সংবাদ

ডেঙ্গু ভয়ঙ্কর: ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১৮৭২


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১১ পিএম

ডেঙ্গু ভয়ঙ্কর: ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১৮৭২
ছবি : সংগৃহীত

ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আরও ৫ জন মারা গেছেন। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৮৭২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত মোট ১৯৫ জন মারা গেছেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫ হাজার ৪৯৯ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগে দুজন এবং ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা ও বরিশাল বিভাগে একজন করে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও দুজন নারী।

এর আগে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর এক হাজার ৭৫৩ জন, ১৫ সেপ্টেম্বর এক হাজার ৫৯৩ জন ও ৮ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এক হাজার ৫৭১ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ফিল্ড রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব একটি অস্বাভাবিক গতিপথ অনুসরণ করেছে। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম ছিল। কিন্তু আগস্টের শেষ থেকে বর্ষা-চালিত তীব্র সংক্রমণ শুরু হয় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ছাড়িয়ে যায়।

আগস্ট মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪৩ জন মারা যান। যা জুলাইয়ের ৯ হাজার ২০৬ জন ভর্তির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৪ দিনে দেশে গড়ে প্রতিদিন এক হাজার ২০০ জনেরও বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশিদ মোহামেদ বলেছেন, “ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা ‘এটি অথবা ওটি’ পদ্ধতিতে চলতে পারে না। নজরদারি, ঝুঁকি যোগাযোগ, সামাজিক সংহতি, ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক চিকিৎসা—সবকিছু একই সময়ে, একই ভৌগোলিক অবস্থানে ঘটতে হবে। এই হস্তক্ষেপগুলো একসঙ্গে মিলিত হতে হবে।”

হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঢাকা ও অন্যান্য শহরের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণে অনেক জায়গায় মেঝে ও বারান্দায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। 

একইসঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাবও চলছে, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় হাম রোগীদের আলাদা রাখতে হচ্ছে, যার ফলে ওয়ার্ডের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।

প্রখ্যাত কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেছেন, বাংলাদেশ মশার দেশ। গত বছরগুলোর তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পূর্বাভাস মডেল বলছে, অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ বাংলাদেশে রয়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে ডিইএনভি৩ প্রভাবশালী ছিল, কিন্তু বর্তমানে ডিইএনভি২ আবার প্রাধান্য পাচ্ছে। ভিন্ন সেরোটাইপে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ হলে রোগ গুরুতর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ডব্লিউএইচও বলছে, ডেঙ্গুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সহায়ক চিকিৎসাই মূল ভরসা। তবে দ্রুত রোগ শনাক্ত এবং সঠিক ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা জটিলতা ও মৃত্যু কমাতে পারে। ভেক্টর নিয়ন্ত্রণই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডিজিটাল সচেতনতা প্রচারণা শুরু করেছে। ডব্লিউএইচওর সহায়তায় স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আপডেটেড ডেঙ্গু ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।

সিটি করপোরেশনগুলো কমিউনিটি পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা ও স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) অনুমোদিত কীটনাশক পরীক্ষা করে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারের সুপারিশ দিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ভেক্টর নিয়ন্ত্রণের জন্য সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল, উন্নত নজরদারি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনা করেছে।

ডব্লিউএইচওর মেডিকেল অফিসার ড. অনুপমা হাজারিকা বলেছেন, “প্রতিটি ডেঙ্গু সংখ্যার পেছনে একটি নাম আছে; প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি পরিবার আছে; এবং প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির পেছনে একটি দায় আছে, যা আমরা সবাই ভাগ করি।”

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ডেঙ্গু ভয়ঙ্কর: ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ১৮৭২

প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে আরও ৫ জন মারা গেছেন। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৮৭২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে এ পর্যন্ত মোট ১৯৫ জন মারা গেছেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৫ হাজার ৪৯৯ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগে দুজন এবং ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা ও বরিশাল বিভাগে একজন করে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও দুজন নারী।

এর আগে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর এক হাজার ৭৫৩ জন, ১৫ সেপ্টেম্বর এক হাজার ৫৯৩ জন ও ৮ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এক হাজার ৫৭১ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ফিল্ড রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব একটি অস্বাভাবিক গতিপথ অনুসরণ করেছে। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম ছিল। কিন্তু আগস্টের শেষ থেকে বর্ষা-চালিত তীব্র সংক্রমণ শুরু হয় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ছাড়িয়ে যায়।

আগস্ট মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪৩ জন মারা যান। যা জুলাইয়ের ৯ হাজার ২০৬ জন ভর্তির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৪ দিনে দেশে গড়ে প্রতিদিন এক হাজার ২০০ জনেরও বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশিদ মোহামেদ বলেছেন, “ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা ‘এটি অথবা ওটি’ পদ্ধতিতে চলতে পারে না। নজরদারি, ঝুঁকি যোগাযোগ, সামাজিক সংহতি, ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক চিকিৎসা—সবকিছু একই সময়ে, একই ভৌগোলিক অবস্থানে ঘটতে হবে। এই হস্তক্ষেপগুলো একসঙ্গে মিলিত হতে হবে।”

হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঢাকা ও অন্যান্য শহরের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণে অনেক জায়গায় মেঝে ও বারান্দায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। 

একইসঙ্গে হামের প্রাদুর্ভাবও চলছে, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় হাম রোগীদের আলাদা রাখতে হচ্ছে, যার ফলে ওয়ার্ডের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।

প্রখ্যাত কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেছেন, বাংলাদেশ মশার দেশ। গত বছরগুলোর তুলনায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। পূর্বাভাস মডেল বলছে, অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ বাংলাদেশে রয়েছে। ২০১৯ সালের পর থেকে ডিইএনভি৩ প্রভাবশালী ছিল, কিন্তু বর্তমানে ডিইএনভি২ আবার প্রাধান্য পাচ্ছে। ভিন্ন সেরোটাইপে দ্বিতীয়বার সংক্রমণ হলে রোগ গুরুতর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

ডব্লিউএইচও বলছে, ডেঙ্গুর জন্য নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। সহায়ক চিকিৎসাই মূল ভরসা। তবে দ্রুত রোগ শনাক্ত এবং সঠিক ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা জটিলতা ও মৃত্যু কমাতে পারে। ভেক্টর নিয়ন্ত্রণই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকার তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডিজিটাল সচেতনতা প্রচারণা শুরু করেছে। ডব্লিউএইচওর সহায়তায় স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আপডেটেড ডেঙ্গু ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।

সিটি করপোরেশনগুলো কমিউনিটি পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা ও স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) অনুমোদিত কীটনাশক পরীক্ষা করে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারের সুপারিশ দিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ভেক্টর নিয়ন্ত্রণের জন্য সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল, উন্নত নজরদারি ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদারের পরিকল্পনা করেছে।

ডব্লিউএইচওর মেডিকেল অফিসার ড. অনুপমা হাজারিকা বলেছেন, “প্রতিটি ডেঙ্গু সংখ্যার পেছনে একটি নাম আছে; প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি পরিবার আছে; এবং প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতির পেছনে একটি দায় আছে, যা আমরা সবাই ভাগ করি।”


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত