সংবাদ

একটি দিঘি হারানোর গল্প


হোসেন আবদুল মান্নান
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৪ এএম

একটি দিঘি হারানোর গল্প
দেশের অনেক জলাশয়ই দখল হয়ে যাচ্ছে

পৃথিবীতে প্রতিদিন লক্ষ কোটি প্রাণী ও জীববৈচিত্রে‍্যর মধ্যে  পরিবর্তন সংঘটিত হয়ে চলেছে। প্রকৃতিতে এমন দৃশ্যমান ও অদৃশ্যে বদলে যাওয়ার ভেতর দিয়েই সৃষ্টি ও ধ্বংসের খেলায় মেতে থাকছে মানুষ। চারপাশে অনবরত ঘটে চলেছে হাজারো পরিবর্তন যার সবকিছু মানুষের চর্মচোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু পরিবর্তন অব্যাহত থাকছে। প্রকৃতির এমন নিগূঢ় রহস্যাবৃত বিষয় নিয়ে ভাববার অবকাশ সাধারণ মানুষের থাকে না। এগুলো যেন  জীববিজ্ঞান তথা  প্রকৃতিপ্রেমীদের নিত্যনব পরীক্ষা ও গবেষণার বিষয়।

২.

এদেশের সর্বত্র জীবন ও প্রকৃতির সহায়ক-শক্তি হিসেবে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি হওয়া বিল-ঝিল, হাওর-বাউর,নদী-নালা, জলাশয়, পুরানো পুকুর, জলের বিচিত্র উৎসস্থল সবকিছুকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, বিলীন করে চলেছে মূলত একশ্রেণীর অবিমৃষ্যকারী, অদেশপ্রেমী,আবেগপ্রবণ তথা ক্ষমতাধর মানুষের হটকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। এসব নতুন নয়, চলে এসেছে বহু বছর ধরে। সরকার আসে, সরকার যায়, নতুন নতুন নীতিমালা হয়,আইন পাশ হয়, কঠোরতার মহড়া হয়, প্রচার হয়। তবে খুব বেশি কার্যকর কিছু হয়ে ওঠে না। যা হয় তা নেহায়েত লোকপ্রদর্শনের নিমিত্ত। আর এ ধরনের আত্মহত্যার সমান  পরিবেশ বিধ্বংসী সিদ্ধান্তগুলো আসে ক্ষমতাসীন শিক্ষিত মানুষের পক্ষ থেকে। দেশের জন্য এটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য ও দুর্ভাবনার কারণ।

৩.

কিশোরগঞ্জ জেলায় আমাদের গ্রামের বাড়ির অতি নিকটে একটা ঐতিহ্যবাহী বিশালাকৃতির পুকুর ছিল। তাই এটাকে পুকুর না বলে দিঘি বলা যায়। অভিধানের ভাষায়  বড় পুকুরকে দিঘি বলা হয়। সে এখন অর্ধেক মৃত। ট্রেনে কাটা পড়া দেহের মতন একাংশ নিয়েই সচল আছে। এর আয়তন কমপক্ষে ১৫ একর হবে। দিঘিটা আমার কাছে আজন্ম লালিত বিস্ময়জাগানো এক অদ্ভুত বস্তুর মতো ছিল। এর বিশালত্ব, চৌহদ্দির জঙ্গলাকীর্ণ গাছ আর বাঁশঝাড়ের দৃশ্য, চারপাশের ঘরবসতি, সবুজ ও লালচে রঙের কচুরিপানায় চাপাপড়া তার দীর্ঘ দেহ ইত্যাদি যা আমাকে শৈশব-কৈশোর অবধি ভাবিয়ে তুলেছিল। এমন পাড়াগাঁয়ে যেখানে হিন্দু রাজা জমিদারের অস্তিত্ব নেই কিন্তু এত বড় দিঘি  কিভাবে হল? কারা ছিল এর খননকারী? জায়গা জমির প্রকৃত মালিকই বা কারা ছিল? এসব প্রশ্নও আমাকে কম ভাবায় নি।

দিঘিটার উত্তর পার্শ্বে একখানা দরগাহ বা চুনের মাজার আছে। যার সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস সুস্পষ্ট ভাবে লেখায় কোথাও পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি আছে, ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষে ভারত উপমহাদেশে আগত এবং কথিত ১৬০ জন আউলিয়ার অন্যতম একজন হযরত মিয়াচান শাহ (র.) এর মাজার এটি। কেউ কেউ মনে করেন, দিঘিটা মাজারের সমান বয়েসী বা মাজারকে ঘিরেই দিঘি অস্তিত্ববান হয়ে টিকে আছে। আমার পূর্ববর্তী দুই পুরুষের জবানিতে পাওয়া তথ্য মতে এবং স্হানীয় শত বছরের বৃদ্ধের বক্তব্যে জানা গেছে, পুকুরটা ইতোমধ্যে  কয়েক শতাব্দীর পথ পেছনে ফেলে এসেছে। আমার কৈশোরের  কোমলপ্রাণ স্মৃতি হাতড়িয়ে এখনো দিব্যি চোখে দেখি, দিঘিজুড়ে শুধু দল-ধামে ভরা, নানা জাতের পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দ, লতাপাতায় পাখির বাসা, বিশেষ করে বক জাতীয় পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল এ দিঘি। সেকালে  যুগের পর যুগ চলে যেত এগুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ কেউ নিতেন না। 

তাছাড়া মাজারের জিন্দাপীরের পছন্দ অপছন্দ বলেও একটা মিথ চালু আছে। কাজেই গ্রামবাসী সচরাচর কোনো ঝুঁকি নিতেন না। কৈশোরে দেখেছি, অতিবৃষ্টিতে পুকুর ভরে গেলে পূর্বপাড় দিয়ে সরু ড্রেন করে পানি নামানো হত, সঙ্গে বড় বড় কৈ, শিং, মাগুরের মিছিল নেমে আসতো। এলাকাবাসী আনন্দ উল্লাসে মাছ ধরে নিত। দিঘিতে সারাবছরই বেশ গভীর পানি থাকতো। চৈত্রের খরতাপে যখন মাঠ-ঘাট, বন-বাদার বিরান, দাউ-দাউ আগুনের ফুলকি তখনও কচুরিপানা ঠেলে সে দিঘি থেকে শীতল জলের অমৃত সুধার পরশ পেত এলাকাবাসী। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে নিজেও কতবার যে এর কাকচক্ষু স্বচ্ছ জলে সিক্ত হয়েছি সে কথা কবে কে গুণে রাখে? এসব এখন শুধু নস্টালজিক, পেছনে ফেলে আসা স্মৃতির ধূসর বিবর্ণ দিনলিপি।

৪.

দিঘির উত্তর পাড়ে অলৌকিক ভাবে গড়ে ওঠা কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন যে দরগাহ শরীফ রয়েছে। এক সময়ে হযরত মিয়াচান শাহ'র চুনের দরগাহ নামে এর ব্যাপক পরিচিতি ছিল। এখন মাজার হিসেবে সুপরিচিত নাম। এক বিশাল বটবৃক্ষের নিচে দরগাহ'র গোলাকৃতির প্রধান গুম্বজসহ পাশে একাধিক কবরের আদলে তৈরি সাদা গুম্বজ রয়েছে। পরিস্কার পাক-পবিত্র টিলার চারদিকে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন দূরদূরান্তর থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষ দু-হাত তুলে প্রার্থনা করে। তারা নিভৃতে নানা কিছু মানত করে এবং অপেক্ষায় থাকে। এ সকল জিয়ারতকারীর গোপন চাওয়া-পাওয়ার গল্প ক’জন জানে? কথিত আছে, এই চুনের মাজারে মানত হিসেবে সাদা মনে কোনো কিছু দান করার বাসনা যেন রাতারাতি ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। এমন বিশ্বাস আর আস্থাশীল মানুষের আগমন এলাকাটিকে কালক্রমে লোক সমাগমে পরিণত করছে।

