ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা— কবি, নাট্যকার, থিয়েটার পরিচালক, সঙ্গীতজ্ঞ ও চিত্রকর। স্পেনের আন্দালুসিয়ার জন্ম। মাত্র ২১ বছরে মাদ্রিদে লেখাপড়া করতে যেয়ে সালভাদর দালি, রাফায়েল আলবের্তি, লুই বুনুয়েল, পাবলো পিকাসো, আন্তোনিও মাচাদো, হুয়ান রেমন হিমেনেথ, জর্জ গিয়েন প্রমুখ পৃথিবীখ্যাত কবি, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। কবিতায় তিনি আন্দালুসিয়ার প্রাচীন লোকসংস্কৃতি, স্পেনের লোকগাথা, জলবায়ু, জিপসিদের মিথ, ষাঁড়ের লড়াই, উৎসব, আন্দালুসিয়া— গ্রানাদা— করদোবার হাহাকার ফুটে ওঠে। কবি কখনো সরাসরি রাজনীতি করেননি। কিন্তু রাজনীতি সচেতন ছিলেন। স্পেনের ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। প্রকাশ্য খোলা মঞ্চে কবিতা পড়তেন। তাঁর উচ্চারণগুলো স্পেনবাসীকে উদ্দীপিত করত। এই অপরাধে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বাহিনী তাঁকে খুন করেছে।
লোরকার কবিতায় এই মৃত্যুচিন্তা বহুবার বহু উপমা-চিত্রকল্পে গান হয়ে উঠেছে। তার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গীতিধর্মিতা। তাঁর কাব্যে গীতিময়তা অন্যতম বৈশিষ্ট্য— যা জিপসিদের জীবনগাথা তুলে ধরেছে। এই মহান কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে নিয়ে ২০১৫ সালে কবি ওবায়েদ আকাশ তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এ একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। সেই সময় ওবায়েদ আকাশ এই গ্রন্থের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদকে লোরকাকে নিয়ে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তারই ফল হলো “লোরকার দেশে”।
লোরকা স্পেন থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা, কিউবা, ব্রাজিলসহ যে সকল জায়গায় ঘুরেছেন-থেকেছেন সেই সকল জায়গায় চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণ শুরু হয় স্পেনের গ্রানাদা থেকে। গ্রানাদা হচ্ছে লোরকার শহর। সেভিয়া শহর, মাদ্রিদের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল হলো শিল্পকলার তিনটি বিখ্যাত মিউজিয়াম— মুসেও দেল প্রাদো, মুসেও দে রেইনা সোফিয়া ও মুসেও থাইসেন। লেখক যেমন লোরকার কথা বলেছেন তেমনি সংশ্লিষ্ট এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূ-রাজনীতি, লোকাচার ও সংস্কৃতির কথা তুলে ধরেছেন। লেখক উল্লেখ করেন, “চত্বরটির নাম ‘হেনেরআলিফে থিয়েটার’, যা একটি ওপেন-এয়ার কনসার্ট এরেনা— গ্রানাদার সঙ্গীত ও নাচ উৎসবের ভেন্যু হিসেবে ১৯৫৩ সালে এটি উন্মুক্ত হয়। এরপর ২০০২ সালে শুরু হওয়া ‘লোরকা ও গ্রানাদা উৎসব’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এখানে প্রতি বছর। তাছাড়াও মাঝেমধ্যে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে। গত বছরই এখানে অনুষ্ঠিত হলো বব ডিলানের কনসার্ট।” (পৃষ্ঠা ২৮, চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ, লোরকার দেশে, শালুক)
লেখকের লেখায় স্পেনের ইতিহাস ও বর্তমান সময়ের কথা উঠে এসেছে। আরাগান রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ ও কাস্তিয়া রাজ্যের রাণী ইসাবেলার মধ্যে বিয়ে হয়। জন্ম হয় একক রাজ্য স্পেনের। এই দম্পতিকে একত্রে বলা হয় ক্যাথলিক মনার্ক, যারা যৌথভাবে ১৪৯২ সালে গ্রানাদা জয় করেন। তাদের সহযোগিতায় নাবিক কলম্বাস ভারতের জলপথ আবিষ্কার করতে যেয়ে আমেরিকা আবিষ্কার করেন। আর এ সূত্রেই স্পেন অঢেল সম্পদের মালিক হয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তে গড়ে ওঠে উপনিবেশ। ল্যাটিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ভাষার জায়গা দখল করে নেয় স্পেন। আর সেভিয়া হয়ে ওঠে ক্রীতদাস ব্যবসায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই সেভিয়া এখন আন্দালুসিয়ার রাজধানী। লেখকের কথায় এও উঠে এসেছে গ্রানাদার প্রধান মসজিদ এখন প্রধান ক্যাথেদ্রাল। অথচ ইউরোপ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন তখন প্রথম ইউসুফ ১৩৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসা দে গ্রানাদা। ১৪৯২ সালে গ্রানাদার পতনের পর প্রতিষ্ঠানটি ১৪৯৯ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। কিন্তু ১৪৯৯ সালে আরব অভ্যুত্থানের অজুহাতে ইনকুজিইটর জেনারেল, গনজালো হিমেনেজ দে সিসনারেজ মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয় এবং বইপত্র প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলে।
স্পেনের মেলিইয়া শহরে আরব সংস্কৃতি। শহরটি হতে পারত মরক্কানদের। তা না হয়ে হয়ে যায় স্পেনের। এই শহরে খ্রিস্টান, মুসলিম, ইহুদি ও হিন্দুদের দেখা যায়। চার ধর্মমতের সংস্কৃতি এখানে অভিনব বৈশিষ্ট্যের জীবন তৈরি করেছে। এরপর লেখক মেলিইয়া থেকে যান মালাগা শহরে। দুটিই ভূমধ্যসাগরের তীরে। মেলিইয়া ইউরোপে মালাগা আফ্রিকায়। তবে দুটি শহরই স্পেনের। মালাগা হচ্ছে পাবলো পিকাসোর শহর। এখানেও লোরকার স্মৃতি আছে। লেখক উল্লেখ করেন, “পরিবারের দান করা পিকাসোর ২৮৫টি চিত্রকর্ম দিয়ে ‘মুসেও পিকাসো’ নির্মিত হয় ঐতিহাসিক ভবন ‘বুয়েনাভিস্তা প্রাসাদে’— যা ষোড়শ শতাব্দীর এক মনোরম আন্দালুসীয় স্থাপত্য। এ প্রাসাদের বেসমেন্টে রয়েছে মালাগার ইতিহাসের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, আর ওপরের দু’টি তলায় রয়েছে পাবলো পিকাসোর চিত্রকর্ম।” (পৃষ্ঠা ৮৪)
কাস্তিয়ো দে জিব্রালফারো, এখানে প্রথমে ফিনিশীয়রা বাতিঘর তৈরি করেন। ৯২৯ সালে মুর শাসক ৩য় আবদ-আল-রহমান এটাকে দুর্গ হিসাবে রূপান্তর করেন। পরবর্তীতে প্রথম সুলতান ইউসুফ এটিকে আরও সম্প্রসারিত করেন। সেখান থেকে তরিফা যেটি স্পেনের শেষ প্রান্ত। মূলত একটি দ্বীপ, যা দুটি মহাসাগরের বিশেষ সঙ্গমস্থল, জিব্রাল্টার প্রণালি আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরের মিলনস্থল একদিকে আফ্রিকা আরেকদিকে ইউরোপ।
সেভিয়ার শহরের পার্কের শিলা স্তম্ভে স্পেনীয় ভাষায় লোরকার কবিতা খোদাই করা। সাথেই আরেকটি পার্ক— পার্কে দে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। লেখক উল্লেখ করেন, “গেভারা শুরু করল তার বর্ণনা, ‘কীভাবে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের দেহাবশেষ সেভিয়াতে এলো, সে এক বড় ইতিহাস। অনেকে বলে, কলম্বাস জীবিত থাকতে যত ভ্রমণ করেছেন, মৃত্যুর পর করেছেন আরো বেশি। তিনি ১৫০৬ সালে মারা যান স্পেনের উত্তর-পশ্চিমের ‘ভায়াদলিথ’ শহরে, সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ ‘সেভিয়া’র এক মঠে নিয়ে আসা হয়। পরে কলম্বাস-এর ইচ্ছে অনুসারে তাঁকে আবার সমাহিত করা হয় ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ‘ডোমিনিকান রিপাবলিক’-এর এক সমাধিতে। এরপর তাঁর দেহাবশেষ নিয়ে আসা হয় ‘কিউবা’য়। ১৯০২ সালে স্পেন থেকে কিউবা স্বাধীন হয়ে গেলে কলম্বাসের দেহাবশেষ নিয়ে আসা হয় বর্তমানের অবস্থান, ‘সেভিয়া ক্যাথিদ্রালে’। কলম্বাস অনেক ভ্রমণ করেছেন, জীবনে, এবং মৃত্যুতেও।’ (পৃষ্ঠা ১৩৩, ১৩৪)
আন্দালুসিয়ার করদোবার সঙ্গে কবির জীবন ওতোপ্রোতোভাবে যুক্ত। মূলত গ্রানাদা হচ্ছে আরব— মুসলিম ও খ্রিস্টান সংস্কৃতির এক বেদনাবহ ইতিহাসের অধ্যায়। আর এসকল এলাকায় লোরকা তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যাপন করেছেন।
লেখক উল্লেখ করেন, “করদোবা যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে, তখন বাকি ইউরোপ ঢাকা পড়ে ছিল অজ্ঞানতার অন্ধকারে। দশম শতাব্দীর স্পেনে তখন চলছে ইউরোপে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ। সে সময় ইউরোপের বৃহত্তম ও সমৃদ্ধতম নগরী ছিল করদোবা। জ্ঞান-চর্চার অন্যতম সূচক লাইব্রেরি, আর এ নগরীর লাইব্রেরিগুলিতে সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ।” (পৃষ্ঠা ১৩৯)
কাতালুনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা। এই বার্সেলোনায় থাকাকালীন ক্যাফে লা রাম্বালায় কবি প্রত্যহ আড্ডা দিতেন। রা লাম্বানা নিয়ে লোরকার উক্তি লেখক উল্লেখ করেন এভাবে— “‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী সড়ক, যেখানে বছরের চারটি ঋতু এক সাথে একই সময়ে বসবাস করে। এটি পৃথিবীর একমাত্র সড়ক, যা শেষ হোক তা আমি চাই না। তা শব্দে ভরপুর, বাতাসে মাতোয়ারা, জমায়েতে সুন্দর, ঐতিহ্যে প্রাচীন: বার্সেলোনার লা রাম্বলা।’” (পৃষ্ঠা ১৪৫)
লেখকের আলোচনা থেকে পাঠক জানতে পারে রিও দে প্লাতোতে ছিলেন ওকাম্পো, ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লোরকা দুজনেই এসেছিলেন। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের ষাঁড়ের লড়াই, এর ঐতিহ্য। এর অমানবিক বিষয়গুলো লেখক উল্লেখ করেছেন। আবার মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন লোরকা, গাউদি, সালভেদর দালি। মাদ্রিদ নিয়ে লোরকার উক্তি লেখক উল্লেখ করেন এভাবে— “পৃথিবীর যে কোনো দেশের মৃতদের চেয়ে স্পেনের মৃতরা অনেক বেশি জীবিত।” (পৃষ্ঠা ৩১৭) এই কথা অন্তত লোরকার বেলায় সত্য, যেমনি সত্য তারিক বিন জিয়াদ, রাজা ফার্নিনান্দ, রাণী ইসাবেলা, নাবিক কলম্বাস, সালভেদর দালি কিংবা পাবলো পিকাসোর বেলায়।
লেখক লোরকার যাপিত ও স্মৃতিময় বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে সেগুলোর সঙ্গে লোরকার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। তেমনি ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে তা কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে সেই বিষয়গুলোও উল্লেখ করেছেন। বস্তুত এটি একটি ভ্রমণগদ্য হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভূগোল, বিশ্ব রাজনীতি, ক্ষমতা চর্চা ও বেদনাবহ লুপ্ত যাতনা। বইটি পাঠ করা মানে ঋদ্ধ হওয়ার নামান্তর।
লোরকার দেশে। চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ। প্রকাশক : শালুক। প্রচ্ছদ: মাসুদ রুবেল, ফেব্রুয়ারি ২০২৬। মূল্য ১০০০ টাকা।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা— কবি, নাট্যকার, থিয়েটার পরিচালক, সঙ্গীতজ্ঞ ও চিত্রকর। স্পেনের আন্দালুসিয়ার জন্ম। মাত্র ২১ বছরে মাদ্রিদে লেখাপড়া করতে যেয়ে সালভাদর দালি, রাফায়েল আলবের্তি, লুই বুনুয়েল, পাবলো পিকাসো, আন্তোনিও মাচাদো, হুয়ান রেমন হিমেনেথ, জর্জ গিয়েন প্রমুখ পৃথিবীখ্যাত কবি, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। কবিতায় তিনি আন্দালুসিয়ার প্রাচীন লোকসংস্কৃতি, স্পেনের লোকগাথা, জলবায়ু, জিপসিদের মিথ, ষাঁড়ের লড়াই, উৎসব, আন্দালুসিয়া— গ্রানাদা— করদোবার হাহাকার ফুটে ওঠে। কবি কখনো সরাসরি রাজনীতি করেননি। কিন্তু রাজনীতি সচেতন ছিলেন। স্পেনের ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। প্রকাশ্য খোলা মঞ্চে কবিতা পড়তেন। তাঁর উচ্চারণগুলো স্পেনবাসীকে উদ্দীপিত করত। এই অপরাধে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বাহিনী তাঁকে খুন করেছে।
লোরকার কবিতায় এই মৃত্যুচিন্তা বহুবার বহু উপমা-চিত্রকল্পে গান হয়ে উঠেছে। তার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গীতিধর্মিতা। তাঁর কাব্যে গীতিময়তা অন্যতম বৈশিষ্ট্য— যা জিপসিদের জীবনগাথা তুলে ধরেছে। এই মহান কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে নিয়ে ২০১৫ সালে কবি ওবায়েদ আকাশ তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এ একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। সেই সময় ওবায়েদ আকাশ এই গ্রন্থের লেখক চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদকে লোরকাকে নিয়ে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তারই ফল হলো “লোরকার দেশে”।
লোরকা স্পেন থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা, কিউবা, ব্রাজিলসহ যে সকল জায়গায় ঘুরেছেন-থেকেছেন সেই সকল জায়গায় চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণ শুরু হয় স্পেনের গ্রানাদা থেকে। গ্রানাদা হচ্ছে লোরকার শহর। সেভিয়া শহর, মাদ্রিদের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল হলো শিল্পকলার তিনটি বিখ্যাত মিউজিয়াম— মুসেও দেল প্রাদো, মুসেও দে রেইনা সোফিয়া ও মুসেও থাইসেন। লেখক যেমন লোরকার কথা বলেছেন তেমনি সংশ্লিষ্ট এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভূ-রাজনীতি, লোকাচার ও সংস্কৃতির কথা তুলে ধরেছেন। লেখক উল্লেখ করেন, “চত্বরটির নাম ‘হেনেরআলিফে থিয়েটার’, যা একটি ওপেন-এয়ার কনসার্ট এরেনা— গ্রানাদার সঙ্গীত ও নাচ উৎসবের ভেন্যু হিসেবে ১৯৫৩ সালে এটি উন্মুক্ত হয়। এরপর ২০০২ সালে শুরু হওয়া ‘লোরকা ও গ্রানাদা উৎসব’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এখানে প্রতি বছর। তাছাড়াও মাঝেমধ্যে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে। গত বছরই এখানে অনুষ্ঠিত হলো বব ডিলানের কনসার্ট।” (পৃষ্ঠা ২৮, চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ, লোরকার দেশে, শালুক)
লেখকের লেখায় স্পেনের ইতিহাস ও বর্তমান সময়ের কথা উঠে এসেছে। আরাগান রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ ও কাস্তিয়া রাজ্যের রাণী ইসাবেলার মধ্যে বিয়ে হয়। জন্ম হয় একক রাজ্য স্পেনের। এই দম্পতিকে একত্রে বলা হয় ক্যাথলিক মনার্ক, যারা যৌথভাবে ১৪৯২ সালে গ্রানাদা জয় করেন। তাদের সহযোগিতায় নাবিক কলম্বাস ভারতের জলপথ আবিষ্কার করতে যেয়ে আমেরিকা আবিষ্কার করেন। আর এ সূত্রেই স্পেন অঢেল সম্পদের মালিক হয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তে গড়ে ওঠে উপনিবেশ। ল্যাটিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ভাষার জায়গা দখল করে নেয় স্পেন। আর সেভিয়া হয়ে ওঠে ক্রীতদাস ব্যবসায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই সেভিয়া এখন আন্দালুসিয়ার রাজধানী। লেখকের কথায় এও উঠে এসেছে গ্রানাদার প্রধান মসজিদ এখন প্রধান ক্যাথেদ্রাল। অথচ ইউরোপ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন তখন প্রথম ইউসুফ ১৩৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসা দে গ্রানাদা। ১৪৯২ সালে গ্রানাদার পতনের পর প্রতিষ্ঠানটি ১৪৯৯ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। কিন্তু ১৪৯৯ সালে আরব অভ্যুত্থানের অজুহাতে ইনকুজিইটর জেনারেল, গনজালো হিমেনেজ দে সিসনারেজ মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয় এবং বইপত্র প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলে।
স্পেনের মেলিইয়া শহরে আরব সংস্কৃতি। শহরটি হতে পারত মরক্কানদের। তা না হয়ে হয়ে যায় স্পেনের। এই শহরে খ্রিস্টান, মুসলিম, ইহুদি ও হিন্দুদের দেখা যায়। চার ধর্মমতের সংস্কৃতি এখানে অভিনব বৈশিষ্ট্যের জীবন তৈরি করেছে। এরপর লেখক মেলিইয়া থেকে যান মালাগা শহরে। দুটিই ভূমধ্যসাগরের তীরে। মেলিইয়া ইউরোপে মালাগা আফ্রিকায়। তবে দুটি শহরই স্পেনের। মালাগা হচ্ছে পাবলো পিকাসোর শহর। এখানেও লোরকার স্মৃতি আছে। লেখক উল্লেখ করেন, “পরিবারের দান করা পিকাসোর ২৮৫টি চিত্রকর্ম দিয়ে ‘মুসেও পিকাসো’ নির্মিত হয় ঐতিহাসিক ভবন ‘বুয়েনাভিস্তা প্রাসাদে’— যা ষোড়শ শতাব্দীর এক মনোরম আন্দালুসীয় স্থাপত্য। এ প্রাসাদের বেসমেন্টে রয়েছে মালাগার ইতিহাসের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, আর ওপরের দু’টি তলায় রয়েছে পাবলো পিকাসোর চিত্রকর্ম।” (পৃষ্ঠা ৮৪)
কাস্তিয়ো দে জিব্রালফারো, এখানে প্রথমে ফিনিশীয়রা বাতিঘর তৈরি করেন। ৯২৯ সালে মুর শাসক ৩য় আবদ-আল-রহমান এটাকে দুর্গ হিসাবে রূপান্তর করেন। পরবর্তীতে প্রথম সুলতান ইউসুফ এটিকে আরও সম্প্রসারিত করেন। সেখান থেকে তরিফা যেটি স্পেনের শেষ প্রান্ত। মূলত একটি দ্বীপ, যা দুটি মহাসাগরের বিশেষ সঙ্গমস্থল, জিব্রাল্টার প্রণালি আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরের মিলনস্থল একদিকে আফ্রিকা আরেকদিকে ইউরোপ।
সেভিয়ার শহরের পার্কের শিলা স্তম্ভে স্পেনীয় ভাষায় লোরকার কবিতা খোদাই করা। সাথেই আরেকটি পার্ক— পার্কে দে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। লেখক উল্লেখ করেন, “গেভারা শুরু করল তার বর্ণনা, ‘কীভাবে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের দেহাবশেষ সেভিয়াতে এলো, সে এক বড় ইতিহাস। অনেকে বলে, কলম্বাস জীবিত থাকতে যত ভ্রমণ করেছেন, মৃত্যুর পর করেছেন আরো বেশি। তিনি ১৫০৬ সালে মারা যান স্পেনের উত্তর-পশ্চিমের ‘ভায়াদলিথ’ শহরে, সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। পরে তাঁর মরদেহ ‘সেভিয়া’র এক মঠে নিয়ে আসা হয়। পরে কলম্বাস-এর ইচ্ছে অনুসারে তাঁকে আবার সমাহিত করা হয় ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ‘ডোমিনিকান রিপাবলিক’-এর এক সমাধিতে। এরপর তাঁর দেহাবশেষ নিয়ে আসা হয় ‘কিউবা’য়। ১৯০২ সালে স্পেন থেকে কিউবা স্বাধীন হয়ে গেলে কলম্বাসের দেহাবশেষ নিয়ে আসা হয় বর্তমানের অবস্থান, ‘সেভিয়া ক্যাথিদ্রালে’। কলম্বাস অনেক ভ্রমণ করেছেন, জীবনে, এবং মৃত্যুতেও।’ (পৃষ্ঠা ১৩৩, ১৩৪)
আন্দালুসিয়ার করদোবার সঙ্গে কবির জীবন ওতোপ্রোতোভাবে যুক্ত। মূলত গ্রানাদা হচ্ছে আরব— মুসলিম ও খ্রিস্টান সংস্কৃতির এক বেদনাবহ ইতিহাসের অধ্যায়। আর এসকল এলাকায় লোরকা তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যাপন করেছেন।
লেখক উল্লেখ করেন, “করদোবা যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে, তখন বাকি ইউরোপ ঢাকা পড়ে ছিল অজ্ঞানতার অন্ধকারে। দশম শতাব্দীর স্পেনে তখন চলছে ইউরোপে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ। সে সময় ইউরোপের বৃহত্তম ও সমৃদ্ধতম নগরী ছিল করদোবা। জ্ঞান-চর্চার অন্যতম সূচক লাইব্রেরি, আর এ নগরীর লাইব্রেরিগুলিতে সংগৃহীত বইয়ের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ।” (পৃষ্ঠা ১৩৯)
কাতালুনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা। এই বার্সেলোনায় থাকাকালীন ক্যাফে লা রাম্বালায় কবি প্রত্যহ আড্ডা দিতেন। রা লাম্বানা নিয়ে লোরকার উক্তি লেখক উল্লেখ করেন এভাবে— “‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী সড়ক, যেখানে বছরের চারটি ঋতু এক সাথে একই সময়ে বসবাস করে। এটি পৃথিবীর একমাত্র সড়ক, যা শেষ হোক তা আমি চাই না। তা শব্দে ভরপুর, বাতাসে মাতোয়ারা, জমায়েতে সুন্দর, ঐতিহ্যে প্রাচীন: বার্সেলোনার লা রাম্বলা।’” (পৃষ্ঠা ১৪৫)
লেখকের আলোচনা থেকে পাঠক জানতে পারে রিও দে প্লাতোতে ছিলেন ওকাম্পো, ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লোরকা দুজনেই এসেছিলেন। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের ষাঁড়ের লড়াই, এর ঐতিহ্য। এর অমানবিক বিষয়গুলো লেখক উল্লেখ করেছেন। আবার মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন লোরকা, গাউদি, সালভেদর দালি। মাদ্রিদ নিয়ে লোরকার উক্তি লেখক উল্লেখ করেন এভাবে— “পৃথিবীর যে কোনো দেশের মৃতদের চেয়ে স্পেনের মৃতরা অনেক বেশি জীবিত।” (পৃষ্ঠা ৩১৭) এই কথা অন্তত লোরকার বেলায় সত্য, যেমনি সত্য তারিক বিন জিয়াদ, রাজা ফার্নিনান্দ, রাণী ইসাবেলা, নাবিক কলম্বাস, সালভেদর দালি কিংবা পাবলো পিকাসোর বেলায়।
লেখক লোরকার যাপিত ও স্মৃতিময় বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে সেগুলোর সঙ্গে লোরকার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। তেমনি ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে তা কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে সেই বিষয়গুলোও উল্লেখ করেছেন। বস্তুত এটি একটি ভ্রমণগদ্য হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভূগোল, বিশ্ব রাজনীতি, ক্ষমতা চর্চা ও বেদনাবহ লুপ্ত যাতনা। বইটি পাঠ করা মানে ঋদ্ধ হওয়ার নামান্তর।
লোরকার দেশে। চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ। প্রকাশক : শালুক। প্রচ্ছদ: মাসুদ রুবেল, ফেব্রুয়ারি ২০২৬। মূল্য ১০০০ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন