মাতামুহুরী, স্মৃতি ও বর্ষার অন্তর্লোক
কিছু ঋতু মানুষের অন্তর্জগতে জন্ম নেয়। বর্ষা তেমনই এক ঋতু। সে শুধু আকাশে মেঘ ডেকে আনে না; বহুদিন নীরব হয়ে থাকা স্মৃতির জানালাও খুলে দেয়। আষাঢ়ের প্রথম বাতাস বইলেই মানুষের অন্তরে যেন কোনো সুপ্ত নদী আবার জেগে ওঠে।
পার্বত্য জনপদের নদীগুলোর মধ্যে মাতামুহুরী এমনই এক প্রবহমান স্মৃতিধারা। পাহাড়ের ছায়া, অরণ্যের স্নিগ্ধ গন্ধ এবং মেঘের কোমল আলোকে সঙ্গী করে সে নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলে। এই নদীর তীরে দাঁড়িয়েই বহু মানুষ প্রথম বর্ষাকে কেবল দেখেনি; ধীরে ধীরে তাকে অনুভব করতেও শিখেছে। কারণ বর্ষা দৃশ্যের চেয়ে অনুভবের বিষয়ই বেশি। পাহাড়ে মেঘ নামারও একটি নিজস্ব ভঙ্গি আছে। দূরের শৈলশিরা ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যায়। কুয়াশা ও মেঘ মিলে নির্মাণ করে এক অপার্থিব আবরণ। মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজের মুখটি নিঃশব্দে ঢেকে নিয়ে গভীর আত্মমগ্নতায় নিমগ্ন হয়েছে। চারদিকে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। আছে কেবল এক নীরব রূপান্তর।
বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে নদীর ভাষাও বদলে যায়। শুষ্ক ঋতুর চঞ্চলতা মিলিয়ে গিয়ে তার প্রবাহ হয়ে ওঠে গভীর, ধীর এবং বিস্তৃত। তখন মনে হয়, নদীর বুক বেয়ে কেবল জল নয়, সময়ও প্রবাহিত হচ্ছে। মানুষ দীর্ঘক্ষণ সেই স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকে। পরে উপলব্ধি করে, প্রকৃতির কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্য সব সময় উত্তর খোঁজা নয়; অনেক সময় নিজের অন্তর্লোকের নীরবতাকে চিনে নেয়াও। শৈশবের বহু শিক্ষা ভাষায় প্রকাশিত হয় না; তারা অনুভূতির স্তরে জমা থাকে। বর্ষার জলে একটি ফোঁটা পড়ে। জলের বুকে জন্ম নেয় একটি বৃত্ত। কিছুক্ষণ পরে তা মিলিয়ে যায়। কিন্তু মিলিয়ে যাওয়ার আগে সে জলের মুখে এক মুহূর্তের কম্পন রেখে যায়। প্রকৃতির এই সামান্য দৃশ্যই মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর শিক্ষা বহন করে। তখন বোঝা যায়, স্থায়িত্বের চেয়ে স্পর্শ অনেক সময় অধিক অর্থবহ। মানুষের জীবনও অনেক ক্ষেত্রে তেমনি অস্তিত্বের দৈর্ঘ্যরে চেয়ে তার রেখে যাওয়া অনুরণনই অধিক মূল্যবান।
বর্ষার গন্ধেরও একটি স্মৃতিলোক আছে। ভেজা মাটি, কচি ঘাস, বাঁশপাতা এবং অরণ্যের সজল সুবাস মিলিয়ে যে অনুভূতির জন্ম হয়, তার কোনো অভিধানগত নাম নেই। কিন্তু বহু বছর পরও সেই গন্ধ মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে শৈশবের দরজায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সম্ভবত স্মৃতিরও নিজস্ব ঋতু আছে। সেই ঋতুর নাম বর্ষা।
পাহাড়ি বর্ষণ সমতলের বর্ষার মতো নয়। এখানে বৃষ্টি স্তরে স্তরে অবতীর্ণ হয়। কখনো মিহি পর্দার মতো। কখনো অবিরাম গম্ভীর ধ্বনিতে। আবার কখনো হঠাৎ থেমে গিয়ে চারদিকে এমন এক নিস্তব্ধতা রেখে যায়, যেন প্রকৃতি নিজেই নিজের হৃদস্পন্দন শুনছে। বর্ষার দিনে নদীর ঘাটে বসে ভেসে চলা একটি শুকনো পাতার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা অনেকেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে না। কোনো ব্যাখ্যাও থাকে না। শুধু মনে হয়, পৃথিবীর সবকিছুই চলমান। নদী চলছে। মেঘ চলছে। বাতাস চলছে। মানুষও চলমান। অথচ এই নিরবচ্ছিন্ন গতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর স্থিতি।
জীবনের পথ বিস্তৃত হতে থাকে। মানুষ সাহিত্য পাঠ করে। সংগীত শোনে। দর্শনের নানা ধারা সম্পর্কে জানতে শেখে। তখন একসময় পরিচয় ঘটে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বর্ষামুখর রাগ মেঘমল্লার-এর সঙ্গে। কিন্তু এই রাগের প্রকৃত অনুভব অনেকের কাছে সংগীতশালায় নয়; বরং প্রকৃতির মধ্যেই প্রথম ধরা দেয়। মাতামুহুরীর বর্ষাসন্ধ্যা, পাহাড়ের মেঘছায়া কিংবা নদীর গম্ভীর প্রবাহ যেন বহু আগে থেকেই সেই রাগের নীরব অনুশীলন করে আসছে। মানুষের কণ্ঠ উচ্চারণ করার বহু পূর্বেই প্রকৃতি যেন নিজের ভাষায় মেঘমল্লার গেয়ে চলেছে। এই কারণেই মেঘমল্লার কেবল একটি রাগের নাম নয়। এটি এক গভীর অনুভূতির নাম। এমন এক অন্তর্লোকের অবস্থা, যখন প্রকৃতি মানুষের অদৃশ্য হৃদয়তন্ত্রীতে আলতো স্পর্শ রাখে। তখন কোনো উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না। এক ধরনের নীরব সুর অন্তরে জন্ম নেয়। সেই সুর কানে শোনা যায় না; অনুভূত হয় আত্মার গভীরে।
বর্ষা ফিরে এলেই মানুষের স্মৃতিতে প্রথম যে দৃশ্যটি জেগে ওঠে, তা অনেক সময় আকাশ নয়; কোনো নদী, কোনো পাহাড়, কোনো শৈশব কিংবা কোনো বিস্ময়ে ভরা প্রথম পৃথিবী। সময় মানুষকে বহুদূর নিয়ে যায়। জীবন বদলে যায়। কিন্তু বিস্ময়ের সেই প্রথম আলো পুরোপুরি নিভে যায় না। বর্ষার প্রথম মেঘ তাকে আবার নিঃশব্দে জাগিয়ে তোলে।
সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে স্থায়ী ঠিকানা তার অনুভূতি। সেই অনুভূতির ভেতরেই জন্মভূমি, নদী, পাহাড়, মানুষ এবং শৈশব এক অদৃশ্য ঐক্যে বেঁচে থাকে। মাতামুহুরী তাই কেবল একটি নদীর নাম নয়; এটি একটি স্মৃতি-ভূগোল, একটি সাংস্কৃতিক চেতনা এবং মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর নন্দনপ্রতীক। তখন উপলব্ধি জন্মায় নদী কেবল জলধারা নয়। পাহাড় কেবল ভূপ্রকৃতি নয়। বর্ষাও কেবল একটি ঋতু নয়। এরা মিলিত হয়ে মানুষের স্মৃতির এমন এক ভূগোল নির্মাণ করে, যেখানে সময়ের হিসাব মুছে যায়, কিন্তু অনুভূতির প্রতিধ্বনি থেকে যায়।
হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না। তারা নদীর মতোই প্রবাহিত হয়। ঋতুর পর ঋতু। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। মাতামুহুরীর জলরেখায়, পাহাড়ের মেঘছায়ায় এবং মানুষের অন্তর্জগতের গভীরে। সেই অবিরাম প্রবাহেরই এক নন্দনময় নাম মেঘমল্লারের নীল উপাখ্যান।
[লেখক: প্রধান শিক্ষক, অসতি ত্রিপুরা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলীকদম, বান্দরবান]

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬
মাতামুহুরী, স্মৃতি ও বর্ষার অন্তর্লোক
কিছু ঋতু মানুষের অন্তর্জগতে জন্ম নেয়। বর্ষা তেমনই এক ঋতু। সে শুধু আকাশে মেঘ ডেকে আনে না; বহুদিন নীরব হয়ে থাকা স্মৃতির জানালাও খুলে দেয়। আষাঢ়ের প্রথম বাতাস বইলেই মানুষের অন্তরে যেন কোনো সুপ্ত নদী আবার জেগে ওঠে।
পার্বত্য জনপদের নদীগুলোর মধ্যে মাতামুহুরী এমনই এক প্রবহমান স্মৃতিধারা। পাহাড়ের ছায়া, অরণ্যের স্নিগ্ধ গন্ধ এবং মেঘের কোমল আলোকে সঙ্গী করে সে নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে চলে। এই নদীর তীরে দাঁড়িয়েই বহু মানুষ প্রথম বর্ষাকে কেবল দেখেনি; ধীরে ধীরে তাকে অনুভব করতেও শিখেছে। কারণ বর্ষা দৃশ্যের চেয়ে অনুভবের বিষয়ই বেশি। পাহাড়ে মেঘ নামারও একটি নিজস্ব ভঙ্গি আছে। দূরের শৈলশিরা ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যায়। কুয়াশা ও মেঘ মিলে নির্মাণ করে এক অপার্থিব আবরণ। মনে হয়, প্রকৃতি যেন নিজের মুখটি নিঃশব্দে ঢেকে নিয়ে গভীর আত্মমগ্নতায় নিমগ্ন হয়েছে। চারদিকে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। আছে কেবল এক নীরব রূপান্তর।
বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে নদীর ভাষাও বদলে যায়। শুষ্ক ঋতুর চঞ্চলতা মিলিয়ে গিয়ে তার প্রবাহ হয়ে ওঠে গভীর, ধীর এবং বিস্তৃত। তখন মনে হয়, নদীর বুক বেয়ে কেবল জল নয়, সময়ও প্রবাহিত হচ্ছে। মানুষ দীর্ঘক্ষণ সেই স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকে। পরে উপলব্ধি করে, প্রকৃতির কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্য সব সময় উত্তর খোঁজা নয়; অনেক সময় নিজের অন্তর্লোকের নীরবতাকে চিনে নেয়াও। শৈশবের বহু শিক্ষা ভাষায় প্রকাশিত হয় না; তারা অনুভূতির স্তরে জমা থাকে। বর্ষার জলে একটি ফোঁটা পড়ে। জলের বুকে জন্ম নেয় একটি বৃত্ত। কিছুক্ষণ পরে তা মিলিয়ে যায়। কিন্তু মিলিয়ে যাওয়ার আগে সে জলের মুখে এক মুহূর্তের কম্পন রেখে যায়। প্রকৃতির এই সামান্য দৃশ্যই মানুষের জীবন সম্পর্কে গভীর শিক্ষা বহন করে। তখন বোঝা যায়, স্থায়িত্বের চেয়ে স্পর্শ অনেক সময় অধিক অর্থবহ। মানুষের জীবনও অনেক ক্ষেত্রে তেমনি অস্তিত্বের দৈর্ঘ্যরে চেয়ে তার রেখে যাওয়া অনুরণনই অধিক মূল্যবান।
বর্ষার গন্ধেরও একটি স্মৃতিলোক আছে। ভেজা মাটি, কচি ঘাস, বাঁশপাতা এবং অরণ্যের সজল সুবাস মিলিয়ে যে অনুভূতির জন্ম হয়, তার কোনো অভিধানগত নাম নেই। কিন্তু বহু বছর পরও সেই গন্ধ মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে শৈশবের দরজায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সম্ভবত স্মৃতিরও নিজস্ব ঋতু আছে। সেই ঋতুর নাম বর্ষা।
পাহাড়ি বর্ষণ সমতলের বর্ষার মতো নয়। এখানে বৃষ্টি স্তরে স্তরে অবতীর্ণ হয়। কখনো মিহি পর্দার মতো। কখনো অবিরাম গম্ভীর ধ্বনিতে। আবার কখনো হঠাৎ থেমে গিয়ে চারদিকে এমন এক নিস্তব্ধতা রেখে যায়, যেন প্রকৃতি নিজেই নিজের হৃদস্পন্দন শুনছে। বর্ষার দিনে নদীর ঘাটে বসে ভেসে চলা একটি শুকনো পাতার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা অনেকেরই পরিচিত অভিজ্ঞতা। কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে না। কোনো ব্যাখ্যাও থাকে না। শুধু মনে হয়, পৃথিবীর সবকিছুই চলমান। নদী চলছে। মেঘ চলছে। বাতাস চলছে। মানুষও চলমান। অথচ এই নিরবচ্ছিন্ন গতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর স্থিতি।
জীবনের পথ বিস্তৃত হতে থাকে। মানুষ সাহিত্য পাঠ করে। সংগীত শোনে। দর্শনের নানা ধারা সম্পর্কে জানতে শেখে। তখন একসময় পরিচয় ঘটে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বর্ষামুখর রাগ মেঘমল্লার-এর সঙ্গে। কিন্তু এই রাগের প্রকৃত অনুভব অনেকের কাছে সংগীতশালায় নয়; বরং প্রকৃতির মধ্যেই প্রথম ধরা দেয়। মাতামুহুরীর বর্ষাসন্ধ্যা, পাহাড়ের মেঘছায়া কিংবা নদীর গম্ভীর প্রবাহ যেন বহু আগে থেকেই সেই রাগের নীরব অনুশীলন করে আসছে। মানুষের কণ্ঠ উচ্চারণ করার বহু পূর্বেই প্রকৃতি যেন নিজের ভাষায় মেঘমল্লার গেয়ে চলেছে। এই কারণেই মেঘমল্লার কেবল একটি রাগের নাম নয়। এটি এক গভীর অনুভূতির নাম। এমন এক অন্তর্লোকের অবস্থা, যখন প্রকৃতি মানুষের অদৃশ্য হৃদয়তন্ত্রীতে আলতো স্পর্শ রাখে। তখন কোনো উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না। এক ধরনের নীরব সুর অন্তরে জন্ম নেয়। সেই সুর কানে শোনা যায় না; অনুভূত হয় আত্মার গভীরে।
বর্ষা ফিরে এলেই মানুষের স্মৃতিতে প্রথম যে দৃশ্যটি জেগে ওঠে, তা অনেক সময় আকাশ নয়; কোনো নদী, কোনো পাহাড়, কোনো শৈশব কিংবা কোনো বিস্ময়ে ভরা প্রথম পৃথিবী। সময় মানুষকে বহুদূর নিয়ে যায়। জীবন বদলে যায়। কিন্তু বিস্ময়ের সেই প্রথম আলো পুরোপুরি নিভে যায় না। বর্ষার প্রথম মেঘ তাকে আবার নিঃশব্দে জাগিয়ে তোলে।
সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে স্থায়ী ঠিকানা তার অনুভূতি। সেই অনুভূতির ভেতরেই জন্মভূমি, নদী, পাহাড়, মানুষ এবং শৈশব এক অদৃশ্য ঐক্যে বেঁচে থাকে। মাতামুহুরী তাই কেবল একটি নদীর নাম নয়; এটি একটি স্মৃতি-ভূগোল, একটি সাংস্কৃতিক চেতনা এবং মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর নন্দনপ্রতীক। তখন উপলব্ধি জন্মায় নদী কেবল জলধারা নয়। পাহাড় কেবল ভূপ্রকৃতি নয়। বর্ষাও কেবল একটি ঋতু নয়। এরা মিলিত হয়ে মানুষের স্মৃতির এমন এক ভূগোল নির্মাণ করে, যেখানে সময়ের হিসাব মুছে যায়, কিন্তু অনুভূতির প্রতিধ্বনি থেকে যায়।
হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না। তারা নদীর মতোই প্রবাহিত হয়। ঋতুর পর ঋতু। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। মাতামুহুরীর জলরেখায়, পাহাড়ের মেঘছায়ায় এবং মানুষের অন্তর্জগতের গভীরে। সেই অবিরাম প্রবাহেরই এক নন্দনময় নাম মেঘমল্লারের নীল উপাখ্যান।
[লেখক: প্রধান শিক্ষক, অসতি ত্রিপুরা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলীকদম, বান্দরবান]

আপনার মতামত লিখুন