যা চল্লিশ, পঞ্চাশ বছর আগেও কল্পনাতীত বিষয় ছিল। আজকাল শিক্ষিত, অশিক্ষিত, নারী পুরুষ সকল শ্রেণির মানুষই মাজারের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন। নির্বাচন, পরীক্ষা, চাকরি প্রার্থীরাও অবলীলায় মানত করে তাদের কাজ শুরু করেন। এটা কিসের আলামত বোঝা দায়! উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক কালে আমাদের কিশোরগঞ্জের 'পাগলা মসজিদে'র দানবাক্স খোলার আয়োজন আর কিছুদিন পরপর কোটি কোটি টাকা গণনার মিডিয়া চিত্র তো দেশবাসীকে অবাক করেই চলেছে। এক সময়ে দরগাহ জিয়ারতে আসা মানুষ দিঘির পানিতে হাত লাগিয়ে অজু করে উপরে উঠে জিয়ারত করতেন। অজু করার সুবিধার্থে বিভিন্ন সময়ে পাকা ঘাটলা করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি মাজারের এক পাশে পৃথক নামাজের ব্যবস্হা করাও আছে। বলাবাহুল্য, স্মরণাতীত কাল থেকে একটা অভিন্ন বিষয় লক্ষণীয় যে, ভারতবর্ষের যেখানেই পীর-দরবেশের এমন মাজার গড়ে ওঠেছে, সেখানেই সংলগ্নে আগত ভক্তবৃন্দের পবিত্রতার অবলম্বন হিসেবে একটা জলাশয় বা পুকুরের ব্যবস্হা রয়েছে। এটা যেন একে অপরের পরিপূরক এক আদি ব্যবস্হাপনা। দরগাহ'র চারপাশে বেশ কয়েকটি প্রবীণ বৃক্ষ ছিল। যার ডালে বাস করতো শতবর্ষী শকুনেরা। রাতের বিভিন্ন প্রহরে এরা গলা ছেড়ে ডাক ছাড়তো।  শৈশবে দেখেছি, একটা বড় বটগাছের শাখার ছায়া যেন দশদিগন্তে ছড়িয়ে ছিল। কোথাও বাতাস না থাকলেও বট গাছের তলে শনশন করে দেহজোড়ানো  বাতাস বয়ে যেত। বিশাল একটা জাম গাছও ছিল। মাজারের উপরে ওঠে জাম পারতে গিয়ে কারও কারও মৃত্যুর ঘটনা আজও গল্প হয়ে আছে। মনে পড়ে, ভর বর্ষা মৌসুমে সামনের হাওরের ভাসমান নৌকার মাঝিরা অন্ধকার রাতে সেই উঁচু বটগাছের মাথা দেখেই দিক নির্ণয় করতো।

৫.

বছর পাঁচ আগের কথা। একদিন  শুনলাম, সেই স্বপ্নময় দিঘিটাকে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক সশরীরে দেখতে গেলাম। আহা! অবাক বিস্ময়ে ভাবছিলাম, এটা কেন করা হলো? কোনো সদুত্তর পেলাম না। বালু ব্যবসায়ী বসন্তের কোকিলরা এমপি সাহেবকে বোঝাতে সক্ষম  হয়েছে, মাজারে ওয়াজ মাহফিলের জন্য উন্মুক্ত স্থান নেই। একমাত্র দিঘিটা ভরাট করেই তা করা যাবে। যদিও মাজারের দু'পাশে এসব মাহফিল আয়োজন করার মত স্থান ছিল। সেদিকে কে তাকায়?  বালু ভরাটের কাজে স্হানীয় মধ্যস্হতাকারীদের পকেটেও কিছু আর্থিক সুবিধা পৌঁছে গেল এবং যথাসময়ে তাই করা হলো। তাদের আগ্রহে অপরিকল্পিত তথা হটকারিতায় হাওরের মূল্যবান ফসলি জমিকে গভীর গর্ত করে বালু এনে অর্ধেক দিঘি ভরাট করা হলো। মাজারের আয় থেকে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হলো। ফলে এতে এখন নিত্যদিনের ওয়াজ-মাহফিলের ব্যবস্থা হলো। সঙ্গে  গো বিচরণেরও একটা বিহিত হলো। 

আবার পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে যাদের বাড়িতে উঠোন ছিল না তারাও এর বহুমাত্রিক ব্যবহার করে চলেছে। এবং এ কাজে মোটামুটি সবাই খুশি, বাহবা দেয়ার মতন একটা প্রশংসনীয় কাজ হয়েছে । কিন্তু কেউ ভাবলো না, ইতিহাসের অমূল্য ধন, অপরূপ সুন্দর দিঘিটি কিভাবে চিরতরে হারিয়ে গেল। অথচ এরা দিঘিটাকে কত বিচিত্র সাজে রূপান্তর করতে পারতো! প্রথমে দেশের অভিজ্ঞ পরিবেশবিদদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতো। তিন দিকের প্রতিটা বাড়ির পশ্চাদভাগে সোজাসুজি ছোটছোট ঘাটলা করে নামিয়ে দেওয়া যেত। উপরের অংশে প্রাতঃভ্রমণ ও সান্ধ্যকালীন হাঁটার জন্য দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দিতে পারতো। পুকুরে প্রয়োজনীয় মাছ ছেড়ে এর যথাযথ রক্ষণা-বেক্ষন করে এক পর্যায়ে লটারি পদ্ধতিতে কাছে-দূরের মৎস শিকারীদের সুযোগ দিতে পারতো। বছরে লাখ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মে অংশ নিতে পারতো। তখন পুরো এলাকাটা বিবেচিত হত এক অনন্য পর্যটন কেন্দ্রের স্পট হিসেবে। কিন্তু  দিনের শেষে এসব কিছুই হলো না, মধ্য থেকে শতাব্দীর স্মারক ও ঐতিহ্যের ধারক দিঘিটার একটা অংশকে ভরে দিয়ে এক দৃষ্টিকটু আজব বদ্ধ-জলাশয়ে পরিণত করা হলো।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: গল্পকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


একটি দিঘি হারানোর গল্প

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পৃথিবীতে প্রতিদিন লক্ষ কোটি প্রাণী ও জীববৈচিত্রে‍্যর মধ্যে  পরিবর্তন সংঘটিত হয়ে চলেছে। প্রকৃতিতে এমন দৃশ্যমান ও অদৃশ্যে বদলে যাওয়ার ভেতর দিয়েই সৃষ্টি ও ধ্বংসের খেলায় মেতে থাকছে মানুষ। চারপাশে অনবরত ঘটে চলেছে হাজারো পরিবর্তন যার সবকিছু মানুষের চর্মচোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু পরিবর্তন অব্যাহত থাকছে। প্রকৃতির এমন নিগূঢ় রহস্যাবৃত বিষয় নিয়ে ভাববার অবকাশ সাধারণ মানুষের থাকে না। এগুলো যেন  জীববিজ্ঞান তথা  প্রকৃতিপ্রেমীদের নিত্যনব পরীক্ষা ও গবেষণার বিষয়।

২.

এদেশের সর্বত্র জীবন ও প্রকৃতির সহায়ক-শক্তি হিসেবে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্টি হওয়া বিল-ঝিল, হাওর-বাউর,নদী-নালা, জলাশয়, পুরানো পুকুর, জলের বিচিত্র উৎসস্থল সবকিছুকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, বিলীন করে চলেছে মূলত একশ্রেণীর অবিমৃষ্যকারী, অদেশপ্রেমী,আবেগপ্রবণ তথা ক্ষমতাধর মানুষের হটকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। এসব নতুন নয়, চলে এসেছে বহু বছর ধরে। সরকার আসে, সরকার যায়, নতুন নতুন নীতিমালা হয়,আইন পাশ হয়, কঠোরতার মহড়া হয়, প্রচার হয়। তবে খুব বেশি কার্যকর কিছু হয়ে ওঠে না। যা হয় তা নেহায়েত লোকপ্রদর্শনের নিমিত্ত। আর এ ধরনের আত্মহত্যার সমান  পরিবেশ বিধ্বংসী সিদ্ধান্তগুলো আসে ক্ষমতাসীন শিক্ষিত মানুষের পক্ষ থেকে। দেশের জন্য এটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য ও দুর্ভাবনার কারণ।

৩.

কিশোরগঞ্জ জেলায় আমাদের গ্রামের বাড়ির অতি নিকটে একটা ঐতিহ্যবাহী বিশালাকৃতির পুকুর ছিল। তাই এটাকে পুকুর না বলে দিঘি বলা যায়। অভিধানের ভাষায়  বড় পুকুরকে দিঘি বলা হয়। সে এখন অর্ধেক মৃত। ট্রেনে কাটা পড়া দেহের মতন একাংশ নিয়েই সচল আছে। এর আয়তন কমপক্ষে ১৫ একর হবে। দিঘিটা আমার কাছে আজন্ম লালিত বিস্ময়জাগানো এক অদ্ভুত বস্তুর মতো ছিল। এর বিশালত্ব, চৌহদ্দির জঙ্গলাকীর্ণ গাছ আর বাঁশঝাড়ের দৃশ্য, চারপাশের ঘরবসতি, সবুজ ও লালচে রঙের কচুরিপানায় চাপাপড়া তার দীর্ঘ দেহ ইত্যাদি যা আমাকে শৈশব-কৈশোর অবধি ভাবিয়ে তুলেছিল। এমন পাড়াগাঁয়ে যেখানে হিন্দু রাজা জমিদারের অস্তিত্ব নেই কিন্তু এত বড় দিঘি  কিভাবে হল? কারা ছিল এর খননকারী? জায়গা জমির প্রকৃত মালিকই বা কারা ছিল? এসব প্রশ্নও আমাকে কম ভাবায় নি।

দিঘিটার উত্তর পার্শ্বে একখানা দরগাহ বা চুনের মাজার আছে। যার সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস সুস্পষ্ট ভাবে লেখায় কোথাও পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি আছে, ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষে ভারত উপমহাদেশে আগত এবং কথিত ১৬০ জন আউলিয়ার অন্যতম একজন হযরত মিয়াচান শাহ (র.) এর মাজার এটি। কেউ কেউ মনে করেন, দিঘিটা মাজারের সমান বয়েসী বা মাজারকে ঘিরেই দিঘি অস্তিত্ববান হয়ে টিকে আছে। আমার পূর্ববর্তী দুই পুরুষের জবানিতে পাওয়া তথ্য মতে এবং স্হানীয় শত বছরের বৃদ্ধের বক্তব্যে জানা গেছে, পুকুরটা ইতোমধ্যে  কয়েক শতাব্দীর পথ পেছনে ফেলে এসেছে। আমার কৈশোরের  কোমলপ্রাণ স্মৃতি হাতড়িয়ে এখনো দিব্যি চোখে দেখি, দিঘিজুড়ে শুধু দল-ধামে ভরা, নানা জাতের পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দ, লতাপাতায় পাখির বাসা, বিশেষ করে বক জাতীয় পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল এ দিঘি। সেকালে  যুগের পর যুগ চলে যেত এগুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ কেউ নিতেন না। 

তাছাড়া মাজারের জিন্দাপীরের পছন্দ অপছন্দ বলেও একটা মিথ চালু আছে। কাজেই গ্রামবাসী সচরাচর কোনো ঝুঁকি নিতেন না। কৈশোরে দেখেছি, অতিবৃষ্টিতে পুকুর ভরে গেলে পূর্বপাড় দিয়ে সরু ড্রেন করে পানি নামানো হত, সঙ্গে বড় বড় কৈ, শিং, মাগুরের মিছিল নেমে আসতো। এলাকাবাসী আনন্দ উল্লাসে মাছ ধরে নিত। দিঘিতে সারাবছরই বেশ গভীর পানি থাকতো। চৈত্রের খরতাপে যখন মাঠ-ঘাট, বন-বাদার বিরান, দাউ-দাউ আগুনের ফুলকি তখনও কচুরিপানা ঠেলে সে দিঘি থেকে শীতল জলের অমৃত সুধার পরশ পেত এলাকাবাসী। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে নিজেও কতবার যে এর কাকচক্ষু স্বচ্ছ জলে সিক্ত হয়েছি সে কথা কবে কে গুণে রাখে? এসব এখন শুধু নস্টালজিক, পেছনে ফেলে আসা স্মৃতির ধূসর বিবর্ণ দিনলিপি।

৪.

দিঘির উত্তর পাড়ে অলৌকিক ভাবে গড়ে ওঠা কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন যে দরগাহ শরীফ রয়েছে। এক সময়ে হযরত মিয়াচান শাহ'র চুনের দরগাহ নামে এর ব্যাপক পরিচিতি ছিল। এখন মাজার হিসেবে সুপরিচিত নাম। এক বিশাল বটবৃক্ষের নিচে দরগাহ'র গোলাকৃতির প্রধান গুম্বজসহ পাশে একাধিক কবরের আদলে তৈরি সাদা গুম্বজ রয়েছে। পরিস্কার পাক-পবিত্র টিলার চারদিকে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন দূরদূরান্তর থেকে আসা ধর্মপ্রাণ মানুষ দু-হাত তুলে প্রার্থনা করে। তারা নিভৃতে নানা কিছু মানত করে এবং অপেক্ষায় থাকে। এ সকল জিয়ারতকারীর গোপন চাওয়া-পাওয়ার গল্প ক’জন জানে? কথিত আছে, এই চুনের মাজারে মানত হিসেবে সাদা মনে কোনো কিছু দান করার বাসনা যেন রাতারাতি ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। এমন বিশ্বাস আর আস্থাশীল মানুষের আগমন এলাকাটিকে কালক্রমে লোক সমাগমে পরিণত করছে।

যা চল্লিশ, পঞ্চাশ বছর আগেও কল্পনাতীত বিষয় ছিল। আজকাল শিক্ষিত, অশিক্ষিত, নারী পুরুষ সকল শ্রেণির মানুষই মাজারের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন। নির্বাচন, পরীক্ষা, চাকরি প্রার্থীরাও অবলীলায় মানত করে তাদের কাজ শুরু করেন। এটা কিসের আলামত বোঝা দায়! উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক কালে আমাদের কিশোরগঞ্জের 'পাগলা মসজিদে'র দানবাক্স খোলার আয়োজন আর কিছুদিন পরপর কোটি কোটি টাকা গণনার মিডিয়া চিত্র তো দেশবাসীকে অবাক করেই চলেছে। এক সময়ে দরগাহ জিয়ারতে আসা মানুষ দিঘির পানিতে হাত লাগিয়ে অজু করে উপরে উঠে জিয়ারত করতেন। অজু করার সুবিধার্থে বিভিন্ন সময়ে পাকা ঘাটলা করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি মাজারের এক পাশে পৃথক নামাজের ব্যবস্হা করাও আছে। বলাবাহুল্য, স্মরণাতীত কাল থেকে একটা অভিন্ন বিষয় লক্ষণীয় যে, ভারতবর্ষের যেখানেই পীর-দরবেশের এমন মাজার গড়ে ওঠেছে, সেখানেই সংলগ্নে আগত ভক্তবৃন্দের পবিত্রতার অবলম্বন হিসেবে একটা জলাশয় বা পুকুরের ব্যবস্হা রয়েছে। এটা যেন একে অপরের পরিপূরক এক আদি ব্যবস্হাপনা। দরগাহ'র চারপাশে বেশ কয়েকটি প্রবীণ বৃক্ষ ছিল। যার ডালে বাস করতো শতবর্ষী শকুনেরা। রাতের বিভিন্ন প্রহরে এরা গলা ছেড়ে ডাক ছাড়তো।  শৈশবে দেখেছি, একটা বড় বটগাছের শাখার ছায়া যেন দশদিগন্তে ছড়িয়ে ছিল। কোথাও বাতাস না থাকলেও বট গাছের তলে শনশন করে দেহজোড়ানো  বাতাস বয়ে যেত। বিশাল একটা জাম গাছও ছিল। মাজারের উপরে ওঠে জাম পারতে গিয়ে কারও কারও মৃত্যুর ঘটনা আজও গল্প হয়ে আছে। মনে পড়ে, ভর বর্ষা মৌসুমে সামনের হাওরের ভাসমান নৌকার মাঝিরা অন্ধকার রাতে সেই উঁচু বটগাছের মাথা দেখেই দিক নির্ণয় করতো।

৫.

বছর পাঁচ আগের কথা। একদিন  শুনলাম, সেই স্বপ্নময় দিঘিটাকে বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক সশরীরে দেখতে গেলাম। আহা! অবাক বিস্ময়ে ভাবছিলাম, এটা কেন করা হলো? কোনো সদুত্তর পেলাম না। বালু ব্যবসায়ী বসন্তের কোকিলরা এমপি সাহেবকে বোঝাতে সক্ষম  হয়েছে, মাজারে ওয়াজ মাহফিলের জন্য উন্মুক্ত স্থান নেই। একমাত্র দিঘিটা ভরাট করেই তা করা যাবে। যদিও মাজারের দু'পাশে এসব মাহফিল আয়োজন করার মত স্থান ছিল। সেদিকে কে তাকায়?  বালু ভরাটের কাজে স্হানীয় মধ্যস্হতাকারীদের পকেটেও কিছু আর্থিক সুবিধা পৌঁছে গেল এবং যথাসময়ে তাই করা হলো। তাদের আগ্রহে অপরিকল্পিত তথা হটকারিতায় হাওরের মূল্যবান ফসলি জমিকে গভীর গর্ত করে বালু এনে অর্ধেক দিঘি ভরাট করা হলো। মাজারের আয় থেকে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা হলো। ফলে এতে এখন নিত্যদিনের ওয়াজ-মাহফিলের ব্যবস্থা হলো। সঙ্গে  গো বিচরণেরও একটা বিহিত হলো। 

আবার পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে যাদের বাড়িতে উঠোন ছিল না তারাও এর বহুমাত্রিক ব্যবহার করে চলেছে। এবং এ কাজে মোটামুটি সবাই খুশি, বাহবা দেয়ার মতন একটা প্রশংসনীয় কাজ হয়েছে । কিন্তু কেউ ভাবলো না, ইতিহাসের অমূল্য ধন, অপরূপ সুন্দর দিঘিটি কিভাবে চিরতরে হারিয়ে গেল। অথচ এরা দিঘিটাকে কত বিচিত্র সাজে রূপান্তর করতে পারতো! প্রথমে দেশের অভিজ্ঞ পরিবেশবিদদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতো। তিন দিকের প্রতিটা বাড়ির পশ্চাদভাগে সোজাসুজি ছোটছোট ঘাটলা করে নামিয়ে দেওয়া যেত। উপরের অংশে প্রাতঃভ্রমণ ও সান্ধ্যকালীন হাঁটার জন্য দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করে দিতে পারতো। পুকুরে প্রয়োজনীয় মাছ ছেড়ে এর যথাযথ রক্ষণা-বেক্ষন করে এক পর্যায়ে লটারি পদ্ধতিতে কাছে-দূরের মৎস শিকারীদের সুযোগ দিতে পারতো। বছরে লাখ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মে অংশ নিতে পারতো। তখন পুরো এলাকাটা বিবেচিত হত এক অনন্য পর্যটন কেন্দ্রের স্পট হিসেবে। কিন্তু  দিনের শেষে এসব কিছুই হলো না, মধ্য থেকে শতাব্দীর স্মারক ও ঐতিহ্যের ধারক দিঘিটার একটা অংশকে ভরে দিয়ে এক দৃষ্টিকটু আজব বদ্ধ-জলাশয়ে পরিণত করা হলো।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: গল্পকার]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত