সংবাদ

মাছ ধরার ফাঁদে ভাগ্য বদলাচ্ছে হাজারো মানুষের


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, পাবনা
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, পাবনা
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৬ এএম

মাছ ধরার ফাঁদে ভাগ্য বদলাচ্ছে হাজারো মানুষের
হাটে বিক্রির অপেক্ষায় সারি সারি সাজানো খলসুনী। ছবি : সংগৃহীত

মাছ ধরার দেশীয় সরঞ্জাম ‘খলসুনী’ বা ‘চারো’ তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন চলনবিল অঞ্চলের প্রায় তিন হাজার পরিবার। পাবনার চাটমোহর এবং নাটোরের গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন চলছে খলসুনী তৈরির ধুম। তবে উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জালের দাপটে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে।

খলসুনী তৈরির প্রধান উপকরণ হলো তল্লা বাঁশ, তালের ডাগুরের আঁশ এবং সুতা। কারিগররা জানান, একটি তালগাছ থেকে বছরে প্রায় ২০টির মতো ডাগুর পাওয়া যায়। প্রতিটি ডাগুর বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডাগুরের পাতার অংশ দিয়ে পাখা তৈরি করা হলেও গোড়ার অংশ মেশিনে পিষে বের করা হয় সরু আঁশ। বাঁশ থেকে তৈরি চিকন শলাকা বা কাঠিগুলোকে এই আঁশ ও সুতা দিয়ে বেঁধে সুনিপুণভাবে তৈরি করা হয় খলসুনী।

বড়াইগ্রাম উপজেলার চামটা গ্রামের কারিগর মহরম আলী জানান, এক জোড়া খলসুনী তৈরি করতে বাঁশ, সুতা ও আঁশ বাবদ খরচ হয় প্রায় ১০০ টাকা। একজন দক্ষ শ্রমিকের পক্ষে তিন দিনে বড়জোর এক জোড়া খলসুনী তৈরি করা সম্ভব। সেই হিসেবে তিন দিনের পারিশ্রমিক ৯০০ টাকা ধরলে এক জোড়া খলসুনীর উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ১ হাজার টাকা। বাজারে আকারভেদে এক জোড়া খলসুনী ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। পরিবহন খরচ বাদে প্রতিটি জোড়ায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকার বেশি লাভ থাকে না। গড়ে একজন কারিগর দিনে ৩০০ টাকার মতো পারিশ্রমিক পান।

এই শিল্পের বিশেষত্ব হলো, পরিবারের নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও এর সঙ্গে জড়িত। বাড়ির কাজের পাশাপাশি নারীরা এবং পড়াশোনার ফাঁকে ছেলেমেয়েরা খলসুনী বুননের কাজ করে। চাটমোহরের ঝাঁকরা, দয়রামপুর; বড়াইগ্রামের চামটা, প্রতাপপুর; এবং গুরুদাসপুরের ধারাবারিষা ও তালবাড়িয়াসহ প্রায় ২০টি গ্রামে সারা বছরই এই কাজ চলে। শুষ্ক মৌসুমে চাহিদা কম থাকায় তখন পণ্য গুদামজাত করে রাখা হয় এবং আষাঢ় থেকে কার্তিক–এই পাঁচ মাস চলে বিক্রির ভরা মৌসুম।

চলনবিলের ধারাবারিষা, চাঁচকৈড়, অমৃতকুণ্ডা, মির্জাপুর ও জোনাইল হাটে ভোরে বসছে খলসুনীর হাট। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব সরঞ্জাম ট্রাকযোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। বর্ষা শেষে যখন নদ-নদী ও বিলের পানি কমতে শুরু করে, তখন এই খলসুনী দিয়ে দেশি প্রজাতির ছোট মাছ শিকার করেন জেলেরা।

খলসুনী তৈরির কারিগর আব্দুল হামিদ ও রজব আলী বলেন, "জন্মসূত্রেই আমরা এই কাজ করছি। লাভ খুব বেশি না হলেও অন্তত অন্য কারোর বাড়িতে শ্রম বিক্রি করতে হচ্ছে না। কিন্তু এখন সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।"

দীর্ঘদিন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত বয়োবৃদ্ধ রহমত আলী মোল্লা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "বাজারে যে হারে ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জাল বিক্রি হচ্ছে, তাতে দেশীয় এই ফাঁদ আর বেশিদিন টিকবে না। বিল ও নদীতে চায়না জালের ব্যবহারের কারণে আমাদের তৈরি খলসুনীর চাহিদা দিন দিন কমছে।"

কারিগরদের দাবি, এই কুটির শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মাছ ধরার ফাঁদে ভাগ্য বদলাচ্ছে হাজারো মানুষের

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মাছ ধরার দেশীয় সরঞ্জাম ‘খলসুনী’ বা ‘চারো’ তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন চলনবিল অঞ্চলের প্রায় তিন হাজার পরিবার। পাবনার চাটমোহর এবং নাটোরের গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার গ্রামগুলোতে এখন চলছে খলসুনী তৈরির ধুম। তবে উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জালের দাপটে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে।

খলসুনী তৈরির প্রধান উপকরণ হলো তল্লা বাঁশ, তালের ডাগুরের আঁশ এবং সুতা। কারিগররা জানান, একটি তালগাছ থেকে বছরে প্রায় ২০টির মতো ডাগুর পাওয়া যায়। প্রতিটি ডাগুর বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ডাগুরের পাতার অংশ দিয়ে পাখা তৈরি করা হলেও গোড়ার অংশ মেশিনে পিষে বের করা হয় সরু আঁশ। বাঁশ থেকে তৈরি চিকন শলাকা বা কাঠিগুলোকে এই আঁশ ও সুতা দিয়ে বেঁধে সুনিপুণভাবে তৈরি করা হয় খলসুনী।

বড়াইগ্রাম উপজেলার চামটা গ্রামের কারিগর মহরম আলী জানান, এক জোড়া খলসুনী তৈরি করতে বাঁশ, সুতা ও আঁশ বাবদ খরচ হয় প্রায় ১০০ টাকা। একজন দক্ষ শ্রমিকের পক্ষে তিন দিনে বড়জোর এক জোড়া খলসুনী তৈরি করা সম্ভব। সেই হিসেবে তিন দিনের পারিশ্রমিক ৯০০ টাকা ধরলে এক জোড়া খলসুনীর উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ১ হাজার টাকা। বাজারে আকারভেদে এক জোড়া খলসুনী ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। পরিবহন খরচ বাদে প্রতিটি জোড়ায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকার বেশি লাভ থাকে না। গড়ে একজন কারিগর দিনে ৩০০ টাকার মতো পারিশ্রমিক পান।

এই শিল্পের বিশেষত্ব হলো, পরিবারের নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও এর সঙ্গে জড়িত। বাড়ির কাজের পাশাপাশি নারীরা এবং পড়াশোনার ফাঁকে ছেলেমেয়েরা খলসুনী বুননের কাজ করে। চাটমোহরের ঝাঁকরা, দয়রামপুর; বড়াইগ্রামের চামটা, প্রতাপপুর; এবং গুরুদাসপুরের ধারাবারিষা ও তালবাড়িয়াসহ প্রায় ২০টি গ্রামে সারা বছরই এই কাজ চলে। শুষ্ক মৌসুমে চাহিদা কম থাকায় তখন পণ্য গুদামজাত করে রাখা হয় এবং আষাঢ় থেকে কার্তিক–এই পাঁচ মাস চলে বিক্রির ভরা মৌসুম।

চলনবিলের ধারাবারিষা, চাঁচকৈড়, অমৃতকুণ্ডা, মির্জাপুর ও জোনাইল হাটে ভোরে বসছে খলসুনীর হাট। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব সরঞ্জাম ট্রাকযোগে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। বর্ষা শেষে যখন নদ-নদী ও বিলের পানি কমতে শুরু করে, তখন এই খলসুনী দিয়ে দেশি প্রজাতির ছোট মাছ শিকার করেন জেলেরা।

খলসুনী তৈরির কারিগর আব্দুল হামিদ ও রজব আলী বলেন, "জন্মসূত্রেই আমরা এই কাজ করছি। লাভ খুব বেশি না হলেও অন্তত অন্য কারোর বাড়িতে শ্রম বিক্রি করতে হচ্ছে না। কিন্তু এখন সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।"

দীর্ঘদিন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত বয়োবৃদ্ধ রহমত আলী মোল্লা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "বাজারে যে হারে ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জাল বিক্রি হচ্ছে, তাতে দেশীয় এই ফাঁদ আর বেশিদিন টিকবে না। বিল ও নদীতে চায়না জালের ব্যবহারের কারণে আমাদের তৈরি খলসুনীর চাহিদা দিন দিন কমছে।"

কারিগরদের দাবি, এই কুটির শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি সরকারি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত