খেলার মাঠে নারীর উপস্থিতি আজ আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। অলিম্পিক থেকে বিশ্বকাপ, ক্রিকেট থেকে ফুটবল—প্রায় সব খেলাতেই নারী ক্রীড়াবিদরা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটি মোটেও সহজ ছিল না। আর সেই দীর্ঘ পরিবর্তনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক ‘ব্রাইটন ডিক্লারেশন অন উইমেন অ্যান্ড স্পোর্টস’।
১৯৯৪ সালের ৫ থেকে ৮ মে যুক্তরাজ্যের ব্রাইটনে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব নারী ও ক্রীড়া সম্মেলন। ব্রিটিশ স্পোর্টস কাউন্সিলের আয়োজনে এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সমর্থনে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে ৮২টি দেশের ২৮০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সরকার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা, অলিম্পিক কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিরা সেখানে এক প্রশ্ন সামনে আনেন—কেন ক্রীড়ার সব স্তরে নারীরা পুরুষের সমান সুযোগ পাবেন না?
সম্মেলনের ফল হিসেবে গৃহীত হয় ‘ব্রাইটন ডিক্লারেশন অন উইমেন অ্যান্ড স্পোর্টস’। এর মূল লক্ষ্য ছিল খেলাধুলার এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে নারী ও মেয়েরা কেবল খেলোয়াড় হিসেবে নয়, কোচ, প্রশাসক, সংগঠক, কর্মকর্তা, গবেষক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবেও সমানভাবে অংশ নিতে পারেন।
ঘোষণাটিতে ১০টি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করা হয়—সমাজ ও ক্রীড়ায় সমতা, ক্রীড়া অবকাঠামো, স্কুল ও যুব ক্রীড়া, অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, উচ্চমানের ক্রীড়া, নেতৃত্ব, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও তথ্য, সম্পদের সমান সুযোগ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
এর গুরুত্ব ছিল এখানেই যে, এটি শুধু নারীদের বেশি খেলতে দেওয়ার আহ্বান ছিল না। বরং ক্রীড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতেও নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ মাঠে নারী খেলোয়াড় বাড়ানোর পাশাপাশি বোর্ডরুমেও নারীর জায়গা তৈরি করার ধারণাটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নীতির কেন্দ্রে চলে আসে।
ব্রাইটন ঘোষণার পর এর বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে গড়ে ওঠে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং গ্রুপ অন উইমেন অ্যান্ড স্পোর্টস (আইডাব্লিউজি)। পরবর্তী দুই দশকে উইন্ডহোক, মন্ট্রিয়ল, কুমামোতো ও সিডনিতে বিশ্ব নারী ও ক্রীড়া সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সম্মেলনের মাধ্যমে ব্রাইটন ঘোষণার নীতিগুলো বিভিন্ন দেশ ও ক্রীড়া সংগঠনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
দুই দশক পর ২০১৪ সালের ১২ থেকে ১৫ জুন ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে বসে ষষ্ঠ বিশ্ব নারী ও ক্রীড়া সম্মেলন। এবার অংশ নেন প্রায় ১০০ দেশের ৮০০-র বেশি প্রতিনিধি। সেখানে ১৯৯৪ সালের ঘোষণাটিকে সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে সংশোধন ও সম্প্রসারণ করা হয়। নতুন নাম হয় ‘ব্রাইটন প্লাস হেলসিংকি ২০১৪ ডিক্লারেশন’।
হেলসিঙ্কি সংস্করণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল- নারী ও মেয়েদের জন্য শুধু সংগঠিত ক্রীড়া নয়, শারীরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া। নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশে অংশগ্রহণ, নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা, প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্তি এবং ক্রীড়ার সব স্তরে নারীর নেতৃত্ব বাড়ানোর বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করা হয়।
ঘোষণাটি ২০২০ সালের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদগুলোতে অন্তত ৪০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্যও সামনে এনেছিল। যদিও এটি কোনো আন্তর্জাতিক আইন নয় এবং স্বাক্ষরকারীদের ওপর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না, তবু ক্রীড়া নীতিতে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। আজ প্রায় ৬০০ সংগঠন ব্রাইটন প্লাস হেলসিংকি ডিক্লারেশন’-এর প্রতি অঙ্গীকার জানিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও এর গুরুত্ব কম নয়। নারী ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, শুটিং, সাঁতারসহ বিভিন্ন খেলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ ক্রীড়া পরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো, সমান সম্পদ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর প্রতিনিধিত্ব।
ব্রাইটন-হেলসিঙ্কি ঘোষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটি বাক্যে বলা যায়—নারী ক্রীড়ায় সমতা মানে শুধু নারী খেলোয়াড় বাড়ানো নয়; ক্রীড়ার পুরো ব্যবস্থাটিকে নারীবান্ধব ও সমতাভিত্তিক করে তোলা।
তিন দশক আগে ব্রাইটনে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার উত্তর আজ অনেকটাই দৃশ্যমান। কিন্তু খেলার মাঠে সমতা প্রতিষ্ঠার লড়াই এখনও শেষ হয়নি। ব্রাইটন থেকে হেলসিঙ্কি সেই লড়াইকে একটি বৈশ্বিক নীতিতে রূপ দিয়েছে; এখন সেই নীতিকে বাস্তব ক্রীড়া সংস্কৃতিতে পরিণত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খেলার মাঠে নারীর উপস্থিতি আজ আর বিস্ময়ের বিষয় নয়। অলিম্পিক থেকে বিশ্বকাপ, ক্রিকেট থেকে ফুটবল—প্রায় সব খেলাতেই নারী ক্রীড়াবিদরা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটি মোটেও সহজ ছিল না। আর সেই দীর্ঘ পরিবর্তনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক ‘ব্রাইটন ডিক্লারেশন অন উইমেন অ্যান্ড স্পোর্টস’।
১৯৯৪ সালের ৫ থেকে ৮ মে যুক্তরাজ্যের ব্রাইটনে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব নারী ও ক্রীড়া সম্মেলন। ব্রিটিশ স্পোর্টস কাউন্সিলের আয়োজনে এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সমর্থনে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে ৮২টি দেশের ২৮০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। সরকার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা, অলিম্পিক কমিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিরা সেখানে এক প্রশ্ন সামনে আনেন—কেন ক্রীড়ার সব স্তরে নারীরা পুরুষের সমান সুযোগ পাবেন না?
সম্মেলনের ফল হিসেবে গৃহীত হয় ‘ব্রাইটন ডিক্লারেশন অন উইমেন অ্যান্ড স্পোর্টস’। এর মূল লক্ষ্য ছিল খেলাধুলার এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে নারী ও মেয়েরা কেবল খেলোয়াড় হিসেবে নয়, কোচ, প্রশাসক, সংগঠক, কর্মকর্তা, গবেষক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবেও সমানভাবে অংশ নিতে পারেন।
ঘোষণাটিতে ১০টি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করা হয়—সমাজ ও ক্রীড়ায় সমতা, ক্রীড়া অবকাঠামো, স্কুল ও যুব ক্রীড়া, অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, উচ্চমানের ক্রীড়া, নেতৃত্ব, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও তথ্য, সম্পদের সমান সুযোগ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
এর গুরুত্ব ছিল এখানেই যে, এটি শুধু নারীদের বেশি খেলতে দেওয়ার আহ্বান ছিল না। বরং ক্রীড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতেও নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ মাঠে নারী খেলোয়াড় বাড়ানোর পাশাপাশি বোর্ডরুমেও নারীর জায়গা তৈরি করার ধারণাটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নীতির কেন্দ্রে চলে আসে।
ব্রাইটন ঘোষণার পর এর বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে গড়ে ওঠে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং গ্রুপ অন উইমেন অ্যান্ড স্পোর্টস (আইডাব্লিউজি)। পরবর্তী দুই দশকে উইন্ডহোক, মন্ট্রিয়ল, কুমামোতো ও সিডনিতে বিশ্ব নারী ও ক্রীড়া সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এসব সম্মেলনের মাধ্যমে ব্রাইটন ঘোষণার নীতিগুলো বিভিন্ন দেশ ও ক্রীড়া সংগঠনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
দুই দশক পর ২০১৪ সালের ১২ থেকে ১৫ জুন ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে বসে ষষ্ঠ বিশ্ব নারী ও ক্রীড়া সম্মেলন। এবার অংশ নেন প্রায় ১০০ দেশের ৮০০-র বেশি প্রতিনিধি। সেখানে ১৯৯৪ সালের ঘোষণাটিকে সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে সংশোধন ও সম্প্রসারণ করা হয়। নতুন নাম হয় ‘ব্রাইটন প্লাস হেলসিংকি ২০১৪ ডিক্লারেশন’।
হেলসিঙ্কি সংস্করণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল- নারী ও মেয়েদের জন্য শুধু সংগঠিত ক্রীড়া নয়, শারীরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া। নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশে অংশগ্রহণ, নারীর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা, প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্তি এবং ক্রীড়ার সব স্তরে নারীর নেতৃত্ব বাড়ানোর বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করা হয়।
ঘোষণাটি ২০২০ সালের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদগুলোতে অন্তত ৪০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্বের লক্ষ্যও সামনে এনেছিল। যদিও এটি কোনো আন্তর্জাতিক আইন নয় এবং স্বাক্ষরকারীদের ওপর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না, তবু ক্রীড়া নীতিতে এর প্রভাব ছিল ব্যাপক। আজ প্রায় ৬০০ সংগঠন ব্রাইটন প্লাস হেলসিংকি ডিক্লারেশন’-এর প্রতি অঙ্গীকার জানিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যও এর গুরুত্ব কম নয়। নারী ক্রিকেট, ফুটবল, অ্যাথলেটিকস, শুটিং, সাঁতারসহ বিভিন্ন খেলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ ক্রীড়া পরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো, সমান সম্পদ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর প্রতিনিধিত্ব।
ব্রাইটন-হেলসিঙ্কি ঘোষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই একটি বাক্যে বলা যায়—নারী ক্রীড়ায় সমতা মানে শুধু নারী খেলোয়াড় বাড়ানো নয়; ক্রীড়ার পুরো ব্যবস্থাটিকে নারীবান্ধব ও সমতাভিত্তিক করে তোলা।
তিন দশক আগে ব্রাইটনে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার উত্তর আজ অনেকটাই দৃশ্যমান। কিন্তু খেলার মাঠে সমতা প্রতিষ্ঠার লড়াই এখনও শেষ হয়নি। ব্রাইটন থেকে হেলসিঙ্কি সেই লড়াইকে একটি বৈশ্বিক নীতিতে রূপ দিয়েছে; এখন সেই নীতিকে বাস্তব ক্রীড়া সংস্কৃতিতে পরিণত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন