চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কিসমত-জাফরাবাদ আবাসন প্লট প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০১৫ সালের জুলাই মাসে। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী একটি চক্র গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের যোগসাজশে শুরুতে মাটি ভরাট না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
একের পর এক দুর্নীতির কারণে প্রকল্পটি ১১ বছর ধরে ঝুলে আছে। অনেক কর্মজীবী তাদের উপার্জনের সবটুকু গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে দিয়ে এখন পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছেন। তাদের পরিবার চরম হতাশায়। অবশিষ্টরা বেঁচে থাকতে পরিবারকে প্লট দিতে পারবেন কি না—সেই হতাশায় ভেঙে পড়ছেন।
মীরসরাই সদরের ভাড়া বাসায় থাকা ভুক্তভোগী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনজুর কাদের চৌধুরী জানান, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৩ কাঠার একটি প্লট পাওয়ার জন্য ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন কিস্তিতে ২১ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। এর বিনিময়ে রশিদসহ সব কাগজপত্রে সে বছরই প্লট বুঝে পাওয়ার কথা থাকলেও ১১ বছর পরও তিনি প্লট পাননি। বরং সেখানে আস্তে আস্তে তৈরি হয়েছে ভাগাড় ও পরিত্যক্ত জংলা। তিনি বলেন, ‘আমার সব সঞ্চয় ও পেনশনের টাকা দিয়ে এক টুকরো ঘর করার স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন যেন।’
উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি আজিজুল হক নিজামী বলেন, ‘আমাদের অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকার লোন করে নেওয়া প্লটের টাকা আটকে আছে। অগ্রণী ব্যাংক থেকে অবসর নেওয়া জামশেদ আলম (৫৬) গৃহায়ন থেকে প্লট পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার স্ত্রী-সন্তান এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন, কিন্তু গৃহায়ন বিভাগের দয়া হয়নি প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার।’
আজিজুল হক নিজামী আরও বলেন, ‘আমার জানামতে শিক্ষকদের মধ্যে রাশেদা আক্তার, জিনাত আরা, মফিজুর রহমান, কামরুন নাহারসহ অনেক শিক্ষক গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে ধর্ণা দিতে দিতে এখন ক্লান্ত। অসংখ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী সরকারি প্লট পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অনেকে দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছেন, কিন্তু পরিবার সেই শেষ ঠিকানা বুঝে পাচ্ছে না।’
সরেজমিনে দেখা যায়, গৃহায়ন প্লটগুলোর স্থানে অল্প অল্প মাটির ছোট ছোট ডিবি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে জংলা ও ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে। কে, কখন, কোথা থেকে ময়লা এনে ফেলছেন—কেউ জানেন না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাটি ভরাট না করেই পূর্বের আমলের ঠিকাদারকে অগ্রিম টাকা দিয়েছেন। ভুয়া বিল দেখিয়ে ঠিকাদার ও কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। ১১ বছর পার হলেও প্রকল্পটি এখনো মাটি ভরাট হয়নি। এতে প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিসমত-জাফরাবাদ প্রকল্প আটকে থাকার প্রধান কারণ কিছু অনিয়ম ও কৌশলে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা। মাটি ভরাটের জন্য বারবার দরপত্র দিলেও সেই অর্থ যথাযথ ব্যয় না করে ‘নয়ছয়’ করার অভিযোগও রয়েছে। তবে প্রকল্পের নিরীহ প্লট ক্রেতারা এসব জানতে চান না। তাঁরা চান, অন্তত বেঁচে থাকতে পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁইটা যেন শেষ ঠিকানা হয়।
এ বিষয়ে মীরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তারের কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘এই বিষয়ে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র প্রেরণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আমিনুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত মার্চে মাটি ভরাটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে একটি দরপত্র দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আহ্বানকৃত দরপত্রের মূল্যের সঙ্গে বর্তমান বাজারদর সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় কেউ টেন্ডারে অংশ নেয়নি। তবে এই বিষয়ে শিগগিরই নতুনভাবে সময়োপযোগী টেন্ডারের প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন।’
আশা প্রকাশ করে আমিনুর রহমান বলেন, ‘এই বছরের মধ্যেই মাটি ভরাটসহ আগামী বছরের মধ্যে প্লট মালিকদের সব প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হব।’
এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘ওই প্রকল্প সম্পর্কে আমার পূর্বপ্রেক্ষাপট জানা ছিল না। এরপরও সব বিষয় অনুসন্ধান করে প্লট উন্নয়নবিষয়ক সব উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬
চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কিসমত-জাফরাবাদ আবাসন প্লট প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০১৫ সালের জুলাই মাসে। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী একটি চক্র গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের যোগসাজশে শুরুতে মাটি ভরাট না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।
একের পর এক দুর্নীতির কারণে প্রকল্পটি ১১ বছর ধরে ঝুলে আছে। অনেক কর্মজীবী তাদের উপার্জনের সবটুকু গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে দিয়ে এখন পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছেন। তাদের পরিবার চরম হতাশায়। অবশিষ্টরা বেঁচে থাকতে পরিবারকে প্লট দিতে পারবেন কি না—সেই হতাশায় ভেঙে পড়ছেন।
মীরসরাই সদরের ভাড়া বাসায় থাকা ভুক্তভোগী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মনজুর কাদের চৌধুরী জানান, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৩ কাঠার একটি প্লট পাওয়ার জন্য ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন কিস্তিতে ২১ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। এর বিনিময়ে রশিদসহ সব কাগজপত্রে সে বছরই প্লট বুঝে পাওয়ার কথা থাকলেও ১১ বছর পরও তিনি প্লট পাননি। বরং সেখানে আস্তে আস্তে তৈরি হয়েছে ভাগাড় ও পরিত্যক্ত জংলা। তিনি বলেন, ‘আমার সব সঞ্চয় ও পেনশনের টাকা দিয়ে এক টুকরো ঘর করার স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন যেন।’
উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি আজিজুল হক নিজামী বলেন, ‘আমাদের অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকার লোন করে নেওয়া প্লটের টাকা আটকে আছে। অগ্রণী ব্যাংক থেকে অবসর নেওয়া জামশেদ আলম (৫৬) গৃহায়ন থেকে প্লট পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার স্ত্রী-সন্তান এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন, কিন্তু গৃহায়ন বিভাগের দয়া হয়নি প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার।’
আজিজুল হক নিজামী আরও বলেন, ‘আমার জানামতে শিক্ষকদের মধ্যে রাশেদা আক্তার, জিনাত আরা, মফিজুর রহমান, কামরুন নাহারসহ অনেক শিক্ষক গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে ধর্ণা দিতে দিতে এখন ক্লান্ত। অসংখ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী সরকারি প্লট পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অনেকে দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছেন, কিন্তু পরিবার সেই শেষ ঠিকানা বুঝে পাচ্ছে না।’
সরেজমিনে দেখা যায়, গৃহায়ন প্লটগুলোর স্থানে অল্প অল্প মাটির ছোট ছোট ডিবি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে জংলা ও ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে। কে, কখন, কোথা থেকে ময়লা এনে ফেলছেন—কেউ জানেন না।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাটি ভরাট না করেই পূর্বের আমলের ঠিকাদারকে অগ্রিম টাকা দিয়েছেন। ভুয়া বিল দেখিয়ে ঠিকাদার ও কর্তৃপক্ষ কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। ১১ বছর পার হলেও প্রকল্পটি এখনো মাটি ভরাট হয়নি। এতে প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তদের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিসমত-জাফরাবাদ প্রকল্প আটকে থাকার প্রধান কারণ কিছু অনিয়ম ও কৌশলে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা। মাটি ভরাটের জন্য বারবার দরপত্র দিলেও সেই অর্থ যথাযথ ব্যয় না করে ‘নয়ছয়’ করার অভিযোগও রয়েছে। তবে প্রকল্পের নিরীহ প্লট ক্রেতারা এসব জানতে চান না। তাঁরা চান, অন্তত বেঁচে থাকতে পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁইটা যেন শেষ ঠিকানা হয়।
এ বিষয়ে মীরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তারের কাছে জানতে চাইলে বলেন, ‘এই বিষয়ে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র প্রেরণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আমিনুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত মার্চে মাটি ভরাটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে একটি দরপত্র দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আহ্বানকৃত দরপত্রের মূল্যের সঙ্গে বর্তমান বাজারদর সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় কেউ টেন্ডারে অংশ নেয়নি। তবে এই বিষয়ে শিগগিরই নতুনভাবে সময়োপযোগী টেন্ডারের প্রস্তাবনা প্রক্রিয়াধীন।’
আশা প্রকাশ করে আমিনুর রহমান বলেন, ‘এই বছরের মধ্যেই মাটি ভরাটসহ আগামী বছরের মধ্যে প্লট মালিকদের সব প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হব।’
এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘ওই প্রকল্প সম্পর্কে আমার পূর্বপ্রেক্ষাপট জানা ছিল না। এরপরও সব বিষয় অনুসন্ধান করে প্লট উন্নয়নবিষয়ক সব উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন