মায়ের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। বয়স এমন, যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবীজুড়ে থাকার কথা স্কুল, বন্ধু, খেলাধুলা আর অসংখ্য ছোট ছোট স্বপ্ন। কিন্তু শুক্রবার বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেনি সে। একদিন পর শনিবার কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো তার মরদেহ। শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে থাকা আইফোনটিরও সন্ধান মেলেনি।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক নাহিদা নাহিদের ছেলে। নিখোঁজ হওয়ার পর সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে সামাজিকমাধ্যমে মায়ের যে আর্তি ছড়িয়ে পড়েছিল, মরদেহ উদ্ধারের খবরের পর সেটিই যেন বদলে গেল এক গভীর জাতীয় শোকে।
ঘটনার তদন্ত চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।কয়েকজন পুলিশ হেফাজতে আছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এখনই হত্যার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু একটি বিষয় এরই মধ্যে স্পষ্ট—অপ্রতিমের মৃত্যু মানুষের ভেতরে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। সামাজিকমাধ্যমে কবি, লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানাচ্ছেন। কেউ দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি করছেন, কেউ প্রশ্ন তুলছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে, কেউ আবার সন্তান হারানো একটি পরিবারের অসহনীয় যন্ত্রণার কথা লিখছেন।
তার বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও একটি ভয়ংকর বাস্তবতা—একটি শিশু হত্যার পর কিছুদিন সামাজিকমাধ্যম উত্তাল হয়, তারপর নতুন কোনো ঘটনা এসে আগের ঘটনাটিকে আড়াল করে দেয়। এই কথাটিই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবায়। কারণ অপরাধের বিচার শুধু আদালতের বিষয় নয়; অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজের ধারাবাহিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো হত্যাকাণ্ডে মানুষের ক্ষোভ যদি কয়েক দিনের সামাজিকমাধ্যম পোস্টে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তার সামাজিক প্রতিরোধমূলক শক্তি খুব বেশি দূর যায় না। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি প্রশ্ন তৈরি করে—কেন ঘটল, কোথায় ব্যর্থতা ছিল, কীভাবে ভবিষ্যতে ঠেকানো যায়—তাহলে সেটি সামাজিক জবাবদিহির শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
কবি জাকির জাফরান লিখেছেন, তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে আছেন এবং দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দেখতে চান। কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন লিখেছেন, ‘এ কোন অমানুষের দেশ! এ কেমন বর্বর, হিংস্র, জানোয়ার, নৃশংস নরপিশাচের দেশ!’
এই ভাষা মূলত শোকের ভাষা। সন্তানের মৃত্যু যে মানুষের ভেতরে কতটা অসহায় ক্রোধ তৈরি করতে পারে, অপ্রতিমকে ঘিরে সামাজিকমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াগুলো তারই প্রকাশ। কারণ, একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়। অপ্রতিমের মৃত্যু তার মা-বাবার জীবনে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা কোনো বিচার দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু একটি শিশুর নিরাপত্তা কেবল তার পরিবারের ব্যক্তিগত দায়িত্ব—এমন ভাবার সুযোগও নেই।
একটি শিশু যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবেশ, স্থানীয় পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং বৃহত্তর সামাজিক কাঠামো।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের ওপর সহিংসতাকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখে না। তাদের বিশ্লেষণে ব্যক্তিগত ঝুঁকির পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সংহতি, মাদক, দারিদ্র্য, সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলা সামাজিক মূল্যবোধ এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ—সবকিছুকেই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ শিশুর নিরাপত্তা একটি সমষ্টিগত দায়িত্ব।
কোনো শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, কেউ তাকে ভয় দেখাচ্ছে, অনলাইনে অচেনা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক তার ওপর অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে, কোথাও মাদক বা অপরাধী চক্রের প্রভাব দেখা যাচ্ছে—এসবকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে একাই দৌড়াতে হয়। অথচ দ্রুত অনুসন্ধান, তথ্যের সমন্বয়, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা—এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সক্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে প্রায় ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে জিডির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই সংখ্যা শিশু নিখোঁজের চূড়ান্ত জাতীয় পরিসংখ্যান নয়; কতজন পরে ফিরে এসেছে, কতজন অপহরণ বা পাচারের শিকার হয়েছে, কতটি ঘটনা অন্য কারণে ঘটেছে—এ বিষয়ে সমন্বিত নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডেটাবেসের ঘাটতির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই ‘১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ’—এই সংখ্যাকে সরাসরি ‘১৫ হাজার শিশু অপহৃত বা হত্যার শিকার’ হিসেবে দেখানো যাবে না। কিন্তু সংখ্যাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করার জন্য আমাদের জাতীয় ব্যবস্থাটি কতটা কার্যকর?
কিন্তু সামাজিকমাধ্যমের ক্ষোভ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা তিনটি জায়গায় পৌঁছায়—সচেতনতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। শুধু ‘বিচার চাই’ লিখে পোস্ট দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন করতে হবে—অপ্রতিমের মতো শিশুরা কোথায় নিরাপদ? নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় পুলিশের কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত? শিশুদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আছে কি? স্কুল ও পরিবার কি শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা শেখাচ্ছে? কোনো শিশু বিপদের সংকেত দিলে তাকে কোথায় সহায়তা দেওয়া হবে? নিখোঁজ শিশুদের তথ্য কি পুলিশ, হাসপাতাল, সীমান্ত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বিত হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে সামাজিকমাধ্যমের ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত আরেকটি আবেগের ঢেউ হয়েই থেকে যাবে। কিন্তু অপ্রতিম যেন শুধু একটি নাম হয়ে না যায়।অপ্রতিমের মৃত্যুর সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি হয়তো এখানেই—কয়েক দিন পর নতুন কোনো ঘটনা এসে সামাজিকমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্র দখল করবে। নতুন কোনো শিশুর ছবি ভাইরাল হবে। নতুন কোনো পরিবারের কান্না আমাদের নাড়া দেবে। তারপর আবার আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাব।
অপ্রতিমের ক্ষেত্রে তাই শুধু হত্যাকারীদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার দাবি যথেষ্ট নয়। তদন্ত স্বচ্ছভাবে শেষ হওয়া দরকার। অপরাধের কারণ ও প্রেক্ষাপটও জানা দরকার। যদি অপরাধের পেছনে লুট, ছিনতাই, ব্যক্তিগত বিরোধ, পরিকল্পিত হামলা, অনলাইন যোগাযোগ কিংবা অন্য কোনো কারণ থাকে, তদন্তে তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।কারণ সত্য জানা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রতিরোধও দুর্বল থাকে।
একজন মায়ের শূন্যতা যেন আমাদের বিবেকের আয়না হয়।অপ্রতিমের মা নাহিদা নাহিদ একজন শিক্ষক ও লেখক। কিন্তু আজ তার পরিচয়ের আগে সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি একজন সন্তানহারা মা। সন্তান হারানোর এই শোক কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। কোনো সামাজিকমাধ্যমের পোস্ট দিয়েও নয়। তবু তার সন্তানের মৃত্যু আমাদের একটি দায়িত্ব দিয়ে যায়। সেই দায়িত্ব হলো—অপ্রতিমকে শুধু একটি মর্মান্তিক খবর হিসেবে মনে না রাখা।লেখক সানাউল্লাহ সাগর লিখেছেন, ‘দেশটা নরক হওয়ার আগে আপনারা জেগে ওঠেন।’ এটি শুধু সরকারের প্রতি বলা কথা নয়। এটি আসলে আমাদের সবার প্রতি একটি প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই জেগে আছি?
একটি ১৩ বছরের শিশু আইফোন হাতে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়েছিল। তার পৃথিবীটা ছিল সামনে। ফিরে আসার কথা ছিল সন্ধ্যায়। সে আর ফেরেনি। এখন অন্তত অপ্রতিমের জন্য আমাদের প্রশ্নটা থামানো যাবে না— আর কোনো শিশুর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা যেন এমন শোকে শেষ না হয়।

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মায়ের কাছ থেকে আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের অপ্রতিম। বয়স এমন, যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবীজুড়ে থাকার কথা স্কুল, বন্ধু, খেলাধুলা আর অসংখ্য ছোট ছোট স্বপ্ন। কিন্তু শুক্রবার বিকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেনি সে। একদিন পর শনিবার কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো তার মরদেহ। শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার সঙ্গে থাকা আইফোনটিরও সন্ধান মেলেনি।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও লেখক নাহিদা নাহিদের ছেলে। নিখোঁজ হওয়ার পর সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে সামাজিকমাধ্যমে মায়ের যে আর্তি ছড়িয়ে পড়েছিল, মরদেহ উদ্ধারের খবরের পর সেটিই যেন বদলে গেল এক গভীর জাতীয় শোকে।
ঘটনার তদন্ত চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।কয়েকজন পুলিশ হেফাজতে আছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এখনই হত্যার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
কিন্তু একটি বিষয় এরই মধ্যে স্পষ্ট—অপ্রতিমের মৃত্যু মানুষের ভেতরে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। সামাজিকমাধ্যমে কবি, লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক জানাচ্ছেন। কেউ দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি করছেন, কেউ প্রশ্ন তুলছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে, কেউ আবার সন্তান হারানো একটি পরিবারের অসহনীয় যন্ত্রণার কথা লিখছেন।
তার বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও একটি ভয়ংকর বাস্তবতা—একটি শিশু হত্যার পর কিছুদিন সামাজিকমাধ্যম উত্তাল হয়, তারপর নতুন কোনো ঘটনা এসে আগের ঘটনাটিকে আড়াল করে দেয়। এই কথাটিই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবায়। কারণ অপরাধের বিচার শুধু আদালতের বিষয় নয়; অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজের ধারাবাহিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো হত্যাকাণ্ডে মানুষের ক্ষোভ যদি কয়েক দিনের সামাজিকমাধ্যম পোস্টে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তার সামাজিক প্রতিরোধমূলক শক্তি খুব বেশি দূর যায় না। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি প্রশ্ন তৈরি করে—কেন ঘটল, কোথায় ব্যর্থতা ছিল, কীভাবে ভবিষ্যতে ঠেকানো যায়—তাহলে সেটি সামাজিক জবাবদিহির শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
কবি জাকির জাফরান লিখেছেন, তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে আছেন এবং দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দেখতে চান। কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন লিখেছেন, ‘এ কোন অমানুষের দেশ! এ কেমন বর্বর, হিংস্র, জানোয়ার, নৃশংস নরপিশাচের দেশ!’
এই ভাষা মূলত শোকের ভাষা। সন্তানের মৃত্যু যে মানুষের ভেতরে কতটা অসহায় ক্রোধ তৈরি করতে পারে, অপ্রতিমকে ঘিরে সামাজিকমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াগুলো তারই প্রকাশ। কারণ, একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়। অপ্রতিমের মৃত্যু তার মা-বাবার জীবনে যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা কোনো বিচার দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু একটি শিশুর নিরাপত্তা কেবল তার পরিবারের ব্যক্তিগত দায়িত্ব—এমন ভাবার সুযোগও নেই।
একটি শিশু যখন বাড়ি থেকে বের হয়, তার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিবেশ, স্থানীয় পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং বৃহত্তর সামাজিক কাঠামো।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের ওপর সহিংসতাকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখে না। তাদের বিশ্লেষণে ব্যক্তিগত ঝুঁকির পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সংহতি, মাদক, দারিদ্র্য, সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলা সামাজিক মূল্যবোধ এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ—সবকিছুকেই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ শিশুর নিরাপত্তা একটি সমষ্টিগত দায়িত্ব।
কোনো শিশুর আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, কেউ তাকে ভয় দেখাচ্ছে, অনলাইনে অচেনা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক তার ওপর অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে, কোথাও মাদক বা অপরাধী চক্রের প্রভাব দেখা যাচ্ছে—এসবকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে একাই দৌড়াতে হয়। অথচ দ্রুত অনুসন্ধান, তথ্যের সমন্বয়, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা—এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সক্রিয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে প্রায় ১৫ হাজার শিশুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে জিডির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই সংখ্যা শিশু নিখোঁজের চূড়ান্ত জাতীয় পরিসংখ্যান নয়; কতজন পরে ফিরে এসেছে, কতজন অপহরণ বা পাচারের শিকার হয়েছে, কতটি ঘটনা অন্য কারণে ঘটেছে—এ বিষয়ে সমন্বিত নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডেটাবেসের ঘাটতির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই ‘১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ’—এই সংখ্যাকে সরাসরি ‘১৫ হাজার শিশু অপহৃত বা হত্যার শিকার’ হিসেবে দেখানো যাবে না। কিন্তু সংখ্যাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করার জন্য আমাদের জাতীয় ব্যবস্থাটি কতটা কার্যকর?
কিন্তু সামাজিকমাধ্যমের ক্ষোভ তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা তিনটি জায়গায় পৌঁছায়—সচেতনতা, জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। শুধু ‘বিচার চাই’ লিখে পোস্ট দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন করতে হবে—অপ্রতিমের মতো শিশুরা কোথায় নিরাপদ? নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় পুলিশের কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত? শিশুদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা আছে কি? স্কুল ও পরিবার কি শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা শেখাচ্ছে? কোনো শিশু বিপদের সংকেত দিলে তাকে কোথায় সহায়তা দেওয়া হবে? নিখোঁজ শিশুদের তথ্য কি পুলিশ, হাসপাতাল, সীমান্ত ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বিত হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে সামাজিকমাধ্যমের ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত আরেকটি আবেগের ঢেউ হয়েই থেকে যাবে। কিন্তু অপ্রতিম যেন শুধু একটি নাম হয়ে না যায়।অপ্রতিমের মৃত্যুর সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি হয়তো এখানেই—কয়েক দিন পর নতুন কোনো ঘটনা এসে সামাজিকমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্র দখল করবে। নতুন কোনো শিশুর ছবি ভাইরাল হবে। নতুন কোনো পরিবারের কান্না আমাদের নাড়া দেবে। তারপর আবার আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাব।
অপ্রতিমের ক্ষেত্রে তাই শুধু হত্যাকারীদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার দাবি যথেষ্ট নয়। তদন্ত স্বচ্ছভাবে শেষ হওয়া দরকার। অপরাধের কারণ ও প্রেক্ষাপটও জানা দরকার। যদি অপরাধের পেছনে লুট, ছিনতাই, ব্যক্তিগত বিরোধ, পরিকল্পিত হামলা, অনলাইন যোগাযোগ কিংবা অন্য কোনো কারণ থাকে, তদন্তে তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।কারণ সত্য জানা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রতিরোধও দুর্বল থাকে।
একজন মায়ের শূন্যতা যেন আমাদের বিবেকের আয়না হয়।অপ্রতিমের মা নাহিদা নাহিদ একজন শিক্ষক ও লেখক। কিন্তু আজ তার পরিচয়ের আগে সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি একজন সন্তানহারা মা। সন্তান হারানোর এই শোক কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। কোনো সামাজিকমাধ্যমের পোস্ট দিয়েও নয়। তবু তার সন্তানের মৃত্যু আমাদের একটি দায়িত্ব দিয়ে যায়। সেই দায়িত্ব হলো—অপ্রতিমকে শুধু একটি মর্মান্তিক খবর হিসেবে মনে না রাখা।লেখক সানাউল্লাহ সাগর লিখেছেন, ‘দেশটা নরক হওয়ার আগে আপনারা জেগে ওঠেন।’ এটি শুধু সরকারের প্রতি বলা কথা নয়। এটি আসলে আমাদের সবার প্রতি একটি প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই জেগে আছি?
একটি ১৩ বছরের শিশু আইফোন হাতে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়েছিল। তার পৃথিবীটা ছিল সামনে। ফিরে আসার কথা ছিল সন্ধ্যায়। সে আর ফেরেনি। এখন অন্তত অপ্রতিমের জন্য আমাদের প্রশ্নটা থামানো যাবে না— আর কোনো শিশুর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা যেন এমন শোকে শেষ না হয়।

আপনার মতামত লিখুন