে পরিচিত এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ব্যাপক হারে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল এবং এখনও আছে। সুবিধাবাদীরা তাদের ব্যবহার করছে নিজস্ব চাহিদা পূরণের নেতিবাচক অভিপ্রায়ে।
অনুরূপভাবে, মনোবৈকল্যে ভুগছেন এমন নাগরিকদের চিহ্নিত করে তাদের অংশগ্রহণে ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ সেশন আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে ইতিবাচক মনস্তত্ত্বসম্পন্ন দক্ষ ও কর্মক্ষম জনসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
এই জনসম্পদকে আমরা গঠনমূলক কাজে এবং দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারি। তারা তাদের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবেন। এটি ভঙ্গুর সমাজকাঠামো পুনর্গঠনে জনহিতকর ভূমিকা রাখবে।
কারণ ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ অভিব্যক্তিমূলক একটি মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন ও ইতিবাচক মনোভাব গঠনের প্রক্রিয়া। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো অভিজ্ঞতাকেন্দ্রিক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণশৈলী। এই শৈলী মানুষের অভিব্যক্তিকে তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক খাতে প্রবাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক তথা দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের কাছে বিনীত অনুরোধ— দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রস্তাবিত কর্মকৌশল ‘এক্সপ্রেসিভ সাইকোথেরাপি’ প্রদানের জন্য দক্ষ জনবল গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি লক্ষ্য জনগোষ্ঠীভিত্তিক সেবা প্রদানের জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চলমান সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি একটি গঠনমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত হয়।
[লেখক: সাধারণ সম্পাদক, মেন্টাল হেলথ অ্যাডভোকেসি অ্যাসোসিয়েশন]

আপনার মতামত লিখুন