সংবাদ

ঢাকার রাস্তায় থাকবে না লক্কড়-ঝক্কড় বাস, কীভাবে?


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম

ঢাকার রাস্তায় থাকবে না লক্কড়-ঝক্কড় বাস, কীভাবে?
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার রাস্তায় পুরোনো, জরাজীর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী বাসের দৃশ্য নতুন নয়। কোনো বাসের জানালার কাচ নেই, কোথাও দরজা ভাঙা, কোথাও শরীরজুড়ে মরিচা। কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে কোনোটি ছুটছে। আবার কোনোটি ব্রেকের সমস্যায় রাস্তায় দাঁড়িয়েই তৈরি করছে যানজট। কাগজে-কলমে কোনো কোনো গাড়ির ফিটনেস সনদও আছে।

এবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ বলছে, এমন গাড়িও আর ছাড় পাবে না। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) মহাখালী বাস টার্মিনালে অভিযান চালানোর সময় ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেছেন, ফিটনেস সনদ নেই- এমন গাড়ি তো চলবেই না; এমনকি ফিটনেস সনদ থাকলেও বাস্তবে গাড়ির অবস্থা খারাপ হলে সেটিকেও রাস্তায় চলতে দেওয়া হবে না।

বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এত দিন মূলত ‘ফিটনেস আছে কি নেই’- এই কাগজের পরীক্ষাই বড় হয়ে থেকেছে। এবার পুলিশের বক্তব্যে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি প্রশ্ন: গাড়িটি বাস্তবে সড়কে চলার মতো অবস্থায় আছে কি না। কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন- এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?

শুধু ফিটনেস সনদই কি নিরাপদ গাড়ির নিশ্চয়তা? বাস্তবতা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। একটি গাড়ির ফিটনেস সনদ থাকলেই সেটি নিরাপদ- এমন নিশ্চয়তা নেই। গাড়ির ইঞ্জিন, ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার, আলো, দরজা, বডি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রকৃত অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, ফিটনেস সনদ থাকলেও বাস্তবে চলাচলের অনুপযোগী গাড়ি পাওয়া গেলে সেটিকে সরিয়ে নির্দিষ্ট গ্যারেজে মেরামতের জন্য পাঠানো হবে। গাড়ির ছবি তুলে রাখা হবে এবং মেরামত শেষে পুলিশের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই সেটি আবার রাস্তায় নামতে পারবে। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় পুলিশের লক্ষ্য হচ্ছে কাগজের ফিটনেসের পাশাপাশি বাস্তব ফিটনেসও নিশ্চিত করা। এটি কার্যকর হলে ঢাকার গণপরিবহনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিআরটিএর হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ঢাকায় চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের মধ্যে ১৬ হাজারের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ। ঢাকায় নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা প্রায় ৫৪ হাজার। অর্থাৎ নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের প্রায় ৩০ শতাংশই ২০ বছরের বেশি পুরোনো।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া আর ফিটনেসবিহীন হওয়া একই বিষয় নয়। কোনো গাড়ি নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার করলেই সেটি একই মুহূর্তে যান্ত্রিকভাবে অচল হয়ে যায় না। আবার কম বয়সী গাড়িও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।তাই বয়সের সীমা এবং বাস্তব যান্ত্রিক সক্ষমতা- দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে।

সরকার বাস ও মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর নির্ধারণ করেছে। মালবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ক্ষেত্রে তা ২৫ বছর। এই সিদ্ধান্ত ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।এর পেছনে যুক্তি হলো, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর পুরোনো যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, নিরাপত্তা এবং পরিবেশদূষণের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ঢাকার পুরোনো বাসের গল্পে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নেই।

ঢাকায় পুরোনো বাস উচ্ছেদের উদ্যোগ কিন্তু নতুন নয়। ২০১০ সালেই রাজধানীতে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস এবং ২৫ বছরের বেশি পুরোনো পণ্যবাহী যানবাহন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১৫ সালেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আসে। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আন্দোলন ও নানা বাস্তবতায় আগের উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

অর্থাৎ ঢাকার মানুষ বহুবার শুনেছে- পুরোনো বাস আর চলবে না। কিন্তু কিছুদিন অভিযান চলার পর আবার পুরোনো চিত্র ফিরে এসেছে। এবারের উদ্যোগের সাফল্য তাই নির্ভর করবে অভিযান কত দিন চলে এবং নিয়ম কতটা সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়, তার ওপর।

ডিএমপির পরিসংখ্যান

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, গত জুনে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ির বিরুদ্ধে ১১৯টি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১৭১টি। ইতিমধ্যে প্রায় ৪০টি মেয়াদোত্তীর্ণ ও অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া গাড়ি বিআরটিএর কাছে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি গাড়ি বিআরটিএর স্ক্র্যাপ নীতিমালা অনুযায়ী স্ক্র্যাপও করা হয়েছে।

এই সংখ্যা অবশ্য ঢাকার মোট পুরোনো গাড়ির তুলনায় খুবই কম। কিন্তু এখানেই উদ্যোগটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে- অন্তত কিছু গাড়ি এবার শুধু মামলা খেয়ে আবার রাস্তায় ফিরে আসছে না। তবে শুধু মামলা দিয়ে কি সমস্যার সমাধান হবে, উত্তর হচ্ছে না। কারণ পুরোনো বাসের মালিকের কাছে গাড়িটি একটি বিনিয়োগ। নতুন বাস কেনার খরচ অনেক বেশি। ফলে পুরোনো গাড়ি মেরামত করে চালিয়ে যাওয়াই অনেকের কাছে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

অন্যদিকে যাত্রীদের বড় অংশও বাধ্য হয়ে এসব বাসে ওঠেন। কারণ ঢাকায় গণপরিবহনের পর্যাপ্ত বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।এখানে তৈরি হয় একটি চক্র- পুরোনো বাস কম খরচে পরিচালনা। যাত্রীর নির্ভরতাও আছে। নতুন গাড়িতে বিনিয়োগের অনীহা থাকায় আবারও পুরোনো বাসের দিকেই ফেরা হয়। এই চক্র না ভাঙলে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন।

মহাখালী বাস টার্মিনালে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা ও ‘গ্যাপে’ থাকা বাসগুলো এবার পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে সরানো হচ্ছে। ডিএমপি জানিয়েছে, পূর্বাচলে প্রায় ১০ একর জায়গার মধ্যে ডিপোর একটি অংশ চালু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৫০টি বাস রাখা সম্ভব; পুরো কাজ শেষ হলে ধারণক্ষমতা প্রায় ৬০০ বাস হবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কারণ পুরোনো বা সন্দেহজনক গাড়ি আটক করার পর রাখার জায়গা না থাকলে পুলিশকে আবার গাড়ি ছেড়ে দিতে হয় বা মালিকের জিম্মায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অভিযানের পাশাপাশি গাড়ি রাখার অবকাঠামো তৈরি করাও জরুরি।

‘লক্কড়-ঝক্কড়’ মুক্ত ঢাকা কীভাবে সম্ভব

এর জন্য অন্তত পাঁচটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে। প্রথমত, বিআরটিএর ডাটাবেজে ঢাকার প্রতিটি বাসের বয়স, ফিটনেস ও মালিকানার তথ্য প্রকাশ্য ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফিটনেস পরীক্ষাকে কাগজের আনুষ্ঠানিকতা না বানিয়ে প্রকৃত যান্ত্রিক পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ২০ বছর পার হওয়া বাসের ক্ষেত্রে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, স্ক্র্যাপ বা প্রতিস্থাপনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা করতে হবে।

চতুর্থত, পুরোনো বাসের পরিবর্তে নতুন বাস নামাতে মালিকদের জন্য সহজ ঋণ বা অন্য আর্থিক প্রণোদনা বিবেচনা করা দরকার। পঞ্চমত, একই সঙ্গে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সংগঠিত করতে হবে। কারণ পুরোনো বাস সরিয়ে নতুন বাস না আনলে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ তৈরি হয়ে অভিযান থেমে যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে ‘ধারাবাহিকতা’। ঢাকার রাস্তায় লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি থাকবে না- এই ঘোষণা শুনতে স্বস্তিদায়ক। কিন্তু ঢাকার মানুষ এমন ঘোষণা আগেও বহুবার শুনেছে। এবার পার্থক্য তৈরি করতে হলে অভিযানকে এককালীন অভিযান না করে নিয়মিত ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। কারণ একটি বাস আজ ধরা পড়ল, কাল মেরামত হলো- এতে সমস্যা শেষ হবে না। প্রশ্ন হলো, আগামী ছয় মাস, এক বছর পরও একই নিয়মে গাড়ি পরীক্ষা হবে কি না।

কোনো সুরক্ষা ছাড়াই চলছে বাস

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বাস নয়, ঢাকা শহরের বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর করতে হবে। নিরাপদ গণপরিবহন মানে শুধু নতুন রঙের বাস নয়; নিরাপদ ব্রেক, ভালো টায়ার, কার্যকর স্টিয়ারিং, পর্যাপ্ত আলো, মজবুত কাঠামো এবং প্রশিক্ষিত চালক।

তাই ডিএমপির নতুন অভিযান সফল হলে তার সুফল শুধু যানজট কমানোয় সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুর্ঘটনা, বায়ুদূষণ ও নগরজীবনের অনিরাপত্তাও কমতে পারে। তবে প্রশ্ন একটাই- ঢাকার রাস্তায় সত্যিই কি লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি থাকবে না, নাকি কয়েক মাস পর আবার সেই পুরোনো বাসগুলোই ফিরে আসবে?  এর উত্তর নির্ভর করছে এবার ঘোষণার চেয়ে প্রয়োগ কতটা শক্ত এবং কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার ওপর।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ঢাকার রাস্তায় থাকবে না লক্কড়-ঝক্কড় বাস, কীভাবে?

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ঢাকার রাস্তায় পুরোনো, জরাজীর্ণ ও চলাচলের অনুপযোগী বাসের দৃশ্য নতুন নয়। কোনো বাসের জানালার কাচ নেই, কোথাও দরজা ভাঙা, কোথাও শরীরজুড়ে মরিচা। কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে কোনোটি ছুটছে। আবার কোনোটি ব্রেকের সমস্যায় রাস্তায় দাঁড়িয়েই তৈরি করছে যানজট। কাগজে-কলমে কোনো কোনো গাড়ির ফিটনেস সনদও আছে।

এবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ বলছে, এমন গাড়িও আর ছাড় পাবে না। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) মহাখালী বাস টার্মিনালে অভিযান চালানোর সময় ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেছেন, ফিটনেস সনদ নেই- এমন গাড়ি তো চলবেই না; এমনকি ফিটনেস সনদ থাকলেও বাস্তবে গাড়ির অবস্থা খারাপ হলে সেটিকেও রাস্তায় চলতে দেওয়া হবে না।

বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এত দিন মূলত ‘ফিটনেস আছে কি নেই’- এই কাগজের পরীক্ষাই বড় হয়ে থেকেছে। এবার পুলিশের বক্তব্যে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি প্রশ্ন: গাড়িটি বাস্তবে সড়কে চলার মতো অবস্থায় আছে কি না। কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন- এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?

শুধু ফিটনেস সনদই কি নিরাপদ গাড়ির নিশ্চয়তা? বাস্তবতা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। একটি গাড়ির ফিটনেস সনদ থাকলেই সেটি নিরাপদ- এমন নিশ্চয়তা নেই। গাড়ির ইঞ্জিন, ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার, আলো, দরজা, বডি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রকৃত অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, ফিটনেস সনদ থাকলেও বাস্তবে চলাচলের অনুপযোগী গাড়ি পাওয়া গেলে সেটিকে সরিয়ে নির্দিষ্ট গ্যারেজে মেরামতের জন্য পাঠানো হবে। গাড়ির ছবি তুলে রাখা হবে এবং মেরামত শেষে পুলিশের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই সেটি আবার রাস্তায় নামতে পারবে। অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় পুলিশের লক্ষ্য হচ্ছে কাগজের ফিটনেসের পাশাপাশি বাস্তব ফিটনেসও নিশ্চিত করা। এটি কার্যকর হলে ঢাকার গণপরিবহনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিআরটিএর হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ঢাকায় চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের মধ্যে ১৬ হাজারের বেশি মেয়াদোত্তীর্ণ। ঢাকায় নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা প্রায় ৫৪ হাজার। অর্থাৎ নিবন্ধিত বাস-মিনিবাসের প্রায় ৩০ শতাংশই ২০ বছরের বেশি পুরোনো।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া আর ফিটনেসবিহীন হওয়া একই বিষয় নয়। কোনো গাড়ি নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পার করলেই সেটি একই মুহূর্তে যান্ত্রিকভাবে অচল হয়ে যায় না। আবার কম বয়সী গাড়িও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।তাই বয়সের সীমা এবং বাস্তব যান্ত্রিক সক্ষমতা- দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে।

সরকার বাস ও মিনিবাসের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর নির্ধারণ করেছে। মালবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ক্ষেত্রে তা ২৫ বছর। এই সিদ্ধান্ত ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে।এর পেছনে যুক্তি হলো, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর পুরোনো যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, নিরাপত্তা এবং পরিবেশদূষণের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ঢাকার পুরোনো বাসের গল্পে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নেই।

ঢাকায় পুরোনো বাস উচ্ছেদের উদ্যোগ কিন্তু নতুন নয়। ২০১০ সালেই রাজধানীতে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস এবং ২৫ বছরের বেশি পুরোনো পণ্যবাহী যানবাহন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১৫ সালেও এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল নির্ধারণের সিদ্ধান্ত আসে। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আন্দোলন ও নানা বাস্তবতায় আগের উদ্যোগগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

অর্থাৎ ঢাকার মানুষ বহুবার শুনেছে- পুরোনো বাস আর চলবে না। কিন্তু কিছুদিন অভিযান চলার পর আবার পুরোনো চিত্র ফিরে এসেছে। এবারের উদ্যোগের সাফল্য তাই নির্ভর করবে অভিযান কত দিন চলে এবং নিয়ম কতটা সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়, তার ওপর।

ডিএমপির পরিসংখ্যান

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, গত জুনে লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ির বিরুদ্ধে ১১৯টি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১৭১টি। ইতিমধ্যে প্রায় ৪০টি মেয়াদোত্তীর্ণ ও অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া গাড়ি বিআরটিএর কাছে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি গাড়ি বিআরটিএর স্ক্র্যাপ নীতিমালা অনুযায়ী স্ক্র্যাপও করা হয়েছে।

এই সংখ্যা অবশ্য ঢাকার মোট পুরোনো গাড়ির তুলনায় খুবই কম। কিন্তু এখানেই উদ্যোগটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে- অন্তত কিছু গাড়ি এবার শুধু মামলা খেয়ে আবার রাস্তায় ফিরে আসছে না। তবে শুধু মামলা দিয়ে কি সমস্যার সমাধান হবে, উত্তর হচ্ছে না। কারণ পুরোনো বাসের মালিকের কাছে গাড়িটি একটি বিনিয়োগ। নতুন বাস কেনার খরচ অনেক বেশি। ফলে পুরোনো গাড়ি মেরামত করে চালিয়ে যাওয়াই অনেকের কাছে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।

অন্যদিকে যাত্রীদের বড় অংশও বাধ্য হয়ে এসব বাসে ওঠেন। কারণ ঢাকায় গণপরিবহনের পর্যাপ্ত বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।এখানে তৈরি হয় একটি চক্র- পুরোনো বাস কম খরচে পরিচালনা। যাত্রীর নির্ভরতাও আছে। নতুন গাড়িতে বিনিয়োগের অনীহা থাকায় আবারও পুরোনো বাসের দিকেই ফেরা হয়। এই চক্র না ভাঙলে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন।

মহাখালী বাস টার্মিনালে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা ও ‘গ্যাপে’ থাকা বাসগুলো এবার পূর্বাচলের অস্থায়ী ডিপোতে সরানো হচ্ছে। ডিএমপি জানিয়েছে, পূর্বাচলে প্রায় ১০ একর জায়গার মধ্যে ডিপোর একটি অংশ চালু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৫০টি বাস রাখা সম্ভব; পুরো কাজ শেষ হলে ধারণক্ষমতা প্রায় ৬০০ বাস হবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কারণ পুরোনো বা সন্দেহজনক গাড়ি আটক করার পর রাখার জায়গা না থাকলে পুলিশকে আবার গাড়ি ছেড়ে দিতে হয় বা মালিকের জিম্মায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অভিযানের পাশাপাশি গাড়ি রাখার অবকাঠামো তৈরি করাও জরুরি।

‘লক্কড়-ঝক্কড়’ মুক্ত ঢাকা কীভাবে সম্ভব

এর জন্য অন্তত পাঁচটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে। প্রথমত, বিআরটিএর ডাটাবেজে ঢাকার প্রতিটি বাসের বয়স, ফিটনেস ও মালিকানার তথ্য প্রকাশ্য ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফিটনেস পরীক্ষাকে কাগজের আনুষ্ঠানিকতা না বানিয়ে প্রকৃত যান্ত্রিক পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ২০ বছর পার হওয়া বাসের ক্ষেত্রে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, স্ক্র্যাপ বা প্রতিস্থাপনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা করতে হবে।

চতুর্থত, পুরোনো বাসের পরিবর্তে নতুন বাস নামাতে মালিকদের জন্য সহজ ঋণ বা অন্য আর্থিক প্রণোদনা বিবেচনা করা দরকার। পঞ্চমত, একই সঙ্গে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সংগঠিত করতে হবে। কারণ পুরোনো বাস সরিয়ে নতুন বাস না আনলে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়তে পারে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ তৈরি হয়ে অভিযান থেমে যেতে পারে।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে ‘ধারাবাহিকতা’। ঢাকার রাস্তায় লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি থাকবে না- এই ঘোষণা শুনতে স্বস্তিদায়ক। কিন্তু ঢাকার মানুষ এমন ঘোষণা আগেও বহুবার শুনেছে। এবার পার্থক্য তৈরি করতে হলে অভিযানকে এককালীন অভিযান না করে নিয়মিত ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। কারণ একটি বাস আজ ধরা পড়ল, কাল মেরামত হলো- এতে সমস্যা শেষ হবে না। প্রশ্ন হলো, আগামী ছয় মাস, এক বছর পরও একই নিয়মে গাড়ি পরীক্ষা হবে কি না।

কোনো সুরক্ষা ছাড়াই চলছে বাস

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বাস নয়, ঢাকা শহরের বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর করতে হবে। নিরাপদ গণপরিবহন মানে শুধু নতুন রঙের বাস নয়; নিরাপদ ব্রেক, ভালো টায়ার, কার্যকর স্টিয়ারিং, পর্যাপ্ত আলো, মজবুত কাঠামো এবং প্রশিক্ষিত চালক।

তাই ডিএমপির নতুন অভিযান সফল হলে তার সুফল শুধু যানজট কমানোয় সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুর্ঘটনা, বায়ুদূষণ ও নগরজীবনের অনিরাপত্তাও কমতে পারে। তবে প্রশ্ন একটাই- ঢাকার রাস্তায় সত্যিই কি লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি থাকবে না, নাকি কয়েক মাস পর আবার সেই পুরোনো বাসগুলোই ফিরে আসবে?  এর উত্তর নির্ভর করছে এবার ঘোষণার চেয়ে প্রয়োগ কতটা শক্ত এবং কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তার ওপর।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত