মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরেও থেমে নেই স্বাস্থ্যসেবা। ধ্বংসস্তূপের সামনে রাস্তার ওপর বসেই দ্বিতীয় দিনের মতো শিশুদের টিকা দিয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ৩৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয় এবং আরও অন্তত ১৫ জনকে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। স্বাভাবিক দিনে এই কেন্দ্র থেকে সেবা পেতেন ১২০ থেকে ১৫০ জন।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা সেন্টারে হামলা চালায়। তারা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, নগদ অর্থ ও অন্য মালপত্র লুট করে নেয়।
পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার।
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ–শিশুসেবা, টিকাদান, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছিল। এখন এসব সেবা বন্ধ।
প্যারামেডিক ফারজানা জানান, আগে শিশুদের কার্ড পূরণ করে অপেক্ষা করিয়ে টিকা দেওয়া হতো, ওজন-উচ্চতা মাপা হতো, পুষ্টি পরামর্শ দেওয়া হতো। এখন এসব দেওয়া যাচ্ছে না। নদীর ওপার থেকেও অনেক দরিদ্র রোগী এখানে আসতেন।
সেবা নিতে আসা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষেরা এখন কোথায় যাবে?’ রোগীরা সরকারের কাছে দ্রুত সেবা পুনরায় চালুর অনুরোধ জানিয়েছেন।
ওসি প্রত্যাহার: ঘটনার পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিএমপি সদর দপ্তরের আদেশে তাকে ‘প্রশাসনিক কারণে’ প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে দেখা হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি: এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, হাম ও ডেঙ্গু মহামারির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান কেন্দ্র মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া কেবল একটি ভবনে হামলা নয়, এটি পুরো গণস্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণ।
কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ২০০-২৫০ জনের অস্ত্রধারী দল নির্বিঘ্নে দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙচুর চালায়। স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার নাম উঠে আসা এবং ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে এটি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত জমি দখলের তাণ্ডব।
কমিটি চারটি দাবি জানিয়েছে—এজাহারভুক্ত বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার, নিশ্চুপ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, দখল করা ১০ কাঠা জমি উদ্ধার করে রাড্ডা ক্লিনিক পুনর্নির্মাণ এবং ভূমিদস্যুতা ও মাফিয়াতন্ত্রের সংস্কৃতি বন্ধ করা।
এনসিপি: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া রোববার মিরপুর-১-এ রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শন শেষে বলেন, ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে মবতন্ত্র কায়েম করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের পর সেখানে টাঙানো ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’ নামের বিলবোর্ড ফেলে দেওয়া হয়।
আসিফ মাহমুদ বলেন, দুই দিনের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশ সদস্যদের ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কোনো স্থাপনা ভাঙার অনুমতি আছে কি না, তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার সঙ্গে বিএনপির একজন সংসদ সদস্য, একজন কাউন্সিলর ও স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা জড়িত। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তাসনিম জারা: চিকিৎসক ও রাজনীতিক তাসনিম জারা রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শন শেষে বলেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চলার পরও পুলিশ কেন ঠেকাতে পারেনি? এমন পরিস্থিতিতে মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা রাখবে কীভাবে? তিনি বলেন, টিকাদানের রেজিস্টার খাতা ও দুটি ট্যাব নেই, তাই কোন শিশুর কখন টিকা দেওয়ার কথা তা জানা যাচ্ছে না। নিয়মিত টিকা থেকে অনেক শিশু বঞ্চিত হতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দ্রুত রেজিস্টার পুনরায় তৈরি করে টিকার আওতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরেও থেমে নেই স্বাস্থ্যসেবা। ধ্বংসস্তূপের সামনে রাস্তার ওপর বসেই দ্বিতীয় দিনের মতো শিশুদের টিকা দিয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ৩৭ শিশুকে টিকা দেওয়া হয় এবং আরও অন্তত ১৫ জনকে অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। স্বাভাবিক দিনে এই কেন্দ্র থেকে সেবা পেতেন ১২০ থেকে ১৫০ জন।
গত বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা সেন্টারে হামলা চালায়। তারা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, নগদ অর্থ ও অন্য মালপত্র লুট করে নেয়।
পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার।
১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ–শিশুসেবা, টিকাদান, প্রজননস্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছিল। এখন এসব সেবা বন্ধ।
প্যারামেডিক ফারজানা জানান, আগে শিশুদের কার্ড পূরণ করে অপেক্ষা করিয়ে টিকা দেওয়া হতো, ওজন-উচ্চতা মাপা হতো, পুষ্টি পরামর্শ দেওয়া হতো। এখন এসব দেওয়া যাচ্ছে না। নদীর ওপার থেকেও অনেক দরিদ্র রোগী এখানে আসতেন।
সেবা নিতে আসা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষেরা এখন কোথায় যাবে?’ রোগীরা সরকারের কাছে দ্রুত সেবা পুনরায় চালুর অনুরোধ জানিয়েছেন।
ওসি প্রত্যাহার: ঘটনার পর শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডিএমপি সদর দপ্তরের আদেশে তাকে ‘প্রশাসনিক কারণে’ প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশের গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে দেখা হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি: এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, হাম ও ডেঙ্গু মহামারির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ টিকাদান কেন্দ্র মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া কেবল একটি ভবনে হামলা নয়, এটি পুরো গণস্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণ।
কমিটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও ২০০-২৫০ জনের অস্ত্রধারী দল নির্বিঘ্নে দীর্ঘ সময় ধরে ভাঙচুর চালায়। স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার নাম উঠে আসা এবং ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে এটি রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত এক সুপরিকল্পিত জমি দখলের তাণ্ডব।
কমিটি চারটি দাবি জানিয়েছে—এজাহারভুক্ত বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার, নিশ্চুপ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, দখল করা ১০ কাঠা জমি উদ্ধার করে রাড্ডা ক্লিনিক পুনর্নির্মাণ এবং ভূমিদস্যুতা ও মাফিয়াতন্ত্রের সংস্কৃতি বন্ধ করা।
এনসিপি: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া রোববার মিরপুর-১-এ রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শন শেষে বলেন, ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে মবতন্ত্র কায়েম করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের পর সেখানে টাঙানো ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিঃ’ নামের বিলবোর্ড ফেলে দেওয়া হয়।
আসিফ মাহমুদ বলেন, দুই দিনের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। সিসিটিভি ফুটেজে পুলিশ সদস্যদের ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কোনো স্থাপনা ভাঙার অনুমতি আছে কি না, তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার সঙ্গে বিএনপির একজন সংসদ সদস্য, একজন কাউন্সিলর ও স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা জড়িত। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
তাসনিম জারা: চিকিৎসক ও রাজনীতিক তাসনিম জারা রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শন শেষে বলেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চলার পরও পুলিশ কেন ঠেকাতে পারেনি? এমন পরিস্থিতিতে মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আস্থা রাখবে কীভাবে? তিনি বলেন, টিকাদানের রেজিস্টার খাতা ও দুটি ট্যাব নেই, তাই কোন শিশুর কখন টিকা দেওয়ার কথা তা জানা যাচ্ছে না। নিয়মিত টিকা থেকে অনেক শিশু বঞ্চিত হতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দ্রুত রেজিস্টার পুনরায় তৈরি করে টিকার আওতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন