সংবাদ

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

কালজয়ী প্রতিভা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য


শামসুজ্জামান হীরা
শামসুজ্জামান হীরা
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১৪ এএম

কালজয়ী প্রতিভা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য
কিশোর বয়সে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য

গত ১৫ আগস্ট ২০২৬ ছিল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবার্ষিকী। গত শতকের এক বিস্ময়কর কবিপ্রতিভা ছিলেন সুকান্ত। অকালপ্রয়াত এই কবি অতি অল্প বয়সেই বুঝে ফেলেছিলেন সে সময়ের রাষ্ট্র ও সমাজ-বাস্তবতা। তাই এখনো যে কোনো সঙ্কটে ও বিশেষ পরিস্থিতিতে উচ্চারিত হতে শুনি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা। তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘সংবাদ সাময়িকী’তে লিখেছেন শামসুজ্জামান হীরা

বিশ শতকে পাঠক-মনে যে কবি বিস্ময় জাগিয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন, কবি সুকান্ত— সুকান্ত ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রোত্তর কাব্যধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন এই কিশোর কবি। মাত্র তের-চৌদ্দ বছর বয়সে লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘পূর্বাভাস’-এর কবিতাগুলোর স্বতঃস্ফূর্ততায় মুগ্ধ, কিছুটা বা বিস্মিত হয়েছিলেন সেই সময়ের খ্যাতিমান কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, এমনকি রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে যিনি ছিলেন ভিন্ন শিবিরের, কাব্যরসবেত্তা হিসাবে উন্নততর কবি বুদ্ধদেব বসুও।

১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলের ৪২ মহিম হালদার স্ট্রিটের যে বাড়িটিতে সুকান্তের জন্ম হয়, তা ছিল তাঁর মাতামহ সতীশচন্দ্র ভট্টাচার্যের বাড়ি। নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় স্ত্রী সুনীতি দেবীর দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন সুকান্ত। কবির জন্ম কলকাতায় হলেও তার পূর্বপুরুষের আদিনিবাস ছিল বাংলাদেশের বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামে।

সুকান্তের মানস গঠনে প্রভাব ফেলেছিল শৈশবে তাঁর পারিবারিক পরিবেশ—  কৈশোরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাঁর মা সুনীতি দেবী ছিলেন সংস্কারমুক্ত, উদারমনা। তাঁর জ্যাঠতুতো বোন, নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্যের বড় ভাই কৃষ্ণচন্দ্রের কন্যা রানী প্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক মণীন্দ্রলাল বসুর উপন্যাস ‘রমলা’র নায়কের নামে তাঁর নাম রাখেন সুকান্ত। এই দিদির কাছে শুনেছেন ছড়া; আধো আধো গলায় নিজেও কেটেছেন ছড়া। অল্প বয়সে রানীদির মৃত্যু হয়। একসময় নিবারণ আর কৃষ্ণচন্দ্রের একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যায়। বড় ভাই কৃষ্ণচন্দ্র চলে যান হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। নিবারণ ভট্টাচার্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের এক ভাড়া বাসায় মাথা গোঁজেন।

বড়দা মনমোহনের স্ত্রী সরযূ দেবীর কাছে ছ’বছর বয়সে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় সুকান্তের। অক্ষরজ্ঞানের সাথে সাথে ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি করার কৌশলটা সুকান্তকে শেখান তিনি। সরযূ দেবীর ভাষায়, “সুকান্তের বয়স তখন মাত্র ছ’বছর। খুব কালো আর রোগা ছিল সে। ওদের ভাইয়েরা আর কেউ অত কালো ছিল না। তাই আমি প্রায়ই বাড়ির সকলকে বলতাম, ওর নাম কালাচাঁদ রাখোনি কেন?... আমার নিজেরও তখন খুব গল্পের বই পড়ার শখ ছিল। তা সেসব বই তো সুকান্তকে পড়ে শোনানো চলত না। তাই তার ফরমাসমতো ছোটদের গল্পের বই, ছড়ার বই ওসব আনতে হতো আমাকে। ও তখনো পড়তে শেখেনি ভালোমতো। তাই আমাকে বলত, বৌদি তুমি চেঁচিয়ে পড়, আমি শুনব।  যোগিন্দ্রনাথ সরকারের ‘খুকুমণির ছড়া’ আমি এনেছিলাম ওর জন্য। সেই বই থেকে জোরে জোরে ছড়া পড়তাম আর সুকান্ত সেইসব ছড়া শুনেই মুখস্থ করে নিত। তারপর তা শোনাত বাড়ির সকলকে।” এমনই করে সুকান্ত মানুষ হয়ে উঠলেন এক যৌথ পরিবারে, যেখানে একদিকে ছিল প্রাচীন সংস্কৃত-সাহিত্য ও শাস্ত্রচর্চা, অন্যদিকে অতি স্বাভাবিকভাবে যুগের হাওয়ায় নবযুগের সাড়া। রানীদির মাধ্যমে রবীন্দ্র কাব্যশ্রুতি আর দূরসম্পর্কের কাকা সরোজ ভট্টাচার্য এবং জেঠতুতো দাদা গোপালচন্দ্র ও রাখালচন্দ্রের মাধ্যমে আধুনিকতার নাড়া। বাংলা সাহিত্যে তখন কল্লোল-কালিকলম প্রগতির যুগ। সে এক প্রচণ্ড আধুনিকতা। তার মধ্যে ভাঙনের নেশাটাই বড়। ফলে বাস্তবতার নামে সৃষ্টি হলো এক ধরনের মধ্যবিত্ত ভাববিলাস।


শীর্ণকায় একমাথা ঝাকড়া চুলের এই বালকটির স্বভাব ছিল ব্যতিক্রমী। এলোমেলো অগোছালো ঘরে বসে বসেই অক্ষরজ্ঞান আর বইয়ের পড়ালেখা শেখার সঙ্গে সঙ্গে ছন্দের জ্ঞানও রপ্ত করে নিয়েছিলেন সুকান্ত। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের প্রতি সুকান্তের তেমন আগ্রহ ছিল না। বিভূতিভূষণের অমর সৃষ্টি অপু চরিত্রটি সুকান্তের মনকে করেছিল বিপুলভাবে প্রভাবিত। পরবর্তীকালে তাঁর কোনও এক বন্ধুকে সুকান্ত বলেছিলেন , “ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে সমান আদরে এই বইখানা (বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী) বাংলার ঘরে ঘরে রাখা উচিত।”

সুকান্তের কবি হিসাবে গড়ে ওঠার পাবিবারিক পটভূমি এখানে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো। 

উত্তর কলকাতার প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘কমলা বিদ্যামন্দির’-এ সুকান্তকে ভর্তি করে দেওয়া হলো। এ স্কুলের শিক্ষার্থী থাকাকালে ‘সঞ্চয়’ নামে এক হাতেলেখা পত্রিকা বের করেন সুকান্ত। তাতে স্থান পায় তাঁর লেখা একটি হাসির গল্প। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠকালেই তিনি গদ্য রচনায় হাত দেন। বিনয়কুমার গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘শিখা’ পত্রিকায় সুকান্তের প্রথম গদ্য ছাপা হয়।  

কমলা বিদ্যামন্দিরের পাঠ শেষ করে বেলেঘাটার দেশবন্ধু হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন সুকান্ত। এখানেই কবি অরুণাচল বসুর সঙ্গে সুকান্তের পরিচয় ঘটে এবং দুজনেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হন। তাঁদের মধ্যকার এই বন্ধুত্ব আজীবন অক্ষুণ্ন ছিল। এই স্কুলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় সুকান্ত ও অরুণাচল প্রকাশ করলেন হাতেলেখা  পত্রিকা ‘সপ্তমিকা’। সুকান্তের কবিসত্তা ‘সপ্তমিকা’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বিকশিত হতে থাকে।

বাংলা ছাড়া আর সব বিষয়ে তিনি ছিলেন উদাসীন। বিশেষ করে ইতিহাসে তিনি ছিলেন ভীষণ কাঁচা। আর অঙ্ক তো ছিল তাঁর কাছে যমের মতো! আর সেকারণেই বার বার প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েও তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও সুকান্তের ‘রানার’ ও অন্য একটি কবিতা গৌহাটি ও পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। 

একথা অনস্বীকার্য যে, সুকান্তের লেখক হবার পেছনে কমলা বিদ্যামন্দির ও দেশবন্ধু হাই স্কুলের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।


সাহিত্য যে ইতিহাসের কত বড় উপাদান, তার পরিচয় আমরা পাই মধ্যযুগের বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবৎ কিংবা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল থেকে। চর্যাপদ ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে বাদ দিয়ে আদি ও মধ্যযুগের বাংলার পরিচয় জানা সম্ভব নয়। তেমনি কুড়ির দশকে বিদ্রোহী কবি নজরুলের কাব্য এবং চল্লিশের দশকে সুকান্তের কাব্য ইতিহাসের এক অমূল্য উপাদান।

সেজন্য সুকান্ত কেবলমাত্র একজন কবি নন—  একটি বিশেষ যুগের প্রতিনিধি। অবশ্য কবি হিসাবে সুকান্তকে নিয়ে একসময় খুব বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই বিতর্কের উৎসে ছিলেন কবি বুদ্ধদেব বসু। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “কবি হবার জন্যই জন্মেছিল সুকান্ত, কবি হতে পারার আগেই তার মৃত্যু হলো।” এই আক্ষেপের কারণ, সুকান্ত ‘রাজনৈতিক পদ্য’ নিয়ে শক্তির অপচয় করেছেন। তিনি লিখেছেন, “তার কবিতা পড়ে মোটের ওপর এক কথাই মনে হয় যে, তার কিশোর হৃদয়ের স্বাভাবিক উন্মুখতার সঙ্গে পদে পদে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়েছে এক কঠিন সংকীর্ণ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতবাদ।” বুদ্ধদেব বসুর হয়ত সুকান্তের কিছু কবিতার সঙ্গে পরিচয় ছিল। সুকান্তের জীবনকে তিনি সামগ্রিকভাবে জানতেন না। জানলে হয়ত এমন উক্তি তিনি করতেন না। বস্তুত যে সময়ে যে পরিবেশে তাঁর কিশোর হৃদয়ের উন্মোচন হয়েছিল, তাতে তাঁর ব্যক্তিজীবনে কোনও দাঙ্গা বাধেনি। বরং সেই যুগ, সেই পরিবেশ তাঁর কিশোর হৃদয়কে উন্মোচিত করতে, অনুপ্রাণিত করতে প্রভূত সাহায্য করেছিল। মাছ যেমন জলের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে সুকান্তের তেমনই সেই যুগের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছিলেন। সেজন্য তাঁর কবিতায় আছে সহজ স্বাভাবিক প্রকাশ। বুদ্ধদেব বসু যাকে ‘সংকীর্ণ তথাকথিত  বৈজ্ঞানিক মতবাদ’ বলেছেন, তার নাম মার্কসবাদ। যে মতবাদ আজও পর্যন্ত মানবমুক্তির পরীক্ষিত একমাত্র বৈজ্ঞানিক মতবাদ বলে গণ্য হয়ে থাকে। প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার বৈজ্ঞানিক মতবাদ। এই মতবাদের ওপর ভিত্তি করেই সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে এক শোষণমুক্ত মানবিক সমাজ গড়ার সংগ্রামে লিপ্ত। সুকান্ত এই মতবাদকে শুধু স্বীকারই করেননি, একে আত্মস্থ করে নতুন এক সমাজ নির্মাণের কাজে নিজেকে নিয়োগ করেছিলেন। সুকান্তের কাছে এই বিপ্লবী সত্তাই প্রধান। তাকে উপলব্ধি করতে না পারলে সুকান্তের কাব্যকৃতিকেও সঠিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যথার্থই বলেছিলেন, “সাহিত্য গড়িয়া উঠে যুগধর্মে”। সুকান্তের যুগকে বাদ দিয়ে সুকান্তকে যথার্থ উপলব্ধি করা যায় না। তিনি নিজে জীবনের সূক্ষ্ম বস্তুর মধ্যেও পৃথিবীর ঘটমান বিরাট বিরাট ঘটনার ঘনীভূত প্রতিচ্ছবির আবেগকে অনুভব করেছেন। সুকান্ত আরেক অর্থে নতুন যুগের প্রবর্তক।

ম্যাক্সিম গোর্কিকে সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তার কারণ এই নয় যে, গোর্কি সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যপ্রতিভা ছিলেন। তাঁকে এই আখ্যা দেওয়ার কারণ পূর্ববর্তীদের মতো সমাজের দুঃখ-দুর্দশা দেখে করুণাআপ্লুত হয়ে তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করেননি। তিনি তা করেছিলেন সচেতনভাবে, শোষক শোষিতের সত্যিকার চরিত্র ও পারস্পরিক সম্পর্ককে নিজের সাহিত্যের মধ্যে রূপদান করে। শ্রেণিসংগ্রামের বাস্তব চিত্রকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরে তিনি তাদের সেই সংগ্রামকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করেছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রে গোর্কি যে কাজ সম্পন্ন করেছিলেন, সুকান্ত বাংলা কবিতার ক্ষুদ্রতর পরিধির মধ্যে সেই কাজই সম্পন্ন করেছিলেন।


আধুনিক কবিতার সুদীর্ঘ পরিক্রমায় আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করবার একটা প্রবণতা। সুকান্তের কাব্যভাষা রবীন্দ্র ঐতিহ্যের অনুসারী। সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য জনতার কবি হতে গিয়ে মানবপ্রেমিক ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী রবীন্দ্রসত্তাকে ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকার করে নিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে গিয়েছেন। সেই ইতিহাস কবিতা দিয়েই কবিতাকে অতিক্রমের ইতিহাস:

                  হে মহামানব, আর এ কাব্য নয়

                  এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,

                  পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক

                  গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো।

                  প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—

                  কবিতা তোমায় দিলাম আজিকে ছুটি,

                  ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:

                  পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি।

‘সুকান্ত সমগ্র’ বইয়ের ভূমিকায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “সুকান্তের যখন বালক বয়স তখন থেকেই তার কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয়।

আমি তখন স্কটিশ চার্চ কলেজে বি-এ পড়ছি। ‘পদাতিক’ বেরিয়ে তখন পুরানো হয়ে গেছে। রাজনীতিতে আপাদমস্তক ডুবে আছি। ক্লাস পালিয়ে বিডন স্ট্রিটের চায়ের দোকানে আমাদের আড্ডা। কলেজের বন্ধু মনোজ একদিন জোর করে আমার হাতে একটা কবিতার খাতা গছিয়ে দিল। পড়ে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি কবিতাগুলো সত্যিই তার চৌদ্দ বছর বয়সের খুড়তুতো ভাইয়ের লেখা। শুধু আমি কেন আমার অন্যান্য বন্ধুরা, এমনকি বুদ্ধদেব বসুও কবিতার সেই খাতা পড়ে অবাক না হয়ে পারেননি।

আমার সন্দেহ ভঞ্জন করবার জন্যই বোধ হয় মনোজ একদিন কিশোর সুকান্তকে সেই চায়ের দোকানে এনে হাজির করেছিলেন। সুকান্তের চোখের দিকে তাকিয়ে তার কবিত্ব শক্তি সম্বন্ধে সেদিন কেন আমি নিঃসংশয় হয়েছিলাম, সে বিষয়ে কেউ যদি আমাকে জেরা করে, আমি সদুত্তর দিতে পারব না।

সে সব কবিতা পরে ‘পূর্বাভাস’-এ ছাপা হয়েছে। তাতে কি এমন ছিল যে, পড়ে সেদিন আমরা একেবারে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম? আজকের পাঠকেরা আমাদের সেদিনকার বিস্ময়ের কারণটা ধরতে পারবেন না। কারণ, বাংলা কবিতার ধারা তারপর অনেকখানি ব’য়ে এসেছে। কোনো কিশোরের পক্ষে ঐ বয়সে ছন্দে অমন আশ্চর্য দখল, শব্দের অমন লাগসই ব্যবহার সেদিন ছিল অভাবিত।”


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন সুকান্তের বয়স মাত্র তের। এত কম বয়সে রাজনীতির পক্ষ বিপক্ষ নির্ণয়ের বিচারবুদ্ধি না জন্মালেও পরবর্তী দুবছরের মাথায় সুকান্তের চিন্তা অনেক পক্বতা প্রাপ্ত হয়। তিনি আকৃষ্ট হন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি। ১৯৪২ সালে দশম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র ফেডারেশন’-এ। ১৯৪৩-এর (বাংলা সন ১৩৫০ অনুযায়ী পঞ্চাশের মন্বন্তর হিসাবেই সুবিদিত) ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় বঙ্গীয় ছাত্র ফেডারেশন একদিকে যেমন নিরন্ন জনতার পাশে সাধ্যানুসারে অবস্থান নেয়, অপর দিকে পূর্ব সীমান্তে ফ্যাসিস্ত জাপানি আক্রমণ ঠেকাতে তৎপরতা চালায়। ছাত্রনেতা অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয় ‘কিশোর বাহিনী’। ওই কিশোর বাহিনীর মূলমন্ত্র ছিল ‘শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সেবা-স্বাধীনতা। এই বাহিনী কলকাতা ছাড়িয়ে সারা পূর্ব বাংলার জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। সুকান্তের সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ১৯৪৩ সালে কিশোর বাহিনীর কর্মসচিব হিসাবে সুকান্তকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক মুখপাত্র ‘স্বাধীনতা’ নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। সেখানে ‘কিশোর সভা’ নামে একটি বিভাগ খোলা হয়। কিশোর সভার সম্পাদকের দায়িত্বে থাকেন প্রথমে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কিন্তু পরে এর পরিচালনার ভার সুকান্তের ওপর এসে পড়ে। কিশোর বাহিনীর জনপ্রিয়তার সুবাদেই সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের কাছে যথেষ্ট পরিচিত হয়ে ওঠেন। বেলেঘাটায় পার্টি অফিসে নিয়মিত যাতায়াতের কারণেও সেটা ঘটে। ১৯৪৩ সালে ঘটে সুকান্তের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। মাত্র আঠার বছর বয়সে তিনি কনিষ্ঠতম ব্যক্তি হিসাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ’র পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘আকাল’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। কাব্যগ্রন্থটিতে সুকান্তসহ সেই সময়কার খ্যাতিমান  ১৮জন কবির ১৮টি কবিতা স্থান পায়।

আমরা জানি, সুকান্তের কৃতির যুগে শোষিত সর্বহারা শ্রেণির ক্রমবর্ধমান বিপ্লব ও বিক্ষোভকে স্তব্ধ করার জন্য ইউরোপে পুঁজিবাদ ফ্যাসিবাদে রূপ নেয়। হিটলার মুসোলিনির সঙ্গে হাত মিলিয়ে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। এর প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলে ফ্যাসিবাদবিরোধী বিপ্লবী চেতনা দুর্বার হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান-ইতালীয়-জাপানি ফ্যাসিবাদের পতন ও যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ের ফলশ্রুতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজতন্ত্রের—  কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি তরুণ সমাজের আকর্ষণ ব্যাপকতা লাভ করে। সুকান্তের কবিতায় সেই সমাজচেতনাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি লিখলেন:

                  যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে

                  তার মুখে খবর পেলুম:

                  সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,

                  ... ... ...

                  আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে 

                  করে যাব আশীর্বাদ,

                  তারপর হব ইতিহাস॥

তিরিশ এবং চল্লিশের দশকে বাংলা সাহিত্যে রুশ বিপ্লবের বিপুল প্রভাব পড়ে। এই সময়েই আমরা দেখা পাই সমাজবিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ একঝাঁক কবি ও লেখকের। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিদ্র্রোহী কবি নজরুল, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কবি বিষ্ণু দে, কবি সমর সেন, কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ। উল্লিখিত কবিদের মধ্যে বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সমর সেন সাম্যবাদি ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হলেও তাঁদের কবিতা সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল না। আর সে কারণেই গণমানুষের কবি হিসাবে সুকান্ত অনন্য। তাঁর প্রাঞ্জল, সহজবোধ্য ভাষায় রচিত কবিতা আজও উজ্জীবিত করে মেহনতি মানুষের সংগ্রামকে। তাঁর সৃষ্টি আজও তাই শোষণহীন সমাজ নির্মাণে প্রাসঙ্গিক। 

সঙ্গীতের প্রতি সুকান্তের ছিল গভীর অনুরাগ। পঙ্কজ কুমার মল্লিকের ভরাট কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। হেমন্তের গান পছন্দের ছিল না তাঁর। অথচ পরবর্তীকালে এই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘রানার’ গানটি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিল। 

সুকান্তের জীবদ্দশাতেই তাঁর কবিতা ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। আন্তর্জাতিক যুব সঙ্ঘের মুখপত্রে তাঁর অনেক কবিতার অনুবাদ বেরোয়। ১৯৫১ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ায় ‘প্রবুজেনি’ (চৎড়নুঁবহর) নামে চেক ভাষায় বাংলা প্রগতিশীল কবিদের একটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। চেক প্রোবুজেনি শব্দের অর্থ জাগরণ বা বোধন। সুকান্তের বোধন কবিতার নামানুসারে গ্রন্থটির নামকরণ হয়। ১৯৫৩ সালে ‘ক্ষুধা ও বিদ্রোহের গান’ নামে সুকান্তের নিজস্ব কবিতার চেক ভাষায় একটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

“অসুখে পড়বার অল্প কিছুদিন আগে একদিন ওয়েলিংটন স্কয়ারের এক মিটিঙে যাবার পথে আমার এক সংশয়ের জবাবে সুকান্ত বলেছিল: আমার কবিতা পড়ে পার্টির কর্মীরা যদি খুশি হয় তাহলেই আমি খুশি—  কেননা এই দলবলই তো একদিন বাড়তে বাড়তে এ দেশের অধিকাংশ হবে।” অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্যের প্রশ্নের জবাব এভাবে দিয়েছিলেন সুকান্ত। কী দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তাঁর বিপ্লবেব সাফল্যের ওপর! তাই তিনি উচ্চারণ করেন:

                  লেনিন ভেঙেছে বিশ্বে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,

                  অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন জানায় প্রতিবাদ।

                  লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,

                  বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন॥

কিশোর সুকান্ত দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান লিখতেন, মিছিলে স্লোগান দিতেন। সেই স্লোগানগুলোর বেশিরভাগ অব্যর্থ বলেই কবিতা, অথবা কবিতা বলেই অব্যর্থ:

                  রক্তে আনো লাল

                  রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।


কমিউনিস্ট পার্টির কাজে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম, অনিয়ম ও শরীরের প্রতি অবহেলার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন সুকান্ত। ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রথমে তাঁকে পার্টির ‘রেড এন্ড কিওর হোম’-এ ভর্তি করা হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। কিন্তু দুরারোগ্য ক্ষয়রোগ ধরা পড়ায় ১৯৪৭ সালের ২ এপ্রিল তাঁকে ‘যাদবপুর যক্ষা হাসপাতালে’ ভর্তি করা হয়। ৪১ দিন যক্ষার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৩ মে সকালের কোনও একসময়ে মাত্র একুশ বছর বয়সে নিভে যায় বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এক প্রতিভার প্রাণপ্রদীপ।

মাত্র ২১ বছর বয়সের এক কবির রচনাসম্ভার দেখে অবাক না-হয়ে পারা যায় না। কবিতা ছাড়াও তিনি রচনা করেছেন গল্প, নাটক, গান ও প্রবন্ধ। তার রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, মিঠেকড়া, অভিযান, ঘুম নেই, হরতাল ও গীতিগুচ্ছ।

বাংলা কবিতার ইতিহাসে সুকান্তের স্থান শ্রমিশ্রেণির প্রথম সার্থক কবি হিসাবে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

এ-বছর পালিত হচ্ছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবার্ষিকী। জন্মশতবর্ষে মহান এই কবির প্রতি নিবেদন করি অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।    


ঋণস্বীকার:

১. ড. সরোজমোহন মিত্র

২. ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ

৩. ঈশান সামী

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬


কালজয়ী প্রতিভা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য

প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

গত ১৫ আগস্ট ২০২৬ ছিল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবার্ষিকী। গত শতকের এক বিস্ময়কর কবিপ্রতিভা ছিলেন সুকান্ত। অকালপ্রয়াত এই কবি অতি অল্প বয়সেই বুঝে ফেলেছিলেন সে সময়ের রাষ্ট্র ও সমাজ-বাস্তবতা। তাই এখনো যে কোনো সঙ্কটে ও বিশেষ পরিস্থিতিতে উচ্চারিত হতে শুনি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা। তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘সংবাদ সাময়িকী’তে লিখেছেন শামসুজ্জামান হীরা

বিশ শতকে পাঠক-মনে যে কবি বিস্ময় জাগিয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন, কবি সুকান্ত— সুকান্ত ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রোত্তর কাব্যধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন এই কিশোর কবি। মাত্র তের-চৌদ্দ বছর বয়সে লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘পূর্বাভাস’-এর কবিতাগুলোর স্বতঃস্ফূর্ততায় মুগ্ধ, কিছুটা বা বিস্মিত হয়েছিলেন সেই সময়ের খ্যাতিমান কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, এমনকি রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে যিনি ছিলেন ভিন্ন শিবিরের, কাব্যরসবেত্তা হিসাবে উন্নততর কবি বুদ্ধদেব বসুও।

১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলের ৪২ মহিম হালদার স্ট্রিটের যে বাড়িটিতে সুকান্তের জন্ম হয়, তা ছিল তাঁর মাতামহ সতীশচন্দ্র ভট্টাচার্যের বাড়ি। নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় স্ত্রী সুনীতি দেবীর দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন সুকান্ত। কবির জন্ম কলকাতায় হলেও তার পূর্বপুরুষের আদিনিবাস ছিল বাংলাদেশের বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামে।

সুকান্তের মানস গঠনে প্রভাব ফেলেছিল শৈশবে তাঁর পারিবারিক পরিবেশ—  কৈশোরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাঁর মা সুনীতি দেবী ছিলেন সংস্কারমুক্ত, উদারমনা। তাঁর জ্যাঠতুতো বোন, নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্যের বড় ভাই কৃষ্ণচন্দ্রের কন্যা রানী প্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক মণীন্দ্রলাল বসুর উপন্যাস ‘রমলা’র নায়কের নামে তাঁর নাম রাখেন সুকান্ত। এই দিদির কাছে শুনেছেন ছড়া; আধো আধো গলায় নিজেও কেটেছেন ছড়া। অল্প বয়সে রানীদির মৃত্যু হয়। একসময় নিবারণ আর কৃষ্ণচন্দ্রের একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যায়। বড় ভাই কৃষ্ণচন্দ্র চলে যান হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। নিবারণ ভট্টাচার্য কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের এক ভাড়া বাসায় মাথা গোঁজেন।

বড়দা মনমোহনের স্ত্রী সরযূ দেবীর কাছে ছ’বছর বয়সে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি হয় সুকান্তের। অক্ষরজ্ঞানের সাথে সাথে ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি করার কৌশলটা সুকান্তকে শেখান তিনি। সরযূ দেবীর ভাষায়, “সুকান্তের বয়স তখন মাত্র ছ’বছর। খুব কালো আর রোগা ছিল সে। ওদের ভাইয়েরা আর কেউ অত কালো ছিল না। তাই আমি প্রায়ই বাড়ির সকলকে বলতাম, ওর নাম কালাচাঁদ রাখোনি কেন?... আমার নিজেরও তখন খুব গল্পের বই পড়ার শখ ছিল। তা সেসব বই তো সুকান্তকে পড়ে শোনানো চলত না। তাই তার ফরমাসমতো ছোটদের গল্পের বই, ছড়ার বই ওসব আনতে হতো আমাকে। ও তখনো পড়তে শেখেনি ভালোমতো। তাই আমাকে বলত, বৌদি তুমি চেঁচিয়ে পড়, আমি শুনব।  যোগিন্দ্রনাথ সরকারের ‘খুকুমণির ছড়া’ আমি এনেছিলাম ওর জন্য। সেই বই থেকে জোরে জোরে ছড়া পড়তাম আর সুকান্ত সেইসব ছড়া শুনেই মুখস্থ করে নিত। তারপর তা শোনাত বাড়ির সকলকে।” এমনই করে সুকান্ত মানুষ হয়ে উঠলেন এক যৌথ পরিবারে, যেখানে একদিকে ছিল প্রাচীন সংস্কৃত-সাহিত্য ও শাস্ত্রচর্চা, অন্যদিকে অতি স্বাভাবিকভাবে যুগের হাওয়ায় নবযুগের সাড়া। রানীদির মাধ্যমে রবীন্দ্র কাব্যশ্রুতি আর দূরসম্পর্কের কাকা সরোজ ভট্টাচার্য এবং জেঠতুতো দাদা গোপালচন্দ্র ও রাখালচন্দ্রের মাধ্যমে আধুনিকতার নাড়া। বাংলা সাহিত্যে তখন কল্লোল-কালিকলম প্রগতির যুগ। সে এক প্রচণ্ড আধুনিকতা। তার মধ্যে ভাঙনের নেশাটাই বড়। ফলে বাস্তবতার নামে সৃষ্টি হলো এক ধরনের মধ্যবিত্ত ভাববিলাস।


শীর্ণকায় একমাথা ঝাকড়া চুলের এই বালকটির স্বভাব ছিল ব্যতিক্রমী। এলোমেলো অগোছালো ঘরে বসে বসেই অক্ষরজ্ঞান আর বইয়ের পড়ালেখা শেখার সঙ্গে সঙ্গে ছন্দের জ্ঞানও রপ্ত করে নিয়েছিলেন সুকান্ত। স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের প্রতি সুকান্তের তেমন আগ্রহ ছিল না। বিভূতিভূষণের অমর সৃষ্টি অপু চরিত্রটি সুকান্তের মনকে করেছিল বিপুলভাবে প্রভাবিত। পরবর্তীকালে তাঁর কোনও এক বন্ধুকে সুকান্ত বলেছিলেন , “ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে সমান আদরে এই বইখানা (বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী) বাংলার ঘরে ঘরে রাখা উচিত।”

সুকান্তের কবি হিসাবে গড়ে ওঠার পাবিবারিক পটভূমি এখানে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো। 

উত্তর কলকাতার প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘কমলা বিদ্যামন্দির’-এ সুকান্তকে ভর্তি করে দেওয়া হলো। এ স্কুলের শিক্ষার্থী থাকাকালে ‘সঞ্চয়’ নামে এক হাতেলেখা পত্রিকা বের করেন সুকান্ত। তাতে স্থান পায় তাঁর লেখা একটি হাসির গল্প। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠকালেই তিনি গদ্য রচনায় হাত দেন। বিনয়কুমার গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘শিখা’ পত্রিকায় সুকান্তের প্রথম গদ্য ছাপা হয়।  

কমলা বিদ্যামন্দিরের পাঠ শেষ করে বেলেঘাটার দেশবন্ধু হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হলেন সুকান্ত। এখানেই কবি অরুণাচল বসুর সঙ্গে সুকান্তের পরিচয় ঘটে এবং দুজনেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হন। তাঁদের মধ্যকার এই বন্ধুত্ব আজীবন অক্ষুণ্ন ছিল। এই স্কুলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় সুকান্ত ও অরুণাচল প্রকাশ করলেন হাতেলেখা  পত্রিকা ‘সপ্তমিকা’। সুকান্তের কবিসত্তা ‘সপ্তমিকা’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বিকশিত হতে থাকে।

বাংলা ছাড়া আর সব বিষয়ে তিনি ছিলেন উদাসীন। বিশেষ করে ইতিহাসে তিনি ছিলেন ভীষণ কাঁচা। আর অঙ্ক তো ছিল তাঁর কাছে যমের মতো! আর সেকারণেই বার বার প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েও তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেও সুকান্তের ‘রানার’ ও অন্য একটি কবিতা গৌহাটি ও পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। 

একথা অনস্বীকার্য যে, সুকান্তের লেখক হবার পেছনে কমলা বিদ্যামন্দির ও দেশবন্ধু হাই স্কুলের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।


সাহিত্য যে ইতিহাসের কত বড় উপাদান, তার পরিচয় আমরা পাই মধ্যযুগের বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবৎ কিংবা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল থেকে। চর্যাপদ ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে বাদ দিয়ে আদি ও মধ্যযুগের বাংলার পরিচয় জানা সম্ভব নয়। তেমনি কুড়ির দশকে বিদ্রোহী কবি নজরুলের কাব্য এবং চল্লিশের দশকে সুকান্তের কাব্য ইতিহাসের এক অমূল্য উপাদান।

সেজন্য সুকান্ত কেবলমাত্র একজন কবি নন—  একটি বিশেষ যুগের প্রতিনিধি। অবশ্য কবি হিসাবে সুকান্তকে নিয়ে একসময় খুব বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই বিতর্কের উৎসে ছিলেন কবি বুদ্ধদেব বসু। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “কবি হবার জন্যই জন্মেছিল সুকান্ত, কবি হতে পারার আগেই তার মৃত্যু হলো।” এই আক্ষেপের কারণ, সুকান্ত ‘রাজনৈতিক পদ্য’ নিয়ে শক্তির অপচয় করেছেন। তিনি লিখেছেন, “তার কবিতা পড়ে মোটের ওপর এক কথাই মনে হয় যে, তার কিশোর হৃদয়ের স্বাভাবিক উন্মুখতার সঙ্গে পদে পদে দাঙ্গা বাধিয়ে দিয়েছে এক কঠিন সংকীর্ণ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক মতবাদ।” বুদ্ধদেব বসুর হয়ত সুকান্তের কিছু কবিতার সঙ্গে পরিচয় ছিল। সুকান্তের জীবনকে তিনি সামগ্রিকভাবে জানতেন না। জানলে হয়ত এমন উক্তি তিনি করতেন না। বস্তুত যে সময়ে যে পরিবেশে তাঁর কিশোর হৃদয়ের উন্মোচন হয়েছিল, তাতে তাঁর ব্যক্তিজীবনে কোনও দাঙ্গা বাধেনি। বরং সেই যুগ, সেই পরিবেশ তাঁর কিশোর হৃদয়কে উন্মোচিত করতে, অনুপ্রাণিত করতে প্রভূত সাহায্য করেছিল। মাছ যেমন জলের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে সুকান্তের তেমনই সেই যুগের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছিলেন। সেজন্য তাঁর কবিতায় আছে সহজ স্বাভাবিক প্রকাশ। বুদ্ধদেব বসু যাকে ‘সংকীর্ণ তথাকথিত  বৈজ্ঞানিক মতবাদ’ বলেছেন, তার নাম মার্কসবাদ। যে মতবাদ আজও পর্যন্ত মানবমুক্তির পরীক্ষিত একমাত্র বৈজ্ঞানিক মতবাদ বলে গণ্য হয়ে থাকে। প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার বৈজ্ঞানিক মতবাদ। এই মতবাদের ওপর ভিত্তি করেই সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ বিদ্যমান সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে এক শোষণমুক্ত মানবিক সমাজ গড়ার সংগ্রামে লিপ্ত। সুকান্ত এই মতবাদকে শুধু স্বীকারই করেননি, একে আত্মস্থ করে নতুন এক সমাজ নির্মাণের কাজে নিজেকে নিয়োগ করেছিলেন। সুকান্তের কাছে এই বিপ্লবী সত্তাই প্রধান। তাকে উপলব্ধি করতে না পারলে সুকান্তের কাব্যকৃতিকেও সঠিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যথার্থই বলেছিলেন, “সাহিত্য গড়িয়া উঠে যুগধর্মে”। সুকান্তের যুগকে বাদ দিয়ে সুকান্তকে যথার্থ উপলব্ধি করা যায় না। তিনি নিজে জীবনের সূক্ষ্ম বস্তুর মধ্যেও পৃথিবীর ঘটমান বিরাট বিরাট ঘটনার ঘনীভূত প্রতিচ্ছবির আবেগকে অনুভব করেছেন। সুকান্ত আরেক অর্থে নতুন যুগের প্রবর্তক।

ম্যাক্সিম গোর্কিকে সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তার কারণ এই নয় যে, গোর্কি সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যপ্রতিভা ছিলেন। তাঁকে এই আখ্যা দেওয়ার কারণ পূর্ববর্তীদের মতো সমাজের দুঃখ-দুর্দশা দেখে করুণাআপ্লুত হয়ে তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করেননি। তিনি তা করেছিলেন সচেতনভাবে, শোষক শোষিতের সত্যিকার চরিত্র ও পারস্পরিক সম্পর্ককে নিজের সাহিত্যের মধ্যে রূপদান করে। শ্রেণিসংগ্রামের বাস্তব চিত্রকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরে তিনি তাদের সেই সংগ্রামকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করেছিলেন। বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রে গোর্কি যে কাজ সম্পন্ন করেছিলেন, সুকান্ত বাংলা কবিতার ক্ষুদ্রতর পরিধির মধ্যে সেই কাজই সম্পন্ন করেছিলেন।


আধুনিক কবিতার সুদীর্ঘ পরিক্রমায় আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করবার একটা প্রবণতা। সুকান্তের কাব্যভাষা রবীন্দ্র ঐতিহ্যের অনুসারী। সাম্যবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য জনতার কবি হতে গিয়ে মানবপ্রেমিক ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী রবীন্দ্রসত্তাকে ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকার করে নিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে গিয়েছেন। সেই ইতিহাস কবিতা দিয়েই কবিতাকে অতিক্রমের ইতিহাস:

                  হে মহামানব, আর এ কাব্য নয়

                  এবার কঠিন কঠোর গদ্যে আনো,

                  পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক

                  গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো।

                  প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা—

                  কবিতা তোমায় দিলাম আজিকে ছুটি,

                  ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:

                  পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি।

‘সুকান্ত সমগ্র’ বইয়ের ভূমিকায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “সুকান্তের যখন বালক বয়স তখন থেকেই তার কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয়।

আমি তখন স্কটিশ চার্চ কলেজে বি-এ পড়ছি। ‘পদাতিক’ বেরিয়ে তখন পুরানো হয়ে গেছে। রাজনীতিতে আপাদমস্তক ডুবে আছি। ক্লাস পালিয়ে বিডন স্ট্রিটের চায়ের দোকানে আমাদের আড্ডা। কলেজের বন্ধু মনোজ একদিন জোর করে আমার হাতে একটা কবিতার খাতা গছিয়ে দিল। পড়ে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি কবিতাগুলো সত্যিই তার চৌদ্দ বছর বয়সের খুড়তুতো ভাইয়ের লেখা। শুধু আমি কেন আমার অন্যান্য বন্ধুরা, এমনকি বুদ্ধদেব বসুও কবিতার সেই খাতা পড়ে অবাক না হয়ে পারেননি।

আমার সন্দেহ ভঞ্জন করবার জন্যই বোধ হয় মনোজ একদিন কিশোর সুকান্তকে সেই চায়ের দোকানে এনে হাজির করেছিলেন। সুকান্তের চোখের দিকে তাকিয়ে তার কবিত্ব শক্তি সম্বন্ধে সেদিন কেন আমি নিঃসংশয় হয়েছিলাম, সে বিষয়ে কেউ যদি আমাকে জেরা করে, আমি সদুত্তর দিতে পারব না।

সে সব কবিতা পরে ‘পূর্বাভাস’-এ ছাপা হয়েছে। তাতে কি এমন ছিল যে, পড়ে সেদিন আমরা একেবারে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম? আজকের পাঠকেরা আমাদের সেদিনকার বিস্ময়ের কারণটা ধরতে পারবেন না। কারণ, বাংলা কবিতার ধারা তারপর অনেকখানি ব’য়ে এসেছে। কোনো কিশোরের পক্ষে ঐ বয়সে ছন্দে অমন আশ্চর্য দখল, শব্দের অমন লাগসই ব্যবহার সেদিন ছিল অভাবিত।”


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন সুকান্তের বয়স মাত্র তের। এত কম বয়সে রাজনীতির পক্ষ বিপক্ষ নির্ণয়ের বিচারবুদ্ধি না জন্মালেও পরবর্তী দুবছরের মাথায় সুকান্তের চিন্তা অনেক পক্বতা প্রাপ্ত হয়। তিনি আকৃষ্ট হন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি। ১৯৪২ সালে দশম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র ফেডারেশন’-এ। ১৯৪৩-এর (বাংলা সন ১৩৫০ অনুযায়ী পঞ্চাশের মন্বন্তর হিসাবেই সুবিদিত) ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় বঙ্গীয় ছাত্র ফেডারেশন একদিকে যেমন নিরন্ন জনতার পাশে সাধ্যানুসারে অবস্থান নেয়, অপর দিকে পূর্ব সীমান্তে ফ্যাসিস্ত জাপানি আক্রমণ ঠেকাতে তৎপরতা চালায়। ছাত্রনেতা অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয় ‘কিশোর বাহিনী’। ওই কিশোর বাহিনীর মূলমন্ত্র ছিল ‘শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সেবা-স্বাধীনতা। এই বাহিনী কলকাতা ছাড়িয়ে সারা পূর্ব বাংলার জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। সুকান্তের সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ১৯৪৩ সালে কিশোর বাহিনীর কর্মসচিব হিসাবে সুকান্তকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখন কমিউনিস্ট পার্টির দৈনিক মুখপাত্র ‘স্বাধীনতা’ নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। সেখানে ‘কিশোর সভা’ নামে একটি বিভাগ খোলা হয়। কিশোর সভার সম্পাদকের দায়িত্বে থাকেন প্রথমে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কিন্তু পরে এর পরিচালনার ভার সুকান্তের ওপর এসে পড়ে। কিশোর বাহিনীর জনপ্রিয়তার সুবাদেই সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের কাছে যথেষ্ট পরিচিত হয়ে ওঠেন। বেলেঘাটায় পার্টি অফিসে নিয়মিত যাতায়াতের কারণেও সেটা ঘটে। ১৯৪৩ সালে ঘটে সুকান্তের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। মাত্র আঠার বছর বয়সে তিনি কনিষ্ঠতম ব্যক্তি হিসাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ’র পক্ষ থেকে প্রকাশিত ‘আকাল’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। কাব্যগ্রন্থটিতে সুকান্তসহ সেই সময়কার খ্যাতিমান  ১৮জন কবির ১৮টি কবিতা স্থান পায়।

আমরা জানি, সুকান্তের কৃতির যুগে শোষিত সর্বহারা শ্রেণির ক্রমবর্ধমান বিপ্লব ও বিক্ষোভকে স্তব্ধ করার জন্য ইউরোপে পুঁজিবাদ ফ্যাসিবাদে রূপ নেয়। হিটলার মুসোলিনির সঙ্গে হাত মিলিয়ে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। এর প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলে ফ্যাসিবাদবিরোধী বিপ্লবী চেতনা দুর্বার হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান-ইতালীয়-জাপানি ফ্যাসিবাদের পতন ও যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ের ফলশ্রুতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে সমাজতন্ত্রের—  কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রতি তরুণ সমাজের আকর্ষণ ব্যাপকতা লাভ করে। সুকান্তের কবিতায় সেই সমাজচেতনাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি লিখলেন:

                  যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে

                  তার মুখে খবর পেলুম:

                  সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,

                  ... ... ...

                  আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে 

                  করে যাব আশীর্বাদ,

                  তারপর হব ইতিহাস॥

তিরিশ এবং চল্লিশের দশকে বাংলা সাহিত্যে রুশ বিপ্লবের বিপুল প্রভাব পড়ে। এই সময়েই আমরা দেখা পাই সমাজবিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ একঝাঁক কবি ও লেখকের। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিদ্র্রোহী কবি নজরুল, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কবি বিষ্ণু দে, কবি সমর সেন, কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ। উল্লিখিত কবিদের মধ্যে বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সমর সেন সাম্যবাদি ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হলেও তাঁদের কবিতা সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিল না। আর সে কারণেই গণমানুষের কবি হিসাবে সুকান্ত অনন্য। তাঁর প্রাঞ্জল, সহজবোধ্য ভাষায় রচিত কবিতা আজও উজ্জীবিত করে মেহনতি মানুষের সংগ্রামকে। তাঁর সৃষ্টি আজও তাই শোষণহীন সমাজ নির্মাণে প্রাসঙ্গিক। 

সঙ্গীতের প্রতি সুকান্তের ছিল গভীর অনুরাগ। পঙ্কজ কুমার মল্লিকের ভরাট কণ্ঠে গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। হেমন্তের গান পছন্দের ছিল না তাঁর। অথচ পরবর্তীকালে এই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘রানার’ গানটি তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিল। 

সুকান্তের জীবদ্দশাতেই তাঁর কবিতা ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। আন্তর্জাতিক যুব সঙ্ঘের মুখপত্রে তাঁর অনেক কবিতার অনুবাদ বেরোয়। ১৯৫১ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ায় ‘প্রবুজেনি’ (চৎড়নুঁবহর) নামে চেক ভাষায় বাংলা প্রগতিশীল কবিদের একটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। চেক প্রোবুজেনি শব্দের অর্থ জাগরণ বা বোধন। সুকান্তের বোধন কবিতার নামানুসারে গ্রন্থটির নামকরণ হয়। ১৯৫৩ সালে ‘ক্ষুধা ও বিদ্রোহের গান’ নামে সুকান্তের নিজস্ব কবিতার চেক ভাষায় একটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়।

“অসুখে পড়বার অল্প কিছুদিন আগে একদিন ওয়েলিংটন স্কয়ারের এক মিটিঙে যাবার পথে আমার এক সংশয়ের জবাবে সুকান্ত বলেছিল: আমার কবিতা পড়ে পার্টির কর্মীরা যদি খুশি হয় তাহলেই আমি খুশি—  কেননা এই দলবলই তো একদিন বাড়তে বাড়তে এ দেশের অধিকাংশ হবে।” অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্যের প্রশ্নের জবাব এভাবে দিয়েছিলেন সুকান্ত। কী দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তাঁর বিপ্লবেব সাফল্যের ওপর! তাই তিনি উচ্চারণ করেন:

                  লেনিন ভেঙেছে বিশ্বে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,

                  অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন জানায় প্রতিবাদ।

                  লেনিন ভূমিষ্ঠ রক্তে, ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ,

                  বিপ্লব স্পন্দিত বুকে, মনে হয় আমিই লেনিন॥

কিশোর সুকান্ত দেয়ালে দেয়ালে স্লোগান লিখতেন, মিছিলে স্লোগান দিতেন। সেই স্লোগানগুলোর বেশিরভাগ অব্যর্থ বলেই কবিতা, অথবা কবিতা বলেই অব্যর্থ:

                  রক্তে আনো লাল

                  রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।


কমিউনিস্ট পার্টির কাজে মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম, অনিয়ম ও শরীরের প্রতি অবহেলার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন সুকান্ত। ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রথমে তাঁকে পার্টির ‘রেড এন্ড কিওর হোম’-এ ভর্তি করা হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। কিন্তু দুরারোগ্য ক্ষয়রোগ ধরা পড়ায় ১৯৪৭ সালের ২ এপ্রিল তাঁকে ‘যাদবপুর যক্ষা হাসপাতালে’ ভর্তি করা হয়। ৪১ দিন যক্ষার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৩ মে সকালের কোনও একসময়ে মাত্র একুশ বছর বয়সে নিভে যায় বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী এক প্রতিভার প্রাণপ্রদীপ।

মাত্র ২১ বছর বয়সের এক কবির রচনাসম্ভার দেখে অবাক না-হয়ে পারা যায় না। কবিতা ছাড়াও তিনি রচনা করেছেন গল্প, নাটক, গান ও প্রবন্ধ। তার রচনাবলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, মিঠেকড়া, অভিযান, ঘুম নেই, হরতাল ও গীতিগুচ্ছ।

বাংলা কবিতার ইতিহাসে সুকান্তের স্থান শ্রমিশ্রেণির প্রথম সার্থক কবি হিসাবে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

এ-বছর পালিত হচ্ছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবার্ষিকী। জন্মশতবর্ষে মহান এই কবির প্রতি নিবেদন করি অশেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।    


ঋণস্বীকার:

১. ড. সরোজমোহন মিত্র

২. ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ

৩. ঈশান সামী



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত