লাইটারেজ জাহাজ খাতে বিশৃঙ্খলার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হয়েছে। পণ্য নিয়ে দিনের পর দিন অলস বসে থাকতে হচ্ছে বিদেশি বড় জাহাজগুলোকে (মাদার ভেসেল)।
সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় আমদানিকারকদের প্রতিদিন জাহাজপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তি মাশুল গুনতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমদানির ব্যয় বেড়ে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিন বহির্নোঙরে কয়লা, সিমেন্ট ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ, গম, ডাল, সার, পাথরসহ শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য নিয়ে মাদার ভেসেল নোঙর করে। গভীরতা বেশি হওয়ায় বড় জাহাজগুলো সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। তাই সাগরে ভাসমান অবস্থায় ক্রেন ও গ্র্যাবের মাধ্যমে পণ্য লাইটারেজ জাহাজে খালাস করে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে নেওয়া হয়। বছরে প্রায় ১০ কোটি টন পণ্য ১ হাজার ৮০০টি লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে এভাবে পরিবহন করা হয়।
স্বাভাবিক সময়ে একটি মাদার ভেসেল থেকে ২৪ ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টন পণ্য খালাস করে ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে জাহাজগুলো বিদায় করার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত লাইটারেজ জাহাজ না পাওয়ায় এখন একটি মাদার ভেসেলকে সাগরে ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত বসে থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি প্রায় ৫৫টি মাদার ভেসেল পণ্য নিয়ে বহির্নোঙরে আটকে থাকার খবর পাওয়া গেছে।
লাইটারেজের মাধ্যমে খালাস করা স্ক্র্যাপ দিয়ে লোহা, ক্লিংকার দিয়ে সিমেন্ট এবং গম দিয়ে আটা-ময়দা তৈরি হয়। লাইটারেজ খাতে সংকট দেখা দেওয়ায় অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে এবং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, ‘বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল’ (বিডব্লিউটিসিসি)-এর অকার্যকর সিরিয়াল ব্যবস্থার কারণেই এ সংকট প্রকট হয়েছে। চার শতাধিক লাইটারেজ জাহাজ বিডব্লিউটিসিসির নিয়মনীতি না মেনে নিজস্ব উপায়ে পণ্য পরিবহন করছে। ফলে সংস্থাটি চাহিদামতো জাহাজ দিতে পারছে না। পাঁচটি জাহাজের চাহিদার বিপরীতে দেওয়া হচ্ছে একটি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আমদানিকারক বলেন, ‘হয় লাইটারেজ খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সিন্ডিকেট ভাঙা হোক, না হয় মুক্তবাজার ব্যবস্থার নীতিতে নিয়ন্ত্রণ তুলে নিয়ে আমদানিকারকদের নিজস্ব সুবিধামতো জাহাজ ভাড়ার সুযোগ দেওয়া হোক।’
বিডব্লিউটিসিসির আহ্বায়ক সফিক আহমেদ বিশৃঙ্খলার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘সিরিয়ালের বাইরে বহু লাইটারেজ জাহাজ চলায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। বারবার চেষ্টা করেও নিয়মভাঙা জাহাজগুলোকে আমরা নিয়মের আওতায় আনতে পারছি না। ফলে মাদার ভেসেল অলস পড়ে থাকলেও লাইটারেজ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।’
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেরি হওয়ার কারণে বিদেশি জাহাজকে বিপুল অঙ্কের মাশুল দিতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। চূড়ান্ত বিচারে এই বাড়তি খরচের বোঝা সাধারণ ভোক্তাদেরই টানতে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা।
আপনার মতামত লিখুন