বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বেরিয়েছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ। মাথায় আঘাতের চিহ্ন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং দুজনকে আটক করা হয়েছে।
একটি ফোন। তার জন্য একটি শিশুর জীবন। এই সমীকরণটাই বলে দেয়, আমরা কোন সমাজে বাস করছি। প্রশ্ন উঠতে পারে—একটি আইফোনের জন্য কেউ কেন শিশু হত্যা করবে? উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোয়।
আইফোন প্রাণের চেয়ে বড়?
আইফোন এখন আর কেবল একটি ফোন নয়; এটি সম্পদের, ক্ষমতার ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। একটি আইফোনের বাজারমূল্য দেশের একজন নিম্নআয়ের মানুষের কয়েক মাসের আয়ের সমান। যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোই কঠিন, সেখানে এই বস্তুটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রতীক।
ঢাকার অলিগলিতে ‘আইফোন ছিনতাই’ এখন নিত্যদিনের খবর। এই ভোগবাদের সংস্কৃতি এমন এক নৈতিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মানুষের চেয়ে বস্তুর মূল্য বেশি।
তরুণ বয়সে এই বস্তুকেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা যাদের পূরণ হয় না, তারা ধীরে ধীরে সহিংসতার পথ বেছে নেয়। তারা ভাবে—আমি যদি এই ফোনটি না পাই, আমি কিছুই নই। আর এই ‘কিছু না হওয়া’-র হতাশা থেকেই জন্ম নেয় অপরাধ।
রাজনীতি মানুষকে ভাগ করে
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা ঘটেছে, সেটি হত্যাকাণ্ডের চেয়েও ভয়াবহ। নাহিদা বেগম ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার সন্তানের মৃত্যুকে কেউ কেউ ‘ন্যায্যতা’ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রশ্ন করা হয়েছে—‘তার মা কোন দলের? কোন পক্ষের?’
এই মানসিকতার নাম ‘ডিহিউম্যানাইজেশন’—প্রতিপক্ষকে তার পূর্ণ মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা। প্রথমে সে ‘অন্য মতের মানুষ’, তারপর ‘ওদের লোক’, তারপর ‘শত্রু’। শেষে তার ওপর যা ঘটে, সেটিও আর মানুষের কষ্ট বলে মনে হয় না। ‘সে কী করেছে?’ প্রশ্নের জায়গা নেয় ‘সে কোন পক্ষের?’—এটাই রাজনৈতিক ঘৃণার সবচেয়ে ভয়ংকর সাফল্য।
রাজনীতির স্বাভাবিক ভাষা বলে—আমাদের মত আলাদা। অসুস্থ রাজনীতি বলে—তুমি আমার শত্রু। আর ঘৃণার রাজনীতি বলে—তুমি শত্রু হলে তোমার কষ্টও আমার কাছে মূল্যহীন। একবার যদি এই নৈতিক অনুমোদন তৈরি হয়, তখন অপরাধ শুধু ঘটে না; অপরাধের আগেই সে নৈতিক বৈধতা পেয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা
অপরাধ কেবল অপরাধীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতারও বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, মামলার জট, সাক্ষীর ভয়, দণ্ডিতদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি—এসবই অপরাধীদের মনোবলে সাহস জোগায়। মানুষ দেখে, অপরাধ করে কেউ পার পেয়ে যায়। তখন সাধারণ মানুষের মনেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এটাই ‘আইনগত নৈরাজ্যবাদ’।
একটি শিশুহত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সমাজের প্রতিরোধক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়বে। রাষ্ট্র যদি অপরাধীকে ধরে আইনের কাঠগড়ায় না দাঁড় করাতে পারে, তাহলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হবে।
বিচারব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো চলছে। প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য বলা হলেও হত্যার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। এই তদন্ত যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ না হয়, যদি দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হয়, তাহলে এই হত্যাকাণ্ড আরও বড় সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দেবে।
অপরাধের বিচার হওয়া উচিত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক। সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ফরেনসিক তদন্ত আরও আধুনিক করতে হবে। অপরাধীরা যেন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবে পার না পায়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রযুক্তির আগ্রাসন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আমরা যতটা মুক্ত ভাবি, ততটা নয়। এর অ্যালগরিদম আমাদের রাগ, ঘৃণা ও বিভাজনের কনটেন্টকেই বেশি প্রমোট করে। একটি ঘটনার পর মানুষ যেন দ্রুত পক্ষ নিতে বাধ্য হয়। ‘আপনি কোন দলের?’—এই প্রশ্নটি এখন যেকোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর তার মায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের পুরোনো ভিডিও, পোস্ট ও বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি শিশুর মৃত্যুকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক স্কোরকার্ড বানিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রযুক্তির এই নিষ্ঠুরতা হত্যার চেয়েও কম ভয়ংকর নয়।
প্রযুক্তির আরেকটি দিক হলো—সহিংসতার ভিডিও শেয়ার, লাইক ও কমেন্টের সংস্কৃতি। শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে গণপিটুনি দেখে, ভিডিও করে; কেউ এগিয়ে যায় না। এই দৃশ্য পরোক্ষভাবে শেখায়—সহিংসতা করা যায়, এমনকি সহিংসতা থেকে বিনোদনও পাওয়া যায়।
শিক্ষায় অবক্ষয়
একটি শিশু যদি ১৩ বছরে এসে ফোনের জন্য হত্যার শিকার হয়, তার মানে সেই সমাজের শিক্ষা ও পারিবারিক ব্যবস্থায় কোথাও গলদ আছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, অভিভাবকের তত্ত্বাবধান কমছে, শিশুরা একাকী হয়ে পড়ছে। আবার যে শিশু হত্যা করে, সেই অপরাধীর পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানও প্রশ্ন তুলেছে।
মানুষ জন্মগতভাবে অমানুষ হয়ে জন্মায় না। মানুষ ধীরে ধীরে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে অক্ষম হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধন, নৈতিকতা ও সহানুভূতি—এসব না থাকলে একটি প্রজন্ম পশুর চেয়েও হিংস্র হয়ে ওঠে।
প্রশ্নবিদ্ধ রাজনীতি
অপ্রতিমের হত্যাকারী কে—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠছি। আমরা কি এমন সমাজ তৈরি করছি, যেখানে মানুষ আগে মানুষ, পরে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাহক? নাকি এমন সমাজ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই ঠিক করে দেবে—কার কান্নায় আমরা কাঁদব, কার মৃত্যুতে আমরা নীরব থাকব, আর কার মৃত্যুকে আমরা উপহাস করব?
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছে না। এটি আমাদের কাছে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—রাজনীতি কি আমাদের মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখাচ্ছে, নাকি মানুষকে ‘আমাদের’ আর ‘ওদের’ ভাগ করে ধীরে ধীরে অমানুষ বানিয়ে দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, আমাদের প্রত্যেকের দিতে হবে।
উত্তরণের পথ
দ্রুত বিচার: শিশুহত্যা ও নৃশংস অপরাধের মামলাগুলোকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আনা এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করা।
মাদক ও অপরাধ চক্র ধ্বংস: সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক এবং অস্ত্রের প্রবেশপথ বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি জেলায় মানসম্মত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গড়তে হবে।
শিক্ষায় সহানুভূতি: প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ‘সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং’ চালু করতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে—মানুষ আগে মানুষ, পরে রাজনৈতিক পরিচয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: সহিংস ও ঘৃণা ছড়ানো কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কমিউনিটি সুরক্ষা কমিটি: প্রতি পাড়া-মহল্লায় সামাজিক সুরক্ষা কমিটি গড়ে তুলতে হবে।

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বেরিয়েছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ। মাথায় আঘাতের চিহ্ন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং দুজনকে আটক করা হয়েছে।
একটি ফোন। তার জন্য একটি শিশুর জীবন। এই সমীকরণটাই বলে দেয়, আমরা কোন সমাজে বাস করছি। প্রশ্ন উঠতে পারে—একটি আইফোনের জন্য কেউ কেন শিশু হত্যা করবে? উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোয়।
আইফোন প্রাণের চেয়ে বড়?
আইফোন এখন আর কেবল একটি ফোন নয়; এটি সম্পদের, ক্ষমতার ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। একটি আইফোনের বাজারমূল্য দেশের একজন নিম্নআয়ের মানুষের কয়েক মাসের আয়ের সমান। যেখানে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোই কঠিন, সেখানে এই বস্তুটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার প্রতীক।
ঢাকার অলিগলিতে ‘আইফোন ছিনতাই’ এখন নিত্যদিনের খবর। এই ভোগবাদের সংস্কৃতি এমন এক নৈতিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে মানুষের চেয়ে বস্তুর মূল্য বেশি।
তরুণ বয়সে এই বস্তুকেন্দ্রিক আকাঙ্ক্ষা যাদের পূরণ হয় না, তারা ধীরে ধীরে সহিংসতার পথ বেছে নেয়। তারা ভাবে—আমি যদি এই ফোনটি না পাই, আমি কিছুই নই। আর এই ‘কিছু না হওয়া’-র হতাশা থেকেই জন্ম নেয় অপরাধ।
রাজনীতি মানুষকে ভাগ করে
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা ঘটেছে, সেটি হত্যাকাণ্ডের চেয়েও ভয়াবহ। নাহিদা বেগম ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার সন্তানের মৃত্যুকে কেউ কেউ ‘ন্যায্যতা’ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। প্রশ্ন করা হয়েছে—‘তার মা কোন দলের? কোন পক্ষের?’
এই মানসিকতার নাম ‘ডিহিউম্যানাইজেশন’—প্রতিপক্ষকে তার পূর্ণ মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা। প্রথমে সে ‘অন্য মতের মানুষ’, তারপর ‘ওদের লোক’, তারপর ‘শত্রু’। শেষে তার ওপর যা ঘটে, সেটিও আর মানুষের কষ্ট বলে মনে হয় না। ‘সে কী করেছে?’ প্রশ্নের জায়গা নেয় ‘সে কোন পক্ষের?’—এটাই রাজনৈতিক ঘৃণার সবচেয়ে ভয়ংকর সাফল্য।
রাজনীতির স্বাভাবিক ভাষা বলে—আমাদের মত আলাদা। অসুস্থ রাজনীতি বলে—তুমি আমার শত্রু। আর ঘৃণার রাজনীতি বলে—তুমি শত্রু হলে তোমার কষ্টও আমার কাছে মূল্যহীন। একবার যদি এই নৈতিক অনুমোদন তৈরি হয়, তখন অপরাধ শুধু ঘটে না; অপরাধের আগেই সে নৈতিক বৈধতা পেয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা
অপরাধ কেবল অপরাধীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতারও বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, মামলার জট, সাক্ষীর ভয়, দণ্ডিতদের পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি—এসবই অপরাধীদের মনোবলে সাহস জোগায়। মানুষ দেখে, অপরাধ করে কেউ পার পেয়ে যায়। তখন সাধারণ মানুষের মনেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এটাই ‘আইনগত নৈরাজ্যবাদ’।
একটি শিশুহত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না গেলে সমাজের প্রতিরোধক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়বে। রাষ্ট্র যদি অপরাধীকে ধরে আইনের কাঠগড়ায় না দাঁড় করাতে পারে, তাহলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হবে।
বিচারব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো চলছে। প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্য বলা হলেও হত্যার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। এই তদন্ত যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ না হয়, যদি দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হয়, তাহলে এই হত্যাকাণ্ড আরও বড় সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দেবে।
অপরাধের বিচার হওয়া উচিত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক। সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ফরেনসিক তদন্ত আরও আধুনিক করতে হবে। অপরাধীরা যেন রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবে পার না পায়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রযুক্তির আগ্রাসন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আমরা যতটা মুক্ত ভাবি, ততটা নয়। এর অ্যালগরিদম আমাদের রাগ, ঘৃণা ও বিভাজনের কনটেন্টকেই বেশি প্রমোট করে। একটি ঘটনার পর মানুষ যেন দ্রুত পক্ষ নিতে বাধ্য হয়। ‘আপনি কোন দলের?’—এই প্রশ্নটি এখন যেকোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর তার মায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের পুরোনো ভিডিও, পোস্ট ও বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি শিশুর মৃত্যুকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক স্কোরকার্ড বানিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রযুক্তির এই নিষ্ঠুরতা হত্যার চেয়েও কম ভয়ংকর নয়।
প্রযুক্তির আরেকটি দিক হলো—সহিংসতার ভিডিও শেয়ার, লাইক ও কমেন্টের সংস্কৃতি। শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে গণপিটুনি দেখে, ভিডিও করে; কেউ এগিয়ে যায় না। এই দৃশ্য পরোক্ষভাবে শেখায়—সহিংসতা করা যায়, এমনকি সহিংসতা থেকে বিনোদনও পাওয়া যায়।
শিক্ষায় অবক্ষয়
একটি শিশু যদি ১৩ বছরে এসে ফোনের জন্য হত্যার শিকার হয়, তার মানে সেই সমাজের শিক্ষা ও পারিবারিক ব্যবস্থায় কোথাও গলদ আছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, অভিভাবকের তত্ত্বাবধান কমছে, শিশুরা একাকী হয়ে পড়ছে। আবার যে শিশু হত্যা করে, সেই অপরাধীর পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানও প্রশ্ন তুলেছে।
মানুষ জন্মগতভাবে অমানুষ হয়ে জন্মায় না। মানুষ ধীরে ধীরে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে অক্ষম হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধন, নৈতিকতা ও সহানুভূতি—এসব না থাকলে একটি প্রজন্ম পশুর চেয়েও হিংস্র হয়ে ওঠে।
প্রশ্নবিদ্ধ রাজনীতি
অপ্রতিমের হত্যাকারী কে—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠছি। আমরা কি এমন সমাজ তৈরি করছি, যেখানে মানুষ আগে মানুষ, পরে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাহক? নাকি এমন সমাজ, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই ঠিক করে দেবে—কার কান্নায় আমরা কাঁদব, কার মৃত্যুতে আমরা নীরব থাকব, আর কার মৃত্যুকে আমরা উপহাস করব?
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছে না। এটি আমাদের কাছে আরও কঠিন একটি প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে—রাজনীতি কি আমাদের মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখাচ্ছে, নাকি মানুষকে ‘আমাদের’ আর ‘ওদের’ ভাগ করে ধীরে ধীরে অমানুষ বানিয়ে দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনীতিবিদদের নয়, আমাদের প্রত্যেকের দিতে হবে।
উত্তরণের পথ
দ্রুত বিচার: শিশুহত্যা ও নৃশংস অপরাধের মামলাগুলোকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আনা এবং ৯০ দিনের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করা।
মাদক ও অপরাধ চক্র ধ্বংস: সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক এবং অস্ত্রের প্রবেশপথ বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি জেলায় মানসম্মত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গড়তে হবে।
শিক্ষায় সহানুভূতি: প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ‘সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং’ চালু করতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে—মানুষ আগে মানুষ, পরে রাজনৈতিক পরিচয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: সহিংস ও ঘৃণা ছড়ানো কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কমিউনিটি সুরক্ষা কমিটি: প্রতি পাড়া-মহল্লায় সামাজিক সুরক্ষা কমিটি গড়ে তুলতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন