বাংলা কবিতায় আসাদ চৌধুরীর পরিচয় বহুমাত্রিক। তাঁর কবিতার সহজ উচ্চারণ, কথোপকথনের ঘনিষ্ঠতা, মানুষের প্রতি গভীর মমতা, সমাজসচেতনতা ও প্রতিবাদী স্বর নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কবিসত্তার আরেকটি বিস্তৃত দিক তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত: পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ, কবিতা, সংস্কৃতি, যুদ্ধ, বর্ণবৈষম্য, দেশত্যাগ, নির্বাসন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সংযোগ। কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক জয়দুল হোসেন তাঁর ‘আসাদ চৌধুরীর কবিতায় বৈশ্বিক চেতনা’ গ্রন্থে সেই বিস্তৃত পরিসরকে এক জায়গায় ধরার চেষ্টা করেছেন।
গ্রন্থের সূচির দিকে তাকালেই গবেষকের অনুসন্ধানের বিস্তার বোঝা যায়। ‘বৈশ্বিক চেতনার উন্মেষ’ দিয়ে শুরু করে ‘চালচুলো ছেড়ে আসা উর্দু কবিদের মর্মবেদনা’, ‘উর্দু গজল ও গীতিকবিতা’, ‘অনূদিত অন্যান্য কবিতা ও গদ্য রচনা’, ‘অনুবাদকর্মে বৈশ্বিক চেতনা: ফিলিস্তিন ও প্রতিবেশী দেশের প্রতিবাদী কবিতা’ পেরিয়ে শেষ হয়েছে ‘পরিশিষ্ট’-এ। এই বিন্যাসের ভেতর দিয়ে একজন বাংলা কবির বিশ্বসংযোগকে শুধু তাঁর নিজের কবিতায় খোঁজা হয়নি; তাঁর পাঠ, অনুবাদ, সাহিত্যিক সম্পর্ক, অন্য সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ এবং নিপীড়িত মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতাকেও একই আলোচনার মধ্যে আনা হয়েছে।
জয়দুল হোসেনের আলোচনায় আসাদ চৌধুরীর বৈশ্বিক চেতনার প্রথম বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে কঙ্গোর স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা। তরুণ আসাদ চৌধুরীর কবিজীবনের শুরুতেই আফ্রিকার এই নেতার হত্যাকাণ্ড তাঁর হৃদয়ে গভীর আলোড়ন তুলেছিল। লুমুম্বার মৃত্যু তাঁর কাছে দূর দেশের রাজনৈতিক সংবাদ হয়ে থাকেনি। কবির নিজের ভাষ্যে, তাঁর মনে হয়েছিল নিজের কাজিন মারা গেছে। লুমুম্বার স্ত্রী পলিন লুমুম্বার শোকাহত দৃশ্যও তাঁকে তীব্রভাবে আহত করেছিল। সেই আবেগ থেকেই জন্ম নেয় ‘ইতিহাসের আর এক নায়ক’।
এই ঘটনাকে আসাদ চৌধুরীর কবিসত্তা বোঝার একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা যায়। একজন বাঙালি তরুণ কবি কঙ্গোর একজন নিহত নেতার মৃত্যুতে নিজের আত্মীয় হারানোর বেদনা অনুভব করছেন। দূরত্ব সেখানে আবেগের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি। আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শোষণ তাঁর কাছে মানবিক অপমানের অংশ হয়ে উঠেছে। এখানেই তাঁর বিশ্ববোধের মূল স্বরটি ধরা পড়ে: মানুষ যেখানে নিপীড়িত, কবির সংবেদন সেখানেই পৌঁছে যায়।
‘ইতিহাসের আর এক নায়ক’ কবিতায় লুমুম্বাকে হত্যা করেও তাঁর আদর্শকে হত্যা করতে না পারার কথা এসেছে। ঘরে ঘরে লক্ষ কোটি জীবন্ত লুমুম্বার জন্ম নেওয়ার কল্পনা রাজনৈতিক হত্যাকে বৃহত্তর মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় রূপ দেয়। পরে ‘আফ্রিকা, আমার আপনজন’ কবিতায় পলিন লুমুম্বার শোক আবার ফিরে আসে। সেখানে কবি বলেন, আর্তনাদ অনুবাদের অপেক্ষা রাখে না। এই পংক্তির ভেতরেই আসাদ চৌধুরীর আন্তর্জাতিক মননের একটি গভীর সূত্র পাওয়া যায়। মানুষের কান্নার জন্য অভিধান লাগে না; নিপীড়নের বেদনা দেশ ও জাতির সীমানা অতিক্রম করে সরাসরি আরেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
আসাদ চৌধুরীর বিশ্বপরিক্রমা কেবল রাজনৈতিক ঘটনার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি। বিশ্বসাহিত্যের কবি, লেখক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব তাঁর কল্পনায় বারবার প্রবেশ করেছেন। পাবলো নেরুদাকে উৎসর্গ করা কবিতায় কবিতার শক্তিকে তিনি যুদ্ধাস্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর কল্পনায় নেরুদার শব্দ বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে বোমারু বিমান নামিয়ে আনতে পারে, কবিতার পংক্তি ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। কবিতার ক্ষমতা সম্পর্কে এমন কল্পনা আসলে যুদ্ধবিরোধী কবির নিজস্ব বিশ্বাসেরও প্রকাশ।
প্রাচীন পারস্যের মহাকবি ফেরদৌসীকেও তিনি আপন সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের অংশ করে নিয়েছেন। ‘ফেরদৌসী তনয়ার স্বর্ণমুদ্রা প্রত্যাখ্যান’ কবিতায় রাজশক্তির অহংকারের বিপরীতে কবির মর্যাদা এবং তাঁর কন্যার আত্মসম্মান প্রধান হয়ে ওঠে। সুলতানের বিলম্বিত পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের দৃশ্য আসাদ চৌধুরীর হাতে ইতিহাসের পুনর্কথন থেকে বেরিয়ে কবির স্বাধীনতার এক তীব্র কাব্যিক মুহূর্তে পৌঁছায়। ফেরদৌসীর কন্যার কণ্ঠে যে ক্রোধ, সেখানে রাজকীয় করুণার বিপরীতে শিল্পীর আত্মমর্যাদা উচ্চারিত।
উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের প্রতি আসাদ চৌধুরীর অনুরাগের আরেকটি বড় নাম মির্জা গালিব। গালিবকে তিনি শুধু পাঠ করেননি, তাঁকে উৎসর্গ করে কবিতা লিখেছেন, ‘গালিবের অনুসরণে’ নামে ধারাবাহিক কবিতাও রচনা করেছেন। মীর তকী মীর ও গালিবের গজলের অশ্রুকে তিনি ‘হীরক দ্যুতি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই সূত্রে বোঝা যায়, তাঁর বিশ্বসংযোগ কেবল সমকালীন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল না; বহু শতাব্দীর সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও তাঁর কথোপকথন চলেছে।
উইলিয়াম কেরি, তাজমহল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, হলিউড ও ভারতীয় চলচ্চিত্র, সোফিয়া লোরেন, সুচিত্রা সেন, মক্কা-মদিনা, টরন্টোর প্রবাসজীবন— জয়দুল হোসেন এসব প্রসঙ্গ পাশাপাশি এনে আসাদ চৌধুরীর মানসিক পরিসরের বিস্তার তুলে ধরেছেন। ফলে ‘বৈশ্বিক’ শব্দটি এখানে শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমার্থক হয়ে থাকে না। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, প্রবাস, স্মৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ও তার অংশ হয়ে ওঠে।
আসাদ চৌধুরীর বিশ্বচেতনার অন্যতম কেন্দ্র যুদ্ধবিরোধিতা। পরাশক্তির অস্ত্র প্রতিযোগিতা, আণবিক বোমা, নিউট্রন অস্ত্র এবং মানুষ ধ্বংসের আয়োজনের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট। ‘ঝকঝকে অস্ত্র, আর নয়’ উচ্চারণে যুদ্ধের প্রযুক্তিগত ভয়াবহতার পাশাপাশি সভ্যতার আত্মবিনাশী প্রবণতার বিরুদ্ধেও ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে কবির প্রতিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকে না। আফ্রিকার কালো মানুষের ওপর বর্ণবাদী নিপীড়ন তাঁকে আহত করে, ফিলিস্তিনিদের দেশহীনতার যন্ত্রণা তাঁর অনুবাদে প্রবেশ করে, উর্দুভাষী মানুষের পরিচয়গত বেদনা তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফলে তাঁর বৈশ্বিকতা মূলত মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতার বিস্তার।
এই জায়গাতেই জয়দুল হোসেনের বইটির প্রধান তাৎপর্য। তিনি আসাদ চৌধুরীর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের তালিকা তৈরিতে থেমে যাননি। বিভিন্ন কবিতা, অনুবাদ ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে একটি মানবিক যোগসূত্র খুঁজেছেন। লুমুম্বা, নেরুদা, ফেরদৌসী, গালিব, ফিলিস্তিনি কবি, বাংলাদেশের উর্দু কবি— তাঁদের অবস্থান ও সময় আলাদা হলেও আসাদ চৌধুরীর কাছে তাঁদের মিলনের জায়গা মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা, প্রেম, স্মৃতি ও প্রতিবাদ।
গ্রন্থটির সবচেয়ে মূল্যবান অংশগুলোর মধ্যে ‘চালচুলো ছেড়ে আসা উর্দু কবিদের মর্মবেদনা’ বিশেষ মনোযোগের যোগ্য। অংশটি আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের উর্দু সাহিত্য’ থেকে সংকলিত ও সম্পাদিত। গবেষক এখানে এমন এক সাহিত্যিক পরিসর সামনে এনেছেন, যা বাংলাদেশের মূলধারার সাহিত্য আলোচনায় খুব বেশি জায়গা পায়নি। দেশভাগের পর অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু উর্দুভাষী মানুষ পূর্ব বাংলায় এসে বসতি গড়েন। তাঁদের অনেকের জীবনে জন্মভূমি হারানোর ক্ষত থেকে যায়। আসাদ চৌধুরী সেই মানসিক অবস্থার প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং তাঁদের সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করেছেন। আহসান আহমদ আশককে উৎসর্গ করা ‘অরণ্যেও বৃক্ষ একা থাকে’ কবিতায় এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি অসাধারণভাবে এসেছে: “অরণ্যেও বৃক্ষ একা থাকে/ ভিড়ের মধ্যে যেমন আমি, তুমি/ চুল পেকেছে কয়েক বছর আগে/ স্বদেশ তবু হয় না জন্মভূমি।”
‘স্বদেশ’ ও ‘জন্মভূমি’র মধ্যকার এই দূরত্ব দেশভাগের সবচেয়ে গভীর মানসিক ক্ষতগুলোর একটি। নতুন রাষ্ট্রে একজন মানুষ নাগরিকত্ব পেতে পারেন, জীবিকা গড়ে তুলতে পারেন, সন্তান জন্মাতে পারে, তবু স্মৃতির ভেতরে পড়ে থাকে অন্য উঠোন, অন্য কুয়ো, অন্য শস্যক্ষেত, অন্য শৈশব।
আসাদ চৌধুরী বাংলাদেশের উর্দু কবিদের মধ্যে ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’-এর কথা লিখেছিলেন। আহসান আহমদ আশকের কবিতায় তিনি সেই অনুভূতি প্রবলভাবে পেয়েছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে ফিলিস্তিনি কবিদের সঙ্গে বাংলাদেশের উর্দু কবিদের মানসিক অবস্থার একটি তুলনা। মাহমুদ দারবিশ, ফাদওয়া তুকানিসহ ফিলিস্তিনি কবিদের দেশহীনতা বিশ্বব্যাপী পাঠকের সহমর্মিতা পেয়েছে; বাংলাদেশের উর্দু কবিদের বেদনা সেই মাত্রায় সাহিত্যিক মনোযোগ পায়নি। এই তুলনা গ্রন্থটির আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয়। দেশভাগকে তখন শুধু ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে পড়া যায় না; মানুষের স্মৃতি, পরিচয়, সাহিত্য ও প্রজন্মান্তরে বহন করা বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা হিসেবেও পড়া যায়।
গ্রন্থের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আসাদ চৌধুরীর অনুবাদকর্ম। বিশেষত ‘ফিলিস্তিন ও প্রতিবেশী দেশের প্রতিবাদী আরবি কবিতা’ থেকে সংগৃহীত অংশ বইটির কেন্দ্রীয় আলোচনাকে আরও গভীর করেছে। ফাদওয়া তুকান, তাওফিক সাইয়িখ, খলিল হাবি, অ্যাডোনিস, নিজার কাব্বানি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত, সা’দী ইউসুফ, সামিহ আল কাসিম, মাহমুদ দারবিশ, জাবরা ইবরাহিম জাবরাসহ বহু আরবি কবির রচনা আসাদ চৌধুরী বাংলায় এনেছিলেন।
জয়দুল হোসেন এই জায়গায় আসাদ চৌধুরীর কবিতা ও অনুবাদকে একই স্রোতের দুই প্রবাহ হিসেবে পড়েছেন। নিজের কবিতায় তিনি লুমুম্বার হত্যার বিরুদ্ধে লিখছেন, যুদ্ধাস্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, আফ্রিকার কালো মানুষের প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন; অনুবাদে তিনি ফিলিস্তিন ও আরব বিশ্বের প্রতিবাদী কবিদের বাংলা পাঠকের কাছে নিয়ে আসছেন। কবিতা লেখা এবং কবিতা অনুবাদ, দুই ক্ষেত্রেই তাঁর মনোযোগ মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার দিকে।
বইটির পরিশিষ্ট বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আসাদ চৌধুরী ২০২৩ সালে প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু যে বিশ্বমানবিক চেতনার কথা পুরো বইয়ে আলোচিত হয়েছে, গবেষক জয়দুল হোসেন সেই প্রবাহকে কবির মৃত্যুর সঙ্গে থামিয়ে দেননি। ২০২৫ সালে ফিলিস্তিনে চলমান ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে লেখা ও অনূদিত কয়েকজন কবির রচনা পরিশিষ্টে সংযোজিত হয়েছে। এই অংশে একটি প্রজন্মগত সংযোগ তৈরি হয়েছে। আসাদ চৌধুরী যে প্রতিবাদী আরবি কবিতাকে বাংলায় এনেছিলেন, পরবর্তী সময়ের কবিরাও যুদ্ধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অনুবাদ ও কবিতার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। ইরানি কবি পারনিয়া আব্বাসির কবিতার ভূমিকা ও ভাষান্তর করেছেন শাহেদ কায়েস, মতিন রায়হান লিখেছেন কবিতা ‘পারনিয়া আব্বাসির জন্য শোকগাথা’, গোলাম কিবরিয়া পিনু লিখেছেন কবিতা ‘ফিলিস্তিন’, মারুফুল ইসলামের কবিতা ‘বিপন্ন’, শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক-এর অনুবাদে কবি হেবা আবু নাদার কবিতা ‘বিলীয়মান নয়’।
সেই রচনাও পরিশিষ্টে স্থান পেয়েছে। ফলে গ্রন্থের আলোচ্য বিষয় একজন কবির জীবনকাল অতিক্রম করে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই সম্পাদনাগত সিদ্ধান্ত বইটির ধারণাগত পরিধি বাড়িয়েছে। আসাদ চৌধুরীর বিশ্বচেতনা তখন অতীতের একটি সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য হয়ে পড়ে থাকে না; তার উত্তরপ্রবাহ সমকালীন কবিতা ও অনুবাদের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের উর্দু সাহিত্য প্রসঙ্গে দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এবং স্বাধীনতার পর উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থানের জটিল সম্পর্কও আরও বিস্তৃত বিশ্লেষণের সুযোগ বহন করে। আসাদ চৌধুরীর সহমর্মিতার জায়গাটি মূল্যবান, তবে সেই সহমর্মিতাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা স্তরের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে আলোচনায় আরও সূক্ষ্মতা যোগ হতো।
‘আসাদ চৌধুরীর কবিতায় বৈশ্বিক চেতনা’ শেষ পর্যন্ত একজন কবিকে নতুনভাবে আবিষ্কারের বই। আমরা যে আসাদ চৌধুরীকে বাংলা কবিতার জনপ্রিয়, সহজাত, মানবিক ও সমাজসচেতন কবি হিসেবে চিনি, জয়দুল হোসেন তাঁর পাশে আরেক আসাদ চৌধুরীকে হাজির করেছেন।
জিনিয়াস পাবলিকেশন্স থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ, মূল্য ৪০০ টাকা।

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
বাংলা কবিতায় আসাদ চৌধুরীর পরিচয় বহুমাত্রিক। তাঁর কবিতার সহজ উচ্চারণ, কথোপকথনের ঘনিষ্ঠতা, মানুষের প্রতি গভীর মমতা, সমাজসচেতনতা ও প্রতিবাদী স্বর নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর কবিসত্তার আরেকটি বিস্তৃত দিক তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত: পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ, কবিতা, সংস্কৃতি, যুদ্ধ, বর্ণবৈষম্য, দেশত্যাগ, নির্বাসন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাঁর নিবিড় সংযোগ। কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক জয়দুল হোসেন তাঁর ‘আসাদ চৌধুরীর কবিতায় বৈশ্বিক চেতনা’ গ্রন্থে সেই বিস্তৃত পরিসরকে এক জায়গায় ধরার চেষ্টা করেছেন।
গ্রন্থের সূচির দিকে তাকালেই গবেষকের অনুসন্ধানের বিস্তার বোঝা যায়। ‘বৈশ্বিক চেতনার উন্মেষ’ দিয়ে শুরু করে ‘চালচুলো ছেড়ে আসা উর্দু কবিদের মর্মবেদনা’, ‘উর্দু গজল ও গীতিকবিতা’, ‘অনূদিত অন্যান্য কবিতা ও গদ্য রচনা’, ‘অনুবাদকর্মে বৈশ্বিক চেতনা: ফিলিস্তিন ও প্রতিবেশী দেশের প্রতিবাদী কবিতা’ পেরিয়ে শেষ হয়েছে ‘পরিশিষ্ট’-এ। এই বিন্যাসের ভেতর দিয়ে একজন বাংলা কবির বিশ্বসংযোগকে শুধু তাঁর নিজের কবিতায় খোঁজা হয়নি; তাঁর পাঠ, অনুবাদ, সাহিত্যিক সম্পর্ক, অন্য সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ এবং নিপীড়িত মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতাকেও একই আলোচনার মধ্যে আনা হয়েছে।
জয়দুল হোসেনের আলোচনায় আসাদ চৌধুরীর বৈশ্বিক চেতনার প্রথম বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে কঙ্গোর স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা। তরুণ আসাদ চৌধুরীর কবিজীবনের শুরুতেই আফ্রিকার এই নেতার হত্যাকাণ্ড তাঁর হৃদয়ে গভীর আলোড়ন তুলেছিল। লুমুম্বার মৃত্যু তাঁর কাছে দূর দেশের রাজনৈতিক সংবাদ হয়ে থাকেনি। কবির নিজের ভাষ্যে, তাঁর মনে হয়েছিল নিজের কাজিন মারা গেছে। লুমুম্বার স্ত্রী পলিন লুমুম্বার শোকাহত দৃশ্যও তাঁকে তীব্রভাবে আহত করেছিল। সেই আবেগ থেকেই জন্ম নেয় ‘ইতিহাসের আর এক নায়ক’।
এই ঘটনাকে আসাদ চৌধুরীর কবিসত্তা বোঝার একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা যায়। একজন বাঙালি তরুণ কবি কঙ্গোর একজন নিহত নেতার মৃত্যুতে নিজের আত্মীয় হারানোর বেদনা অনুভব করছেন। দূরত্ব সেখানে আবেগের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি। আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শোষণ তাঁর কাছে মানবিক অপমানের অংশ হয়ে উঠেছে। এখানেই তাঁর বিশ্ববোধের মূল স্বরটি ধরা পড়ে: মানুষ যেখানে নিপীড়িত, কবির সংবেদন সেখানেই পৌঁছে যায়।
‘ইতিহাসের আর এক নায়ক’ কবিতায় লুমুম্বাকে হত্যা করেও তাঁর আদর্শকে হত্যা করতে না পারার কথা এসেছে। ঘরে ঘরে লক্ষ কোটি জীবন্ত লুমুম্বার জন্ম নেওয়ার কল্পনা রাজনৈতিক হত্যাকে বৃহত্তর মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় রূপ দেয়। পরে ‘আফ্রিকা, আমার আপনজন’ কবিতায় পলিন লুমুম্বার শোক আবার ফিরে আসে। সেখানে কবি বলেন, আর্তনাদ অনুবাদের অপেক্ষা রাখে না। এই পংক্তির ভেতরেই আসাদ চৌধুরীর আন্তর্জাতিক মননের একটি গভীর সূত্র পাওয়া যায়। মানুষের কান্নার জন্য অভিধান লাগে না; নিপীড়নের বেদনা দেশ ও জাতির সীমানা অতিক্রম করে সরাসরি আরেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
আসাদ চৌধুরীর বিশ্বপরিক্রমা কেবল রাজনৈতিক ঘটনার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি। বিশ্বসাহিত্যের কবি, লেখক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব তাঁর কল্পনায় বারবার প্রবেশ করেছেন। পাবলো নেরুদাকে উৎসর্গ করা কবিতায় কবিতার শক্তিকে তিনি যুদ্ধাস্ত্রের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর কল্পনায় নেরুদার শব্দ বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে বোমারু বিমান নামিয়ে আনতে পারে, কবিতার পংক্তি ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। কবিতার ক্ষমতা সম্পর্কে এমন কল্পনা আসলে যুদ্ধবিরোধী কবির নিজস্ব বিশ্বাসেরও প্রকাশ।
প্রাচীন পারস্যের মহাকবি ফেরদৌসীকেও তিনি আপন সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের অংশ করে নিয়েছেন। ‘ফেরদৌসী তনয়ার স্বর্ণমুদ্রা প্রত্যাখ্যান’ কবিতায় রাজশক্তির অহংকারের বিপরীতে কবির মর্যাদা এবং তাঁর কন্যার আত্মসম্মান প্রধান হয়ে ওঠে। সুলতানের বিলম্বিত পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের দৃশ্য আসাদ চৌধুরীর হাতে ইতিহাসের পুনর্কথন থেকে বেরিয়ে কবির স্বাধীনতার এক তীব্র কাব্যিক মুহূর্তে পৌঁছায়। ফেরদৌসীর কন্যার কণ্ঠে যে ক্রোধ, সেখানে রাজকীয় করুণার বিপরীতে শিল্পীর আত্মমর্যাদা উচ্চারিত।
উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের প্রতি আসাদ চৌধুরীর অনুরাগের আরেকটি বড় নাম মির্জা গালিব। গালিবকে তিনি শুধু পাঠ করেননি, তাঁকে উৎসর্গ করে কবিতা লিখেছেন, ‘গালিবের অনুসরণে’ নামে ধারাবাহিক কবিতাও রচনা করেছেন। মীর তকী মীর ও গালিবের গজলের অশ্রুকে তিনি ‘হীরক দ্যুতি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই সূত্রে বোঝা যায়, তাঁর বিশ্বসংযোগ কেবল সমকালীন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল না; বহু শতাব্দীর সাহিত্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও তাঁর কথোপকথন চলেছে।
উইলিয়াম কেরি, তাজমহল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, হলিউড ও ভারতীয় চলচ্চিত্র, সোফিয়া লোরেন, সুচিত্রা সেন, মক্কা-মদিনা, টরন্টোর প্রবাসজীবন— জয়দুল হোসেন এসব প্রসঙ্গ পাশাপাশি এনে আসাদ চৌধুরীর মানসিক পরিসরের বিস্তার তুলে ধরেছেন। ফলে ‘বৈশ্বিক’ শব্দটি এখানে শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমার্থক হয়ে থাকে না। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, প্রবাস, স্মৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ও তার অংশ হয়ে ওঠে।
আসাদ চৌধুরীর বিশ্বচেতনার অন্যতম কেন্দ্র যুদ্ধবিরোধিতা। পরাশক্তির অস্ত্র প্রতিযোগিতা, আণবিক বোমা, নিউট্রন অস্ত্র এবং মানুষ ধ্বংসের আয়োজনের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট। ‘ঝকঝকে অস্ত্র, আর নয়’ উচ্চারণে যুদ্ধের প্রযুক্তিগত ভয়াবহতার পাশাপাশি সভ্যতার আত্মবিনাশী প্রবণতার বিরুদ্ধেও ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে কবির প্রতিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক পরিচয়ের মধ্যে আটকে থাকে না। আফ্রিকার কালো মানুষের ওপর বর্ণবাদী নিপীড়ন তাঁকে আহত করে, ফিলিস্তিনিদের দেশহীনতার যন্ত্রণা তাঁর অনুবাদে প্রবেশ করে, উর্দুভাষী মানুষের পরিচয়গত বেদনা তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফলে তাঁর বৈশ্বিকতা মূলত মানুষের প্রতি সংবেদনশীলতার বিস্তার।
এই জায়গাতেই জয়দুল হোসেনের বইটির প্রধান তাৎপর্য। তিনি আসাদ চৌধুরীর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের তালিকা তৈরিতে থেমে যাননি। বিভিন্ন কবিতা, অনুবাদ ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে একটি মানবিক যোগসূত্র খুঁজেছেন। লুমুম্বা, নেরুদা, ফেরদৌসী, গালিব, ফিলিস্তিনি কবি, বাংলাদেশের উর্দু কবি— তাঁদের অবস্থান ও সময় আলাদা হলেও আসাদ চৌধুরীর কাছে তাঁদের মিলনের জায়গা মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা, প্রেম, স্মৃতি ও প্রতিবাদ।
গ্রন্থটির সবচেয়ে মূল্যবান অংশগুলোর মধ্যে ‘চালচুলো ছেড়ে আসা উর্দু কবিদের মর্মবেদনা’ বিশেষ মনোযোগের যোগ্য। অংশটি আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের উর্দু সাহিত্য’ থেকে সংকলিত ও সম্পাদিত। গবেষক এখানে এমন এক সাহিত্যিক পরিসর সামনে এনেছেন, যা বাংলাদেশের মূলধারার সাহিত্য আলোচনায় খুব বেশি জায়গা পায়নি। দেশভাগের পর অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু উর্দুভাষী মানুষ পূর্ব বাংলায় এসে বসতি গড়েন। তাঁদের অনেকের জীবনে জন্মভূমি হারানোর ক্ষত থেকে যায়। আসাদ চৌধুরী সেই মানসিক অবস্থার প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং তাঁদের সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করেছেন। আহসান আহমদ আশককে উৎসর্গ করা ‘অরণ্যেও বৃক্ষ একা থাকে’ কবিতায় এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি অসাধারণভাবে এসেছে: “অরণ্যেও বৃক্ষ একা থাকে/ ভিড়ের মধ্যে যেমন আমি, তুমি/ চুল পেকেছে কয়েক বছর আগে/ স্বদেশ তবু হয় না জন্মভূমি।”
‘স্বদেশ’ ও ‘জন্মভূমি’র মধ্যকার এই দূরত্ব দেশভাগের সবচেয়ে গভীর মানসিক ক্ষতগুলোর একটি। নতুন রাষ্ট্রে একজন মানুষ নাগরিকত্ব পেতে পারেন, জীবিকা গড়ে তুলতে পারেন, সন্তান জন্মাতে পারে, তবু স্মৃতির ভেতরে পড়ে থাকে অন্য উঠোন, অন্য কুয়ো, অন্য শস্যক্ষেত, অন্য শৈশব।
আসাদ চৌধুরী বাংলাদেশের উর্দু কবিদের মধ্যে ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’-এর কথা লিখেছিলেন। আহসান আহমদ আশকের কবিতায় তিনি সেই অনুভূতি প্রবলভাবে পেয়েছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে ফিলিস্তিনি কবিদের সঙ্গে বাংলাদেশের উর্দু কবিদের মানসিক অবস্থার একটি তুলনা। মাহমুদ দারবিশ, ফাদওয়া তুকানিসহ ফিলিস্তিনি কবিদের দেশহীনতা বিশ্বব্যাপী পাঠকের সহমর্মিতা পেয়েছে; বাংলাদেশের উর্দু কবিদের বেদনা সেই মাত্রায় সাহিত্যিক মনোযোগ পায়নি। এই তুলনা গ্রন্থটির আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেয়। দেশভাগকে তখন শুধু ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে পড়া যায় না; মানুষের স্মৃতি, পরিচয়, সাহিত্য ও প্রজন্মান্তরে বহন করা বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা হিসেবেও পড়া যায়।
গ্রন্থের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আসাদ চৌধুরীর অনুবাদকর্ম। বিশেষত ‘ফিলিস্তিন ও প্রতিবেশী দেশের প্রতিবাদী আরবি কবিতা’ থেকে সংগৃহীত অংশ বইটির কেন্দ্রীয় আলোচনাকে আরও গভীর করেছে। ফাদওয়া তুকান, তাওফিক সাইয়িখ, খলিল হাবি, অ্যাডোনিস, নিজার কাব্বানি, মুহাম্মদ আল-মাঘুত, সা’দী ইউসুফ, সামিহ আল কাসিম, মাহমুদ দারবিশ, জাবরা ইবরাহিম জাবরাসহ বহু আরবি কবির রচনা আসাদ চৌধুরী বাংলায় এনেছিলেন।
জয়দুল হোসেন এই জায়গায় আসাদ চৌধুরীর কবিতা ও অনুবাদকে একই স্রোতের দুই প্রবাহ হিসেবে পড়েছেন। নিজের কবিতায় তিনি লুমুম্বার হত্যার বিরুদ্ধে লিখছেন, যুদ্ধাস্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, আফ্রিকার কালো মানুষের প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন; অনুবাদে তিনি ফিলিস্তিন ও আরব বিশ্বের প্রতিবাদী কবিদের বাংলা পাঠকের কাছে নিয়ে আসছেন। কবিতা লেখা এবং কবিতা অনুবাদ, দুই ক্ষেত্রেই তাঁর মনোযোগ মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার দিকে।
বইটির পরিশিষ্ট বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আসাদ চৌধুরী ২০২৩ সালে প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু যে বিশ্বমানবিক চেতনার কথা পুরো বইয়ে আলোচিত হয়েছে, গবেষক জয়দুল হোসেন সেই প্রবাহকে কবির মৃত্যুর সঙ্গে থামিয়ে দেননি। ২০২৫ সালে ফিলিস্তিনে চলমান ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে লেখা ও অনূদিত কয়েকজন কবির রচনা পরিশিষ্টে সংযোজিত হয়েছে। এই অংশে একটি প্রজন্মগত সংযোগ তৈরি হয়েছে। আসাদ চৌধুরী যে প্রতিবাদী আরবি কবিতাকে বাংলায় এনেছিলেন, পরবর্তী সময়ের কবিরাও যুদ্ধ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অনুবাদ ও কবিতার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। ইরানি কবি পারনিয়া আব্বাসির কবিতার ভূমিকা ও ভাষান্তর করেছেন শাহেদ কায়েস, মতিন রায়হান লিখেছেন কবিতা ‘পারনিয়া আব্বাসির জন্য শোকগাথা’, গোলাম কিবরিয়া পিনু লিখেছেন কবিতা ‘ফিলিস্তিন’, মারুফুল ইসলামের কবিতা ‘বিপন্ন’, শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক-এর অনুবাদে কবি হেবা আবু নাদার কবিতা ‘বিলীয়মান নয়’।
সেই রচনাও পরিশিষ্টে স্থান পেয়েছে। ফলে গ্রন্থের আলোচ্য বিষয় একজন কবির জীবনকাল অতিক্রম করে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই সম্পাদনাগত সিদ্ধান্ত বইটির ধারণাগত পরিধি বাড়িয়েছে। আসাদ চৌধুরীর বিশ্বচেতনা তখন অতীতের একটি সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য হয়ে পড়ে থাকে না; তার উত্তরপ্রবাহ সমকালীন কবিতা ও অনুবাদের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের উর্দু সাহিত্য প্রসঙ্গে দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এবং স্বাধীনতার পর উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থানের জটিল সম্পর্কও আরও বিস্তৃত বিশ্লেষণের সুযোগ বহন করে। আসাদ চৌধুরীর সহমর্মিতার জায়গাটি মূল্যবান, তবে সেই সহমর্মিতাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা স্তরের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে আলোচনায় আরও সূক্ষ্মতা যোগ হতো।
‘আসাদ চৌধুরীর কবিতায় বৈশ্বিক চেতনা’ শেষ পর্যন্ত একজন কবিকে নতুনভাবে আবিষ্কারের বই। আমরা যে আসাদ চৌধুরীকে বাংলা কবিতার জনপ্রিয়, সহজাত, মানবিক ও সমাজসচেতন কবি হিসেবে চিনি, জয়দুল হোসেন তাঁর পাশে আরেক আসাদ চৌধুরীকে হাজির করেছেন।
জিনিয়াস পাবলিকেশন্স থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ, মূল্য ৪০০ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন