ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে এসেছে। দেশব্যাপী পরিচালিত বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা বা ‘এসআইআর’ (SIR) কর্মসূচি নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের অন্তত ১৪টি লিখিত আপত্তির তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর এই রাজনৈতিক বিতর্ক চরম আকার ধারণ করেছে।
ভারতের অন্যতম প্রধান পত্রিকা ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশিকা নিয়ে লিখিতভাবে অন্তত ১৪ বার ভিন্নমত পোষণ ও আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তাাদের প্রধান আপত্তির বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল–নতুন ভোটার নিবন্ধনের ফর্ম-৬ পরিবর্তন, তালিকা থেকে ভোটার নাম কর্তন ও পুনর্সংযোজনের নিয়মাবলি, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার সংক্রান্ত আপিল এবং ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় বা দিল্লির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই কমিশনারের স্পষ্ট বিরোধিতা সত্ত্বেও একটি ক্ষেত্রে ফর্ম-৬-এ পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যাকে পরবর্তীতে কমিশনার সান্ধু ‘অননুমোদিত’ ও ‘বেআইনি’ বলে অভিহিত করেন।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই ভারতের কেন্দ্রীয় বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলো কমিশনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরেই ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে আসছিলেন। বিরোধীদের দাবি, তাদের এতদিনের অভিযোগ যে কেবল রাজনৈতিক ছিল না, কমিশনের ভেতরের এই অনাস্থাই তার প্রমাণ। দুই কমিশনার কেন আপত্তি তুলেছিলেন এবং কীভাবে তাদের এড়িয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো–তা প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। বিরোধী দলগুলোর একাংশের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাসকদল বিজেপিকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রবীণ আইনজীবী ও রাজ্যসভা সংসদ সদস্য কপিল সিব্বল নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কাঠামোর কথা উল্লেখ করে বলেন, তিন সদস্যের সংস্থায় কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে মীমাংসা করার আইনি বিধান রয়েছে। দুই সদস্যের ধারাবাহিক আপত্তির পরও কীভাবে ওই নির্দেশিকাগুলো বলবৎ হলো, তার পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করা এবং চলমান এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি তুলেছেন তিনি।
একই সুরে সুর মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস বিষয়টিকে মারাত্মক জালিয়াতি বলে উল্লেখ করেছে। দলের সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন প্রবীণ বিরোধী আইনপ্রণেতাদের সই করা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের প্রস্তাবটি পুনরায় উত্থাপনের দাবি জানান। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে পুরোনো ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের জোর দাবি তোলেন। আম আদমি পার্টি (আপ), কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টিও এই ঘটনায় সরব হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ একবাক্যে খারিজ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন–ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, একটি স্বাধীন প্রশাসনিক সংস্থায় অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও পরামর্শের সময় সদস্যদের ব্যক্তিগত মতভেদ বা পৃথক পর্যবেক্ষণ থাকাটা স্বাভাবিক প্রশাসনিক চর্চা। কিন্তু এসআইআরসহ প্রতিটি চূড়ান্ত নির্দেশিকা তিন কমিশনারের সর্বসম্মত সম্মতিতেই অনুমোদিত ও জারি করা হয়েছে। ফলে দুই কমিশনারের মতামতকে কোনো অবস্থাতেই কমিশনের ভেতরে বিভাজন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরোধী ‘ভোট’ বলা চলে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু এখন কমিশনের ভেতরের প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতীয় নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত সংস্থা। ভারতের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কমিশনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লাখ ১৬ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল, যা নিয়ে ইতিমধ্যে ২২ লাখের বেশি মানুষ নাম পুনর্বহালের আবেদন জানিয়েছেন।
ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মানদণ্ড ও পরবর্তী আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত এটি কেবল রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের ইস্যু নয়; ভারতের মতো বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থা ও ভোটার তালিকার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখার এক বড় পরীক্ষা।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভারতের জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে এসেছে। দেশব্যাপী পরিচালিত বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা বা ‘এসআইআর’ (SIR) কর্মসূচি নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের অন্তত ১৪টি লিখিত আপত্তির তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর এই রাজনৈতিক বিতর্ক চরম আকার ধারণ করেছে।
ভারতের অন্যতম প্রধান পত্রিকা ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশিকা নিয়ে লিখিতভাবে অন্তত ১৪ বার ভিন্নমত পোষণ ও আপত্তি জানিয়েছিলেন।
তাাদের প্রধান আপত্তির বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল–নতুন ভোটার নিবন্ধনের ফর্ম-৬ পরিবর্তন, তালিকা থেকে ভোটার নাম কর্তন ও পুনর্সংযোজনের নিয়মাবলি, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার সংক্রান্ত আপিল এবং ভোটার তালিকার প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় বা দিল্লির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই কমিশনারের স্পষ্ট বিরোধিতা সত্ত্বেও একটি ক্ষেত্রে ফর্ম-৬-এ পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যাকে পরবর্তীতে কমিশনার সান্ধু ‘অননুমোদিত’ ও ‘বেআইনি’ বলে অভিহিত করেন।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই ভারতের কেন্দ্রীয় বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলো কমিশনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরেই ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে আসছিলেন। বিরোধীদের দাবি, তাদের এতদিনের অভিযোগ যে কেবল রাজনৈতিক ছিল না, কমিশনের ভেতরের এই অনাস্থাই তার প্রমাণ। দুই কমিশনার কেন আপত্তি তুলেছিলেন এবং কীভাবে তাদের এড়িয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো–তা প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। বিরোধী দলগুলোর একাংশের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাসকদল বিজেপিকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রবীণ আইনজীবী ও রাজ্যসভা সংসদ সদস্য কপিল সিব্বল নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কাঠামোর কথা উল্লেখ করে বলেন, তিন সদস্যের সংস্থায় কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলে তা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে মীমাংসা করার আইনি বিধান রয়েছে। দুই সদস্যের ধারাবাহিক আপত্তির পরও কীভাবে ওই নির্দেশিকাগুলো বলবৎ হলো, তার পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করা এবং চলমান এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত রেখে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি তুলেছেন তিনি।
একই সুরে সুর মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস বিষয়টিকে মারাত্মক জালিয়াতি বলে উল্লেখ করেছে। দলের সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন প্রবীণ বিরোধী আইনপ্রণেতাদের সই করা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের প্রস্তাবটি পুনরায় উত্থাপনের দাবি জানান। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে পুরোনো ভোটার তালিকার ভিত্তিতে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের জোর দাবি তোলেন। আম আদমি পার্টি (আপ), কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টিও এই ঘটনায় সরব হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ একবাক্যে খারিজ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন–ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, একটি স্বাধীন প্রশাসনিক সংস্থায় অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও পরামর্শের সময় সদস্যদের ব্যক্তিগত মতভেদ বা পৃথক পর্যবেক্ষণ থাকাটা স্বাভাবিক প্রশাসনিক চর্চা। কিন্তু এসআইআরসহ প্রতিটি চূড়ান্ত নির্দেশিকা তিন কমিশনারের সর্বসম্মত সম্মতিতেই অনুমোদিত ও জারি করা হয়েছে। ফলে দুই কমিশনারের মতামতকে কোনো অবস্থাতেই কমিশনের ভেতরে বিভাজন বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরোধী ‘ভোট’ বলা চলে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণের কেন্দ্রবিন্দু এখন কমিশনের ভেতরের প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতীয় নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত সংস্থা। ভারতের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কমিশনের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লাখ ১৬ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল, যা নিয়ে ইতিমধ্যে ২২ লাখের বেশি মানুষ নাম পুনর্বহালের আবেদন জানিয়েছেন।
ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মানদণ্ড ও পরবর্তী আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত এটি কেবল রাজনৈতিক জয়-পরাজয়ের ইস্যু নয়; ভারতের মতো বিশাল গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন পরিচালনা ব্যবস্থা ও ভোটার তালিকার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখার এক বড় পরীক্ষা।

আপনার মতামত লিখুন