সংবাদ

একসঙ্গে থেকেও আমরা একা


কামরুজ্জামান
কামরুজ্জামান
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৩ এএম

একসঙ্গে থেকেও আমরা একা

সময় এখন তথ্য ও প্রযুক্তির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বজুড়ে বিস্তার ঘটছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন। যোগাযোগ, বিনোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজ এখন মোবাইলনির্ভর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গেম ও জুয়ার মতো নানা ঝুঁকিও।

আবালবৃদ্ধবনিতা থেকে শুরু করে ধনী-গরিব—সব শ্রেণির মানুষের হাতেই এখন মোবাইল ফোন। কাজেও মোবাইল, অবসরেও মোবাইল, বিনোদনেও মোবাইল। ফলে মানুষে মানুষে সরাসরি মতবিনিময় ও আড্ডার আগ্রহ কমছে। একা থাকা এবং নিজের জগতে ডুবে থাকাকেই অনেকে স্বাচ্ছন্দ্য মনে করছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মোবাইল ফোন কি ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

আমাদের চারপাশে মানুষের ভিড় বাড়ছে, অথচ কমে যাচ্ছে আপন মানুষ। প্রযুক্তি দূরের মানুষকে কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু কাছের মানুষগুলোকে যেন আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একসময় অবসর পেলেই মানুষ পরিবারের সঙ্গে বসত, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, প্রতিবেশীর খোঁজ নিত। এখন অবসর পেলেই অনেকের চোখ চলে যায় মোবাইলের পর্দায়। একই ঘরে বসে থাকা মানুষগুলোর মধ্যেও তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য দূরত্ব। কথা বলার মানুষ আছে, কিন্তু মনের কথা বলার মানুষ যেন কমে যাচ্ছে।

হাজারো পরিচিত মুখের ভিড়েও অনেক মানুষ ভীষণ একা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রতিদিন নিজেদের হাসিমুখের ছবি প্রকাশ করি। অথচ সেই হাসির আড়ালে কতটা শূন্যতা লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় কেউ জানে না। মানুষ অন্যের জীবনের খবর রাখে, কিন্তু পাশের মানুষটির মন খারাপের খবর রাখে না।

সম্পর্কগুলোও ধীরে ধীরে প্রয়োজননির্ভর হয়ে পড়ছে। যতক্ষণ প্রয়োজন আছে, ততক্ষণ যোগাযোগ থাকে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সম্পর্কের উষ্ণতাও কমে যায়। অভিমান জমে থাকে, কিন্তু তা ভাঙার মতো মানুষ থাকে না। কষ্ট হয়, কিন্তু কষ্টের কথা শোনার মতো ধৈর্যশীল মানুষ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই নিজের সমস্যার কথা বলতে চান, কিন্তু অন্যকে বিরক্ত করার ভয়ে চুপ করে থাকেন। এই নীরবতা একসময় মানুষকে নিজের ভেতরেই বন্দি করে ফেলে।

ব্যস্ত জীবনের অজুহাতে আমরা প্রিয় মানুষদের সময় দিতে ভুলে যাচ্ছি। বাবা-মায়ের পাশে বসার সময় নেই, বন্ধুর সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময় নেই। প্রিয় মানুষটি কেমন আছে—এই ছোট্ট প্রশ্নটিও অনেক সময় করা হয় না। ফলে সম্পর্কগুলো টিকে থাকে, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানুষ নিজের একাকিত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছে।

একসময় পরিবারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প-আড্ডা ও মতবিনিময় হতো। পরিবারের সদস্যরা সারাদিন ব্যস্ত থাকলেও রাতে একসঙ্গে খাবার খেতে বসতেন। খাবারের টেবিলে পরিবার, সমাজ ও চারপাশের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার বড় একটি অংশ সেখান থেকেই অর্জিত হতো। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। মোবাইলের রঙিন পর্দার ভেতরেই অনেকে নিজের আলাদা জগৎ তৈরি করে নিয়েছেন।

রাস্তা, ঘাট, চায়ের দোকান, বাস কিংবা ট্রেন—সব জায়গাতেই একই চিত্র। সবাই যেন মোবাইলের পর্দায় নিমগ্ন। কেউ গান শুনছেন, কেউ খবর পড়ছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। পাশে কে বসে আছেন, চারপাশে কী ঘটছে—সেদিকে নজর দেওয়ার সময় যেন কারও নেই।

শিশুরাও এর বাইরে নয়। অনেক শিশু মোবাইল ফোনে গেম খেলে, মোবাইল দেখতে দেখতে খাবার খায়। বড়রাও পারিবারিক, সামাজিক, দাপ্তরিক ও আর্থিক নানা কাজ মোবাইলেই সারেন। এরপর দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটিয়ে দেন। ফলে পরিবারের সদস্যরা একই জায়গায় থেকেও নিজ নিজ পর্দার জগতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।

কর্মক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একসঙ্গে অনেক সহকর্মী বসে থাকলেও প্রত্যেকে নিজের মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। কেউ গান শুনছেন, কেউ খবর পড়ছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ কারও সঙ্গে অনলাইনে কথা বলছেন। কথাবার্তা হলেও অনেক সময় তা সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে আন্তরিকভাবে কথা বলার অভ্যাস কমে যাচ্ছে।

বন্ধুদের আড্ডাতেও একই অবস্থা। দশজন বন্ধু একসঙ্গে বসে আছেন, অথচ সবার মনোযোগ মোবাইলের পর্দায়। কেউ গেম খেলছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। ফলে একসঙ্গে থেকেও তারা যেন প্রত্যেকে আলাদা জগতে অবস্থান করছেন। বাস্তব আড্ডার জায়গা দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল ব্যস্ততা।

মোবাইল ফোন মানুষের যোগাযোগের পরিসর বাড়িয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক বন্ধনে দূরত্ব তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা যদি মানুষের আবেগ, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করে, তাহলে সেই অগ্রগতি নিয়ে ভাবারও প্রয়োজন আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার প্রবণতা বাড়ছে, অথচ বাস্তব জীবনের সম্পর্কের সেতু দুর্বল হয়ে পড়ছে।

মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক হৃদ্যতা ও মানবিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং এর ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। প্রয়োজনের সময় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু প্রযুক্তিকে যেন আমাদের জীবনের সম্পর্কগুলোর নিয়ন্ত্রক হতে না দেওয়া হয়।

মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ তুলে চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকানো দরকার। প্রিয় মানুষের পাশে বসা দরকার। একটি ফোন, একটু খোঁজ নেওয়া কিংবা কয়েক মিনিটের আন্তরিক কথাও কারও একাকিত্ব অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, মানুষ যতই আধুনিক হোক, ভালোবাসা, সঙ্গ ও আন্তরিকতার প্রয়োজন কখনো কমে না।

জীবনে কতজন মানুষকে আমরা চিনি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতজন মানুষ আমাদের আপন। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে একা। কিন্তু সেই একাকিত্ব যেন প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে না দেয়। প্রযুক্তি আমাদের আশীর্বাদ। সেই আশীর্বাদ যেন আমাদের সম্পর্কের জন্য অভিশাপ হয়ে না ওঠে।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


একসঙ্গে থেকেও আমরা একা

প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সময় এখন তথ্য ও প্রযুক্তির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বজুড়ে বিস্তার ঘটছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আর মানুষের প্রাত্যহিক জীবনকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় সবার হাতেই মোবাইল ফোন। যোগাযোগ, বিনোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজ এখন মোবাইলনির্ভর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গেম ও জুয়ার মতো নানা ঝুঁকিও।

আবালবৃদ্ধবনিতা থেকে শুরু করে ধনী-গরিব—সব শ্রেণির মানুষের হাতেই এখন মোবাইল ফোন। কাজেও মোবাইল, অবসরেও মোবাইল, বিনোদনেও মোবাইল। ফলে মানুষে মানুষে সরাসরি মতবিনিময় ও আড্ডার আগ্রহ কমছে। একা থাকা এবং নিজের জগতে ডুবে থাকাকেই অনেকে স্বাচ্ছন্দ্য মনে করছেন। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মোবাইল ফোন কি ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

আমাদের চারপাশে মানুষের ভিড় বাড়ছে, অথচ কমে যাচ্ছে আপন মানুষ। প্রযুক্তি দূরের মানুষকে কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু কাছের মানুষগুলোকে যেন আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একসময় অবসর পেলেই মানুষ পরিবারের সঙ্গে বসত, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, প্রতিবেশীর খোঁজ নিত। এখন অবসর পেলেই অনেকের চোখ চলে যায় মোবাইলের পর্দায়। একই ঘরে বসে থাকা মানুষগুলোর মধ্যেও তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য দূরত্ব। কথা বলার মানুষ আছে, কিন্তু মনের কথা বলার মানুষ যেন কমে যাচ্ছে।

হাজারো পরিচিত মুখের ভিড়েও অনেক মানুষ ভীষণ একা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রতিদিন নিজেদের হাসিমুখের ছবি প্রকাশ করি। অথচ সেই হাসির আড়ালে কতটা শূন্যতা লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময় কেউ জানে না। মানুষ অন্যের জীবনের খবর রাখে, কিন্তু পাশের মানুষটির মন খারাপের খবর রাখে না।

সম্পর্কগুলোও ধীরে ধীরে প্রয়োজননির্ভর হয়ে পড়ছে। যতক্ষণ প্রয়োজন আছে, ততক্ষণ যোগাযোগ থাকে। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সম্পর্কের উষ্ণতাও কমে যায়। অভিমান জমে থাকে, কিন্তু তা ভাঙার মতো মানুষ থাকে না। কষ্ট হয়, কিন্তু কষ্টের কথা শোনার মতো ধৈর্যশীল মানুষ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই নিজের সমস্যার কথা বলতে চান, কিন্তু অন্যকে বিরক্ত করার ভয়ে চুপ করে থাকেন। এই নীরবতা একসময় মানুষকে নিজের ভেতরেই বন্দি করে ফেলে।

ব্যস্ত জীবনের অজুহাতে আমরা প্রিয় মানুষদের সময় দিতে ভুলে যাচ্ছি। বাবা-মায়ের পাশে বসার সময় নেই, বন্ধুর সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময় নেই। প্রিয় মানুষটি কেমন আছে—এই ছোট্ট প্রশ্নটিও অনেক সময় করা হয় না। ফলে সম্পর্কগুলো টিকে থাকে, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মানুষ নিজের একাকিত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছে।

একসময় পরিবারে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প-আড্ডা ও মতবিনিময় হতো। পরিবারের সদস্যরা সারাদিন ব্যস্ত থাকলেও রাতে একসঙ্গে খাবার খেতে বসতেন। খাবারের টেবিলে পরিবার, সমাজ ও চারপাশের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার বড় একটি অংশ সেখান থেকেই অর্জিত হতো। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে চায় না। মোবাইলের রঙিন পর্দার ভেতরেই অনেকে নিজের আলাদা জগৎ তৈরি করে নিয়েছেন।

রাস্তা, ঘাট, চায়ের দোকান, বাস কিংবা ট্রেন—সব জায়গাতেই একই চিত্র। সবাই যেন মোবাইলের পর্দায় নিমগ্ন। কেউ গান শুনছেন, কেউ খবর পড়ছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। পাশে কে বসে আছেন, চারপাশে কী ঘটছে—সেদিকে নজর দেওয়ার সময় যেন কারও নেই।

শিশুরাও এর বাইরে নয়। অনেক শিশু মোবাইল ফোনে গেম খেলে, মোবাইল দেখতে দেখতে খাবার খায়। বড়রাও পারিবারিক, সামাজিক, দাপ্তরিক ও আর্থিক নানা কাজ মোবাইলেই সারেন। এরপর দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটিয়ে দেন। ফলে পরিবারের সদস্যরা একই জায়গায় থেকেও নিজ নিজ পর্দার জগতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।

কর্মক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একসঙ্গে অনেক সহকর্মী বসে থাকলেও প্রত্যেকে নিজের মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। কেউ গান শুনছেন, কেউ খবর পড়ছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ কারও সঙ্গে অনলাইনে কথা বলছেন। কথাবার্তা হলেও অনেক সময় তা সংক্ষিপ্ত ও প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একে অন্যের চোখের দিকে তাকিয়ে আন্তরিকভাবে কথা বলার অভ্যাস কমে যাচ্ছে।

বন্ধুদের আড্ডাতেও একই অবস্থা। দশজন বন্ধু একসঙ্গে বসে আছেন, অথচ সবার মনোযোগ মোবাইলের পর্দায়। কেউ গেম খেলছেন, কেউ ভিডিও দেখছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত। ফলে একসঙ্গে থেকেও তারা যেন প্রত্যেকে আলাদা জগতে অবস্থান করছেন। বাস্তব আড্ডার জায়গা দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল ব্যস্ততা।

মোবাইল ফোন মানুষের যোগাযোগের পরিসর বাড়িয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক বন্ধনে দূরত্ব তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি মানুষের কাজকে দ্রুত ও সহজ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতা যদি মানুষের আবেগ, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সম্পর্ককে দুর্বল করে, তাহলে সেই অগ্রগতি নিয়ে ভাবারও প্রয়োজন আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার প্রবণতা বাড়ছে, অথচ বাস্তব জীবনের সম্পর্কের সেতু দুর্বল হয়ে পড়ছে।

মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক হৃদ্যতা ও মানবিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং এর ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। প্রয়োজনের সময় প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু প্রযুক্তিকে যেন আমাদের জীবনের সম্পর্কগুলোর নিয়ন্ত্রক হতে না দেওয়া হয়।

মোবাইলের পর্দা থেকে চোখ তুলে চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকানো দরকার। প্রিয় মানুষের পাশে বসা দরকার। একটি ফোন, একটু খোঁজ নেওয়া কিংবা কয়েক মিনিটের আন্তরিক কথাও কারও একাকিত্ব অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, মানুষ যতই আধুনিক হোক, ভালোবাসা, সঙ্গ ও আন্তরিকতার প্রয়োজন কখনো কমে না।

জীবনে কতজন মানুষকে আমরা চিনি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো, কতজন মানুষ আমাদের আপন। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে একা। কিন্তু সেই একাকিত্ব যেন প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়িয়ে না দেয়। প্রযুক্তি আমাদের আশীর্বাদ। সেই আশীর্বাদ যেন আমাদের সম্পর্কের জন্য অভিশাপ হয়ে না ওঠে।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা কলেজ, গাজীপুর]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত