সংবাদ

গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?


এইচ এম নাজমুল আলম
এইচ এম নাজমুল আলম
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?
গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

বাংলাদেশে গ্যাসের সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহু বছর ধরেই গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেন সেই পুরনো সমস্যাকে নতুন করে ভয়ংকর করে তুলেছে। সিএনজি স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সংকট, বাড়তে থাকা লোডশেডিং, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নেই। এটি ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতির সমস্যা হয়ে উঠছে। 

তবে এই সংকটকে শুধু এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল হবে। দুর্ঘটনাটি হয়তো বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে, কিন্তু সংকটের বীজ অনেক আগে থেকেই বপন করা হয়েছিল। দেশের পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, নতুন গ্যাসের সন্ধান প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, অথচ সেই আমদানি সামাল দেয়ার মতো অবকাঠামোও যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্যাস সংকট আসলে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা সম্পর্কে দুর্বল প্রস্তুতির ফল। 

বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক উৎপাদন ১, ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। একই সময়ে এলএনজি আমদানির পরিমাণ প্রায় ৪৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা এর চেয়ে অনেক বেশি। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও প্রতিদিন প্রায় ১, ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। 

অর্থনীতির একটি বড় অংশ যখন গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তখন এই ঘাটতি খুব দ্রুত অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। 

সবচেয়ে বড় ধাক্কা যাচ্ছে শিল্পে। একটি কারখানায় গ্যাস না থাকলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। শ্রমিক কাজ করতে পারে না, মেশিন বন্ধ থাকে, কাঁচামাল পড়ে থাকে, বিদেশি ক্রেতার অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করা যায় না। অথচ ব্যাংকের ঋণের কিস্তি থেমে থাকে না। শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, গুদাম ভাড়া, কাঁচামালের খরচ, সুদ, কর সব চলতে থাকে। 

বাংলাদেশে এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে একজন উদ্যোক্তা ভালো ব্যবসা করেও জ্বালানির অভাবে সমস্যায় পড়তে পারেন। তিনি হয়তো ঋণ নিয়েছেন, বিনিয়োগ করেছেন, শ্রমিক নিয়োগ করেছেন, রপ্তানির অর্ডার পেয়েছেন। কিন্তু উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস যদি না থাকে, তাহলে তার সব পরিকল্পনা থেমে যেতে পারে। 

অর্থাৎ গ্যাসের পাইপলাইনের সংকট একসময় ব্যাংকের ঋণখেলাপির সংকটে পরিণত হতে পারে। আমরা সাধারণত ঋণখেলাপি হলে উদ্যোক্তার দিকে আঙুল তুলি। ব্যবসায় ভুল হয়েছে কি না, ব্যবস্থাপনা দুর্বল ছিল কি না, ঋণ নেওয়ার সময় ঝুঁকি ঠিকমতো বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্ন করি। কিন্তু যদি কারখানা চালানোর মতো গ্যাসই না থাকে, তাহলে সেই ব্যবসার ব্যর্থতার দায় কতটা উদ্যোক্তার এবং কতটা রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত ব্যর্থতার, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে। 

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে শিল্পায়নের কথা বলছে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে, নতুন কারখানা হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু একটি কারখানা তৈরি করা আর সেটিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো এক বিষয় নয়। বিনিয়োগকারীকে শুধু জমি, কর সুবিধা বা ঋণ দিলেই হয় না। তাকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পরিবহন ও বন্দর সুবিধাও দিতে হয়। 

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় বাংলাদেশ ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে। সমুদ্রে দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ স্থাপন করা হয়। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১.১ বিলিয়ন ঘনফুট। তখন এটি ছিল প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যবস্থা কি দেশের ভবিষ্যৎ চাহিদার জন্য যথেষ্ট ছিল?

না। কারণ দুটি টার্মিনালের একটি সমস্যায় পড়লেই সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। একটি টার্মিনাল দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি শুধু শিল্পে নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি করেছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে এক দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৩, ৭০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর বাংলাদেশের বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। ফলে গ্যাস কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে, বিদ্যুৎ কমলে শিল্প উৎপাদন কমে এবং শিল্প উৎপাদন কমলে অর্থনীতিতে আবার নতুন চাপ তৈরি হয়। 

এটি অনেকটা ফড়সরহড় বভভবপঃ-এর মতো। একটি জায়গায় ধাক্কা লাগে, তারপর একে একে অন্য জায়গাগুলোও পড়ে যায়। 

দেশের গ্যাস উৎপাদন যে কমছে, সেটি বহু বছর ধরেই জানা। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে কমে আসে। নতুন কূপ খনন না করলে এবং নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার না করলে উৎপাদন আরও কমবে, এটিও নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়। তারপরও নতুন অনুসন্ধানের গতি চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। 

একসময় বাংলাদেশকে গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দেখা হতো। গ্যাসের ওপর নির্ভর করে শিল্প গড়ে উঠেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, সার কারখানা চালু হয়েছে, শহরের যানবাহনে সিএনজি জনপ্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাসকে কেন্দ্র করে আমরা একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছি। 

কিন্তু সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একই সময়ে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। এখন আমরা সেই পুরোনো সিদ্ধান্তগুলোর মূল্য দিচ্ছি। সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন সরকার অফশোর ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। ১৫০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগোচ্ছে। 

এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দরকার। কিন্তু সমস্যাটা হলো, এগুলোর কোনোটিই আজ কিংবা আগামীকাল গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পারবে না। 

একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করলেই পরদিন সেখান থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে ঢুকবে না। অনুসন্ধান, আবিষ্কার, মূল্যায়ন, উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। সমুদ্রের ক্ষেত্রে সময় আরও বেশি লাগতে পারে। নতুন এফএসআরইউ নির্মাণ বা রূপান্তরেও সময় প্রয়োজন। 

অর্থাৎ আজকের সংকটের সমাধান এবং আগামী দশকের সমাধান এক জিনিস নয়। সরকারকে এই দুই কাজ একই সঙ্গে করতে হবে। প্রথমে বর্তমান সংকট সামাল দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করা জরুরি। বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ আছে কি না, তা খুঁজে দেখতে হবে। ভোলার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে আনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। 

কিন্তু এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাজ থামানো যাবে না। এখানে অনশোর বা স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৭ সালের পর আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে স্থলভাগে বড় ধরনের অনুসন্ধান হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। যদি দেশের মাটির নিচে এখনও বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস থাকে, তাহলে সেটি খুঁজে বের করার কাজ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। 

একই সঙ্গে সমুদ্রেও অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা রয়েছে। সেখানে কী পরিমাণ গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি সম্পদ আছে, তার পূর্ণ চিত্র এখনও আমাদের হাতে নেই। অনুসন্ধান না করে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করা কোনো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি হতে পারে না। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এর অংশ এখনও সীমিত। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বিদ্যুৎ আমদানি এবং অন্যান্য জ্বালানি উৎসকে বাস্তবসম্মতভাবে জাতীয় পরিকল্পনায় আনতে হবে। কোন উৎস কতটা সাশ্রয়ী, কতটা নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটি বিবেচনা করে একটি বৈচিত্র্যময় জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। 

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো, আমরা অনেক সময় চাহিদা বাড়ার পর সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। অথচ জ্বালানি পরিকল্পনার কাজ হওয়া উচিত উল্টো। আগে ভবিষ্যতের চাহিদা অনুমান করতে হবে, তারপর সেই চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। 

তাই গ্যাসের সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: শিক্ষক, আইইউবিএটি]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬


গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ?

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে গ্যাসের সংকট নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহু বছর ধরেই গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যেন সেই পুরনো সমস্যাকে নতুন করে ভয়ংকর করে তুলেছে। সিএনজি স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সংকট, বাড়তে থাকা লোডশেডিং, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, সব মিলিয়ে গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নেই। এটি ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতির সমস্যা হয়ে উঠছে। 

তবে এই সংকটকে শুধু এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল হবে। দুর্ঘটনাটি হয়তো বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে, কিন্তু সংকটের বীজ অনেক আগে থেকেই বপন করা হয়েছিল। দেশের পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমছে, নতুন গ্যাসের সন্ধান প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, অথচ সেই আমদানি সামাল দেয়ার মতো অবকাঠামোও যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্যাস সংকট আসলে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা সম্পর্কে দুর্বল প্রস্তুতির ফল। 

বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক উৎপাদন ১, ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। একই সময়ে এলএনজি আমদানির পরিমাণ প্রায় ৪৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা এর চেয়ে অনেক বেশি। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও প্রতিদিন প্রায় ১, ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। 

অর্থনীতির একটি বড় অংশ যখন গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তখন এই ঘাটতি খুব দ্রুত অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। 

সবচেয়ে বড় ধাক্কা যাচ্ছে শিল্পে। একটি কারখানায় গ্যাস না থাকলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। শ্রমিক কাজ করতে পারে না, মেশিন বন্ধ থাকে, কাঁচামাল পড়ে থাকে, বিদেশি ক্রেতার অর্ডার সময়মতো সরবরাহ করা যায় না। অথচ ব্যাংকের ঋণের কিস্তি থেমে থাকে না। শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, গুদাম ভাড়া, কাঁচামালের খরচ, সুদ, কর সব চলতে থাকে। 

বাংলাদেশে এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে একজন উদ্যোক্তা ভালো ব্যবসা করেও জ্বালানির অভাবে সমস্যায় পড়তে পারেন। তিনি হয়তো ঋণ নিয়েছেন, বিনিয়োগ করেছেন, শ্রমিক নিয়োগ করেছেন, রপ্তানির অর্ডার পেয়েছেন। কিন্তু উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস যদি না থাকে, তাহলে তার সব পরিকল্পনা থেমে যেতে পারে। 

অর্থাৎ গ্যাসের পাইপলাইনের সংকট একসময় ব্যাংকের ঋণখেলাপির সংকটে পরিণত হতে পারে। আমরা সাধারণত ঋণখেলাপি হলে উদ্যোক্তার দিকে আঙুল তুলি। ব্যবসায় ভুল হয়েছে কি না, ব্যবস্থাপনা দুর্বল ছিল কি না, ঋণ নেওয়ার সময় ঝুঁকি ঠিকমতো বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্ন করি। কিন্তু যদি কারখানা চালানোর মতো গ্যাসই না থাকে, তাহলে সেই ব্যবসার ব্যর্থতার দায় কতটা উদ্যোক্তার এবং কতটা রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত ব্যর্থতার, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে। 

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে শিল্পায়নের কথা বলছে। নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে, নতুন কারখানা হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু একটি কারখানা তৈরি করা আর সেটিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো এক বিষয় নয়। বিনিয়োগকারীকে শুধু জমি, কর সুবিধা বা ঋণ দিলেই হয় না। তাকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পরিবহন ও বন্দর সুবিধাও দিতে হয়। 

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় বাংলাদেশ ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে। সমুদ্রে দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট বা এফএসআরইউ স্থাপন করা হয়। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১.১ বিলিয়ন ঘনফুট। তখন এটি ছিল প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যবস্থা কি দেশের ভবিষ্যৎ চাহিদার জন্য যথেষ্ট ছিল?

না। কারণ দুটি টার্মিনালের একটি সমস্যায় পড়লেই সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। একটি টার্মিনাল দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি শুধু শিল্পে নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি করেছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে এক দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৩, ৭০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর বাংলাদেশের বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। ফলে গ্যাস কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে, বিদ্যুৎ কমলে শিল্প উৎপাদন কমে এবং শিল্প উৎপাদন কমলে অর্থনীতিতে আবার নতুন চাপ তৈরি হয়। 

এটি অনেকটা ফড়সরহড় বভভবপঃ-এর মতো। একটি জায়গায় ধাক্কা লাগে, তারপর একে একে অন্য জায়গাগুলোও পড়ে যায়। 

দেশের গ্যাস উৎপাদন যে কমছে, সেটি বহু বছর ধরেই জানা। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে কমে আসে। নতুন কূপ খনন না করলে এবং নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার না করলে উৎপাদন আরও কমবে, এটিও নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়। তারপরও নতুন অনুসন্ধানের গতি চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। 

একসময় বাংলাদেশকে গ্যাসসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দেখা হতো। গ্যাসের ওপর নির্ভর করে শিল্প গড়ে উঠেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, সার কারখানা চালু হয়েছে, শহরের যানবাহনে সিএনজি জনপ্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাসকে কেন্দ্র করে আমরা একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছি। 

কিন্তু সেই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একই সময়ে যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। এখন আমরা সেই পুরোনো সিদ্ধান্তগুলোর মূল্য দিচ্ছি। সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন সরকার অফশোর ব্লকে অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। ১৫০টি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগোচ্ছে। 

এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দরকার। কিন্তু সমস্যাটা হলো, এগুলোর কোনোটিই আজ কিংবা আগামীকাল গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পারবে না। 

একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করলেই পরদিন সেখান থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে ঢুকবে না। অনুসন্ধান, আবিষ্কার, মূল্যায়ন, উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। সমুদ্রের ক্ষেত্রে সময় আরও বেশি লাগতে পারে। নতুন এফএসআরইউ নির্মাণ বা রূপান্তরেও সময় প্রয়োজন। 

অর্থাৎ আজকের সংকটের সমাধান এবং আগামী দশকের সমাধান এক জিনিস নয়। সরকারকে এই দুই কাজ একই সঙ্গে করতে হবে। প্রথমে বর্তমান সংকট সামাল দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করা জরুরি। বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ আছে কি না, তা খুঁজে দেখতে হবে। ভোলার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে আনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। 

কিন্তু এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাজ থামানো যাবে না। এখানে অনশোর বা স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৭ সালের পর আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে স্থলভাগে বড় ধরনের অনুসন্ধান হয়নি বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। যদি দেশের মাটির নিচে এখনও বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস থাকে, তাহলে সেটি খুঁজে বের করার কাজ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। 

একই সঙ্গে সমুদ্রেও অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা রয়েছে। সেখানে কী পরিমাণ গ্যাস বা অন্যান্য জ্বালানি সম্পদ আছে, তার পূর্ণ চিত্র এখনও আমাদের হাতে নেই। অনুসন্ধান না করে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করা কোনো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি হতে পারে না। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এর অংশ এখনও সীমিত। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বিদ্যুৎ আমদানি এবং অন্যান্য জ্বালানি উৎসকে বাস্তবসম্মতভাবে জাতীয় পরিকল্পনায় আনতে হবে। কোন উৎস কতটা সাশ্রয়ী, কতটা নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশের জন্য কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটি বিবেচনা করে একটি বৈচিত্র্যময় জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। 

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা হলো, আমরা অনেক সময় চাহিদা বাড়ার পর সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। অথচ জ্বালানি পরিকল্পনার কাজ হওয়া উচিত উল্টো। আগে ভবিষ্যতের চাহিদা অনুমান করতে হবে, তারপর সেই চাহিদা মেটানোর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। 

তাই গ্যাসের সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: শিক্ষক, আইইউবিএটি]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত