সংবাদ

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল, কেন?


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল, কেন?
প্রতীকী ছবি।

গত জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সে হিসেবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তার আগে মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অথচ, জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আগের ইতিহাস ধরলে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে এসে তা দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। এরপর ২০২৬ সালের জুনে তা ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অর্থাৎ, গত দেড় দশকে শুধু নতুন খেলাপি তৈরি হয়নি; বরং পুরোনো খেলাপি ঋণকে বিভিন্নভাবে আড়াল, পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করে ব্যাংকগুলো বহুদিন প্রকৃত ক্ষতির হিসাব পিছিয়ে দিয়েছে। এখন সেই চাপ একসঙ্গে বেরিয়ে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সুদ যোগ হওয়ার কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় আছে। ধরা যাক, একজন গ্রাহকের মূল ঋণ ১০০ কোটি টাকা। কয়েক বছর ধরে তিনি ঋণ পরিশোধ করেননি। তার ওপর চুক্তি অনুযায়ী সুদ জমেছে। ফলে হিসাবের খাতায় তার মোট দায় ১০০ কোটি থেকে ১৩০ বা ১৪০ কোটি হতে পারে।

সুতরাং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়া মানেই নতুন করে ব্যাংক ৬ লাখ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে- এমন নয়। বরং এর একটি অংশ হলো- পুরোনো অনাদায়ী মূলধনের সঙ্গে জমে থাকা সুদ যোগ হয়ে মোট খেলাপি দায়ের অঙ্ক বড় হওয়া। তবে এটাকে আবার অজুহাত হিসেবেও দেখা যাবে না। কারণ সুদ জমতে থাকার অর্থই হলো ব্যাংক তার মূল অর্থও সময়মতো ফেরত পাচ্ছে না।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা হলো- ঋণ বিতরণে ব্যাংকারের সাফল্য অনেক সময় ঋণের পরিমাণ দিয়ে মাপা হয়েছে, ঋণ ফেরত আসার মান দিয়ে নয়। বিশেষ করে বড় করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসার প্রকৃত আয় কত, নগদ প্রবাহ কেমন, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি, জামানতের প্রকৃত বাজারমূল্য কত, উদ্যোক্তার নিজের মূলধন কত, আগের ব্যাংকঋণ কত, একই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কত ঋণ আছে, ঋণের টাকা প্রকল্পে গেছে, নাকি অন্য কোথাও- এসব বড় প্রশ্ন। 

এই প্রশ্নগুলোর জায়গায় যদি রাজনৈতিক যোগাযোগ, ব্যবসায়িক প্রভাব বা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে খেলাপি ঋণ তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। তবে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ বনাম ‘ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ’- দুটি বিষয়কে এক করে ফেললে সমস্যার সমাধান হবে না এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য আছে। সেটা হচ্ছে, সব খেলাপি ঋণগ্রহীতা প্রতারক নন।

একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা ব্যবসা করে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বাজার ধস, আমদানি সংকট, যুদ্ধ, ডলার সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোনো প্রকল্পের ব্যর্থতায় তার ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে এমন গ্রাহকও আছেন যিনি, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দেন না। তার সম্পদ থাকতে পারে, ব্যবসা চলতে পারে, কিন্তু ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিয়ে মামলা ঠেকান, সময় নেন, পুনঃতফসিল করেন কিংবা সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে ফেলেন।

বাংলাদেশের সমস্যার বড় অংশ এই দ্বিতীয় শ্রেণির সঙ্গে যুক্ত। তাই ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণকে পুরোপুরি ‘ব্যবসায়িক মন্দা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল। মূলত, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাংকঋণকে ‘ক্রেডিট’ থেকে ‘পৃষ্ঠপোষকতায়’ পরিণত করেছে। গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে এসেছে। এর ফল হয়েছে- কিছু ঋণ ঝুঁকি বিবেচনায় নয়, সম্পর্ক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে।

এর ভয়াবহ দিক হলো- খারাপ ঋণ শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়। একটি ব্যাংক যখন ৫০০ কোটি টাকা এমন একটি প্রতিষ্ঠানে দেয়, যে প্রতিষ্ঠান তা ফেরত দিতে পারবে না, তখন ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থাৎ— খেলাপি ঋণ থেকে ব্যাংকের ক্ষতি এরপর আমানতকারীর ঝুঁকি সেখান থেকে ভবিষ্যৎ ঋণপ্রবাহের সংকট তৈরি হয়।

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ সামলানোর সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর একটি ছিল পুনঃতফসিল। গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না বিধায় ঋণ খেলাপি। এতে কিছু টাকা জমা পড়ে, নতুন সময়সূচি দেওয়া হয়, ফলে আবার ঋণ চালু হয়। তবে সমস্যা হলো, পুনঃতফসিল যদি প্রকৃত ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধারের ভিত্তিতে না হয়, তাহলে সেটি হয়ে যায়— ‘খেলাপি ঋণকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া’।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতেও পুনঃতফসিলের পর প্রকৃত আদায় এবং পরবর্তী কিস্তি পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বছরের পর বছর অনেক ঋণ জীবিত দেখানো হয়েছে, যদিও বাস্তবে তা দুর্বল বা অকার্যকর ছিল। এখন নিয়ম কঠোর হওয়ায় ‘লুকানো’ খেলাপি প্রকাশ্যে আসছে। যেটা বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের নভেম্বর নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং কাঠামো দেয়, যা ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়। নতুন ব্যবস্থায় ঋণ শ্রেণীকরণ আগের তুলনায় কঠোর হয়েছে। ১২ মাসের বেশি সময় বকেয়া থাকা ঋণকে মন্দ/ক্ষতিজনক শ্রেণিতে নেওয়ার কাঠামো রয়েছে। অর্থাৎ এখন ব্যাংকের পক্ষে— ‘এই ঋণটা আরেকটু সময় দিলে ঠিক হয়ে যাবে’ বলে দীর্ঘদিন হিসাবের বাইরে রাখার সুযোগ কমেছে।

এ কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ার একটি অংশকে বলা যায়: রিকগনাইশন এফেক্ট- প্রকৃত ক্ষতি এখন হিসাবের খাতায় ধরা পড়ছে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। খেলাপি ঋণ বেড়েছে মানেই সবটাই নতুন অর্থনৈতিক বিপর্যয়—এমন নয়। ব্যাংকের পুরোনো ক্ষত এখন বেশি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।

এদিকে, একটি দুর্বল ব্যাংক সাধারণত ভালো ঋণগ্রহীতা বাছাই করতে পারে না, কারণ তার— দক্ষ ক্রেডিট অফিসার কম, ঝুঁকি মূল্যায়ন দুর্বল, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব বেশি, আদায় ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে খারাপ ঋণ তৈরি হয়, ব্যাংকের আয় কমে, প্রভিশন ঘাটতি হয়, মূলধন দুর্বল হয়, নতুন ভালো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে, পরিশেষে ব্যাংক আরও দুর্বল হয়। এটি একটি ‘ভিসিয়াস সাইকেল’।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই বলছে, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি ব্যাংকের সম্পদের মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাছাড়া ব্যাংক একীভূতকরণেও পুরোনো ক্ষতি সামনে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—একীভূত পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশের বেশি। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।

কালো টাকা

ব্যাংক একীভূত হওয়ার ফলে খেলাপি ঋণ তৈরি হয়নি; বরং দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো ক্ষতি নতুন ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়েছে। অর্থাৎ একত্রীকরণ বা সংযুক্তিকরণ অনেকটা নির্ণায়ক পরীক্ষা-এর মতো কাজ করছে। আগে পাঁচটি ব্যাংকের পাঁচটি আলাদা অসুখ ছিল; এখন একটি বড় ব্যালান্সশিটে সব একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।

‘ওয়ান টাইম এক্সিট’ও দেখাচ্ছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যাটিকে শুধু হিসাবের অঙ্ক হিসেবে দেখছে না ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণির ঋণের জন্য বিশেষ স্পেশাল এক্সিট বা ওয়ানটাইম এক্সিট ব্যবস্থা চালু করেছে। শর্ত পূরণ করলে এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সুদ মওকুফের সুযোগও রাখা হয়েছে।

এর অর্থ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে এখন দুটি সমস্যা: প্রথমত, খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবার বাস্তবসম্মতভাবে আদায়যোগ্য ঋণকে অর্থনীতির বাইরে রাখা যাবে না। কিন্তু এখানে বিপদও আছে। যদি প্রকৃত আদায়যোগ্য ঋণগ্রহীতাকে সুবিধা দেওয়া হয়—ভালো। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃত খেলাপিরাও বারবার ছাড় পায়, তাহলে বাজারে একটি ভয়ংকর বার্তা যায়- ঋণ ফেরত না দিলেও শেষ পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যায়। এটিই মোরাল হেজার্ড।

মূলত, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা হয়েছে শুধু মানুষ ঋণ ফেরত দিচ্ছে না বলে নয়; বহু বছর ঋণ দেওয়ার সময় ঝুঁকি উপেক্ষা, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ব্যাংক-সুশাসন, ইচ্ছাকৃত খেলাপি, বারবার পুনঃতফসিল এবং প্রকৃত ক্ষতি স্বীকারে বিলম্ব- সব মিলিয়ে এখন সেই জমে থাকা সমস্যার হিসাব একসঙ্গে সামনে আসছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল, কেন?

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

গত জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সে হিসেবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তার আগে মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অথচ, জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আগের ইতিহাস ধরলে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে এসে তা দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। এরপর ২০২৬ সালের জুনে তা ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অর্থাৎ, গত দেড় দশকে শুধু নতুন খেলাপি তৈরি হয়নি; বরং পুরোনো খেলাপি ঋণকে বিভিন্নভাবে আড়াল, পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করে ব্যাংকগুলো বহুদিন প্রকৃত ক্ষতির হিসাব পিছিয়ে দিয়েছে। এখন সেই চাপ একসঙ্গে বেরিয়ে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সুদ যোগ হওয়ার কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় আছে। ধরা যাক, একজন গ্রাহকের মূল ঋণ ১০০ কোটি টাকা। কয়েক বছর ধরে তিনি ঋণ পরিশোধ করেননি। তার ওপর চুক্তি অনুযায়ী সুদ জমেছে। ফলে হিসাবের খাতায় তার মোট দায় ১০০ কোটি থেকে ১৩০ বা ১৪০ কোটি হতে পারে।

সুতরাং খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়া মানেই নতুন করে ব্যাংক ৬ লাখ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে- এমন নয়। বরং এর একটি অংশ হলো- পুরোনো অনাদায়ী মূলধনের সঙ্গে জমে থাকা সুদ যোগ হয়ে মোট খেলাপি দায়ের অঙ্ক বড় হওয়া। তবে এটাকে আবার অজুহাত হিসেবেও দেখা যাবে না। কারণ সুদ জমতে থাকার অর্থই হলো ব্যাংক তার মূল অর্থও সময়মতো ফেরত পাচ্ছে না।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা হলো- ঋণ বিতরণে ব্যাংকারের সাফল্য অনেক সময় ঋণের পরিমাণ দিয়ে মাপা হয়েছে, ঋণ ফেরত আসার মান দিয়ে নয়। বিশেষ করে বড় করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবসার প্রকৃত আয় কত, নগদ প্রবাহ কেমন, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি, জামানতের প্রকৃত বাজারমূল্য কত, উদ্যোক্তার নিজের মূলধন কত, আগের ব্যাংকঋণ কত, একই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কত ঋণ আছে, ঋণের টাকা প্রকল্পে গেছে, নাকি অন্য কোথাও- এসব বড় প্রশ্ন। 

এই প্রশ্নগুলোর জায়গায় যদি রাজনৈতিক যোগাযোগ, ব্যবসায়িক প্রভাব বা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে খেলাপি ঋণ তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী। তবে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ বনাম ‘ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ’- দুটি বিষয়কে এক করে ফেললে সমস্যার সমাধান হবে না এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য আছে। সেটা হচ্ছে, সব খেলাপি ঋণগ্রহীতা প্রতারক নন।

একজন প্রকৃত উদ্যোক্তা ব্যবসা করে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বাজার ধস, আমদানি সংকট, যুদ্ধ, ডলার সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কোনো প্রকল্পের ব্যর্থতায় তার ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে এমন গ্রাহকও আছেন যিনি, ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দেন না। তার সম্পদ থাকতে পারে, ব্যবসা চলতে পারে, কিন্তু ব্যাংকের টাকা ফেরত না দিয়ে মামলা ঠেকান, সময় নেন, পুনঃতফসিল করেন কিংবা সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে ফেলেন।

বাংলাদেশের সমস্যার বড় অংশ এই দ্বিতীয় শ্রেণির সঙ্গে যুক্ত। তাই ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণকে পুরোপুরি ‘ব্যবসায়িক মন্দা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল। মূলত, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাংকঋণকে ‘ক্রেডিট’ থেকে ‘পৃষ্ঠপোষকতায়’ পরিণত করেছে। গত দেড় দশকে ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে এসেছে। এর ফল হয়েছে- কিছু ঋণ ঝুঁকি বিবেচনায় নয়, সম্পর্ক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে।

এর ভয়াবহ দিক হলো- খারাপ ঋণ শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়। একটি ব্যাংক যখন ৫০০ কোটি টাকা এমন একটি প্রতিষ্ঠানে দেয়, যে প্রতিষ্ঠান তা ফেরত দিতে পারবে না, তখন ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থাৎ— খেলাপি ঋণ থেকে ব্যাংকের ক্ষতি এরপর আমানতকারীর ঝুঁকি সেখান থেকে ভবিষ্যৎ ঋণপ্রবাহের সংকট তৈরি হয়।

বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ সামলানোর সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর একটি ছিল পুনঃতফসিল। গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না বিধায় ঋণ খেলাপি। এতে কিছু টাকা জমা পড়ে, নতুন সময়সূচি দেওয়া হয়, ফলে আবার ঋণ চালু হয়। তবে সমস্যা হলো, পুনঃতফসিল যদি প্রকৃত ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধারের ভিত্তিতে না হয়, তাহলে সেটি হয়ে যায়— ‘খেলাপি ঋণকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া’।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিতেও পুনঃতফসিলের পর প্রকৃত আদায় এবং পরবর্তী কিস্তি পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বছরের পর বছর অনেক ঋণ জীবিত দেখানো হয়েছে, যদিও বাস্তবে তা দুর্বল বা অকার্যকর ছিল। এখন নিয়ম কঠোর হওয়ায় ‘লুকানো’ খেলাপি প্রকাশ্যে আসছে। যেটা বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের নভেম্বর নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং কাঠামো দেয়, যা ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়। নতুন ব্যবস্থায় ঋণ শ্রেণীকরণ আগের তুলনায় কঠোর হয়েছে। ১২ মাসের বেশি সময় বকেয়া থাকা ঋণকে মন্দ/ক্ষতিজনক শ্রেণিতে নেওয়ার কাঠামো রয়েছে। অর্থাৎ এখন ব্যাংকের পক্ষে— ‘এই ঋণটা আরেকটু সময় দিলে ঠিক হয়ে যাবে’ বলে দীর্ঘদিন হিসাবের বাইরে রাখার সুযোগ কমেছে।

এ কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ার একটি অংশকে বলা যায়: রিকগনাইশন এফেক্ট- প্রকৃত ক্ষতি এখন হিসাবের খাতায় ধরা পড়ছে। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। খেলাপি ঋণ বেড়েছে মানেই সবটাই নতুন অর্থনৈতিক বিপর্যয়—এমন নয়। ব্যাংকের পুরোনো ক্ষত এখন বেশি স্বচ্ছভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।

এদিকে, একটি দুর্বল ব্যাংক সাধারণত ভালো ঋণগ্রহীতা বাছাই করতে পারে না, কারণ তার— দক্ষ ক্রেডিট অফিসার কম, ঝুঁকি মূল্যায়ন দুর্বল, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, পরিচালনা পর্ষদের প্রভাব বেশি, আদায় ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে খারাপ ঋণ তৈরি হয়, ব্যাংকের আয় কমে, প্রভিশন ঘাটতি হয়, মূলধন দুর্বল হয়, নতুন ভালো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে, পরিশেষে ব্যাংক আরও দুর্বল হয়। এটি একটি ‘ভিসিয়াস সাইকেল’।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই বলছে, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি ব্যাংকের সম্পদের মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাছাড়া ব্যাংক একীভূতকরণেও পুরোনো ক্ষতি সামনে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—একীভূত পাঁচ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৮০ শতাংশের বেশি। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।

কালো টাকা

ব্যাংক একীভূত হওয়ার ফলে খেলাপি ঋণ তৈরি হয়নি; বরং দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো ক্ষতি নতুন ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়েছে। অর্থাৎ একত্রীকরণ বা সংযুক্তিকরণ অনেকটা নির্ণায়ক পরীক্ষা-এর মতো কাজ করছে। আগে পাঁচটি ব্যাংকের পাঁচটি আলাদা অসুখ ছিল; এখন একটি বড় ব্যালান্সশিটে সব একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।

‘ওয়ান টাইম এক্সিট’ও দেখাচ্ছে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যাটিকে শুধু হিসাবের অঙ্ক হিসেবে দেখছে না ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণির ঋণের জন্য বিশেষ স্পেশাল এক্সিট বা ওয়ানটাইম এক্সিট ব্যবস্থা চালু করেছে। শর্ত পূরণ করলে এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সুদ মওকুফের সুযোগও রাখা হয়েছে।

এর অর্থ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে এখন দুটি সমস্যা: প্রথমত, খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবার বাস্তবসম্মতভাবে আদায়যোগ্য ঋণকে অর্থনীতির বাইরে রাখা যাবে না। কিন্তু এখানে বিপদও আছে। যদি প্রকৃত আদায়যোগ্য ঋণগ্রহীতাকে সুবিধা দেওয়া হয়—ভালো। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃত খেলাপিরাও বারবার ছাড় পায়, তাহলে বাজারে একটি ভয়ংকর বার্তা যায়- ঋণ ফেরত না দিলেও শেষ পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যায়। এটিই মোরাল হেজার্ড।

মূলত, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা হয়েছে শুধু মানুষ ঋণ ফেরত দিচ্ছে না বলে নয়; বহু বছর ঋণ দেওয়ার সময় ঝুঁকি উপেক্ষা, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ব্যাংক-সুশাসন, ইচ্ছাকৃত খেলাপি, বারবার পুনঃতফসিল এবং প্রকৃত ক্ষতি স্বীকারে বিলম্ব- সব মিলিয়ে এখন সেই জমে থাকা সমস্যার হিসাব একসঙ্গে সামনে আসছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত