উত্তর-উপনিবেশবাদ (Post‑colonialism) ঔপনিবেশিক শাসনের পরও তার দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, ভাষিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে বিশ্লেষণ করে। ঔপনিবেশিক পর্ব শেষ হলেও তার গঠন— যেমন ‘অন্য’ (Other) বনাম ‘আমরা’, উপনিবেশিত বনাম ঔপনিবেশক— স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্তর্ঘটনা হিসেবে বেঁচে থাকে। ‘উপনিবেশী প্রশাসকদের অনুকরণে উপনিবেশিতদের মধ্যে বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থান। উপনিবেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পর এরা সাদা প্রভুদের অনুকরণে স্থানীয় প্রভুতে পরিণত হয়। এরা মর্যাদা পরিপূর্ণভাবে ভোগ করার জন্য উপনিবেশী প্রভুদের অনুকরণে পশ্চিমা সংস্কৃতির চর্চা করে। তা আত্মস্থ করে এবং তাকে ঊর্ধ্বে তুলে রাখে’। (আলম, ২০২০ : ২২-২৩) বিশ শতক বাংলা ভাষাভাষি মানুষজনের জীবনে একই সঙ্গে উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট সময়। শতকের সূচনায় সুপরিকল্পিত বঙ্গভঙ্গের ফলে প্রদেশের দুই জাতিগোষ্ঠীর সংস্কার ও জাতিবিদ্বেষ উন্মোচিত হয় নগ্নভাবে। সর্বশেষ উইনস্টন চার্চিল (১৮৭৪-১৯৬৫) পরিকল্পিত পঞ্চাশের মন্বন্তরে তিরিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ বাঙালির অকালে অপমৃত্যুর পথ ধরে আসে ১৯৪৭-এর শোচনীয় ও মর্মান্তিক স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পরে ভারতবর্ষ ও পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা সমর্পিত হয় সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে। স্বাধীনতার পরেও তাই রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে শুরু করে জনজীবন পর্যন্ত উপনিবেশী সংস্কৃতির এ ভাব অনেকখানি অক্ষুণ্ন থেকে যায়।
বাঙালির আবেগদীপ্ত প্রত্যাশা-প্রাপ্তির অন্তর্ভেদী সত্যকে সম্পূর্ণতা প্রদানের ঐকান্তিকতায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ঋদ্ধ। তাঁর চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬) মূলত রাজনৈতিক উপন্যাস। উপন্যাসের নায়ক যেন ৬৯। এক প্রচণ্ড জীবনস্পর্শী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে শহর-বন্দর-গঞ্জ, নিভৃত গ্রাম, এমনকি যমুনার দুর্গম চর এলাকা। মিটিং-মিছিল, গুলিবর্ষণ আর কার্ফ্যু-ভাঙা ও গণআদালত সব জায়গায় ফেটে পড়ে ক্ষোভ ও বিদ্রোহ। সকল মানুষের হৃদয়ে অভিষেক ঘটে একটি অবিচল লক্ষ্যে— মুক্তি।
উপন্যাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বলিষ্ঠ প্রতিনিধি রহমতউল্লা। সে কেবল স্থানীয় প্রভু বা মহাজন নয়; তার মধ্যে ঔপনিবেশিক শাসকের মানসিকতাও সক্রিয়। ঔপনিবেশিক শাসকের দমননীতিকে অনুকরণ করে সে শ্রমিক ও নিম্নবর্গীয় মানুষের শ্রম, দেহ ও অধিকারকে নিজের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। তাই প্রলেতারিয়েত শ্রেণির খিজির তাদের শোষণ ও দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠলে রহমতউল্লা অবতীর্ণ হয় উপনিবেশ-উত্তর শোষকের ভূমিকায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের সপক্ষে গণ আন্দোলনের বিরোধিতায় নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ ও অবস্থান স্পষ্ট করে:
“মহাজন খিজিরকে ঠাস করে একটা চড় মেরে বসলো। কি ব্যাপার? ‘চুতমারানি আমারই খাইবি আমারই পরবি, আমি ঘর না দিলে জায়গা নাই, আর আমার লগে নিমকহারামি করস?’... তরে অক্ষন ধরাইয়া দেই তো কয় বছরের জেল খাটতে হইবো, জানস?... ছয় দফার পোস্টার মারস, আরে ছয় দফা হইলে পাকিস্তান থাকবো? আমরা পাকিস্তানের লাইগা ফাইট করছি।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৫২)
পাকিস্তানি রাজনীতির তথা সামন্তবাদ, উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ, আমলাতন্ত্র, সামরিক শাসন ইত্যাদি বহুমুখী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে গণমানুষের পুঞ্জীভূত ক্রোধের প্রথম বিস্ফোরণ ঘটেছিল ৬৯-এর আন্দোলনে। মহাজনের শোষণ, অন্যায়-অপকর্ম অন্তর্দগ্ধ লুম্পেন প্রলেতারিয়েত চরিত্র খিজিরকে দেখা যায় গণঅভ্যুত্থানের আইয়ুব-বিরোধী মিছিলের অগ্রভাগে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, ধাপ্পাবাজ মহাজনের শাসন-শোষণের অবসানের জন্য জুলুমবাজ আইয়ুব সরকারের পতন অনির্বায। খিজিরের মত চরিত্র সম্পর্কে ভøাদিমির লেনিন (১৮৭০-১৯২৪) এর মত, ‘সংহতি সংগঠন এর শ্রেণি চেতনায় কৃষকেরা শ্রমিকের চেয়ে কম দৃঢ় বলে প্রমাণিত।’ (ইকবাল, ২০০৯ : ৫৪) সাধারণত Private Ownership Psychology-র কারণে কৃষকরা বাঁধা পড়ে থাকে। শ্রমিকরা সেখানে বন্ধনহীন, অগ্রগামী। খিজিরের অমিত তেজরূপী স্লোগানে বিস্ফোরিত হয় নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীদের শ্রেণিগত অবস্থান ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ:
“দ্বিগুণ শক্তিতে খিজির চিৎকার করে, ‘আইয়ুবের দালাল মহাজন!’ এবার জবাব আসে, ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক! তারপর ফের স্লোগান ওঠে, মহাজনের জুলুম, মহাজনের জুলুম-চলবে না, চলবে না!’ খিজির এবার ফের নতুন স্লোগান তোলে, ‘মানুষরে ডাইকা বেইজ্জতি করা— চলবে না, চলবে না!!.. সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা— ‘হুশিয়ার, হুশিয়ার’। দুনিয়ার মজদুর এক হও! কেউ খাবে, কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। জোতদারের গদিতে আগুন জ্বালো এক সাথে।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৭০)
এ উত্তপ্ত দৃশ্য সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিত্রায়িত করে। নিপীড়িত মানুষের রক্তজাগানিয়া উচ্চারণ রূপ নেয় শ্রেণিসংগ্রামের ভাষায়; খিজিরের প্রতিবাদ শ্রমিকদের আন্দোলনের সাথে মিলিত হয়ে ছাত্রদের অগ্নিঝরা স্লোগানের সাথে একাকার হয়ে যায়— শ্রমিক-ছাত্রের ঐক্যের মধ্য দিয়েই বিস্তার লাভ করে গণআন্দোলন। সম্মিলিত বিদ্রোহ অবশ্যম্ভাবী করে তোলে মার্কসবাদকে। মার্কসবাদ উনিশ শতকের দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং বিপ্লবী কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (১৮২০-১৮৯৫) এর তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গডে ওঠা রাজনৈতিক অনুশীলন ও সামাজিক তত্ত্ব। এ তত্ত্বে সামাজিক পরিবর্তনের দ্বান্দি¦ক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিতে সামাজিক দ্বন্দ্ব ও শ্রেণি সম্পর্ককে ভিত্তি করে সমাজ বিশ্লেষণের বিশ্বদর্শন ও প্রক্রিয়া বয়ান করা হয়েছে। প্রায়োগিক বিবেচনায় মার্কসবাদ হচ্ছে মালিক শ্রেণির তথা বুর্জোয় শ্রেণির শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন তথা মজুরি-দাসত্ব থেকে প্রলেতারিয়েতের বা শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ। কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস The Communist Manifesto গ্রন্থে বলেছেন:
Though not in
substance, yet in form, the struggle of the proletariat with the bourgeoisie is
at first a national struggle. The proletariat of each country must, of course,
first of all settle matters with its own bourgeoisie. In depicting the most
general phases of the development of the proletariat, we traced the more or
less veiled civil war, raging within existing society, up to the point where
that war breaks out into open revolution, and where the violent overthrow of
the bourgeoisie lays the foundation for the sway of the proletariat. (Marx
& Engels, 2002 : 232)
তেমনি সাবঅল্টার্ন পাঠে খিজিরের কণ্ঠস্বরই হয়ে ওঠে প্রকৃত Sub altern Voice বা দমিতের বয়ান, যা মূল ধারার রাজনীতিতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও নিপীড়িত জনতার সংগ্রামকে ইতিহাসে দৃশ্যায়ন করে। আন্দোলনে খিজিরের ক্রোধান্বিত ভাষা ও সংগ্রামী মনোভাব সৃষ্টি করেছে এক বিপ্লবী জাগরণ, যা মিখাইল বাখতিন (১৮৯৫-১৯৭৫) কথিত কার্নিভালাইজেশন তত্ত্বের মতই-শাসকশ্রেণির আধিপত্যবাদকে ভেঙে দিয়ে নিম্নবর্গের ক্ষমতা কাঠামো নির্মাণ করে। কারণ, ‘বাখতিনের কার্নিভালাইজেশন হলো... স্বয়ং বিপ্লব।’ (Holquist, 1981 : xviii) খিজিরের বক্তব্যে পুরনো ঢাকার মুখের ভাষা ব্যবহারে ঔপন্যাসিক যে স্বাচ্ছন্দ্যের পরিচয় দিয়েছেন তাতে তাঁর অসামান্য কৃতিত্ব বিস্মিত করে তোলে:
“তারস্বরে খিজির চ্যাঁচাতে শুরু করে, ‘ভাইসব ভাইসব, আপনেরা খালি চিল্লা-চিল্লি করেন ক্যালায়? খামোস মাইরা মিটিং হোনবার পারেন না? পাঁচজনে দশজনে একলগে নামছেন, খালি চিল্লাচিল্লি করবেন তো খালি হাউকাউ হইবে, কাম হইবো আপনের কেলাটা! কাম করেন একলগে, হাউকাউ কইরেন না।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৭০)
কার্নিভালের মতো নিম্নবিত্তের ক্রোধ ও সচেতনতাকে ভাষার শৈল্পিক প্রয়োগে উন্মোচন করে ঔপন্যাসিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের ঢেউ যখন অনিবার্য গতিতে তরঙ্গায়িত হয়ে গ্রামেও বিদ্রোহের অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করে, তখন তা কেবল রাজনৈতিক বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং রূপ নেয় প্রকৃত শ্রেণিসংগ্রামে। শোষক-শোষিতের দ্বন্দ্বে একতাবদ্ধ গ্রামের (চন্দনদহ, পদুমশহর, গোটিয়া) মানুষ; কিন্তু বুর্জোয়াদের কূটকৌশলে ভেস্তে যায় সব কিছু। এ বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার গ্রামীণ শোষক মৌলিক গণতন্ত্রী ও বৃহৎ ভূস্বামী খয়বার গাজী। গ্রামীণ অর্থনীতি, রাজনীতি ও ধর্মব্যবস্থার পূর্ণ নিয়ন্ত্রক প্রবল বিষয়ী মানুষ খয়বার কুশলী অভিনেতাও। তার সম্পত্তি-ক্ষুধা দুর্নিবার ‘চাঁদে চাঁদে তার মোকদ্দমা’। শোষণের সুবিধার্থে সে ধর্মকে ব্যবহার করে, তার সশব্দে ঘনঘন আল্লাহর নাম নেওয়ার মধ্যেও থাকে আধিপত্যবাদের ইশারা। এমনকি, তার কথা বলা বা না-বলা, অঙ্গচালনা কিংবা হাসির রকমফেরে অভিসন্ধির তাৎপর্য বদলে যায়। আনোয়ারের মুখে ভোট জালিয়াতির কথা শুনে:
“মুখে একটু জর্দা পুরে ডান হাত তুলে খয়বার গাজী তাকে থামিয়ে দেয়, তারপর বলে, ‘বাপু, বেসিক ডেমোক্রেসি কও আর এ্যাডাল্ট ফ্রাঞ্চাইজ কও, আইয়ুব খান কও আর শেখ মুজিব কও, দ্যাশের মানুষের ঈমান ঠিক নাই। ঈমান না থাকলে কেডা কি করবো?” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৯০)
অথচ ইউনিয়নের সমস্ত মুসলিম ভোটই খয়বারের হাতে। খয়বারের মত সামন্তশ্রেণিই প্রজাদের রক্তে গড়া ফসল লুণ্ঠন করে, ভূমিহীন, বর্গাচাষীদের জীবন বিপন্ন করে ক্ষমতার দম্ভে অটল থাকতে চায়।
গ্রামের জমির জালিয়াতি, সুদখোর মহাজনের অত্যাচার, গরু চুরির কূটকৌশল, বর্গাচাষীদের অসহায় আর্তনাদ ঔপন্যাসিক মৌল অবয়বে স্বতন্ত্ররূপে উন্মোচন করেছেন তাঁর শিল্পচেতনার অপরিমেয় শক্তি দ্বারা। সে সময়ে মিলিটারি-প্রশাসন যে পূর্ণাঙ্গভাবে আধিপত্যবাদীদের এখতিয়ারভুক্ত ছিল তা ঐতিহাসিক ভাষ্যে প্রমাণিত:
“দেশের সম্পদ ও বৈদেশিক ঋণ সবকিছুর ফায়দা আশেপাশের ভাগ্যবানরাই লুটিয়েছে। কৃষক তাহাদের সমস্যা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে দেন-দরবার করিতে চাহিলে তাহাদিগের মাথায় ও পিঠে পুলিশের লাঠি পড়িয়াছে।” (হোসেন, ১৯৮১ : ৮৫)
বাংলাদেশের গ্রামশাসিত জনপদে জমি প্রাণসম। কিন্তু জমির পরিচর্যায় তাদের থেকে যায় অতৃপ্তি, অসাম্যের দাহ। অসংখ্য কৃষক আন্দোলন, আত্মনিগ্রহের পরও প্রতিষ্ঠিত হয় না তাদের অধিকার। ঔপন্যাসিক তীক্ষ্ণধী মেধায় আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার এ প্রতিরূপ অঙ্কন করেছেন:
“আনোয়ার শুনতে পাচ্ছে যে হোসেন আলি ফকির ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের মেরে পচার বাপের মৃতদেহ ছিনিয়ে আনার সংকল্প ঘোষণার চিৎকারে বট-গাছে শিশির ভেজা পাতায় সপসপ এবং নিচের শুকনো পাতায় সরসর সাড়া তুলছে। চাঁদের অল্প-আলোয় দ্যাখা যায় যে, গোটা বটগাছ তার ডালপালা, পাতার বহর, ঝুড়ি ও থাম, শিকড় ও ছাদ নিয়ে তরতর করে কাঁপছে।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ১৯২)
সমগ্র কৃষক সমাজকে জেগে ওঠার প্রণোদনায় বটগাছকে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত করেছেন ঔপন্যাসিক। গ্রামীণ শ্রেণিসংঘাতে প্রকট রূপ ধারণ করে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব যেখানে আলীবক্স, চেংটুদের মত চরিত্রের শোষণের জাঁতাকল ভাঙার প্রতিবাদ মূলত নিপীড়িত কৃষকের বিপ্লবী চেতনার উন্মেষের প্রতিচিত্র। সামন্তশক্তির বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের এ সংগ্রাম মার্কসবাদে শোষক শোষিত দ্বন্দ্বের অনিবার্য পরিণতি, সাব-অল্টার্ন তত্ত্বে নীরব কৃষককণ্ঠের ইতিহাসমুখী উচ্চারণ:
“চিলেকোঠার সেপাই-এর আর্থ-সামাজিক জীবনার্থ গভীর এবং শৈল্পিক নৈপুণ্যে পরিব্যাপ্ত। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রখর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে নানা চরিত্রের মধ্য দিয়ে জীবন সমগ্রতার প্রতিরূপ নির্মাণ করেছেন। এখানে লেখক সন্দেহাতীতভাবে নির্মোহ এবং প্রগতিবাদী।” (ইকবাল, ২০০৯ : ৩৯)
উপন্যাসে সংগ্রামী চেতনার প্রকাশ ঘটাতে পারতো ওসমান; তবে নার্সিসিস্ট সত্তার দরুণ ব্যর্থতায় হয় পর্যবসিত। দায়িত্ব নিতে পারতো আনোয়ার, মধ্যবিত্ত সুলভ আপোষকামী মানসিকতার জন্য তা হয়ে ওঠেনি। সেই মহান দায়িত্ব পালন করেছে দুজন— চেংটু আর হাড্ডি খিজির। দেশ ও জনগণের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য দুজনকেই মহাজনদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে।
উত্তর-উপনিবেশবাদ তত্ত্বে, বিশেষত গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ( জ. ১৯৪২ ) এর Can The Subaltern Speak? (২০০৯) প্রবন্ধের তথ্যানুসারে স্পষ্ট যে, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা জনগণের কণ্ঠস্বর শাসক শ্রেণির কাছে প্রায়শই অবহেলিত থাকে। এ প্রেক্ষাপটে উপন্যাসে খিজির, চেংটুর মৃত্যু জাতীয় চেতনার উত্থান, শোষণ প্রতিরোধের সংঘর্ষ আর রাজনৈতিক সংগ্রামের ভয়ংকর বাস্তবতার ঐতিহাসিক ও তার শিল্পসত্যের প্রতীক। উত্তর উপনিবেশবাদী বাস্তবতার নির্মম সত্যকে উন্মোচন করে হাড্ডি খিজিরের মৃত্যুদৃশ্য:
“গুলিবর্ষণ, মিছিলের শেষ প্রান্তের ‘মানি না! মানি না।’... খিজির জানে, এইসময় স্পিড কমাতে নাই। স্পিড কমালেই অনিবার্য পতন।... সিগন্যালের লাল তর্জনী এখন অবয়ব বদলে গুলির শব্দে পরিণত হয়ে তাকে রীতিমতো শাসায়।... এক ঝাক টকটকাটকটক ধ্বনির সঙ্গে চোখের সামনেকার কালচে হলুদ আলোর ভাগ মিলিয়ে যায়, অন্ধকার গাঢ়তর হয়। ব্যাপারটা কী হলো? কোন শালা খানকির বাচ্চা ট্রাক এসে ধাক্কা দিলো তার বুকে, বুকের বাঁদিকে ও পেটের ঠিক ওপরভাগে।... গালাগালি করার জন্য মুখ হা করে, কিন্তু মুখ দিয়ে ধ্বনি বেরোয় না, সটান সে পড়ে গেছে ফুটপাথ ঘেঁষে। (ইলিয়াস, ২০২৩ : ২৫৪)
পাকিস্তানি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ছিল ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারবাহী দমনযন্ত্র; যেখানে প্রান্তিক কৃষক শ্রমিকদের জীবন একেবারেই তুচ্ছ। খিজির ও চেংটু বিদ্রোহী হলেও তারা এ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারবাহী শোষণ-সংস্কৃতির জাঁতাকলে চূর্ণ হয়। উত্তর উপনিবেশবাদে বলা হয়, ঔপনিবেশিক শাসনের পতনের পরও পুরনো ক্ষমতাকাঠামো নতুন রূপে বজায় থাকে— বক্ষ্যমান উপন্যাসে পাকিস্তানি সামরিক সামন্ততান্ত্রিক শোষণই তার প্রমাণ। উপন্যাসে প্রান্তিকবর্গের আত্মত্যাগের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার জন্ম হয় যা জাতীয় চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হোমি কে ভাভা (জ. ১৯৪৯) তাঁর The Location of Culture (1994) গ্রন্থে Hybridity, Third Space, Mimicry ধারণার মাধ্যমে উত্তর-উপনিবেশবাদী সমাজের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক রূপান্তরকে ব্যাখ্যা করেছেন। Hybridity বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, দমনের পরেও প্রান্তিক মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতিকে মিলিয়ে নতুন পরিচয় নির্মাণ করে নেয়। বক্ষ্যমাণ উপন্যাস-এর শেষাংশে এই ভাবনারই প্রতিফলন ঘটেছে - খিজির ও চেংটুর মৃত্যুতে আন্দোলনের স্রোত স্তব্ধ হয়নি; বরং জুম্মন ও ওসমানের মতো চরিত্রের মাধ্যমে পুনরায় প্রোথিত হয় দ্রোহের অঙ্কুর। ওসমানের ঘরের তালা ভেঙে রাস্তায় বের হয়ে আসা প্রতীকীভাবে third space এর সূচনা করে। সে ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতা ও আত্মসংকোচ ভেদ করে বৃহত্তর গণসংগ্রামের পটভূমিকায় একত্রিত হয়ে যায়। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সবদিকের পথই তার জন্য উন্মুক্ত; সে এখন যেদিকে তাকায় সেদিকেই পূর্ব-বাংলা:
“... জলজ্যান্ত ১টা শরীর নিয়ে ওসমানের তো হাঁটা ছাড়া আর গতি নাই। গ্রহ-নক্ষত্রের ফোকাসে গোলাপি নীল, নীলচে নীল, গোলাপি সাদা এবং নীলচে সাদা আকাশের নিচে এবং পানিকাদা কফথুথু গুমুতের ওপর পা টানতে টানতে ওসমানের চেহারায় নতুন ধরনের দাগ পড়ছে। এখন খাকি বলো কালো বলো, সবুজ বলো সাদা বলো- কারো সাধ্যি নাই যে তাকে সেই ওসমান গনি বলে সনাক্ত করে।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৩০৪)
ঔপনিবেশিক শাসন কেবল ভৌগোলিক দখল নয়; মানসিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যও গড়ে তোলে। সেই আধিপত্য ভাঙার জন্য জনগণকে তৈরি করতে হয় third space-একটা নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জায়গা, যেখানে পুরোনো দমননীতি ভেঙে স্বাধীনতার নতুন অর্থ জন্ম নেয়।
সালমান রুশদির (জ. ১৯৪৭) Midnight's Children (1981) এবং জর্জ ল্যামিং (১৯২৭-২০২২)-এর In the Castle of My Skin (১৯৫৩) উপন্যাসে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, ইতিহাস ও ব্যক্তিমানুষের চেতনার পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিশেষত্ব হলো, তিনি এ উত্তরাধিকারকে শ্রেণিশোষণ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও গণপ্রতিরোধের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে প্রান্তিক মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। উপন্যাসটির চিরকালীন আবেদন একে বিশ্বসাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রচনাপঞ্জি:
১. আলম, ফয়েজ (২০২০), উত্তর উপনিবেশী মন, সংবেদ, ঢাকা। ২. ইকবাল, শহীদ (২০০৯), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মানুষ ও কথাশিল্প, অন্বেষা, ঢাকা। ৩. ইলিয়াস, আখতারুজ্জামান (২০২৩), চিলেকোঠার সেপাই, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা। ৪. হোসেন, তফাজ্জল (১৯৮১), নির্বাচিত ভাষণ ও প্রবন্ধ, আবদুল হাফিজ (সম্পাদিত)। ৫. বাংলাদেশ বুকস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কলকাতা।
6. Holquist, Michael (1981), The Dialogic Imagination, University of Texas Press, Prologue, xviii. 7. Marx, Karl and Engels, Friedrich (2002), The Communist Manifesto, translated by Samuel Moore, Penguin Books, 80 Strand, London, WC2R ORL, England.

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
উত্তর-উপনিবেশবাদ (Post‑colonialism) ঔপনিবেশিক শাসনের পরও তার দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, ভাষিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে বিশ্লেষণ করে। ঔপনিবেশিক পর্ব শেষ হলেও তার গঠন— যেমন ‘অন্য’ (Other) বনাম ‘আমরা’, উপনিবেশিত বনাম ঔপনিবেশক— স্বাধীন রাষ্ট্রের অন্তর্ঘটনা হিসেবে বেঁচে থাকে। ‘উপনিবেশী প্রশাসকদের অনুকরণে উপনিবেশিতদের মধ্যে বুর্জোয়া শ্রেণির উত্থান। উপনিবেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পর এরা সাদা প্রভুদের অনুকরণে স্থানীয় প্রভুতে পরিণত হয়। এরা মর্যাদা পরিপূর্ণভাবে ভোগ করার জন্য উপনিবেশী প্রভুদের অনুকরণে পশ্চিমা সংস্কৃতির চর্চা করে। তা আত্মস্থ করে এবং তাকে ঊর্ধ্বে তুলে রাখে’। (আলম, ২০২০ : ২২-২৩) বিশ শতক বাংলা ভাষাভাষি মানুষজনের জীবনে একই সঙ্গে উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট সময়। শতকের সূচনায় সুপরিকল্পিত বঙ্গভঙ্গের ফলে প্রদেশের দুই জাতিগোষ্ঠীর সংস্কার ও জাতিবিদ্বেষ উন্মোচিত হয় নগ্নভাবে। সর্বশেষ উইনস্টন চার্চিল (১৮৭৪-১৯৬৫) পরিকল্পিত পঞ্চাশের মন্বন্তরে তিরিশ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ বাঙালির অকালে অপমৃত্যুর পথ ধরে আসে ১৯৪৭-এর শোচনীয় ও মর্মান্তিক স্বাধীনতা। স্বাধীনতার পরে ভারতবর্ষ ও পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা সমর্পিত হয় সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে। স্বাধীনতার পরেও তাই রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে শুরু করে জনজীবন পর্যন্ত উপনিবেশী সংস্কৃতির এ ভাব অনেকখানি অক্ষুণ্ন থেকে যায়।
বাঙালির আবেগদীপ্ত প্রত্যাশা-প্রাপ্তির অন্তর্ভেদী সত্যকে সম্পূর্ণতা প্রদানের ঐকান্তিকতায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ঋদ্ধ। তাঁর চিলেকোঠার সেপাই (১৯৮৬) মূলত রাজনৈতিক উপন্যাস। উপন্যাসের নায়ক যেন ৬৯। এক প্রচণ্ড জীবনস্পর্শী বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে শহর-বন্দর-গঞ্জ, নিভৃত গ্রাম, এমনকি যমুনার দুর্গম চর এলাকা। মিটিং-মিছিল, গুলিবর্ষণ আর কার্ফ্যু-ভাঙা ও গণআদালত সব জায়গায় ফেটে পড়ে ক্ষোভ ও বিদ্রোহ। সকল মানুষের হৃদয়ে অভিষেক ঘটে একটি অবিচল লক্ষ্যে— মুক্তি।
উপন্যাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বলিষ্ঠ প্রতিনিধি রহমতউল্লা। সে কেবল স্থানীয় প্রভু বা মহাজন নয়; তার মধ্যে ঔপনিবেশিক শাসকের মানসিকতাও সক্রিয়। ঔপনিবেশিক শাসকের দমননীতিকে অনুকরণ করে সে শ্রমিক ও নিম্নবর্গীয় মানুষের শ্রম, দেহ ও অধিকারকে নিজের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। তাই প্রলেতারিয়েত শ্রেণির খিজির তাদের শোষণ ও দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠলে রহমতউল্লা অবতীর্ণ হয় উপনিবেশ-উত্তর শোষকের ভূমিকায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের সপক্ষে গণ আন্দোলনের বিরোধিতায় নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ ও অবস্থান স্পষ্ট করে:
“মহাজন খিজিরকে ঠাস করে একটা চড় মেরে বসলো। কি ব্যাপার? ‘চুতমারানি আমারই খাইবি আমারই পরবি, আমি ঘর না দিলে জায়গা নাই, আর আমার লগে নিমকহারামি করস?’... তরে অক্ষন ধরাইয়া দেই তো কয় বছরের জেল খাটতে হইবো, জানস?... ছয় দফার পোস্টার মারস, আরে ছয় দফা হইলে পাকিস্তান থাকবো? আমরা পাকিস্তানের লাইগা ফাইট করছি।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৫২)
পাকিস্তানি রাজনীতির তথা সামন্তবাদ, উপনিবেশবাদ, পুঁজিবাদ, আমলাতন্ত্র, সামরিক শাসন ইত্যাদি বহুমুখী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে গণমানুষের পুঞ্জীভূত ক্রোধের প্রথম বিস্ফোরণ ঘটেছিল ৬৯-এর আন্দোলনে। মহাজনের শোষণ, অন্যায়-অপকর্ম অন্তর্দগ্ধ লুম্পেন প্রলেতারিয়েত চরিত্র খিজিরকে দেখা যায় গণঅভ্যুত্থানের আইয়ুব-বিরোধী মিছিলের অগ্রভাগে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, ধাপ্পাবাজ মহাজনের শাসন-শোষণের অবসানের জন্য জুলুমবাজ আইয়ুব সরকারের পতন অনির্বায। খিজিরের মত চরিত্র সম্পর্কে ভøাদিমির লেনিন (১৮৭০-১৯২৪) এর মত, ‘সংহতি সংগঠন এর শ্রেণি চেতনায় কৃষকেরা শ্রমিকের চেয়ে কম দৃঢ় বলে প্রমাণিত।’ (ইকবাল, ২০০৯ : ৫৪) সাধারণত Private Ownership Psychology-র কারণে কৃষকরা বাঁধা পড়ে থাকে। শ্রমিকরা সেখানে বন্ধনহীন, অগ্রগামী। খিজিরের অমিত তেজরূপী স্লোগানে বিস্ফোরিত হয় নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীদের শ্রেণিগত অবস্থান ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ:
“দ্বিগুণ শক্তিতে খিজির চিৎকার করে, ‘আইয়ুবের দালাল মহাজন!’ এবার জবাব আসে, ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক! তারপর ফের স্লোগান ওঠে, মহাজনের জুলুম, মহাজনের জুলুম-চলবে না, চলবে না!’ খিজির এবার ফের নতুন স্লোগান তোলে, ‘মানুষরে ডাইকা বেইজ্জতি করা— চলবে না, চলবে না!!.. সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা— ‘হুশিয়ার, হুশিয়ার’। দুনিয়ার মজদুর এক হও! কেউ খাবে, কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না। জোতদারের গদিতে আগুন জ্বালো এক সাথে।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৭০)
এ উত্তপ্ত দৃশ্য সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিত্রায়িত করে। নিপীড়িত মানুষের রক্তজাগানিয়া উচ্চারণ রূপ নেয় শ্রেণিসংগ্রামের ভাষায়; খিজিরের প্রতিবাদ শ্রমিকদের আন্দোলনের সাথে মিলিত হয়ে ছাত্রদের অগ্নিঝরা স্লোগানের সাথে একাকার হয়ে যায়— শ্রমিক-ছাত্রের ঐক্যের মধ্য দিয়েই বিস্তার লাভ করে গণআন্দোলন। সম্মিলিত বিদ্রোহ অবশ্যম্ভাবী করে তোলে মার্কসবাদকে। মার্কসবাদ উনিশ শতকের দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং বিপ্লবী কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩) ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (১৮২০-১৮৯৫) এর তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে গডে ওঠা রাজনৈতিক অনুশীলন ও সামাজিক তত্ত্ব। এ তত্ত্বে সামাজিক পরিবর্তনের দ্বান্দি¦ক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দৃষ্টিতে সামাজিক দ্বন্দ্ব ও শ্রেণি সম্পর্ককে ভিত্তি করে সমাজ বিশ্লেষণের বিশ্বদর্শন ও প্রক্রিয়া বয়ান করা হয়েছে। প্রায়োগিক বিবেচনায় মার্কসবাদ হচ্ছে মালিক শ্রেণির তথা বুর্জোয় শ্রেণির শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন তথা মজুরি-দাসত্ব থেকে প্রলেতারিয়েতের বা শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির মতবাদ। কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস The Communist Manifesto গ্রন্থে বলেছেন:
Though not in
substance, yet in form, the struggle of the proletariat with the bourgeoisie is
at first a national struggle. The proletariat of each country must, of course,
first of all settle matters with its own bourgeoisie. In depicting the most
general phases of the development of the proletariat, we traced the more or
less veiled civil war, raging within existing society, up to the point where
that war breaks out into open revolution, and where the violent overthrow of
the bourgeoisie lays the foundation for the sway of the proletariat. (Marx
& Engels, 2002 : 232)
তেমনি সাবঅল্টার্ন পাঠে খিজিরের কণ্ঠস্বরই হয়ে ওঠে প্রকৃত Sub altern Voice বা দমিতের বয়ান, যা মূল ধারার রাজনীতিতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও নিপীড়িত জনতার সংগ্রামকে ইতিহাসে দৃশ্যায়ন করে। আন্দোলনে খিজিরের ক্রোধান্বিত ভাষা ও সংগ্রামী মনোভাব সৃষ্টি করেছে এক বিপ্লবী জাগরণ, যা মিখাইল বাখতিন (১৮৯৫-১৯৭৫) কথিত কার্নিভালাইজেশন তত্ত্বের মতই-শাসকশ্রেণির আধিপত্যবাদকে ভেঙে দিয়ে নিম্নবর্গের ক্ষমতা কাঠামো নির্মাণ করে। কারণ, ‘বাখতিনের কার্নিভালাইজেশন হলো... স্বয়ং বিপ্লব।’ (Holquist, 1981 : xviii) খিজিরের বক্তব্যে পুরনো ঢাকার মুখের ভাষা ব্যবহারে ঔপন্যাসিক যে স্বাচ্ছন্দ্যের পরিচয় দিয়েছেন তাতে তাঁর অসামান্য কৃতিত্ব বিস্মিত করে তোলে:
“তারস্বরে খিজির চ্যাঁচাতে শুরু করে, ‘ভাইসব ভাইসব, আপনেরা খালি চিল্লা-চিল্লি করেন ক্যালায়? খামোস মাইরা মিটিং হোনবার পারেন না? পাঁচজনে দশজনে একলগে নামছেন, খালি চিল্লাচিল্লি করবেন তো খালি হাউকাউ হইবে, কাম হইবো আপনের কেলাটা! কাম করেন একলগে, হাউকাউ কইরেন না।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৭০)
কার্নিভালের মতো নিম্নবিত্তের ক্রোধ ও সচেতনতাকে ভাষার শৈল্পিক প্রয়োগে উন্মোচন করে ঔপন্যাসিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের ঢেউ যখন অনিবার্য গতিতে তরঙ্গায়িত হয়ে গ্রামেও বিদ্রোহের অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করে, তখন তা কেবল রাজনৈতিক বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং রূপ নেয় প্রকৃত শ্রেণিসংগ্রামে। শোষক-শোষিতের দ্বন্দ্বে একতাবদ্ধ গ্রামের (চন্দনদহ, পদুমশহর, গোটিয়া) মানুষ; কিন্তু বুর্জোয়াদের কূটকৌশলে ভেস্তে যায় সব কিছু। এ বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার গ্রামীণ শোষক মৌলিক গণতন্ত্রী ও বৃহৎ ভূস্বামী খয়বার গাজী। গ্রামীণ অর্থনীতি, রাজনীতি ও ধর্মব্যবস্থার পূর্ণ নিয়ন্ত্রক প্রবল বিষয়ী মানুষ খয়বার কুশলী অভিনেতাও। তার সম্পত্তি-ক্ষুধা দুর্নিবার ‘চাঁদে চাঁদে তার মোকদ্দমা’। শোষণের সুবিধার্থে সে ধর্মকে ব্যবহার করে, তার সশব্দে ঘনঘন আল্লাহর নাম নেওয়ার মধ্যেও থাকে আধিপত্যবাদের ইশারা। এমনকি, তার কথা বলা বা না-বলা, অঙ্গচালনা কিংবা হাসির রকমফেরে অভিসন্ধির তাৎপর্য বদলে যায়। আনোয়ারের মুখে ভোট জালিয়াতির কথা শুনে:
“মুখে একটু জর্দা পুরে ডান হাত তুলে খয়বার গাজী তাকে থামিয়ে দেয়, তারপর বলে, ‘বাপু, বেসিক ডেমোক্রেসি কও আর এ্যাডাল্ট ফ্রাঞ্চাইজ কও, আইয়ুব খান কও আর শেখ মুজিব কও, দ্যাশের মানুষের ঈমান ঠিক নাই। ঈমান না থাকলে কেডা কি করবো?” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৯০)
অথচ ইউনিয়নের সমস্ত মুসলিম ভোটই খয়বারের হাতে। খয়বারের মত সামন্তশ্রেণিই প্রজাদের রক্তে গড়া ফসল লুণ্ঠন করে, ভূমিহীন, বর্গাচাষীদের জীবন বিপন্ন করে ক্ষমতার দম্ভে অটল থাকতে চায়।
গ্রামের জমির জালিয়াতি, সুদখোর মহাজনের অত্যাচার, গরু চুরির কূটকৌশল, বর্গাচাষীদের অসহায় আর্তনাদ ঔপন্যাসিক মৌল অবয়বে স্বতন্ত্ররূপে উন্মোচন করেছেন তাঁর শিল্পচেতনার অপরিমেয় শক্তি দ্বারা। সে সময়ে মিলিটারি-প্রশাসন যে পূর্ণাঙ্গভাবে আধিপত্যবাদীদের এখতিয়ারভুক্ত ছিল তা ঐতিহাসিক ভাষ্যে প্রমাণিত:
“দেশের সম্পদ ও বৈদেশিক ঋণ সবকিছুর ফায়দা আশেপাশের ভাগ্যবানরাই লুটিয়েছে। কৃষক তাহাদের সমস্যা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে দেন-দরবার করিতে চাহিলে তাহাদিগের মাথায় ও পিঠে পুলিশের লাঠি পড়িয়াছে।” (হোসেন, ১৯৮১ : ৮৫)
বাংলাদেশের গ্রামশাসিত জনপদে জমি প্রাণসম। কিন্তু জমির পরিচর্যায় তাদের থেকে যায় অতৃপ্তি, অসাম্যের দাহ। অসংখ্য কৃষক আন্দোলন, আত্মনিগ্রহের পরও প্রতিষ্ঠিত হয় না তাদের অধিকার। ঔপন্যাসিক তীক্ষ্ণধী মেধায় আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার এ প্রতিরূপ অঙ্কন করেছেন:
“আনোয়ার শুনতে পাচ্ছে যে হোসেন আলি ফকির ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের মেরে পচার বাপের মৃতদেহ ছিনিয়ে আনার সংকল্প ঘোষণার চিৎকারে বট-গাছে শিশির ভেজা পাতায় সপসপ এবং নিচের শুকনো পাতায় সরসর সাড়া তুলছে। চাঁদের অল্প-আলোয় দ্যাখা যায় যে, গোটা বটগাছ তার ডালপালা, পাতার বহর, ঝুড়ি ও থাম, শিকড় ও ছাদ নিয়ে তরতর করে কাঁপছে।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ১৯২)
সমগ্র কৃষক সমাজকে জেগে ওঠার প্রণোদনায় বটগাছকে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত করেছেন ঔপন্যাসিক। গ্রামীণ শ্রেণিসংঘাতে প্রকট রূপ ধারণ করে উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্ব যেখানে আলীবক্স, চেংটুদের মত চরিত্রের শোষণের জাঁতাকল ভাঙার প্রতিবাদ মূলত নিপীড়িত কৃষকের বিপ্লবী চেতনার উন্মেষের প্রতিচিত্র। সামন্তশক্তির বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের এ সংগ্রাম মার্কসবাদে শোষক শোষিত দ্বন্দ্বের অনিবার্য পরিণতি, সাব-অল্টার্ন তত্ত্বে নীরব কৃষককণ্ঠের ইতিহাসমুখী উচ্চারণ:
“চিলেকোঠার সেপাই-এর আর্থ-সামাজিক জীবনার্থ গভীর এবং শৈল্পিক নৈপুণ্যে পরিব্যাপ্ত। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রখর সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে নানা চরিত্রের মধ্য দিয়ে জীবন সমগ্রতার প্রতিরূপ নির্মাণ করেছেন। এখানে লেখক সন্দেহাতীতভাবে নির্মোহ এবং প্রগতিবাদী।” (ইকবাল, ২০০৯ : ৩৯)
উপন্যাসে সংগ্রামী চেতনার প্রকাশ ঘটাতে পারতো ওসমান; তবে নার্সিসিস্ট সত্তার দরুণ ব্যর্থতায় হয় পর্যবসিত। দায়িত্ব নিতে পারতো আনোয়ার, মধ্যবিত্ত সুলভ আপোষকামী মানসিকতার জন্য তা হয়ে ওঠেনি। সেই মহান দায়িত্ব পালন করেছে দুজন— চেংটু আর হাড্ডি খিজির। দেশ ও জনগণের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য দুজনকেই মহাজনদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে।
উত্তর-উপনিবেশবাদ তত্ত্বে, বিশেষত গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ( জ. ১৯৪২ ) এর Can The Subaltern Speak? (২০০৯) প্রবন্ধের তথ্যানুসারে স্পষ্ট যে, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা জনগণের কণ্ঠস্বর শাসক শ্রেণির কাছে প্রায়শই অবহেলিত থাকে। এ প্রেক্ষাপটে উপন্যাসে খিজির, চেংটুর মৃত্যু জাতীয় চেতনার উত্থান, শোষণ প্রতিরোধের সংঘর্ষ আর রাজনৈতিক সংগ্রামের ভয়ংকর বাস্তবতার ঐতিহাসিক ও তার শিল্পসত্যের প্রতীক। উত্তর উপনিবেশবাদী বাস্তবতার নির্মম সত্যকে উন্মোচন করে হাড্ডি খিজিরের মৃত্যুদৃশ্য:
“গুলিবর্ষণ, মিছিলের শেষ প্রান্তের ‘মানি না! মানি না।’... খিজির জানে, এইসময় স্পিড কমাতে নাই। স্পিড কমালেই অনিবার্য পতন।... সিগন্যালের লাল তর্জনী এখন অবয়ব বদলে গুলির শব্দে পরিণত হয়ে তাকে রীতিমতো শাসায়।... এক ঝাক টকটকাটকটক ধ্বনির সঙ্গে চোখের সামনেকার কালচে হলুদ আলোর ভাগ মিলিয়ে যায়, অন্ধকার গাঢ়তর হয়। ব্যাপারটা কী হলো? কোন শালা খানকির বাচ্চা ট্রাক এসে ধাক্কা দিলো তার বুকে, বুকের বাঁদিকে ও পেটের ঠিক ওপরভাগে।... গালাগালি করার জন্য মুখ হা করে, কিন্তু মুখ দিয়ে ধ্বনি বেরোয় না, সটান সে পড়ে গেছে ফুটপাথ ঘেঁষে। (ইলিয়াস, ২০২৩ : ২৫৪)
পাকিস্তানি রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ছিল ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারবাহী দমনযন্ত্র; যেখানে প্রান্তিক কৃষক শ্রমিকদের জীবন একেবারেই তুচ্ছ। খিজির ও চেংটু বিদ্রোহী হলেও তারা এ ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারবাহী শোষণ-সংস্কৃতির জাঁতাকলে চূর্ণ হয়। উত্তর উপনিবেশবাদে বলা হয়, ঔপনিবেশিক শাসনের পতনের পরও পুরনো ক্ষমতাকাঠামো নতুন রূপে বজায় থাকে— বক্ষ্যমান উপন্যাসে পাকিস্তানি সামরিক সামন্ততান্ত্রিক শোষণই তার প্রমাণ। উপন্যাসে প্রান্তিকবর্গের আত্মত্যাগের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার জন্ম হয় যা জাতীয় চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হোমি কে ভাভা (জ. ১৯৪৯) তাঁর The Location of Culture (1994) গ্রন্থে Hybridity, Third Space, Mimicry ধারণার মাধ্যমে উত্তর-উপনিবেশবাদী সমাজের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক রূপান্তরকে ব্যাখ্যা করেছেন। Hybridity বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, দমনের পরেও প্রান্তিক মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতিকে মিলিয়ে নতুন পরিচয় নির্মাণ করে নেয়। বক্ষ্যমাণ উপন্যাস-এর শেষাংশে এই ভাবনারই প্রতিফলন ঘটেছে - খিজির ও চেংটুর মৃত্যুতে আন্দোলনের স্রোত স্তব্ধ হয়নি; বরং জুম্মন ও ওসমানের মতো চরিত্রের মাধ্যমে পুনরায় প্রোথিত হয় দ্রোহের অঙ্কুর। ওসমানের ঘরের তালা ভেঙে রাস্তায় বের হয়ে আসা প্রতীকীভাবে third space এর সূচনা করে। সে ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতা ও আত্মসংকোচ ভেদ করে বৃহত্তর গণসংগ্রামের পটভূমিকায় একত্রিত হয়ে যায়। পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ সবদিকের পথই তার জন্য উন্মুক্ত; সে এখন যেদিকে তাকায় সেদিকেই পূর্ব-বাংলা:
“... জলজ্যান্ত ১টা শরীর নিয়ে ওসমানের তো হাঁটা ছাড়া আর গতি নাই। গ্রহ-নক্ষত্রের ফোকাসে গোলাপি নীল, নীলচে নীল, গোলাপি সাদা এবং নীলচে সাদা আকাশের নিচে এবং পানিকাদা কফথুথু গুমুতের ওপর পা টানতে টানতে ওসমানের চেহারায় নতুন ধরনের দাগ পড়ছে। এখন খাকি বলো কালো বলো, সবুজ বলো সাদা বলো- কারো সাধ্যি নাই যে তাকে সেই ওসমান গনি বলে সনাক্ত করে।” (ইলিয়াস, ২০২৩ : ৩০৪)
ঔপনিবেশিক শাসন কেবল ভৌগোলিক দখল নয়; মানসিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যও গড়ে তোলে। সেই আধিপত্য ভাঙার জন্য জনগণকে তৈরি করতে হয় third space-একটা নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জায়গা, যেখানে পুরোনো দমননীতি ভেঙে স্বাধীনতার নতুন অর্থ জন্ম নেয়।
সালমান রুশদির (জ. ১৯৪৭) Midnight's Children (1981) এবং জর্জ ল্যামিং (১৯২৭-২০২২)-এর In the Castle of My Skin (১৯৫৩) উপন্যাসে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার, ইতিহাস ও ব্যক্তিমানুষের চেতনার পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিশেষত্ব হলো, তিনি এ উত্তরাধিকারকে শ্রেণিশোষণ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও গণপ্রতিরোধের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে প্রান্তিক মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। উপন্যাসটির চিরকালীন আবেদন একে বিশ্বসাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রচনাপঞ্জি:
১. আলম, ফয়েজ (২০২০), উত্তর উপনিবেশী মন, সংবেদ, ঢাকা। ২. ইকবাল, শহীদ (২০০৯), আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মানুষ ও কথাশিল্প, অন্বেষা, ঢাকা। ৩. ইলিয়াস, আখতারুজ্জামান (২০২৩), চিলেকোঠার সেপাই, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা। ৪. হোসেন, তফাজ্জল (১৯৮১), নির্বাচিত ভাষণ ও প্রবন্ধ, আবদুল হাফিজ (সম্পাদিত)। ৫. বাংলাদেশ বুকস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, কলকাতা।
6. Holquist, Michael (1981), The Dialogic Imagination, University of Texas Press, Prologue, xviii. 7. Marx, Karl and Engels, Friedrich (2002), The Communist Manifesto, translated by Samuel Moore, Penguin Books, 80 Strand, London, WC2R ORL, England.

আপনার মতামত লিখুন