কুমোরটুলির গলিতে দুর্গামায়ের মুখ তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বদলে যাচ্ছে সেই ব্যস্ততার চরিত্র। একসময় দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার ঘিরেই যে পাড়ার মৃৎশিল্পীদের বছরের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ শুরু হতো, এবার সেই কুমারটুলির পটুয়াপাড়ার বাজারে দেখা যাচ্ছে কিছুটা অনিশ্চয়তা। তার পাশেই দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে মারোয়ারীদের পছন্দের গণেশপুজোর বাজার। কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় গণেশপুজোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কুমোরটুলির প্রতিমা তৈরির ব্যবসায়।
গত বছরের সঙ্গে এবারের ছবি কোথায় আলাদা? ২০২৫ সালে দুর্গাপুজোর আগে কুমোরটুলিতে দেশ-বিদেশ থেকে অর্ডারের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু বিদেশে পাঠানো দুর্গা ও তার পরিবারের প্রতিমার সংখ্যাই ২০২৪ সালের প্রায় ২৪০ থেকে বেড়ে ২০২৫-এ ৩০০-র বেশি হয়েছিল। অর্থাৎ অন্তত আন্তর্জাতিক বাজারে তখন দুর্গাপ্রতিমার চাহিদা বৃদ্ধির স্পষ্ট ছবি ছিল।
২০২৬-এর ছবিটা অনেক বেশি জটিল। বছরের শুরুতে মাটির জোগান নিয়ে সঙ্কট, বাঁসের যোগানে বাধা, অতিবৃষ্টি, শ্রমিকের অভাব এবং অর্ডার আসতে দেরি- সব মিলিয়ে প্রতিমা তৈরির সময়সূচি পিছিয়ে যায়। জুন মাসে কুমোরটুলির শিল্পীরা জানিয়েছিলেন, মাটির সরবরাহের সমস্যায় প্রায় দেড় থেকে দুই মাসের কাজ পিছিয়ে গিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিমার ধরন বদলের প্রবণতা। নানা থিমের প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য ছিল ভরপুর। শিল্পীদের একাংশের বক্তব্য, থিম-ভিত্তিক দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার এবার ব্যাপকভাবে কমেছে; এর কারণ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বিজপি সরকারের থিম পুজোয় বারণ আছে, তাই অনেক পূজা কমিটি অপেক্ষাকৃত পরিচিত, সাবেকি বা একচালা প্রতিমার দিকে ঝুঁকছে।এ ব্যাপারে কুমোরটুলির শিল্পীদের একাংশের হিসাবে, গত বছরের তুলনায় এ বছর দুর্গাপ্রতিমার সামগ্রিক অর্ডারে প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম অর্ডারের ছবি দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে শিল্পী ও প্রতিমা-নির্মাতাদের বাজার-অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা জরুরি। কারণ কুমোরটুলির সব শিল্পীর অর্ডার একই হারে কমেনি এবং মোট দুর্গাপূজার সংখ্যা কমেছে যা সরকারি তথ্য এখনও সামনে নেই।
বরং নিশ্চিতভাবে যে পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে, তা হলো বড় ও পরীক্ষামূলক প্রতিমার জায়গায় অপেক্ষাকৃত ছোট, পরিবহণে সহজ এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিমার চাহিদা বাড়ছে। আগের বছরগুলিতেও কাঁচামালের দাম, পরিবহন খরচ এবং থিমপুজোর কাঠামোর কারণে দুর্গাপ্রতিমার আকার ছোট হওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।
তাহলে কি বাঙালির দুর্গাপূজার উৎসব পিছিয়ে যাচ্ছে? এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কুমোরটুলির প্রতিমার অর্ডার কমা আর বাংলায় দুর্গাপূজা কমে যাওয়া—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কলকাতা ও বাংলায় দুর্গাপূজা এখনও বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক উৎসব। ২০২৬-এর দুর্গাপূজা নিয়েও রাজ্যজুড়ে বড় আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তাই প্রতিমা-শিল্পের বাজারে পরিবর্তনকে সরাসরি দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রমাণ বলা যাবে না।
বরং বাজারের ভিতরের পরিবর্তনটাই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে থিমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমছে, অন্যদিকে সাবেকি প্রতিমার চাহিদা বাড়ছে। ফলে প্রতিমার সংখ্যা নয়, প্রতিমার ধরন, আকার এবং বাজেটের চরিত্র বদলে যাচ্ছে।
তবে ভারতের মারোয়ারীদের পছন্দের গণেশপুজোয় বর্তমানে কেন এত জোয়ার? কলকাতার উৎসবের ক্যালেন্ডারে গণেশপূজা দ্রুত বড় জায়গা করে নিচ্ছে এটা তার বড় প্রমাণ।২০২৬ সালে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় গণেশপূজার সংখ্যা ৮০০-র বেশি হতে পারে বলে একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে গত বছর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫০। আবার কুমোরটুলির শিল্পীদের হিসাবে গণেশপ্রতিমার অর্ডারও প্রায় ১২–১৫ শতাংশ বেড়েছে।
এর পিছনে শুধু ধর্মীয় কারণ খোঁজা যথেষ্ট নয়। কলকাতার বহু আবাসন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং নতুন পুজো-কমিটি এখন গণেশ চতুর্থীকে আলাদা সামাজিক উৎসব হিসেবে গ্রহণ করছে। বাঙালি সমাজেও বিভিন্ন উৎসবের পারস্পরিক প্রভাব বাড়ছে। ফলে একসময় যে উৎসবগুলি মূলত নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে বেশি যুক্ত ছিল, সেগুলির অনেকগুলিই এখন কলকাতার সার্বজনীন উৎসবের চরিত্র পাচ্ছে।
গণেশের পাশাপাশি রামনবমী, হনুমানপুজো, ছটপুজো—নতুন উৎসবের বাজার। এই পরিবর্তন শুধু গণেশপুজোয় আটকে নেই, কলকাতা ও বাংলার শহুরে উৎসব-সংস্কৃতিতে রামনবমী, হনুমানপুজো, ছটপুজো-সহ নানা উৎসবের প্রকাশ্য আয়োজনও আগের তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে। আর বাঙালির ঐতিহ্য পুজো মলুন হতে চলেছে l
বাংলায় উৎসবের বাজার এখন আরও বহুমুখী হচ্ছে। আগে যেখানে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কয়েক মাসের জন্য মৃৎশিল্পীদের প্রধান কাজ তৈরি হত, এখন বিভিন্ন উৎসবের প্রতিমা ও সাজসজ্জার অর্ডার বছরজুড়ে শিল্পীদের আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। এই পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক দিকও আছে—কুমোরটুলির শিল্পীরা শুধু দুর্গাপ্রতিমার উপর নির্ভরশীল থাকছেন না। গণেশপ্রতিমার বাড়তি অর্ডার অনেক শিল্পীর কাছে নতুন বাজার তৈরি করছে।
তাহলে আশঙ্কার জায়গা কোথায়? আশঙ্কা অন্য জায়গায়। দুর্গাপ্রতিমা শুধু একটি পণ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুমোরটুলির বহু প্রজন্মের শিল্প-ঐতিহ্য। যদি বড় থিমের প্রতিমা, নতুন ধরনের মুখাবয়ব বা পরীক্ষামূলক শিল্পকর্মের অর্ডার দীর্ঘমেয়াদে কমতে থাকে, তাহলে শিল্পের সৃজনশীল দিকটি সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
২০২৬ সালে শিল্পীরা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, সাবেকি প্রতিমার দিকে ঝোঁক বাড়ছে এবং থিম-ভিত্তিক কাজ কমেছে। পাশাপাশি মাটির জোগান, কাঁচামালের দাম ও শ্রমিকের সমস্যাও রয়েছে।
অন্যদিকে পরিবেশ, নিরাপত্তা, প্রতিমার উচ্চতা, প্যান্ডেলের থিম কিংবা সাজসজ্জা নিয়ে নতুন নতুন বিধিনিষেধও শিল্পীদের কাজের স্বাধীনতা ও খরচের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে বাজারের এই পরিবর্তনের পিছনে কোনও একটি কারণ সীমাবদ্ধ নয় কারণ বহুবিধ। কুমোরটুলির ছবিটা দুর্গাপুজোর পতনের গল্প নয়—বরং বাংলার উৎসব-অর্থনীতির বদলে যাওয়ার গল্প।
একদিকে, দুর্গাপ্রতিমার অর্ডারে অনিশ্চয়তা, সরকারি থিম থেকে সাবেকিতে প্রত্যাবর্তন, মাটি ও কাঁচামালের সঙ্কট; অন্যদিকে গণেশপুজোর দ্রুত বিস্তার এবং রামনবমী, হনুমানপুজো, ছটের মতো উৎসবের বাড়তে থাকা দৃশ্যমানতা।
কুমার টুলির মৃৎশিল্পী ইন্দ্রজিৎ পালও জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন মাটির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় প্রায় দেড় থেকে দু’মাসের কাজ পিছিয়ে যায়। পরে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও হারানো সময় দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া সহজ হয়নি।
অন্যদিকে, গণেশপ্রতিমার বাজার নিয়ে সমিতির সম্পাদক কার্তিক পালের বক্তব্য, এ বছর গণেশপ্রতিমার অর্ডার প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ একই কুমোরটুলিতে দুর্গাপ্রতিমার কাজের পাশাপাশি অন্য উৎসবের প্রতিমার বাজারও বাড়ছে। এই তিনটি বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে রিপোর্টের মূল প্রশ্নটাই আরও পরিষ্কার হবে—দুর্গাপুজো সত্যিই কমছে, নাকি প্রতিমা তৈরির বাজারের চাহিদা ও কাজের ধরন বদলাচ্ছে?গত বছরের কুমোরটুলিতে যেখানে দুর্গাই ছিল মূল ব্যস্ততার কেন্দ্র, এ বছর সেই একই গলিতে শিল্পীরা আরও নানা দেবদেবীর প্রতিমা গড়ছেন। প্রশ্ন তাই শুধু—দুর্গাপুজো কমছে কি না, তা নয়। বড় প্রশ্ন হল, কলকাতার উৎসবের মানচিত্রই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে?
আর সেই বদলের প্রথম স্পষ্ট ছবি হয়তো দেখা যাচ্ছে কুমোরটুলির মাটির ঘ্রাণমাখা গলিতেই।

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কুমোরটুলির গলিতে দুর্গামায়ের মুখ তৈরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বদলে যাচ্ছে সেই ব্যস্ততার চরিত্র। একসময় দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার ঘিরেই যে পাড়ার মৃৎশিল্পীদের বছরের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ শুরু হতো, এবার সেই কুমারটুলির পটুয়াপাড়ার বাজারে দেখা যাচ্ছে কিছুটা অনিশ্চয়তা। তার পাশেই দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে মারোয়ারীদের পছন্দের গণেশপুজোর বাজার। কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় গণেশপুজোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কুমোরটুলির প্রতিমা তৈরির ব্যবসায়।
গত বছরের সঙ্গে এবারের ছবি কোথায় আলাদা? ২০২৫ সালে দুর্গাপুজোর আগে কুমোরটুলিতে দেশ-বিদেশ থেকে অর্ডারের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু বিদেশে পাঠানো দুর্গা ও তার পরিবারের প্রতিমার সংখ্যাই ২০২৪ সালের প্রায় ২৪০ থেকে বেড়ে ২০২৫-এ ৩০০-র বেশি হয়েছিল। অর্থাৎ অন্তত আন্তর্জাতিক বাজারে তখন দুর্গাপ্রতিমার চাহিদা বৃদ্ধির স্পষ্ট ছবি ছিল।
২০২৬-এর ছবিটা অনেক বেশি জটিল। বছরের শুরুতে মাটির জোগান নিয়ে সঙ্কট, বাঁসের যোগানে বাধা, অতিবৃষ্টি, শ্রমিকের অভাব এবং অর্ডার আসতে দেরি- সব মিলিয়ে প্রতিমা তৈরির সময়সূচি পিছিয়ে যায়। জুন মাসে কুমোরটুলির শিল্পীরা জানিয়েছিলেন, মাটির সরবরাহের সমস্যায় প্রায় দেড় থেকে দুই মাসের কাজ পিছিয়ে গিয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিমার ধরন বদলের প্রবণতা। নানা থিমের প্রতিমা তৈরির ঐতিহ্য ছিল ভরপুর। শিল্পীদের একাংশের বক্তব্য, থিম-ভিত্তিক দুর্গাপ্রতিমার অর্ডার এবার ব্যাপকভাবে কমেছে; এর কারণ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বিজপি সরকারের থিম পুজোয় বারণ আছে, তাই অনেক পূজা কমিটি অপেক্ষাকৃত পরিচিত, সাবেকি বা একচালা প্রতিমার দিকে ঝুঁকছে।এ ব্যাপারে কুমোরটুলির শিল্পীদের একাংশের হিসাবে, গত বছরের তুলনায় এ বছর দুর্গাপ্রতিমার সামগ্রিক অর্ডারে প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম অর্ডারের ছবি দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে শিল্পী ও প্রতিমা-নির্মাতাদের বাজার-অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা জরুরি। কারণ কুমোরটুলির সব শিল্পীর অর্ডার একই হারে কমেনি এবং মোট দুর্গাপূজার সংখ্যা কমেছে যা সরকারি তথ্য এখনও সামনে নেই।
বরং নিশ্চিতভাবে যে পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে, তা হলো বড় ও পরীক্ষামূলক প্রতিমার জায়গায় অপেক্ষাকৃত ছোট, পরিবহণে সহজ এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিমার চাহিদা বাড়ছে। আগের বছরগুলিতেও কাঁচামালের দাম, পরিবহন খরচ এবং থিমপুজোর কাঠামোর কারণে দুর্গাপ্রতিমার আকার ছোট হওয়ার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।
তাহলে কি বাঙালির দুর্গাপূজার উৎসব পিছিয়ে যাচ্ছে? এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কুমোরটুলির প্রতিমার অর্ডার কমা আর বাংলায় দুর্গাপূজা কমে যাওয়া—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কলকাতা ও বাংলায় দুর্গাপূজা এখনও বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক উৎসব। ২০২৬-এর দুর্গাপূজা নিয়েও রাজ্যজুড়ে বড় আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। তাই প্রতিমা-শিল্পের বাজারে পরিবর্তনকে সরাসরি দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রমাণ বলা যাবে না।
বরং বাজারের ভিতরের পরিবর্তনটাই বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে থিমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমছে, অন্যদিকে সাবেকি প্রতিমার চাহিদা বাড়ছে। ফলে প্রতিমার সংখ্যা নয়, প্রতিমার ধরন, আকার এবং বাজেটের চরিত্র বদলে যাচ্ছে।
তবে ভারতের মারোয়ারীদের পছন্দের গণেশপুজোয় বর্তমানে কেন এত জোয়ার? কলকাতার উৎসবের ক্যালেন্ডারে গণেশপূজা দ্রুত বড় জায়গা করে নিচ্ছে এটা তার বড় প্রমাণ।২০২৬ সালে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় গণেশপূজার সংখ্যা ৮০০-র বেশি হতে পারে বলে একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে গত বছর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫০। আবার কুমোরটুলির শিল্পীদের হিসাবে গণেশপ্রতিমার অর্ডারও প্রায় ১২–১৫ শতাংশ বেড়েছে।
এর পিছনে শুধু ধর্মীয় কারণ খোঁজা যথেষ্ট নয়। কলকাতার বহু আবাসন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং নতুন পুজো-কমিটি এখন গণেশ চতুর্থীকে আলাদা সামাজিক উৎসব হিসেবে গ্রহণ করছে। বাঙালি সমাজেও বিভিন্ন উৎসবের পারস্পরিক প্রভাব বাড়ছে। ফলে একসময় যে উৎসবগুলি মূলত নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে বেশি যুক্ত ছিল, সেগুলির অনেকগুলিই এখন কলকাতার সার্বজনীন উৎসবের চরিত্র পাচ্ছে।
গণেশের পাশাপাশি রামনবমী, হনুমানপুজো, ছটপুজো—নতুন উৎসবের বাজার। এই পরিবর্তন শুধু গণেশপুজোয় আটকে নেই, কলকাতা ও বাংলার শহুরে উৎসব-সংস্কৃতিতে রামনবমী, হনুমানপুজো, ছটপুজো-সহ নানা উৎসবের প্রকাশ্য আয়োজনও আগের তুলনায় বেশি চোখে পড়ছে। আর বাঙালির ঐতিহ্য পুজো মলুন হতে চলেছে l
বাংলায় উৎসবের বাজার এখন আরও বহুমুখী হচ্ছে। আগে যেখানে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কয়েক মাসের জন্য মৃৎশিল্পীদের প্রধান কাজ তৈরি হত, এখন বিভিন্ন উৎসবের প্রতিমা ও সাজসজ্জার অর্ডার বছরজুড়ে শিল্পীদের আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। এই পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক দিকও আছে—কুমোরটুলির শিল্পীরা শুধু দুর্গাপ্রতিমার উপর নির্ভরশীল থাকছেন না। গণেশপ্রতিমার বাড়তি অর্ডার অনেক শিল্পীর কাছে নতুন বাজার তৈরি করছে।
তাহলে আশঙ্কার জায়গা কোথায়? আশঙ্কা অন্য জায়গায়। দুর্গাপ্রতিমা শুধু একটি পণ্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কুমোরটুলির বহু প্রজন্মের শিল্প-ঐতিহ্য। যদি বড় থিমের প্রতিমা, নতুন ধরনের মুখাবয়ব বা পরীক্ষামূলক শিল্পকর্মের অর্ডার দীর্ঘমেয়াদে কমতে থাকে, তাহলে শিল্পের সৃজনশীল দিকটি সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
২০২৬ সালে শিল্পীরা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, সাবেকি প্রতিমার দিকে ঝোঁক বাড়ছে এবং থিম-ভিত্তিক কাজ কমেছে। পাশাপাশি মাটির জোগান, কাঁচামালের দাম ও শ্রমিকের সমস্যাও রয়েছে।
অন্যদিকে পরিবেশ, নিরাপত্তা, প্রতিমার উচ্চতা, প্যান্ডেলের থিম কিংবা সাজসজ্জা নিয়ে নতুন নতুন বিধিনিষেধও শিল্পীদের কাজের স্বাধীনতা ও খরচের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে বাজারের এই পরিবর্তনের পিছনে কোনও একটি কারণ সীমাবদ্ধ নয় কারণ বহুবিধ। কুমোরটুলির ছবিটা দুর্গাপুজোর পতনের গল্প নয়—বরং বাংলার উৎসব-অর্থনীতির বদলে যাওয়ার গল্প।
একদিকে, দুর্গাপ্রতিমার অর্ডারে অনিশ্চয়তা, সরকারি থিম থেকে সাবেকিতে প্রত্যাবর্তন, মাটি ও কাঁচামালের সঙ্কট; অন্যদিকে গণেশপুজোর দ্রুত বিস্তার এবং রামনবমী, হনুমানপুজো, ছটের মতো উৎসবের বাড়তে থাকা দৃশ্যমানতা।
কুমার টুলির মৃৎশিল্পী ইন্দ্রজিৎ পালও জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন মাটির সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় প্রায় দেড় থেকে দু’মাসের কাজ পিছিয়ে যায়। পরে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও হারানো সময় দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া সহজ হয়নি।
অন্যদিকে, গণেশপ্রতিমার বাজার নিয়ে সমিতির সম্পাদক কার্তিক পালের বক্তব্য, এ বছর গণেশপ্রতিমার অর্ডার প্রায় ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ একই কুমোরটুলিতে দুর্গাপ্রতিমার কাজের পাশাপাশি অন্য উৎসবের প্রতিমার বাজারও বাড়ছে। এই তিনটি বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে রিপোর্টের মূল প্রশ্নটাই আরও পরিষ্কার হবে—দুর্গাপুজো সত্যিই কমছে, নাকি প্রতিমা তৈরির বাজারের চাহিদা ও কাজের ধরন বদলাচ্ছে?গত বছরের কুমোরটুলিতে যেখানে দুর্গাই ছিল মূল ব্যস্ততার কেন্দ্র, এ বছর সেই একই গলিতে শিল্পীরা আরও নানা দেবদেবীর প্রতিমা গড়ছেন। প্রশ্ন তাই শুধু—দুর্গাপুজো কমছে কি না, তা নয়। বড় প্রশ্ন হল, কলকাতার উৎসবের মানচিত্রই ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে?
আর সেই বদলের প্রথম স্পষ্ট ছবি হয়তো দেখা যাচ্ছে কুমোরটুলির মাটির ঘ্রাণমাখা গলিতেই।

আপনার মতামত লিখুন