সংবাদ

রোহিঙ্গাদের মানবপাচার নিয়ে জাতিসংঘের চরম উদ্বেগ


সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

রোহিঙ্গাদের মানবপাচার নিয়ে জাতিসংঘের চরম উদ্বেগ
ছবি : সংগৃহীত

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গা সংকট যত গভীর হচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানবপাচারের ভয়াবহ ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন হ্রাস, জীবিকা ও শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং নথিপত্রের সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাচারকারী চক্রগুলো। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ‘এএল বিজিডি ৪/২০২৬’ শীর্ষক বিশেষ নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেই অন্তত ৪০৭টি মানবপাচারের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ পুরুষ, ২২ শতাংশ নারী এবং ২১ শতাংশই শিশু। পুরুষ ও ছেলেদের মূলতঃ কৃষি, পশুপালন, মাছ ধরা ও নির্মাণকাজে আর নারী ও মেয়েদের জোরপূর্বক শ্রম ও যৌনকাজে পাচার করা হচ্ছে। চাকরি, ভালো শিক্ষা কিংবা বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারগুলোকে ফাঁদে ফেলছে দালাল চক্র।

শিবিরে সুযোগের অভাবে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ট্রলারে চেপে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় নামেন। এদের মধ্যে অন্তত ৮৯০ জন সাগরে ডুবে মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এই প্রাণহানির হার ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যার দুই-তৃতীয়াংশই ছিল নারী ও শিশু।

চলতি ২০২৬ সালেও সমুদ্রযাত্রার এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি থেকে মে) ৪ হাজার ৩৪৯ জন রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে রওনা হয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫৬ শতাংশ বেশি। গত ৯ এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলার ডুবে সাগরে অন্তত ২৫০ জন সলিলসমাধি লাভ করেন।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্র থেকে উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিদের অনেক সময় ভুক্তভোগী হিসেবে সুরক্ষা না দিয়ে অনিয়মিত অভিবাসী বা অপরাধী হিসেবে গ্রেফতার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের পরিপন্থী। এছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। চলতি বছরের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম।

উদ্ধার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, মানবপাচার প্রতিরোধ, দায়ীদের বিচার এবং রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ জানতে চেয়ে মোট ১০টি বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে জাতিসংঘ। এর মধ্যে রয়েছে ৯ এপ্রিলের নৌকাডুবির পরিস্থিতি ও তদন্ত, সমুদ্র থেকে উদ্ধার ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া, পাচারের ঝুঁকি শনাক্তকরণ, রোহিঙ্গা শিবিরে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা, পাচারের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার, ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণের সুযোগ।

এ ছাড়া দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, জীবিকার অভাব, পরিচয়পত্রের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথের সংকটের মতো মানবপাচারের মূল ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় বাংলাদেশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকট এখন কেবল খাদ্য ও আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; মানবপাচার রোধ ও সমুদ্রপথে জীবন বাঁচানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র : যুগান্তর

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


রোহিঙ্গাদের মানবপাচার নিয়ে জাতিসংঘের চরম উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গা সংকট যত গভীর হচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানবপাচারের ভয়াবহ ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন হ্রাস, জীবিকা ও শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং নথিপত্রের সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাচারকারী চক্রগুলো। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ‘এএল বিজিডি ৪/২০২৬’ শীর্ষক বিশেষ নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেই অন্তত ৪০৭টি মানবপাচারের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ পুরুষ, ২২ শতাংশ নারী এবং ২১ শতাংশই শিশু। পুরুষ ও ছেলেদের মূলতঃ কৃষি, পশুপালন, মাছ ধরা ও নির্মাণকাজে আর নারী ও মেয়েদের জোরপূর্বক শ্রম ও যৌনকাজে পাচার করা হচ্ছে। চাকরি, ভালো শিক্ষা কিংবা বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারগুলোকে ফাঁদে ফেলছে দালাল চক্র।

শিবিরে সুযোগের অভাবে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরের বিপজ্জনক সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ট্রলারে চেপে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় নামেন। এদের মধ্যে অন্তত ৮৯০ জন সাগরে ডুবে মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৪ সালের তুলনায় এই প্রাণহানির হার ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যার দুই-তৃতীয়াংশই ছিল নারী ও শিশু।

চলতি ২০২৬ সালেও সমুদ্রযাত্রার এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই (জানুয়ারি থেকে মে) ৪ হাজার ৩৪৯ জন রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে রওনা হয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫৬ শতাংশ বেশি। গত ৯ এপ্রিল টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলার ডুবে সাগরে অন্তত ২৫০ জন সলিলসমাধি লাভ করেন।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্র থেকে উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিদের অনেক সময় ভুক্তভোগী হিসেবে সুরক্ষা না দিয়ে অনিয়মিত অভিবাসী বা অপরাধী হিসেবে গ্রেফতার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের পরিপন্থী। এছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। চলতি বছরের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম।

উদ্ধার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা, মানবপাচার প্রতিরোধ, দায়ীদের বিচার এবং রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ জানতে চেয়ে মোট ১০টি বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছে জাতিসংঘ। এর মধ্যে রয়েছে ৯ এপ্রিলের নৌকাডুবির পরিস্থিতি ও তদন্ত, সমুদ্র থেকে উদ্ধার ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া, পাচারের ঝুঁকি শনাক্তকরণ, রোহিঙ্গা শিবিরে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা, পাচারের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার, ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং ক্ষতিপূরণের সুযোগ।

এ ছাড়া দারিদ্র্য, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, জীবিকার অভাব, পরিচয়পত্রের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের পথের সংকটের মতো মানবপাচারের মূল ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় বাংলাদেশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকট এখন কেবল খাদ্য ও আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; মানবপাচার রোধ ও সমুদ্রপথে জীবন বাঁচানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র : যুগান্তর


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত